Home "ধারাবাহিক গল্প জোড়া শালিকের গল্প জোড়া শালিকের গল্প পর্ব-০৩ এবং শেষ পর্ব

জোড়া শালিকের গল্প পর্ব-০৩ এবং শেষ পর্ব

0
11

#জোড়া_শালিকের_গল্প
#শেষ_পর্ব
#ইশরাত_জাহান_জেরিন

নতুন কাজের চার মাসের মাথায় সাভারের ওই বড় অটো গ্যারেজে পলাশের নাম ছড়িয়ে পড়ল। পলাশের হাতের কাজ যেমন নিখুঁত, তেমনি মুখভরা অমায়িক মিষ্টি কথা। গ্যারেজের মালিক করিম সাহেব পলাশকে খালি হাতে যেতে দেন না। বেতন তো বটেই, মাস শেষে ভালো বখশিসও হাতে তুলে দেন। আজ মাসের শেষ তারিখ। ঘরে ফিরে পলাশ সটান বুননের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। বুনন তখন ঘরে বসে পানের বাটা পরিষ্কার করছিল। পলাশকে হঠাৎ এভাবে সামনে এসে দাঁড়াতে দেখে সে অবাক হয়ে বলল, “কী হলো পলাশ? এভাবে খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন? চোখ মুখ তো বেশ রহস্যময় লাগছে!”

পলাশ কোনো কথা না বলে পাঞ্জাবির ভেতরের পকেট থেকে ছোট একটা লাল মখমলের পলিথিন বের করে সোজা বুননের কোলে ফেলে দিল। বুনন পলিথিনের বাঁধন খুলতেই চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। ভেতরে চকচক করছে তার মায়ের দেওয়া সেই একমাত্র সোনার বালাটা! বন্ধক রাখা বালা ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছে পলাশ! বুননের গলার কাছটা আনন্দে আটকে এলো। সে বালাটার দিকে তাকিয়ে রইল, কোনো কথা মুখ দিয়ে বের হলো না। পলাশ হাঁটু গেড়ে বুননের পাশে বসল। তারপর বুননের নরম হাতে নিজ হাতে বালাটা পরিয়ে দিয়ে বলল, “কী গো বুনন? কথা বন্ধ হয়ে গেল নাকি? বলেছিলাম না তিন মাসের মধ্যে তোমার মায়ের স্মৃতি তোমঅর হাতে ফিরিয়ে দেব? পলাশ কথা দিলে কথা রাখে!”

বুনন ভেজা চোখে পলাশের দিকে তাকাল। “তুমি এত খাটুনি খাটো পলাশ… নিজের জন্য একটা ভালো জামাও কেন না। আর আমার জন্য এত কিছু করো!”

“তুমি ভালো থাকলে আমার দশটা ভালো জামা কেনার চেয়ে বেশি শান্তি লাগে বুনন। তবে শোনো, সারপ্রাইজ কিন্তু এখানেই শেষ নয়!” পলাশ পকেট থেকে আরেকটা খাম বের করল।

“এটা কী?” বুনন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

“এটা হলো আমাদের এই স্যাঁতসেঁতে নিচতলার সাবলেট ঘরকে টাটা বাই-বাই জানানোর টিকেট!” পলাশ একগাল হেসে বলল, “গ্যারেজের কাছেই এক দোতলায় সুন্দর একটা দুটো রুমের ফ্ল্যাট ভাড়া পেয়েছি। ব্যালকনি আছে, প্রকাণ্ড জানালা আছে, হু হু করে আলো-বাতাস আসে! আগামী মাসের ১ তারিখেই আমরা নতুন ঘরে উঠছি।”

বুননের বুকের ভেতরটা যেন এক নিমিষে শান্তির সুবাসে ভরে গেল। এই এক চিলতে সাবলেট ঘরে ওদের যত কান্না, যত কষ্ট আর অভাবের স্মৃতি ছিল সব যেন এক নিমেষে ধুয়েমুছে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় হালকা ধাক্কা পড়ল। বুনন আর পলাশ দুজনই অবাক হলো। এই সাবলেট ঘরে তো ওদের পরিচিত কেউ আসে না। পলাশ গিয়ে দরজা খুলতেই চমকে উঠল। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে বুননের ছোট ভাই রাতুল! হাত দুটো জ্যাকেটের পকেটে পুরে লজ্জিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা। বুনন লাফিয়ে উঠে ছুটে এলো, “রাতুল! তুই? এখানে কীভাবে পালি আমাদের ঠিকানা?”

রাতুল ঘরের ভেতর ঢুকল। ছোট সাবলেট ঘরের চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে দেখে তার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। বুননের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপা, বাবা খুব অসুস্থ। পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। তোদের পালিয়ে যাওয়ার পর প্রথমে খুব রাগ করেছিলেন, কিন্তু এখন দিনরাত তোর কথা মনে করে কাঁদেন। মায়েরও শরীর ভালো না। বাবা তোকে আর দুলাভাইকে শেষবার দেখতে চেয়েছেন… তোদের ক্ষমা করে দিয়েছেন রে আপা।”

বুনন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ছোট ভাইকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। এতদিন ধরে মনের ভেতরে জমিয়ে রাখা অভিমান আর কষ্টের বাঁধ ভেঙে গেল এক মুহূর্তে।

পলাশ রাতুলের কাঁধে হাত রেখে খুব শান্ত ও নরম গলায় বলল, “চল রাতুল, আমরা কাল সকালেই গ্রামে যাব। বাবার পাশে গিয়া দাঁড়াব। ক্ষমা চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই, আমরা তো পরিবারেরই লোক।”

রাতুল পলাশের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। যে ছেলেটাকে একসময় গ্রামে সবাই অবহেলা করত, সে আজ কতটা পরিণত, কত বড় মনের মানুষ হয়ে উঠেছে!

—

তিন দিন পর। গ্রামের বাড়ি থেকে বাবা-মায়ের সাথে দেখা করে, মা-বাবার উজার করে দোয়া নিয়ে বুনন আর পলাশ আবার শহরে ফিরে এসেছে। আগামীকাল সকালে ওরা এই সাবলেট ঘর ছেড়ে নতুন দোতলার আলো-বাতাসপূর্ণ ঘরে শিফট করবে।
ঘরের সব জামাকাপড়, হাঁড়ি-পাতিল গুছিয়ে বাক্সে পোড়া শেষ। বিকেলের হালকা সোনাঝরা রোদ এসে পড়েছে জানালার ওই পুরনো ফাটলটায়। বুনন ধীরে ধীরে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। জানালার গ্রিল ধরে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল ফাটলটার দিকে। দেয়ালের সেই ভাঙা ফাটলটায় শালিকের বাসাটা এখন আর খালি নেই। খড়কুটোর ছোট নীড়টার ভেতরে এখন ফুটে উঠেছে ছোট্ট দুটি শালিকের ছানা! বড় শালিক আর ছোট শালিক ঘুরে ঘুরে ছানা দুটোর মুখে খাবারের টুকরো তুলে দিচ্ছে। পলাশ পেছন থেকে এসে শান্তভাবে বুননের কোমর জড়িয়ে ধরল। থুতনিটা রাখল বুননের কাঁধে।

“কী গো বুনন? পুরনো ঘর ছাড়তে মন খারাপ লাগছে নাকি?” পলাশ বুননের কানে কানে বলল।

বুনন পলাশের গায়ে মাথা হেলিয়ে দিয়ে পরম তৃপ্তিতে মুচকি হাসল। “মন খারাপ হবে কেন? আমি তো দেখছি প্রকৃতির নিয়ম। ওই দ্যাখো পলাশ, শালিক দুটোও নতুন প্রাণ এনে নিজেদের সংসার পূর্ণ করল। আর আমরাও আমাদের নতুন ভোরের দিকে যাচ্ছি।”

পলাশ বুননের গালে মিষ্টি একটা চুমু খেয়ে চোখ টিপে বলল, “ঠিক বলেছ। শালিক জোড়া ওদের ফাটলে বাসা বুনে সংসার বাড়াল, আর আমরা এই ইট-পাথরের শহরে নিজেদের ভালোবাসা দিয়ে জীবন বুনে নিলাম। তবে শোনো, দোতলার নতুন বাসায় কিন্তু এমন এক জোড়া শালিকের জন্য একটা মাটির পাত্র আমি ব্যালকনিতে ঝুলিয়ে রাখবই!”

বুনন হেসে ফেলে পলাশের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। জানালার ওপারে বাতাসে উড়ে গেল এক জোড়া শালিক, আর এপারে এক চিলতে সাবলেট ঘরে দাঁড়িয়ে রইল ভালোবাসা দিয়ে নিজেদের নীড় বুনে নেওয়া দুটি মানুষ যাদের আর কোনো অভাব নেই, কোনো আফসোস নেই, আছে শুধু এক অসীম পূর্ণতার আকাশ!

( সমাপ্ত)