তুই আমার কাব্য পর্ব-০৩

0
941

#তুই_আমার_কাব্য 🍂

#Writer: Anha Ahmed 🍂
#Part : 3
.
🍁
.

ভয়ে মেঘলার এবার মনে হচ্ছে যেনো হার্ড এ্যাটাক হয়ে যাবে। কাব্য বসে থেকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেনো মানুষ না হয়ে খাওয়ার বস্তু হলে এখনি খেয়ে নিতো। ভাবলেশহীন হয়ে মেঘলাকে বলে,

– বসো

– কোথায় বসবো?

– এখানে ( নিজের কোল দেখিয়ে)

– কিহহহহহহহহ ( চিৎকার করে)

– এই মেয়ে এতো জোড়ে চিল্লাসো কেনো? কানের পর্দা তো দেখছি ফাটিয়ে দেবে। কপাল ফাটিয়ে শান্তি হয় নি নাকি যে আবার কান ফাটানোর ফন্দি আঁটছো?

– তো আর কি করবো? এতো জায়গা থাকতে আপনার কোলে গিয়ে বসবো আমি কোন দুঃখে? এর থেকে তো ভালো আমি সারাদিন এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবো। তবু আপনার কোলে গিয়ে বসবো না।

– বসতে তো তোমায় হবেই।

-কখনোই না। মরে গেলেও না।

– মরে যাওয়ার আগেই বসবে। সেইটা না করলে তুমি ভার্সিটিতে টিকতে পারবে না। আমি টিকতে দেবো না।

– টিকতে দেবেন না মানে? ভার্সিটি কি আপনার দাদার সম্পত্তি? এইটা সরকারি সম্পত্তি আর সরকারি জিনিসে দেশের সব নাগরিকের সমান অধিকার আছে।

– দাদার নাকি আমার সম্পত্তি তা ঠিকই বুঝে যাবে। আপাতত এখন যা বলছি তা করো।

একটা ছেলে ফার্স্টএইড বক্স এনে মেঘলার হাতে দিলো। মেঘলা বিরক্ত হয়ে নিজে নিজেই বলতে শুরু করলো,

-আজিব এইটা আমার হাতে কেনো দিলো? চোট কি আমি পেয়েছি নাকি?

ছেলেটাকে জিজ্ঞাসা করলো,

– আমি এইটা দিয়ে কি করবো?

ছেলেটা কিছু না বলে কাব্যের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো। মেঘলা জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে কাব্যের দিকে তাকালো। কাব্যের পাশে থাকা মেয়েটা বলল,

– ওইটা মেকআপ বক্স। মেকআপ করো।

কাব্যের পাশে রাহি রাগি মুডে দাঁড়িয়ে ছিলো। ওর বসে থাকলে হয়তো মেঘলার গায়ে হাতই তুলতো। কিন্তু কাব্যের উপস্থিতিতে এইটা সম্ভব নয়।
রাহির কথা শুনে উপস্থিত সবাই হেসে ওঠলো। প্রচন্ড রাগ হচ্ছে মেঘলার। মাথা জ্বলে যাচ্ছে। সবকটার চুল টেনে টেনে ছিড়তে ইচ্ছা হচ্ছে।

– নিজে মেকআপ ম্যান সরি ওম্যান হয়ে সেজে দাড়িয়ে আছে আর আমাকে বলছে মেক আপ করতে। সাতচুন্নি। ( নিচের দিকে তাকিয়ে মনে মনে)

সবার হাসি কাব্যের ধমকে থেমে গেলো। কাব্য আবারো মেঘলাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

– ব্যাথা যখন তুমি দিয়েছো তখন ঔষধটাও তুমি লাগিয়ে দেবে।

উনাদের কথায় রাগের মাত্রা বেড়েই যাচ্ছে মেঘলার । কখন যে ব্রাষ্ট হয়ে যাবে তা নিজেই জানি না। এহ্ শখ কতো ঔষধ লাগিয়ে দেবে।

– পারবো না

– সরি কি বললে বুঝি নি

– বলেছি আমি পারবো না ( মৃদু চিৎকার করে)

– অনি রাহি তোরা কি কিছু শুনতে পারছিস? কেউ কি কিছু বলছে?

কাব্যের কথায় এবার রাগ না হয়ে ব্যপক পরিমাণে কান্না পাচ্ছে মেঘলার । কাব্যের ধমকে মেঘলার সমস্ত শরীর কেঁপে উঠলো।

– যা বলেছি তা কি করবে নাকি অন্য কোনো রাস্তা বের করতে হবে। আর তা যদি হয় ট্রাস্ট মি তোমার একদম ভালো লাগবে না। ( কাব্য)

ভয়ে কাব্য যা বললেন তাই করতে লাগলো মেঘলা। ইতস্ততভাবো কোলে বসে কাব্যের কপালে মেডিসিন লাগিয়ে ব্যান্ডিজ করে দিলো। অসম্ভব পর্যায়ে অপমান বোধ হচ্ছে মেঘলার। রাগ না হয়ে কান্না পাচ্ছে খুব। চোখে পানি ছলছল করছে। বেড়িয়ে যাবে যেকোনো সময়। অনেক কষ্টে বাঁধ দিয়ে রেখেছে। ব্যান্ডেজ করা শেষে কাব্যের চোখে চোখ পরলো। মেঘলার চোখে চোখ পরতে কাব্যের চোখ আবার রাগে লাল হয়ে গেলো। কারণ টা বুঝে ওঠতে পারলো না। বুঝে উঠার আগেই কাব্য মেঘলাকে কোল থেকে ওঠার সময়টুকু না দিয়ে নিজে ওঠে দাড়িয়ে পড়লো আর মেঘলা ঠাস করে পরে গেলো।

– আহ্

মেঘলাকে এভাবে পরে যেতে দেখে সবাই হেসে দিলো। মেঘলার নিজেকে জোকার জোকার মনে হলো। চোখের পানি আর বাঁধ দিয়ে রাখা গেলো না। এবার বেড়িয়েই গেলো। হঠাৎ করে পরে যাওয়ায় পা টা মছকিয়ে গেছে। একা ওঠে দাঁড়াতেও পারছে না। তবু কষ্ট করে উঠতে যাবে তার আগেই দেখে কাব্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। যাক সামান্য মানবতাবোধটুকু তো আছে ভেবে হাত ধরতে যাবে তখনই আবার হাতটা সরিয়ে নিলো। আবার অপমান। হাসতে হাসতে বেড়িয়ে গেলো কাব্য আর ওর পেছন পেছন ওর কিছু বন্ধুরা। মেঘলা আর তনু আছে একমাত্র রুমটাতে। তনু এসে ওঠাতে যাবে ওকে একটা ধমক দিয়ে দুরে সরিয়ে দিলো মেঘলা । কান্না পাচ্ছে, ভিষণ কান্না পাচ্ছে। গলা ফাটিয়ে কান্না করতে ইচ্ছা করছে। এর মধ্যেই তনু বলে উঠলো,

– কিরে তুই কি উঠবি না? নাকি এখানেই বসে থাকবি?

– চুপ একদম চুপ। একটা কথা বলবি না তুই ( চিৎকার করে)

– আমার উপর রাগছিস কেনো? আমি কি তোকে কিছু করেছি নাকি?

– হ্যা তুই ই করেছিস। তোর জন্যই এসব কিছু হয়েছে। কে বলেছিলো তোকে কোক খেতে। একটু পর না খেরে তোর হয় না তাই না? তখন তুই কোক না আনলে আমি খেতাম না, না খেলে ওই ভাবে ছুড়তামও না আর না ছুড়লে ছেলেটারো কপাল কাটতো না আর আমাকে এতো অপমান এতো কিছু পোহাতে হতো না। সব দোষ তোর।

বলেই মেঘলা কান্না শুরু করলো। হাত পা ছড়িয়ে কান্না করতে ইচ্ছে করছে। রাগগুলো কান্নার রূপে বের হয়ে যাচ্ছে। গলা ফাটিয়ে বকতে শুরু করলো ,

-শয়তানের হাড্ডি, নাইজেরিয়া গন্ডার, আফ্রিকান হাতি, কান কাটা বনমানুষ, উগান্ডার সেনাপতি, লাল তিমির বাচ্চা, এনাকন্ডা কোবরা। তোকে দেখে কিনা ক্রাশ খেয়েছিলাম। ছিহ্ নিজের উপরই রাগ হচ্ছে। এরকম একটা বদমাইশ ছেলের উপর আমি কি করে ক্রাশ খেলাম। ছিহ্ মেঘলা তোর টেস্ট এতো খারাপ হয়ে গেছে। মানবিকতা বলে কোনো চিজ ই নাই এর মাঝে। সাদা মুরগি একটা, ইংল্যান্ডের বাচ্চা।

– মেঘলা তুই এভাবে বকছিস কেনো? দ্যাখ ছেলেটা কিন্তু এমনিতেই খুব ড্যাশিং। কি কিউট রে বাবা। ( নেকা নেকা করে)

– থাপরাযে তোর আক্কেল দাঁত ফালায়ে দেবো। কিউট না ছাই। এর থেকে তো ওই আবির ভাইয়াই শতগুনে ভালো। আমি ওনাকে লুচু ভেবেছিলাম আর এ তো দ্যখি ওনার থেকেও দশগুন বেশি খারাপ। ( কান্নার স্বরে)

– যাই বলিস না কেনো মেঘলা, তোর জায়গায় যদি আমি থাকতাম তাহলে কিন্তু খুশিই হতাম। আহ্ কি রোমান্টিক দৃশ্য ক্রিয়েট হতো ( মুচকি হেসে)

তনুর কথা শুনে মাথায বাজ পরছে মেঘলার । তনুর দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবতে বলতে থাকে,
– বলে কি এ মেয়ে? আমার ফ্রেন্ড এতো লুচি হলো কবে থেকে? হায় খোদা রক্ষা কর আমায় না হলে তুলে নাও।

এরপর আবারো ধমকের সুরে তনুকে বকতে থাকে,

– যদি আমার হাতে মার খেতে না চাস তাহলে ওই সাদা মুরগির না থুরি মুরগের কথা বাদ দে। আর আমাকে ওঠা।

রুম থেকে বেড়োতেই দেখে একটা ছেলে স্প্র নিয়ে এসেছে।

– এইটা আপনার জন্য পাঠিয়েছে

– কে?

– ওই যে সানগ্লাস হাতে ভাইয়াটা

প্রথমে তাকাতেই দেখে আবির সানগ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। মেঘলা তাকাতেই আবির একটা মিষ্টি হাসি দিলো। মেঘলা হাসি দিয়ে ভাবতে থাকে,

– মানুষটাকে যতটা খারাপ মনে করেছিলাম ততটাও খারাপ না। আর যাই হোক ওই সাদা মোরগটার থেকে যথেষ্ট ভালো আর মানবিকতা সম্পন্ন।

একটু সামনে চোখ পড়তে দেখলো কাব্যরা বসে আছে। কাব্য চোখে সানগ্লাস পড়ছে। কাব্য দেখে মেঘলার মুখ থেকে হাসি উধাও হয়ে গেলো। রাগ ও অপমানের কষ্টের এক মিশ্রিত রূপ ফুটে ওঠছে চোখে মুখে। ছেলেটার হাত থেকে স্প্রেটা নিয়ে বসে লাগিয়ে নিলো মেঘলা । কিন্তু না তনু শান্তি মতো আর নিতে দিলো না।

– হাও সুইট!! দেখেছিস তুই শুধুই এতো খারাপ মন্তব্য করছিলি। ছেলেটা কতো কেয়ারিং ( দুই গালে হাত দিয়ে ছেরেটার দিকে তাকিয়ে)

যে ছেলেটা স্প্রে দিয়ে গেলো তনু ওকে ডাক দিয়ে কাব্যকে দেখিয়ে ওর নাম জিজ্ঞাস করে নিলো।

– মেঘ কি সুন্দর নামটা শুনেছিস? আয়ুষ্মান কাব্য। ওফ্ যেমন নিজে তেমন তার নাম।

মেঘলা ওর দিকে ভ্রু কুচকে তাকালো। এভাবে তাকানো দেখে আবার বললো,

– এভাবে তাকাচ্ছিস কেনো? এখনো বলবি ভালো না সে । দ্যাখ যে কেউ রিয়েক্ট করতো ওরকম হলে। হ্যা মানলাম ওনি একটু বেশি করেছে তাতে কি হয়েছে? কিউট ছেলেদের সাত খুন মাফ। ( কাব্যের দিকে তাকিয়ে হেসে হেসে)

– না বলবো না। কারণ স্প্রেটা ওনি পাঠান নি। পাঠিয়েছে আবির ভাইয়া।

– আবির ভাইয়া না কাব্য ভাইয়া পাঠিয়েছে। দেখলি না ছেলেটা বললো।

– হ্যা দেখেছি। সানগ্লাস আবির ভাইয়ার হাতেও ছিলো। আর কারো হাতে ছিলো না। আর আমি শিউর উনিই পাঠিয়েছে। তোর কি মনে হয় যে ব্যাথা দিলো, যে ছেলে এতোগুলো মানুষের সামনে এইভাবে অপমান করে গেলো সেই ই আবার ব্যাথা সারানোর ঔষধ দেবে?

– তোর কেনো মনে হচ্ছে আবির ভাইয়াই পাঠিয়েছে?

– তোর কেনো মনে হচ্ছে ওই কাব্য না সাহিত্য হোয়াটেবার ওনিই পাঠিয়েছেন।

– বিকজ হি ইজ আ কিউট গাই।

– হোয়াট আ চিপ লজিক।

– আচ্ছা তাই? তাহলে তোর লজিক টা শুনি। ( রাগি মুড নিয়ে)

– আবির ভাইয়া ইজ আ নাইস গাই এন্ড হি ইজ সো হেল্পফুল ম্যান। মানলাম প্রথম দেখাতে অন্য রকম মন্তব্য করেছি। দ্যাট টাইম আই ওয়াজ রং। আই থিংক উনি অনেক মজা করতে ভালোবাসেন তাই ওই রকম করেছেন।

– লজিক কি মা হয়েছে যাস্ট স্টপ। আর সাফাই দিস না। তুই যেভাবে বলছিস মনে হচ্ছে যেনো প্রেমে ট্রেমে পরেছিস।

– তনু ( প্রচন্ড রেগে)

তনু ভয়ে আর কিছু বললো না। মাঠের দিকে হাঁটতে লাগলো ওরা। হঠাৎ দেখে মাটের মাঝখানে বেশ গন্ডগোল হয়েছে। অনেক ভিড় জমে গেছে। মেঘলা ভাবতে থাকলো কি করবো? যাওয়া ঠিক হবে কি? কিন্তু কি হচ্ছে তা জানার তীব্র কৌতুহল জাগছে মেঘলার মনে । একটা ছেলে দৌড়ে এদিক আসতে দেখে তাকে থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলো ,

– এই যে ভাইয়া ওখানে কি হয়েছে? এতো ভিড় কেনো?

– আবির আর কাব্য ভাইয়ের মাঝে সমস্যা হয়েছে আবার।

– কেনো?

– দুই পার্টির অপজিট নেতা ওরা। সো সমস্যা তো হবেই। কারণ টা জানতে পারি নি এখনো। আর কিছু বলতে পারবো না। এখন আমাকে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। না হলে আরো বড় গন্ডগোল হতে পারে।

মেঘলা তনুর তাকালো আর দেখে তনুও তাকিয়ে আছে। এতক্ষণ এই দুজনকে নিয়ে আমরা দুজন ঝগড়া করলো আর এখন এরা নিজেদের মধ্যেই ঝগড়া করছে। দুইটাই একি। ডাফার।

🍁

– মোহনা রির্মোট দে। আমি মুভি দেখবো। তুই এতক্ষণ দেখেছিস। এখন আমি দেখবো। তোর টাইম ওভার এখন আমার টাইম।

– নাহ্ এখনো শেষ হয় নি আরো তিন মিনিট আছে। তিন মিনিট পর পাবি।

– থাপ্পর খাবি। দে বলছি

– না দেবো না। কি করবি?

– দ্যাখ ভালোই ভালো বলছি দে না হলে কিন্তু পরে ভালো হবে না।

– দেবো না দেবো না দেবো না

– মা ও মা! মোহনাকে রির্মোট দিতে বর। ও এতক্ষণ দেখেছে এখন আমি দেখবো।

মেঘলা মা চিল্লানো শুনে রেগে ধেয়ে আসলো হাতে খুতনি নিয়ে। তা দেখে মেঘলার প্রান পাখি গেলো উড়ে। মায়ের এই রূপটা বড্ড ভয়ংকর লাগে মেঘলার কাছে । মাকে এভাবে আসতে দেখে মেঘলা মোহনা দুজনেই চুপ করে দাড়িয়ে আছে। কাঠগড়ায় দাড়িয়ে থাকার মতো ফিলিংস কাজ করছে মেঘলার । মনে হচ্ছে মেঘলার মা জর্জ আর হাতের খুনতি টা হলো কাঠের হাতুরি, মেঘলা নিরপরাধী তবুও অপরাধী বলে দাবি করা হচ্ছে আর মোহনা অপরাধী হলেও দোষী বলে সাবস্ত করা হচ্ছে না। হি হি।

চলবে…… ❤

ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।