Home "ধারাবাহিক গল্প দিগন্তের ওপারে বাড়ি দিগন্তের ওপারে বাড়ি পর্ব-০২

দিগন্তের ওপারে বাড়ি পর্ব-০২

0
13

#দিগন্তের_ওপারে_বাড়ি |২|

‘ঠাডা পড়া কপাল’ বলে একটা শব্দ আছে না? মৈত্রেয়ীর মনে হয় ওই শব্দটা কেবল তার জন্যই প্রযোজ্য। সে কোনো কাজ বেশি কৌতুহল নিয়ে করলে সেখানেই ঝামেলা বাঁধবে নিশ্চিত। এর কোনো ভুল নেই। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। এখন ভোর পাঁচটা। অথচ তাদের বাসটা নষ্ট হয়ে গেছে। বান্দরবান পৌঁছাতে তাদের এমনিতেই সকাল সাতটা বাঁজত কিন্তু এখন সেই সময় আরও দীর্ঘ হলো। তারা অবস্থান করছে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, কেরানীহাটে যেটা বান্দরবান যাওয়ার মূল মোড়। সবাই একপ্রকার বিরক্ত হয়ে বাস থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে। কতৃপক্ষ জানিয়েছে ঘণ্টা খানেক সময় লাগবে বাসটা ঠিক হতে। এতটুকু সময় যেন তাদের দেওয়া হয়। এমন বিড়ম্বনার জন্য তারা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। কারোর কিছুই করার ছিল না। অগত্যা মানতেই হয়েছে। ভোর পাঁচটার সময় এই অঞ্চলের পরিবেশ সাধারণত দারুণ এক মিশ্র অনুভূতি তৈরি করেছে। চারপাশ তখনো পুরোপুরি ফর্সা হয়নি। একটা হালকা আলো আঁধারি ভাব জমে আছে প্রকৃতির বুকে। পাহাড়ের কাছাকাছি এলাকা হওয়ায় বাতাসে বেশ চমৎকার একটা শীতল আমেজ ছড়িয়ে আছে। ঠাণ্ডা মারুত কায়া ছুঁয়ে যেতেই সর্বাঙ্গ শিরশির করে উঠছে। মহাসড়কের দুই পাশে কুয়াশার পাতলা চাদর দৃশ্যমান। কুয়াশার ধুম্রজাল পেরিয়ে গাছপালা এবং দূরের পাহাড়ের ঝাঁপসা অবয়ব এক রহস্যময় ও সুন্দর পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে। কুয়াশার বিন্দু বিন্দু কণায় বৃক্ষের পাতা সহ রাস্তাঘাট সিক্ত হয়ে আছে। চারিদিকে পক্ষীকুলও ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। শোনা যাচ্ছে তাদের মিষ্টি গুঞ্জন। মহাসড়কটি দিনের অন্য সময়ের তুলনায় বেশ নীরব হয়ে আছে। ক্ষণে ক্ষণে কেবল দুই একটা দূরপাল্লার ট্রাক বা বাস শো শো শব্দ করে তীব্র গতিতে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। দূরের একটা মসজিদ থেকে সূরা পড়ার সুমিষ্ট আওয়াজ ভেসে আসছে। একদিকে বাস নষ্ট হওয়ার কারণে বান্দরবান পৌঁছাতে দেরি হবে বলে কিছুটা ক্লান্তি ও বিরক্তি লেপ্টে আছে সকলের মুখমণ্ডলে। অন্যদিকে ভোরের এই চমৎকার ও স্নিগ্ধ পরিবেশ এবং পাহাড়ের কোল ঘেঁষে থাকা হিমেল হাওয়া তাদের মনকে কিছুটা হলেও শান্ত করে দিচ্ছে। এতক্ষণে অনুভব করছে সবাই, না, এভাবে প্রকৃতির সনে একটু সময় কাটানো খারাপ নয়। শহরের যান্ত্রিকতা পেরিয়ে ভোরের এমন নির্মল পরিবেশের সঙ্গও প্রয়োজন। অনায়াসেই মস্তিষ্ক সতেজ হয়ে উঠছে। সবার থেকে একটু দূরে একাকী দাঁড়িয়ে আছে মৈত্রেয়ী। অন্তর্মুখী স্বভাবের মানুষ সে। সহজে সবার সাথে মিশতে পারে না। নিঃসঙ্গ নীরব পরিবেশ তার বরাবরই পছন্দের শীর্ষে। তার দৃষ্টি নিবিষ্ট অদূরের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের শীর্ষে। সবুজে অরণ্যে ঘেরা পর্বত গুলো কী সুন্দর বুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে! কোনো খুঁটির ও প্রয়োজন হয়নি। আল্লাহর কী অপরুপ সৃষ্টি! মানুষ আল্লাহর কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে? মৈত্রেয়ী বিড়বিড় করে আওড়াল,
“মা শা আল্লাহ।”
পরক্ষণেই চোখ ফিরিয়ে নিল। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ফোনটা অন করে নোটপ্যাডে ঢুকল। সেখানে ক্রমশ শব্দ স্পষ্ট হতে লাগল,

“আচ্ছা আম্মু শোনো তো, বাবার এই অঞ্চলের দিকে পোস্টিং এর সময় তুমি তো সকাল সন্ধ্যা পাহাড় দেখতে পেতে তাই না? পাহাড়ের কোল ঘেঁষে যখন সূর্য উদয় হতো এবং অস্ত যেত তখন নিশ্চয় তুমি মুগ্ধ চোখে দেখতে ঠিক আমার মতো করেই। যারা পাহাড় দেখেনি তারা বোধহয় আল্লাহর সবচেয়ে সুন্দরতম সৃষ্টি দেখেনি ঠিক না? জানো আমি পাহাড়ের থেকে একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছি। প্রতিবারের মতোই এবারও নতুন অনুভূতির সাথে পরিচিত হচ্ছি। মনেই হচ্ছে না এখানে আমি অনেকবার এসেছি। তুমি তো বলতে যারা প্রকৃতির সান্নিধ্যে যায় না, প্রকৃতিকে ভালোবাসে না তারা নাকি নিজেকে ভালোবাসতে পারে না। তাই আমি প্রতিনিয়ত প্রকৃতিকে ভালোবাসতে চেষ্টা করি। সর্বোপরি নিজেকে ভালোবাসতে চেষ্টা করছি। ”
২২জুন, ২০১৮
ভোর ৫টা ২০মিনিট
মৈত্রেয়ী হালদার।

নোটপ্যাডে এতটুকুই লিখে থামল মৈত্রেয়ী। সেই সময় শ্রবণেন্দ্রিয়ে প্রবেশ করল পুরুষোচিত শান্ত ভরাট কণ্ঠস্বর,
“আপনার আম্মু ভুল বলতেন না।”
মৈত্রেয়ী চকিতে পাশ ফিরল। চোখের পর্দায় শায়ানের পরিচিত গম্ভীর মুখমণ্ডল ভেসে উঠল। তার পাশেই এসে দাঁড়িয়েছে। মানুষটা দাঁড়িয়ে ছিল একটু দূরেই। কখন এসেছে এখানে? সে তো একটুও টের পায়নি। কী আশ্চর্য! দুজনের মধ্যিখানে বেশখানিকটা দুরত্ব বজায় আছে। মৈত্রেয়ী ফোনটা একটু নিচু করে লিখছিল বলেই হয়ত চোখে পড়েছে লেখাগুলো। নয়ত একটা রাতেই মানুষটার ভদ্র আচরণ সে বেশ লক্ষ করেছে। পাশাপাশি সিটে বসেও কখনো তার অস্বস্তি অনুভব হয়নি। সেখানে লুকিয়ে তার লেখা পড়া অসম্ভব বটে। এখন আর শায়ানের মুখে মাস্ক কিংবা সানগ্লাস কোনোটাই নেই। প্রথমবারের মতোই মানুষটাকে দেখল সে। অসম্ভব রকমের সুন্দর শায়ান। কখনো কোনো পুরুষকে ভালো না লাগা, পুরুষের থেকে দুরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করা মৈত্রেয়ীর কী যেন হলো। চোখে তাক লেগে গেল এক মুহুর্তের জন্য। মানুষটার গাত্র বর্ণ ফর্সা কিন্তু একটু তামাটে ধরণের। একেবারে সাদা ফর্সা নয়। এই ভোরের সকালে ওই নীল মণি দুটো একটু বেশিই স্বচ্ছ মনে হলো মেয়েটার নিকট। মৈত্রেয়ী দ্রুত দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। নিজেকে সামলাতে কেবল যৎসামান্য সময় লাগল। সহজে কোনো অনুভূতির কবলে সে পড়ে না। ক্ষীণ হাসল,
“আম্মুর বলা প্রতিটা কথাই চমৎকার ছিল।”
শায়ান অবশ্য মৈত্রেয়ীর দিকে তাকায়নি। চেয়ে আছে ভোরের কুয়াশাচ্ছন্ন প্রকৃতির দিকে। মেয়েটাকে সবার থেকে দূরে এভাবে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একপ্রকার অনিচ্ছা নিয়েই এদিকে এসেছে সে। যেহেতু তার পাশের সিটের যাত্রী, সেহেতু নিরাপত্তার বিষয়টুকুও একটু নিশ্চিত করা উচিত। মনুষ্যত্ব আছে বলেই হয়ত এরকমটা ভেবেছে সে। সেভাবেই প্রত্যুত্তর করল শায়ান। গলার আওয়াজ সুদৃঢ় এবং হিমশীতল শোনাল,
“প্রকৃতির সাথে যার বন্ধুত্ব তাকে স্বার্থান্বেষী পৃথিবীর কোনো স্বার্থপর মানুষ ভাঙতে পারে না। প্রকৃতি তো মানুষকে প্রতিনিয়ত নতুনভাবে নিজেকে গড়তে শেখায়। বাই দ্য ওয়ে আন্টি কোথায় এখন?”
কথাগুলো বেশ মনোযোগের সাথেই শুনছিল মৈত্রেয়ী। কিন্তু শেষবাক্যটা কর্ণগোচর হতেই তার অভিনিবেশ ক্ষুন্ন হলো‌। উত্তরে কিছুক্ষণ নীরবতা বেছে নিল। কিয়ৎকাল পেরোল সেভাবেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল সে,
“নাই, আমার কাছে নাই, পৃথিবীর কোথাও নাই, আম্মু। বাবার কাছে চলে গেছে। দুজনের বড্ড মিল ছিল কি-না!”
একটু থামল সে। নিজ থেকেই একমনে ফের বলতে শুরু করল,
“আম্মুর ভালোর জন্য সমাজের বিরুদ্ধে যেয়ে দ্বিতীয়বার বিয়ে দিয়েছিলাম কিন্তু তিনি সেই সংসারে মাত্র সাত দিন ছিলেন। তারপর চলে গেলেন বাবার কাছে। আংকেলের সাথেও থাকতেন না। আলাদা ঘরে থাকতেন। বাবার ভালোবাসা, যত্ন থেকে তিনি কখনোই বেরোতে পারেননি। বাবা ছিলেন আর্মি অফিসার। এই বান্দরবানেও বাবার পোস্টিং পড়েছিল। আম্মুর থেকে অনেক গল্প শুনেছি তাদের ছোট্ট সুন্দর পাহাড়ি সংসারের।”
কথাগুলো বলেই নিশ্চুপ হয়ে গেল মৈত্রেয়ী। স্বল্পভাষী মেয়েটা আজ খুব সহজেই অনেকগুলো কথা বলে ফেলল। দীর্ঘদিন থেকে মনের কোণে পাথরের ন্যায় জমে ছিল কথাগুলো। কিন্তু বলার একটা মানুষ সে খুঁজে পাচ্ছিল না। তার তো নিজের বলতে কেউ নেই। তাই অজানা আগন্তুক কাউকেই অনায়াসে বলে ফেলল। বুকটা ভীষণ ভার অনুভব হতো ইদানিং। এখন বেশ স্বস্তি লাগছে। শায়ান একটু অবাক হলো বৈকি! মেয়েটাকে পুরোটা রহস্যময় লাগছে। সঙ্গে অদ্ভুত ও। কখনো মুখ থেকে একটা শব্দও উচ্চারণ করছে না আবার কখনো গল্পের ঝুড়ি নিয়ে বসছে। এতক্ষণে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে দেখল শায়ান। সফেদ রঙা লেডিস শার্ট এবং প্যান্টে আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের থেকে একটু ভিন্নই লাগছে মৈত্রেয়ীকে। চুলগুলো হেয়ারব্যান্ড দিয়ে পিছনে উঁচু করে বেঁধে রাখা। না, খারাপ না। বেশ স্নিগ্ধ, সুন্দর, সপ্রতিভ। ইতোমধ্যে শায়ানের কপালে গুটিকয় ভাঁজের সৃষ্টি হয়েছে। চোখ দুটো সরু হয়ে আছে। বাকিটা জানতে তার একটু কৌতূহল হলো,
“তারপর কী হলো? সেই আংকেল কোথায় এখন?”
মৈত্রেয়ী যেন এই প্রশ্নের অপেক্ষাতেই ছিল। কেউ তো কখনো এগুলো আগ্রহ নিয়ে শুনতে চায়নি। মুচকি হাসল সে। প্রশ্ন শোনা মাত্রই আর অপেক্ষা করল না। আনমনে বলতে শুরু করল,
“তারপর আমার জীবনে সবচেয়ে কঠিন সময় নেমে এল। বাবা রিটায়ার্ডের পরে নিজ গ্রামে ফিরে গিয়েছিলেন। তখন আমরা গ্রামেই থাকতাম। আমি তো বিশ বছরের মাত্র। বাবার ছোট ভাই বাবার সব সম্পত্তি কৌশলে কেড়ে নিয়ে ভিটে ছাড়া করল আমাকে। আংকেল একজন শিক্ষক ছিলেন। ভীষণ ভালো মনের মানুষ ছিলেন। পরবর্তীতে আর বিয়ে করেননি তিনি। তখন আমি মামার সাহায্যে ঢাকার মতো এত বড়ো শহরে এলাম। দুঃসম্পর্কের একজন খালামণির কাছে ছিলাম প্রথম কয়েক বছর। একপ্রকার যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে শিখলাম। খুব সাধারণ মৈত্রেয়ী হালদার থেকে ত্রিশ বছর বয়সে এভিপি মৈত্রেয়ী হালদার নাম হলো। আংকেল গ্রামেই নিজের বাড়িতে ছিলেন। পরবর্তীতে রিটায়ার্ড হলেন। আমি এখানে নিয়ে এসেছিলাম ওনাকে। এইত বছর দুই হলো তিনিও আমায় ছেড়ে চলে গেছেন। সবশেষে সেই নিঃসঙ্গ জীবনই সঙ্গী হলো। আপাতত একাকী জীবন পার করছি।”
ধীরে ধীরে কথাগুলো বলে থামল মৈত্রেয়ী। কণ্ঠস্বর অভিনব রকমের শীতল শোনাল। কেমন যেন একটা বুকব্যথাময় বিষাদ লেপ্টে ছিল। শায়ান এতক্ষণে মেয়েটার নোট লেখার কারণটা বুঝল। দুয়েকবার যখনই ভুলবশত মেয়েটার দিকে চোখ পড়েছে তখনই তাকে কিছু না কিছু লিখতে দেখেছে সে। জগৎ সংসারে একা হয়ে পড়ায় নোটপ্যাডকেই সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছে। মৈত্রেয়ীর প্রোফেশনও তার নিকট পানির মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। একজন উচ্চশিক্ষিত, স্বাধীন নারী সে। যার আর কাউকে প্রয়োজন নেই। শায়ান নিশ্চিত হতে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“পদ এভিপি, ব্যাংকার ম্যাম?”
প্রশ্নটা বেনামী হাওয়ায় মেশার পূর্বেই, উত্তরে নারীর ধীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“এভিপি অ্যান্ড ব্রাঞ্চ ম্যানেজার।”
শায়ানের অধরযুগল একপাশে কিঞ্চিৎ উঁচু হলো। যদিও খুব খুঁটিয়ে না দেখলে তা বোঝা সম্ভব নয়। একজন বড়ো সড়ো মানুষের পাশে সে দাঁড়িয়ে আছে অথচ বোঝার যৎকিঞ্চিত উপায় নেই। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীকে একটুখানি সঙ্গ দিতে এসে নিজেই নিঃসঙ্গতা অনুভব করছে এখন। মানুষের উপর তকতকে অথচ মনের ভেতর ঠিক কতটা কষ্ট জমা থাকে সেই সম্পর্কে আমরা কেউ অবগত নই! আসলে আমরা সকলেই নিজেদের জীবন সিনেমার অভিনেত্রী। ভালো থাকার অভিনয়ে সেরা আমরা। মৈত্রেয়ী সামনের দিকে তাকিয়ে ছিল। সেই সময় শুনতে পেল পুরুষালী ভারী কণ্ঠস্বর,
“কখনো প্রতিশোধের ইচ্ছা জাগেনি?”
এই প্রশ্নের জবাবে মৈত্রেয়ী একটু সময় নিল। রয়ে সয়ে বলল,
“আম্মু বলতেন, প্রতিশোধ শব্দটা ভীষণ তুচ্ছ। নারী হবে নারীর মতোই। যার এক দর্শনেই প্রতিপক্ষ আফসোসের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে। মুক্তির দ্বিতীয় কোনো রাস্তা খুঁজে পাবে না।”
কয়েকটা শব্দ অথচ তার ভাবার্থ, গভীরতা অনেক বেশি। সবার বোঝার ক্ষমতাও নেই। মেয়েটা আসলেই চমৎকার। পরিবার থেকে তার পাওয়া শিক্ষাটা সুন্দর। দুজনের মধ্যিখানে কিছুক্ষণ নীরবতা চলল। পরপরই নিস্তব্ধতা ভেঙে ভাসমান হলো পৌরুষদীপ্ত প্রগাঢ় গলা,
“স্বেচ্ছায় যে অপরিচিত একজনকে মনের সব কথা বললেন, ভয় হচ্ছে না?”
মৈত্রেয়ী মাথা নেড়ে বেশ অবজ্ঞার সুরে হাসল,
“কীসের ভয়? অপমান, ফিরতি আঘাতের? মানুষ যখন সর্বহারা হয়ে যায় তখন কেবল আগন্তুকের কাছেই নিজেকে প্রকাশ করে। অপরিচিত মানুষটা খুব সহজেই সব ভুলে যায়। তাদের না আর কখনো দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ হয়। আর না সেই স্মৃতি স্মরণ হয়। উলটো পরিচিতদের কাছে নিজেকে ভেঙে প্রকাশ করলে তা দ্বিগুণ হয়ে ছোবল মারে।”
কথাগুলো বেশ চমকপ্রদ লাগল শায়ানের নিকট। ঠোঁটের কোণ ঘেঁষে সুক্ষ্ম বাঁকা হাসির রেশ ছড়াল। এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে সে একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। যেভাবে নিঃশব্দে এসেছিল সেভাবেই প্রস্তান করল। জবাব না পেয়ে মৈত্রেয়ী এতক্ষণে দৃষ্টি চ্যুত হলো। পাশে দেখল। কিন্তু কেউ নেই! তার থেকে অনেকটা দূরেই একাকী কুয়াশার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে শায়ান। ওখানকার পরিবেশটা বেশ স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে। যা এতক্ষণে মৈত্রেয়ীর নজরে পড়েনি। এখন মানুষটার চোখে সানগ্লাস দৃশ্যমান। মৈত্রেয়ীর ওষ্ঠপুট দুপাশে ঈষৎ প্রসারিত হলো। ফোন অন করে প্রথমেই নোটপ্যাডে ঢুকল,

“জানো আম্মু, একজন অদ্ভুত রকমের মানুষের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে। আমার থেকেও অনেক কম কথা বলেন তিনি। কেমন যেন রহস্যময়। আশ্চর্যকর বিষয় কি জানো? উনি উপস্থিত থাকলেই সেখানকার প্রকৃতি একটু বেশিই উপভোগ্য হয়ে উঠছে। কারণ হচ্ছে ওনার দুটো স্বচ্ছ নীল মণির চোখ। একেবারে অভূতপূর্ব সুন্দর ওই নেত্রজোড়া।”
২২জুন ২০১৮
ভোর ৫টা ৫০মিনিট
মৈত্রেয়ী হালদার

ফোনটা বন্ধ করতে যেয়েও কিছু একটা ভেবে থেমে গেল মৈত্রেয়ী। নোটপ্যাডেই ছিল সে। পুনরায় ফোনের স্ক্রিনে আঙুল চলল ধীর গতিতে,

“প্রকৃতি তার সমস্ত নীলিমা ঢেলে দিয়েছিল সেই দুটি চোখে,
যার দিকে তাকালে চারপাশটা হঠাৎ করেই একটু বেশি সুন্দর হয়ে ওঠে।”
২২জুন ২০১৮
ভোর ৫টা ৫৫মিনিট
মৈত্রেয়ী হালদার, চট্টগ্রাম লোহাগাড়া, কেরানীহাট

লেখাটুকু শেষ হতেই ট্যুর কতৃপক্ষের একজন হ্যান্ড মাইক নিয়ে সবাইকে বাসে উঠে বসতে নির্দেশনা দিলেন। বাস সারা হয়ে গেছে। আপাতত সব ঠিকঠাক। ওনারা সবাই এক্ষুনি রওনা দেবেন। সবকিছু কর্ণগোচর হতেই ফোনটা আলগোছে প্যান্টের পকেটে রাখল মৈত্রেয়ী।‌ অতঃপর বাসের দিকে হাঁটা ধরল। তৎক্ষণাৎ এক দমকা শীতল হাওয়া এসে তাকে ছুঁয়ে গেল। জানিয়ে গেল সুন্দর একটুকরো মুহূর্তের বিদায়ী বার্তা। একটু শীত শীত অনুভব হলো তার। ঠোঁটের কোণ ঘেঁষে প্রতীয়মান হাসিটুকু সরল না।

#চলবে
লেখনীতে: #ইসরাত_তন্বী