Home "ধারাবাহিক গল্প দিগন্তের ওপারে বাড়ি দিগন্তের ওপারে বাড়ি পর্ব-০৩

দিগন্তের ওপারে বাড়ি পর্ব-০৩

0
4

#দিগন্তের_ওপারে_বাড়ি |৩|

সময় বহমান। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল এখন। বান্দরবানের বিকালটা অন্যরকম সৌন্দর্যে মোড়ানো। দুপুরের পর থেকেই রোদটা নরম হয়ে আসে। পাহাড়ের মাথায় হালকা সফেদ রঙা মেঘ আটকে থাকে, মনে হয় কেউ তুলো ছিঁড়ে রেখে গেছে। চারিদিকে নীরব নিস্তব্ধ পরিবেশ বিরাজমান থাকে। সূর্যটা যখন পাহাড়ের আড়ালে নামতে থাকে, তখন আকাশটা প্রথমে সোনালি, তারপর কমলা হয়ে যায়। ওই আলোয় মনে হয় মেঘপুঞ্জে আগুন ধরে আছে। প্রাকৃতিক নৈস্বর্গিক সৌন্দর্য প্রস্ফুটিত হয় চারিদিকে!

বাসটা বান্দরবান প্রধান বাস টার্মিনালে পৌঁছেছিল সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ। প্রায় দেড় ঘণ্টা দেরীতে পৌঁছেছিল তারা। তারপর হোটেলে পৌঁছানো এবং চেক ইন সহ সাড়ে দশটা বেজে যায়। Green Belt Tourism ট্রাভেলার গ্রুপটা উঠেছে Sairu Hill Resort এ। অবস্থান, বারো মাইল, ওয়াই জংশন, চিম্বুক রোড, শোয়ালক ইউনিয়ন, বান্দরবান সদর, বান্দরবান। বান্দরবান শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় আঠারো কিলোমিটার। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৮০০ ফুট উঁচুতে চিম্বুক রাস্তার পাহাড়ের ঢালে ওয়াই জংশনে অবস্থিত। বান্দরবান শহর থেকে জিপ, কার বা চান্দের গাড়ি করে এখানে পৌঁছাতে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট সময় লাগে। চারপাশে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য রিসোর্টটার চারপাশে বিদ্যমান। শহরের কোলাহল থেকে একদম আলাদা, এই জন্যই বড়লোকেরা বান্দরবান যেয়ে ওখানেই ওঠে। বান্দরবানের সবচেয়ে প্রিমিয়াম রিসোর্ট এটা। সবাই দুপুরে রিসোর্টেই ছিল। পৌঁছানোর পরে একটু রেস্ট নিয়ে সুইমিং এবং লাঞ্চ করেছে ওখানেই। সবাই মিলে ঘোরার উদ্দেশে বাইরে বেরিয়েছে দুপুর দুটো নাগাদ। দুটো চাঁদের গাড়ি রিজার্ভ করেছে ভ্রমণ কর্তৃপক্ষ। ওনারাই মেঘলা ট্যুরিস্ট কমপ্লেক্স, শৈলপ্রপাত, নীলাচল ঘুরিয়ে আবার রিসোর্টে নামিয়ে দিবে বলে জানিয়েছিল। কোনো দুশ্চিন্তার কারণ নেই। কথা মোতাবেক তেমনটাই করেছে। বিকাল তিনটা ছুঁই ছুঁই করে ট্রাভেলার গ্রুপটা মেঘলাতে পৌঁছেছিল। শহর থেকে মাত্র ৪ কিমি দুরত্ব। কিন্তু সাইরু থেকে দুরত্ব ২০.২ কিমি। তাই তো দীর্ঘ পঞ্চাশ মিনিট সময় লেগেছিল পৌঁছাতে। মেঘলাতে হ্রদের ওপর দুটি চমৎকার ঝুলন্ত সেতু রয়েছে, যেখান থেকে চারপাশের পাহাড়ি দৃশ্য দারুণ দেখায়। পুরো গ্রুপ সেই ঝুলন্ত সেতুতে উঠে চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করেছে। নয়নাভিরাম হ্রদ, পাহাড়ের পাদদেশে তৈরি কৃত্রিম হ্রদে পর্যটকদের জন্য প্যাডেল বোটে ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থাও ছিল। অনেকেই বোটে উঠে স্বল্প সময়ের জন্য ঘুরে ছিল। এছাড়াও পাহাড়ের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যাতায়াত এবং চারপাশের সৌন্দর্য দেখার জন্য কেবল কারের ব্যবস্থা রয়েছে। কেবল কারটাতে মৈত্রেয়ী চড়েছিল। উঁচু স্থান থেকে কোনো কিছু দেখতে সে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, হরিণ ও বন্যপ্রাণী নিয়ে একটি ছোট চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্ক ও ছিল। সেখানে চেনা অচেনা অনেক রকমের পশু পাখির দেখা মিলেছিল। শিশুদের বিনোদনের জন্য ছিল বিভিন্ন রাইডযুক্ত শিশুপার্ক। বাচ্চারা যারা বড়োদের সঙ্গে গ্রুপে ছিল তারা বেশ আনন্দলাভ করেছিল রাইডে চড়ে। হাঁটার জন্য সুন্দর প্রশস্ত পথ এবং পাহাড় ট্র্যাকিংয়ের সুযোগ পাওয়া যাচ্ছিল। মোদ্দা কথা ওখানে বেশ কিছুক্ষণ চমৎকার সময় কাটিয়েছিল সকলে। মন প্রাণ শীতল করার মতো পরিবেশ ছিল সেখানে।

এরপর শৈলপ্রপাত। মেঘলা থেকে বের হয়েই পথে পড়ে। ছোট একটা ঝর্ণা। দুরত্ব ৮.৬ কিমি। গাড়িতে তেইশ মিনিট লেগেছিল তাদের। বর্ষায় পানি বেশি থাকে। বর্ষাকালে বান্দরবানের শৈলপ্রপাত ঝর্ণা তার পূর্ণ যৌবন ফিরে পায় যেন। এক বিধ্বংসী সুন্দর রূপ ধারণ করে। বান্দরবান-থানচি সড়কের মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই পাহাড়ি ঝর্ণাটি বছরের অন্য সময়ে শান্ত ও স্নিগ্ধ থাকলেও, বর্ষার মৌসুমে বিশেষ করে জুন থেকে সেপ্টেম্বরে এর চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। জলের তীব্র গতি ও গর্জন ভূমির বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। বর্ষার অবিরাম বৃষ্টিপাতের ফলে পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে আসা পানির প্রবাহ বহুগুণ বেড়ে যায়। এই সময়ে শৈলপ্রপাত একটি দুধসাদা জলের শক্তিশালী ধারায় পরিণত হয়। জলপ্রপাতের পানি প্রচণ্ড বেগে পাথুরে ঢাল বেয়ে নিচে নেমে আসে। দূর থেকেই ঝর্ণার পানির আছড়ে পড়ার গর্জন এবং কলকল ধ্বনি পর্যটকদের আকর্ষিত করে। ‌শৈলপ্রপাতের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর পানি সবসময় অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং বরফশীতল থাকে। বর্ষার তীব্র স্রোতের মধ্যেও পানি তার স্বচ্ছতা হারায় না, যা দেখতে অত্যন্ত মনোরম লাগে। বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢালগুলো ঘন সবুজ অরণ্যে ছেয়ে যায়। শৈলপ্রপাতের চারপাশের গাছপালা ও পাহাড়গুলো যেন নতুন প্রাণ পায়। ঝর্ণার পানির সাদা ফেনা এবং চারপাশের গাঢ় সবুজের মেলবন্ধন এক অপূর্ব ক্যানভাস তৈরি করে রাখে। এছাড়াও, বর্ষার মেঘ পাহাড়ের কোল বেয়ে ঝর্ণার ওপর দিয়ে ভেসে যাওয়ার দৃশ্য চোখ জুড়িয়ে দেয়। বর্ষাকালে শৈলপ্রপাত যেমন অত্যধিক সুন্দর দেখায়, তেমনি এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণও হয়ে ওঠে। ঝর্ণার চারপাশের পাথরগুলো শ্যাওলা এবং তীব্র পানির কারণে প্রচণ্ড পিচ্ছিল হয়ে থাকে। পা হড়কে বড়ো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। এই সময়ে পানির স্রোত এতটাই শক্তিশালী থাকে যে, ঝর্ণার পানিতে নামা বা গোসল করা একেবারেই নিরাপদ নয়। ঝর্ণার ঠিক পাশেই রয়েছে বম উপজাতির একটি ছোট পাড়া বা গ্রাম। বর্ষার দিনেও তারা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, হাতে বোনা চাদর, শৌখিন জিনিসপত্র এবং পাহাড়ের তাজা ফলমূল যেমন জুমের আম, আনারস, পেঁপে নিয়ে ঝর্ণার আশেপাশের টং দোকানগুলোতে বসেন। পর্যটকরা ঝর্ণা দেখার পাশাপাশি পাহাড়ি সংস্কৃতির ছোঁয়াও উপভোগ করতে পারেন। Green Belt Tourism এর ট্রাভেলার গ্রুপটা বেশ কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করেছিল। সকলে সাবধানতার সাথে ঘুরে ঘুরে দেখেছিল। পাথরের উপর থেকে পানিতে পা ডোবালেও কেউ পানিতে নামেনি। অসময় ছিল কি-না! শৈলপ্রপাতটা যেন একজন দক্ষ শিল্পির হাতে আঁকা নিখুঁত শিল্প মনে হচ্ছিল। এতটাই জীবন্ত এবং প্রাণবন্ত ছিল।

শৈলপ্রপাত দেখা শেষ করে সবাই নীলাচলে এসেছে। নীলাচল বাংলাদেশের অন্যতম একটি নয়নাভিরাম ও জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। নীলাচল বাংলাদেশের পার্বত্য জেলা বান্দরবানের টাইগারপাড়া এলাকায় অবস্থিত। বান্দরবান জেলা শহর থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,০০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই পাহাড় চূড়াটি বান্দরবান জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে একটি সুপরিকল্পিত পর্যটন কমপ্লেক্স হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। উচ্চতা এবং অবারিত সৌন্দর্যের কারণে একে অনেকেই ‘বাংলার দার্জিলিং’ বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। নীলাচলের বিকেল মানেই যেন এক অপার্থিব ও স্বর্গীয় অনুভূতির ক্যানভাস। দুপুরের চড়া রোদ যখন আস্তে আস্তে নরম হতে শুরু করে, তখন থেকেই নীলাচলের রূপ পাল্টাতে থাকে। বিকেলের হেলে পড়া সূর্যের আলো যখন চারপাশের সারি সারি সবুজ পাহাড়ের ওপর পড়ে, তখন পুরো উপত্যকাটি যেন সোনালি রঙে ছেয়ে যায়। দূর দূরান্তের সবুজ বনানী আর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথগুলোকে উপর থেকে দেখতে ভীষণ চমৎকার লাগে। নীল আকাশের বুকে অলস মেঘের ভেলা ভেসে বেড়ায়। মাঝে মাঝে নীরদের দল এত নিচে নেমে আসে যে মনে হয় হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। সেই সাথে পাহাড়ের ওপর বয়ে চলে শীতল ও নির্মল হাওয়া, যা নিমেষেই মনের সব ক্লান্তি দূর করে দেয়। বিকেল গড়ানোর সাথে সাথে পাহাড়ি পাখিদের ঘরে ফেরার গুঞ্জন চারপাশে এক শান্ত আবহ তৈরি করে রাখে। কখনো কখনো স্থানীয় আদিবাসী শিল্পীদের পাহাড়ি সুর কিংবা দোতারার মিষ্টি আওয়াজ বিকেলের এই নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দূর থেকে ভেসে আসে। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকালে সম্পূর্ণ বান্দরবান শহরটিকে এক নজরে দেখা যায়। আকাশ যদি একদম পরিষ্কার থাকে, তবে দূর দিগন্তে চট্টগ্রাম বন্দর ও কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের আবছা দেখাও মিলতে পারে। নীলাচলের বিকেলের প্রধান আকর্ষণ হলো এর সূর্যাস্ত। সূর্য যখন ধীরে ধীরে পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে যেতে থাকে, তখন আকাশে লাল, কমলা আর বেগুনি রঙের এক অদ্ভুত কোলাজ তৈরি হয়। গোধূলির এই অপরুপ দ্যুতিতে নীলাচলের প্রতিটি নীল রঙের ক্যাফটেরিয়া বা বিশ্রামাগার এক অন্যরকম মায়ায় জড়িয়ে যায়। প্রকৃতির এই শান্ত, স্নিগ্ধ এবং মহিমান্বিত রূপ দেখার জন্যই প্রতিদিন শত শত ভ্রমণপিপাসু মানুষ বিকেলের সময়টাতে নীলাচলের চূড়ায় এসে ভিড় জমান। আজকেও তার ব্যতিক্রম নয়।

বান্দরবানের শৈলপ্রপাত থেকে নীলাচল পর্যটন কেন্দ্রের দূরত্ব প্রায় ১২ থেকে ১৩ কিলোমিটার। শৈলপ্রপাত থেকে নীলাচল আসতে সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় লেগেছে সকলের। বর্তমানে সেখানেই একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সবাই। কেউ প্রকৃতির সৌন্দর্য ক্যামেরা বন্দি করছে, কেউবা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘড়ির কাঁটার দখলদারিত্ব ঠিক পাঁচটা ত্রিশের ঘরে। অধিকাংশের দৃষ্টি স্থির হয়েছে পশ্চিমাকাশে। সূর্য ডোবার সময় ঘনিয়ে আসছে বৈকি। মৈত্রেয়ী বরাবরের মতোই লোকসমাগম এড়িয়ে একপাশে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে। দুই দিনের ট্যুরের মধ্যে আজকের দিনটা শেষ হয়েই গেল। আগামীকাল তাদের গ্রুপের নীলগিরি পর্বত যাওয়ার কথা আছে। আজ তার শরীরে স্মুথ গোলাপি লেডিস শার্ট এবং অফ হোয়াইট রঙের ঢিলেঢালা প্যান্ট জড়ানো। ভীষণ স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে রংটা তার গায়ে। সবসময়ের মতোই হাতে ফোনটা ঠাঁই পেয়েছে। পড়ে আছে নোটপ্যাডে। সে প্রকৃতি বিলাস করবে আর তা লিখে সংরক্ষণ করবে না সেটা কখনো হয়? অসম্ভব ব্যাপার। নোটপ্যাডে ক্রমশ বাক্যগঠন হয়ে চলেছে,

“আম্মু, জানো আজ প্রকৃতির ভীষণ লোমহর্ষক একটা রুপ দেখার সুযোগ হলো। শৈলপ্রপাত দেখতে গিয়ে কিছুক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে ছিলাম। পানির গতিবেগ এতটাই ছিল যে মনে হচ্ছিল মাটির বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। ভয়ংকর রকমের বিধ্বংসী ছিল! ঠিক তোমার মতোই, তোমার অনিন্দ্য ভাবনার মতোই। এক মুহুর্তের জন্য মনে হচ্ছিল মানবকুলের প্রতি মায়া মমতা ত্যাগ করে, কোনো পিছুটান না রেখে আমিও যদি এমন কঠিন হতে পারতাম! যদি পারতাম, আম্মু!”
২২জুন ২০১৮
বিকাল ৫টা ৩৫মিনিট
মৈত্রেয়ী হালদার
নীলাচল, বান্দরবান।

বাক্যগুলোতে ইতি টেনে মৈত্রেয়ী ফোনটা স্বেচ্ছায় বন্ধ করে দিল। আলগোছে প্যান্টের পকেটে রাখল। লোচন জোড়া চারপাশে ভাসমান হলো। চোখ ফিরিয়ে নিতে যেয়েও অকস্মাৎ নজরে এল একটা পরিচিত মুখাবয়ব। তার থেকে বেশখানিকটা দূরে শায়ান দাঁড়িয়ে আছে। একাকী নিরিবিলি। চেয়ে আছে দূরাকাশের দিকে। ভীষণ মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা দেখে চলেছে। পুরুষালী লম্বা চওড়া পেশীবহুল শরীরে স্কাই ব্লু শার্ট এবং সফেদ রঙা প্যান্ট দৃশ্যমান। এতে পৌরুষদীপ্ত সৌন্দর্য বেড়েছে বৈকি! মৈত্রেয়ী ঘাড় ঘুরিয়ে নিল। কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে রইল। একবার মৃত্তিকার বুকে চাইল, একবার পাহাড় দেখল আবার কখনো পশ্চিম আসমানে নজর স্থির রাখল। সেভাবেই পেরোল কিয়ৎক্ষণ। হঠাৎ করেই মেয়েটা হাঁটা ধরল শায়ানের দিকে। নিজস্ব ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে শায়ানের পাশাপাশি দাঁড়াল। মধ্যিখানে বেশখানিকটা দুরত্ব বজায় রেখেছে। না দেখেও অপরপক্ষের উপস্থিতি দিব্যি অনুভব করল শায়ান। তবুও তার মধ্যে বিশেষ কোনো হেলদোল দেখা গেল না। দুজন নিশ্চুপ হয়েই দাঁড়িয়ে রইল। নীরবতা ভেঙে মৈত্রেয়ী নিজেই প্রথমে মুখ খুলল,
“আকাশ দেখতে ভালোবাসেন?”
কথাটা কর্ণগোচর হলো শায়ানের। তবুও সে দৃষ্টি চ্যুত হলো না। মুখমণ্ডল স্বভাবসুলভ গম্ভীর হয়ে আছে। মিনিট কয়েক পেরোনো মাত্রই জবাবে শোনা গেল নিরেট গলার আওয়াজ,
“কোনোকিছুর প্রতি দীর্ঘক্ষণ চেয়ে থাকলে যদি মনে ভালোবাসা নামক অনুভূতির জন্ম হয় তবে তাই হয়ত।”
মৈত্রেয়ীর মসৃণ কপাল গুটিয়ে এল। ভ্রু যুগল কুঁচকে গেল আপন গতিতে। চোখ দুটো ছোট ছোট করে তাকিয়ে রইল পাশে দাঁড়ানো মানুষটার দিকে। অতীব সাধারণ একটা প্রশ্নের কী জটিল, কী অদ্ভুত উত্তর! পরক্ষণেই চোখ ফিরিয়ে নিল সে। নিজেও সূর্যাস্তের দিকে আঁখি জোড়া স্থির করল। চারপাশের চারুতাময় প্রকৃতি চোখের শান্তি এনে দিল। মৈত্রেয়ী একমনে সেইসব দেখে চলল। হঠাৎ শ্রবণেন্দ্রিয়ে প্রবেশ করল বীরোচিত দৃঢ় কণ্ঠ থেকে ভেসে আসা প্রশ্ন,
“নিঃসঙ্গতা আপনার ভীষণ প্রিয়, ব্যাংকার ম্যাম?”
প্রশ্নটা স্বাভাবিক ভাবে নিলেও শেষ সম্বোধনটুকুতে মৈত্রেয়ীর অধরের কোণে ফুটে উঠল এক টুকরো সুহাস। শুনতে অবশ্য তার খারাপ লাগল না। এই প্রশ্নের জবাব বেশ ঠাণ্ডা গলায় দিল সে,
“মানুষের প্রতি যে সহানুভূতি, নরম একটা হৃদয় ছিল, মানুষ নিজেই সেটা মেরে ফেলেছে।”
শায়ানের নমনীয় ঘাড়টা বেঁকে পাশে ঘুরল। এতক্ষণে মেয়েটার দিকে তাকাল সে। নীল মণি যুগলের চাহনি সব সময়ের মতোই বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ। তার অধরযুগল একপাশে কিঞ্চিৎ প্রসারিত হলো,
“পৃথিবীর সব প্রাপ্তিই শর্তসাপেক্ষ, ব্যাংকার ম্যাম। চোখে দেখা সব সম্পর্ক মিথ্যা। আর হারিয়ে যাওয়া? ওটা চিরন্তন সত্য।”
মৈত্রেয়ী একটু আনমনা হয়ে ছিল। ইহজাগতিক সবকিছু থেকে দূরে সরে গেছিল সে। প্রকৃতির বুকে নিজেকে খুইয়ে বসেছিল। কিন্তু এমন শাশ্বত শব্দগুচ্ছ শ্রুতিগোচর হতেই চকিতে পাশ ফিরল সে। তার চোখদুটোর চাহনি বড্ড দুর্বোধ্য ঠেকল। শায়ান ততক্ষণে ফের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছে। দুজনের কেউই আর কোনো শব্দ উচ্চারণ করল না। জায়গাটাতে নিগূঢ় নীরবতা লেপ্টে রইল। হঠাৎ সেই সময় ঝংকার তুলে সশব্দে বেজে উঠল শায়ানের ফোনটা। না চেয়ে আলগোছে প্যান্ট হাতড়ে ফোনটা বের করল সে। ফোনের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে ‘ক্যাপ্টেন আনিসুজ্জামান স্যার’ নামে সংরক্ষিত নাম্বারটা। শায়ান আড়দৃষ্টিতে একবার মৈত্রেয়ীকে দেখে ওখান থেকে একটু দূরে সরে গেল। মৈত্রেয়ীর কপালে গুটিকয় ভাঁজের দেখা মিলল। ছেলেটা হঠাৎ এভাবে চলে গেল কেন? ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইল সে। পরক্ষণেই ভাবল, হয়ত ওয়াইফ বা গফ কল দিয়েছে। বাইরের মানুষ সে। তার সামনে ব্যক্তিগত মানুষদের সাথে কথাই কেন বা বলবে? মেয়েটা নিজের ভাবনায় নিজেই হাসল মৃদু। নেত্র ঘুরে মৃত্তিকার দিকে পড়তেই একটা ছোট্ট কার্ড টাইপ কিছু একটা চোখের পর্দায় ভাসল। ঠিক ওখানটায় শায়ান দাঁড়িয়ে ছিল। ফোন বের করার সময় তার পকেট থেকে কিছু পড়ে গেল নাকি? আগেপিছে না ভেবেই সেটা উঠিয়ে নিল মৈত্রেয়ী। কার্ডটা চোখের সামনে একটু উঁচু করে ধরল। অমনিই প্রথমে নজর কাড়ল কার্ডের উপরে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা, ‘BANGLADESH NAVY’ শব্দটা। দেখল বামপাশে উপরের দিকে শায়ানের একটা ফর্মাল লুকের ছবি পিনড করা আছে। তার নিচে দৃশ্যমান, ‘Shayan Mahir’ সম্পূর্ণ নামটা। পাশেই ডানদিকে বাংলাদেশ নেভির লোগোটা জ্বলজ্বল করছে। তার নিচেই লাল রঙে লেখা শায়ানের বর্তমান পদ ‘LIEUTENANT COMMANDER’। এছাড়াও ব্লাড গ্রুপ, সার্ভিস নম্বর, কমিশন/ নিয়োগের তারিখ, জন্ম তারিখ ও শায়ানের সাক্ষর আছে কার্ডটাতে। মৈত্রেয়ী মনে মনে শায়ানের বয়স হিসাব করল। বর্তমানে ৩৪ চলছে। বিড়বিড় করে আওড়াল,
“লেফটেন্যান্ট কমান্ডার শায়ান মাহির।”
এতক্ষণে দিব্যি বুঝেছে এটা শায়ানের নেভির পরিচয়পত্র। বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ সে। এমন কিছু সে কস্মিনকালেও কল্পনা করিনি। এইবার সে খুব সহজেই দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে ফেলল। এইজন্যই ট্রাভেল গ্রুপের সবাই ছেলেটাকে এত বেশি সম্মান, এত সমীহ করে চলছে। খুব সাধারণভাবে চলাফেরা করা মানুষটা এত বড়ো কেউ সে ভাবতেও পারছে না। অদূরেই তার দিকেই পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে কথা বলছে শায়ান। বাম হাতটা প্যান্টের পকেটে ঠাঁই পেয়েছে। আর ডান হাতটা ফোনটা ধরে রেখেছে কান বরাবর। মৈত্রেয়ীর ঠোঁট দুটোতে বক্র হাসির রেশ ছড়াল। হঠাৎ করেই কণ্ঠস্বর একটু উঁচু করে ডেকে উঠল,
“স্যার, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার শায়ান মাহির?”
চারপাশে অবস্থানরত অনেকেই পদবীটা শুনে মুগ্ধতা নিয়ে তাকাল তাদের দিকে। পরিচিত নারী কণ্ঠস্বরে এই সম্বোধন শায়ানের শ্রবণেন্দ্রিয়য়ে পৌঁছাতেই তার মুখের কথা থেমে গেল। ব্যস্ত হাতে প্যান্টের পকেট হাতড়াল। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত বস্তুটা খুঁজে পেল না। চোখে মুখে অসন্তোষের রেশ ফুটে উঠল। কণ্ঠনালী বেয়ে বিরক্তির সহিত উচ্চারিত হলো,
“শিট! ড্যাম ইট!”

#চলবে
লেখনীতে: #ইসরাত_তন্বী