#দিগন্তের_ওপারে_বাড়ি |৪. সমাপ্তি পর্ব|
সময় আটটা বেজে পনেরো মিনিট। রাতের সময় চলমান। এই সময়ে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত সাইরু হিল রিসোর্টের রাতের পরিবেশ এককথায় মায়াবী ও রোমাঞ্চকর। প্রায় ১৮০০ ফুট উচ্চতায় দিন শেষের অন্ধকার নেমে আসে দ্রুত, চারপাশ ঢেকে যায় গভীর নীরবতায়। পাহাড়ের ওপর থেকে রাতের আকাশটা অনেক বেশি পরিষ্কার ও বিশাল মনে হয়। মিটিমিটি তারাভরা আকাশ আর চাঁদের আলোয় চারপাশের দূরদূরান্তের পাহাড়ের অবয়ব এক রহস্যময় সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। রাতে যান্ত্রিক কোনো কোলাহল থাকে না। কেবল ঝিঁঝি পোকার ডাক আর পাহাড়ি বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে চারপাশের প্রকৃতি এক অদ্ভুত সুর তোলে। রিসোর্টের আশেপাশের ঝোপঝাড় ও গাছের ফাঁকে ফাঁকে জোনাক পোকার ওড়াউড়ি রাতের অন্ধকারকে আরও জাদুকরী করে তোলে। রিসোর্টের ভেতরটা খুব বেশি কড়া আলোয় আলোকিত করা হয় না। একেবারে মিটমিট করে জ্বলতে থাকা নিয়ন আলোয় সজ্জিত থাকে। মায়াবী ও মৃদু আলোয় বাঁধানো পথগুলো দিয়ে হাঁটলে মনে হয় মেঘ আর পাহাড়ের কোনো রূপকথার রাজ্যে হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। Green Belt Tourism গ্রুপের সবাই সাতটার আগেই ফিরে এসেছে রিসোর্টে। গ্রুপ কতৃপক্ষ সন্ধ্যায় বার্বিকিউ পার্টির আয়োজন করেছে। বর্তমানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রিসোর্টের সম্মুখে খোলা স্থানে সবাই আসন পেতে বসে আছে। মাত্র একদিনেই অনেকেই নিজেদের মাঝে পরিচিত হয়ে বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছে। তারা দলবদ্ধ হয়েই আড্ডা দিচ্ছে। গ্রুপ কতৃপক্ষ নিজেদের মতো করেই চিকেন বারবিকিউ রেডি করছে। আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বেশ কয়েকজন যুবক অবস্থান করছে। সেখানে শায়ান ও আছে। সে অবশ্য বসেনি। সটান হয়ে সকলের পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। গ্রুপের প্রধান ছেলেটা ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। একটা চেয়ার ইশারায় দেখাল,
“স্যার, বসুন প্লিজ।”
শায়ান একদৃষ্টে জলন্ত অগ্নিশিখার দিকেই চেয়ে ছিল। এই কথায় দৃষ্টি ঘুরে ছেলেটার দিকে স্থির হলো। উত্তরে সুদৃঢ় কণ্ঠস্বর ভাসমান হলো জায়গাটায়,
“নো নিড, ইউ গাইজ এনজয়।”
ছেলেটা মুচকি হাসল। পুনরায় নিজের কাজে মনোনিবেশ করল। তার পাশ থেকে একজন ছেলে জানতে চাইল। কণ্ঠস্বর বেশ উৎসুক শোনাল,
“স্যার, আপনি তো মাঝেমধ্যেই আমাদের সঙ্গে ট্যুরে আসেন। প্রোফেশনে কোনো সমস্যা হয় না? যতদূর জানি আপনাদের ছুটি কম।”
এই প্রশ্নে শায়ানের ভিতরে তেমন ভ্রুক্ষেপ দেখা গেল না। আঁখি জোড়া চারপাশে ভাসমান হলো। খুঁজল কাঙ্ক্ষিত কাউকে। পেয়েও গেল মুহুর্তে। ঠোঁট জোড়া একপাশে কিঞ্চিৎ উঁচু হলো। ছেলেটার উদ্দেশে বলল,
“বছরে দুইবার পাহাড় ভ্রমণে আসা হয় অ্যান্ড দ্যাটস নরমাল।”
মুখের কথাতে ইতি টেনে বড়ো বড়ো পা ফেলে ওখান থেকে প্রস্থান করল শায়ান। সে বরাবরই একটু বেশিই গম্ভীর। অপ্রয়োজনীয় কথা তো দূর প্রয়োজনীয় কথাও সহজে মুখ ফুটে বের হয় না। প্রশ্ন করা ছেলেটার পিঠে ধুম করে একজন কিল বসিয়ে দিল,
“তোমার ভাই মুখ চলে বেশি। উনি এমনিতেই কম কথা বলে সঙ্গে ভীষণ স্ট্রিক্ট। মানুষ বুঝে তো প্রশ্ন করবে।”
বেচারা একটুর জন্য কেমন যেন ভ্যাবলকান্ত সেজে গেল। কিন্তু সে ভীষণ সাদাসিধে। কারোর কোনো কথা মনেই নিল না। মুহুর্তেই সব ভুলে নিজের কাজে মনোযোগ জ্ঞাপন করল।
.
রিসোর্টের আঙিনার একপাশে নিস্তব্ধতাকে সঙ্গী করে একাকী বসে আছে মৈত্রেয়ী। চেয়ে আছে দূরাকাশের দিকে। যদিও এখান থেকে অম্বর খুব নিকটে মনে হচ্ছে। হাত বাড়ালেই যেন ছোঁয়া যাবে। নক্ষত্রের হাট জমে আছে সেখানে। একেবারে ক্ষুদ্রতর থেকে বৃহত্তম আকারের তারকা দৃশ্যমান আসমান জুড়ে। এই জ্বলছে তো এই নিভছে! এক মুহুর্তের জন্য তার মনে হচ্ছিল সে সৌরজগতের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। মৈত্রেয়ী আল্লাহর সৃষ্টি যতই দেখছে, ততই মুগ্ধ হচ্ছে। একটা বস্তুর সঙ্গে আরেকটা বস্তুর কোনো মিল নেই। নিজ নিজ জায়গা থেকে সবকিছুই অতুলনীয়। আল্লাহর সৃষ্টি অপরুপ। এইটুকু তার জন্মদাত্রীকে জানাতে বড্ড ইচ্ছে হলো। নিজের কোনো ইচ্ছাই সে অপূর্ণ রাখে না। সাধ্য মতো চেষ্টা করে পূর্ণ করার। ছোট্ট জীবনে নিজেকে খুশি রাখার দায়িত্ব কেবল নিজেকেই নিতে হয় যে। ভাবনা মোতাবেক প্যান্টের পকেট হাতড়ে ফোনটা বের করল মৈত্রেয়ী। ফোন অন করে সোজা নোটপ্যাডে প্রবেশ করল। আঙুল চলল কিবোর্ড,
“জানো আম্মু, তোমার সাথে আমার পাহাড় ভ্রমণের ভীষণ ইচ্ছে ছিল। তোমায় নিয়ে আমি পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে চেয়েছিলাম। সমুদ্রের স্বচ্ছ নীল জলে পা ভেজাতে চেয়েছিলাম। কোনো এক রিসোর্টের ব্যালকনিতে বসে রাতের আকাশ দেখতে দেখতে নিজের সুখ, দুঃখের গল্প করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেই সুযোগ আমার হলো না। বড্ড আফসোস লাগে। মানুষের নাকি এক জীবনে সব ইচ্ছা পূরণ হতে নেই। কিন্তু আমার যে কোনো ইচ্ছাই পূরণ হলো না। সব অদৃষ্টের লিখন তাই না? সে যাকগে বেঁচে তো আছি। শোনো আম্মু, আমার মনে হচ্ছে আমিও খুব শিঘ্রই তোমার কাছে চলে আসব। এটা নিছকই আমার মনের কল্পনা তাই না? কে জানে!”
২২শে জুন, ২০১৮
রাত ৮টা ৩০মিনিট
মৈত্রেয়ী হালদার
সাইরু হিল রিসোর্ট, বান্দরবান।
কিবোর্ডে আঙুল থামিয়ে ফোনটা বন্ধ করে ফেলল সে। নেত্র যুগল বুঁজে শরীর ছেড়ে দিল সবুজ সতেজ ঘাসের উপর। সেভাবেই পড়ে রইল। হঠাৎ করেই আকাশের বুকে মেঘ জমতে শুরু করল। নক্ষত্রেরা কাদম্বিনীর আড়ালে হারিয়ে যেতে লাগল ক্রমশ। পাহাড়ি অঞ্চলে এই হয়ে থাকে। এই রোদ, এই মেঘ, এই স্বচ্ছ আকাশ আবার এই বৃষ্টি। কখন যে কী ঘটে বলা দুষ্কর। ঠাণ্ডা হাওয়ার বেগও বাড়ল। মৈত্রেয়ী চোখ বুজে সবকিছু অনুভব করার চেষ্টা করছিল। অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করছিল তার। সেই সময় শ্রবণেন্দ্রিয়ে প্রবেশ করল পরিচিত পুরুষালী কণ্ঠস্বর,
“সামনে একটু হাঁটবেন, ম্যাম?”
মৈত্রেয়ী তড়িৎ গতিতে বন্ধ চোখ মেলে তাকাল। চোখের পর্দায় সর্বপ্রথম ওই নীল স্বচ্ছ মণি জোড়া এবং পরক্ষণেই শায়ানের সুদর্শন মুখমণ্ডল ভেসে উঠল। মেয়েটা দ্রুত উঠে বসল। প্রশ্নটা করেই অপরপক্ষ একেবারে নিশ্চুপ হয়ে গেছে। সুন্দর একখানা প্রস্তাব পেয়েছে মৈত্রেয়ী। এত সুন্দর আবহাওয়ায় একটু হাঁটলে মন্দ হয় না। কিন্তু একটু দোটানা কাজ করছে তার। সেই বিকালের শেষ ক্ষণে শায়ান নিঃশব্দে এগিয়ে এসে কেবল নিজের পরিচয়পত্রটা নিয়েছিল। ফিরতি একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। ওখানে আর অবস্থানও করেনি। এতে মৈত্রেয়ীর একটু ইগো হার্ট হয়েছিল বৈকি! কিন্তু এখন কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। তার কি যাওয়া উচিত? একটু ভেবে যাবে বলেই মনস্থির করল। বসা থেকে উঠে দাঁড়াল সে,
“চলুন যাওয়া যাক।”
এইসব জায়গা শায়ানের পরিচিত। এখানকার আনাচে কানাচে সবকিছু সম্পর্কে সে অবগত। তাই কোনো শঙ্কা নেই। অপরপক্ষের সম্মতি পেতেই শায়ান উলটো ঘুরে হাঁটা ধরল। মৈত্রেয়ী এগিয়ে এসে পাশাপাশি দুরত্ব রেখে হেঁটে চলল। সরু উঁচু নিচু রাস্তা বেয়ে হাঁটতে বেশ লাগছে মেয়েটার। মাঝে মধ্যে এক দমকা শীতল মারুত এসে কায়া ছুঁয়ে যাচ্ছে। তক্ষুনি শিরশির করে উঠছে সর্বাঙ্গ। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পরে মৈত্রেয়ীর কর্ণগোচর হলো শান্ত শীতল ভারিক্কি গলার আওয়াজ,
“জীবন খুব ছোট্ট। তাই এটাকে উপভোগ করুন। জন্ম গ্রহণ করলে মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবেই। আল্লাহর কোনো সৃষ্টির এর থেকে পরিত্রাণ নেই। জীবন বড়ো অনিশ্চিত।”
মৈত্রেয়ী আপন মনে হাঁটছিল। এমন কথায় পাশ ফিরল সে। সরু চাহনিতে পাশে হেঁটে চলা মানুষটাকে দেখে চলল। মানুষটার বলা কথাগুলো বেশ চমৎকার, বাস্তবতা ভিত্তিক। শায়ানের নমনীয় ঘাড়টা আলগোছে পাশে ঘুরল। এই প্রথম তাদের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলল। কেউই স্বেচ্ছায় চোখ সরাল না। চোখে চোখ রেখেই হঠাৎ করে মৈত্রেয়ী শুধাল,
“আপনার সম্পর্কে তো কিছুই জানা হলো না, স্যার, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার।”
মেয়েটার মুখে এই সম্বোধন শুনে শায়ান ক্ষীণ হাসল। খুব খুঁটিয়ে না দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না। ভীষণ সুক্ষ্ম এক চিলতে হাসি। জবাবে ভেসে গেল গুরুগম্ভীর দৃঢ় গলা,
“আমি আপনার বিপরীত, ম্যাম। আলহামদুলিল্লাহ আমার সব আছে। একটা সুন্দর পরিবার আছে। পরিবারে মা, বাবা, বড়ো একটা ভাই, ভাবী, তাদের সাত বছরের একটা ছেলে আছে। নাম শৌর্য। চাচ্চু বলতে পাগল সে।”
মৈত্রেয়ীর ঠোঁট দুটো দুদিকে প্রসারিত হলো। খুশি হওয়ার সাথে একটু আফসোস ও হলো তার। ইশ! এমন সুন্দর একটা পরিবার যদি তার হতো! পুনরায় জানতে চাইল,
“ঘুরতে ভীষণ ভালোবাসেন তাই না? ছুটিতে ঘুরতে এসেছেন, স্যার?”
মেয়েটার গলা অদ্ভুত রকমের নরম শোনাল। কেমন যেন মোলায়েম শান্তি, শান্তি ধরণের। শায়ানের হাত দুটো পকেটে ঠাঁই পেয়েছে। এই পর্যায়ে নিজের ফোনটা বের করল। কিছু একটা খোঁজা অবস্থাতেই প্রত্যুত্তর করল,
“জি, অনেকটা তাই। আমি আমার ছুটি বনে বাদাড়ে, পাহাড়, পর্বতে কাটিয়ে থাকি। দেশ, বিদেশ সবখানেই ছুটে যাই ছুটি পেলেই। আর এমনিতেই তো সমুদ্রময় জীবন আমার।”
মুখের কথাতে সমাপ্তি টেনে নিজের ফোনটা এগিয়ে দিল মৈত্রেয়ীর দিকে। মেয়েটার মনোভাব সে এভাবেই বুঝে ফেলেছে। মৈত্রেয়ী ফোনের স্ক্রিনে তাকাল। চোখদুটো ভালো লাগায় জ্বলজ্বল করে উঠল। ফোনের স্ক্রিনে একটা সুন্দর, হাস্যোজ্জ্বল পরিবারের ছবি স্পষ্ট। ছবিটা বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল মেয়েটা। শায়ানের বলা প্রতিটা সদস্যই সেখানে উপস্থিত আছে। শায়ান ঠিক তার মায়ের মতোই সুন্দর হয়েছে। ভদ্রমহিলা এই বয়সে এসেও চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যের অধিকারী। আজ প্রথমবারের মতো মৈত্রেয়ী বেশ কৌতূহল প্রকাশ করল,
“আপনার পরিবার এটা? সবাই কত্ত হাসিখুশি! মা শা আল্লাহ।”
একটা ছোট্ট পরিবারের বরাবরই তার ভীষণ শখ। ওই যে যার যেটা থাকে না, সে সেটার প্রতিই টান অনুভব করে। মৈত্রেয়ীর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। শায়ান হালকা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝাল। মেয়েটার চোখে মুখে ফুটে ওঠা উজ্জ্বলতা টুকু তার দৃষ্টি এড়াল না। মৈত্রেয়ী প্রাণোচ্ছল গলায় বাচ্চাদের মতো করে বলল,
“আপনি আপনার মায়ের মতোই হয়েছেন, স্যার। মা শা আল্লাহ খুব সুন্দর পরিবার। সবাই ভালো থাকুক।”
মৈত্রেয়ীর কথা মাটিতে পড়ার আগেই এইবার উত্তর পেল সে,
“মানুষ হিসেবেও ওনারা অসাধারণ।”
শায়ান ফোনটা বন্ধ করে পুনরায় প্যান্টের পকেটে রাখল। এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে মৈত্রেয়ী কিছুই বলল না। কেবল ঠোঁটের কোণে উঁকি দেওয়া হাসি টুকু বর্ধিত হলো। দুজন চুপচাপ হেঁটে চলল। আরেকটু এগোতেই মৈত্রেয়ী বলে উঠল,
“সমুদ্র আমার ভীষণ পছন্দের। সমুদ্রময় জীবনটা হয়ত মন্দ নয় ঠিক না , স্যার?”
প্রথমবারের মতো এই ক্ষণে শায়ান প্রকাশ্যে হাসল। মৃদু আওয়াজে। চোখে পড়ার সুন্দর সেই হাসিটুকু। প্রত্যুত্তরে বলল,
“দোয়া করি, সমুদ্রের সঙ্গে যার নিত্য বসবাস, সেই একদিন আপনার জীবনসঙ্গী হোক। আপনার অন্তরের সমুদ্রতৃষ্ণা মুছে দিয়ে, আপনাকে নিয়ে সে গড়ে তুলুক নীল জলের মতোই স্থবির, সুন্দর একটা জীবন।”
শায়ানের মুখনিঃসৃত বাক্যগুলো খুবই সহজ সরল ছিল। অথচ এক মুহুর্তের জন্য মৈত্রেয়ীর হৃৎস্পন্দন থমকাল। শিরদাঁড়া সোজা হয়ে গেল তার। শিরদাঁড়া বেয়ে একখণ্ড বরফ কুচি নেমে গেল। সর্বাঙ্গ শিরশির করে উঠল। সেই শীতলতা বাড়াতেই অকস্মাৎ আকাশ ফুঁড়ে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে এল। মুহুর্তেই দুজনে কাকভেজা হয়ে গেল। আসমানের বুক চিরে বৈদ্যুতিক রেখা দাগ কেটে গেল। সেই দ্যুতিতে আলোকিত হয়ে উঠল চারপাশ। মৈত্রেয়ীর নজর আটকাল অপরপক্ষের বৃষ্টিস্নাত নীল মণি জোড়াতে। কী অপরুপ সুন্দর ওই নেত্র জোড়া! শায়ান উলটো ঘুরে তাড়া দিল,
“দ্রুত পা চালান, ম্যাম। রিসোর্টে ফিরতে হবে। এই অসময়ের বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বর বাঁধবে।”
মৈত্রেয়ী যেন কিছু্ই শুনল না। শায়ানের পিছু পিছু খুবই ধীর গতিতে পা চালাল সে। একটু ঝুঁকে প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করল। নোটপ্যাড অন করাই ছিল। সেখানে নতুন একটা নোট লেখা হলো,
“একজোড়া নীল চোখ যেন নীরব কোনো সমুদ্র যেখানে একবার ডুবলে, ফিরে আসার পথটুকুও মনে থাকে না।”
২২শে জুন, ২০১৮
রাত ৯টা
মৈত্রেয়ী হালদার
সাইরু হিল রিসোর্ট, বান্দরবান।
.
নীলগিরি পর্বত! বান্দরবান শহরের সদর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এর অবস্থান। সাইরু হিল রিসোর্ট থেকে নীলগিরি পাহাড়ে পৌঁছাতে সাধারণত ১ থেকে ১.৫ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার, বান্দরবান-থানচি সড়কের পাশে তেংপ্লং চুট পাহাড়ের চূড়ায় এই পর্যটন কেন্দ্রটি অবস্থিত। এর উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,২০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত হওয়ায় জায়গাটি সবসময় মেঘমণ্ডিত থাকে। নীলগিরি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্যটন কেন্দ্র। Green Belt Tourism ট্রাভেলার গ্রুপটা সকাল আটটা নাগাদ দুটো চান্দের গাড়ি নিয়ে রওনা দিয়েছিল। পৌঁছেছে সাড়ে নয়টা নাগাদ। এখন সবাই নীলগিরি পর্বতের চূড়ায় অবস্থান করছে। সবাই চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখছে। এরমধ্যে কেউ ফটোশুট করছে। আবার কেউবা এত সুন্দর স্মৃতি ক্যামেরা বন্দি করতে ব্যস্ত। কেবল দুজন মানুষের মাঝে কোনো হেলদোল নেই। একাকী নিজেদের মতো দাঁড়িয়ে প্রকৃতি বিলাসে ব্যস্ত তারা। নীলগিরি বাংলাদেশের বান্দরবান জেলায় অবস্থিত একটি অত্যন্ত সুন্দর একটা অদ্রি। নীলগিরি পর্বত মূলত ‘মেঘের রাজ্য’ নামে পরিচিত জনপ্রিয়। নীলগিরির সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ হলো মেঘ। এখানে দাঁড়িয়ে নিজের হাতে অভ্রপুঞ্জকে ছুঁতে দেখার সৌভাগ্য হয়। মেঘদূতের দল যখন পাহাড়ের চূড়া আর উপত্যকার ওপর দিয়ে উড়ে যায় তখন কেবল চেয়ে থাকতেই ইচ্ছা হয়। চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। চোখের দৃষ্টি সীমানার মধ্যে কেবল সবুজের মেলবন্ধন। দূরের সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড় দেখতে দারুণ লাগে। ভোরবেলা পূর্ব আকাশে সূর্য ওঠার দৃশ্যটা ভীষণ মনমুগ্ধকর দেখায় পাহাড়ের চূড়া থেকে। শেষ বিকেলে পাহাড়ের আড়ালে সূর্য ডোবার সময় আকাশ লালচে আলোয় ছেয়ে যায়। পর্বত শৃঙ্গে দাঁড়িয়ে তা দেখতে বেশ লাগে। নীলগিরিতে রাতের আকাশ থাকে পরিষ্কার। তারাভরা আসমান আর চাঁদের আলোয় পাহাড়ের রূপ অন্য রকম দেখায়। শীতের রাতে চারপাশ কুয়াশায় ঢেকে যায়। এখানে থাকার জন্য সুন্দর কটেজ আছে। কটেজের বারান্দায় বসেই পাহাড় ও মেঘের খেলা দেখা যায়। আজকের অম্বর একেবারে স্বচ্ছ। চারপাশে সফেদ রঙা মেঘেদের ভেলা ভেসে বেড়াচ্ছে। এই পর্যায়ে মৈত্রেয়ী হাত উঠিয়ে আলতো করে মেঘ ছুঁয়ে দিল। স্পর্শ করা মাত্রই তা হাওয়া হয়ে গেল। একই কাজ বারকয় করল মেয়েটা। অধরের কোণে হাসি ফুটে উঠল। বেশ লাগছে তার এভাবে। তক্ষুনি শুনতে পেল শায়ানের গম্ভীর কণ্ঠ,
“মেঘ স্পর্শ করতে ভালো লাগছে, ম্যাম?”
মৈত্রেয়ী হাসিমুখেই পাশ ফিরল। শায়ান দাঁড়িয়ে আছে তার পিছনে। দূর থেকে মেয়েটাকে মেঘ নিয়ে পাগলামী করতে দেখেই সে এগিয়ে এসেছে। মৈত্রেয়ী মাথা নাড়ল। অকপটে স্বীকার করল সত্যটা,
“জি, ভীষণ।”
শায়ান কিছুক্ষণ নীরবতাকে সঙ্গী করে দাঁড়িয়ে রইল। অতঃপর আদেশের স্বরে মৈত্রেয়ীকে বলল,
“আমার সাথে আসুন, ম্যাম।”
কথাটা বলেই সে অপরদিকে অগ্রসর হলো। অপরপক্ষের উত্তরের আশা করেনি। কারণ এ সম্পর্কে সে অবগত আছে বৈকি! মৈত্রেয়ী আগেপিছে না ভেবেই পিছু নিল। মিনিট কয় হেঁটে এসে পাহাড়ের একপাশে উপস্থিত হলো তারা দুজন। চারিদিকে তাকাতেই মৈত্রেয়ীর নয়ন জোড়ায় ছড়াল আকাশসম মুগ্ধতা। এ যেন সাক্ষাৎ মেঘেদের রাজ্য! অন্যান্য জায়গার তুলনায় এপাশটায় মেঘেদের অস্তিত্ব তুলনামূলক অনেক বেশি। মৈত্রেয়ী এক মুহুর্তের জন্য জীবনের সকল দুঃখ ভুলে বসল। তাকে যেতে বাচ্চাদের স্বভাবে পেল। হাসিমুখে বারবার স্বেচ্ছায় মেঘ ছুঁয়ে দিতে লাগল। আনমনে একা একাই হাসছে মেয়েটা। এই পর্যায়ে প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করল সে। সবসময়ের মতোই নোটপ্যাডে পাওয়া গেল তাকে,
“আম্মু, শুনছ? আমি না মেঘেদের রাজ্যে চলে এসেছি। নিজেকে মনে হচ্ছে মেঘ রাজ্যের রাজকন্যা। আমার চারপাশে মেঘ ব্যতীত আর কিচ্ছুটি দেখতে পারছি না। এই পৃথিবীটা এত সুন্দর কেন! আমি যদি এখানে সারাজীবনের মতো থেকে যেতে পারতাম। আহা কতই না ভালো হতো তাহলে?”
২৩শে জুন ২০১৮
সকাল ১০টা ৫৫মিনিট
মৈত্রেয়ী হালদার
নীলগিরি পর্বত, বান্দরবান।
শব্দগুলোতে দিব্যি প্রকাশ পেল কঠিন খোলসে মুড়িয়ে রাখা একটা হৃদয়ের পাগলামী। যার সহজে পাওয়ার সুযোগ মেলে না। ফোনটা বন্ধ করে পরপরই পাশ ফিরে তাকাল মৈত্রেয়ী। মুখের হাসি ধরে রেখেই অপরপক্ষকে কৃতজ্ঞতা জানাল,
“আপনাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করব না, স্যার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার শায়ান মাহির। আপনার কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ থাকব। এইবারের বান্দরবান ভ্রমণ আমার কাছে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে আমৃত্যু। এতটা এনজয় আমি আমার কোনো ট্রাভেলে করি নাই।”
কথাটা বলেই পাশে চেয়ে রইল সে। এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে মেয়েটা কিছু শোনার আশায় রইল বটে। কিন্তু আফসোস, তাকে পুরোদমে হতাশ হতে হলো। অপরপক্ষের থেকে ফিরতি কোনো শব্দ শোনা গেল না। কিন্তু এতে তার মুখের হাসি ফুরোল না। আজ অকারণেই যেন সে একটু বেশিই হাসছে। শায়ানের ঠোঁটের কোণ ঘেঁষে একচিলতে মুচকি হাসি ঠিকই উঁকি দিল। সানগ্লাসের আড়ালে থাকা চোখদুটোর বিমোহিত চাহনি মৈত্রেয়ীর দৃষ্টির অগোচরে থেকে গেল। কতকিছুই তো সে জানে না! মৈত্রেয়ী আর একটা শব্দও বলল না। দুজন নীরবে নিভৃতে দাঁড়িয়ে রইল। উপভোগ করে চলল চারপাশের অতীব সুন্দর প্রকৃতির নৈস্বর্গিক রুপ।
.
সময় একটা বেজে পাঁচ মিনিট। মধ্যিখানে অনায়াসেই বেশ কয়েক ঘণ্টা পেরিয়েছে। আকাশ এখন মেঘাচ্ছন্ন। এই বুঝি বর্ষণ নামল। সিক্ত করে দিল বান্দরবানের প্রতিটি কোণা। গ্রুপ কতৃপক্ষের আদেশে প্রত্যেকে চান্দের গাড়িতে উঠে বসেছে ততক্ষণে। এখন তারা রিসোর্টে ফিরে যাবে। দুপুরে গোসল, খাওয়া শেষ করে কিছু সময় রেস্ট নিবে। পরবর্তীতে আবার বিকেলে রিসোর্টের আশেপাশের জায়গাগুলো ঘুরে দেখবে। ওনাদের আদেশ মতো মেয়েরা একটা গাড়িতে এবং ছেলেটা একটা গাড়িতে উঠে বসল। নয়ত বসে শান্তি পাওয়া যায় না। মিনিট কয়েকের ব্যবধানেই গাড়ি দুটো চলতে শুরু করল পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে। আগে আগে এগিয়ে চলেছে ছেলেদের গাড়িটা। এবং পিছু পিছু আসছে মেয়েদের গাড়িটা। রাস্তায় একটু পরপরই বাঁক। উঁচু নিচু রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে আছে। রাতভোর বেশ বৃষ্টি হয়েছে। সকাল থেকে রোদের অস্তিত্ব থাকলেও গাছপালায় ঢাকা রাস্তার পিচ্ছিলতা কমাতে সক্ষম হয়নি। তার উপর এই বৃষ্টি হচ্ছে তো এই রোদ উঠছে। অগত্যা খুব সাবধানে গাড়ি চালাতে হচ্ছে চালকদের। শায়ান চান্দের গাড়ির শেষের দিকে বসেছে। এই পর্যায়ে তার ঘাড়টা বেঁকে পাশে ঘুরল। অদূরের গাড়িতে বসা মৈত্রেয়ী তার দিকেই চেয়ে ছিল। তার চোখ দুটো নিঃশব্দে হাসছে যেন। গম্ভীর, স্বল্পভাষী, হাসতে না জানা মেয়েটার এই পরিবর্তনে শায়ান নিজেও প্রকাশ্যে মুচকি হাসল। দুজনের মধ্যে কেউই চোখই সরাল না। একে অপরের দিকে থেকে। কিছুদূর এগিয়েই একটা বাঁক পড়ল। ওই বাঁকটা ঘোরাতে যেয়ে দ্বিতীয় গাড়িটার চাকা পিছলে যেয়ে পড়ল খাদে। গাড়িতে অবস্থান করা মানুষগুলো ছিটকে যেয়ে গাড়ির নিচে পড়ল। শায়ানের চোখের সামনেই অনতিদূরে গাড়িতে বসে থাকা মৈত্রেয়ী ছিটকে গেল গাড়ি থেকে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ করেই সবটা ঘটে গেল। একেবারে ন্যানো সেকেন্ডের ব্যবধানে। অমনিই জায়গাটা জুড়ে হই হই রই রই পড়ে গেল। সামনের পিছনের গাড়ি গুলো থেকে যাত্রীরা নেমে এল দ্রুত। শায়ান একপ্রকার লাফিয়ে নামল। ঝড়ের গতিতে জায়গাটায় ছুটে এল সে। গাড়িচালক একপাশের নরম জায়গায় পড়েছিল। আঘাত তুলনামূলক কম পেয়েছে সে। শায়ানের বলিষ্ঠ ডান হাতটা তার দিকেই এগোল। লোকটাকে একবারে মাটি থেকে শূন্যে তুলে ফেলল। সিংহের ন্যায় গর্জে উঠল,
“গাঞ্জা খেয়ে গাড়ি চালাস? মন কোথায় থাকে? আই সোয়্যার একটা প্রাণের যদি কিছু হয় এই বান্দরবানের মাটিতে তোকে গাড়ব আমি।”
কেউ শায়ানেক নিকট এগোনোর সাহস পাচ্ছে না। এতটাই রাগান্বিত দেখাচ্ছে তাকে। মুখমণ্ডল লালচে হয়ে উঠেছে। কপালের নীল শিরাগুলো ফুলে ফেঁপে উঠেছে। চোখদুটো সাক্ষাৎ জলন্ত অগ্নিকুণ্ড যেন। গ্রুপ কতৃপক্ষের কয়েকজন সাহস করে এগিয়ে এসে শায়ানের সাথে সম্মানের সহিত কথা বলে তাকে শান্ত করল। সে নিজেও বুঝল। ছেড়ে দিল লোকটাকে। গাড়িটা আগে খাদ থেকে তোলার প্রয়োজন। অনেক জন মিলে বেশখানিকটা সময় নিয়ে গাড়িটা তোলা হলো। শায়ানের ব্যথিত চোখদুটো মৈত্রেয়ী খুঁজে চলল। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে পেয়েও গেল কাঙ্ক্ষিত মুখটা। দুর্গম রাস্তা পেরিয়ে দৌড়ে সেদিকে গেল সে। মৈত্রেয়ীর মাথাটা একটা পাথরের সাথে বাড়ি খেয়েছে। থেঁতলে গেছে মুখের একাংশ। সুশ্রী আননের নকশাটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে। তাজা লাল রক্তে শরীর মাখামাখি হয়ে আছে। শায়ান ওই রক্তাক্ত শীর্ণ শরীরটাই কোলে উঠিয়ে নিল। পাঁজাকোলা করে নিয়ে এসে রাস্তায় রাখল। মাথাটা ঠাঁই পেল তার বুকে। কখনো কোনো মেয়ের আশেপাশে না যাওয়া শায়ান আজ যেন নিজের মধ্যে নেই। মৈত্রেয়ীর গালে আলতো করে হাত ছুঁয়ে বারকয় ডাকল,
“মৈত্রেয়ী ম্যাম, শুনছেন? কথা বলুন। শুনছেন আপনি? ম্যাম?”
কিন্তু মেয়েটার মধ্যে কোনো হেলদোল দেখা গেল না। পাওয়া গেল না কোনো সাড়াশব্দ। শায়ানের বুকব্যথা ক্রমশ মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। শরীরের শিরা উপশিরা জুড়ে অসহনীয় একটা যাতনা ছুটে চলল। নেত্র জোড়া শোণিতবর্ণ হয়ে দেখাচ্ছে। মেয়েটার নাসারন্ধ্রের নিকট হাত দিতে ভয় হচ্ছে তার। ভয়ংকর সমুদ্রকে জয় করা একজন মানুষের জন্য এ আহামরি কিছু না। অথচ এই সামান্য কাজটা করতে যেয়েই হাত কাঁপছে শায়ানের। কী অদ্ভুত! তবুও বুকে সাহস সঞ্চয় করে কাঁপা কাঁপা হাতে মৈত্রেয়ীর পালস রেট পরীক্ষা করল সে। কিন্তু কোনো কিছুই অনুভব করতে পারল না। পরপরই নাসিকাগ্রের নিকট হাতটা এগিয়ে দিল। না, নিঃশ্বাসের আর কোনো আনাগোনা নেই। মেয়েটার হৃৎস্পন্দন থমকেছে ততক্ষণে। প্রাণ পাখিটা উড়াল দিয়েছে সৃষ্টিকর্তার নিকট। শায়ানের রক্তিম হয়ে ওঠা চোখদুটো দিয়ে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল মৈত্রেয়ীর গালে বরাবর। মেয়েটার মেলে থাকা নেত্রপল্লবের দিকে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকল। এই চোখদুটো আর কখনো প্রকৃতিকে মুগ্ধ চোখে দেখবে না। জীবন এতটা ধোঁয়াশাপূর্ণ কেন? হাসতে হাসতেও বুঝি এভাবে সব ছেড়েছুড়ে চলে যাওয়া যায়? এত দ্রুত সত্যিই কী সব হওয়ার ছিল? শায়ান আঙুলের স্পর্শে মৈত্রেয়ীর নেত্রপল্লব বন্ধ করে দিল। চেয়েও শব্দনালী বেয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না সে। মেয়েটার মাথা বুকের মাঝে নিয়ে সেভাবেই বসে রইল। তৎক্ষণাৎ অম্বরের বুক চিরে বর্ষণ নেমে এল। ভিজিয়ে দিল প্রতিটা মানবদেহ প্রাণ। সবটুকু বিষাদ এবং বুকব্যথা ধুয়ে মুছে নিজের সাথে নিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু চাইলেই কি আর সব হয়? মৈত্রেয়ীর তো খুশির দিন আজ। সাতকুলে কেউ না থাকার দুঃখে তার অন্তর সর্বক্ষণ ব্যথিত হতো অথচ আজ দুই দিনের পরিচয়ে কেউ একজন নিজের পৃথিবীসম আপন করে নিয়েছিল তাকে। তাই তো প্রাণহীন নিথর দেহটা একটা ভরসা স্থলে পড়ে রইল। নয়ত তার তো ওই খাদ থেকে এত দ্রুত উদ্ধার হওয়ার কথা ছিল না। নিঃসন্দেহে সে ভাগ্যবতী। তা নয় কী?
.
বর্তমান…
২০২৬ সালের জুন মাস চলমান। জীবন থেকে আটটা বছর কেটে গেছে। সময় তার নিজস্ব নিয়মে বয়ে চলেছে। কখনো ধীরগতিতে, কখনোবা দুরন্ত। এই দীর্ঘ সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেছে। পরিচিত মুখে জমেছে অচেনার ছায়া। কিছু সম্পর্ক হারিয়েছে তার পুরোনো উষ্ণতা। আবার কিছু স্মৃতি আরও গভীর হয়ে শেকড় গেড়েছে মনের ভেতর। তবু জীবন থেমে থাকেনি। পুরোনো দিনগুলোকে পেছনে ফেলে মানুষগুলোও এগিয়ে গেছে নিজ নিজ গন্তব্যের দিকে। আট বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়, সেদিনের সেই জীবনটা যেন অন্য কারও ছিল। অথচ তার প্রতিটি স্মৃতিই আজও নিঃশব্দে বয়ে চলেছে বুকের ভেতর। সেই একই জায়গায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে শায়ান এবং তার ভাইঝি শৌর্য। শৌর্যের বয়স এখন পনেরো। শায়ানের বয়স চল্লিশের কোঠায় পৌঁছেছে। বিয়াল্লিশ বছরের পুরুষ সে এখন। নিজের সমুদ্র জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকে সর্বদা। ছুটিতেও আর দেশ ভ্রমণে বেরোয় না। মন টানে না আর কিছুতে। সর্বগ্রাসী প্রকৃতির সৌন্দর্যও আর তাকে টানতে পারে না। পদোন্নতি হয়েছে তার। এখন সবার নিকট সে ক্যাপ্টেন শায়ান মাহির নামেই পরিচিত। দীর্ঘ আট বছর পরে বান্দরবানের মাটিতে আজ সকালে পা রেখেছে শায়ান। একপ্রকার শৌর্যের জোরজবরদস্তিতেই এসেছে সে। ভাতিজা তার বড্ড আদরের কি-না! তাই তো কথা ফেলতে পারেনি এইবার। বাইক রাইড করেই এসেছে দুজন। চাচা, ভাতিজার মধ্যে নিগূঢ় নীরবতা বিরাজমান। চাচ্চুর থেকে সবটা শুনে শৌর্যের আঁখি জোড়া ছলছল করছে। জীবন কী অদ্ভুত সে ভেবে পাচ্ছে না। চাচ্চুর বিয়ে না করার কারণ কি তবে এটাই ছিল? সময় নিয়ে নিজেকে সামলিয়ে জানতে চাইল শৌর্য,
“তোমার কাছে যত্নে থাকা ফোনটা তবে মৈত্রেয়ী ম্যামের, চাচ্চু? তুমি কি এই নোট লেখা অভ্যাস ম্যামের থেকেই পেয়েছ?”
শায়ান একদৃষ্টে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। পুরোনো স্মৃতি তার মস্তিষ্কের প্রতিটা নিউরনে কিলবিল করে ছুটে চলেছে। এই প্রশ্নের জবাবে ঘাড়টা ঈষৎ কাত হলো কেবল। জবাব পেতেই শৌর্য চুপ হয়ে গেল। সেভাবেই পেরোল কিয়ৎক্ষণ। এই পর্যায়ে মনের মাঝে খচখচ করতে থাকা প্রশ্নটাই করে বসল সে,
“তোমার বিয়ে না করার কারণ কি তবে মৈত্রেয়ী ম্যাম, চাচ্চু? ভালোবেসে ফেলেছিলে ওনাকে?”
এই প্রশ্নে শায়ানের মাঝে কোনো হেলদোল দেখা গেল না। এক চিত্তে কী যেন দেখে চলেছে। শৌর্য ধরে নিল সে জবাব পাবে না। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে শায়ান ধীর গলায় বলল,
“ভালোবাসিনি তো। ভালোবাসলে তো নিজেও মরে যেতাম।”
চাচ্চুর মনের অবস্থাটা দিব্যি অনুভব করল শৌর্য। মানুষটাকে তার চেয়ে আর বেশি কে বোঝে? ঝরঝরে কেঁদেই ফেলল এইবার। এতে অবশ্য শায়ানের মধ্যে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখ গেল না। শুধু অধরযুগল একপাশে কিঞ্চিৎ উঁচু হলো। তাচ্ছিল্যের হাসির রেশ ছড়াল সেথায়। আলগোছে নিজের প্যান্ট হাতড়ে ফোনটা বের করল। প্রবেশ করল নোটপ্যাডে। সেখানে স্পষ্ট হলো কয়েকটা বাক্য,
“বুঝলেন ব্যাংকার ম্যাম, কিছু কথা আমৃত্যু অকথিতই থেকে যায়। দিগন্তের ওপারের বাড়িতে ভীষণ ভালো থাকুন আপনি। আমি কিন্তু আপনাকে কখনোই ভালোবাসিনি!”
২৩শে জুন, ২০২৬
বিকাল ৪টা ১৫ মিনিট
ক্যাপ্টেন শায়ান মাহির,
বান্দরবান।
#সমাপ্ত
লেখনীতে: #ইসরাত_তন্বী


