Home "ধারাবাহিক গল্প দিগন্তের ওপারে বাড়ি দিগন্তের ওপারে বাড়ি পর্ব-০১

দিগন্তের ওপারে বাড়ি পর্ব-০১

0
6

#দিগন্তের_ওপারে_বাড়ি |১|
লেখনীতে: #ইসরাত_তন্বী

“বাবার মৃত্যুর পরে, আমি নিজ হাতে আমার মায়ের দ্বিতীয়বার বিয়ে দিয়েছি। বিষয়টা খুব অদ্ভুত শোনাচ্ছে তাই না? কিন্তু এটাই সত্যি। মায়ের জন্য একটা শক্ত খুটির বড্ড প্রয়োজন ছিল। সমাজের কাউকে পরোয়া করিনি। কারোর দৃষ্টিভঙ্গিকে পাত্তা দেইনি। মানিনি কোনো তথাকথিত সুশীল নিয়ম। আমার ঘরে ভাত না থাকলে কেউ কি দুমুঠো চাল দিয়ে আমায় সাহায্য করবে? করবে না তো। তাহলে তাদের কথা আমার জীবনে কেন প্রভাব ফেলবে? মোটেও নয়। সেই প্রশ্নই আসে না। আমার বয়স তখন মাত্র বিশ। সবে অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছি। জীবন বড়ো বিচিত্র ছিল আমার কাছে।”
২১জুন, ২০১৮
রাত আটটা বেজে চল্লিশ মিনিট।
মৈ…

ফোনের নোটপ্যাডে শব্দগুলো বেশ যত্ন নিয়েই লেখা হচ্ছিল। কিন্তু অকস্মাৎ পুরুষালী গম্ভীর কণ্ঠস্বর শ্রবণেন্দ্রিয়ে প্রবেশ করতেই টাইপিংয়ে ব্যস্ত আঙ্গুলটা থেমে গেল। ফোনটার সাইড বাটনে আলতো চাপ দিয়ে বন্ধ করা হলো। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে দেখতেই প্রথমেই চোখের পর্দায় ভেসে উঠল দুটো স্বচ্ছ নীল মণির নেত্র। পরক্ষণেই একটা লম্বা চওড়া পেশীবহুল শরীরের অবয়ব। মানুষটার শরীরে কালো রঙের টি শার্ট এবং শুভ্র রঙা ঢিলেঢালা প্যান্ট জড়ানো। মাথায় ক্যাপ এবং মুখে মাস্ক পরিধান করা। চোখে থাকা চশমাটা টিশার্টে ঠায় পেয়েছে। ফর্সা কপাল আর ওই নীল চকচকে মণিজোড়া ব্যতীত কিচ্ছুটি দেখার উপায় নেই। ঠিক সেই মুহূর্তে পুনরায় একই বাক্য শুনতে পেল রমণী,
“আপনার পাশের সিটটা আমার। বসতে পারি?”
রমণি দ্রুত মাথা নেড়ে সায় জানাল। ইশ! কেমন বেয়াদবি করে ফেলল সে। তবে অপরপক্ষের এমন ভদ্র আচরণ তার বেশ ভালো লাগল। যুবকটা হাতে থাকা ব্যাগটা মাথার উপরে বাসে রেখে পাশটাই বসল। সময় এখন রাত আটটা বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। তারা অবস্থান করছে, ঢাকার ফকিরাপুল, আরামবাগ বাসস্ট্যান্ডে। গন্তব্যস্থল বান্দরবান। বাসের মধ্যে একটা ট্রাভেলার গ্রুপ আছে। Green Belt Tourism গ্রুপের মাধ্যমে পরিচালিত ট্যুরে সবাই যাচ্ছে। বাস ছাড়বে নয়টা নাগাদ। ঋতুতে বর্ষাকাল। এখন আষাঢ় মাস চলমান। এই সময়ে পাহাড় এবং ঝরনা গুলো চমৎকার সৌন্দর্য ধারণ করে। আজকের মেঘে ঢাকা রাতের ঢাকা শহরটাকে কেমন যেন বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। কালচে কাদম্বিনীর ভারে আকাশটা নুইয়ে এসেছে দিগন্তের দিকে। অথচ শহরের বুকজুড়ে অগণিত আলো জ্বলছে। ব্যস্ত সড়কের আলো ছায়া রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে তৈরি করেছে শৈল্পিক সৌন্দর্য। সেখানে লেপ্টে আছে অস্পষ্ট এক মায়া। বাসের খোলা জানালা দিয়ে ক্ষণে ক্ষণে হুড়মুড়িয়ে প্রবেশ করতে ঠাণ্ডা ঝিরঝিরে হাওয়া। শরীরে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে একেবারে। মাঝেমধ্যে দুয়েকটা ট্রাক সহ অন্যান্য গাড়ি তাদের স্থির বাসটাকে পাশ কাটিয়ে শো শো শব্দে চলে যাচ্ছে। দূরের সেই গাড়ির শব্দ, আশেপাশের ল্যাম্পপোস্টের হলদে নিয়ন আলো আর আসমানে জমে থাকা মেঘ সব মিলিয়ে শহরটা নিজেকে অদ্ভুত এক সৌন্দর্যে মুড়িয়েছে। জানালার পাশের সিটে রমণী বসেছে। কিছুক্ষণ আপনমনে প্রকৃতি বিলাস করল। তারপর আবার ব্লুটুথ কানেকশন অন করে পুনরায় নোটপ্যাডে ঢুকল। এটাই তার অভ্যাস। নিজের মনের সবকিছু লম্বা ট্যুরের সময় নোটপ্যাডে সংরক্ষণ করে রাখে। আজ মাকে বড্ড মনে পড়ছে তার। তাই পুরোনো সবকিছুই স্মৃতিচারণ করছে। আজকের বিষন্ন আবহাওয়ার সাথে তার মনের অবস্থাটা মিলেমিশে একাকার। আঙ্গুল গুলো পুনরায় ফোনের কিবোর্ডে চলমান হলো,

“সেই সময়ে আমার সম্মান হানি করতেও কতজনে চেষ্টা করেছিল। ছোট্ট জীবনটা দূর্বিষহ বানিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু কেউ সক্ষম হয়নি। রাখে আল্লাহ মারে কে? আল্লাহর উপর ভরসা রেখে আমি শূন্য থেকেই শুরু করেছিলাম এবং এখন একজন সফল নারী আমি। গাড়ি, বাড়ি সব আছে আমার। যারা আমাকে মাটির সাথে ধূলিসাৎ করে দিতে চেয়েছিল এখন তাদের সন্তানরাই আমার মতো হতে চায়। এর থেকে বেস্ট রিভেঞ্জ আর কি কিছু হতে পারে, আম্মু? হাহ্!”
২১জুন ২০১৮
রাত আটটা বেজে আটচল্লিশ মিনিট
মৈত্রে…

ত্বরান্বিত আঙ্গুল গুলো আবারও থমকাল কিয়ৎসময়ের জন্য। স্বেচ্ছায় প্লে লিস্ট অফ করে দিল রমণী। ট্রাভেলার গ্রুপের লিড সহ আরও দুজন এগিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে তাদের সিটের কাছটাই। লিড ছেলেটা মুচকি হেসে নমনীয় গলায় সালাম দিয়ে জানতে চাইল,
“আসসালামুয়ালাইকুম, স্যার। এখানে কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো?”
সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে বসে ছিল যুবক। হঠাৎ এই কথা কর্ণগোচর হতেই সোজা হয়ে বসল। জবাবে শোনা গেল গুরুগম্ভীর শীতল গলার আওয়াজ,
“ওয়ালাইকুমুস সালাম। নো প্রবলেম, এভরিথিং ইজ ফাইন।”
“ওকে স্যার। হ্যাভ আ গ্রেট ট্রিপ।”
জবাবে যুবক ক্ষীণ হাসল। যদিও ঠোঁট দুটো মাস্কের আড়ালে থাকায় তা চক্ষুগোচর হলো না কারোর। সকলের দৃষ্টির অগোচরে থেকে গেল। গ্রুপ থেকে আসা একজন ছেলে রমণীর দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে নিচ্ছিল,
“আপু, আপনার ওই সিটটা…”
মুখের কথা শেষ করতে পারল না সে। অসমাপ্ত থেকে গেল। যুবক আঙুলের ইশারায় থামিয়ে দিল। ছেলেগুলো আর কী বলবে! যার সিট সে যদি স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেয় তাদের তো আর কিছু করার থাকে না এখানে। সবাই মাথা নেড়ে চলে গেল। রমণীর নিকট সবকিছু কেমন ঘোলাটে লাগল। কপাল গুটিয়ে এসেছে তার। কী বলতে চাইছিল তাকে? একবাস মানুষের মধ্যে তার পাশে বসা মানুষটাকে এক্সট্রা সম্মান দেওয়ার কারণই কী? আবার স্যারও সম্বোধন করল! কে ইনি? পরক্ষণেই কাঁধ ঝাকাল। যে হয় হোক। তার কী তাতে? আবার ভাবল, পাশে বসেছে একটু পরিচিত হবে না? দূরের পথে যাচ্ছে। পরিচয় থাকাই শ্রেয়। কখন কার কী হয়! মনের দোটানায় নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল রমণী। যুবক ততক্ষণে ফোন বের করে স্ক্রল করতে শুরু করেছে। রমণীও আর কিছু বলল না। পুনরায় পছন্দের প্লে লিস্ট অন করে নোটপ্যাডে ঢুকল,

“জীবন বড়ো অদ্ভুত তাই না, আম্মু? অন্যকে ফাঁদে ফেলতে যেয়ে, নিজেই সেই ফাঁদে পড়ে ধুঁকে পঁচে মরতে হয়। জানো আম্মু, আব্বুর ছোট ভাইটার এখন সেই একই করুণ অবস্থা। আল্লাহ ছাড় দেন কিন্তু ছেড়ে দেন না। প্রকৃতির বিচার বড্ড কঠিন।”
২১জুন ২০১৮
রাত আটটা বেজে ছাপান্ন মিনিট
মৈত্রে…

লেখাটুকু লিখেই রমণীর বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। আর আঙ্গুল নড়ল না। নিজের নামটাও সম্পূর্ণ লিখতে ইচ্ছে হলো না। একরাশ বিরক্তি এসে ঘিরে ধরল তাকে। ইদানিং গ্রাম থেকে সে কত শত ফোন কল পায়। কিন্তু স্বেচ্ছায় রিসিভ করে না। ওই গ্রামের কথা স্মরণে এলেই তার শরীরে আগুন ধরে যায়। বিতৃষ্ণায় মুখটা তেতো হয়ে ওঠে। মৃত্যুকে বরণ করবে তবুও ওখানে আর ফিরবে না। কখনোই না। হঠাৎ বাতাসের বেগ ঈষৎ বাড়ল। তা উপলব্ধি করা মাত্রই রমণী জানালার দিকে ঠেসে বসল। ফোন অফ করে একদৃষ্টে বাইরে চেয়ে রইল। বাস ছাড়ার সময় হতেই একজন ছেলে সুন্দর মতো সবাইকে নির্দেশনা দিল। সকলে মনোযোগের সহিত শুনল। যাত্রীরা সবাই ঠিকঠাকভাবে এসেছে কি-না একবার ভালোভাবে দেখে নিলেন ওনারা। অতঃপর বাস স্টার্ট দিলেন ড্রাইভার। বাসটা ঢাকা শহরকে পিছনে ফেলে বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে চলতে শুরু করল। সকলে একটু একটু করে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলল। কিছুদূর এগোতেই বাসের ভেতরকার সব লাইট বন্ধ করে দেওয়া হলো। নিগূঢ় নীরবতা আঁকড়ে ধরল বাসটাকে। রমণীর শরীর শিরশির করে উঠল। নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে বসল। মধ্যিখানে বেশ কিছুক্ষণ সময় পেরোল সেভাবেই। অকস্মাৎ রমণী একটু ঘুরে পাশের যুবককে দেখল। যুবক ফোনে কিছু একটা টাইপ করছে। কারোর সাথে মেসেজে কথা বলছে হয়ত। মিনিট দুই চুপ থেকে রমণী নিজ থেকেই বলল,
“হ্যালো, আই’ম মৈত্রেয়ী হালদার।”
কয়েক সেকেন্ড অতিক্রম হতেই যুবকের নমনীয় ঘাড়টা বেঁকে তার দিকে ঘুরল। এতক্ষণে সে খেয়াল করল তার পাশের মেয়েটাকে ঠিকভাবে। লেডিস শার্ট আর প্যান্ট জড়ানো শীর্ণ লম্বা ফর্সা শরীরে। পরপরই যুবক দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। পুনরায় কাজে মনোনিবেশ করল। সেভাবেই প্রত্যুত্তর করল,
“হাই, আই’ম শায়ান মাহির। আপনার নামটা বেশ ইন্টারেস্টিং।”
মৈত্রেয়ী মৃদু হাসল,
“আম্মু, ভীষণ শৌখিন মনের মানুষ ছিলেন। উনিই রেখেছিলেন এই আনকমন নাম। মানুষের উচ্চারণ করতে যেয়েই দাঁত ভেঙে যায়।”
যুবক হাতের কাজ সেরে ফোনটা অফ করে রাখল। মৈত্রেয়ীর কথার পরিপ্রেক্ষিতে বলল,
“বেশ ভালো।”
মৈত্রেয়ী কিছুক্ষণ চুপ থেকে জানতে চাইল,
“আপনি ঢাকার স্থানীয়?”
শায়ান ইশারায় হ্যাঁ বোঝাল। পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“আপনি?”
মৈত্রেয়ী এই প্রশ্নে তাচ্ছিল্য হাসল,
“অনেকগুলো বছর ধরে ঢাকাতেই আছি। আপাতত স্থানীয় বলা চলে।”
শায়ান আর কিছু বলল না। মৈত্রেয়ী এতক্ষণে দিব্যি বুঝেছে তার পাশে বসা মানুষটা ভীষণ স্বল্পভাষী। মানুষ তাকে মিতভাষী বলে কিন্তু ইনি তো আরও একধাপ উপরে। সে নিজেও এভাবে কথা বলতে ইতস্তত বোধ করছে। কিন্তু মনের মধ্যে একটা বিষয় নিয়ে খচখচ লাগছে। সেটার উত্তর না জানা অবধি স্বস্তি মিলবে না।‌ অগত্যা কুণ্ঠিত হয়েই শুধাল,
“যদি কিছু মনে না করেন আপনি কোন প্রোফেশনে আছেন জানতে পারি?”
শায়ান ব্লু টুথ কানেক্ট করে প্লে লিস্টে ঢুকে পছন্দ মতো গান খুঁজছিল। এই প্রশ্নে কয়েক সেকেন্ডের জন্য তর্জনী আঙ্গুল স্থির হলো। পরক্ষণেই আগের ন্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মৈত্রেয়ীর ভ্রু যুগল কুঁচকে গেল। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। ঠিক সেই মুহূর্তে শ্রবণেন্দ্রিয়ে পৌঁছাল শান্ত শীতল গলার জবাব,
“ভবঘুরে আমি। পাহাড়, সমুদ্র সবকিছু মিলেই দিন কাটে আমার। যেখানে রাত সেখানেই কাত।”
মৈত্রেয়ী নেত্র যুগল ছোট ছোট করে ফেলল। সরু চাহনিতে চাইল,
“মিথ্যা বলছেন আপনি? ভবঘুরে একজনকে কেউ স্যার বলে নাকি? বোকা বানাচ্ছেন আমাকে?”
শায়ান এই পর্যায়ে তাকাল মৈত্রেয়ীর দিকে। মেয়েটা নীল মণির ওই শাণিত দৃষ্টিতে চোখ স্থির রাখতে পারল না। নজর ঘুরিয়ে ডানে বামে দেখল। বাম ভ্রু উঁচিয়ে উলটো প্রশ্ন ছুঁড়ল শায়ান,
“এরকম কিছু মনে হচ্ছে কি? যদি মনে হয়, তবে তাই। আপনিও নিশ্চয় আমার মতো ভবঘুরে একজন?”
এমন প্রশ্নে মৈত্রেয়ী হেসে ফেলল,
“এই মুহূর্তে সেটাই মনে হচ্ছে।”
শায়ান শুনল কথাটা কিন্তু আর কিছু বলল না। কেবল অধরযুগল একপাশে কিঞ্চিৎ প্রসারিত হলো। বেশ চিত্তাকর্ষক মেয়েটা। মৈত্রেয়ীও নিজ থেকে আর একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। বাইরের প্রকৃতির দিকে একঝলক দেখল। তৎক্ষণাৎ এক দমকা হাওয়া এসে কপালের উপর বড্ড অবহেলায় পড়ে থাকা চুলগুলো উড়িয়ে দিল। পরম আবেশে লোচন জোড়া বুজে নিল সে। আলগোছে নোটপ্যাডে ঢুকল। মুচকি হেসে সেখানে লিখল,

“শহরের যান্ত্রিক কোলাহল মাড়িয়ে নির্জনতায় নিজেকে সঁপেছি। মানুষ তাই নাম দিয়েছে ভবঘুরে। বিষয়টা ইন্টারেস্টিং না বলো, আম্মু?”
২১জুন ২০১৮
রাত নয়টা বেজে পঁচিশ মিনিট
মৈত্রেয়ী হালদার

#চলবে