অদৃষ্টের মৃগতৃষ্ণা পর্ব-৩৬+৩৭

0
121

#অদৃষ্টের_মৃগতৃষ্ণা (৩৬)
#লিখনীতে_প্রোপীতা_নিউমী
(বড় পর্ব, বুঝে পড়বেন। প্রাপ্ত বয়স্কদের এবং উন্মুক্তমনাদের জন্য প্রযোজ্য)

পিছনে কাগজের পাতা লুকিয়ে বাচ্চাটা ছোট্ট ছোট্ট পায়ে বাবার ঘরের দারগোড়ায় গিয়ে দাড়িয়ে উঁকি দিলো, ইজি চেয়ারে বসা বাবাকে দুলতে দেখে চঞ্চল মনায় হয়ে রুমে প্রবেশ করলো সে তবে প্রবেশ মাত্রই তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধে কাশি আসার জোগাড়। খুক খুক করে কেশে উঠলো সে।

তোফায়েল মির্জা বিরিক্তিমায় মাথা পাশ করে চেয়ে কৌশিককে দেখে বিরক্ত হলেন। কর্কশ কন্ঠে তার রুক্ষ শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো কানে,
“এই সময় আসতে বারণ জানো না?!”

বাবার কঠিন কথা কৌশিক জন্মের পর থেকেই শুনে আসছে, কিন্তু তার বাবা মানুষটা ভয়ানক রকমের, সে শুনতে শুনতে অভ্যস্থ প্রায়। তিনি সর্বদা গরম হয়ে থাকেন, কৌশিকের সামান্যতম অবাধ্য আচরণও যেনো তার চক্ষুশুল অথচ কিনানের ব্যাপারটা ঠিক উল্টো।

“বল নিতে এসেছি বাবা।”
কৌশিকের পিঠে ঢেকে থাকা দুইহাত কিছুটা নড়লো তাই কোনরকম হাতের কাগজ টা প্যান্টের পিছনের পকেটে ঢুকিয়ে ফেললো। তোফায়েল মির্জা যেন কানেই তুললেন না এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করে আবার সিগারেটে টান বসিয়ে দিলেন। কৌশিক তার বাবার রুমে বল খুঁজে পেয়ে গেলো তারপর যেই বের হতে যাবে তার পূর্বেই তোফায়েল মির্জা চোখজোড়া তির্যক করে শুধলেন,

“তোমার এই বাচ্চামো কখন কাটবে?”
ঝাঁঝালো কণ্ঠের আঁচ কৌশিক করতে পারলো বোধহয় তবে তার বয়সে এমন কথার ধাঁচ ঠিক ধরতে পারলো না। চোখ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো শুধু অনেকক্ষন।

“সিগারেট ফুকবে? ধরো, এই নাও!”
রুমের কড়া ধুম্রজাল ভেদ করে তোফায়েল মির্জার গম্ভীর কণ্ঠ বাজলো পাঁচ বছরের কৌশিকের কর্ণকুহরে। হাফ প্যান্ট আর টিশার্ট গায়ে বল হাতে ছোট্ট ছেলেটা দাড়িয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো তার বাবার বাড়িয়ে রাখা হাতে জ্বলন্ত সিগারেটটার দিকে, একটু খানি পরখ করতেই নাক কুচকে নেয়।

এহেন আচরণে তোফায়েল মির্জা ক্রুদ্ধ হলেন বোধহয়, চোখ ছোট ছোট করে কুটিল হেসে আওড়ালেন,
“তুমি কি মেয়ে হুম? সিগারেট দেখে নাক সিটকাও কেনো?”

“আমার ভালো লাগে না বাবা।”
অমতা অমতা করে ভয়ে ভয়ে উচ্চারণ করলো কৌশিক কিন্তু ততক্ষণে তার বাবার ভস্মকারী নজরে কৌশিকের হাত থেকে বল মাটিতে পড়ে গেল। কৌশিকের ভয় উপলব্ধি করতে পেরে তোফায়েল মির্জা বেজায় রেগে গেলেন। সে পুরুষ মানুষ তার কেনো ভয় পেতে হবে?! মেজাজ তুঙ্গে বিড়বিড় করে আওরালেন তিনি,
“হয়েছে মায়ের মতো ইদুর একটা!”

থরথর করে কেঁপে দুই পা দুই পা পিছিয়ে নিয়ে নিজেকে আড়াল করার প্রচেষ্টায় নেমে পড়লো। তবে কৌশিকের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় হুট করে একটা ধাক্কা বসিয়ে দিলো তার ভাই কিনান মির্জা।
তার থেকে তিন চারবছরের বড় অথচ চোখে মুখে দাম্ভিকতা, ভীষণ নাক উঁচু স্বভাব তার। কিনান চোখ তুলে শাসানোর সুরে বললো,

“দেখে চলতে পারিস না?”

কৌশিক চোখ নামিয়ে ভদ্র কায়দায়, বিনয়ী স্বরে উচ্চারণ করলো,
“সরি…”

তবে তার মুখের সরি শুনে তোফায়েল মির্জা চোখ রাঙ্গালেন, তার মনে মনে ক্ষোভ যে বংশের কোনো পুরুষ এমন নরম আচরণ করেননি, তাহলে তার ছেলেটা এমন কেনো? সব রাগ স্ত্রীর জন্য তোলা রাখলেন, আচ্ছামতন রাতে ঝাড়বেন তিনি রাগ।
তোফায়েল মির্জার কাছে নূন্যতম ভদ্রতা দেখানো কিংবা সামান্য ভালো মানুষি পাপ সমতুল্য, তিনি মানতে পারেন না যে পুরুষের চরিত্র এমন হবে। তার মতে পুরুষ স্ত্রীর গায়ে হাত তুলতে পারে, রাগ দেখাতে পারে, নিজের ইচ্ছেমত চলতে পারে এমনটাই তো পুরুষত্ব!

“ওটা কি দেখি?”
কিনান চোখ পাকিয়ে গমগমে সুরে বললো, বলার ধরনটা তার বাবার অনুরূপ। লোকে বলে কিনান হয়েছে তার বাবার মতো আর সে তার মায়ের মতো। তার নিষ্পাপ মনের মায়ের প্রতি ভক্তি মায়ের ভালোবাসা তার বাবার অপছন্দের তালিকায় শীর্ষে।

“কিছু না!”
কৌশিক উচ্চারণ করা মাত্রই তার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ফেলা হয় ড্রয়িংটা। কিনান তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে ড্রয়িংটা খুলে হো হো করে হাসতে লাগলো। কৌশিক বিব্রত হলো কেনোনা ড্রয়িং এ এলোমেলো হাতের আকাবুকিতে সে তার মা আর নিজেকে এঁকেছে। আর তাই বল নিয়ে তার মাকে সেটাই দেখাতে নিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু পারলো কই?

কিনানের হাত থেকে ড্রয়িংটা কেড়ে নিতে চাইলে কিনান তা ছিঁড়ে ফেলে মাটিতে ফেলে তার বাবার পাশে গিয়ে বসলো। তোফায়েল পিঠ চাপড়ে কিনানকে বাহবা দিলেন তারপর কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“এসব মেয়েলী আচরণ না থামলে তোমাকে আমি বোর্ডিং স্কুলে দিতে বাধ্য হবো।”
বোর্ডিং স্কুলের নাম শুনেই কৌশিকের দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। সে মা ছাড়া থাকবে কী করে?

দেখতে দেখতে পার হয়ে গেল অনেক বছর, দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টেছে কৌশিকের ও, খুব একটা মানুষের সাথে মেলামেশা তার নেই, তার কথাবার্তা সীমিত ধরনের। তবে পনেরো বছরের এই কৌশিক আজও ভীষণ মা পাগল ছেলে। কিন্তু তার নরম মনের মা টা প্রতিনিয়ত ভীষণ কষ্ট পায়, কারণ তোফায়েল মির্জা খুব একটা সুবিধার মানুষ না অথচ তার মা বিয়ের আগে থেকেই কৌশিকের বাবার প্রেমে মজে ছিলেন। এতটা ভালোবাসা পেয়েও তোফায়েল মির্জা এক নারীতে আটকাতে পারেন নি।

যেমন ফরমালী স্যার, ম্যাডাম বলে সম্মোধন করা হয় ঠিক তেমনই কৌশিক তোফায়েলকে ফরমার্লি বাবা বলে ডাকে, পিতৃত্বের টান যার মাঝে কখনো ছিল না তার প্রতি ভালোবাসা কিংবা দায়িত্ববোধ কভু আসেনি তার। দুঃখ একটা জিনিসই, তার মা এতোটা নিঃস্বার্থভাবে ভালবাসতে জানেন অথচ তার বাবা ভালোবাসার মূল্যও দিতে জানেন না।

কোয়েল গরম চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে ছেলেকে স্বচক্ষে পরখ করে নেয়, খুবই মনোযোগ দিয়ে বই পড়তে ব্যাস্ত সে। এত সুন্দর চেহারার অধিকারী সে! তার ছেলেটা অতি সুদর্শন কিশোর, ধূসর চোখ জোড়ায় যেনো তড়িৎ চৌম্বকীয় আকর্ষণ নিহিত। কোয়েলের চোখে পানি চলে এলো, তৎক্ষণাৎ মন ভরে দোয়া করলেন কৌশিক যেন কখনও তোফায়েল মির্জার মতো না হোক।

“তুমি নাস্তা খেয়েছ, মা?!”
মলিন মুখে হাসার চেষ্টা করলেন কোয়েল কিন্তু কৌশিকের কাছে মনে হলো এই দুর্বল হাসির চেয়ে তার মায়ের বিপর্যস্ত বোঝানোর জন্য আর ভালো কোনো উদাহরণ হতে পারে না।

“তোর বাবার জন্য অপেক্ষা করছি।”
বাবা ডাকটা কৌশিকের কানে হুলের মতো ফুটলো। একটা মানুষের শরীর ফেলে যখন আত্মা মরে যায় তখন মানুষকে যেমন দেখায় তার মাকে ও তেমনটা দেখলো। চোখের নিচে কালো দাগ, মুখে কোনো লাবণ্যতা নেই। তোফায়েল মির্জা তার মায়ের প্রতিটা সুখ কেড়ে নিয়েছে অথচ তাকেই কিনা তার মা মন দিয়ে বসেছে!

কৌশিক তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের স্বরে কপাট রগ দেখিয়ে বললো,
“সে আসবে না।”

তোফায়েল মির্জা কাল সন্ধ্যার পর থেকেই বাসায় ফেরেন নি তাই কোয়েলও ডিনারে কিছু মুখে না তুলেই ঘুমিয়েছিলেন। কৌশিক অপেক্ষা করলো কিন্তু প্রতুত্তরে তার মা কিছুই বললেন না যেনো তিনি জানেন কিন্তু মানতে অপ্রস্তুত।

“তুই খেয়ে নে!”

“চলো একসাথে নাস্তা করবো।”
এক বাক্যে এই বিষয়ের ইতি টানতে চাইলো কৌশিক, কিন্তু তার মা মাথা নেড়ে আহ্লাদিপূর্ণ নরম স্বরে জানালেন,

“তোর বাবা আসবেন আমি নাস্তা করে ফেলেছি শুনলে তিনি মুখে কিছুই তুলবেন না।”

কৌশিক মায়ের প্রফুল্লতায় বিস্মিত হলো। চোখ ছোট ছোট করে নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ নজর ফেললো তারপর অবিশ্বাস্য কণ্ঠে শুধলো,

“বাবা তোমার সাথে বসার কথা তো আগে কখনও বলেন নি! এমনকি বাবা তো নিজের নাস্তাটা পর্যন্ত করার সময় তোমাকে ডাকেন না।”

“ওসব তোরা বুঝবি না।”

“আচ্ছা মা, তুমি কি এসব নিজেকে বোঝাও? নিজের সাথে আর কত ছলচাতুরি করে বেড়াবে বলো তো! ”

ছেলের কথায় কোয়েলের গলায় কান্নার দলা পাকিয়ে গেলো যেনো। তার ছেলেটা অনেক বড় হয়ে গেছে, অনেক কিছুই বুঝতে শিখেছে। নিজেকে সামলে কণ্ঠে স্বাভাবিকতা এনে বললেন,
“তোর বাবা মনে কষ্ট পাবেন এমন বলিস না।”

“মা, তোমার লাইফে তোমার নিজের প্রায়োরিটি কোথায়?”

“তোর বাবাই আমার প্রায়োরিটি।”

কৌশিক উঠে দাড়িয়ে পড়লো, রাগে ফেটে পড়ার উপক্রম হলো তার। আর বেশিক্ষণ টিকতে পারবে না সে, তারপর হনহন করে বেরিয়ে এলো। এখানে এতটা সহজ সরল আর নির্বোধ মানুষ কি করে হয়?!

প্রতিদিন তার বাবা মায়ের সাথে মিথ্যে বলবে আর তার মা অন্ধের মতো তা বিশ্বাস করে নেয়। তিরিক্ষি মস্তিষ্কে কৌশিক মির্জা নিবাস থেকে বের হতেই দেখতে পেলো অদ্ভুত রকমের হয়ে কাব্য দাড়িয়ে আছে। স্বাভাবিক হেলদোল নেই তার মাঝে, কৌশিক কাছে এসে তার কাধে হাত রাখতেই সে পিলে চমকে উঠলো। কাব্যের চোখের নিচে কালি, যেনো সে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে ছিল। তার মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে ছোট হয়ে আছে, ঠোঁট শুকনো হয়ে পানিশূন্যতার জানান দিচ্ছে। কৌশিক কিছুটা ঘাবড়ে গেল,

“কি হয়েছে তোর?”
ততক্ষণে কাব্যের চোখ ছলছল করছে, তার হাত পা কেমন অস্বাভাবিক রকমের কাপছে। টের পেয়ে কৌশিক আলতো করে কাব্যের মুখটা হাতে তুলে আবার কঠোর স্বরে শুধলো,

“আমাকে বল কি হয়েছে! পানি খাবি?”
তার থেকে এক বছরের ছোট কাব্য মাথা নেড়ে চোখের অশ্রু ছেড়ে দিলো তারপর হাঁটু গেঁড়ে মাটিতে বসে পড়লো। বিড়বিড় করে কাপা কাপা দুর্বল স্বরে আওড়ালো,

“মা ভীষণ বাজে মহিলা ভাই, চাচাও ভীষণ বাজে!”
কৌশিকের বুকে প্রচণ্ড বেগে চাপ উপলব্ধি করলো, যেনো তার হৃদপিণ্ড কেউ মুচড়ে নিংড়ে ধরেছে। বাবার স্বভাব তার অজানা নয়, বাবার মেয়েবাজি স্বভাব তার ভাইটাও পেয়েছে। কিন্তু তাই বলে সে তার চাচির সাথে বাবার অবৈধ কিছুই মানতে নারাজ।

কৌশিকের হাত পা আসাড় হয়ে আসার জোগাড়, মনে মনে প্রার্থনা করলো যেনো এমন কিছুই না হয়। কাপা কাপা কণ্ঠে তো তো করে করে উচ্চারণ করলো,
“কোথায় দেখেছিস?”

“মায়ের রুমে।”
কাব্যের চোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু ঝরলো আর কৌশিক শিউরে উঠলো। বুক চিরে বেরিয়ে এলো দীর্ঘ চাপা শ্বাস আর তার বাবার প্রতি বিশদ বিতৃষ্ণা। একটা মানুষ কতটা জ/ঘ/ন্য হলে তাকে ঘৃ/না বেশি কিছু করা যায় কৌশিকের জানা নেই।

সে আবার বাসার দিকে ছুটতেই দেখতে পেলো তার বাবা ছোট চাচার ইউনিটের দিকটা থেকে বেরিয়ে আসলেন মাত্র। আর তার বাবাকে ফিরতে তার মা এক চিলতে হাসি হেসে দৌড় রান্না ঘরে ছুটেন।
কৌশিক থ হয়ে পড়ে, তার চোখের কর্ণিশ বেয়ে নোনা জল গাল ভিজিয়ে দিল। তার মাকে বাঁচতে দেওয়ার একমাত্র উপায় জ/ঘ/ন্য মিথ্যের আশ্রয় নেওয়া। কৌশিকের সাহস জুটলো না আর এগোনোর, এই বাড়িটা তার জন্য ধীরে ধীরে দমরুদ্ধকর হয়ে আসছে। এক বুক ঘৃনা, দ্বেষ, আক্রোশ নিয়ে সে দ্রুত পা ফেলে প্রস্থান করলো।

*

প্রতিদিন কামরার বড় ব্যালকনিতে দাড়িয়ে আধার রজনীতে ঝি ঝি পোকার ডাক শুনে নিজেকে ঘুম পাড়ানোর গান শোনায় কাশফি, তার বয়স সবে মাত্র নয় বছর। তার বাবা খুবই ব্যাস্ত মানুষ তাই তাকে সময় কম দেয় কিন্তু কাশফি জানে তার বাবা তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। তার ভাই মারা যাওয়ার পর থেকে তার মা তাকে পুকুরের পানিতে ছেড়ে আগুনের কাছে ফেলে এসে ভয় লাগানোর চেষ্টায় থাকে, কখনো তো তিনি তাকে মেরে ফেলার মতো করে কথা বলেন। এই বিষয় তার বাবাকে জানানোর পর তার বাবা তার মাকে কোথাও রেখে আসেন। এরপর থেকে তার মাকে সে আর কোথাও দেখেনি। কাশফি এতো সবকিছুর জন্য নিজেকে দায়ী ভাবে, সবাই তার থেকে কেনো এতো দূরে দূরে থাকে? সে কি একা ফেলে রাখার যোগ্য?

চেয়ারে বসে তার ছোট ছোট পা হেলে দুলে গুনগুনিয়ে গান গেয়ে গেলো, গানের মাঝে কোনো সুর নেই, যেনো হাজারো বিষাদ ছেয়ে আছে। তার বাবা আর তার ব্লাড গ্রুপ এক হওয়ায় সে গত বছর বেঁচে গিয়েছে অথচ সেই গাড়িটা কিনা তার ছোট ভাইকে নির্দয়ের মতো পি/ষে অস্তিত্বহীন করে দিল? ভাইটার না জানি কত কষ্ট হয়েছে। কাশফির চোখ ভিজে আসলো তবুও তার বিষাদের সুর থেমে নেই।

কয়েক দফায় হাই তুলেতেই নিজেকে চেয়ার থেকে তুলে লাফ দিয়ে নেমে পড়লো কিন্তু ব্যালকনি ছেড়ে যাওয়া হলো না। ঘন কালো বাগানের গহীন হতে ভেসে আসা ভায়োলিনের সুরে আটকে পড়লো কাশফি, এমন মনমাতানো ভায়োলিনের সুরে নেচে উঠল তার হৃদয় কিন্তু সুরের মাঝে কোথাও যেনো অজস্র বিষাদ ছেয়ে, লুকিয়ে রাখা আবেগ যেন ছেড়ে দিয়েছে কেউ।

কাশফির মনে লোভ জাগলো, ভায়োলিনের টানে নিজেকে নিয়ে গেলো ঘন কালো জঙ্গলের মাঝে। নির্ভীক হয়ে ছোট ছোট পায়ে দৌড়ে চলছে সে, কোথায় যে ভায়োলিনিস্ট?!
বৃষ্টির পানি জমে থাকা ছোট খালের কাছটায় দাড়িয়ে এক কিশোর অবহিত মনে ভায়োলিনের বাও নিখুঁত হাতে চালিয়ে ভায়োলিনে মনোরঞ্জক সুর তুলছে। কাশফি থমকে দাড়ায়, ভায়োলিনের সুরে কেমন বশীভূত হয়ে পড়লো যেনো। এতটা আবিষ্ট হয়ে পড়লো যে চোখের পাতা ফেলতে ভুলেই গেলো হয়ত, আধার ধারায় যেনো শ্রুতিমধুরতা ছেয়ে গেলো। সুরেলা ঐকতানে নিজেকে শিথিল হতে দিলো।

“এখানে কি?”
ভায়োলিনের সুর থেমে আচমকা গমগমে গলার বিরস কণ্ঠ কানে বাজলো আর কাশফির ও ধ্যান ছুটলো বোধহয়। কিশোরটার পিঠ এখনো তার মুখোমুখি, পিছনে না ফিরেই কাশফির আগমন টের পেলো কিভাবে!

“তুমি অনেক সুন্দর ভায়োলিন বাজাও।”
নিজের অভিব্যক্তির দ্বিগুণ প্রকাশে সে বুড়ো আংগুল উপরে তুলে ধরলো, থাম্বস আপ জানালো কিন্তু কৌশিক একটি বার চেয়েও দেখলো না। তার কণ্ঠ আগের ন্যায় কর্কশ রেখে বলল,

“তোমার মতো বাচ্চা মেয়ের এত রাতে বাইরে কি?!”

কাশফি ভ্রু কুঁচকে নেয়, তারপর দুই পা এগিয়ে এসে কোমরে হাত দিয়ে তেতে উঠে জবাব দেয়,
“আমি বাচ্চা না, নয় বছর আমার, হিসাব করতে জানো না?!”

কৌশিক এবার পিছনে ফিরে দেড় ব্যাটারির মেয়েটাকে দেখে নেয়, ছোট মরিচের ঝাল বেশি হওয়ার মতো ব্যাপার স্যাপার। সে হালকা ঝুঁকে উপহাস করার মতো মেকি হাসলো।
“বাহ, নয় বছর? অনেক বড় তো তুমি।”

কাশফি সূক্ষ্ম অপমান কানেই তুললো না, বরঞ্চ বিরক্ত হলো কিছুটা। ছেলেটাকে এত লম্বা কেনো হতে হলো? এইযে তার ঘাড় উপরে তুলে কথা বলতে ঢের কষ্ট হচ্ছে। মুখ কুচকে বিরক্তির শব্দ করলো সে।

“তুমি খাম্বার মতো এতো লম্বা কেনো?”

“তোমার হাইট আর চোখ দুটোতেই সমস্যা।”

“তুমি কি কমপ্লেন খাও?”

“কি?”

“আচ্ছা, তোমার নাম কি?”

কৌশিক মুখ কুচকে গাল বাকায়, বিরক্তির স্বরে উচ্চারণ করলো,
“কিছুনা।”

কাশফি ভাবুক হয়ে উৎসুক নজর ফেললো, স্তম্ভিত হয়ে জিজ্ঞেস করে বসলো,
“করো নাম কিছু না হয়?”

“আমার হয়।”

কাশফি কিছুক্ষণ ছেলেটাকে পরখ করে, তারপর তার চঞ্চলা দুরন্ত চোখ আটকায় ধূসর অক্ষীপটে। ভারী সুদর্শন দেখতে এক কিশোর অথচ তার চোখের রং দেখলেই বরফ গলা নদীর কথা মনে পড়ে যায়। কেমন এক হিম হিম প্রবাহ তার আচার আচরণে, লোকটা কি হাসতে জানে না?

“আচ্ছা যাও তোমার নাম আমি হিমাদ্রী রাখলাম।”

কৌশিক তৎক্ষণাৎ নাক সিটকে ফেললো,
“এতো ফালতু নাম আমি এই জীবনে দুবার শুনিনি।”

“আচ্ছা, তুমি কি হাসতে পারো না?”
বয়সে ছোট মেয়ের মুখে মুখে তর্ক করার মতো ইচ্ছে কৌশিকের নেই তাই ভায়োলিন ব্যাগে ভরে কাঁধে তুলে নিতেই বাচ্চা মেয়েটা তার কাধের পাশে এসে দাড়িয়ে চঞ্চল গলায় বললো,

“তুমি কি চলে যাচ্ছ?”

“না আমি বনের রাক্ষস তাই এখানে থাকি।”

“এসব রাক্ষস বলতে কিছুই নেই।”

মেয়েটার তোয়াক্কাহিন কথায় কৌশিক চোখ ছোট ছোট করে জানালো,
“তাহলে তুমি এখানে একা পড়ে থাকো আমি গেলাম।”

তড়িৎ বেগে মেয়েটা কৌশিকের বাহু খপ করে শক্ত করে ধরে এগিয়ে চললো,
“এই না, না! দাড়াও আমি যাচ্ছি।”

কৌশিক নিশ্চুপ দেখে কাশফি কৌতুহলী মনে আবার প্রশ্ন করে বসলো,
“আচ্ছা তুমি কি প্রতিদিন এখানে ভায়োলিন বাজাও?”

“না।”

“মিথ্যুক, আমি জানি তুমি প্রতিদিন এখানে ভায়োলিন বাজাও।”

“তুমি কিন্তু আমায় প্রচুর বিরক্ত করছো!”

“যাই বলো, আমি কিন্তু কাল আসবো!”
আহা! কি নিঃসঙ্কোচে আবদার! কাশফির রিনরিনে কণ্ঠের উচ্ছাস শুনে কৌশিক তার হাস্য উজ্জ্বল মুখ পানে চেয়ে আরেক দফায় চোখ কুচকে নেয় তারপর বিড়বিড় করে বললো,

“ফাজিল!”

*

সময়ের পর্দা ভেদ করে ত্রয়োদশী ব্যালেরিনা নীলাম্বরী নিখুঁত ব্যালট নৃত্যে মজলো। তার এই ব্যালট নৃত্যে পুষ্পকঞ্জ একাডেমির বিপুল জনপ্রিয়, কেউ কাশফিকে চিনুক বা না জানুক কিন্তু ব্যালেরিনা নামের একজন সবার মুখে। তার নৃত্যের ঝড়ে প্রতিদিনের মতোই শামিল হলো পিয়ানোইস্ট হিমাদ্রী, তবে আজ শক্ত মুখে চোখ বুজে সে পিয়ানোর কি তে আঙ্গুল নাচিয়ে নোট উপরে তুলতে থাকলো।

কাশফির ধারণা কৌশিকের আবেগ প্রকাশের তিনটা মাধ্যম — ভায়োলিন, পিয়ানো আর পেইন্টিং। অল্পসময়ের ব্যবধানে এতো ঘনঘন নোটের উচ্চহারে পরিবর্তনে কাশফি স্তম্ভিত, উনিশ বছরের এই যুবকের হাতে নির্ঘাত কোনো জাদু আছে। কাশফি নিজের ব্যালট জুতোয় রক্তের ছোপের তোয়াক্কা করলো না, কৌশিকের আবেগ অনুভূতি প্রকাশে সে কখনও বাধা হয়ে দাড়ানো ভীষন রকমের অপছন্দ তার। এদিকে কৌশিকের হাত বেয়ে লাল রঞ্জক পিয়ানোর কি ছুঁয়ে এক দু ফোঁটা মাটিতে গড়িয়ে পড়লো। এমতাবস্থায় এই তার হাঁপিয়ে উঠার উপক্রম। হুট করে কৌশিক থেমে গেল আর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কাশফি ছিটকে পড়ে যেতে গেলে দেওয়াল ধরে স্থির করে নেয় নিজেকে তবে বেগের তাড়নায় হাতের কনুই বেশ খানিকটা ছুলে যায়।

“তুমি থামলে না কেনো নীলাম্বরী?”

“হিমাদ্রী না থামা পর্যন্ত নীলাম্বরীর যে থামার অনুমতি নেই!”
কৌশিক চট করে অপ্রস্তুত কাশফিকে তুলে চেয়ারে বসিয়ে নিলো তারপর ডেস্ক থেকে ফার্স্ট এইড বক্স বের করে। কৌশিক কাশফির পা থেকে সন্তপর্নে জুতো খুলে, তারপর এলকোহল প্যাড দিয়ে আলতো হাতে মুছে দিতে লাগলো। কাশফি ঘোর লাগা দৃষ্টিতে অনিমেষ নেত্রে চেয়ে রইলো কেবল।

বাসায় ফিরতে ফিরতে কৌশিকের বেশ রাত হলো, বাসায় ফিরে সে প্রথমেই মায়ের ঘরটায় ঢুকে গেলো। প্রতিদিন এই সময়ে তার মাকে টেবিলে পবিত্র কোরআন পাঠ করতে দেখে কিন্তু আজকে ঘটনার ব্যতিক্রম, কোয়েলকে দেখতে পেলো বেশ প্রশান্তির ঘুমে ডুবে বিছানায় শুয়ে আছেন। কৌশিক মায়ের কাছটায় গিয়ে হাত ধরতেই পিলে চমকে উঠলো, বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে তার হাত।
কৌশিকের নিশ্বাস নিয়মবিরুদ্ধ হলো, বিস্ফোরিত নয়নে কম্পমান হাতে মায়ের হাতে পালস রেট চেক করে সটান হয়ে দাড়িয়ে পড়লো। তারপর ফোনে তার বড় চাচাতো ভাই কায়সারের নাম্বার ডায়াল করে কানে ধরে শান্ত রকমের কণ্ঠে বললো,
“কবর খোড়ার জন্য লোক লাগবে ভাই, আজই বড় মা কে নিয়ে রওনা হয়ে যা।”

তারপর কৌশিক আরেকটা নাম্বারে কল দিয়ে দুই এক বাক্যে কথার ইতি টেনে তারপর মোবাইলের একটা ফাইল সেই নাম্বারে সেন্ট করে মায়ের বিছানার পাশে অভিব্যক্তি হিন বসে রইলো।
তবে আজ থেকে তার মায়ের মানসিক আর শারীরিক শান্তি চূড়ান্ত হলো।

*

মায়ের লাশ রাখা খাটটা সামনে রেখে জানাজার নামাজ শেষ করলো কৌশিক, দ্বিতীয় কাতারে তোফায়েল মির্জা দুই কাঁধে সালাম ফিরালেন মাত্র তৎক্ষণাৎ ফোন ভাইব্রেট করলো পকেটে। কৌশিক, তার ছোট চাচা, কায়সার আর কাব্য খাটের পাশে গিয়ে তোফায়েল মির্জার অপেক্ষা করছিলেন কিন্তু তোফায়েল মির্জা ফোনে কিছু শুনেই চোখ বের হয়ে আসার জোগাড়। পাগলের মতো মাথা চাপড়ে বিড়বিড় করে হন্তদন্ত দৌড় লাগিয়ে ছুটলেন। বিরক্তিতে চোয়াল শক্ত করে কায়সার মির্জা রেগে গেলো। তার বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই সে এবাড়িতে তেমন আসা যাওয়া করে না তাছাড়া তার মায়ের সুস্থ পরিবেশের জন্য সে এ বাড়ি থেকে যথাসম্ভব দূরে থেকেছে। তিরিক্ষ মেজাজে উচ্চারণ করলো,

“কেমন কাণ্ডজ্ঞানহীন অমানুষ সে! নিজের স্ত্রীর জানাজা এভাবে ছেড়ে চলে যায় নাকি?”
কৌশিক তোফায়েল মির্জার যাওয়ার পথে চেয়ে মুখ ভার করে প্রহেলিকাময় উত্তর দিলো,

“হয়ত শুনেছে কোটি টাকার ইনভেস্টমেন্ট আগুনে ছাই হয়ে গিয়েছে নয়ত নোংরামি ফাঁস হয়ে গিয়েছে। তাছাড়া আমার মায়ের দাফন আমি তোফায়েল মির্জা ছাড়া করতে পারলেই খুশি।”
কৌশিকের রহস্যময় হাঁসির দিকে চেয়ে কায়সার হতবম্ব, শান্ত কৌশিকের মনে উত্তপ্ত ক্রোধের আগুনের টের পেলো সে। ভাইকে শান্তনা দিয়ে কাঁধ চাপরালো।

“বড় হয়ে গিয়েছিস কৌশিক, এবার মির্জা বাড়ির এই নোংরা পরিবেশ থেকে বের হওয়ার সময় হয়ে এসেছে।”

কৌশিক তার মায়ের লাশের দিকে চেয়ে খাট কাঁধে তোলার জন্য হাত বাড়ালো। বিনাবাক্যে কবরস্থানের খুঁড়ে রাখা কবরে মাকে চিরতরে শোয়ান করিয়ে ফিসফিস করে বললো,

“তোমার প্রতিটা ঘায়ের পরিবর্তে আমি তোফায়েল মির্জার পদতলে ধ্বংস খুঁড়ে রাখবো, মা। তুমি এবার নিশ্চিন্তে তোমার প্রশান্তির নিন্দ্রায় ঘুমো।”

***

(বর্তমান সময়)

“আমার বেড়ে উঠার পরিবেশ খুবই জঘন্য আর নোংরা ছিল কাশফি কিন্তু আমি আমার সন্তানের জন্য তার ভালো নিশ্চিত করে আমার সবকিছু ছাড়তে রাজি।”

এদিকে কাশফির চোখ হতে অঝোর ধরায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, তার খুব চাইছে মানুষটাকে জড়িয়ে ধরে মানুষটার জন্য হয়ে কাদতে। তার আবেগ প্রকাশে সে এতো নিষ্ঠুর কেনো? নিজের প্রতি এত নির্দয় কেনো সে?! নিজের কষ্ট যথাসাধ্য আড়াল করতে চাইলো কিন্তু তার অবাধ্য অশ্রু থামলো না। কান্না মিশ্রিত কন্ঠে ভাঙ্গা গলায় বললো,
“আপনি যেমন আছেন তেমন হলেই চলবে কৌশিক, আমি পরিবর্তন চাই না।”

কাশফির কান্না টের পেয়ে কৌশিক তাকে টেনে বুকে নেয় তারপর আলতো করে কপালে চুমু দিয়ে প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
কাশফি কৌশিককে জড়িয়ে ধরে কাদলো অনেকক্ষণ, ইশ, আগে কেনো তার কৌশিকের সাথে মুহুর্ত গুলো মনে আসলো না, তাদের পুনরায় দেখা হতে কেন এত দেরি হলো?
ভাবতে ভাবতে ভেজা চোখে কাশফি নিজের হাতে থাকা রিপোর্টের দিকে একবার চাইলো। সেদিন আতিকুর রহমান আর তার ডিএনএ পেটারনিটি টেস্ট করিয়েছে সে রেস্টাল্ট তিনদিনেই হাতে পেয়ে গিয়েছে তবে হাতে পাওয়া মাত্রই তার পুরো জগৎ উল্টে গিয়েছে। ডিএনএ রিপোর্টে কালো কালির বোল্ড অক্ষরে লিখা—

Probability of Paternity: 0%

The alleged father is excluded as the biological father of the tested child. This conclusion is based on the non-matching alleles observed at the loci listed above with a PI equal to 0. The alleged father lacks the genetic markers that must be contributed to the child by the biological father. The probability of paternity is 0%.

তার চোখের সামনে দেখা তার পুরো জীবন যেনো মুহূর্তেই উল্টে পাল্টে গেলো। আতিকুর রহমানের সাথে প্রতিটা স্মৃতি তার মস্তিষ্কে ফিকে হয়ে ঘুরতে লাগলো। সে আতিকুর রহমানের সন্তান নয় তবে কি চারুলতার না/জা/য়ে/জ সন্তান? ভাবতেই তার গা শিউরে উঠে। নিজেকে নিয়ে ঢের প্রশ্ন তার মনে কিন্তু একই দিন তার হাতে তার তার আল্ট্রাসনোগ্রাফি রেজাল্ট ও এসে পড়ে।
কাশফিকে ভাবনায় মশগুল হতে দেখে কৌশিক তার হাত থেকে ডিএনএ টেস্টের কাগজটা নিয়ে পকেটে ভরে ফেললো।

“খারাপ কোনো চিন্তা না আনাই ভালো কাশফি, যার কাছে তোমার প্রশ্নের উত্তর তার থেকেই জিজ্ঞেস করে নিও। আর তাছাড়া উত্তর যেমনই হোক তুমি আমার নীলাম্বরী হয়েই থাকবে।”
কাশফি কান্নার মাঝে হেসে ফেললো। কৌশিকের প্রশস্ত বুকে মাথা রেখে অল্পসরে সম্মতি জানালো, সে কৌশিক আর তার মাঝের এমন মুহুর্ত এসব ভেবে খা রা প করতে চায়না। কাল আতিকুর রহমানের অপারেশন করানো হবে তারপর তিনি সুস্থ হলেই জিজ্ঞেস করে নিবে কাশফি।

কিন্তু সবাই যেমনটা চিন্তা ভাবনা সাজিয়ে করে রাখে তেমনটা কি হয়? হয় না। ঠিক কাশফির বেলায়ও তেমনটাই ঘটলো।

#চলবে…

#অদৃষ্টের_মৃগতৃষ্ণা (৩৭) #লিখনীতে_প্রোপীতা_নিউমী

কলার টাই লুজ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাড়ির দরগোড়ায় দাড়ালো ফাহিম, কাপাকাপি তে নাজেহাল অবস্থা হয়ে দোয়া দুরুদ পাঠ করে বেল চাপলো। আতিকুর রহমানের মেয়ের জামাই কৌশিক মির্জা তা আগে জন্য থাকলে সিংহের গুহায় পা দিতো নাকি? তৎক্ষণাৎ পুরুষালি গমগমে সুর বিধলো ফাহিমের কানে।

“ইয়েস?”
কালো শার্টের হাত গুটিয়ে তুলে পেশল বাহু দিয়ে দরজা খুলতেই তির্যক ধূসর চোখের কৌশিকের দেখা মিললো, আধ খোলা দরজার ফ্রেমের পাশে দাঁড়িয়েকে সে। কৌশিকের প্রভাবশালী দেহজ্যোতি আর দৃঢ় অঙ্গভঙ্গি দেখে তার গলা শুকিয়ে কাঠ কাঠ। সে শুকনো ঢোক গিলতে লাগলো তারপর অমতা অমতা করে বললো,

“স্যার আমি ফাহিম।”

“কিসের হিম?”

“আমার নাম ফাহিম। চিনেছেন আমাকে?”

“চিনবো না কেনো? খেলনা মনে করে তো আমার জান নিয়ে খেলবে ভেবেছিলে, তাই না?!”
কৌশিকের নাস্তানাবুদ করার ধরন দেখে ফাহিম লজ্জায় মাথা নুইয়ে ফেললো। অস্বস্তিতে হাত মোচড়ামুচড়ি করে ক্ষিণ স্বরে বলতে লাগলো।

“না, স্যার আসলে…”

কৌশিক তার পুরো বাক্য শেষ হওয়ার অপেক্ষা করলো না, ভাবলেশহীন হয়ে বললো,
“আমার বাসায় এই মুহূর্তে তোমার আসার কারণ দেখছি না।”

“ঈশিতার সাথে…”
কৌশিক চোয়াল শক্ত করে তার শক্ত পোক্ত হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিলো তারপর ক্রুদ্ধ দৃষ্টি ফেলে চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করলো,

“ আমার ওয়াইফ, মিসেস মির্জা, তার সাথে দেখা করতে এসেছো তাই তো?”

কৌশিকের কথার ধরন দেখে ফাহিম বুঝে নিলো আজ তার খেল খতম। জড়োসড়ো হয়ে আড়ষ্ট ভঙ্গিমায় ত ত করে উত্তর দিলো,
“জ্বি স্যার ম্যাডামের সাথে দেখা করতে চাই।”

ফাহিমের সোজা সরল আবদার শুনে কৌশিকের মাথায় দপ করে আগুন জ্বলে উঠলো। তবুও নিজেকে শান্ত দেখিয়ে খোচা খোচা দাড়িতে হাত বুলিয়ে ভাবুক হওয়ার ভঙ্গি করে শুধলো,
“আমার ওয়াইফের সাথে তোমার দেখা করার কি এমন কারণ থাকতে পারে?”

“উনার বাবা কিছু জরুরি ডকুমেন্ট পৌঁছে দিতে বলেছিলেন।”

কৌশিক তৎক্ষণাৎ হাতের ফাইলটা দেখে হাত বাড়িয়ে ধরলো,
“এখন আপাদত আমার হাতে দাও, এই মুহূর্তে আমার মিসেস বাসায় নেই।”

এদিকে ফাহিমের অবস্থা খারাপ, কৌশিক মির্জার হাতে সে ফাইল তুলে দিতে চায় না কিন্তু না তুলে দিলে বিপদ। এমতাবস্থায় আগমন ঘটলো কাশফির, নরম গলায় চিকন মেয়েলী নমনীয় স্বর শুনতে পেয়ে ফাহিম স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো।
“কৌশিক কে এসেছে?”

কাশফি গলায় ওড়না পেচিয়ে নিয়ে দরজার কাছে গিয়ে দাড়িয়েই চমকে গিয়ে শুধলো — “ওহ! ফাহিম তুমি?”

ফাহিমের অবস্থা হ্যাবলাকান্তের মতো, কোনো উত্তর না দিয়ে মুখ হা করে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো কাশফির দিকে। চোখে মুখে কাশফির জন্য তৃপ্তি দেখে কৌশিকের ঠিক হজম হলো না। সে চোখ রাঙিয়ে তির্যক দৃষ্টি ফেললো ফাহিমের দিকে তারপর কাশফির কোমরে হাত পেচিয়ে শক্ত হাস্কী ভয়েসে বললো,

“ফাহিম বিদায় নিয়ে চলেই যাচ্ছিল, তাই না ফাহিম?”

মনে মনে ফাহিম একটা গালি দিলো কৌশিক কে, লোকটার বউকে তো সে আর তুলে ধরে নিয়ে যাচ্ছে না। এতো সাহস তার বুকে ছিলো ও না তবুও সে কৌশিকের কথায় সায় দিলো। কিন্তু আপত্তি জানালো কাশফি, কৌশিকের মতো এভাবে মেহমানকে তাড়িয়ে দেওয়ার মতো মানুষ সে না। ফাহিমের অস্বস্তি বুঝি কাশফি কৌশিকের দিকে চেয়ে চোখ পাকালো কিন্তু কৌশিক না দেখার ভান করে দাড়িয়ে রইলো।

“বাইরে কেনো দাড়িয়ে আছ, ভিতরে এসো, নাস্তা করে যাও।”

এখানে এক মুহুর্ত থাকার ইচ্ছে ফাহিমের নেই, তড়িঘড়ি করে ফাইল টা সামনে ধরে দ্বিরুক্তি জানিয়ে বললো,
“না না নাস্তা করবো না। আসলে তোমার বাবা আমাকে বলেছিলেন এস্টেটের চুক্তিপত্রটা তোমাকে পৌঁছে দিতে, সেটা দিতে এসেছি।”

কাশফি ভ্রু কুঞ্চিত করে ফাইলে চোখ বুলালো, কই বাবার বাড়িতে থাকাকালীন তার বাবা তো তাকে কিছুই জানায় নি। কাশফি ফাইল নিয়ে সৌজন্যতার খাতিরে মুচকি হেসে জানালো,
“ধন্যবাদ ফাহিম, তুমি কিছুক্ষণ বসলে খুশি হতাম।”

ফাহিম কোনরকম বিদায় না নিয়েই হুড়মুড়িয়ে পালালো। এদিকে ফাহিম যেতে না যেতেই কৌশিক ধড়াম করে সজোরে দরজা বন্ধ করে দিলো। এতো উচ্চ আওয়াজে লাফ দিয়ে কাশফি চমকে উঠলো। কৌশিকের শক্ত চোয়াল আর তিরিক্ষ মেজাজ দেখে কিছুক্ষণ চোখ পিট পিট করে চেয়ে কৌশিকের বাহুতে হাত রেখে নরম গলায় বললো,

“এই সকাল সকাল আপনার মুখে সন্ধ্যা নামার কারণ কী?”

কৌশিক কাশফির মুখের দিকে না চেয়ে, মুখ ভার করে উত্তর দিলো,
“আমিও ঠিক তো তোমার খুশির কারণ ধরতে পারছি না?”

কৌশিকের কথায় হতবম্ব বনে গেলো কাশফি,
“আমি আবার খুশি কবে হলাম?”

“বলছিলে না ফাহিম কে সে বসলে তুমি খুব খুশি হতে!”

“ধুর, সেটা তো কথার কথা ছিল!”
কাশফির কথায় কৌশিকের রাগ কমলো না তার উপর সকাল সকাল ফাহিমের দেখা পেয়ে এমনিতেই মন বিষিয়ে উঠেছে। কৌশিক ঠাট্টা স্বরুপ ভাব ভঙ্গি করে মাথা নাড়ালো তারপর বিদ্রুপের হাসি হাসলো।

“তাই না? আর আমি কিছুক্ষণের জন্য ভাবতে বসেছিলাম যে আমার ওয়াইফ ফ্লার্ট করছিল।”

“হেঁয়ালি করবেন না, কৌশিক। আপনি নিজেও অবগত যে আমি ফ্লার্ট করতে জানি না।”

কৌশিক তৎক্ষণাৎ খপ করে কাশফির হাট ধরলো তারপর ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমির হাসি ঝুলিয়ে মিনমিনে কণ্ঠে শুধলো,
“শিখিয়ে দিব?”

কি এক পাজি! তবে কাশফি আড়ষ্ট হলো বরং কৌশিকের বাম কাঁধে হাত রেখে আদুরে ভঙ্গিমায় বুলিয়ে দিলো। মায়াবী চোখ দিয়ে কৌশিক কে চিত্তগ্রাহী দৃষ্টিতে বেঁধে প্রলোভনসঙ্কুল গলায় আবদার করে বসলো,

“তবে দিন, ঠিক আপনাকে জব্দ করার মতো করে শিখিয়ে দিন।”

কৌশিকের ঠোঁটের কোণের পাজি হাসি আর গাঢ় হলো। মিটিমিটি হেঁসে সে লোভনীয় হাড়কাঁপানো শিরশিরী পুরুষালি হাস্কী কণ্ঠে বললো,
“মিসেস কৌশিক মির্জা আমি তোমার তিনবেলা ফরজ গোসলের কারণ হতে চাই তাছাড়া তিন বেলা একসাথে গোসল করে তুমি কী ফরজ এবং সুন্নত পালন করতে প্রস্তুত?”

কাশফির নিঃশ্বাস আটকে এলো যেনো, শিরদাঁড়া বেয়ে হিম হিম প্রবাহ বয়ে গেলো, প্রবল উত্তেজনায় তার র/ক্তচা/প বেড়ে গেলো। প্রথম প্রণয়ের অবাধ্য দুষ্ট মিষ্টি লাজুক হাসি দেখা দিলো তার ঠোটে। পরপর লজ্জায় কেঁপে উঠে হাসি থামাতে নিচের ঠোঁট দাত দিয়ে কা/ম/ড়ে ধরে নিজেকে আয়ত্তে এনে কৌশিকের কাধে চাপড়ে মিনমিনে স্বরে বললো,
“বেহায়া কোথাকার!”

গাল ভরা লাজুকতা নিয়ে কাশফি পালাই পালাই করে কৌশিক থেকে সরে আসতেই কৌশিক ওড়নার কোনা ধরে ফেলে আবারো তার নারী সত্তা দুর্বল করার কণ্ঠে ডেকে উঠলো,
“আর শোনো!”

“বলুন।”

“আমায় তুমি করে ডাকো তো, ম্যাডাম!”

কাশফির কি যে লজ্জা লাগলো, তার মনে হলো সে সদ্য কিশোরী আর তার আবেগের বয়সে সে আবেগে ভাসছে দেখেই তার স্বামী নামক দুষ্ট পুরুষটা তার মন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। কাশফির বুকের উঠানামা বাড়ল, পিছনে হটে কৌশিকের একেবারে কাছে সে লাজুক হাসে তারপর আলতো করে তার হাত দিয়ে কৌশিকের মুখে ছুঁয়ে কানের কাছে ঘোর লাগা কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বললো,

“কৌশিক মির্জা, তুমি এই কাশফির দ্বারা সিলমোহর করা তার ব্যক্তিগত অসভ্য পুরুষ!”

স্ত্রীর এমন আবেশে মাখানো স্বর কৌশিকের মতো পাকাপোক্ত এক পুরুষকে কাবু করতেই যথেষ্ঠ। তৃপ্তিতে উদ্ভাসিত হয়ে কৌশিক আজ মন খুলে হাসলো আর সেই ফাঁকে তার লাজুক বিহঙ্গিনী তাকে কথার মায়াজালে বেঁধে ওড়না হাত থেকে নিয়ে উড়ে পালালো।

***

ঘুমন্ত আতিকুর রহমানের বেডের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে কৌশিক সূক্ষ্মভাবে পরখ করতে ব্যাস্ত। এই কয়েকদিনে আতিকুর রহমানের জ্ঞান ফিরেছে তবে তিনি সম্পূর্ন হুসে ছিলেন না, কথাবার্তায় রেসপন্স ছিল হুঁ হা পর্যন্তই। ফিজিক্যাল কন্ডিশন ভালো বিধায় ডাক্তার আজকের মধ্যে অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিলেন। কৌশিক হসপিটালে পৌঁছালো মাত্র, এসে ডক্তরের সাথে কথা শেষে কেবিনে এসে বসলেন মাত্র। ভাবনা চিন্তায় মশগুল হয়ে আতিকুর রহমানের স্থির চোখের পাতার দিকে চেয়ে সপ্তাহ খানেক আগের কথা ভেসে আসলো কৌশিকের চোখে।

যেদিন সৌরভ সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দ্যেশে নিয়ে নাইট ক্লাবে এসেছিল সেদিন ক্লাবে উপস্থিত ছিল আতিকুর রহমানও। ভিআইপি দিকটায় তেজস্বিনীর ড্রেসিং রুম হতে বের হতে দেখা গিয়েছিল আতিকুর রহমানকে। তিনি ফেইস পেইন্ট করা ছদ্মবেশী কৌশিক কে চিনতে পারেন নি বোধহয়। দুজনের চোখে চোখ পড়েছিল কেবল এরপর তারা দুজন একইভাবে চোখ সরিয়ে নেয় যেন কেউ কারো পূর্ব পরিচিত নয়। তারপর কৌশিক নিজের কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো আর আতিকুর রহমান ক্লাব থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন। ব্যাস সাক্ষাৎ এইটুকুই স্থায়ী হয়েছিল।

নিজের ইউজুয়াল ক্ষমতাধর আভা নিয়ে কা’ম আর ক্যালকুলেটেড ভঙ্গিমায় অটল হয়ে দাড়িয়ে থাকা কৌশিক কিছুটা ঝুঁকে আতিকুর রহমানের কানের কাছে গিয়ে ফিস ফিস করে বললো,

“আপনি সত্য প্রকাশ করেও নিজের অনুশোচনা থেকে মুক্তি পেতেন জনাব, কিন্তু আপনি তো নিজে থেকে নিজের মুক্তিই চেয়ে বসলেন।”

আতিকুর রহমানের কোনো হেলদোল দেখা গেলো না তবে মনিটরে হার্টরেট বাড়তে দেখা গেলো। কৌশিক আবার সোজা হয়ে গেলো তারপর নিঃশব্দে কেবিন ত্যাগ করলো।

***

কাশফি গোসল সেরে হসপিটালে যাওয়ার জন্য তৈরী হতে লাগলো। চোখের সামনে ফাইলটা দেখে একবার ভাবলো উল্টে পাল্টে দেখবে পরক্ষণে সময়ের দিকে চোখ ফেলতেই সিদ্ধান্ত পাল্টে আলমারিতে তুলে রাখার জন্য এগিয়ে চললো। ডকুমেন্ট গুলো একসাথে করে ফাইলটা আলমারিতে রাখতে যাবে তখন ফাইল থেকে একটা খাম নিচে পড়ে গেলো। কাশফি যখন ড্রয়ারে ফাইলটা রেখে খাম তুললো তখন খামের উপর আতিকুর রহমানের হাতের লিখা চোখে পড়লো, কালো কালিতে ‘কাশফি’ নামটা লিখা।
কাশফি নিজের ডাক নাম দেখে কিছুটা বিব্রত হলো, তার বাবা কখনো ভুল করেও তাকে এই নামে ডাকেন নি। তাছাড়া কৌশিক ছাড়া এই নামে সম্বোধন করা তার জন্য সচ্ছন্দ্যের বাইরের বিষয়। কাশফি খাম থেকে কাগজ বের করে ভাঁজ খুলতেই নজরে আসলো তার বাবার একই সাইজের ছোট ছোট অক্ষরের টানা হাতের লিখা। কাশফি চোখ বুলিয়ে পড়তে লাগলো পুরোটা…

“প্রিয় মেয়ে আমার,
আমার মা ছাড়া মেয়েটার পাশে তুমি সর্বদা ঢাল হয়ে দাড়িয়ে ছিলে তার জন্য চির কৃতজ্ঞ আমি। কিন্তু আমার একমাত্র সন্তানের এতো বড় বেইমানি আমি নিতে পারিনি, অথচ তার বড় হয়ে উঠা নিয়ে ভীষণ ভয়ে ছিলাম বলেই চারুলতাকে ছেড়ে নিজের মেয়েকে নিয়ে একা বাঁচতে চেয়েছি। তারপর আমার মেয়েটা আমাকে ছেড়ে হারিয়ে গেলো বহুদূর আর সেই মুহূর্তে তোমার মাঝে আমি আমার মেয়েকে দেখে বসি। পরিস্থিতি আর অবস্থার সুযোগ নিয়ে তোমার নতুন পরিচয়ে তোমাকে বড় করে তুলি। অথচ ভুলতে বসেছিলাম আমার পাগলামি আর হীন মানসিকতা একটা সন্তানকে তার পরিবার, পরিজন চিনতে দিলো না। আমার সাজানো মিথ্যে তার জন্য মানসিক অশান্তির কারণ হয়ে বসলো। আমার সাজানো নাটক আর মিথ্যে ঢাকতে ঢাকতে হাঁপিয়ে উঠেছি আমি।
এখন মনে হয় আমার মতো একজন প্রতারক পৃথিবীতে না থাকলেই হতো। আমি মনে প্রাণে তোমাকে আমার মেয়ে মানি, তোমার জন্য চিঠি লিখতে বার বার হাত কাপছে, এসব মুখে বলার সাহস আমার নেই। হয়ত তোমার ক্ষমা নাই বা পেলাম কিন্তু তোমার এই বাবাকে কখনো ঘৃনা করো না। আমার ছোট কায়েসের খেয়াল রেখো।

ইতি,
মেজর আতিকুর রহমান।”

চিঠিটা পড়ে শেষ করা মাত্রই কাশফির গলায় কাটা বিধলো যেনো, হুট করেই যেন মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় পৌঁছে গেলো। সে আতিকুর রহমানের মেয়ে নয়, আতিকুর রহমানের নিজের মেয়ে অন্যকেউ। সে আতিকুর রহমান আর চারুলতা দম্পতির মেয়ে নয়, তাহলে কি তার জন্মপরিচয় পরিচয়? কে তার বাবা মা? কোন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন আতিকুর রহমান তাকে? এক ঝাঁক প্রশ্ন আর আতঙ্ক বিরাজ করছে তার মাঝে। আতিকুর রহমান তার পরিচয় গোপন রেখে কি তার জীবন নিয়ে খেলছিলেন?

বেশি কিছু ভাবতে পারলো না কাশফি ফোন বেজে উঠলো তার, হাতে নিয়ে কৌশিকের নাম্বার দেখে কিছু না ভেবেই কল রিসিভ করলো,

“কাশফি, তোমার বাবার অবস্থার অবনতি দেখা দিয়েছে। আগে বলে রাখছি কোনো হুলুস্থুল কান্ড বাঁধবে না ড্রাইভারকে বলে রেখেছি আস্তে ধীরে এসো।”

কৌশিক কল কেটে দিলো কিন্তু কাশফির মন মানসিকতা অত্যন্ত বিক্ষিপ্ত পর্যায়ে আছে। সে পাগলের মতো ছুটে এসে গাড়িতে উঠলো তারপর ড্রাইভার কে তাড়া লাগালো হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার জন্য। গাড়ি স্টার্ট হওয়ার পর পরই কাশফি আবার কৌশিকের কাছে কল লাগলো। কল রিসিভ হতেই কাশফি মিনতির সরে বললো,

“কল কা/টবেন না প্লীজ আমি গাড়িতে আছি। বলুন, বাবার কি হয়েছে?”

“তোমার বাবা ঘুমের মধ্যে স্ট্রোক করে বসেছেন। স্ট্রোক গুরুতর হওয়ায় অবস্থা আশঙ্কাজনক এই মাত্রই আইসিইউ তে শিফট করানো হয়েছে তাকে।”

কাশফি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো, একদিকে তার বাবার প্রতি খারাপ লাগা অন্যদিকে চিঠি পড়ে দুর্দশায় ভুগছে সে। কোনো রকম বললো ড্রাইভার কে দ্রুত পৌঁছানোর কথা।

এদিকে হাসপাতালে কৌশিক এক দৌড়ের উপর থাকায় ফোন রিসিভ করতে অক্ষম। লেভিন কৌশিককে নাম্বারে না পেয়ে হসপিটালে কল করে, স্টাফ কৌশিককে বিষয়টা জানানো মাত্রই কৌশিক বেশ বিচলিত হলো পরক্ষণে লেভিন কে কল ব্যাক করে,

“বস আপনার গাড়িতে বম ফিট করা আপনি যদি গাড়িতে থাকেন এক্ষুনি নেমে পড়ুন!”
হুড়মুড়িয়ে দ্রুততার সাথে বলা লেভিনের কথা কৌশিকের কানে আসতে সময় লাগলো না তবে বোধগম্য হতে সময় নিলো। আসার সময় নিজের ড্রাইভার আর কালো গাড়িটা কাশফির জন্য রেখে এসেছিল যেনো কাশফির পৌঁছাতে কোনো অসুবিধা না হয়। কৌশিকের টনক নড়লো, আতঙ্কে চোখ জোড়া বড় বড় করে তিরিক্ষ মেজাজে বললো,

“লেভিন!!! গাড়িতে কাশফি উঠেছে শীট! শীট শীট শীট!!!”
কৌশিক মাথার চুল খামচে ধরলো। তার মাথা ফাকা ফাকা লাগছে, কানে বিশ্রী রকমের ভোঁ ভোঁ শব্দ করছে যেনো মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। কোনো উপায় না দেখে সে দৌড়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠলো।

“আমার কাশফি প্রেগনেন্ট লেভিন! তুমি গাড়ি নিয়ে বের হয়ে দ্রুত তার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করো আমি বের হচ্ছি।”
পরাজিত সৈনিকের ন্যায় কৌশিকের দুর্বল স্বরের অগোছালো বাক্য শুনে লেভিনের বুক কাঁপলো। কাশফি একা কৌশিকের দুর্বলতা সে জায়গায় নতুন একজন মানে কৌশিকের জীবনের এক টুকরো সর্গ। হতবুদ্ধ হয়ে কৌশিককে সান্ত্বনা দিয়ে শুধু বললো,

“সব ঠিক হয়ে যাবে, বস।”

“এমনই হোক।”

গাড়িতে ট্র্যাকার ছিল বলেই কৌশিকের তেমন অসুবিধা হলো না সে অতি দ্রুত পৌঁছে গেলো সেখানে তবে পৌঁছানো মাত্রই তার চোখের সামনে তার কালো গাড়িটা দাউ দাউ করে জ্বলতে দেখলো। কিছুক্ষণের জন্য তার মনে হলো সে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো, হাত পা অসাড় হয়ে এসে বুকের ভীতির সঞ্চার হলো সেই দগ্ধ আগুনের উত্তাপ। একবুক হাহাকার আর চোখে ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে এগিয়ে চললো সে।

***

“আপনি কিভাবে জানতেন আমার গাড়িতে বম ফিট করা ছিল?”
তেজস্বিনী ড্রাইভিং করতে করতে পাশের সিটে বসা স্তম্ভিত হয়ে থাকা কাশফিকে চেয়ে নেয় তারপর মুচকি হাসি দিয়ে জানালো,
“তোমার উপকারেই আমি এখনো বেশ আছি। তোমার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা এই জীবনেও শেষ হবে না।”

চোখের সামনে গাড়িটা আগুনে পুড়তে দেখে কাশফির চোখে মুখে আতঙ্ক এখনো বিদ্যমান, বুকের উঠানামা বেগতিক। এইটুকু বুঝতে পারলো যে কৌশিকের ক্ষতি করার জন্য কেউ উঠে পড়ে লেগেছে। তেজস্বিনী কে কেবল একবার দেখেছিল তাও কলেজের সামনে, একে অপরের সাথে ধাক্কা খেয়ে বই পড়ে যাওয়ায় তেজস্বিনী বই হাতে তুলে দিয়ে হেসে প্রস্থান করেছিল। কাশফি বেশ বিব্রত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“আপনি কি আমার পরিচিত কেউ?”

“একসময় আমরা প্রাণপ্রিয় বান্ধবী ছিলাম, মনে পড়ে আমার কথা?”

প্রাণপ্রিয় বান্ধবী? চট করে তার মাথায় ধরলো,
“তুমি আরিয়ানা মেহনাজ কাশফি?”

“নিজেকে কেনো খুঁজছিস?! আমার চিঠি পেয়েও বুঝি বুঝলি না?”

তেজস্বিনীর কথার ধাঁচ শুন কাশফির চোখে রাজ্যের বিস্ময়। তার তুমি থেকে তুই এ পরিবর্তন বেশ অগোছালো এবং বেমানান লাগলো। এই মেয়েই কী বুঝাতে চাইছে, সেই কী চিঠির আগন্তুক ছিল? অনেকটা ভরকে গিয়ে ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে আওরালো
“কী?”

কাশফিকে দ্বিতীয় দফায় অবাক করে তেজস্বিনী খিলখিলিয়ে হেসে ফেললো।

“আমি ঈশিতা ইমরোজ কাশফি, এবার চিনেছিস তো আমাকে, আরিয়ানা?”

#চলবে…