অদৃষ্টের মৃগতৃষ্ণা পর্ব-৩৮+৩৯

0
142

#অদৃষ্টের_মৃগতৃষ্ণা (৩৮)
#লিখনীতে_প্রোপীতা_নিউমী
(অতীত)

‘Dissociation is a mental process of disconnecting from one’s thoughts, feelings, memories or sense of identity.’
অর্থাৎ ডিসএসোসিয়েশন হলো একজন মানুষের চিন্তা, তার অনুভূতি, নিজ স্মৃতি বা তার নিজ পরিচয়ের অনুভূতি থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার একটি মানসিক প্রক্রিয়া। ডিসএসোসিয়েশন একপ্রকার মানসিক ব্যাধি একে ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার বলা হয়ে থাকে। আর এই আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার হলো নিজের পরিচয় নিজেই ভুলে যাওয়া।
কোনো খা’রাপ স্মৃতি, বাল্যকালের কিংবা যৌবন কালের ট্র’মা অথবা কোনো সাংঘা’তিক দুর্ঘ’টনা মানুষকে এই অবস্থানে পৌঁছে দিতে পারে। এমতাবস্থায় স্মৃতিশক্তি হ্রাস পেতে থাকে আর আগের স্মৃতি মুছে স্মৃতির শূন্যস্থান পূরণের লক্ষ্যে সম্পূর্ন নতুন স্মৃতি যুক্ত হতে থাকে। তবে কি মানুষটার আসল স্মৃতি কি পুরোপুরি মুছে যায়? আদো কি তা সম্ভব! না।

কিশোরী আরিয়ানা মেহনাজ কাশফির জীবনেও এমন কালো অধ্যায় নেমেছিল যা তাকে নিজের ব্যক্তিত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। মর্মান্তিক অতীত ভুলে বেঁচে থাকার জন্য সে সব ভুলে যায় আর তারপর ধীরে ধীরে সে নিজেকে তার মৃত বান্ধবী ঈশিতা ইমরোজ কাশফি মনে করতে থাকে। তার এই মানসিক অবস্থা উন্নতি হতে পারত যদি না আতিকুর রহমান মৃত বন্ধুর ওয়াদায় আবদ্ধ হতেন।

পুরো কাহিনীটা শুরু হয় একটা মধ্যাহ্নে চায়ের আলাপের মাধ্যমে। আরিয়ানা মেহনাজ কাশফির বয়স তখন সবে মাত্র পাঁচ বছর, এই সময়টা কাশফির মা অপরাজিতা মেয়ের সাথে বাগানে বসে সময় কাটাতে পছন্দ করেন। তার ছোট্ট বাগানটায় হরেক রকমের পুষ্পের গাছগাছালি। উচুঁ ভূমির এই এলাকাটা নানা রঙের পুষ্পের ছড়াছড়ি বলেই এই এলাকা পুষ্পকুঞ্জ নামে বহুল পরিচিত।

“সামনের মাসের শিপমেন্ট নিয়ে ভেবেছ কি, আবরার?! ডিল ফাইনালাইজ তোমার থেকে ভালো কেউই করতে জানে না।”
আবরার কবির মৌন রয়। ইমপোর্ট এক্সপোর্ট বিজনেস ছাড়াও তাগড়া যুবকালে অ’স্ত্রের ব্যবসা ছিল তার, তাছাড়া বন্ধু তোফায়েল মির্জার সাথে রাজনীতিতে একই পার্টির সদস্য তারা। তবে আবরার কবীর এখন মেয়েটার দিকে চেয়ে সব কিছু থেকে বেরিয়ে একটা স্টেবল পজিশনে থাকতে চান, যেখানে প্রতিনিয়ত ভয় নিয়ে কাটাতে হবে না। মেয়েটার একটা সুন্দর ভবিষ্যত সুনিশ্চিত করতে চান তিনি।

“আমি সবকিছু থেকে অবকাশ নিতে চাই, ছোট্ট একটা জীবন নির্দ্বিধায় কাটাতে চাই।”

“বলতে কি চাইছ তুমি?”
শব্দ করে চায়ের কাপ পিরিচে রাখলেন তোফায়েল, তার কপালে চিন্তার গাঢ় ছাপ আর চোখের তীক্ষ্ণতা।

“আমি ইমপোর্ট এক্সপোর্ট বিজনেস থেকে সরে আসতে চাই।”

আবরার কবির কী জানতেন নাকি বন্ধুকে কে বলা সহজ সাবলীল কথার চড়াদাম শোধ করতে হবে। তোফায়েল মির্জা স্বার্থ ছাড়া এক পাও আগায় না, আবরার কবীর একজন বিচক্ষণ মানুষ দেখেই কেবল মাত্র তাকে তোফায়েল মির্জা নিজের পার্টনারশিপ অফার করেছিলেন। ব্যবসার সত্তর শতাংশ মুনাফা তোফায়েল মির্জার ইলিগ্যাল ধান্ধা থেকেই হয়ে থাকে। আবরার কবীরের কথা তাই তার ভীষণ অপছন্দ হলো, রুষ্ট হলেন তিনি।

“ভেবে দেখো আবরার, সবকিছু এত সহজে ছাড়া ঠিক হবে না।”

কিন্তু আবরার কবীর নিজের সিদ্ধান্তে অনড় রয়, ধীরে ধীরে নিজের লিগ্যাল বিজনেস গুলো গুছিয়ে সামলে নিতে থাকলেন, কিন্তু তোফায়েল মির্জার কথা অমান্য করায় কিছুটা হিমশিম খেতে হচ্ছিল।

এরমধ্যে, কাশফির বয়স যখন সাত তখন আবরার কবীরের ঘরে একটা ছেলে সন্তান আহনাফ আসে। কিন্তু জন্মের পর থেকেই আহনাফ বেশ দুর্বল ছিল। কাশফির ভাইয়ের যখন সাত মাস তখন অপরাজিতা টেস্ট করিয়ে জানতে পারলো তার বাচ্চাটার ফুসফুসে টিউমার ধরা পড়েছে। ডাক্তারের মুখে এটা শোনার পর সেদিন তিনি বোধহয় ভেঙে পড়েছিলেন।

বিধি বাম, সেদিন হসপিটাল থেকে আসার সময় তাদের সাথে দুর্ঘটনা ঘটলো আর তৎক্ষণাৎ স্পট ডেথ হয়ে যায় কাশফির সাত মাসের ভাই আহানাফের। অপরাজিতা আর কাশফি আহত হলেও অপরাজিতা মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। কাশফীর জ্ঞান ফিরে পেলেও অপরাজিতার অবস্থা আরো বিগড়ে যায়। তাই তাকে পরবর্তীতে আই সি ইউ তে শিফট করানো হয় কিন্তু ঠিক হয়ে উঠা হলো না তার। সন্তান হারিয়ে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন, চূড়ান্ত পর্যায়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে অপরাজিতা কাশফির সাথেও যেমন তেমন রকমের আচরণ করে বসতেন। এসব আবরার কবীরের নজরে আসা মাত্র সে অপরাজিতাকে মেন্টাল এসাইলামে ভর্তি করিয়ে দিলেন।

এদিকে আবরার কবীর রোড অক্সিডেন্টের পিছনে কার হাত জানতে তদন্তে নামলে জানতে পারেন যে তোফায়েল মির্জার বড় ছেলে মুশফিকুর রহমান কিনান মির্জার ম’দ খেয়ে মাতাল হয়ে ড্রাইভ করার ফলে সেদিন গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এমন দুর্ঘটনা ঘটিয়েছিল।
তার মাথায় রক্ত চড়ে বসে তিনি এসব নিয়ে কোর্ট পর্যন্ত যেতে চাইলেন কিন্তু তোফায়েল মির্জার টাকা আর ক্ষমতার দাপটে সব গুড়িয়ে দিলো। এমন বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েও তিনি জেদে আটকে রইলেন, নিজের সবকিছু দিয়ে তিনি বহু কষ্টে এই কেস কোর্ট পর্যন্ত নিলেন কিন্তু আফসোস অপরাধী তার চোখের সামনে সুখের জীবন কাটাচ্ছিল।

নানা মারা যাওয়ার পর থেকে কাশফির নানা বাড়ি যাওয়া এক প্রকার বন্ধ হয়ে গেলো। তার ভরসা যোগ্য জুন ভাইয়া মানে তার কাজিন জুনায়েদের সাথেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। জুনায়েদের বাবা সুমন শিকদার একপ্রকার বোন অপরাজিতার সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছিলেন যেন।

সবকিছু উলট পালট হয়ে যায়, কি করে যেনো দুই শত্রু পক্ষের চোখে অগোচরে গিয়ে কাশফি আর কৌশিকের দেখা হয়ে গেলো। খুবই আকস্মিকভাবে দেখা হলো তাদের। একে অপরের নাম না জানা বন্ধুত্ব এভাবে চলতে থাকলো। একাকীত্ব অবসান করার চেষ্টায় দুটো মানুষ একে অপরের সময়টুকু সুমধুর করে তুললো।

আরিয়ানা মেহনাজ কাশফির বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল ঈশিতা ইমরোজ কাশফি। ঈশিতার মা চারুলতা ছিলেন ক্লাব, পাব, টাকা, অভিজাত নিয়ে ব্যাস্ত। ঈশিতার অর্থবহুল, চোখ ধাঁধানো সুদর্শন সব পেইন্টিং তিনি টাকার পরিবর্তে মোটা অংকের টাকায় বিক্রি করে দিতেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে থাকায় আতিকুর রহমান খুব একটা আসতে পারতেন না তবে চারুলতার পরকীয়ার ব্যাপারে জানার পর তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় আর আতিকুর রহমান ঈশিতার সম্পূর্ন কাস্টাডি পেয়ে গেলেন। একদিকে চাকরি ছাড়তে পারছিলেন না অন্যদিকে মেয়ের ভবিষ্যত নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেলেন তখন খুব কাছের বন্ধু আতিকুর রহমানের শরণাপন্ন হন। আবরার কবীর জানালেন তার মেয়েটাও একা তারা একসাথে থাকলে বেশ ভালো হয়। এরপর ঈশিতা আর কাশফি একসাথে থাকতে শুরু করলো আর তাদের বন্ধুত্ব গাঢ় হলো।

ট্রমাটিক কারণে ঈশিতা একেবারেই কথা বলতো না, স্কুলের সবাই তাকে মুকবধির ভেবে এড়িয়ে চলতো কিন্তু কাশফির সাহায্যের হাত পেয়ে সে কাশফিকে আকড়ে ধরে তার ছায়ার মতো হয়ে গেলো। এরপর আতিকুর রহমান পার্মানেন্টলি চাকরি ছেড়ে ঈশিতাকে নিয়ে থাকতে শুরু করলেন, তবুও মাঝে মাঝে বান্ধবীর সাথে দেখা করতে আসা হতো ঈশিতার।

চৌদ্দ বছর বয়সী কাশফির মনে যখন আবেগী প্রেমের নীল পদ্ম ফুটলো ঠিক তখন আবরার কবীরও মেয়ের অস্বাভাবিক আচরণ টের পেলেন, জানতে পারলেন তোফায়েল মির্জার ছেলে কৌশিকের সাথে গাঢ় বন্ধুত্ব তার। তৎক্ষণাৎ তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো যেনো। এরপর থেকে তিনি কাশফির সবকিছুতে পা বন্ধী করে দিলেন, খুব একটা বের হতে দিতেন না। নানান বিধি নিষেধে কাশফিকে আটকে রাখলেন।

তবুও বাবার চোখে ফাঁকি দিয়ে কাশফি শুধু মাত্র নাম জানার জন্য কৌশিকের কাছে ছুটে গিয়ে যখন জানতে পারলো কৌশিকের বাগদত্তার ব্যাপারে সে পুরোপুরি ভেঙে গেলো। সেদিন যে চশমা পরা লোকটা তাকে ইভেন্টে নিয়ে যায় সে অন্য কেউ নয় লেভিন আফসার ছিল।

আর লেভিন আফসার আবরার কবীরের সাহয্যে নয় বরং নিজের স্বার্থে কাশফিকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল সেদিন।

***

নয় বছর আগে কৌশিকের এঞ্জেইজমেন্ট ইভেন্টের দিন:

“প্রেম করছো?”
কৌশিক মাত্র গোসল সেরে বের হওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিল, এমতাবস্থায় তোফায়েল মির্জা তার কক্ষে প্রবেশ করে প্রশ্নবিদ্ধ চাউনিতে আবদ্ধ করলো।

“নিজের কাজ বাদ দিয়ে হঠাৎ আমায় নিয়ে এতো মাথাব্যাথা?”
কৌশিক গমগমে সুরে পাল্টা প্রশ্ন করলো তারপর যে চেয়ারে তোফায়েল মির্জা বসার জন্য এগিয়ে আসছিলেন তা পা দিয়ে স্মুথলি স্লাইড করে সরিয়ে দিলো যাতে তোফায়েল মির্জা না বসতে পারেন। তোফায়েল মির্জা রাগলেন না, বরং মেকি হাসি হেসে অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে চাইলেন।

“কৌশিক, মানুষ কখন কথা ঘুরায় জানো? সত্য বেরিয়ে আসলে সেটা ঢাকার জন্য।”

কৌশিক অনর্থক একটা হাসি হেসে বুকের উপর হাত ভাঁজ করে, তারপর চোখ কিঞ্চিৎ ছোট ছোট করে গম্ভীর গলায় উত্তর দিলো,
“আমি তো তোমাকে ক্ষিপ্ত করার জন্য কথা বাড়াচ্ছিলাম। তাছাড়া সব কিছু নিয়ে তোমার ওভার কনফিডেন্স থাকাটা তোমার ব্যক্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে!”

“কেমন প্রশ্ন?”

“পুরুষ মানুষের বেলায় ইনসিকিউরিটি মানায় না, তাই না?”

“আমার ছেলে হয়ে তুমি আমার পুরুষত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছো? এত স্পর্ধা?!”

তোফায়েল মির্জার মুখ লাল হয়ে এলো এতে কৌশিক দাত বের করে সিনিস্টার রকমের দুর্বৃত্ত হাসি হাসলো। তার বাবার সাথে তার মাইন্ড গেইম খেলতে ভীষণ ভালো লাগে, এই যে সে তার বাবাকে রাগিয়ে দিয়ে মুখোশ খুলে ফেললো এটা পৃথিবীর সবচেয়ে ভ’য়া’বহ রকমের থ্রিলিং একটা কাজ। তার হাড়ে হাড়ে, র’ক্তে র’ক্তে ম্যানিপুলেশন।

“রুম থেকে বেরুবে? নাকি সকাল সকাল বুকে বুলেট নিতে ইচ্ছে করলো।”

কৌশিক কাভার্ডের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো তারপর নিজের কাজে এমন ভাবে নিয়োজিত হলো যেনো আসে পাশে করো তোয়াক্কা নেই তার। তোফায়েল মির্জা চমকপ্রদ হয়, নিজের ছেলে কৌশিকের প্রতি ঈর্ষাও হয় তার! এতো নিখুঁত ফাদ কিভাবে ফেলতে পারে সে?! কিভাবে এতো নিপূণভাবে মানুষকে কায়দায় ফেলতে পারে সে?!
“আমার ম্যানিপুলেশন আর্ট দিয়ে তুমি আমাকে রপ্ত করছো?”

কৌশিক হাত ঘড়ি পরে শ্রাগ করে বললো,
“অজগরের বাচ্চা অজগর হবে, কোনো কুকুর হবে না যে লেজ নাড়িয়ে নাড়িয়ে তোমার আগে পিছে ঘুরবে!”

ছলাৎ করে জ্বলে উঠলো তোফায়েল মির্জা, যেনো কেউ গরম তেল তার গায়ে ঢেলে দিয়েছেন। কৌশিকের কথার আপেক্ষিক অর্থ তিনি ভালো করেই বুঝেছেন। বেশ ক্ষুদ্ধ হয়ে বড়বড় কদম ফেলে কৌশিকের কাছে এসে দাড়ালেন তারপর খ্যাক খ্যাক করে বললেন,

“কিনান তোমার বড় ভাই তাকে সম্মান করতে শিখ!”

কৌশিক টাই চুস করতে হিমশিম খাচ্ছে, আজ মুড তেতো হয়ে থাকায় পরক্ষণে নিজের সবচেয়ে অপছন্দনীয় টাই বেঁধে গলায় আটকে নিতে নিতে বললো,
“যতটুকু সম্মান আছে জানাজায় শরিক হয়ে কবর খোঁড়ার জন্য রেখে দিলাম। আর কিছু বলবে?”

“আরিয়ানা কে খুব পছন্দ করো তুমি, না?”
কৌশিকের চোয়ালের একটা পেশী বোধহয় নড়লো, তবে তার চোখে চাউনি, ভাষা কিংবা মুখভঙ্গি পরিবর্তন হলো না। সে এখনো নিজের কাজে খুবই ব্যাস্ত, তোফায়েল মির্জার কথার দাম দেওয়ার সময় কই?

“তোফায়েল মির্জা, সময় তো আমি বাধ্য হয়ে তোমার সাথেও কাটাই, yet I loathe you.”

কৌশিকের স্ট্রেট ফরোয়ার্ড কথায় তোফায়েল মির্জার খারাপ লাগলো না বরং তিনি সূক্ষ্মভাবে পরখ করলেন কিন্তু এই ছেলের ঠোঁট নড়ে কিন্তু মুখে অনুভূতি খেলে না। কেমন অদ্ভুত খোলস! কি এক শক্ত অভিব্যক্তি তার, অবলীলায় মিথ্যে বললেও হয়ত খাটি সত্য মনে হবে।

“যেহেতু তুমি অস্বীকার করছো তবে জানিয়ে রাখি, আজ বিকেলে তোমার অফিসিয়াল জয়েনিং এর সাথে তোমার সারপ্রাইজ এনজেইজমেন্ট পার্টির আয়োজন করা হয়েছে।”

এমন নামের সম্পর্কের কোনো ভিত্তি নেই, লোক দেখানো বিয়ে বলে এদের। কৌশিক তোয়াক্কা করলো না, মাথা নেড়ে নির্বিঘ্ন কণ্ঠে কেবল শুধলো,
“কার সাথে?”

“বুশরা শাহরিন নুসাইফা চৌধুরী।”

কৌশিকের মৌনতায় তোফায়েল মির্জা সম্মতি ভেবে নিলেন। কৌশিক বিচক্ষণ, কাম আর ক্যালকুলেটেড পদে হেঁটে রুম থেকে বেরিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। নির্জন পথের মাঝ রাস্তায় তার গাড়ি রুখে থামায় আরেকটা গাড়ি।
ধুপ ধাপ পা ফেলে টি শার্ট পরা যুবক নেমে পড়লো, সুঠাম তামাটে রঙের শরীর, মুখের বাম পাশে পুরোনো আড়াআড়ি কা’টা দা’গ। চোখের কালো ফ্রেমের চশমার আড়ালে লেভিনের উত্তপ্ত জ্বলন্ত দৃষ্টি স্পষ্টত, কৌশিক আর তার দুটো গার্ড নেমে দাড়ায়। কিন্তু দমলো না ক্ষুব্ধ লেভিন, তেড়ে এসে কৌশিকের গার্ডের শার্টের কলার ধরে সরিয়ে দিয়ে কৌশিকের সামনে এসে দাড়ালো তারপর ঠান্ডা ধরনের ওয়ার্ন করে বললো —

“এই ময়দানে তুমি একা খেলোয়াড় না কৌশিক, তোমার মতো নোং’রা খেলা আমিও খেলতে জানি!”

নিজের একান্ত নারী ইফাকে কৌশিকের পাশে বাগদত্তা হিসাবে দেখার মতো বাজে কিছু লেভিন পরিকল্পনাও আনতে পারেনা। এদিকে ইফার বাবা তাদের এই সম্পর্ক নিয়ে খুবই ঐকান্তিক, মেয়ের বিয়ে নিয়ে তোড়খোড় বাঁধিয়ে দিয়েছেন।
কৌশিকের সাথে লেভিনের ডিল হয়েছিল এমন যে —কাশফিকে তোফায়েল মির্জা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে কৌশিক ইফা কে বিয়ে করবে না। কিন্তু কৌশিক তাদের সাইলেন্স কোড ভেঙেছিল তাই নিয়মমাফিক লেভিন কাশফিকে ভুল বোঝাবুঝির জন্যই ইভেন্টে নিয়ে আসলো। এদিকে সে আবার আবরার কবীর থেকেও নিজের প্রফিট বুঝে নিলো।
কী সাংঘাতিক মানুষ!

পুষ্পকঞ্জের রাজকন্যা নীলাম্বরী নীল শাড়ি জড়িয়ে সেদিন হিমাদ্রীর জন্য একবুক ভালোবাসা নিয়ে এসেছিল কিন্তু হিমাদ্রিকে অন্য নারীর বাহুতে দেখে অশ্রু ফেলে ভগ্ন হৃদয় নিয়ে এক আকাশ সমান অভিশাপ দিয়ে প্রস্থান করেছিল।

লেভিনের কর্মকাণ্ডে কৌশিক ক্ষুব্ধ হয়েছিল বেশ, তোফায়েল মির্জা যাতে কাশফির কোনো ক্ষতি করতে না পারে শুধু এই ভেবে সে এই নাটকে শামিল হয়েছে। কিন্তু কাশফিকে বাঁচানোর অপ্রান চেষ্টা বৃথা গেলো, কারণ বিকল্প ছক তোফায়েল মির্জা পূর্বেই কষে রেখেছিলেন।

***

“তোমার পেইন্টিং গুলো বেশ নন্দিত, ভুবন মোহিনী, চোখ পড়তেই মনে হয় প্রতিটা ক্যানভাসে যেনো তুমি বাকশক্তি দান করেছ।”
পাশ ফিরতেই চওড়া রকমের পুরুষটার শ্যাওলা রঙের চোখজোড়ায় চোখ পড়লো তার, গুল্মের মতো মাথা ভর্তি চুল, মুখে প্রসন্ন হাসি। প্রশংসায় ঈশিতা পুলকিত হলো তবে প্রোফেশনালিজম বজায় রেখে মেকি হাসলো, যেমন হাসিটা সে প্রতিটা ক্লায়েন্টকে সৌজন্যতা মূলক দিয়ে থাকে।

“জ্বি ধন্যবাদ।”

“বয়স কত তোমার?”
আড়ম্বরপূর্ণ বেশভূষায় থাকা যুবকের মুখে নিজের বিষয়ে ব্যক্তিগত কিছু জানতে চাওয়া তার কাছে অস্বস্তির মনে হলো। বিব্রত হয়ে সামনের এক পায়ে আবার পিছনের আরেকপায়ে ভর করে আড়ষ্ট হয়ে মিনমিনে স্বরে উচ্চারণ করলো—

“পনেরো।”

“সৃষ্টিকর্তা মনে হয় তোমায় কোনো ঘাটতি দেন নি, তোমার সৃষ্টিকর্ম যেমন অবর্ণনীয় আপনি তার চেয়েও তিনগুণ সুন্দর।”
ঈশিতা চমকে গিয়ে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো, তার এমন প্রশংসা কেনো আগে কেউ করলো না? লোকটা কি মিথ্যে বলছে? ইন্ট্রোভার্ট ধরনের হওয়ায় তার বেশি কথা বলতেও ভালো লাগে না তবুও সে ভ্রু জোড়া কুচকে থমথমে মুখে সাফ সাফ জানালো,

“সরি আপনি কি ডিসকাউন্টের জন্য তোষামোদি করছেন?!”

“মোটেই না। চাইলেই আমি এই পেইন্টিংয়ের দামের চেয়ে দ্বিগুণ দামে নিতে পারি।”

ঈশিতা ঠোঁট জোড়া আলগা হয়ে হা হয়ে গেলো, বোধহয় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে সে। লোকটা মজা করছে ভেবে সে এড়িয়ে যেতে চাইলো কিন্তু তার শক্ত মুখভঙ্গি দেখে সে আবার নিজের সিদ্ধান্ত পাল্টে নেয়। এসব পেন্টিংয়ের যা দাম, একবার শোধ করতেই তো পকেট ফুটো হয়ে যায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো,

“আপনি এই বিষয়ক সবকিছু আমার এজেন্সির সাথে বা এই গ্যালারির ম্যানেজার চারুলতার সাথে খুলে কথা বলুন, আমি এই ব্যাপারে ধারণা রাখি না।”

“তুমি তো পুরো কথাই শুনলে না, কোনো কি তাড়া আছে?”

ঈশিতা বেশ বিরক্ত হলো,
“না তাড়া নেই, আপনি আর কিছু বলবেন?”

“বলতে চেয়েছিলাম আমি এই পেইন্টিংয়ের দামের চেয়ে দ্বিগুণ দামে কিনে নিতে পারি এক শর্তে যদি তুমি আমার সামনে বসে আঁকতে রাজি হও। প্রয়োজনে আমি তোমার মিউস (Muse) হবো।”

ঈশিতা যেনো চমকের উপর চমকে বোধ শক্তি হারিয়ে ফেললো।
“এমনটা সম্ভব নয়।”

“ঠিক আছে তোমার সময়েরও আমি চওড়া দাম দিতে রাজি।”
ঈশিতা হতবম্ব হয়ে কিছু বলতে পারে না, টাকা নিয়ে কত উদাসীন থাকলে মানুষ এমন কিছু বলতে পারে। তৎক্ষণাৎ তাদের কথার মাঝে আবির্ভাব ঘটে চারুলতার,

“ঈশিতা আমার মেয়ে সে অবশ্যই রাজি, তবে তোমাকে আগে পে করতে হবে ইয়াং ম্যান।”
ঈশিতার গায়ে কাঁটা বিধলো তবে সে তার মাকে মুখের উপর না করতে পারলো না,

“ধন্যবাদ, আমি কিনান মির্জা। ঈশিতার অধীর অপেক্ষায় থাকবো।”

#চলবে…

#অদৃষ্টের_মৃগতৃষ্ণা (৩৯)
#লিখনীতে_প্রোপীতা_নিউমী
(অতীত)

কাশফি থেকে বয়সে এক বছর বড় ঈশিতা, পুরো ব্যক্তিত্ব না জেনেই কিনান মির্জা কে নিয়ে স্বপ্ন বুনছে সে। প্রতিদিন লুকিয়ে চুরিয়ে আতিকুর রহমানের অগোচরে এভাবে কিনানের সাথে কথা বলা কিংবা কিনান কে ঘরে প্রবেশ করানো নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বভাবত ঈশিতা কাশফির ছায়া হয়ে থাকায় তাকে নিয়ে প্রায় সবাই কটাক্ষ করতো, আগে এসব গায়ে না মাখলেও ইদানিং খুব গায়ে লাগে তার। কিনানের উস্কানি মূলক কথাবার্তায় কাশফির প্রতি তার সুপ্ত হিংসে জন্ম নিলো।

কাশফি হাসি খুশি না থাকলেও সে লোক দেখিয়ে হায়হুতাশ করার মতো মেয়ে ছিল না, নিজের দুঃখ খুব একটা প্রকাশ করে না বলেই ঈশিতা ভেবে নেয় কাশফির সুখের সীমা নেই, ফলশ্রুতিতে ধীরে ধীরে সে কাশফি থেকে দুরত্ব বজায় রেখে চলতে শুরু করলো।
সময়ের সাথে সাথে কোথাও না কোথাও কাশফির প্রতি ঈশিতার ঈর্ষা জন্মালো, কৌশিকের সাথে বান্ধবীর এতো সুখ অথচ তার জীবনে সুখের রেশ মাত্র নেই।

এভাবে চলতে থাকলো অনেকদিন কিন্তু এতসব কিছুর মাস্টার মাইন্ড কে জানেন? তোফায়েল মির্জা, অথচ তিনি এই নিয়েও অবগত যে আগের মতোই কৌশিক তার কোটি কোটি টাকার ব্যবসা এক রাতে ল’ণ্ড’ভ’ণ্ড করে দিতে পারে।

বেশ অল্পবয়স থেকেই কৌশিক মির্জা দক্ষ, চোখা, ধৃষ্ট, উপস্থিত বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন ছিল বলেই তোফায়েল মির্জা নিজের ব্যবসা কৌশিকের হাতে তুলে দেওয়া পরিকল্পনা আটছিলেন এতোদিন। তার এই যাত্রায় কৌশিককে শক্ত, কাঠ’খোট্টা, নি’র্দয় মানুষ বানাতে চান বলেই তার কোনো দুর্বলতা থাকুক এমনটা মোটেই চাননা, এতে কোনো নিরীহ প্রাণ নিতে হলেও তার আপত্তি নেই। তাছাড়া কাশফিকে মে’রে আবরার কবীরকে নিঃস্ব করার মতো তৃপ্তি তিনি আর কোথাও পাবেন না। তাই তিনি বিকল্প ছক কষে কাজে নেমে পড়লেন।

“তুমি আমায় ভালোবসো তো কিনান?”

“অনেক ভালোবাসি।”
সে কামনার চুমু ঠোঁটে এঁকে থামে না, এটা তো শরীর পাওয়ার ছুতো মাত্র। বোকা ঈশিতা বুঝতেই পারলো না তার প্রেমিক একজন জ’ঘ’ন্য রকমের অপ’রাধী, সে একজন রেপি’স্ট।

*

“আমি তোমার জীবনে অন্য নারী হয়ে থাকতে চাইনি হিমাদ্রী, প্রয়োজনে আমি তোমাকে ভুলতে গিয়ে নিজেকে শেষ করে দিব তবুও কোনো দ্বিতীয় নারী হয়ে কখনো তোমার জীবনে পদার্পণ করবো না!”
কঠোর অঙ্গীকারে আবদ্ধ করলো কাশফি নিজেকে, তারপর চিরচেনা শহর থেকে বিদায় নিয়ে হিমাদ্রী আর তার হাজার হাজার স্বপ্ন থেকে দূরে পালিয়ে গেলো সে।

সেদিন কৌশিকের ইভেন্ট থেকে ফিরে কাশফি তার বাবার ওয়াদায় কঠোর ভাবে আবদ্ধ হয়ে গেলো। তারপর থেকে আর কখনো কৌশিকের কাছে ফিরে যাওয়ার চিন্তাও মাথায় আনেনি। আর ঈশিতার তখন বান্ধবীকে নিয়ে ভাবার সময় কই? সে তো প্রেমের সাগরে ভাসছে। ধীরে ধীরে কিনান কাশফির ব্যাপারে সবকিছু ঈশিতা থেকে জানতে থাকলো, এমনকি কাশফী আর তার বাবার সব খবরাখবর ঈশিতাই নিজ থেকে বিশ্বাস করে বলতো কিনানকে।

শুরু হলো কিনান মির্জার আরিয়ানা মেহনাজ কাশফিকে আড়ালে চুপিসারে অনুসরণ করা। কাশফি হয়ত টের পেয়েছিল কিন্তু মনের ভুল ভেবে এড়িয়ে চলতে লাগলো।

কিনান মির্জার স্বভাব চরিত্র তার বাবার চেয়েও জ’ঘ’ন্য। সে কিশোরী মেয়েদের প্রতি কা’ম ল’ল’সা উপলব্ধি করতো, তার মতো আরেকজন হলো সৌরভ সরকার। তাদের উদ্দেশ্য ছিল একবার কাশফিকে নিজেরা নিজেরা ব্যবহার করে রোয়ান লুকাসের কাছে বিক্রি করে দিবে। সাধারণত কিশোরী মেয়েদের ডিমান্ড বেশি থাকে, আর এই নারী ধা’ন্ধায় যুক্ত রোয়ান লুকাসের রেগুলার ক্লায়েন্ট হলো কিনান আর সৌরভ সরকার।

একসময় ঈশিতা কিনানের চালাকি টের পেলো আর নিজের বান্ধবীর জীবন নষ্ট করায় হীনমন্যতায় ভুগতে লাগলো। ফলে তার স্টুডিওতে আগুন জ্বালিয়ে নিজেকে শেষ করে ফেলতে চেয়েছিল কিন্তু তখন সঠিক সময়ে আতিকুর রহমান কাশফিকে বাঁচিয়ে ফেলতে পারলেও ঈশিতার কোনো চিহ্ন মেলেনি। মেয়েকে হারিয়ে আতিকুর রহমান জীবন্ত লা’শ হয়ে গেলেন কিন্তু কেউ জানলো না যে সেদিন ঈশিতা মারা যায় নি মূলত সেদিন কিনান মির্জা ঈশিতাকে তুলে নিয়ে টাকার বিনিময়ে রোয়ান লুকাসের কাছে বিক্রি করে দেয়।

এরপর বেশ কিছু দিন কেটে যায়, ঈশিতার মৃত্যু নিয়ে কাশফি নিজেকে দোষারোপ করতে থাকলো। প্রথমে তার ভাই, তারপর মা তারপর হিমাদ্রী আর তার বান্ধবী ও তাকে ছেড়ে চলে গেলো বলে নিজের মনে নিজের জন্য একরাশ ঘৃ’না জন্ম নিলো।
সে যাকে ভালবেসে কাছে টেনে নেয় সে কেনোই বা তার থেকে দূরে সরে যায়? উত্তর জানা নেই কাশফির।

সেদিনটা কাশফির মা অপরাজিতার হুট করে শরীর খুব খারাপ হয়ে পড়লো ফলে কাশফিকে কিছু না জানিয়েই আবরার কবীর হসপিটালে স্ত্রীর কাছে ছুটে চলে যান। আর কাশফি তার ভাইয়ের কবর থেকে ফিরে যতক্ষণে বাসায় ফিরলো ততক্ষণে তা’ণ্ডব হয়ে ছা’রখা’র। র’ক্ত আর লা’শের উপর লা’শ দেখে কাশফি দিশেহারা, এমন লণ্ড’ভণ্ড অবস্থায় বাসার সামনে অচেনা গাড়ির নাম্বার প্লেট দেখে বুঝতে বাকি রইলো না কেউ এসেছে, যে তার ভাইকে মেরে ফেলেছিল সে হয়ত তাদের সবাইকেও মেরে ফেলতে এসেছে।
আবরার কবীর স্ত্রীর মৃত্যু সংবাদ শুনে একেবারেই ভেঙে পড়লেন আর ঠিক তখন তার কাছে কাশফির কল আসা মাত্র তার দুনিয়া উল্টে পাল্টে গেলো, মাথায় বাজ পড়লো যেনো তার।
তার বুঝতে বাকি রইলো না যে কিনান মির্জা মূলত কাশফির জন্য এসেছে।

***

মাসখানেক হলো কাশফির সাথে কৌশিকের কোনো যোগাযোগ নেই। নিজের সময় কাটানোর পথ শুধুই কাজের মাঝে নিজেকে নিয়োজিত রাখা, এমতাবস্থায় লেভিনের আপকামিং কল দেখে সে খুবই বিরক্ত। অনিচ্ছার সত্ত্বেও রিসিভ করে কানে ধরতেই লেভিন আফসারের গম্ভীর কণ্ঠ শুনতে পেলো,

“কৌশিক তোমার জন্য একটা ব্যাড নিউজ আছে।”

“দ্বিতীয়বার আমাকে আর কখনো ফোন করবে না লেভিন। তোমার মাত’লামো পুরো প্ল্যান ত’ছ’ন’ছ করে দিয়েছে।”

“আর এই আমিই ঠিক সব খবর নিজের কাছে রাখছি।”
লেভিনের ঠান্ডা থমথমে গলায় কৌশিক সোজা হয়ে বসলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভারী গলায় বললো,

“Come to the point, Levin.”

“আরিয়ানার বান্ধবী ঈশিতা হলো তোমার ভাইয়ের গুটি, প্রেমের নাটক সাজিয়ে কিনান এতো দিন কাশফির সব খবরাখবর নিচ্ছিল।”
কৌশিকের গলায় যেনো পাথর আটকে গেলো, গায়ে কাঁটা বিধলো, আতঙ্ক জেঁকে ধরলো তাকে। এমনিতেই সে ঈশিতাকে খুব একটা পছন্দ করতো না, ক্রোধান্মত্ত হয়ে উঠে দাড়িয়ে পড়লো। সব অগোছালো ফেলে ছুটলো গাড়ির কাছে,

“শীট শীট শীট! তুমি এসব আগে জানালে না কেনো?”

“তোমার ভাই লো প্রোফাইলে চলছিল এতদিন কিন্তু সে তো রোয়ান লুকাসের সাথে ডিল করে রেখেছে তাই আর আজই মোক্ষম সুযোগ পেয়ে সে আরিয়ানার সাথে কিছু বাজে করতে চলেছে।”

শহরের বাইরে থেকেও কৌশিক ফুল স্পিডে গাড়ি চালিয়ে কাশফির কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিল। মনে হারানোর ভয়, শঙ্কা, কাশফির ভালোর জন্যই সে তাকে ভুলতে চেয়েছিল কিন্তু একি হয়ে বসলো!
বিধি বাম সেদিন উচ্চ স্পিডে গাড়ি চালানোর ফলে তার কার এক্সিডেন্ট হয়ে যায়। তবে আবরার কবীর সঠিক সময়ে পৌছে কিনানকে গু’লি’বি’দ্ধ করে আ’হত করলেন, একসময় তিনি মা’র’তে মা’রতে কিনানকে অ’জ্ঞান করে ফেললেন। তখনও কাশফি পাথরের মতো বনে ছিল, আবরার মেয়ের অবস্থা বুঝতে অক্ষম ছিলেন। মেয়ের এমন পরিস্থিতিতে হাউমাউ করে কেঁদে তিনি কাশফি আর গৃহকর্মী কামিনীকে নিয়ে দ্রুত পাসপাতালে ভর্তি করান। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার তা হয়ে গেলো।

কাশফি জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর থেকে আতিকুর রহমানকে নিজের পিতা বলে দাবি করতে লাগলো আর নিজেকে ঈশিতা বলে জানালো।
আবরার কবীর বিমর্ষ হয়ে গেলেন। পরক্ষণে ডাক্তাররা জানিয়ে দিলেন যে পর পর এতগুলো ট্রমা আর বাজে মুহূর্তের স্বীকার হয়ে কাশফি ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার (DID) তে আক্রান্ত হয়ে গিয়েছে তাই এমন বিচ্ছিন্ন আচরণ করছে।
ততক্ষণে আতিকুর রহমানও হাসপাতালে হাজির হয়ে যান। কাশফির বাবা বাবা ডাক শুনে তিনি মানসিকভাবে বিধ্বস্থ অবস্থায় কাশফির মাঝে ঈশিতাকে ভেবে নিলেন।

এদিকে আবরার কবীর জীবনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল, অপরাজিতার লাশ অপরাজিতার ভাইদের কাছে পাঠিয়ে তিনি বন্ধুর হাতে মেয়েকে তুলে দিলেন।

“আমার মেয়েটা যদি আবারার কবীরের মেয়ে হয়ে বেঁচে থাকে তবে কেউ তাকে বাঁচতে দিবে না। আমার মেয়েকে নতুন একটা পরিচয় দিস, তোর পাশে রেখে দিস।”

আতিকুর রহমান স্তম্ভিত, সৃষ্টিকর্তা কি তবে তাকে আবার বাবা ডাক শুনতে সুযোগ দিলো? কাশফির মাঝে কী সে আবার ঈশিতাকে খুঁজে পাবে? বিস্মিত হয়ে অবিশ্বাস্য কণ্ঠে শুধলো,
“কিন্তু এমন কি আদো সম্ভব? যদি সে কোনোদিন জানতে চায়?”

কাশফির বাবা মেয়ের দিকে চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, পর পর তার চোখ গড়িয়ে অশ্রু শ্রাবণের সন্ধ্যার বর্ষণের ন্যায় নামলো। তার একমাত্র মেয়ে কাশফি যদি তাকে ভুলে, নিকৃষ্ট অতীত ভুলে ভালো, স্বাভাবিক একটা জীবন পেতে পারে তবে সেটাই হোক, বাবা হিসাবে সে মেয়ের ঢাল হয়ে শেষ লড়াই লড়ে যেতে চায়।

“কাশফিকে বলবি আবরার কবীর নামের কেউ তার জীবনে ছিল না!”

***

কৌশিক মাথার চো’ট কিংবা হাতের প্লা’স্টারের তোয়াক্কা করলো না। খো’ড়া পায়ে থেমে থেমে যখন কাশফির কেবিনের সামনে এসে দাড়ালো তখন নিমিষেই তার সারা শরীরে যন্ত্র’ণা, ব্যা’থা, ঘা গায়েব হয়ে গেলো। বহুদিন পর কাশফির দেখা পেয়ে হৃদয়ে শীতলতা অনুভব করলো সে। তবে হসপিটাল বেডে থাকা কাশফি কৌশিকের আগমন টের পেয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। কৌশিককে এগোতে দেখে হাত পা জমে গেলো, যেমনি কৌশিক কিছু বলার জন্য মুখ হা করবে তেমনি কাশফি তীক্ষ্ম চিৎকার দিয়ে উঠলো —
“বাবা, সে আমায় মেরে ফেলবে বাবা! তাকে বের করে দাও প্লীজ!!!”
কাশফির কা’ন্নামিশ্রীত স্বরের বার বার আকুল অনুরোধ, আকুতি মিনতি কৌশিকের বুকে চাবুক মারার মতো যন্ত্র’ণা দিলো। কাশফির চিৎকারে তার কেবিনের নার্স এসে পড়লেন তারপর তিনি চোখ বুলিয়ে কৌশিক কে দেখে বিরক্ত হলেন,
“স্যার, রোগী আপনাকে দেখতে চাইছে না, আপনি প্লীজ বেরিয়ে পড়ুন।”

কৌশিক তোয়াক্কা করলো না, কাশফিকে বোঝানোর জন্য নরম স্বরে বললো,
“সেদিনের জন্য সরি, আমি সত্যি দুঃখিত। নীলাম্বরী প্লীজ একবার আমার দিকে তাকাও!”
কৌশিকের কন্ঠের আকুলতা কাশফির কানেই পৌঁছালো না, সে চিৎকার করে ঝাঁপিয়ে পড়লো আতিকুর রহমানের বুকে, তীব্র বিতৃষ্ণায় মুখ লুকিয়ে চোখ বন্ধ করে নেয়।

“কৌশিক, তুমি এক্ষুনি বেরিয়ে যাও!”
আতিকুর রহমানের বজ্র কণ্ঠে তিরস্কার করে জানালেন কিন্তু কৌশিক অনড়, অধীর আগ্রহে কাশফির মুখ পানে চেয়ে কেবল তার চোখে চোখ মিলানোর প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে যেনো। নরম দৃষ্টি ফেলে কাতর কণ্ঠে আবার শুধলো,

“নীলাম্বরী, তোমার পাহাড় সমান অভিমান ভাঙতে তোমার হিমাদ্রী এসেছে। একবারও কী চেয়ে দেখবে না আমায়?!”

কৌশিকের অনুরক্তিময় নিবেদন আর বুক ভরা য’ন্ত্র’ণা বৃথা গেলো। কাশফি তৎক্ষণাৎ ভীতগ্রস্থ হয়ে কাপা কাপা হাতে বেডের সাদা চাদর টেনে নিজেকে ঢাকতে উদ্যত হয়, সে কা’দতে কা’দতে আতিকুর রহমানের পাশে গুটিসুটি মেরে বসে সারা শরীর চাদর জড়িয়ে নেয়। তার এহেন আচরণে কৌশিক পুরোপুরি থমকে দাড়ায়, তার বুকে সুক্ষ্ম চিনচিনে ব্যাথা অনুভব হলো বুঝি। আজ নিজের মানুষের চোখে সে অপরাধী? মায়ের পর সে কাশফিকে অগাধ ভালোবাসা দিয়েছে অথচ সেই কাশফিই তাকে দেখতে পর্যন্ত চায় না?!

এদিকে কাশফির চোখ মুখ উল্টে একাকার, ভয়ে তার বুক অসহনীয় রকমের কা’পছে, তার মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। কেনো এমন হচ্ছে তার সাথে কিছুই বুঝে আসছে না তার!
কাশফির মস্তিষ্ক ঈশিতার স্মৃতি আর আচরণকে রপ্ত করলেও নিজের স্মৃতি পুরোপুরি মুছতে অক্ষম। মূলত এই অবস্থায় সে কৌশিক কে কিনান মির্জা ভাবছে কারণ কৌশিক আর কিনানের মাঝে খুব একটা পার্থক্য নেই, তবে শেওলা চোখের কিনান হলো Lean বেশ খানিকটা চওড়া ধরনের আর ধূসর চোখের কৌশিক হলো broad শোল্ডারের লম্বা চওড়া মানুষ।

কাশফি আতিকুর রহমানের এতো কাছে অথচ কৌশিক কে দেখেই তার কান্না পাচ্ছে? কাশফির তো বোঝার দরকার ছিল যে কিনান আর সে কি এক হলো নাকি? কৌশিক চোখে ঝাপসা দেখছে, তার অজান্তে চোখের এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। ভাঙ্গা স্বরে ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে সে আতিকুর রহমানকে শুধলো,

“ও এমন কেনো করছে?”

কৌশিকের দুর্বল কণ্ঠ শুনে আতিকুর রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীর কণ্ঠে বললেন,
“বাইরে যাও, আমি আসছি।”

কৌশিক মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেলো। বেশ কিছুক্ষণ পর কাশফি শান্ত হলে নার্স তাকে ঘুমের ডোজ দিয়ে দেন। আতিকুর রহমান বাইরে বেরিয়ে কৌশিকের দিকে তাকালেন, কৌশিকের গায়ে ঢিলা ঢালা কুঁচকে ভাঁজ নষ্ট হয়ে যাওয়া টি শার্ট, পরণে রঙ চটা জিন্স। হাতে প্লাস্টার, পায়ে আঘাত, মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে একাই কাশফির কাছে এসেছে সে।

“কৌশিক!”
পায়ের ব্যথা বেশ খানিকটা বেড়েছে বলেই মাত্র বসেছিল কিন্তু আতিকুর রহমানের ডাকে সে দুর্বল শরীর টেনে দাড়িয়ে পড়লো।

“কাশফি ঠিক আছে তো?”

আতিকুর রহমান কৌশিকের পাশে বসে আঙ্গুল তুলে ইশারায় বললেন,
“আগে বসো কৌশিক, তোমার সাথে কথা আছে।”

“বলুন।”

আতিকুর রহমান কিছুক্ষণ মৌন রইলেন, তারপর তপ্ত নিশ্বাস ফেলে রাশভারী স্বরে আওড়ালেন,
“তোমার পরিবার পরিজন বহু আগেই কাশফির পরিবারের সুখ কেড়ে নিয়েছেন। তোমার কারণে কাশফির এমন দশা হয়েছে। তাছাড়া চৌদ্দ বছর বয়সী মেয়ে সে হয়ত আবেগী হয়ে বলেছিল তোমাকে ভালোবাসে, আশা করি তুমি এসব ভুলে যাবে। তুমি তো অবশ্যই চাইবেনা যে তোমার কারণে তার ক্ষতি হোক!”

কৌশিক মূর্তির মতো বসে হাত শক্ত করে মুষ্টিমেয় করে নেয়, আতিকুর রহমানের কথার ধরন দেখে তার বাকিটুকু বুঝতে অসুবিধা হলো না। শূন্যে দৃষ্টি মিলিয়ে নিচু স্বরের গুরুগম্ভীর কণ্ঠে শুধলো,

“আপনি ঠিক কী বুঝাতে চাইছেন?”

“বহু বছর আগেই কাশফির নানাজান নিজের নাতনির বিয়ে উনার নাতি জুনায়েদ শিকদার জোভানের সাথে করার প্ল্যান করে রেখেছেন। এই বিয়ে সম্পন্ন হলেও কাশফি তার মা- বাবার ভাগের সম্পত্তি পাবে।”

“আপনি যদি সম্পদ নিয়ে ভাবেন তবে আমি তাকে রাজ্য উপহার দিব, কোনো অনিষ্ঠকারী তাকে ছুঁয়ে দেখার সাহস পাবে না।”

আতিকুর রহমান মাথা ঝাকিয়ে কৌশিক কে কাঠ কাঠ কণ্ঠে জানালেন,
“সুদূর ভবিষ্যতে কাশফি আর তোমার আবেগের কোনো ভিত্তি নেই, তোমরা আলাদা আলাদা পরিস্থিতিতে বড় হয়েছো। তোমার পদে পদে শত্রু আছে কৌশিক তাই তার ভালোর জন্য তাকে ভুলে যাও।”

দুর্বল কৌশিকের ভিতরটা দুমড়ে মুচড়ে উঠলো, মানসিক ভাবে পরাজস্থ হয়ে গেলো সে। আতিকুর রহমান উঠে দাড়িয়ে পড়লেন, পা বাড়িয়ে কাশফির কাছে ফিরে যাওয়ার আগে তিনি হতবম্ব বনে থাকা কৌশিকের দিকে চেয়ে বিরস কন্ঠে বললেন,

“আর কোনোদিন কাশফির আশেপাশেও যেনো তোমাকে না দেখি!”

*

“তারা কেনো আমাদের একসাথে বাঁচতে দিলো না, বাবা?”

মেয়ের সাথে হওয়া সর্বশেষ সংলাপ বার বার মনে পড়তেই আবরার কবীরের কলিজা ছিঁ’ড়ে আসার জোগাড়। কাশফিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় সে তার বাবার হাত ধরে এটাই বলেছিল তারপর সে জ্ঞান হারালো। কথাটায় কতটা যন্ত্রণা লুকিয়ে ছিল আবরার কবীর উপলব্ধি করতে পারলেন বোধহয়।

তিনি ক্রমাগত হাতুড়ি দিয়ে কিনানের প্রতিটা আঙ্গুলের করে আঘাত করে যাচ্ছেন। রুমটায় বিভৎস চিৎকার, ভর্ৎসনা, কাতর আর্তনাদ, তীক্ষ্ম কান্নার প্রতিধ্বনিত হলেও আবরার কবীর মৌন রয়ে তার কাজে মনোনিবেশীত। মানুষের আঙ্গুলের ডগায় নার্ভের জয়েন্ট তাই আবরার তার সামনে চেয়ারে বাধা কিনান মির্জার হাতুড়ে দিয়ে হাত, আঙ্গুল, আঙ্গুলের কর আর ডগায় পিটিয়ে যাচ্ছেন। কিনানের পায়ের আসেপাশে মোটা শিকল পড়ে আছে, তার গায়ের চর্ম ছুলে বেয়ে বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। বোঝাই যাচ্ছে তার গেয়ে মোটা শিকল দিয়ে আবরার কবীর অগ্নিকুণ্ড সমান ক্ষোভ ঝেড়েছেন। চিৎকার করতে করতে তার গলা ভেঙে গিয়েছে, গলা শুকিয়ে কাঠ কাঠ ঢোক গিলতেও সে চরম ব্যার্থ।

“মেরে ফেল আমাকে! আমি আর পারছি না।”

আবরার কবীর থামলেন, তার চোখে মুখে তৃপ্তির রেশ মাত্র নেই। ঠিক যতটুকু অত্যাচার সহ্য করলে মানুষ মৃত্যু কামনা করতে পারে? কিনানকে আক্রোশপূর্ণ দৃষ্টিতে পরখ করে তেজস্বী গলার কর্কশ কন্ঠে জানালেন,

“তুই আর তোর বাপ দুটোর পৃথিবী আমি জাহা’ন্নামে পরিণত করে ছাড়বো!”

“আমার কিছু হলে বাবা তোকে জীবিত ছেড়ে দিবে না।”

কিনানের ভাঙ্গা কন্ঠের হুমকি শুনে আবরার কবীর শব্দ যোগে হেসে ফেললেন তারপর হাসি থামিয়ে উচ্ছ্বসিত রিনরিনে গলায় বললেন,

“আমাকে নিজ হাতে মারা মতো সন্তুষ্টি তোর বাপ কোনোদিন পাবে না আর না তোর মরা লাশ তোর বাপের কাছে যাবে।”

“কী?”
কিনান মির্জা উত্তর পেলো না, চোখের নিমিষেই গাঢ় এসিড তার সারা শরীরে ছুড়ে মারা হলো। পরপর আবরারের কানে মরণ বেদনার মতো তীক্ষ্ম আর্তনাদ আর গোঙানির শব্দ পৌঁছালো।

ঠিক সেই রাতেই তোফায়েল মির্জার কাছে র‍্যাপিং পেপারে মোড়ানো বক্সে করে কিনান মির্জার র’ক্তা’ক্ত কা’টা মাথা পাঠানো হলো। সাথে আবরার কবীরের লিখা একটা নোট চিটে বার্তা —
“তোর ছেলের লাশের ৭৮ টুকরো আমি সাগরে ভাসিয়ে দিলাম, প্রতিশোধ নিতে চাইলে আমাকে আর আমার মেয়েকে আঙ্গারে খুঁজিস, পেয়ে যাবি।”

তোফায়েল মির্জা ক্রুদ্ধ হয়ে গেলেন, আবার সেই রাতেই ছেলের শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এফবিআই দ্বারা গ্রেফতার হন। কোনো পারমিশন ছাড়া সরকারি খাতের উন্নয়নের টাকা আত্মসাৎ করা সহ ইলিগ্যাল ওয়েপণ – গান করবার, ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার দায়ে তাকে তুলে নেওয়া হয়। মুহূর্তেই তার সব ব্যবসায় লাল সিল লাগিয়ে দেওয়া হলো।
মূলত দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিকে আবরার কবীর আগেই মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তোফায়েল মির্জার বিরুদ্ধে সকল তথ্য দিয়েছিলেন। সেই মাধ্যম হতে তদন্তে নেমে এফবিআই প্রমাণ সহ তাকে তুলে নিয়ে যান। এদিকে তার বিজনেস পার্টনার আর শেয়ার হোল্ডাররা গা বাঁচিয়ে রাখতে নিজেদের শেয়ারস বিক্রি করতে চাওয়ায় তোফায়েল মির্জা পুরোপুরি দেউলিয়া হয়ে গেলেন।
কিছু মুহূর্তেই তার অহমিকা, দম্ভ, শখের রাজ্য ধ্বংস হয়ে গুড়িয়ে গেলো।

পরদিন আবরার কবীরের ভবন আগুনে পুড়ে দগ্ধ হয়ে গেল, বাসার ভেতরে আবরার কবীর থাকায় সেই আগুনে তার দেহ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আবরার কবীরের প্ল্যান মাফিক মিডিয়ায় প্রকাশিত হলো যে আবরার কবীর আর তার মেয়ে আরিয়ানা মেহনাজ কবীর অগ্নিকাণ্ড দুর্ঘটনায় মৃত্যু বরণ করেন।
অথচ পৃথিবীর কেউ জানতে পারলো না মেয়েকে বাঁচানোর জন্য একজন পিতার লড়াই, মেয়ের জন্য নিজের শরীর, আত্মার বিসর্জন দিয়ে দিতেও পিছপা হলেন না তিনি। মেয়ের জন্য আদর্শ বাবা, একজন বীর পুরুষ রূপে তিনি বিদায় হলেন।
কালের পরিক্রমায় আবরার কবীরের নাম, যশ, অস্তিত্ব অঙ্গারে মিলিয়ে গেলো।

এদিকে কাশফির মৃত্যুর খবরে কৌশিক যেনো সেদিন সর্বস্থ হারালো, একজন প্রেমিকের আর্তনাদ চোখের ভাষায় অপ্রকাশিত হয়ে রইলো। কোথাও না কোথাও জেলে থেকেও তোফায়েল মির্জা কৌশিকের দিকে চেয়ে উপহাস করছিলেন যেন।

*

সাড়ে চার বছর পর, ফিউনারেলে:

কৌশিক সময় গুণে হিসাব কষলো, ত্রিশ মিনিটের মধ্যে তাকে সাইফুল নামক ঝামেলার সাথে নিপ্টে নিতে হবে। এরপর শহরের বাইরে আরেকটা ঝামেলা আছে, সেটার ঠিকানা করতে হবে। সে গাড়িতে বসে তার স্কেজুওল চেক করতে করতে পাশে বসা লেভিনকে জিজ্ঞেস করলো,
“সাইফুলের নাম্বারে কল গিয়েছে?”

“না বস।”

কৌশিক ফোন পকেটে ঢুকিয়ে গা থেকে সুট খুলে রাখলো তারপর শার্টের হাতা গুটিয়ে তুলে, টাই লুজ করতে করতে রুক্ষ কন্ঠে বললো,
“আজরা’ইলের ডাক পড়েছে তাই কৌশিক মির্জার কল ধরছে না।”

কৌশিক গাড়ি থেকে বেরুনোর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে রিক্সা থেকে কাশফি আর ফারাবী নেমে পড়লো তারপর বাকিদের অপেক্ষায় কৌশিকের গড়ির সামনে দাড়িয়ে পড়লো তারা। লেভিন পর্যবেক্ষক নজরে বেশ খানিকক্ষণ চেয়ে অপ্রস্তুত কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে কৌশিকের উদ্দ্যেশ্যে বললো,

“বস, সামনের মেয়েটা আরিয়ানা মেহনাজ কবীর না?”

সতর্ক হয়ে কৌশিকের কান ততক্ষণে খাড়া হয়ে গেলো, চোখা দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে সে পুরোপুরি থমকে গেলো। অবিশ্বাস্য নজরে চেয়ে রইলো শুধু,

সেই চোখা ছোট নাক, টানা টানা হরিণী চোখ, গাঢ় বাদামি কেশ, ঘন নেত্রপল্লব, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের অধিকারী তার নীলাম্বরী, যে বছর খানেক আগেও তার দুনিয়া কাঁপিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল আর তার পূর্ণ আগমনে মুহূর্তেই আবার কৌশিকের পুরো সিষ্টেম এলোমেলো হয়ে গেলো। তার প্রতি কাশফির চোখে ঘৃনা আর ছেড়ে যাওয়া মনে পড়তেই চোয়াল শক্ত করে হিংস্র দৃষ্টি ফেলে, তারপর ক্রোধোন্মাত্ত গলায় অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করলো,

“You are doomed, Kashfi.”

#চলবে…