অদৃষ্টের মৃগতৃষ্ণা পর্ব-৪০

0
132

#অদৃষ্টের_মৃগতৃষ্ণা (৪০)
#প্রোপীতা_নিউমী

“কৌশিক, রি’ভল’ভার রেখে দিন।”
আট ঘণ্টার মধ্যেই কৌশিক নিজের প্রাইভেট ফোর্স নিয়ে তেজস্বিনী তথা ঈশিতার ছোট্ট গুপ্ত আস্তানায় হানা দিয়েছে। ঠিক বারোটা লোডেড বন্দুক ঈশিতার মাথায় তাক করা বুঝতে পেয়ে ঈশিতার চক্ষু চড়ক গাছ, স্তম্ভিত হয়ে সটান দাড়িয়ে রইলো সে, এমতাবস্থায় ভী’তিগ্রিস্থ হয়ে তার হাত পা জমে আসাড় হয়ে গেলো।
নজর স্থির করে কৌশিক ক্রো’ধোন্মা’দ, আ’ক্রোশ ভরা র’ক্ত চক্ষে কাশফিকে সূক্ষ্ম নজরে পরখ করে নেয়, দেখে মনে হচ্ছে তার কাশফি অক্ষত অবস্থায়ই আছে তবে ঈশিতাকে নিয়ে তার সন্দেহ অন্তহীন।

“কৌশিক, আগে শান্ত হন প্লীজ আর রিভ’লভার নামান!”

কাশফির কথায় কৌশিক শান্ত হওয়ার পরিবর্তে উ’গ্র হয়ে উঠলো। কাশফি কি জানে অশান্ত কৌশিক তাকে পাগ’লের মতো খুঁজে বেড়িয়েছি? কোথায় কোথায় না গিয়েছে তার জন্য! রাগে গজগজ করে ত্বরিত তার বাহু ধরে টেনে কাছে নেয়, গ’র্জে তর্জে ক্ষি’প্তবৎ কণ্ঠে শুধলো,
“আমি শান্ত হবো?!”

কৌশিকের সানিধ্যে কাশফির মন উথাল পাথাল করছে, কাপা কাপা হাত কৌশিকের ধরলো চোয়ালে বুলিয়ে আরেক হাত তার কাঁধে রেখে নরম স্বরে বোঝালো,
“আমি ঠিক আছি কৌশিক, দেখুন আমার কিছু হয়নি।”

“তুমি কী তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছো?!”
কৌশিকের কথায় স্পষ্টত অবিশ্বাস টের পেয়ে কাশফি তড়বড় করে মাথা নাড়লো,

“না কৌশিক! গাড়িতে ব’ম ছিল সেটা আমিও জানতাম না, তেজস্বিনী জানিয়েছে আমায়, সে বাঁচিয়েছে আমায়।”

কৌশিক নরম হলো না বরং চোখ গরম করে ঈশিতার দিকে চেয়ে ভয়ঙ্কর রকমের চওড়া কণ্ঠে সুধলো,
“তোমার সাহস কী করে হয়?”

ঈশিতা প্রথমে ভয় পেলেও কাশফিকে নিয়ন্ত্রণে দেখে তরতর করে সাহস বেড়ে গেলো যেনো। ভ্রু কুঁচকে ত্যাড়া হয়ে উত্তর দিলো,
“তোমার আমাকে থ্যাংকস দেওয়া দরকার, কৌশিক মির্জা!”

কৌশিক চোখ রাঙিয়ে কয়েক কদম ধেয়ে আসছে চাইলে কাশফি রুখে দাঁড়ায় কিন্তু কৌশিক দমে না, অঙ্গবিন্যাস কঠিন রেখে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো—
“ওহ তাই? কেমন হয় যদি আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে তোমাকে বেঁধে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দিই? নয়া অভিযান আর সাথে সমুদ্র সফর ও হয়ে যাবে!”

কাশফি এদের থামাতে তড়বড় করে উচ্চারণ করলো,

“হয়েছে! থামুন, কৌশিক! বাসায় চলুন!”
কৌশিক কাশফির কথার হের ফের করলো না, কাশফিকে নিয়ে বের হওয়ার আগেই ঈশিতা শব্দ করে দাঁড়াতে বললো, কয়েক দফায় পলক ঝাপটে শুকনো ঢোক গিলে নেয়, তারপর জড়ানো গলায় শুধলো,
“কৌশিক শুনেছি তুমি বাবার সাথে হাসপাতালে ছিলে_”

আকস্মিক কথা আটকে যেনো থেমে গেলো সে, তারপর আবার অনিশ্চয়তা নিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে বললো,

“আমার বাবা…”

কৌশিকের ভাবমূর্তি আগের ন্যায় দৃঢ়, গম্ভীর মুখে খরখরে কণ্ঠে জানালো,
“কাল, আসরে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।”

আগের ন্যায় মূর্তির মতো হয়েই ঈশিতা দাড়িয়ে রইলো, চেহারায় ভাবভঙ্গির বিশেষ উদয় হলো না। কেবল মাথা নাড়িয়ে কৌশিক কে জানালো যে সে শুনেছে…

এদিকে কাশফি পুরোপুরি হতবম্ব হয়ে গেলো, তাদের এতো সহজ সাবলীল কথপোকথন শুনে কাশফি হা করে চেয়ে থ মেরে দাড়িয়ে রইলো কেবল। কিন্তু তবুও এদের করো মুখে খারাপ লাগার রেশ মাত্র নেই। ঈশিতা ঠিক অনুভতিশূন্যতায় বিরাজ করছে আর কৌশিক তো কৌশিক!
কাশফির চোখে অশ্রুর দেখার মিললো, তার মনে হলো এখনই কণ্ঠনালীতে যেনো পাথর চেপে রেখেছে কেউ। আতিকুর রহমানের কাছে তার হাজারো প্রশ্ন জানার ছিল আর তিনি কিনা এভাবে চলে গেলেন?

“বাবা মা’রা গেছেন? কিভাবে?”
কাশফির কাছে সবকিছুই বি’ষাক্ত মনে হতে লাগলো, প্রথমে তার পুরো পরিবারের কাহিনী, অজানা অতীত, জন্মদাতার আত্মত্যাগ আর বহুকাল পূর্বের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই, এতকাল যাকে বাবা জেনে এসেছে তাকে হারানোর খবর এতসব কিছুর মাঝে যেনো নিতেই পারছে না।

“আইসিইউতে থাকা অবস্থায় স্ট্রোক করেছিলেন।”

কাশফির বোধগম্য হতে সময় লাগলো। ঈশিতার দিকে অবিশ্বাস্য নজরে চেয়ে চাপা কণ্ঠে শুধলো,
“তুই এসব জানতি?”

ম্লান হাসলো ঈশিতা, চোখে মুখে হতাশার আভা প্রকট। শূন্যে অপলক দৃষ্টি মিলিয়ে তপ্ত নিশ্বাস ফেললো তারপর কম্পিত কণ্ঠে বললো,
“আমাকে মানুষ না করতে পারার গ্লানি টানতে টানতে মানুষটা অনেক আগেই ম’রে গেছে রে কাশফি।”

ঈশিতার কথাগুলো কাশফির নিকট বেশ ভারী শোনালো, যেনো বুকে পাথর চেপে কথা বলার মতো মনে হলো তার। সে ঠিক থাকতে পারছে না আর ঈশিতা ঠিক থাকার তো প্রশ্নই আসে না!
“তুই ঠিক নেই, এভাবে মনের ভিতর চাপ নিস না!”

“একটু একা থাকতে দে আমায়, সব ঠিক হয়ে যাবে।”

ঈশিতার বলার দেরি হলেও কৌশিকের পা বাড়ানোর দেরী হলো না, কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই একপ্রকার টেনে হিঁচড়ে কাশফিকে গাড়িতে তুলে, নিজে উঠলো তারপর ড্রাইভার কে নির্দেশ দিলো গাড়ি চালাতে। পুরো রাস্তায় তাদের কথা হলো না, কাশফি বহু চেষ্টা করেও কান্না থামাতে পারলো না। এতকাল কোথায় ছিল তার আবেগ? এখন এসব আবেগের উদয় কোত্থেকে হচ্ছে? এতকিছু ভুলে কিভাবে বেঁচেছিল সে এতকাল?

ইশ! কেউ যদি তাকে আগে জানাতো তবে তো সে আর রং ঢং করে পাঁচটা বছর কৌশিক ছাড়া কাটাতে হতো না। কাশফির নাক টানার আওয়াজ শুনে কৌশিক রুক্ষ কণ্ঠে বললো,

“এভাবে ফ্যাচফ্যাচ করে কাদবেনা কাশফি!”

কাশফি শক্ত মনের মানুষটার দিকে চেয়ে রেগে গিয়ে আগুন, চোখ পাকিয়ে সজোরে সিটে হাত বসিয়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো,
“আপনি কিসের আশায় ছিলেন এতদিন? চাইলে আমাকে তো আগেই সব কিছু জানাতে পারতেন! আর এখন বাবার কথাও আপনার মুখ থেকে বেরুচ্ছে না! মানুষটা মরে গেছে জানাতেও কি আপনার কষ্ট হচ্ছে?!”

“আতিকুর রহমান মরার ইচ্ছে পোষণ করেছেন কাশফি, আমি তো আর চাপিয়ে দিই নি!”
কৌশিকের ঠান্ডা মেজাজের রুক্ষ, স্ট্রেট ফরোয়ার্ড কথায় কাশফির কান্নায় ভেঙে পড়ার জোগাড়। কেঁদে কেঁদে অস্থির হয়ে কৌশিক কে কপাট রাগ দেখিয়ে বললো,

“আপনি কি ঠিকঠাক উত্তর ও দিতে জানেন না?” — কৌশিকের ভাবভঙ্গির বিশেষ পাত্তা না দিয়ে কাশফি এবার ড্রাইভারের দিকে চেয়ে কাঠ কাঠ গলায় নির্দেশ দিলো —
“এই ড্রাইভার গাড়ি সাইড করে থামান এক্ষুনি!”

ড্রাইভার থামলো না, বরং এমন আচরণ করলো যেন সে কাশফির কথা শুনেই নি! ড্রাইভারের পাশে বসা লেভিন কেবল একবার কাশফির দিকে চেয়ে আবার অনড় হয়ে নিজের কাজে মনোনিবেশ করলো। গাড়ির পরিস্থিতি দেখে কাশফির মাথায় দপ করে আগুন জ্বলে উঠল,

“আজব আপনি কী আমায় অবজ্ঞা করছেন?”

“সে আমার ড্রাইভার, তোমার কথা শুনবে না কাশফি।”

কাশফি কৌশিকের দিকে ফিরলো না, চোখ বড় বড় করে ড্রাইভার কে আঙ্গুল তুলে শাসানোর মতো তেতে উঠে হুমকি দিয়ে বললো,
“আচ্ছা? কিছুক্ষণ পর যখন আপনার বস মাথা নিচু করে আমার পা ধরে মাফ চাইবে তখন আমি আপনার এই বিশেষ আচরণের কথা তুলবো!”

লেভিন ততক্ষণে আর চুপ থাকতে পারলো না, গলা খাকারি দিয়ে ড্রাইভারের হাতের উপর হাত রেখে হাত রেখে শক্ত গলায় জানালো,
“ড্রাইভার, সাইডে থামিয়ে রাখো আর আসো আমরা বরং নেমে হওয়া বাতাস খেয়ে নিই।”

লেভিন আর ড্রাইভার নেমে দাড়াতেই পুরো গাড়িতে তারা একা হয়ে পড়লো। কাশফির রাগে ফোস ফোস করে নিশ্বাসের শব্দ শুনে কৌশিক ঠাট্টার ছলে বললো,
“বলুন জাহাঁপনা, আমি শুনছি।”

“হেঁয়ালি করবেন না কৌশিক, আর সারাদিন ফোনে কী আপনার?”

“তোমার তো দেখছি মুড সুইং খুব ঘন ঘন হচ্ছে।”

কাশফি মনে মনে কৌশিকের গালে নিজের পাঁচ আঙ্গুল বসানোর ইচ্ছে পোষণ করলো কিন্তু স্বামী মানুষ গায়ে হাত তোলা পাপ হবে তাই এই ইচ্ছে দাবিয়ে রাখতে হলো। কিন্তু ক্রোধ কমলো না তার। ধা’রলো নজরে চেয়ে, দাত কড়মড় করে, তেজস্বী গলায় বললো,

“আমি সিরিয়াস কথা বলছি আর আপনি ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন? ফোনের মাইরে বাপ! আছাড় দিয়ে বাইরে ফেলে দিব কিন্তু!”

কৌশিক এতক্ষণ শান্ত হয়ে থাকলেও আর শান্ত হতে পারলো না, ফোন একপাশে রেখে চট করে কাশফির গাল টেনে কাছে এনে ধরলো। চড়া হয়ে, তীক্ষ্ম পরখ যোগে উষ্মান্বিত কণ্ঠে বললো,
“অ্যাটেনশন পাওয়ার জন্য তুমি রাগ ঝাড়তে পারো কিন্তু আমি যে তোমাকে না পেয়ে নিজের মগজ নিজে চিবিয়ে খাচ্ছিলাম?!”

“আপনি এমন কেনো?!”

“কেমন?”

কাশফির চোখের পানি বাধ সাধলো না, টপ টপ গড়িয়ে পড়লো একের পর এক। রাগে দুঃখে নাক টেনে টেনে বললো,
“বদরাগী, রক্ষ স্বভাবের মানুষ আপনি! কোথায় আমাকে বুঝবেন তা নয়, কথায় কথায় রাগ ঝাড়ছেন, ইগনোর করছেন!”

কৌশিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাত বাড়িয়ে গম্ভীর গলায় বললো,
“এদিকে আসো!”
দ্বিতীয় বার বলার সুযোগ দিতে হলো না, কাশফি বুকের মধ্যে মিশে গিয়ে একাকার। কৌশিক শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কয়েক দফায় চুমু খেয়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। কাশফিকে বোঝাতে কিছুটা নরম স্বরে বললো,

“আমি ভেবেছিলাম তোমাকে আর আমাদের সন্তানকে হারাতে বসেছি। যখন জানতে পারলাম গাড়িতে তুমি ছিলে না তখন মাথায় কাজ করছিল না আমার, প্রতিটা মুহূর্ত ভয় নিয়ে কিভাবে, কি করে, তোমার কাছে পৌঁছেছি আমার জানা নেই। আমি বোধহয় ঠিকঠাক করে ভালবাসতে জানি না কাশফি, ভালোবাসার সংজ্ঞাই আমার অজানা তবে বুক ফুলিয়ে বলতে পারি তোমাকে ছাড়া আমি নিজেকে কখনো কল্পনা করতে পারি না।”

কাশফি ভীষণ রকমের আবেগী হয়ে গেল, কৌশিককে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নীরবে অশ্রু ফেললো কিছুক্ষণ। খুব করে বলতে ইচ্ছে হলো কাশফির — “আপনার ভালবাসতে জানতে হবে না কৌশিক, ভালবাসতে না জানাতেই আমি পা’গল হয়ে বসেছি জানলে তো আমার পথে বসতে হতো!”

মনের কথা মনে রেখে কাশফি বিশ্রী একটা কাজ করে বসলো। চোখের পানি নাকের পানি কৌশিকের শার্টে মুছে হিচকি কান্নামিশ্রীত কণ্ঠে বললো,

“আমার আরো কান্না করতে ইচ্ছে করছে!”

“শার্ট তো আগেই বরবাদ করে দিলে এখন মানা কে করেছে?”
কৌশিকের কথায় কাশফি আবার ভ্যা ভ্যা করে কাদতে শুরু করলো। কৌশিক পড়লো বিপাকে কেননা দুইমাসেই মুড সুইংয়ের এমন বাজে অবস্থা চার পাঁচ মাস পর্যন্ত গেলে তো কথাই না! অবস্থা না’জেহা’ল করে ছাড়বে।

“আমি আর নিতে পারছিনা কৌশিক! আমার বাবা মা কেউই নেই, যাকে সারাজীবন বাবা ভেবেছি সেও আর আমার পাশে নেই। তারা কেউ আমার সুখ দেখতে পারার সময় নিয়ে আসলো না কৌশিক? কেনো আমার প্রিয় মানুষগুলো আর আমার পাশে নেই? সারাজীবন অন্যকাউকে মা ভেবে আমি ঘৃনা করে এসেছি আর এসব আপনিও আমাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেননি! এতো খচ্চর কেনো আপনি?”

কাশফির ভালো খারাপ মিলিয়ে আবোল তাবোল সব বকাবকি কৌশিক মনোযোগ দিয়ে শুনলো আর কিছুক্ষণ পর পর চুমু দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে গেলো কেবল।

একদিক থেকে আতিকুর রহমানের মৃত্যুর কারণ যে তোফায়েল মির্জা সেই বিষয় কাশফিকে জানালো না সে। তোফায়েল মির্জা তেজস্বিনী তথা ঈশিতার সাথে দীর্ঘদিনের শা’রী’রি’ক সম্পর্কে আবদ্ধ। তাছাড়া ঈশিতা আতিকুর রহমানের মেয়ে এমনটা জানতে পারলে তিনি ঈশিতাকে জানে মে’রে ফেলবেন। সারাজীবন কাশফির কাছে অপরাধী থেকেও আতিকুর রহমান বন্ধুর দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ঠিক, তবে অনুশোচনাবোধ থেকে আর দুই মেয়ের পরিচয় আড়াল রাখতে তিনি নিজেকে চিরতরে আড়াল করার পথ বেছে নিয়েছেন।
অতীতের সব পরিস্থিতির অবনতির কারণ কোথাও না কোথাও কাশফি নিজেকে দায়ী মনে করছে তাই কৌশিক এই কথা তুললো না। কিছু জিনিস অজানা থাকাই শ্রেয়।

“পাঁচ বছর আগে তোমার সাথে আবার দেখা হওয়ার পর থেকেই তুমি আমাকে ভীষণ রকমের অপছন্দ করতে কাশফি, এতে আমার কোনো আপত্তি ছিল না। কারণ নয় বছর আগেও তুমি আমায় তোমার অনিষ্টকারী ভেবে ঘৃনা করে এসেছিলে। তবে কখনো ভাবতে পারিনি তোমার চোখের প্রলয়ংকারী ঘৃণা যতটা না পছন্দ ছিল আমার তার চেয়ে তোমার চোঁখে আমার জন্য ভালোবাসাটার পরিস্ফুটন দেখে মারাত্বক বাজে ভাবে প্রেমে পড়ব। এরপর থেকেই নয় বছর আগের মতো তোমার ঘৃনা, বিতৃষ্ণা দেখার ভয় জেঁকে বসলো। মনে হতো কখন না কখন তুমি আবার আমাকে কিনান মির্জা ভেবে দূরে সরিয়ে দাও, তাই তোমাকে সত্য বলার সাহস হয়ে উঠেনি, কাশফি।”

কাশফি মাথা তুলে চেয়ে দেখলো কৌশিক কে, মানুষটার প্রতিটা লাইন আবেগ অনুভূতি মেশানো কিন্তু মুখে কুলুপ এঁটেছেন যেনো! মনে হবে মুখে পাথরের তৈরি আস্তর বসানো তার। আর এই পাথরের বুকে আবেগ প্রকাশ করা নিষেধ।
কিছুক্ষণের জন্য সে নিজের সকল দুঃখ ভুলে গেলো, কৌশিকের চোখে চোখ রেখে নরম, মোহনীয় ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলো,
“আমার চোখে ভালোবাসা কখন টের পেয়েছিলেন, কৌশিক?”

“যখন তুমি ভাবতে আমার আড়ালে থেকে তুমি তোমার এলোমেলো অনুভূতি থেকে পার পেয়ে যাবে।”
কৌশিকের হাস্কী কণ্ঠ শোনার পর পরই দমকা হওয়ার মতো কৌশিকের মিন্ট আর নিকোটিনের ঘ্রাণ ঘিরে ধরলো তাকে, আবেশে বদ্ধ করে একজোড়া শক্ত পুরুষালি ওষ্ঠাধর সিক্ত করে তুললো তার অধর, নরম কায়া, ওষ্ঠের কোমলতার পুরোপুরি আয়ত্তে নিয়ে ডুবে গেলো আরো গভীরে, এলোমেলো অগোছালো পরিচ্ছদের ঠাই হলো পাদ দেশে।

“আজ ভীষণ জ্বা’লি’য়েছ আমায়, ম্যাডাম!”
দুটো তৃষ্ণার্ত সত্ত্বার দগ্ধ, উত্তপ্ত প্রণয় বিলাসের সীমানার শেষে যখন উৎকর্ষিত প্রান্তে তখন ঘনঘন নিঃশ্বাস আর নরম শিৎকারে শব্দ কাচে কাঁচে প্রতিধ্বনিত হয়ে ঝংকার তুলে দিলো যেনো! প্রেমলীলায় মত্তে আসঙ্গতার উষ্ণতায় ভাপ জুড়ে গেলো অভ্যন্তরীণ বাতাবরণে।

***

আতিকুর রহমানের সুনসান বাড়ির দিকে চেয়ে কাশফি দীর্ঘশ্বাস ফেললো, যে কয়েকজন পাড়া, প্রতিবেশী এসে তার অন্তিম মুহূর্তে শামিল হয়েছিলেন তারা সবাই বিদায় নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। চারদিকে মাগরিবের আজানের ধ্বনি শুনতে পেয়ে কাশফি মাথায় ঘোমটা টেনে নেয়, ফোনে ম্যাসেজের টুং টাং শব্দে কাশফি দৃষ্টি ফোনের ডিসপ্লেতে রাখলো।

“তোর সাথে আমার কথা আছে যাওয়ার আগে একটু দেখা করে যাবি।”
চারপাশ চোখ বুলিয়ে দেখতে পেলো ঈশিতা খুব একটা দূরে দাঁড়িয়ে নেই। কাশফি পায়ে হেঁটে ঈশিতার কাছেই আসতে চলছিল তবে কোত্থেকে যেন ছো মারার মতো করে কৌশিক তার সামনে এসে দাড়ালো। ব্যাস্ত ভঙ্গিতে জানালো,

“আমার কাজ আছে কাশফি, এক্ষুনি বাসায় ফিরতে হবে।”

“এক মিনিট দাঁড়ান, ঈশিতার সাথে কথা বলে আসছি।”
কাশফির কথায় কৌশিকের বদল ঘটলো না, সে যেনো দাড়িয়ে কাশফির গাড়িতে উঠার অপেক্ষা করছিল। গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বললো,

“এক্ষুনি কাশফি!”
কাশফি ভ্রু কুঁচকে নেয়, বেশ বিব্রত বোধ করলো সে।

“বললাম তো কথা আছে!”

“তেজস্বিনীর সাথে তোমার কথা বলার কোনো কারণ নেই কাশফি।”

কৌশিকের এমন কথায় কাশফি ভড়কালো,
“কেনো থাকতে পারে না?”

“তেজস্বিনীকে নিয়ে সন্দেহ হয় আমার।”

“এমন কিছুই হবে না কৌশিক, আপনি দাঁড়ান আমি আসছি।”

কৌশিক খানিকটা নারাজ হলো। কাশফি আর কিছু না বলে ঈশিতার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। ঈশিতা কৌশিকের দিকে চেয়ে আবার কাশফির দিকে ফিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
“কৌশিক দেখা করতে বারণ করেছে, না?”

“তোকে বিশ্বাস করতে পারছেনা হয়ত।”

“আসলে অতীত নিয়ে আমি লজ্জিত, নিজের দোষে বাবাকেও হারালাম তাই তোর কাছে ক্ষমা চাইতে এলাম। আমার হাতে সময় খুব কম, আরিয়ানা। তাই পারলে ক্ষমা করে দিস। আর তোর যেকোনো প্রয়োজনে আমায় স্মরণ করিস, এবার অন্তত আশাহত করবো না তোকে।”

কাশফি মাথা নেড়ে গেলো, হা না কিছুই জানালো না, গভীর চিন্তায় মগ্ন হতে দেখা গেলো তাকে। এক প্রকার হুট করেই প্রশ্ন করে বসে,
“বাবার মৃত্যুর পিছনে পরোক্ষ ভাবে কি তোফায়েল মির্জা জড়িত?”

ঈশিতা কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
“বাবার উপর নজর দারি করতো সে, আমার তেমনই মনে হয়।”

“তোকে কিছু জিজ্ঞেস করার ছিল।”

ঈশিতা বান্ধবীর থেকে নজর সরিয়ে কৌশিকের দিকে চাইলো। তাদের থেকে খুব একটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকলেও প্রখর দৃষ্টি ঠিক তাদের দিকে, বিশেষ করে ঈশিতার দিকে তির্যক দৃষ্টি ফেলে চেয়ে আছে সে। যেনো চোখের ইশারায় ওয়ার্ন করছে!
“আমাদের কথাবার্তা আর লিপসিঙ্ক মিলিয়ে কৌশিকের বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হচ্ছে না আরিয়ানা।”

কাশফি চোখ গরম করে পিছনে ফিরে তাকালো, বিরোক্তিমায় শব্দ করে খানিকটা কৌশিকের আড়াল হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“আমার শ্বশুরের এড্রেস দিতে পারবি?”

ঈশিতা থতমত খেয়ে গেল যেন, ঘোর অসম্মতি প্রকাশ করে সাফ সাফ জানালো,
“অসম্ভব! তোর কি মাথা খারাপ? ওই লোকের সাথে ছলচাতুরি করে তুই বিপদে পড়বি আরিয়ানা। রাগের বশে বিপদ ডেকে বসিস না।”

ততক্ষণে কৌশিকের ডাক পড়ে গেলো। কাশফি নিচের ঠোঁট দাত দিয়ে চেপে হতাশা মিশ্রিত নিশ্বাস ফেলে। ইশারায় বিদায় জানিয়ে কৌশিকের কাছে ফিরে যাওয়ার পূর্বে শক্ত কণ্ঠে জানালো,
“আমাদের কথা এখানে শেষ হয়নি ঈশিতা, আমি সুযোগ বুঝে আবার যোগাযোগ করবো।”

***

“আমি কি XTC ব্রডকাস্ট চ্যানেলের Editor in chief (EIC) এর সাথে কথা বলছি?”
নিজের অফিসের কেবিনেই ছিলেন গোলাম কিবরিয়া, কাজে মন লাগানোর দরুন দেরী করে বাসায় ফেরা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ব্যস্ততায় সব কাজ এক প্রকার এলোমেলো হয়ে আছে তাই ইম্পর্ট্যান্ট কল ভেবে না দেখেই আননোন নাম্বার রিসিভ করে বসেন।

“জ্বি, আমি চিফ এডিটর গোলাম কিবরিয়া বলছি, আপনি কে?”
প্রোফেশনালিজম বজায় রেখে জিজ্ঞেস করলেন তিনি। অপর লাইনের নারী কন্ঠ কিছুটা সময় নিয়ে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বললো,

“শুনলাম XTC Media Limited এর CEO নাকি এইবছর বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের থেকে যে কোনো একজন এডিটরের প্রমোশন দিবেন।”

গোলাম কিবরিয়া ভরকে গেল বোধহয়। কান থেকে ফোন নামিয়ে ভালো করে নাম্বারটা দেখে নেয়। ঘড়িতে বাজে সাড়ে বারোটা, এমন অহেতুক ফোন কল তিনি আগেও রিসিভ করেছেন তাই বেশ বিরক্ত হলেন বটে। কপাল কুঁচকে ব্যাস্ত ভঙ্গিমায় ফাইল চেক করতে করতে অমনোযোগী হয়ে উত্তর দিলেন,

“জ্বি, আপনি ঠিক শুনেছেন তবে এইকথা বলার কারণ?”

“নয় বছর আগের দুজন ধূর্ত টাইকুন জোট আবরার কবীর আর তোফায়েল মির্জার রহস্য সমাধান কিন্তু এখনো হলো না।”
গোলাম কিবরিয়া থমকে গেলো, ফাজলামি হচ্ছে নাকি তার সাথে? চোখ বড় বড় করে গমগমে সুরে অতিষ্ঠ হওয়ার ভঙ্গিমায় শুধলো,

“আপনি এই সময়ে আমার সাথে মশকরা করছেন?”

অপর পাশের নারী কণ্ঠ থেমে থেমে বললো,
“মোটেই না, করো অন্তিম পতন স্বচক্ষে দেখার আনন্দ লুফে নিতে বেশ ইন্টারেস্টেড আমি।”

কিবরিয়া পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে পড়ে,
“আপনি কী আবরার কবীরের পরিবারের কেউ?”

“মিস্টার কিবরিয়া, আপনার জানা মতে তার পরিবারের কেউ কী বেঁচে আছে নাকি?”

গোলাম কিবরিয়া অস্থির হয়ে থমথমে মুখে চেয়ার থেকে উঠে দাড়িয়ে পড়লেন তারপর চট করে উচ্চারণ করলেন,
“আরিয়ানা কবীর!”

মহিলাটা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো যেনো কেউ মশকরা করছে তার সাথে তারপর হুট করেই সে হাসি থামিয়ে গম্ভীর গলায় বললো,
“ঠিকানা লিখে নিন — সিটি হসপিটাল, সেন্ট্রাল এরিয়া। প্রফিট ফিফটি ফিফটি, বাদ বাকি কথা কাল হবে। শুভ রাত্রি মিস্টার গোলাম কিবরিয়া।”

#চলবে…