অদৃষ্টের মৃগতৃষ্ণা পর্ব-৪১ এবং শেষ পর্ব

0
157

#অদৃষ্টের_মৃগতৃষ্ণা (৪১)
#অন্তিম_পর্ব
#লিখনীতে_প্রোপীতা_নিউমী

“মানুষ জাতির অন্যতম ধর্ম হলো নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। পরিস্থিতি বুঝে কিছু মানুষ শিকার করতে জানে আর কিছু মানুষ সুযোগ বুঝে। আমার জীবনটা প্রহেলিকার মতো আর আমি আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন জট খুলতে গিয়ে সুদর্শন তবে ভয়ঙ্কর কিছুর সাক্ষাত পাই তারপর থেকে বিতর্কিত অধ্যায়ে পদর্পন ঘটলো আমার। আমার অতীত যতটা মোহনীয় ভেবেছিলাম তেমনটা নয় বরং রয়েছে বীভৎস কিছু জড়িয়ে। আমাকে জীবন যুদ্ধে টিকিয়ে রাখতে যতজন আত্মত্যাগ করেছে তাদের স্মৃতির ভাজে রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। কৌশিক মির্জা, একসময় মনে হতো তুমি আতঙ্ক বিরাজ করতে এসেছিলে কিন্তু তুমি যে আমার অবিচ্ছেদ্য অংশ! ছোট্ট জীবনে তোমায় পেয়ে আমি জিতে গেলাম। তাই নির্ভীক হয়ে চোখ খুলে সামনে চাইতেই দেখলাম কালো বন্দুক আমার দিকে তাক করা, তর্জনী বন্দুকের চকচকে ট্রিগারে। মুহূর্তেই হয়ত খারাপ কিছু হতে চলছে তবুও আমি ভয় পেলাম না।
আমি আরিয়ানা মেহনাজ কাশফি কবীর, আবরার কবীরের একমাত্র মেয়ে। বহমান স্রোতের মতো আমি বাধ মানতে শিখিনি কৌশিক, আমি আমার নিয়মে চলতে শিখেছি। আজ, এই মুহূর্তে আমি প্রাণ দিতে আসিনি বরং দণ্ডনীয় পাঠের হিসেব নিতে এসেছি।
Once for all.”

***

গোলাম কিবরিয়ার দুই পায়ে দুই রকমের মোজা পরা। আজ সকালে বাসা থেকে বোধহয় কোনরকম রেডি হয়ে বেরিয়েছিলেন। আজ অফিসের কাজ ফেলে হন্তদন্ত হয়ে গাড়িতে উঠে পড়লেন তারপর দ্রুত বেগে গাড়ি চালিয়ে সিটি হসপিটাল খুঁজে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। চোখ দেখে বুঝতে অসুবিধা হবে না যে কাল রাত তার ঠিক মতো ঘুম হয়নি। বেশ অস্থির হয়ে হাসপাতালের ভিতরে ঢুকে রেসিপশনিস্টের কাছে গিয়ে ঘর্মাক্ত মুখে হাঁপিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করলেন,

“পেশেন্ট মিসেস নাহার আমার আত্মীয় হয়। তার কেবিন নাম্বারটা কত একটু দেখবেন?”

রেসিপশনিস্টের চেক করে জানালেন,
“পাঁচ তলা, ৬৭ নাম্বার কেবিন।”

“ধন্যবাদ।”
গোলাম কিবরিয়া ছুটে গিয়ে লিফটে চড়ে বসলেন। বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর কাঙ্ক্ষিত কেবিন নাম্বার দেখতে পেয়ে চোখ জুড়িয়ে গেলো যেনো। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কেবিনে ঢুকতেই দেখতে পেলো জিন্স আর টি শার্ট পরা যুবতীকে, সে বেডে থাকা পেশেন্টের সাথে কথা বলায় ব্যাস্ত। পেশেন্টের চোখে মুখে রুগ্নতার পাশাপাশি আলাদা রকমের খুশি ফুটে উঠেছে যেনো, তার এক হাত টি শার্ট পরা মেয়েটার কাঁধে রাখা।

গোলাম কিবরিয়া দরজায় আলতো হাতে নক করলেন, মেয়েটা পিছনে ফিরে গোলাম কিবরিয়ার দিকে চেয়ে আবার মিসেস নাহারকে কী যেন বলে চেয়ার থেকে উঠে পড়লো তারপর গোলাম কিবরিয়ার সামনে দাড়িয়ে সৌজন্য মূলক হাসি হেসে হ্যান্ড শেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে ধরলো,

“আপনি আরিয়ানা কবীর?”
তাকে সম্পূর্ন অগ্রাহ্য করে বিভ্রান্ত ফেলে সুন্দরী নারী রহস্য জনক হাসি হাসলো তারপর লহু কণ্ঠে জানালো,
“নাইস টু সি ইউ গোলাম কিবরিয়া, প্লীজ কল মি তেজস্বিনী।”

*

গাড়িতে কৌশিকের পাশে বসা কালো আর ছাই রঙের শাড়িতে জড়ানো কাশফি যে তার উপর চটে আছে তা কৌশিক ঠিকই টের পেলো। শক্ত মুখে ধারালো চোয়ালে কৌশিক চোখ হারানো সৌন্দর্য্যে আড়ম্বরী কাশফিকে বেশ অনেকক্ষণ ধরে পরখ করছে, কাশফি আজ একটা বিজনেস পার্টিতে বেছে বেছে কৌশিকের আনা সবচেয়ে সুন্দর শাড়ীটা পরেছে আর সাথে তার লম্বা লম্বা হিলস তো আছেই। কৌশিক গলা খাকরী দিয়ে কিছু বলতে যাবে তার পূর্বেই কাশফি পার্স থেকে ইয়ারপডস বের করে ভারী ঝুমকা পরা কানে ইয়ার পডস গুঁজে নেয় তারপর গান ছেড়ে মাথা সিটে এলিয়ে চোখ বুজে নিলো। মূলত কাশফি আজ মিসেস নাহারের সাথে দেখা করবে বলে জানিয়েছিল কৌশিককে কিন্তু কৌশিক তাকে মুখের উপর না করে বলে হুট করেই জানায় যে আজ সে একটা পার্টিতে যাবে আর তার সাথে কাশফিও যাবে। প্রথমে যদিও কাশফি বোঝানোর চেষ্টা করেছিল কিন্তু কৌশিক নিজ সিদ্ধান্তে অটল হয়ে রইলো।

“আমার পার্টিতে যাওয়ার কী দরকার? আমি তো আপনাকে আগেই বলেছিলাম মিসেস নাহারেরকে দেখার জন্য আমি হাসপাতালে যাবো!”

তৎক্ষণাৎ কাশফির কথার বিরুদ্ধে গিয়ে কৌশিক কাঠ কাঠ কণ্ঠে নির্দেশ দিলো,
“প্ল্যান ক্যান্সেল করো কাশফি, আজ তুমি আমার সাথে যাচ্ছো!”

কাশফি তাই রেগে গিয়ে কৌশিকের বারণ অমান্য করে বসলো। কৌশিকের পছন্দের রঙের সবচেয়ে সুন্দর শাড়িটা আর হিলস পরেছে সে। যদিও কৌশিক কয়েকবার কাশফিকে পাল্টানোর জন্য বলেছিল কিন্তু কাশফি এমন ভান করলো যেনো কথা কানেই তুললো না।

পার্টিতে এসেও কাশফির মুখে হাসি নেই, কৌশিক তার বিজনেস পার্টনার আর পরিচিত কয়েকজনের সাথে কথাবার্তায় ব্যাস্ত আর তার পাশাপাশি মুখ ভোতা করে দাড়িয়ে আছে কাশফি। বেশ বিরক্ত হয়ে কাশফি সার্ভার কে দেখে এক গ্লাস লেমনেড নিলো তবে এক চুমুক বসিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে বাকিটা গ্লাস হাতে নিয়ে নাড়লো কেবল। কৌশিক কথার ফাঁকে ফাঁকে কাশফিকে দেখে যাচ্ছিল, সার্ভার এসে তাদের সামনে ড্রিঙ্কস অফার করলে সে ট্রে থেকে না নিয়ে কাশফির হাতের টা নিয়ে পান করলো। কাশফি তবুও ভাবমূর্তিহীন, অবিচল।
কৌশিক চোখ কিঞ্চিৎ ছোট ছোট করে কাশফির অনেকটা কাছে ঘেষে দাড়ালো। শান্ত ভঙ্গিমায় দাড়িয়ে স্থির দৃষ্টি ফেলে, তারপর সুগভীর পুরুষালি কণ্ঠে খানিকটা খাদ মিশিয়ে বললো,
“হাসপাতালে যেতে পারো নি বলে কী তোমার মুড খারাপ হয়ে আছে কাশফি?”

কাশফি একবার তির্যক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ফোস করে নিঃশ্বাস ফেলে নির্লিপ্ত সুরে জবাব দিলো,
“আমার কথার উপর নিজের কথার জোর দিয়েছেন কৌশিক, হাসপাতাল তো জাস্ট একটা ফ্যাক্ট ছিল!”

কৌশিক দমলো না, নিঃশব্দে অনর্থক হাসি হেসে সন্দিহান নজরে পরখ করে কাশফির বাহু আলতো হাতে ধরলো। বিব্রত কাশফি কৌশিকের দিকে চেয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলে,

“এর আগে তো অনেক সময় ছিল তখন মিসেস নাহারের সাথে দেখা করলে না কেনো?”

“সময় হয়ে উঠেনি তাই আজকে ভিজিট করার প্ল্যান করে করেছিলাম।”

“আচ্ছা?”
কৌশিকের কথায় অবিশ্বাস টের পেয়ে কাশফি জিজ্ঞেসা সুলভ ভাবে চাইলো। কৌশিকের হেঁয়ালির সুরের পরিবর্তে উত্তেজিত গলায় শুধলো,

“আপনি কী আমায় সন্দেহ করছেন কৌশিক?”

“তুমি সন্দেহজনক কিছু কী করেছ?”
কৌশিকের কন্ঠনালী কম্পিত পুরু স্বরে কাশফির বুক কাপলো বোধহয়। তবুও সে ভয়ের আভা কিছুতেই কৌশিক পর্যন্ত জানান দিলো না, অস্থির চিত্তে মুখোশ বেঁধে নির্বিকার কণ্ঠে জানালো,
“না।”

“তবে আমিও সন্দেহ করছি না।”

কৌশিক আর কথা না বাড়িয়ে আগের ন্যায় পরিচিত মানুষদের সাথে কথা বলতে লাগলো, তার কথা গড়িয়ে একপর্যায়ে গভীর আলাপ আলোচনায় পরিণত হলো। কাশফি আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে চাইলো না কৌশিক কে কিছু না বলেই সে খানিকটা দূরে বিশাল জানালার পাশে এসে দাড়িয়ে বাহিরের দিকটায় চোখ রাখলো। তার কাছে কৌশিক আসলো বেশ কিছুক্ষণ পর কেবল এই বলার জন্য যে — “আমি আসেপাশেই আছি, আশা করি জায়গা থেকে নড়বে না!”

কৌশিকের আচমকা এমন কঠোরতায় কাশফি প্রথমে থতমত খেয়ে যায় পরক্ষণে বিরক্তিতে চোখ উল্টে নেয়, তবে প্রতুত্তর করলো না। লেভিন এসে কৌশিককে কিছু বলা মাত্র সে লেভিন সহ দোতলার দিকটায় চলতে লাগলো। আড়াল থেকে চোখা দৃষ্টিতে কৌশিকের প্রতিটা মুভমেন্টের উপর নজর দারি করা কাশফি আসেপাশে চাইতেই কৌশিকের প্রাইভেট ফোর্সের কয়েকটা গার্ডের দেখা পেলো। পার্টির প্রতিটা কোনায় কোনায় সিকিউরিটি।
উপায়ন্তর না পেয়ে ভোতা মুখে একজন সার্ভারকে ডেকে আরেক গ্লাস ড্রিঙ্কস নিতে গিয়ে পাশের এক মহিলার সাথে ধাক্কা খেয়ে হাত থেকে পিছলে গ্লাসের পুরোটা ড্রিঙ্কস ছিটিয়ে পড়লো তার শাড়ির উপর।

“ওহ গড, ম্যাম আম রেলি সরি!”
পার্টির মহিলা সার্ভারটার চোখে মুখে আতঙ্ক ভেসে উঠলো, কাশফি চোখ মুখ খিচে একটা গরম নিশ্বাস ফেলে রাগ আয়ত্তে আনতে কিছুক্ষণ মৌনতা পালন করলো তারপর গমগমে সুরে আওড়ালো,

“যা হওয়ার হয়ে গেছে, এট লিস্ট আমাকে ওয়াশরুমে নিয়ে চলুন।”

“অবশ্যই, প্লীজ আসুন।”
কাশফি মহিলা স্টাফের পিছু পিছু গড়গড় পায়ে হেঁটে এসে ওয়াশ রুমে এসে ঢুকলো তারপর পানি ছিটকে কিছুক্ষণ পরিষ্কার করার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে গেলো। বিরক্ত হয়ে সে কাচু মাচু হয়ে থাকা মহিলার দিকে চেয়ে শুধলো,

“স্টাফ রুমে কোনো আনইউজড স্পেয়ার ক্লথ হবে?”

“আমি জানি না ম্যাম, চেক করতে হবে।”

কাশফি ফোস করে নিঃশ্বাস ফেলে চোখ বুজে নেয়, কয়েক দফায় ঘন ঘন শ্বাস ফেলে মাথা পাশ ফিরে শুধলো,
“আপনি বরং আমাকে ব্যাক এন্ট্রেন্স দেখিয়ে দিন আমি গাড়িতে পাল্টে নেবো।”

মহিলা স্টাফ বেশ বেশ চমকে উঠে, চোখ গোল গোল করে হা হয়ে চেয়ে রইলো। পার্টির সিকিউরিটির কড়া এক্ষেত্রে নিরাপত্তার লক্ষ্যে গেস্টদের পিছনের প্রবেশদ্বার ব্যবহার করা কঠোর বারণ কেবল কিছু স্টাফদের জন্য পিছনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করা উন্মুক্ত।
“কিন্তু ম্যাম ব্যাক এন্ট্রেন্স তো…”

কাশফি চোখ ছোট ছোট করে কড়া ভাষায় বললো,
“তাহলে আপনি কি চাইছেন আমি আপনার বিরুদ্ধে আমার গায়ের কাপড় নষ্ট করার অভিযোগ তুলি?”

মহিলা স্টাফ তৎক্ষণাৎ আতকে উঠে বললো, মাথা নেড়ে জানালো ‘না’, ভয়ার্ত কন্ঠে আকুতির স্বরে বললো,
“প্লীজ ম্যাম এমন করবেন না, আমাকে পিছন দরজা খুলে দিতে কেউ যদি দেখে তবে নির্ঘাত আমার চাকরি চলে যাবে।”

কাশফি পার্স খুলে একটা খাম বের করে মহিলা স্টাফের হাতে ধরিয়ে দেয় তারপর নেম ট্যাগে চোখ বুলিয়ে বেশ শান্ত কণ্ঠে বললো,
“মিস ঐশী, আপাদত তুমি এটা রাখো আর আমাকে আমার পথ দেখাও।”

মহিলা স্টাফ ঐশীকে বিচলিত হতে দেখা গেলো। খাম হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে আসেপাশে দেখে নিয়ে গলা নামিয়ে ফিস ফিস করে জানালো,
“আপনি আসুন আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।”

পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে কাশফি কিছুটা এগোতেই সাদা রঙের টয়োটা গাড়ির দেখা পেলো। অবিচল হয়ে ধীর পায়ে হেঁটে গাড়ির পাশে এসে ড্রাইভিং সিটের বিপরীত পাশের দরজা খুলে ঢুকে পড়লো। তারপর ড্রাইভিং সিটে থাকা তেজস্বিনী কে ইশারায় গাড়ি স্টার্ট করতে বলে প্যাঁচ না খুলেই কোনো রকম শাড়ি গা থেকে সরিয়ে চট করে ফতুয়া আর প্যান্ট পরে নিলো।

“গোলাম কিবরিয়া কী ব্রডকাস্ট নিয়ে সব প্রস্তুত করে রেখেছেন?”

“হ্যাঁ, তোফায়েল মির্জার আস্তানার আসেপাশে পুলিশ ফোর্স ঘেরাও করে নিয়েছে।”

“ভালো।”
কাশফি ফোনে গোলাম কিবরিয়ার নাম্বার ডায়াল করে কানে ধরলো। তবে তেজস্বিনী তথা ঈশিতাকে অস্থির হতে দেখা গেলো, হাত গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলে রেখে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশা মিশ্রিত কণ্ঠে আফসোসের সুরে,

“কৌশিক জেনে গেলে কিন্তু বিপদ বাড়বে আরিয়ানা আর তোর প্র্যাগনেন্সির বিষয়ে জানলে তো আমি কথা এতদূর আগাতামই না!”
কাশফি তেজস্বিনীর দিকে চাইলো একবার তারপর কানে ফোন ধরা অবস্থায়ই ছোট বক্সের লক খুলে সেখান থেকে বেশ কয়েকটা ছোট ছোট স্পাই ডিভাইস, স্পাই ক্যাম, ভয়েস রেকর্ডার নিজের শরীরে আর শার্টের অগোচরে আটকাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো।

“এমনটা আজ নয়ত কাল হবেই হবে ঈশিতা, হয়ত কোনো দিন তার হাতে আমার মুখোশ উন্মোচন হবে নয়ত আমার হাতে তার।”

ততক্ষণে অপর পাশের অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকা গোলাম কিবরিয়া ফোন ধরে কাশফিকে সব কিছুর নিশ্চয়তা দিয়ে দিলেন। কাশফি প্রয়োজনীয় সব ডিভাইস জায়গা মতো সাজিয়ে নিয়ে নিজেকে চেক করে নেয় তারপর তোফায়েল মির্জার বাড়ির ব্যাপারে গোলাম কিবরিয়ার বলা সকল তথ্য মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলো।

“আপনি চিন্তা করবেন না, মিসেস আরিয়ানা কবীর। এখন আপনার সর্বোচ্চ সুরক্ষা দেওয়া আমার গুরু দায়িত্ব। কারণ এটা হতে চলেছে আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে থ্রিলিং রিস্ক আর নাহয় দুর্দান্ত একটা টার্নিং পয়েন্ট এন্ড আম রেডি ফর দিস!”

*

কৌশিক আর লেভিন ঢুকতেই কালো ট্যাংক টপ আর কার্গো ট্রাউজার পরা দিগন্তকে টাওয়ালে ঘাম মুছতে দেখতে পেলো। কৌশিক আর লেভিনের আগমন টের পেয়ে সে হাত থেকে বক্সিং গ্রাভ্স খুলে ফেলে কৌশিকের উদ্দ্যেশে বললো—

“শালার মুখ থেকে আসল কথা বের হচ্ছে না বোধহয়।”
বলেই সে রক্তাক্ত অবস্থায় চেয়ারে বেঁধে রাখা রোয়ান লুকাসের মুখে পানি ছুড়ে তাকে সজাগ করে ফেললো তারপর বাকি বোতলের পানি নিজে ঢক ঢক করে পানি পান করে নিলো।

কৌশিক বিস্ফোরিত নয়নে ভারী পায়ে এগিয়ে চললো রোয়ান লুকাসের দিকে, আবছা নজরে কৌশিকের ভয়ঙ্কর রকমের আভা পরখ করা মাত্র রোয়ান আতকে উঠলো। আর্তনাদ করে তার ভাঙ্গা গলার মেক্সিকান এক্সেন্টে জানায়,
“তুমি আমার বাংলাদেশের বড় মাপের ক্লায়েন্ট কমিয়ে ফেলেছো কৌশিক, এখন ক্লাব নিয়ে আর এই বিজনেস নিয়েও হিমশিম খেতে হচ্ছে আমায় তবে তোমাকে নিয়ে আমি এমন পরিকল্পনা কখনো করিনি।”

কৌশিক ভাবুক ভঙ্গিমায় চোয়াল শক্ত করে চাপা দাড়ির উপর হাত বুলিয়ে ভারী নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো।
“তাহলে তুমি বম তোফায়েল মির্জার কথায় ফিট করোনি বলতে চাইছো?”

রোয়ান বদ্ধ অবস্থায় থেকেই জোর গলায় জানালো,
“আমি তোমার পতন চাই তবে গাড়িতে বম দেওয়ার আইডিয়াটা আমার ছিল না!”

কৌশিক কেবল চেয়ে রইলো কিয়ৎক্ষণ অতঃপর চোখ স্থির রেখে শান্ত স্বরে বললো,
“ঠিকাছে মেনে নিলাম।”

রোয়ানের মুখে পুরোপুরি খুশি ফুটলো না, অবিশ্বাস্য নজরে চেয়ে একবার তেতো হয়ে থাকা দিগন্ত, গম্ভীর মুখো লেভিন আর কৌশিকের দিকে চোখ বুলিয়ে নিলো। খুব মনে হলো তার সাথে মশকরা হচ্ছে তাই রুষ্ট কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো,

“তাহলে আমায় যেতে দাও!”

কৌশিক সম্মতি প্রদানের নির্দেশ দিয়ে মাথা নেড়ে সায় দিলো, চেয়ারের কাছে এসে বেশ খানিকটা ঝুঁকে দুহাত চেয়ারের হাতলে রাখলো। তারপর ধরলো চোয়াল শক্ত করে, তির্যক দৃষ্টি ফেলে পুরু কর্কশ স্বরে বললো,
“তোমাকে ছাড় দেওয়ার একটা কারণ দাও রোয়ান, আমি ছেড়ে দিব।”

চোখ বড় বড় করে নেয় রোয়ান।
“কেমন কারণ?”

“সামথিং, আই নিড টু নো।”

অনেকক্ষণ পিনপতন নীরবতা বিরাজ করলো রুমটায়। কৌশিক, লেভিন, দিগন্ত কিংবা রোয়ান অনড় হয়ে রয়,‌ কেউ টু শব্দ পর্যন্ত করলো না। ঘন ঘন শ্বাস ফেলে রোয়ান জিজ্ঞেস করলো,
“কিভাবে বুঝবো যে তুমি মিথ্যে বলছো না!”

“মুখের কথা না রাখতে পারার মতো কাপুরুষ আমি নই।”

“তোমার বাবা অনেক বড় মাপের প্লেয়ার, ভীষণ স্বার্থপর লোক সে, পুরো লাইফ গা ঢাকা দিয়ে চলেছে। প্রয়াত আবরার কবীরের একমাত্র মেয়ে যে এখনো বেঁচে আছে সেটা তোফায়েল মির্জা বোধহয় আন্দাজ করতে পেরেছে, আমার ধারণা তুমি কিংবা তোমার ওয়াইফকে নিয়ে কোনো প্ল্যান চলছে তার, তাই তোমার গাড়িতে বম ফিট করেছে সে।”

কথা শেষ হওয়ার পরও কৌশিকের মুখের ভাবভঙ্গির পরিবর্তন হলো না বরং কৌশিক মাথা নেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো তারপর গুরু গম্ভীর গলায় নির্দেশ প্রদান করলো,
“তুমি যেতে পারো! লেভিন তাকে ছেড়ে দাও।”

লেভিন প্রথমে জায়গা থেকে নড়লো না কেবল থমথমে মুখে কৌশিকের দিকে চেয়ে থাকল পরক্ষণে নিজেকে পুনরায় ধাতস্থ করে শক্ত মুখে “ইয়েস বস” জানিয়ে রোয়ানের দড়ি খুলে দিলো। রোয়ান যেনো বিশ্বাস করতে পারলো না, দুর্বল শরীর টেনে তুলে হাটা ধরলো। রক্তাক্ত হাত দরজার হ্যান্ডেলে চাপ দিতেই দরজা খোলার আগে বুলেট এসে তার বুক বরাবর সূক্ষ্ম ছেদ করে দিলো।

“আমি ছেড়ে দিয়েছি, ছাড় দেওয়ার কথা বলিনি।”
কৌশিক তার চকচকে কালো হ্যান্ড গান পকেটে ঢুকিয়ে যেই কাশফির লোকেশন ট্র্যাক করে চেক করতে যাবে তার পূর্বেই সিকিউরিটি ফোর্সের কল আসে,

“Boss, she has gone.”

*

“নিজের এক মাত্র ছেলে কেও আপনি জীবিত রাখতে অনিচ্ছুক। অন্তত শেষ সময়ে এসে পূণ্য নাই বা করলেন তবে পাপ মোচন করে নিন।”
পুরো বাড়িটা কোনো পাপে গড়া মহলের কম নয়, কাশফি ভেতরে আসার সময়ও এক দে’হ ব্য’ব’সায়ী মহিলার সঙ্গে তোফায়েল মির্জার কু’রু’চি পূর্ণ ব্যবহার দেখেছে। ঘৃণায় তার গা গুলিয়ে আসলো, এক ছুটে বেরিয়ে আসার কথাও মাথায় এসেছিল তবে তার যে লক্ষ্যচ্যুত হওয়ার নয়!

“পাপ পূণ্যের হিসাব করার মতো মানুষ আমি না।”
কাঠ কাঠ কণ্ঠে জানালেন তোফায়েল মির্জা, বিপরীতে কাশফি ম্লান হাসলো। চোখ প্রখর আর দৃষ্টি তির্যক করে জানালো,

“কিওয়ার্ড — ‘শেষ সময়’ উল্লেখ করেছি আমি তোফায়েল মির্জা।”

তোফায়েল মির্জা গা কাঁপিয়ে হেসে উঠলো।
“আমাকে থ্রেট দিচ্ছ তুমি? আরে তুমি তো শুধু কৌশিকের বে’শ্যা, বুঝলে? আর তুমি কী মনে করছো তুমি নিজের ইচ্ছায় এখানে এসেছো?!”

টেবিলেন এক মাথায় বসা কাশফি ভাবলেশহীন, অপর মাথায় বসা তোফায়েল মির্জার দিকে শান্ত নজরে চেয়ে নির্দ্ধিধায় জবাব দিলো,
“আপনার ভাবনা একান্ত আপনার তাছাড়া আমি আবরার কবীরের মেয়ে সেটা আগেই আপনি জেনে গিয়েছেন, তাই লুকোচুরির সমাপ্তি ঘটিয়ে আপনার সামনে হাজির হয়েছি।”

কাশফির জবাবে তোফায়েল মির্জা বোধহয় চটে গেলেন, কাশফির শান্ত থাকাটা মেনে নিতে পারলেন না। তিনি যেনো পুঙ্খানুুঙ্খভাবে চোখে চোখ মিলিয়ে কাশফির ভয় টুকু গ্রহণ করতে অধীর অপেক্ষায় আছেন। চোখ গরম করে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললেন,

“অপরাজিতার মতো বোকা তুমি! তবে শোনো আজ তুমি নিজের ইচ্ছেতে আসো নি বরং আমি নিয়ে এসেছি তোমায়। নয় বছর আগেই তোমাকে মেরে ফেলার ইচ্ছে ছিল কারণ তুমি কৌশিকের দুর্বলতা ছিলে আর যে একটা মানুষের দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায় সে মানুষটার শক্তিও বটে। কৌশিককে হাতের মুঠোয় আনার পথে বিশাল অন্তরায় ছিলে তুমি আর আরেকজন ছিল কৌশিকের মা কোয়েল। তাই দুজন কেই মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।”

কৌশিকের জীবনের এমন ভয়ঙ্কর অধ্যায় শুনে কাশফি খুশি হতে পারলো না, বুক কেঁপে উঠলো তার। কানের ডিভাইসে স্পষ্টত শুনতে পেলো গোলাম কিবরিয়ার উচ্ছ্বাস। গোলাম কিবরিয়া অগ্রহভরা কণ্ঠে উৎসাহ যোগে জানালেন— “তাকে আরো ক্ষেপিয়ে দাও আরিয়ানা, আমরা ঠিক লক্ষ্যে আছি।”

“কিনান মির্জাকে দিয়ে প্রথমে অপরাজিতা কবীর আর সাত মাসের অহনাফ কবীরের অক্সিডেন্ট ঘটালেন, নিজের স্ত্রীকেও ছাড় দিলেন না আপনি, তারপর মেজর আতিকুর রহমানের মেয়ে ঈশিতা ইমরোজের জীবন নষ্ট করে ফেললেন, ছক কষে আবরার কবীরকেও কিনান মির্জার মাধ্যমে পৃথিবী থেকে মুছে দিলেন। আর এত সব কিছুর মধ্যে আপনি ভিক্টিম কার্ড প্লে করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণিত করে রাখলেন।”
কাশফি খুনের বিবৃতি শুনে তোফায়েল মির্জা হো হো করে বিশ্রী রকমের হাসি হেসে, রুষ্ট কণ্ঠে স্বীকার করে জানান,

“ঠিক ধরেছ আরিয়ানা কবীর, তবে এত খুন করেও আবরার কবীরকে নিজের হাতে মারার সুযোগ মিললো না। তোমার বাবা যেতে যেতে আমার টাকা, ক্ষমতা, যশ সব উড়িয়ে দিয়ে গেলেন।”

তোফায়েল মির্জার নাটকীয় আফসোসেরে সুরে সুর মিলালো কাশফি,
“ইতিমধ্যে আতিকুর রহমান, মিসেস কোয়েল সহ আমার পুরো পরিবারকে মেরে ফেলার স্বীকারোক্তি করে ফেলেছেন আপনি।”

“জানি তবে তুমি এটাও জেনে নাও যে আজ আমাদের দুজনের মাঝে যেকোনো একজন মরতে চলেছে আরেকজন যাবতজীবন কারাদণ্ড পেতে চলেছে।”
সহজ সাবলীল ভঙ্গিমায় কথা শেষ করা মাত্র সে চেয়ার ঠেলে সরিয়ে দাড়িয়ে পকেট থেকে পিস্তল বের করে কাশফির কপালের মাঝ বরাবর তাক করলো তারপর মুখ বেঁকিয়ে কু প্রবৃত্তির হাসি হেসে ফ্যাসফ্যাসে কন্ঠে জানালো,
“হ্যাপী ফ্যামিলি রিউনিয়ন, আরিয়ানা মেহনাজ কবীর।”

তৎক্ষণাৎ কানে বাজলো গোলাম কিবরিয়ার চিৎকার— “ভুলেও ভয় পেও না আরিয়ানা, তোমার ভয় তার শক্তি। আমি পুলিশ ফোর্সকে খবর পাঠিয়ে দিয়েছি, তারা কিছুক্ষণের মধ্যেই সিকিউরিটি সিষ্টেম হ্যাক করে ভিতরে ঢুকে পড়বে!”

কাশফি এবার গোলাম কিবরিয়ার কঠোর নির্দেশ অমান্য করে বসলো, তার চোখে মুখে ভয় প্রদর্শন করার সাথে সাথেই তোফায়েল মির্জার মুখে তৃপ্তির রেশ ফুটলো। আবরার কবীরের পরাজয় পরিকল্পনা করতে করতে আপ্লুত হয়ে গেলো। কিন্তু হার জিত তো আপেক্ষিক ব্যাপার। মূলত এমনটাই কাশফি চেয়েছিল ভয়ের মাধ্যমে যাতে সে তোফায়েল মির্জাকে বিভ্রান্ত করতে পারে, কারণ মাঝে মাঝে যে যা চায় তাকে তা দেওয়ার মাধ্যমেও হার মানানো যায়। একে বলে ম্যানিপুলেশন স্কিল।

অতঃপর মুখে শয়তানের ন্যায় হাসি নিয়ে তর্জনী স্থানান্তর করে ট্রিগারে চাপার পূর্বক্ষণেই যেনো তার তকদির উল্টে যায়। তোফায়েল মির্জার পিস্তল ধরা বাম হাতে পরপর দুটো বুলেট আর দুই হাঁটুতে বুলেট লাগা মাত্রই হাত থেকে পিস্তল নিচে পড়ে যায় আর তৎক্ষণাৎ তীব্র আঘাতে তোফায়েল মির্জার হাত পায়ের নার্ভ সিষ্টেম ড্যামেজ হয়ে গেলো। কুৎসিত রকমের আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। অনিমেষ নেত্রে দামী মার্বেল পাথরের ফ্লোরে তোফায়েল মির্জার র’ক্তের বন্যা বয়ে গেলো।
এদিকে রক্তাভ লাল রঙের হিলস জোড়া পায়ে ঠকঠক শব্দ করে তেজস্বিনী তথা ঈশিতা সিঁড়ি ডিঙিয়ে নামলো, হাতে তার সাদা রঙের বোতল। হেঁটে হেঁটে তোফায়েল মির্জার ব্যথায় কাতরানো দেহের সামনে এসে তার বুকে পা তুলে স্টিলেটোর ধরলো হিল বুকে চেপে ধরে শুধলো,

“কিরে মা***** বল তো এটা আমায় কবে দিয়েছিলি?”

তার দিকে তাক করা বন্দুকের দিকে চেয়ে এবার তেজস্বিনীর দিকে চাইতেই যেনো চক্ষু চড়কগাছ। বিস্ময় কাটিয়ে উঠতেই প্রচণ্ড আ’ক্রো’শ নিয়ে রুক্ষ কণ্ঠে বললো,
“তেজস্বিনী, শা\লী শু\য়ো\রে\র বাচ্চা!”

তেজস্বিনী তোফায়েল মির্জার বুকে হিলসের ধরলো প্রান্ত আরো চেপে ঘা করে ফেললো তারপর কঠোর স্বরে জানালো,
“ভুল উত্তর, ১৫ সেপ্টেম্বর দিয়েছিলি আমায় কারণ কি ছিল বলতো?”

“জানিনা, জন্মদিন?”
তোফায়েল মির্জার উত্তর শোনা মাত্রই তেজস্বিনী বিরক্ত প্রকাশে গোঙ্গিয়ে উঠে ডান হাতে পর পর তিনবার বুলেট চালিয়ে ক্রুদ্ধ হয়ে বলে,

“দুইবার ভুল বলেছিস চু/দ/মা/রা/নী/র পুত আমি আতিকুর রহমানের মেয়ে আর ১৫ সেপ্টেম্বর তুই আমার সাথে প্রথম শুয়ে ছিলি বলেই আমায় এই লাল রঙের স্টিলেটো গিফট করেছিল তাই ভাবলাম আজ বিশেষ দিনে এটাই না হয় পরে আসি।”

তোফায়েল মির্জা চোখ কোটর হতে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো, আশ্চর্য্যের শীর্ষে উত্তীর্ণ হয়েছেন যেন, হা হয়ে সুধলেন,
“তোর নাম তেজস্বিনী না?”

“নারে বুড়া হারামী আমি শাবানা, সিনেমা করতে আসছি তোর সাথে নে ভোগ কর!”
ঈশিতা এবার তার পেলভিসে বুলেট চালাতেই সে তীক্ষ্ম শব্দে আর্তনাদ করে সেনসেটিভ জায়গায় আঘাত প্রাপ্ত হয়ে মরা কান্না জুড়িয়ে দেয়। অবস্থা বেগতিক দেখে কাশফি টেনে ঈশিতাকে সরিয়ে দাতে দাত চেপে বললো,

“ঈশিতা যথেষ্ঠ হয়েছে তুই এবার কিন্তু একে মে’রে ফেলবি।”

“ম’রারই দরকার!”

“পুলিশ জে’লে আটকে দিবে ঈশিতা বোঝার চেষ্টা কর।”

তেজস্বিনী-ঈশিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাশফির কাধে হাত রেখে নরম গলায় বললো,
“মনে আছে তোকে আমি বলে ছিলাম আমার সময় কম, এইচআইভি পজিটিভ আমার। তোকে এই এবস্থায় দেখলে কৌশিক নিজ হাতে তোফায়েল মির্জার খুন করবে, পরে দেখা যাবে তাকে ঝামেলায় পড়তে হবে। তাই ভাবলাম আমি জেলে গেলেই বা কি!”

কাশফি বিস্ময় বিমূঢ়, থ মেরে দাড়িয়ে স্তম্ভিত অবস্থায় মিনমিন করে জিজ্ঞেস করলো,
“কি?! তুই—”

“আর এই শয়তান কে শেষ না করে গেলে মরার পরও বাবার মুখোমুখি হতে পারবো না অন্তত এইবার না হয় বাবা আমার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে বুকে টেনে নিবেন, অনেক কষ্ট দিয়েছি মানুষটাকে।”

ঈশিতা কাশফির প্রতিক্রিয়ার জন্য দাড়ালো না, মূহুর্তের মধ্যেই সাদা বোতলের ছিপি খুলে তোফায়েল মির্জার দেহে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়ে লাইটার বের করে ছুড়ে মারলো। পরক্ষণে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকলো জলজ্যান্ত একটা দেহ, আর্তনাদ আর চিৎকারে শিউরে উঠলো পরিবেশ। কাশফি বরফের মতো জমে গেলো যেন, চোখের সামনে যেনো সে একটা ইতিহাস পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখছে। কিছুক্ষন পর কৌশিক আর পুলিশ পৌঁছে গেলো অবশ্যই ততক্ষণে খুব একটা দেরী হয়নি বোধহয়।
তবে কাশফির উদ্দ্যেশে অবিচল মুখে থাকা হ্যান্ডকাফ পরা পুলিশের গাড়িতে তেজস্বিনীর শেষ কথা ছিল —
“আমায় ক্ষমা করে তোর স্মৃতি থেকে ভুলিয়ে দিস আর আজ যা করেছি তার জন্য আমি মোটেই অনুতপ্ত নয়।”

*

স্যাঁতস্যাঁতে জায়গার মিনমিনে আলোর কক্ষের মেটালের বারের তৈরি লক খুলে ইন্সপেক্টর টেবিলে হ্যান্ডকাফ পরে থাকা মহিলাটার দিকে চেয়ে দেখলেন। কিছুক্ষন পরখ করে চেয়ার টেনে বসে শেষ বারের মতো বললেন,

“আপনি, আরিয়ানা মেহনাজ কবীর আপনার পরিবারের খুনি তোফায়েল মির্জাকে ইচ্ছাকৃত খুন করতে চেয়েছেন।”

“জ্বি।”

“নিজের হয়ে বলার মতো আপনার আর কিছু কী আছে?”

তেজস্বিনী মাথা নেড়ে কাঠ কাঠ জবাব দিলো —“না, এই মুহূর্তে শুধু তোফায়েল মির্জার মৃ’ত্যু কামনা করছি।”

ইন্সপেক্টর দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, তবে আশ্বস্ত গলায় বললেন,
“তোফায়েল মির্জা মৃত্যু শয্যায় আছে আর হাসপাতালে পুলিশ কাস্টডিতে আছে সে। দেখুন আমি আপনার শাস্তি কমিয়ে আনার জন্য আমি যথেষ্ঠ চেষ্টা করবো।”
তেজস্বিনী হ্যাঁ না কিছুই বললো না বরং মুখ খুলে ইন্সপেক্টর কে শক্ত কণ্ঠে জানালো,

“কৌশিক মির্জা কিংবা তার ওয়াইফ কেউ যদি আমার সাথে দেখা করতে চায় তবে মানা করে দিবেন, আমি কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ইচ্ছুক নই।”

***

পরিশিষ্টঃ
ছোট ছোট কদম ফেলে নরম পায়ে দৌড়ে গিয়ে দরজার সামনে এসে দাড়ালো কৃত্তিকা, দরজা খোলা মাত্রই দমকা হাওয়ায় তার মাথার পাতলা চুল দুলিয়ে দিয়ে গেলো। তিন বছরের কৃত্তিকা লম্বা শ্বাস নিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো, মুহূর্তেই গাড়ির শব্দ পেয়ে তার মুখে হাসি ফুটলো, পরক্ষণে কালো গাড়ি থেকে তার বাবাকে বের হতে দেখে ছোট ছোট দাঁত বের করে খিলখিলিয়ে হেসে নেচে কুদে একাকার। এক দৌড়ে গিয়ে ছুটে চললো তার বাবার কাছে, তারপর বাবাকে হাঁটু গেঁড়ে মাটিতে নামতে দেখেই এক লাফে কোলে উঠে বিশ্বজয়ের এক হাসি হাসলো। মেয়েকে বুকে মিশিয়ে কৌশিকের বুকে শীতলতা ছেয়ে গেলো যেনো, প্রতি রাতে নিয়ম করে মেয়েটা তার জন্য দরজার সামনে অপেক্ষা করে আর যেই গাড়ির শব্দ হবে কৃত্তিকা তার বাবাকে দেখার জন্য ধুপ ধাপ নেমে পড়বে। কৌশিক মেয়ের গায়ের ঘ্রাণ টেনে নিয়ে প্রশান্তির অনুভব পেলো, আদুরে ভঙ্গিমায় বেশ নরম স্বরে শুধলো,
“সাড়ে এগারোটা বাজে, এতো রাত জাগা কী ভালো মা?”

“তো কি করবো? তোমাকে ছাড়া আমার তো ঘুমই আসছিল না আব্বু।”
কৃত্তিকা বাচ্চা বাচ্চা কণ্ঠে হাত নেড়ে নেড়ে ঠোঁট ফুলিয়ে বললো তারপর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে অভিমান করার ভান ধরলো। কৌশিক ফুলো গালে চুমু বসিয়ে মেয়ের নানান বায়না আবদার শুনতে লাগলো। হেঁটে হেঁটে দরজা ভিজিয়ে বাসার ভিতরে আসতেই ছেলেদের রুম হতে কাশফিকে বের হতে দেখা গেলো। তার ছেলে দুটো তার মতোই বুঝদার, তারা বাবার কঠোর সময়ানুবর্তিতার হেরফের করেনা আর মেয়েটা ঠিক উল্টো। কাশফি যেমন বাচাল, পন্ডিত আর দুরন্ত স্বভাবের ছিল কৃত্তিকা ও ঠিক তেমন হয়েছে।

ঘরের মহামান্যিতা কৃত্তিকার বায়না মোতাবেক কৌশিক ফ্রেশ হয়েই মেয়েকে কোলে নিয়ে তার বাড়ির দোতলার লিভিং রুমে চলে গেলো তারপর পিয়ানোর স্টুল টেনে এক পাশে বসে মেয়েকে কোলে বসিয়ে পিয়ানোর নোটে আঙ্গুল চালিয়ে কৃত্তিকার পছন্দের একটা পিয়ানো পিস চালাতে শুরু করলো। পিয়ানোর সুরে পুরো বাড়ির দোতলা হয়ে নিচতলা পর্যন্ত পুলকিত হলো যেন, এহেন মায়াময় সুরের টানে তো কাশফি মোহিত হয়েছিল পূর্বে। সুরেলা শব্দে ঘুমুঘুমু চোখে এসে মেয়ে আর স্বামীর কাছে পৌঁছে গেলো কিছুক্ষণের মধ্যেই। গায়ে পাতলা চাদর জড়িয়ে স্টুলে কৌশিকের পাশে তার জন্য রাখা ফাঁকা জায়গা দেখে প্রফুল্ল মনে কৌশিকের পাশ ঘেষে বসে তার কাধে মাথা রাখলো। কৌশিক কাশফির ঠোঁটে টুপ করে চুমু খেয়ে ইশারায় মুখ করে জানালো ‘বাকিটা মেয়ে ঘুমানোর পর’ তার পর আবার পিয়ানোতে চোখ রাখলো।
কাশফি পিয়ানোর সুরে চোখ বুজে নিলো, অতীত নিয়ে সে আর ঘাটতে যায়নি। যে যেমন থাকতে চায় তাকে তেমন ছেড়ে দিয়েছে। হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর প্রতি অপরিসীম কৃতজ্ঞতা রেখে সে তৃপ্তি নিয়ে নিজের সুখটুকু বুঝে নিলো। আলতো হাতে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে পিয়ানোর সুরে সুর মিলিয়ে গুণ গুণ করে গাইতে লাগলো,

We could leave the Christmas lights up ’til January
And this is our place, we make the rules
And there’s a dazzling haze, a mysterious way about you dear
Have I known you 20 seconds or 20 years?
Can I go where you go?
Can we always be this close forever and ever?
And ah, take me out, and take me home
You’re my, my, my, my
Lover
We could let our friends crash in the living room
This is our place, we make the call
And I’m highly suspicious that everyone who sees you wants you
I’ve loved you three summers now, honey, but I want ’em all
Can I go where you go?
Can we always be this close forever and ever?
And ah, take me out, and take me home (forever and ever)
You’re my, my, my, my
Lover

(সমাপ্ত)

বোনাস: কৌশিক মির্জার ঘষামাজা কপাল
#অদৃষ্টের_মৃগতৃষ্ণা (পর্ব ৪২)

“আব্বু তোমার আর আম্মুর দেখা কিভাবে হয়েছিল?”
কৃত্তিকা তার ছোট গোলাপি রঙের তোয়ালে দিয়ে বাবার গা মুছে দিয়ে আবার জর মাপতে মুখে থার্মোমিটার রাখলো, মুখে কী এক কড়া কড়া ভাব। মেয়েটা বোধহয় সেকেন্ডে সেকেন্ডে কৌশিকের জর মাপতে ইচ্ছুক, অবশ্যই কৌশিক এতে বেশ খুশি। সারা দিনে বউয়ের অ্যাটেনশন না পেলেও সে কৃত্তিকার সেন্টার অফ আটেনশন। কৌশিক নাক টেনে হালকা কেশে দুর্বল স্বরে উত্তর দিলো,

“তোমার আম্মু খুবই অসহ্য রকমের চিপকু মেয়ে ছিল, আমার কাছ থেকে পিয়ানো বাদ্য শোনার নাম করে প্রতিদিন জ্বালানোর জন্য হাজির হয়ে যেত।”

রান্নাঘর থেকে বেশ জোরে জোরে শব্দ হলো, তার ম্যাডাম চটেছে বোধহয়। তৎক্ষণাৎ কৌশিক দুষ্টুমির ছলে হাসলো। সে তো কান পেতে রেখেছিল কাশফির রেসপন্স শোনার জন্য, সারা দিন এটা ওটা বলে ঘ্যানঘ্যান প্যানপ্যান করলেও কানে তুলবে না কিন্তু যেই নিজের নামে কিছু বলতে শুনবে তখন হলো..

কৃত্তিকা মন খারাপ করে তার বাবার কপালে চুমু দিয়ে আফসোসের সুরে বললো,
“ওহ হো আব্বু, কত কষ্ট হয়েছিল তোমার। আমি থাকলে তো আম্মুকে তোমার কাছে আসতেই দিতাম না, তুমি তখন আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে নাও নি কেনো আমায়?!”

কৌশিক যেন থতমত খেয়ে গেলো। কী বলতে কী হয়ে গেলো? মেয়ের মা তো নবালিগা ছিল তখন আর মা ছাড়া মেয়েকে চাওয়া কী আলিফ লায়লার কারসাজি ব্যাপার নাকি? কৌশিক গলা খাকরি দিয়ে স্বাভাবিক হয়ে এলো তারপর এনিয়েবিনিয়ে নরম স্বরে মেয়েকে বোঝালো—

“ওসব ব্যাপারে অভ্যস্থ হয়ে গিয়েছিলাম তখন আর তোমার আম্মুর প্রতি মায়া হতো তাই আর কিছু বলিনি।”

কৌশিকের কথায় কৃত্তি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবুক হয়ে জানালো,
“আব্বু তোমার মনে হয় ছোট বেলায় মনের অসুখ হয়েছিলে তাই বিরক্তিকর মানুষের প্রতি মায়া হয়েছিল তোমার।”

কৌশিক তৎক্ষণাৎ মুখ ভোতা করে নিলো। তার মেয়ের উপর চাচাতো ভাইয়ের বউয়ের প্রভাব পড়েছে বোধহয়। সাবেক মেয়র তথা বর্তমান সচিবের বউ আমেরিকান সিটিজেন এবং একজন সাইকাইট্রিস্ট। মেয়ে বিদেশি চাচীর ভক্ত তাই সপ্তাহে একবার হলেও কাশফি মেয়েকে কায়সার মির্জার বাসায় নিয়ে যায়।

“তুমি কি আব্বুকে পাগলের সাথে তুলনা করলে?”
কৌশিক চোখ ছোট ছোট করে চাইলো, তবে কী মেয়েটা মায়ের মতো তাকে পচিয়ে দিলো? কৃত্তীকা বিরক্তমায় চোখ উল্টে বললো,
“উফ আব্বু, সমস্যা থাকলেই কী কেউ পাগল হয়ে যায়?!”

নিকটস্থ জায়গা থেকে কাশফির গলা ফাটানো হাসির শব্দ শোনা গেলো যেন সে কৌশিককে দেখিয়ে দেখিয়ে হাসছে। কৌশিক বিশেষ পাত্তা দিলো না বরঞ্চ রসিয়ে রসিয়ে কথা ঘোরালো,

“বহুকাল আগে তিন বাচ্চার মা আমায় বলেছিল ‘আপনাকে রান্না করে খাওয়ানো দুর এক গ্লাস পানি ঢেলে খাওয়াবে সেই রাজ কপাল নিয়ে জন্ম হয়নি আপনার কৌশিক মির্জা’।”

“কত বড় সাহস তার?! আমার আব্বুকে এমন বলেছিল সে? কে বলেছিল আব্বু?”
কৌশিককে কিছু বলতে হলো না কোত্থেকে হনহন করে এসে কাশফি কৌশিকের পাশে বসে, মুখের সামনে সুপের চামচ বাড়িয়ে অপেক্ষা করে। কৌশিক মুচকি হেসে যেই সুপ টেনে নিলো সেই গরমে পুরো জিভ জ্বলে নাজেহাল অবস্থা হয়ে যায়। চোখ মুখ খিচে একবার ধোয়া উঠা গরম সুপের দিকে চেয়ে আবার কাশফির দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকায়। ম্যাডাম যে সাথে সাথে কড়ায় গন্ডায় হিসেব নিয়ে ফেলেছে তা বুঝতে বাকি নেই কৌশিকের।

ঝাঁঝালো কণ্ঠে শুধলো কাশফি,
“হুশ কোথায় থাকে তোমার?”

কৌশিক মেয়ের থেকে কিছুটা দূরে সরে কাশফির কানের কাছটায় এসে জিজ্ঞেস করলো,
“অসুস্থতায় ও কি তোমার রেহাই পাওয়া যাবে না ম্যাডাম?”

কাশফি চোখ রাঙিয়ে কৌশিকের চোখে চোখ রেখে কঠিন গলায় বললো,
“তিন বাচ্চার মা তোমায় রেঁধে খাওয়াচ্ছে যে সেটাই তোমার সাত রাজার কপাল আবার খোঁচা দাও কোন সাহসে?”

কৌশিক চোখ কিঞ্চিৎ ছোট করে নেয়, তারপর কাশফির হাত টেনে শক্ত ভঙ্গিমায় ফিসফিসিয়ে জানালো,
“শোধ আমি মেয়ে ঘুমানোর পরের সেশনের জন্য তুলে রাখলাম।”

“ছুটিতে আছি তাই পরবর্তী সাত দিন যাতে আশেপাশে ঘেঁষতে না দেখি!”

“দুর, শালার ফুটো কপাল।”

কাশফি বিজয় উল্লাস মুখে সুপ শেষ করতে বলে কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলো। কিছুক্ষন পর কৌশিকের ছেলেদের রুমের পাশ থেকে গলা ফাটিয়ে কায়েস চিৎকার দিয়ে উঠলো,

“ভাইয়া, পানি খেতে গিয়ে আমার নাকে মুখে উঠে গেছে। আপনি কি আমায় গাল মন্দ করলেন?”

***
সমাপ্ত।