অপেক্ষার বসন্ত পর্ব-০৩

0
142

#অপেক্ষার_বসন্ত
ফাহমিদা তানিশা
পর্ব ০৩

আরাবির তো আগে অনেক সুন্দর করে কথা বলতো। দুজনেই সমবয়সী হ‌ওয়ায় একসাথে থাকতো। সুখ-দুঃখের কথা বলতো।কিন্তু আজ আরাবি কেন এভাবে কথা বলছে?সেও কি তার ভাইয়ের মতো হয়ে যাচ্ছে?এসব ভাবতে অর্নির চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো।একা একা দাঁড়িয়ে থেকে তো কোনো লাভ নেই।তাই সে ছাদের দিকে পা বাড়ালো।ধীর পায়ে ছাদে গেলো।

সকালে আরাফের পাশে জুঁইকে দেখে তার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। তখন থেকে খুব কষ্ট লাগছে। ভালোবাসার মানুষটাকে অন্যের পাশে ক’জন মেয়ে দেখতে পারে?তার মধ্যে হাসবেন্ড হলে তো একদমি কথায় নেই। অর্নি না পারছে কাউকে বোঝাতে,না পারছে নিজে সহ্য করতে। কাছের কোনো মানুষকে মনের কথাগুলো বোঝালে হৃদয়টা একটু শান্ত হয়। এখন তো তার বোঝানোর মতো কেউ নেই।যদি বাবা-মাকে এসব বলতে যায় তাহলে তার মা ভীষণ কষ্ট পাবে।তার মায়ের কোনো ছেলে না থাকায় একমাত্র বোনের একমাত্র ছেলে বলে আরাফকে তিনি খুব আদর করেন। এখন যদি জানতে পারে তার চোখের মণি আরাফ স্বেচ্ছায় তার মেয়ের জীবনটা শেষ করছে তাহলে তার কষ্টটা অর্নির চেয়ে দ্বিগুণ হবে।এমনেও বাবা-মা সন্তানের খারাপ দেখতে পারেন না। তাই অর্নি সিদ্ধান্ত নিয়েছে কাউকে কিছু বলবে না।নিজেই সব সহ্য করবে। ‌যেদিন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাবে সেদিন বাকিটা ভেবে দেখবে সে।

বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হ‌তে চলছে।আবছা আলোয় অস্পষ্ট হয়ে আছে পৃথিবীটা।তার মধ্যে আকাশটা মেঘলা হয়ে আছে। নীল আকাশটা ধূসর হয়ে থাকায় অর্নির বেশ ভালো লাগছে। তার মনটাও তো এমন অন্ধকার আর ধুলোয় ভরা হয়ে আছে। চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে তার মনের কথাগুলো বলছে। চোখ দুটি বন্ধ হলেও অঝোর চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে তার গাল বেয়ে। হঠাৎ ভারি বর্ষণ শুরু হলো।বৃষ্টির অঝোর ধারা এসে তাকে ছুঁয়ে দিলো। প্রকৃতির সাথে সেও ভিজে একাকার হয়ে গেলো।আকাশটা এখন স্বচ্ছ হতে শুরু করেছে।তার মনটাও কি এভাবে আচমকা স্বচ্ছ হয়ে যেতে পারে না?সব তো সৃষ্টিকর্তার মর্জি। হঠাৎ কারো ডাক পেয়ে সে পেছনে তাকালো।আরাফ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে তাকে জোর গলায় ডাকছে আর হাতের ইশারা করছে। অর্নি তাকে দেখে ছুটে আসলো। মনে মনে ভাবছে, তার মনের আকাশটাও কি স্বচ্ছ হতে শুরু করেছে? কিন্তু সে তো জানে না তার নিজস্ব আকাশটা স্বচ্ছ করতে তাকে অনেক সাধনা করতে হবে।

আরাফের সামনে দাঁড়াতেই সে একবার অর্নিকে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করলো। তারপর রাগী গলায় বললো:এই সন্ধ্যায় এভাবে বৃষ্টিতে ভিজতে আসলি কেন? মাথায় কি বুদ্ধি নেই তোর? যদি জ্বর আসে তো কি করবি?
_কি আর করবো! ওষুধ খাবো। তাছাড়া আপনি আছেন না?ফ্রিতে কয়েকটা ওষুধ লিখে দিবেন তাতেই হয়ে যাবে।
আরাফ ভ্রু কুঁচকে বললো: তুই ইচ্ছাকৃত অসুখ বাঁধাবি আর আমি তোকে ফ্রিতে ওষুধ লিখে দিবো?
_তাহলে জুঁই ভাবির কাছে যাবো? উনি তো ননদ হিসেবে লিখে দিতে পারেন।
_বাহ্!শখ কতো মহারানীর। জুঁই তোকে ফ্রিতে তো দূরের কথা ফি দিলেও ট্রিটমেন্ট করবে না।
_কেন?আমি উনাকে কি করলাম?আমি যদি স্ত্রী হয়ে আমার একমাত্র জামাইকে উনার জন্য ছেড়ে দিতে পারি, উনি আমাকে ফি নিয়েও ট্রিটমেন্ট করতে পারবে না? সে কি খুব বেশি স্বার্থপর নাকি হাতুড়ে ডাক্তার?

আরাফ অর্নির কথায় মাথা তুলে তার দিকে তাকালো।জীবনে প্রথমবারের মতো আরাফ এভাবে তাকিয়েছে অর্নির দিকে। চোখ দুটো দেখে মনের কথা বোঝা বেশ মুশকিল অর্নির পক্ষে।তাই সে এখনো তাকিয়ে আছে আরাফের চোখ দুটোর দিকে। অর্নি তার চোখের ভাষা পড়তে না পারলেও সে তো চাইলে অর্নির চোখের ভাষাটা বুঝতে পারে।এটা কি এতোই কঠিন কাজ? একটু পর আরাফ চোখ নামিয়ে বললো: জুঁই স্বার্থপর কিনা আমি জানি না তবে তোর মতো মহৎ হৃদয়ের মানুষ নয় সে তা আমি জানি।
_আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করছেন?
_আরে ধুর পাগলি।সত্যিটা বললাম। তুই আমার বোন।আমার মতো হৃদয়বান হবি না?
_আপনার হৃদয় আছে বুঝি?
_হৃদয় ছাড়া মানুষ হয় না মাথামোটা। তুই এসব বুঝবি কি করে? তুই তো আর আমার মতো কার্ডিওলজিস্ট নয়।
_আচ্ছা ওসব বাদ দিলাম। অন্য কথায় আসি।জুঁই ভাবি যদি স্বার্থপর না হয় তাহলে আপনাকে ছেড়ে গিয়েছিল কেন ছয় বছর আগে?
অর্নির কথায় আরাফের এবার রাগ হলো। কিন্তু মনে মনে ভাবলো প্রশ্নটা তো যৌক্তিক। অযৌক্তিক কোনো কথা অর্নি খুব একটা বলে না। অন্যদের সাথে বললেও তার সাথে কখনো বলে না। তবু সে কথাটা এড়িয়ে গিয়ে বললো: রুমে গিয়ে ভেজা কাপড়গুলো চেঞ্জ করে নে। নয়তো ঠান্ডা লাগবে বা জ্বর আসবে।
অর্নি এবার হেসে বললো: ফ্রি ট্রিটমেন্ট করতে হবে এই ভয়ে টেনশন করতে হবে না আপনাকে। আমি একটা নাপা এক্সট্রা খেয়ে নিবো। তাতেই হয়ে যাবে।
আরাফ একবার তার দিকে তাকিয়ে “যা খুশি তাই কর” বলে চলে যাচ্ছিল। তখনি অর্নি থামালো তাকে।
_একটা রিকোয়েস্ট করি?
_বলে ফেল তাড়াতাড়ি।
_যতোদিন আমাদের ডিভোর্সটা হচ্ছে না ততোদিন অন্তত আমাকে বোন বলে সম্বোধন করবেন না।এতে মানুষজন হাসাহাসি করবে। কাজিন পরিচয় দিতে পারেন কিন্তু বোন কথাটা আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে মানানসই নয়। স্ত্রী আর বোনের মাঝে বিশাল তফাৎ আছে। সেটা তো এটলিস্ট আমাদের বুঝতে হবে।
আরাফ আবারো অর্নির দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো। এবারো অর্নি তার চোখের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ। তবে এতটুকু বুঝেছে সে।” স্ত্রী ” শব্দটা আরাফ মন থেকে ফেলতে পারছে না।তাই যতোবার অর্নির মুখে “স্ত্রী ” শব্দটা শুনছে ঠিক ততোবার সে নার্ভাস হয়ে যাচ্ছে। স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কটা পবিত্র সম্পর্ক বলে কথা।তাই স্ত্রী শব্দটা অনেক গুরুত্ব বহন করছে তার মনে।

আরাফ কোনো কথার জবাব না দিয়ে নেমে গেলো।অর্নিও তার পেছন পেছন নামলো।দুজনে রুমে গেলো একসাথে। কিন্তু আরাফ তার ল্যাপটপ আর গাড়ির চাবিটা নিয়ে বেরিয়ে গেলো।সে চলে গেলে অর্নি একেবারে গোসলটা সেরে ফেললো। বৃষ্টির মধ্যে ভিজেছে আবার গোসলও করেছে।তাই তার খুব শীত লাগছে। ভাবলো নিচে রান্নাঘরে গিয়ে একটা চা খেয়ে আসলে মন্দ হবে না।তাই আস্তে আস্তে হেঁটে সে নিচে নামলো। সিঁড়ি বেয়ে কতটুকু যেতে সে বেশ অবাক হলো।অবনি,রকি আর আরাবি সিঁড়িতে বসে আছে। তিনজনের মুখে বিষন্নতার ছাপ। তাদের দেখে বোঝা যাচ্ছে তারা কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তা করছে বা প্ল্যান করছে। অর্নি তাদের কাছে গেলো কিন্তু তারা অন্য ঘোরে আছে এখনো।তাই তাকে দেখতে পেলো না। অর্নি অবনির সামনে গিয়ে একটা তুড়ি বাজাতেই তিনজনের ধ্যান ফিরলো। কিন্তু কেউ কোনো কথা বললো না। অর্নি একবার তাদের দিকে তাকিয়ে বললো:হেই গাইস!কি হয়েছে তোমাদের? এভাবে বসে আছো যে?
রকি গমগমে গলায় জবাব দিলো: আমাদের কিছু হয়নি। তুমি এখান থেকে যাও এখন।
অর্নি কিছু বলতে যাবে তার আগে আরাবি বললো: প্লিজ যাও এখান থেকে। আমাদের একটু শান্তি মতো থাকতে দাও।এসব আর ভালো লাগছে না।

অর্নি এবার কিছু না বলে নেমে গেলো।সে এমন কি করেছে যার জন্য তারা তার সাথে এভাবে কথা বলছে? কিছুই বুঝতে পারছে না।ধীর পায়ে সে রান্নাঘরে গেলো।এক কাপ চা বানিয়ে রুমের দিকে যাবে তখনি দেখলো আরাফের বড় আম্মু মিসেস রেহানা বসে আছে সোফায়। তিনি বসে বসে টিভি দেখছেন। অর্নিকে দেখে বললো: বাসায় কখন আসলে?
_ঘন্টাখানেক হয়েছে এসেছি।
_তোমার খালামনির রুমে গিয়েছো?
_না এখনো যায়নি। কেন? কি হয়েছে?
_দুপুরের আগ থেকে রুমে ঢুকে বসে আছে। এখনো দরজা খুলছে না।এমনকি দুপুরের খাবার‌ও খায়নি।
_শরীর খারাপ লাগছে নাকি?
_না।
_তাহলে কি হলো?
_সেটা তুমি নিজে গিয়ে জিজ্ঞেস করে আসো।
_আচ্ছা যাচ্ছি।

অর্নি দ্রুত পায়ে তার খালামনির রুমের দিকে গেলো।তার পেছন পেছন মিসেস রেহানাও গেলেন। ‌তাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে তিনিও চিন্তিত। যৌথ ফ্যামিলি হ‌ওয়ায় দুই জা এর একসাথে উঠাবসা। দুজনেই মিলেমিশে থাকেন খুব। চিন্তা হ‌ওয়াটাই স্বাভাবিক। অর্নি তার খালামনির রুমে গিয়ে ডাকছে “খালামনি,খালামনি “। কিন্তু তার খালার কোনো সাড়াশব্দ নেই। আবার ডাক দিলো: “খালামনি দরজা খোলেন।কি হয়েছে খালামনি?”
এবারো তিনি কোনো জবাব দিলেন না। অর্নির সাথে সাথে মিসেস রেহানাও ডাকছেন। কিন্তু কোনো রেসপন্স নাই তার।এবার তারা দুজনে জোরে জোরে দরজা ধাক্কাতে লাগলো। অর্নির এখন খুব টেনশন লাগছে। কি হলো তার খালামনির? এভাবে তো কখনো ডাকতে হয়নি তাকে।এক ডাকে সাড়া দেন সবসময় তিনি। কিন্তু আজ এতো ডাকার পরেও সাড়াশব্দ না পেয়ে সে মিসেস রেহানাকে বললো: কোনো কারণ ছাড়া এভাবে রুমের দরজা খুলবে না কেন?
_তোমাদের ডিভোর্সের ব্যাপারটা জানার পর আরাফকে বোঝাতে চেয়েছে। কিন্তু সে রাগারাগি করে।তারপর রুমে চলে গেলো।আর বের হয়নি।
_এখন কি করবো? রুমের দরজা ভাঙবো?
_তাই ভালো হয়।
দু’জনে মিলে দরজা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিলো।তার আগে অবনি,রকি আর আরাবিকে ডাকলো।রকি গিয়ে দরজার দারোয়ানকে ডেকে আনলো। দারোয়ান আসলে দুজনে দরজা ভাঙতে শুরু করলো।

চলবে…