অপেক্ষার বসন্ত পর্ব-০৪

0
127

#অপেক্ষার_বসন্ত
ফাহমিদা তানিশা
পর্ব ০৪

দু’জনে মিলে দরজা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিলো।তার আগে অবনি,রকি আর আরাবিকে ডাকলো।রকি গিয়ে দরজার দারোয়ানকে ডেকে আনলো। দারোয়ান আসলে দুজনে দরজা ভাঙতে শুরু করলো।

দরজা ভেঙে সবাই অবাক হয়ে গেলো।আরাফের মা মিসেস আরমিন রহমান বিছানায় পড়ে আছেন উপুড় হয়ে। বিছানা জুড়ে বমি এবং রক্তের ছাপ আছে।সবাই ধরাধরি করে তাকে তুললো। কিন্তু তিনি অজ্ঞান হয়ে আছেন। তারপর রকি তাকে কোলে নিয়ে গাড়িতে তুললো। সবাই পেছন পেছন গেলো।দ্রুত গাড়ি চলছে। গন্তব্য কাছের হাসপাতালটা যেখানে আরাফ আছে।আরাবি আরাফকে ফোন দিতে চাইলে রকি তাকে বারণ করলো।যার জন্য এই অবস্থা হয়েছে তাকে ফোন করে বলার কোনো দরকার নেই।আরাফের তো বোঝা উচিত ছিল তার মায়ের অবস্থা।একে তো তিনি টেনশনে আছেন নিজের বোনকে কি জবাব দিবেন, সমাজকে কি জবাব দিবেন।তার মধ্যে আরাফ উল্টো রাগারাগি করলো। একজন প্রেসারের রোগী কতো টেনশন করতে পারে আর?তাই তো এই অবস্থা হলো। আজকে মিসেস আরমিনের এই অবস্থার জন্য শুধুমাত্র আরাফ দায়ী।তাই তাকে কিছুই জানাতে হবে না।আরাফের বাবা অফিসে ছিলেন।আরাবি আরাফকে ফোন দিতে না পেরে তার বাবা জনাব রাশেদ সাহেবকে ফোন দিলেন। তিনি তার স্ত্রীর শারীরিক অবস্থার কথা শুনে অনেকটা ঘাবড়ে গেলেন। জোর গলায় বললেন:আরাফের হাসপাতালে তোমার আম্মুকে কিছুতেই নিয়ে যাবে না।অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাবে।ওর মুখ আমরা দেখতে চাই না।

আরাবি অনেক কান্না করছে তাই কথা বলতে পারছে না।তাই অবনি ফোনটা নিয়ে তাকে বুঝিয়ে দিলো।”ছোট চাচ্চু, ছোট আম্মুর অবস্থা তেমন ভালো নয়। অন্য হাসপাতালে যেতে যেতে অনেকটা দেরি হয়ে যাবে। রাস্তায় অনেকটা জ্যাম।”

কথাটা শুনে জনাব রাশেদ সাহেব ভয় পেয়ে গেলেন। এখনতো আর কোনো উপায় নেই।আরাফের হাসপাতালেই নিয়ে যেতে হবে।তাই তিনি ছোট গলায় “আচ্ছা নিয়ে যাও। আমি আসছি” বলে ফোনটা কেটে দিলেন।

অর্নি চুপচাপ তার খালামনির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। অনেক কান্না করছে সে। মনে হচ্ছে সবকিছুর জন্য সেই দায়ী। তার প্ল্যান ছিল ডিভোর্সের বিষয়ে কাউকে কিছু বলবে না। চুপি চুপি ডিভোর্সটা হয়ে গেলে সে অথবা আরাফ যেকোনো একজন বিদেশ চলে যাবে আর অন্যজন যেকোনোভাবে পরিস্থিতি সামাল দিবে।কিন্তু সে কি জানে সবাই বিষয়টা জেনে যাবে?আর এমন একটা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি হয়ে যাবে। এমন একটা পরিস্থিতিতে কাকে দোষ দিবে তা সে বুঝতে পারছে না। নিজেকে নাকি আরাফকে নাকি জুঁইকে।আরাফের বাবাকেও তো দোষটা দেওয়া যায়।এসব ভাবতে ভাবতে হাসপাতালে পৌঁছালো তারা।

গাড়ি থেকে নেমে সবাই মিলে মিসেস আরমিনকে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে গেলো।সেখানের দায়িত্বরত চিকিৎসক আরাফের বন্ধু ডা: তামিম।সে তাদের চিনতে পেরে দ্রুত গেলো। প্রাথমিকভাবে সে একবার চেক করলো কিন্তু পরিস্থিতি তার কাছে ভালো মনে হচ্ছে না।তাই নার্সকে বললো:”সিনিয়র চিকিৎসককে ফোন দাও। নার্সটা”ওকে স্যার ” বলে ফোন দিতে গেলো।আরেকজন নার্স তামিমের মুখ থেকে আরাফের মা শুনে চলে গেলো আরাফকে ডাকতে। কিন্তু কেউ তা জানে না। এদিকে তামিম সবাইকে বাইরে গিয়ে স্পেস করতে বললো।তাই সবাই এক প্রকার বাধ্য হয়ে ইমারজেন্সি রুম থেকে বের হয়ে গেলো। বাইরে একটা জায়গায় চারজনে দাঁড়িয়ে আছে।শুধু মিসেস রেহানা থাকলেন আরাফের মায়ের সাথে।

নার্সটা গিয়ে আরাফকে বলার সাথে সাথে সে দৌড়ে আসলো ইমার্জেন্সি রুমে। রুমের সামনে অর্নিরা সবাই দাঁড়িয়ে থাকায় তারা তাকে দেখতে পেলো। তাকে দেখেই আরাবি থামিয়ে দিলো: তুই কোথায় যাচ্ছিস?

আরাফ দ্রুত আসায় তাদের দেখতে পায়নি এতোক্ষণ। হঠাৎ আরাবির গলা শুনে সে তাকালো।অবাক হয়ে বললো:কেনো? আম্মুর ওখানে যাচ্ছি আরকি।

_তুই আম্মুর কাছে যাবি না।

_আমি আম্মুর কাছে যাবো কি যাবো না সেটা তুই বলার কে?

এই বলে সে রুমে ঢুকে যাচ্ছিল। তখনি আরাবি তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।” তুই যেতে পারবি না মানে পারবি না। এতো নেচে নেচে আম্মুর কাছে যাচ্ছিস কেনো? আম্মুর এখনো নিঃশ্বাস আছে তাই নিঃশ্বাসটা সহ বন্ধ করে দিতে যাচ্ছিস?”

আরাবির কথায় আরাফের মেজাজ চরম পর্যায়ে খারাপ হয়ে গেলো। রেগে গিয়ে বললো:এক থাপ্পড় দিয়ে দাঁত সব ফেলে দিবো।বুঝেছিস?

রকি এবার কথা বললো:তোর সাহস একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না আরাফ?এতো তেজ আমাদের দেখাতে আসিস না। ছোট চাচ্চু বলেছে তোকে দেখতে না দিতে। তাকে গিয়ে দেখা সব তেজ।

আরাফ এবার আরো অবাক হলো।তার বাবা বারণ করেছে মানে সে কিভাবে ভেতরে যাবে? এতো টুকু সাহস তার এখনো হয়নি। একটু ইতস্তত করে বললো:আব্বু তো এখানে নেই। তোরা যেতে দিলে তো হয়। আম্মুকে ট্রিটমেন্ট করতে হবে এটা তোরা বুঝিস না?

অবনি কথাটা শুনে তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো। তারপর হাসি থামিয়ে বললো: তুই তো বীরপুরুষ। তুই ট্রিটমেন্ট না করলে ছোট আম্মু আজীবন অসুস্থ থেকে যাবে। তোকে কি আটকানো যায়?

আরাফ অবনির কথায় তার দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে।সে কি সত্যি যেতে বললো নাকি আরাফকে অপমান করলো?রকি আর আরাবির দিকেও একবার তাকালো। তাদের মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে অবনি তাকে ভদ্র ভাষায় অপমান করলো।সবার মুখ থমথমে হয়ে আছে দেখে আরাফ এবার অর্নির দিকে তাকালো। এখন অর্নি তার শেষ ভরসা।এরা তিনজন যেতে না দিলেও অর্নি তাকে অবশ্যই যেতে দিবে এবং ওদের রাজি করাবে।তাই সে অর্নিকে উদ্দেশ্য করে বললো:এই অর্নি, ওদের বোঝা একটু। আমি ভেতরে যাবো। ওদের বল আমাকে যেতে দিতে।

অর্নি আরাফের কথা শুনতে পায়নি এমন করে দাঁড়িয়ে আছে।আরাফ ভাবলো অর্নি শুনতে পায়নি।তাই সে অর্নির দিকে গিয়ে আবার বললো: অর্নি ওদের বল আমাকে ভেতরে আম্মুর কাছে যেতে দিতে। আমার কিন্তু খুব টেনশন হচ্ছে।

অর্নি এবার জবাব দিলো: আপনার বাবাকে গিয়ে বলুন। আমার এখানে কিছুই বলার নেই।

আরাফ তার দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকালো। তারপর বললো:তার মানে তোরা চারজনেই এক দলে আছিস?

কেউ তার কথায় জবাব দিলো না। জবাব না পেয়ে সে আরেক দফা অপমানিত হলো। কোনো উপায় না পেয়ে সে হাসপাতালে দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে। তখনি ইমারজেন্সি রুম থেকে তার বন্ধু ডাঃ তামিম বের হলো।আরাফ ছুটে গেলো তার কাছে।রকিও পেছন পেছন গেলো। দুজনেই একসাথে জিজ্ঞেস করলো:কি অবস্থা এখন?

তামিম একটু থামলো। তারপর বললো:আন্টি স্ট্রোক করেছে।স্যার বলেছেন আইসিইউতে নিয়ে যেতে। তোরা দ্রুত শিফট কর।

তামিম ভেতরে চলে যাচ্ছিল। আবার পেছনে ফিরে বললো: তুই এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ভেতরে আন্টির কাছে চল।

তামিমের কথায় আরাফ নতুন একটা সুযোগ পেলো।কেউ বারণ করার আগেই সে দ্রুত ইমার্জেন্সি রুমে প্রবেশ করতে যাবে। তখনি জমদূত মানে তার বাবা হাজির। জোর গলায় হুকুম দিলেন তিনি।”আরাফ তুমি ভেতরে যাবে না”।

কথাটা শুনে আরাফ এবং তামিম দুজনেই থেমে গেলো। বাবার কথায় ধীর গতিতে দরজা থেকে সরে দাঁড়ালো সে।তামিম একবার তার দিকে তাকিয়ে ভেতরে চলে গেলো। তার বাবাও তামিমের পেছন পেছন ভেতরে গেলো।আর রকি হাসপাতালের রিসিপশনে গেলো আইসিইউ বুক করতে।

তামিমের সামনে তার বাবার এমন আচরণ তাকে আরো অপমানিত করলো।তার চোখ দুটো ছলছল করছে করছে।একে তো মা অসুস্থ তার উপর অপমানের পর অপমান।চোখের পলক ফেললেই জল গড়িয়ে পড়বে এমন অবস্থা তার।তাই সে একটু দাঁড়িয়ে তারপর সেখান থেকে চলে গেলো।রোজ রোজ অপমান আর বন্ধুদের কানাঘুষা তাকে পাগল বানিয়ে ছাড়ছে।তার মধ্যে তামিম সব বন্ধুদের এসব গিয়ে বলবে আর সবাই আরো ঠাট্টা করবে তাকে নিয়ে।এসব কিভাবে মানা যায়? জুঁই ফিরে আসার পর থেকে তার জীবনটা আবার পাল্টে গেলো।তার অতীতটা ভয়ংকর হলেও এখনের পরিস্থিতির চেয়ে ভালো ছিল। কিন্তু এখন সব সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে।কি করবে সে? কিভাবে সব আগের মতো করবে তা তার জানা নেই।অর্নির জীবনটা কেমন হবে?তার জীবনটা কেমন হবে?সব শুধু এখন ধোঁয়াশা।

ডাক্তার বারবার পর্যবেক্ষণ করছে। ডঃ আরাফের মা হ‌ওয়ায় এক্সট্রা কেয়ার করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।তাই অবস্থার উন্নতি হচ্ছে দ্রুত।

দুইদিন পর মিসেস আরমিনের জ্ঞান ফিরলো।এই দুদিনে কেউ আরাফকে তার মায়ের কাছে যেতে দেয়নি। অনেকবার চেষ্টা করেছে যাওয়ার জন্য। কিন্তু সফল হতে পারেনি সে।সে একজন ডাক্তার হয়ে কতো মানুষকে সেবা করে সুস্থ করেছে। কিন্তু নিজের মাকে সেবা তো দূরের কথা,দেখতেও পারছে না।এর চেয়ে বড়ো কষ্ট আর কি হতে পারে? একজন সন্তানের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে দামী এবং মূল্যবান সম্পদ তার মা।তার মধ্যে আরাফ তার মাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।বলা চলে পৃথিবী একপাশে আর তার মা আরেক পাশে।সেই মাকে সে দেখতে পারছে না।কতোটা অস্বস্তি লাগছে,কতোটা বিষন্ন লাগছে তা শুধু আরাফ জানে। কাউকে বোঝানোর ক্ষমতা তার নেই।তার চেয়েও বড়ো কথা তার মায়ের অসুস্থতার জন্য তাকে দায়ী করা হচ্ছে। শুধুমাত্র আরাফ আর তার মা জানে তাদের দুজনের মাঝে কি কথা হয়েছে?কেনো তার মা এতো টেনশন করেছে? প্রথমে সে একটু রাগারাগি করেছে তা ঠিক।পরে সব ঘটনা বুঝিয়ে বলেছে। কিন্তু তা কেউ জানে না।তাই তো সবাই তাকে ভুল বুঝছে।তার মা কথা বলতে পারলে তখন হয়তো সব সমস্যার সমাধান হবে।তাই শুধু অপেক্ষা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

চলবে….