অপেক্ষার বসন্ত পর্ব-০৮

0
147

#অপেক্ষার_বসন্ত
ফাহমিদা তানিশা

পর্ব ০৮

ধীর পায়ে উঠে গিয়ে ফোনটা হাতে নিলো। স্ক্রিনে “আরাফ ভাই ” নামটা ভাসছে।আরাফ কেনো তাকে এতো রাতে ফোন দিবে?কোনো সমস্যা নয় তো?
ফোনটা রিসিভ করে কানে দিয়ে “হ্যালো” বললো।
অর্নির কথায় আরাফের কোনো রেসপন্স নাই।সে চুপচাপ।অর্নি আবারো ” হ্যালো ” বললো। এবারো আরাফের সাঁড়া শব্দ নেই।

অর্নির এবার কিছুটা রাগ হলো। ফোন দিয়ে কথা না বললে যে কারো রাগ উঠা স্বাভাবিক। তাই গম্ভীর গলায় বললো: ফোন দিয়ে কথা বলছেন না কেনো?

আরাফ এবারো কোনো জবাব দিলো না। জবাব না পেয়ে অর্নি বললো:ওকে ফাইন,আমি ফোনটা কেটে দিচ্ছি।
_ফোন কাটার জন্য কি ফোন দিয়েছি তোকে?
_তাহলে কি কথা না বলে চুপ থাকার জন্য ফোন দিলেন?
_তা না। নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছি আরকি।
_কি বলবেন?বলেন তাড়াতাড়ি। ঘুমাবো।
_এতো কিছুর পরেও তোর চোখে ঘুম আসছে। আমার তো ঘুম আসছে না।তার মানে আমি একাই বলদ। আসলেই সব মেয়ে সেইম। জুঁই যেমন তুইও তেমন।স্বার্থপরের মতো ছেড়ে চলে যায়।যদি চলেই যাবি তো আমার লাইফে আসলি কেন?
_আপনিই তো ডিভোর্স চাইলেন। আমার কি দোষ?
_ডিভোর্স চাইলেই তো আর ডিভোর্স হয় না। তুই মাথামোটা তাই বুঝবি না। কয়েকদিন জুঁইকে নিয়ে উকিলের কাছে ঘুরতাম।আর ওকে বোঝাতাম ডিভোর্সটা হচ্ছে।তারপর ডিভোর্সটা চূড়ান্ত হ‌ওয়ার আগে ক্যান্সেল করে দিতাম।ব্যাস। তখন আর ডিভোর্স হতো কি করে? কিন্তু বাড়িতে জানাজানি হয়ে যাওয়ায় সব শেষ হয়ে গেলো।
আরাফের কথায় অর্নি অবাক হয়ে গেলো।এসব বলে কি?আরাফ তাকে না বলে নিজে নিজে সব করছে।
_আপনি নিজেই সব প্ল্যান করলেন? আমাকে বলা উচিত ছিল না?একা একা দুজনের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন।
_মানে?
_মানে এদিকে আমাকে ডিভোর্স ডিভোর্স বলে পাগল করছেন আর অন্যদিকে জুঁইকে দেখাচ্ছেন আমাকে ডিভোর্স দিবেন। আমার জীবনের এতো বড় একটা সিদ্ধান্ত নিজে নিজে নিলেন আর আমাকে কিছুই বললেন না।এতো কিছু কেনো করছেন?
_সময় হলে সব বলবো।
_এখন বলতে সমস্যাটা কোথায়? আপনি যদি কোনো ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন তাহলে আমাকে বলুন। আমি নিজে সব চেষ্টা করে আপনাকে উদ্ধার করবো।
_আপাতত আমাদের বাড়িতে চলে এসে আমাকে উদ্ধার কর।তাতেই হবে। আমার একা একা ভালো লাগছে না।
_আপনাদের বাসায় যাবো কি করে?
_কেনো?তোকে তো বললাম ডিভোর্সটা হবে না। এখন তো আর আমাদের বাড়িতে থাকতে আপত্তি নেই।
_আমি বুঝতে পারছি না আপনি আমার সাথে প্রতারণা করছেন নাকি জুঁইয়ের সাথে?
_আমাকে তোর প্রতারক মনে হয়?
_অবশ্য‌ই। আপনি জুঁইকে মিথ্যা বললেন কেনো?
_কি মিথ্যা বললাম আবার?
_আপনি আমাকে ডিভোর্স দিবেন বলেছেন জুঁইকে। তাকে সাথে নিয়ে উকিলের কাছেও গেলেন। এখন আমাকে বলছেন ডিভোর্সটা চূড়ান্ত হ‌ওয়ার আগে আপনি উইথড্র করে নিতেন। তাহলে প্রতারণা নয় কি?
_এই এতো সৎ হ‌ওয়ার দরকার নেই। প্রতারকের সাথে প্রতারণা করতে হয়। কোন জনমে ভুল করে তার প্রেমে পড়েছিলাম তার মাশুল এখনো আমাকে দিতে হচ্ছে।আর আমি তার সাথে প্রতারণা না করে তাকে আদর করে আবার ঘরে ঢোকাবো? মানে দুধ-কলা দিয়ে কালো সাপ আনবো বাসায় ছোবল মারতে।
_আপনি প্লিজ আমাকে সব খুলে বলুন। আমার সবকিছু মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।
_বলবো না। আগে আমাদের বাসায় চলে আয় আবার। তারপর বলবো।
_তখন আটকালেন না কেনো?
_আটকানোর সুযোগটা আর পেলাম কোথায়?
_সুযোগ ঠিকই ছিল কিন্তু আপনার আগ্রহ ছিল না। আপনি চান আমি চলে আসি ওই বাড়ি থেকে।
_এই তুই চলে যাবি চাইলে কি আর তোকে ফোন দিয়ে চলে আসতে বলতাম?
_আমি কি জানি!
_ট্রাস্ট মি। তোকে ছাড়া আমি এই বাড়িতে থাকতে পারছি না আর।
_কেনো?
_জানি না।একা একা রুমের মধ্যে ভালো লাগছে না।
_তাহলে বাইরে গিয়ে অবনি আপুদের সাথে আড্ডা দেন।
_বাড়ির কেউ তো আমার সাথে কথায় বলছে না। তুই চলে যাওয়ার পর আর কেউ এদিকে আসলোও না।
_তাই আমাকে ভুলভাল বুঝিয়ে নিয়ে যেতে চাইছেন বুঝি?
_এই তুই কি আমাকে বিশ্বাস করিস না?আমি মিথ্যা বলবো কেন?
_আমার সব প্রশ্নের উত্তর দিন। তাহলে বিশ্বাস করবো।
_একবার আমাদের বাড়ি চলে আয়।তোর সব প্রশ্নের উত্তর দিবো।ইটস মাই রিকোয়েস্ট। প্লিজ ।
_আব্বু-আম্মু আমাকে নিয়ে এসেছে। আসার সময় যদি আমাকে আটকাতেন তাহলে না হয় থাকতে পারতাম। কিন্তু এখন যেতে বলে কোনো লাভ নেই।আমি এখন যাওয়া মানে আম্মু-আব্বুর অপমান হ‌ওয়া।
_মানে তুই আসবি না?
_হুম যাবো না। আপনার যদি মনে হয় লাইফ পার্টনার হিসেবে বা আমার জীবন এতে জড়িয়ে আছে সেই হিসেবে আমাকে সবকিছু জানানো প্রয়োজন তাহলে আপনি আমাকে বলবেন। অন্যথায় বলবেন না।
_তাহলে দেখা কর।
_পারবো না।সব সমস্যা আমাকে খুলে বলবেন। আমার যৌক্তিক মনে হলে দেখা করবো।আর অযৌক্তিক মনে হলে দেখা করবো না।
_আমাকে জালে জড়িয়ে এখন সব সুদে-আসলে তুলে নিচ্ছিস তাই তো। ভালো।সময় আমারো আসবে একদিন।
_আমি আপনাকে কিসের জালে আটকালাম?
_প্রায় নয় বছর আগে এক জালে আটকে গেছিলাম এখনো নিস্তার পায়নি।আর এখন তোর জালে আটকে গেলাম। জানি না এই জন্মে আর নিস্তার পাবো কিনা।
_আপনাকে আমি কেনো জালে আটকাবো?
_তুই কি করে আমাকে জালে আটকাবি? আমি নিজেই তো তোর পাগলামির জালে গিয়ে আটকালাম।
_তাই তো মুক্তি চাইলেন।আর আমিও মুক্তি দিয়ে দিবো।
_বাহ্! আমার জীবনটাকে নরক বানিয়ে এখন সে মুক্তি দিবে আমাকে।তোর জন্য এতো কিছু হচ্ছে।বাই দ্যা ওয়ে, ফোন রাখ। কালকে দেখা হচ্ছে।
_আরে আমি দেখা করবো না।

অর্নির শেষ কথার কোনো জবাব না দিয়েই আরাফ ফোন কেটে দিলো। অর্নি মনে মনে ভাবছে দেখাটা হবে কোথায়?সে তো যাবে না বললো তবু দেখা হবে কি করে?এসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে গেছে তার জানা নেই।

সকালে মায়ের গমগমে গলায় ঘুম ভাঙলো অর্নির।”এই অর্নি, এখনো ঘুমাচ্ছিস”।তার মা বেশ রেগে আছেন বোঝা যাচ্ছে তার কথায়।আস্তে আস্তে চোখ খুলে সামনের দিকে তাকালো সে। ঘুমঘুম কণ্ঠে বললো:কি হয়েছে আম্মু?ঘুমটা এভাবে ভেঙে দিলে?
_মানুষকে বসিয়ে রেখে সে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে।আরো বলে ঘুমটা ভেঙে দিচ্ছি।উঠ তাড়াতাড়ি।
_আমি আবার কাকে বসিয়ে রাখলাম?
_কেনো?আরাফ সেই কখন থেকে এসে বসে আছে। আজকে নাকি কোর্টে যেতে হবে।আর তুই এখনো ঘুমাচ্ছিস?

মায়ের কথায় ধড়মড়িয়ে উঠলো অর্নি। আজকে কোর্টে যাবে কেনো সে? এমন কোনো কথা তো তাদের ছিল না। তাছাড়া এডভোকেট শাহানা তাকে তো কিছু জানালো না।অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো: আজকে কোর্টে যেতে হবে কে বলেছে? কোর্টে যাবো কেনো শুধু শুধু?

অর্নির কথায় তার মা সামনের দিকে ইশারা করে বললো:আরাফ কখন থেকে এসে বসে আছে কোর্টে যেতে হবে তাই।আর তুই বলছিস কোর্টে যাবি কেনো?
অর্নি মায়ের ইশারায় সেদিকে তাকালো।আরাফ সোফায় বসে বসে ফোন টিপছে।তার মানে সে চলে এসেছে অর্নিদের বাসায়। কিন্তু আজ তো কোর্টে যেতে হবে না?

অর্নি উঠে আরাফের কাছে গেলো।অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো:আজ কোর্টে যেতে হবে কে বলেছে আপনাকে?
আরাফের এক কথায় উত্তর:উকিল
_কিন্তু আমাকে তো যেতে বললো না।

অর্নির কথায় আরাফের কোনো জবাব নাই।তা দেখে অর্নি বললো:আচ্ছা আমি একবার এডভোকেট শাহানাকে ফোন করি।আজ কোর্টে যেতে হবে সেটা জানতাম না। অফিসে একটা মিটিং আছে।

আরাফ এবার দ্রুত উঠে দাঁড়ালো। গম্ভীর গলায় বললো: আবার শাহানাকে কেনো ফোন করতে হবে? আমাকে যেতে বলেছে তাই আমার সাথে যাবি। খালামনির কাছ থেকে অর্ডার আমি নিয়েছি। এবার রেডি হয়ে আয়।

অর্নি একবার মায়ের দিকে তাকালো।তার দৃষ্টিতে বোঝা যাচ্ছে আরাফ যাওয়ার পারমিশন নিয়েছে।
ধীরে ধীরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসলো। কিন্তু তার কেমন জানি মনে হচ্ছে আরাফ তাকে কিছু মিথ্যা বলছে।আরাফের চোখমুখ দেখে এতটুকু অনুমান করতে পারছে সে। কিন্তু একদিনের মধ্যে আরাফ এতো কিছু কেনো করছে? এতো দিন এতো দূরত্ব বজায় রাখতো আর হঠাৎ কাল থেকে উদ্ভটের মতো পেছনে পড়ে আছে।বিষয়টা কি অর্নির মাথায় আসছে না।

অর্নি রেডি হয়ে আরাফের সাথে বের হলো।আরাফ গাড়িতে উঠে অর্নিকে উঠতে বললো।অর্নি শান্ত কন্ঠে একবার তাকালো। তারপর বললো: আমি আমার গাড়িতে করে যাবো। আপনার সাথে কোর্ট পর্যন্ত যাবো কিন্তু কোর্ট থেকে অফিসে যেতে আবার গাড়ি নিয়ে ঝামেলায় পড়তে হবে।তাই আমি আমার গাড়িতে করেই কোর্টে যাবো।
_কোর্টে যাচ্ছে কে?
_কেনো?আপনি তো বললেন উকিল ডেকেছে।

অর্নির কথায় আরাফ সামান্য হাসলো। তারপর শান্ত কন্ঠে বললো:ওটা মিথ্যা বলেছি খালামনিকে।যদি বলতাম,খালামনি আপনার মেয়েকে নিয়ে একটু বাইরে যাবো। তখন আমার বারোটা বাজাতো। এখন কোর্টে বলায় যেতে দিচ্ছে।
_মানে?আমি তাহলে অফিসে চলে যাচ্ছি। আপনি আসুন।
_আমি তোর সাথে কথা বলবো তাই খালামনিকে মিথ্যা বলে এখানে এসেছি। এখন তুই অফিসে চলে গেলে কথা কি করে বলবো?
_গতকাল‌ও আপনার বাসায় ছিলাম। তখন তো একটা কথাও বললেন না। একদিনের মধ্যে এতো বাহানা দিয়ে কথা বলতে চলে আসছেন? মানেটা কি? আমার কিছু একটা গণ্ডগোল লাগছে।
_তখন তো বুঝতে পারিনি এতো কিছু হবে। কালকে তুই চলে আসার পর থেকে মনে হচ্ছে সব নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
_আমার কাজ আছে। এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে দেরি হয়ে যাবে।
_ওকে,গাড়িতে উঠে বস।

অর্নি গাড়িতে উঠে বসলো। তারপর আরাফ গাড়ি স্টার্ট দিলো।
_এখন কোথায় যাবেন?
_আপাতত কোথাও যাবো না। গাড়িতেই কথা শেষ করবো। তারপর তোকে তোর অফিসে নামিয়ে দিবো।
_বলুন তাহলে এমন কি সিক্রেট কথা যা এতোদিন বললেন না।
_সিক্রেট কথাটা আজ‌ও বলবো না।

আরাফের কথায় অর্নির রাগ হলো।এতোকিছুর পরেও সে আসল কথাটা না বললে তো জগাখিচুড়ি হয়ে যাবে।তাই রেগে বললো:মানে? তাহলে আমি যাচ্ছি কেনো আপনার সাথে?
_আরে এতো হাইপার হচ্ছিস কেন?কথাটা এখন বলা যাবে না। একটু সময় দে আমাকে।আমি সব ঠিক করে নিয়ে তোকে বলবো।
_আমাকে বললে সমস্যাটা কোথায়?
_তোকে বলতে পারলে তো আগেই বলতাম।এতোদিন নিজে নিজে এতো কিছু করতাম না।আরেকটু সময় দে। শুধু এক মাস।
_তাহলে আজ কথা বলবেন বলে আনলেন কেনো?

কথাটা শুনে আরাফ একটু থামলো। সে তো অনেক কথা বলতে চায়। কিন্তু বারবার আটকে যায়। অর্নি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে আরাফের দিকে। হয়তো তার কথাগুলো শোনার অপেক্ষায় আছে সে। আরাফ একবার অর্নির দিকে তাকালো। তারপর হঠাৎ গাড়িটা থামালো।
_গাড়ি থামালেন কেনো?
_গাড়ি চালাতে চালাতে কথা বললে কখন যে দুনিয়া থেকে আউট হয়ে যাবো তার বিশ্বাস নাই।তাই থামালাম।
_ওকে এবার বলুন।
_আমাকে ভালোবাসিস?

আরাফের কথায় অর্নি চোখ তুলে তাকালো তার দিকে।এতো বছর ধরে একতরফা ভালোবাসার পর যদি কেউ জিজ্ঞেস করে ভালোবাসে কিনা তাহলে তাকে কি জবাব দেওয়া যায়?তাই কোনো জবাব না দিয়ে অর্নি চুপ করে আছে।তার কাছ থেকে কোনো জবাব না পেয়ে আরাফ বললো: ওকে ফাইন।তোর বলতে হবে না। আমিই বলি।

চলবে…