অপেক্ষার বসন্ত পর্ব-১০

0
161

#অপেক্ষার_বসন্ত
ফাহমিদা তানিশা
পর্ব ১০

ছেলেটি তাকে দেখে মুচকি হেসে বললো:ম্যাম আমার গাড়িতে আসতে পারেন।
অর্নি অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। ছেলেটাকে আগে কোথায় যেনো সে দেখেছে। কিন্তু আপাতত মাথায় আসছে না।এই ছেলের গাড়িতে উঠা কি যৌক্তিক হবে? তাছাড়া না উঠে উপায় নেই আর।অর্নি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব ভাবছে তখনি ছেলেটা বললো: নিশ্চয় আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না? বিশ্বাস করতে পারেন। আপনাকে নিয়ে পালিয়ে যাবো না। অবশ্য পালিয়ে যেতে চাইলেও যেতে পারবো না। আপনার টিম ঠিকই উদ্ধার করে নিবে।
ছেলেটার কথায় অর্নি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো:আপনি আমাকে চিনেন?
_অবশ্য‌ই চিনি।চিনি বলেই তো গাড়ি থামালাম। আপনি একজন সিআইডি অফিসার।একটা কেসের ইনভেস্টিগেশন করতে গিয়েছিলেন সেখানে আপনাকে দেখেছিলাম।এখনো ভুলতে পারিনি।

অর্নি বুঝতে পারলো এই ছেলে একটু বাঁচাল টাইপের।এক প্রশ্নের জবাব এতো বিশাল হলে তো বোঝায় যায় কতো কথা বলে সে।এই ছেলেকেও যদি ইগো দেখাতে যায় তাহলে উল্টো তার লস হবে। তখন আবারো আগের মতো হেঁটে হেঁটে যেতে হবে।তার চেয়ে বরং উঠে পড়ুক এই গাড়িতে। অবস্থা বুঝে না হয় আবার নেমে যাবে সে। আড়চোখে ছেলেটা একবার পর্যবেক্ষণ করলো সে। কিন্তু ছেলেটার চোখ তা এড়াতে পারেনি।সে মুচকি হেসে বললো: ম্যাডাম,সন্দেহ করছেন এখনো?

এই বলে সে তার আইডি কার্ডটা বের করলো।অর্নি চোখ বড় বড় করে সেদিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ কি ভেবে বিদ্যুৎ গতিতে গাড়িতে উঠে বসলো সে।যাকে আজ খুঁজতে যাবে বলে ঠিক করেছে সে যদি নিজ থেকে এসে হানা দেয়,তার চেয়ে আনন্দের বিষয় আর কি হতে পারে?এতো মেঘ না চাইতে বৃষ্টি। তাহলে তো ভাবনা-চিন্তা বাদ দিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে উঠে যেতেই হয়। ছেলেটি আচমকা এমন কাণ্ডে একবার অবাক চোখে তাকালো অর্নির দিকে। ছেলেটি আর কেউ নয় ডঃ পারভেজ মানে জুঁইয়ের হাসবেন্ড। রুমানার দেওয়া ফাইলে এই ছবিটা স্পষ্ট ছিল। কিন্তু তার চিনতে এতো সময় লাগলো।দিন দিন এসব কি হচ্ছে তা অর্নির জানা নেই।

অর্নি গাড়িতে উঠে বসলে ছেলেটা গাড়ি স্টার্ট দিলো। অর্নি ভাবছে কিভাবে সব তথ্য বের করা যায়?ধুম করে প্রশ্ন করে বসলো: আমাকে এভাবে লিভ দিচ্ছেন সেটা ব‌উ জানলে কি আস্ত রাখবে?
অর্নির কথায় পারভেজ হেসে উঠলো। তারপর হাসি থামিয়ে জবাব দিলো:ব‌উ থাকলেই তো এসব ভাবতে হতো।
কথাটা শুনে অর্নি রাগী দৃষ্টিতে তাকালো। পুরুষ মানুষের একটাই সমস্যা। মেয়ে দেখলেই তার সিঙ্গেল দাবি করে। তাই পারভেজের কথায় ঠাট্টার ছলে বললো: দেখুন ভাই,আমার সামনে মিথ্যা বলে শুধু শুধু সিঙ্গেল সাজতে যাবেন না।
_আরে আমি সিঙ্গেল কখন সাজলাম?আমি ডিভোর্সড।

কথাটা শুনে অর্নির মাথায় বাজ পড়লো।তার মানে সত্যি পারভেজের সাথে ডিভোর্স হয়ে গেছে। তাহলে নিশ্চয় জুঁই আরাফের কাছে ফেরত আসবে। কিন্তু আরাফ তাকে বোকা পেয়ে ভুলভাল বুঝিয়ে যাচ্ছে। আসলে ঠিকই জুঁই আর আরাফের মাঝে সম্পর্কটা এখনো আছে।আরাফ কেনো এমন করছে?সে কি দোটানায় পড়ে এমন করছে? এমন তো হবে না। তাকে একজনকে সুজ করতে হবে।হোক সেটা জুঁই বা অর্নি। মনে মনে ভাবছে এই আরাফকে আর সুযোগ দেওয়া যাবে না।

ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো: আপনার ডিভোর্স হয়েছে?
_জি।
_কতোদিন হলো?
_এইতো প্রায় তিন বছর হতে চললো।
এতো আরেক দফা চমকে যাওয়ার মতো কথা। অর্নির মনের প্রশ্নগুলো আরো বেড়ে গেলো। আজকে আর পারভেজকে ছাড়া যাবে না।সব কথা জেনে তারপর ছাড়বে সে। শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো: আপনার সাবেক স্ত্রীর নাম কি?
_জুঁই সরকার। পেশায় একজন ডাক্তার। এখানেই চেম্বার করে। আপনি চাইলে কখনো দেখে আসতে পারেন।ভালো গাইনি বিশেষজ্ঞ।
_কেনো ডিভোর্স হলো?মানে কারণটা যদি বলতেন?

কথাটা শুনে পারভেজ মুচকি হাসলো। তারপর বললো: ডিভোর্স হতে কারণ লাগে?
_অবশ্য‌ই লাগে।
_না।কথাটায় ভুল আছে।আপনার আমার কারণ লাগলেও সবার তো কারণ লাগে না। সত্যি বলতে আমি কারণটা জানি না।
_কারণ না জেনে ডিভোর্স দিয়ে দিলেন?
_টক্সিক রিলেশনশিপে থাকার চেয়ে একেবারে চ্যাপ্টার ক্লোজ করে দেওয়া বেটার।

কথাটা শুনে অর্নি হাসলো। আসলেই কথাটা যৌক্তিক। কিন্তু সে কিছুতেই চ্যাপ্টার ক্লোজ করতে পারছে না। অবস্থা যা বেগতিক মনে হচ্ছে তাতে করে সেও হয়তো চ্যাপ্টার ক্লোজ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা এবার নিয়েই নিবে। কিন্তু পারভেজের কথার সত্যতা কতটুকু তা আগে জানতে হবে।গাড়ি প্রায় অফিসের কাছাকাছি চলে এসেছে।তাই আর কথা না বাড়িয়ে অর্নি বললো: আপনার কোনো ভিজিটিং কার্ড পাওয়া যাবে?

অর্নির কথায় পারভেজ তো খুশিতে লুচির মতো ফুলে গেছে। দ্রুত ওয়ালেট থেকে একটা ভিজিটিং কার্ড নিয়ে অর্নিকে দিলো।অর্নি তা হাতে নিয়ে ছোট গলায় “ধন্যবাদ” বললো। পারভেজ অর্নির অফিসের গেইটে গিয়ে গাড়িটা থামাতে অর্নি নেমে গেলো। শান্ত কন্ঠে বললো: ধন্যবাদ লিভ দেওয়ার জন্য।
_শুধু ধন্যবাদ দিলে হবে না।আসবেন কিন্তু অফিসে।
_যাবো বলেই তো নিলাম।

কথাটা শুনে পারভেজের চোখমুখে খুশির ঝিলিক মারছে। এতো সহজে একজন সিআইডি অফিসারকে পটিয়ে ফেলতে পারলো সে। খুশি তো হ‌ওয়ার কথা। কিন্তু সে কি জানে অর্নি কেনো দেখা করতে যাবে?

অর্নি অফিসের গেইট দিয়ে ভেতরে যাবে তখনি গেইটের মধ্যে একটি প্রতিবিম্ব দেখতো পেলো। দ্রুত পেছনে ফিরলো সে।আরাফ গাড়ির ভেতর থেকে তাকিয়ে আছে তার দিকে। রাগ যে একশো আশি ডিগ্রীর উপরে উঠেছে তা স্পষ্ট আবিষ্কার করতে পারলো অর্নি।তাতে অর্নির কি?সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আরাফকে নিয়ে আর ভাববে না। কিন্তু আরাফ এখানে আসলো কেনো?তার মানে সে অর্নিকে ফলো করছিল।আর অর্নি পারভেজের গাড়িতে উঠাই তার মেজাজ চরম পর্যায়ে। অর্নি একটু ভাবলো।আসলেই তাই হয়েছে। অর্নি গাড়ি থেকে নেমে হাটা শুরু করেছিল তখন আরাফের গাড়ি তাকে অতিক্রম করে যায়নি। মানে সে অর্নির কাণ্ড দেখতে পেছনে ছিল। হয়তো ভেবেছিলো কতদূর আসার পর অর্নির রাগ ভাঙলে আবার তুলে নিবে গাড়িতে। কিন্তু কে জানতো তার সামনে থেকে পারভেজ এসে অর্নিকে লিভ দিয়ে যাবে।রাগটা ঠিক কার উপর হচ্ছে তা আরাফ এখনো বুঝতে পারছে না। নিজের উপর না অর্নির উপর। মনে মনে ভাবছে সবকিছুর মূল জুঁই।কি দরকার ছিল তখন ফোন দেওয়ার?

অর্নি একপলক আরাফের দিকে তাকিয়ে অফিসে ঢুকে গেলো।আরাফ‌ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেলো।তার সব প্ল্যান মাটি হয়ে গেলো আজ।

অর্নি অফিসে গিয়ে আবারো রুমানার ডেস্কে গিয়ে বললো:হাই রুমানা।
অর্নিকে দেখে রুমানা উঠে দাঁড়ালো। ছোট গলায় বললো:হ্যালো ম্যাম।
_তুমি গতকাল পারভেজের একটা ডকুমেন্টারি ফাইল দিয়েছিলে।আজ আরেকটু কষ্ট করে পারভেজ আর জুঁইয়ের সম্পর্কের সকল তথ্য আর এভিডেন্স আমাকে বের করে দাও।
_ওকে ম্যাম।আমি এক্ষুনি দিচ্ছি।
_ওকে থ্যাংকস।

এই বলে অর্নি রুমানার ডেস্ক থেকে বেরিয়ে গেলো। রুমানা এসব তথ্য বের করতে করতে সে অন্য কাজগুলো শেষ করবে এই ভেবে নিজের ডেস্কে গেলো। প্রায় পনেরো থেকে বিশ মিনিট পর রুমানা আসলো অর্নির রুমে।
_ম্যাম আসতে পারি?
_হুম আসো।কি পেলে?
_ম্যাম দেখুন।

এই বলে রুমানা তার হাতে থাকা ল্যাপটপ থেকে জুঁই আর পারভেজের ডিভোর্স পেপারটা দেখালো। আসলেই তাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে।আর ডিভোর্স হয়েছে প্রায় তিন বছর হতে চলছে।তার মানে পারভেজ সব কথা সত্যি বললো।এই পারভেজের সাথে এবার দেখা করতেই হয়।তার কাছ থেকে কোনো তথ্য নিতে পারলে মন্দ কি?

ব্যাগ থেকে পারভেজের দেওয়া ভিজিটিং কার্ডটা বের করে তাকে ফোন দিলো। কয়েকটি রিং হওয়ার পর সে রিসিভ করলো:কে বলছেন?
_আমি অর্নি।
_কোন অর্নি?
_একটু আগে লিভ দিলেন আর এখনি ভুলে গেলেন?
_ওহ সরি।এতো তাড়াতাড়ি ফোন দিবেন তা ভাবতে পারিনি।
_ফ্রি আছেন?
_আপনার জন্য সবসময় ফ্রি আছি।
অর্নি কথাটা শুনে মনে মনে হাসলো। আহা বেচারা!কি ভেবে এতো ফ্লটিং করছে কে জানে? একটু পর দেখা হলে তার স্বপ্নের বারোটা বাজবে এই ভেবে অর্নির হাসিটা প্রশস্ত হলো। শান্ত কন্ঠে বললো: তাহলে সবকিছু বাদ দিয়ে একবার আমার অফিসে চলে আসুন।কথা হবে অফিসে আসলে।
_ওকে আসছি।জাস্ট দশ মিনিট।
_আচ্ছা আসুন।

অর্নি ফোনটা কেটে দিয়ে তার কাজে মনোযোগ দিলো। কিছুক্ষণ পর একজন সোর্স আসলো তার রুমে।
_ম্যাম একজন আপনার সাথে দেখা করতে এসেছেন।পাঠাবো?
_হুম পাঠিয়ে দিন।
কথাটা বলে অর্নি ঘড়ির দিকে তাকালো। আসলেই দশ মিনিটের মতো হয়েছে।তার মানে এই ছেলে পারফেক্ট আছে।কথা বা কাজের হেঁয়ালি করে না।যা বলে তাই করে।যদি এমন হয় তাহলে জুঁই ছেড়ে দিলো কেনো?যাক সেটা তাদের দুজনের ব্যক্তিগত ব্যাপার। আগে সে নিজেরটা সামলাক তারপর পরেরটা ভাববে সময় হলে।
পারভেজ অর্নির রুমে আসলো।অর্নি একটু মুচকি হাসি দিয়ে বসতে বললো।সেও খুশি মনে বসলো। একটু হেসে প্রশ্ন করলো:ঘণ্টার মধ্যে ডেকে আনলেন যে?কারণটা কি?
_কারণটা সিম্পল আবার একেবারে সিম্পল নয়। আপনার কাছ থেকে জুঁইয়ের ইনফরমেশন লাগবে?
_মানে? জুঁইয়ের ইনফরমেশন নিয়ে আপনি কি করবেন?
_অনেক কিছু।তার আগে আমার পরিচয়টা দিই।
পারভেজ হেসে বললো: আপনার পরিচয় তো আমি জানি। নতুন করে দিতে হবে কেনো?
_আপনি তো পুরোটা জানেন না।পুরোটা বলি। তাহলে আপনার সব উত্তর বলতে সুবিধা হবে।
_আচ্ছা বলুন।
_ডঃ ফারতাজ আরাফকে চিনেন? কার্ডিওলজিস্ট। মেডিকেলে আপনার ব্যাচমেট ছিল। জুঁইয়ের এক্স বয়ফ্রেন্ড যার সাথে আপনার বিয়ের আগে প্রেম ছিল।
_ হ্যাঁ চিনি।
_আমি তার ওয়াইফ।
কথাটা শুনে পারভেজ মাথা তুলে তাকালো।তার চোখমুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। একটা অচেনা সন্দেহ তার চোখে ভর করছে তা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে অর্নি। পারভেজের মুখ বন্ধ।তা দেখে অর্নি বললো:আমার জানা মতে আপনার আর জুঁইয়ের লাভ ম্যারেজ। দু’জনে পালিয়ে বিয়ে করেছেন। কিন্তু আপনি তো জানতেন জুঁইয়ের সাথে আরাফের রিলেশন ছিল। তাহলে কেনো জুঁইয়ের সাথে জড়ালেন?
প্রশ্নটা পারভেজের মাথা ঘুরিয়ে দিলো।সে জানে সঠিক উত্তরটা বললে কি হতে পারে। কিন্তু না বলে উপায় নেই।যদি মিথ্যা বলে আর অর্নি জেনে যায় সে মিথ্যা বলছে তাহলে ঘটনা আরো সাংঘাতিক রুপ নিবে। তাই সত্যি বলে দিলো:আসলে আরাফ জুঁইয়ের লাইফে আমার পরে এসেছে।
_মানে?
পারভেজ একটু ঢোক গিললো। তারপর বললো:জুঁইকে প্ল্যান করে আরাফের লাইফে আমি পাঠিয়েছিলাম ।আসলে আরাফের সাথে জুঁই টাইম পাস করেছিল। আমার সাথেই রিয়েল ছিল।

কথাটা শুনে অর্নি বেশ অবাক হলো।এমন কিছু আশা করেছিল সে কিন্তু পারভেজকে দেখে মনে হয়েছিল সে অন্তত এসবে নেই। আসলেই মানুষ বোঝা মুশকিল।আজ পারভেজকে না পেলে এতো বড়ো সত্যিটা জানা হতো না তার।আরাফ কি জানে এসব? তাকে তো একবার বলা উচিত জুঁই তার সাথে টাইম পাস করেছে সেটা। সামনে থাকা ফোনটা হাতে নিলো অর্নি। ভাবলো আরাফকে ফোন দিয়ে বলবে কিন্তু কি মনে করে আবার ফোনটা রেখে দিলো।

চলবে…