অপেক্ষার বসন্ত পর্ব-১৬

0
129

#অপেক্ষার_বসন্ত
ফাহমিদা তানিশা
পর্ব ১৬

[কপি করা নিষিদ্ধ]

আরাফকে এই অবস্থায় রেখে যেতে ইচ্ছে করছে না তার। ভীষণ কষ্ট লাগছে।কিন্তু উপায় নেই।এখন না গেলে সে আর জুঁইকে পাবে না।তাই এখনি গিয়ে জুঁইয়ের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে চায় সে।

গাড়ি অর্নির অফিসের সামনে গিয়ে থামলে অর্নি দ্রুত গাড়ি থেকে নামে।বেশ তড়িঘড়ি করে সে ভেতরে গেলো। ভেতরে অর্নির জন্য অপেক্ষা করছে তার টিমের সদস্যরা।রাজ, হাসান, মাহবুবসহ অনেকেই। রুমানা সেখানে নেই।অর্নিকে দেখে তারা বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। মাহবুব বললো:ম্যাম জুঁই রুমানার রুমে আছে।
মাহবুবের কথায় অর্নি শান্ত কন্ঠে “আচ্ছা” বলে রুমানার রুমের দিকে গেলো।

রুমে রুমানা বসা ছিল।তার অপর দিকে একটা চেয়ারে জুঁই বসে আছে।তার হাতে হ্যান্ডকাফ লাগানো। পেছনে দুজন লেডি কনস্টেবল দাঁড়িয়ে আছে। অর্নিকে দেখে রুমানা উঠে দাঁড়িয়ে তাকে চেয়ারে বসতে দিলো‌। অর্নি ধীর পায়ে গিয়ে রুমানার চেয়ারে বসতেই জুঁই মাথা তুলে তাকালো।

দুজনেই সামনাসামনি বসে আছে। অর্নি জুঁইকে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার পর্যবেক্ষণ করলো। মনে মনে ভাবছে,এই মেয়ের মাঝে এমন কি আছে যার জন্য পারভেজ, আরাফ,রকি সবাই পাগল হয়ে যাচ্ছে।জানতে তো হয় জুঁইয়ের কাছ থেকে। জুঁইয়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো:রকির সাথে কতোদিনের পরিচয় তোমার?
জুঁইয়ের দায়সারা জবাব: তোমাকে বলবো কেনো?
কথাটা শুনে অর্নি তার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসলো। তারপর কষিয়ে একটা চড় বসিয়ে দিলো জুঁইয়ের গালে।আচমকা এতো জোরে চড় খেয়ে জুঁই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। মুখটা কাঁচুমাচু করে অর্নির দিকে তাকালো। অর্নি আবারো মুচকি হাসি দিয়ে বললো: এবার বলবি নাকি আরেকটা দিবো?
জুঁই এবার দ্রুত বলে বসলো:না না আর দিতে হবে না।বলছি সব।

_বল তাড়াতাড়ি
_রকির সাথে আমার পাঁচ বছরের পরিচয়।
_শুধু পরিচয় নাকি অন্য কিছু আছে?সব খুলে বল।আমি একটা প্রশ্ন করলে একটা উত্তর দিবি এমন তো নয়।
_তোমাকে এতো কথা বলতে আমি বাধ্য নয়।

অর্নি এবার বুঝলো এই মেয়েকে একটা চড় দিলে হবে না।কয়েকটা একসাথে দিতে হবে। এবার কয়েকটা চড় দিলো একসাথে।চড় খেয়ে জুঁই চেয়ার থেকে পড়ে যেতে রুমানা ধরলো তাকে।সেও একটা দিলো।অর্নির বেশ মজা লাগছে। ইচ্ছে করছে জুঁইয়ের মুখটাকে তবলা বানিয়ে ইচ্ছামতো বাজাতে।কতো দিনের স্বপ্ন তার আজ এক দফা পূরণ হলো ভাগ্যক্রমে। বেচারি জুঁই বুঝতে পারলো আজকে আর ভাব দেখিয়ে লাভ নেই ‌।ভাব দেখাতে গেলে উল্টো নাকানিচুবানি খেতে হবে তাকে।তাই গড়গড় করে সব বলা শুরু করলো: আরাফ দেশ থেকে চলে যাওয়ার পর আমি আরাফের সাথে ব্রেকআপ করি। তখন আরাফ তার ফ্যামিলিকে আমার কথা জানায় যাতে তারা আমার সাথে দেখা করে এবং কথা বলে সব ঠিক করে। সেই সাথে আমার পরিচয় দেয় সে।কিন্তু আরাফের বাবা-মা তার কথায় রাজি হয়নি।তখন রকি আমার সাথে দেখা করে আর আরাফের কাজিন পরিচয় দেয়। আমি তখন তাকে সব খুলে বলে। আমি আরাফের সাথে প্রেম করেছি শুধু আমার এক্স-হাসবেন্ডের কথায়। সেটা জানতে পেরে রকি খুব খুশি হয়।সে আমাকে ট্রিট দিবে বলে রেস্টুরেন্টে খেতে নিয়ে যায়। তখন থেকে তার সাথে আমার বন্ধুত্ব শুরু হয়।
_এখনো কি বন্ধুত্বের সম্পর্ক নাকি অন্য কিছু?
_না। আমরা বিয়ে করেছি তিন বছর হলো।
_তোর সাথে পারভেজের ডিভোর্স হলো তিন বছর। তাহলে রকির সাথে বিয়ের বয়স‌ও তিন বছর হলো কি করে?
_পারভেজের সাথে থাকা অবস্থায় রকির সাথে আমার রিলেশন শুরু হয়।পরে পারভেজকে ডিভোর্স দিয়ে রকিকে বিয়ে করি। কিন্তু আরাফের এক্স গার্লফ্রেন্ড ছিলাম বলে রকির পরিবারকে জানায়নি কিছু তবে আমার পরিবার সব জানে।
_রকিকে বিয়ে করার পরেও আমাদের লাইফে আসলি কেনো আবার?
_আর কোনো উপায় ছিল না।আরাফ আমাকে সিরিয়াসলি ভালোবাসাতো। আমাদের ধারণা ছিল আরাফ দেশে ফিরে এসে আরো ডিপ্রেসড হয়ে যাবে। তখন সে আবারো দেশ ছেড়ে চলে যাবে। তখন সব সম্পত্তি রকির হবে। তাহলে আমারো হবে। কিন্তু আরাফ তোমাকে বিয়ে করে নিলো। তখন আমরা বুঝতে পারলাম তুমি থাকতে আরাফের সম্পত্তি কব্জায় নেওয়া বেশ জটিল কাজ হবে। আস্তে আস্তে প্ল্যান করি আরাফের লাইফে ফিরে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আরাফের সাথে দেখা করে বুঝলাম সে আগের মতো নেই। এখন আমার জায়গার অনেকটা তোমার দখলে চলে গেছে।ও তোমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে। তখন আমাদের খেলাটা ডিফিকাল্ট হয়ে গেলো। তখন অন্য প্ল্যান শুরু করি।
_কি প্ল্যান?
_বুঝতে পারলাম এখন আরাফের দূর্বলতা তুমি।আর তুমি আরাফকে ভালোবাসলেও বিশ্বাস করতে না।আই মিন তুমি জানতে আরাফ তোমাকে ভালোবাসে না আর আমার প্রেমে বিভোর।তাই তুমি মনে করতে আরাফ তোমাকে মিথ্যা বলছে।তার চেয়েও বড়ো সুবিধা ছিলো তুমি রকিকে বিশ্বাস করতে।তাই রকি আরাফকে ব্ল্যাকমেইল শুরু করে।বলে আরাফ যদি সব সম্পত্তি রকির নামে লিখে না দেয় তাহলে রকি তোমাকে খুন করবে।আরাফ ঘাবড়ে যায় রকির হুমকিতে।তাই সে সিদ্ধান্ত নেয় সম্পত্তি রকির নামে লিখে দিবে। উকিলের সাথে কথা বলে সব ঠিক করছিলাম কিন্তু আজ তুমি সব শেষ করে দিলে।
_আমাদের ডিভোর্স করাতে চাইলে কেনো?
_তুমি আরাফের স্ত্রী হিসেবে থাকলে যেকোনো সময় তুমি সব বের করে নিতে আর আমরা ফেঁসে যেতাম।তাই তোমাকে আগে আগে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। তখন কেউ জানতো না এসব বিষয়। কিন্তু তুমি তো সব ভেস্তে দিলে।
_বুঝলাম সব।এবার বলো এতো কিছু করে কি লাভ পেলে? এখন তো ঠাঁই হবে জেলখানায়।এখনি তোমাকে জেলখানায় শিফট করা হবে।

কথাটা শুনে জুঁই কান্না করে দিলো। হঠাৎ কান্না থামিয়ে বললো: তুমি তো আমার ছোট বোনের মতো। আমার জানা মতে তুমি খুব ভালো একটা মেয়ে। প্লিজ আমাদের ছেড়ে দাও।আমি রকিকে নিয়ে এই শহর ছেড়ে চলে যাবো।আর কখনো তোমাদের লাইফে ফেরত আসবো না।আই প্রমিজ। এইবারের মতো ক্ষমা করে দাও।
জুঁইয়ের কথায় অর্নি হাসলো। তারপর বললো: তোমার মতো স্বার্থপর মেয়েকে বিশ্বাস করবো?কতোজনকে ঠকিয়েছো তুমি জানো?আরাফ ,পারভেজ জানিনা আরো কেউ আছে কিনা।
_কিন্তু আমি রকিকে খুব ভালোবাসি।
অর্নি তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো:রকি তোমাকে ভালোবাসে?
_হুম নিজের চেয়েও বেশি।

জুঁইয়ের এমন জবাব দেখে অর্নি হো হো করে হেসে দিলো।কতো কনফিডেন্স নিয়ে সে কথাটা বললো।এটাই তো পৃথিবীর নিয়ম।যার উপর বেশি কনফিডেন্স থাকে সেই মাঝখান থেকে সব শেষ করে দেয়।অর্নি অবাক হচ্ছে জুঁইয়ের মতো মানুষের জীবন নিয়ে খেলেছে এমন একটা মেয়েও আজ রকির হাতে ঠকে গেলো।রকি এককথায় পাকা খেলোয়াড়। হাসি থামিয়ে বললো: তুমি জানো রকির সাথে এক মেয়ের আট বছরের রিলেশন আছে?তার সাথে পারিবারিকভাবে এনগেজমেন্ট হয়েছে আমাদের বিয়ের আগে। আমাদের ঝামেলাটা মিটমাট হলে সামনে বিয়ে হ‌ওয়ার ‌কথা ছিল তাদের।

অর্নির মুখে এমন কথা শুনে জুঁই দম না ফেলে বললো:সব মিথ্যা কথা বলছো তুমি।
_এখন তোমাকে মিথ্যা বলে আমার লাভ কি?এটাই সত্যি।প্রতারক কখনো জিতে না। যেমনটা তুমি জিততে পারলে না।রকি তোমাকে শুধু আরাফের সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যবহার করেছে।আজ বাংলোতে গিয়েছিলাম তোমাকে কথাটা বলার জন্য কিন্তু কি থেকে কি হয়ে গেলো দেখো। তবে আই প্রমিজ,আমি তোমাকে বা রকিকে কাউকে ছাড়বো না। তুমি আরাফকে সামান্য সম্পত্তির জন্য কষ্ট দিয়েছো।আর রকি আজ গুলি করেছে তার বুকে। তোমাদের কি করে ছেড়ে দিই বলো?আমি তো আর তোমার মতো আরাফকে ভালোবাসিনি। নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসি আমি আরাফকে। তাকে যারা কষ্ট দেয় তাদের ছেড়ে দেওয়ার মতো মহৎ আমি কখনো হতে পারবো না।আসি।বাকি জীবনটা জেলখানায় বসে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করো‌।তাই তোমার সাথে মানায়।

অর্নি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। জুঁই কান্না করছে।তাতে তার কি? রুমানাকে বললো:মাহবুবকে বলো ওকে জেলখানায় শিফট করে দিতে।আর তুমি আমার সাথে আসো।
_ওকে ম্যাম।
অর্নি রুমানার রুম থেকে বের হয়ে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালো রুমানার জন্য।

মাহবুব আসলো আর তার সাথে দুজন মহিলা কনস্টেবল আছে।তারা জুঁইয়ের হ্যান্ডকাফ চেয়ার থেকে খুলে রেডি করছে জেলখানায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। দুজনেই ধরে বের করলো জুঁইকে। জুঁইকে নিয়ে যেতে দেখে অর্নি আবার আসলো। শান্ত কন্ঠে বললো: একটা কথা বলা হয়নি তোমাকে।আরাফকে আমি ছোট থেকে চিনতাম।সে কখনো কোনো মেয়ের দিকে তাকায়নি পর্যন্ত। তুমি খুব ভাগ্যবতী ছিলে বলে ভাগ্য করে আরাফকে পেয়েছিলে।সে তোমাকে অনেক বেশি ভালোবাসতো। তাকে এভাবে না ঠকালেও পারতে। তাকে যদি ভালোবেসে আগলে রাখতে তখন হয়তো আমি আরাফকে পেতাম না কিন্তু তুমি আর আরাফ দুজনেই সুখী হতে।নিজেই নিজের জীবনটা শেষ করলে। কিন্তু আমি আরাফকে আমার সবকিছু দিয়ে আগলে রাখবো।

জুঁই তাকিয়ে আছে অর্নির দিকে। কিছু বললো না। তখনি রুমানা আসলো।রুমানাকে দেখে অর্নিও হাঁটা দিলো। তাদের আবারো এফ‌এ ভিলাতে যেতে হবে।কারণ অর্নি তার ব্যাগটা সেখানে রেখে এসেছিল।ব্যাগটা নিতে যেতে হবে।ব্যাগের মধ্যে তার কিছু ইম্পরট্যান্ট কার্ড আর ফোনটা আছে।আরাফের খবরটাও নিতে পারেনি সে ফোন না থাকায়। রুমানার ফোন থেকে কল দিয়ে জেনে নিবে ভেবে রুমানার কাছ থেকে ফোনটা চাইলো অর্নি।রুমানা সাথে সাথে ফোনটা দিলো।আরাফের বাবার নম্বরে ডায়াল করলো অর্নি। কয়েকটা রিং হ‌ওয়ার পর তিনি রিসিভ করলেন।
_কে বলছেন?
_আংকেল আমি অর্নি।আরাফের কি অবস্থা?
_ডাক্তার চেক করছে বারবার। কিন্তু এখনো জ্ঞান ফেরেনি।বলছে কয়েক ঘন্টার মধ্যে ফিরতে পারে।
অর্নির বেশ চিন্তা লাগছে।এতো সময় হয়ে গেলো তবু জ্ঞান ফিরছে না কেনো?আবার কোন সমস্যা হলো না তো?

চলবে…