অপেক্ষার বসন্ত পর্ব-১৯

0
100

#অপেক্ষার_বসন্ত
ফাহমিদা তানিশা
পর্ব ১৯

[কপি করা নিষিদ্ধ]

আরাফের কথায় অর্নি বেশ অবাক হলো।সে জানলো কি করে?সে তো তখন থেকে শুয়ে আছে। তাহলে কিভাবে কি?অর্নির মাথায় আসছে না।
ভ্রু কুঁচকে আরাফকে জিজ্ঞেস করলো:কি কোন ছেলের সাথে আড্ডা দিতে গেলাম আবার?
_বাহ্।মেয়ে মানুষ এমন।কাছে আসতেই গিরগিটির মতো রঙ বদলায়। তুই জানিস না তুই কোন ছেলের সাথে আড্ডা দিয়েছিস? আমি বলবো কেনো?
অর্নি একটু থামলো। আবারো প্রশ্ন করলো: আপনাকে এসব কে বলেছে?
_সেটা তোর লাগবে?
_অবশ্য‌ই লাগবে। আমার নামে একটা কথা বললো তাহলে সে কে জানতে তো হবেই।
_কেনো?সে কি তোর নামে মিথ্যা বলেছে নাকি? সত্যি তো বলেছে।
_হুম সে সত্যি বলেছে কিন্তু সেই সাথে মিথ্যাও তো বলেছে। আমার পারভেজের সাথে দেখা হয়েছে এটা সত্য কিন্তু আমার ওর সাথে কিছু ইম্পরট্যান্ট কথা হয়েছে।আমি তো তাকে আলাদা করে আড্ডা দিতে ডাকিনি। আড্ডা কাকে বলে আপনি জানেন?
_না জানি না। এখন তোর কাছ থেকে শিখতে হবে আরকি।
_আমি এভাবে বলছি না। আপনি অন্যভাবে নিচ্ছেন।
_শোন,তোর সাথে এতো বাড়াবাড়ি করার ইচ্ছে আমার নেই। কিন্তু এতটুকু বলতে চাই যার তার সাথে মিশে আমার মতো নিজেকে বিপদে ফেলবি না।

অর্নি আরাফের কথায় তার দিকে তাকালো। আরাফ ভুল কিছু তো বলেনি।তাই আর তর্কে গেলো না সে। চুপচাপ বসে থাকলো।আরাফ‌ও নিজের মতো চুপচাপ শুয়ে আছে। অর্নি মনে মনে ভাবছে পারভেজের বলা কথাগুলো। পারভেজ বলেছে সে আরাফের সাথে দেখা করতে চায়। মানুষ নিজের ভুল বুঝতে পারলে তাকে তো একটা সুযোগ দেওয়া যায়।কিন্তু আরাফের ভাবসাব বলছে অন্য কথা।সে কিছুতেই পারভেজের নাম মুখেও নিতে চাইছে না। অর্নি একবার ভাবলো আরাফকে বলবে পারভেজের কথা। আবার ভয় হচ্ছে।আরাফ যদি অন্যরকম রিয়্যাক্ট করে?আজ আর কিছু বললো না তাই।

বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেলো মাঝে।আরাফ এখনো আগের মতো চুপচাপ শুয়ে আছে। কোনো কথা বলছে না। যদি ঘুম থাকতো তাহলে একটা কথা ছিল কিন্তু সে জেগে আছে। তবু কথা বলছে না। অর্নির মনে মনে রাগ হচ্ছে।তার একটা জটিল অভ্যাস আছে। চুপচাপ থাকতে পারে না সে। সামনে এতো বড় একজন মানুষ থাকবে আর সে বোবার মতো কথা না বলে বসে থাকবে তা হতে পারে না। আর কতোক্ষণ সে এভাবে বসে থাকবে?বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। ধীর পায়ে পুরো রুমটা পায়চারি করছে সে।ভালো লাগছে না কিছুই। হঠাৎ আরাফের ডাক শুনে পেছনে ফিরলো অর্নি।
_এদিকে আয় তো।
অর্নি দ্রুত পায়ে এসে বললো:হুম বলেন। কোনো সমস্যা?আমি হেল্প করবো?
_না সমস্যা নয়। আম্মু আসেনি কেনো হাসপাতালে?
_আমি তো জানি না।
_আম্মুর কি শরীর খারাপ?তাই আসছে না হয়তো। বাইরে গিয়ে একবার খবর নিয়ে আয়।
_খালামনি সুস্থ আছে।আমি জানি। তবু বাইরে গিয়ে জেনে আসছি।
অর্নি আরাফের কেবিন থেকে বাইরে গেলো। আরাফের বাবার সাথে কথা বললো সে।
_আংকেল খালামনি আসেনি কেনো?
_তোমার খালামনি জানে না। তাকে জানানো হয়নি এসব।
_কেনো?
_এমনে অসুস্থ সে।তার মধ্যে এক্সট্রা প্রেশার হয়ে যাবে। যদি আরাফের খবর পেয়ে আরো অসুস্থ হয়ে যায় তাহলে তো সমস্যা।তাই বলিনি আর।
_এখন তো আরাফ সুস্থ হয়েছে। এখন বলতে পারেন।
_হুম এখন যেহেতু আউট অফ ডেইনজারাস। এখন বলা যায়।
_আচ্ছা আংকেল। ভেতরে যায় এখন।
_আচ্ছা মা।আরাফের খেয়াল রাখিও।
অর্নি হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে ভেতরে গেলো। গিয়ে আরাফকে বললো সব।আরাফ শুনে কিছু বললো না।

আজ অর্নির মা-বাবা হাসপাতাল থেকে চলে যাবেন।এমনেও তাদের কোনো কাজ নেই।দেখতে এসেছে তা ঠিক কিন্তু দেখতেও পারছেন না ভালোমতো।কারণ আরাফের সাথে শুধু একজনকে থাকতে দেওয়া হচ্ছে।আর প্রায় সময় অর্নি থাকছে।তার মধ্যে এখন আরাফ অনেকটা সুস্থ।ন্যাচারালি এতো তাড়াতাড়ি সুস্থ হয় না কিন্তু প্রপার ট্রিটমেন্ট আর এক্সট্রা কেয়ার পাওয়ায় সে অন্যদের তুলনায় অনেকটা সুস্থ।তাই তারা শুধু শুধু হাসপাতালে থেকে কি করবেন? অর্নিকে তার মা ডাকলে সে আরাফের কেবিন থেকে বের হয়।
_আমরা চলে যাচ্ছি। তুই কি থাকবি নাকি আমাদের সাথে যাবি?
অর্নি একটু থামলো।সে কি বলবে বুঝতে পারছে না। চুপচাপ তার মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে।
_কিরে কথা বলছিস না কেনো?
_তোমরা বলো কি করবো। আমার মাথা কাজ করছে না।
আরাফের বাবা তাদের কথার মাঝখানে বললেন:ও আবার কোথায় যাবে। একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে তা ঠিক। এখন তো সব ঠিক হয়ে গেছে। তাহলে অর্নি চলে যাবে কেনো?
অর্নির মা কি বলবেন বুঝতে পারছেন না।মেয়ের দিকে একবার তাকিয়ে বললেন: অর্নি আপাতত আমাদের সাথে চলে যাক।আরাফ প্রপারলি সুস্থ হলে তারা দুজনে সিদ্ধান্ত নিবে। যেহেতু তাদের লাইফ,তাদেরকেই তো ডিসিশন নিতে হবে।

অর্নির মায়ের কথায় আরাফ বাবা অসম্মতি জানালো।ব‌উয়ের ছোট বোন মানে নিজের ছোট বোনের মতো। তিনি তাই একটু কর্তৃত্ব ফলিয়ে বললেন: না।এটা কোনো কথা হতে পারে না। অর্নি এখানে থাকবে।আরাফের সাথে থাকবে। তুমি আর অর্নির বাবা যেতে পারো। কিন্তু ওদের বিষয় নিয়ে আর কোনো কথা আসবে না।

অর্নির বাবা চুপচাপ শুনছেন সবার কথা। তিনি কিছু বলছেন না।অর্নির মাও তার কাছ থেকে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।কারণ একটাই। তিনি বলবেন মেয়ে যা বলে তাই হবে।আমি এসবে নেই। এখন মেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলো নাকি ভুল সিদ্ধান্ত নিলো সেটা তার দেখার বিষয় নয়।তাই অর্নির মা কিছু জিজ্ঞেস করছে না তার কাছ থেকে। কিন্তু আরাফের বাবা তো আর জিজ্ঞেস না করে পারেন না।তার মেয়ে যখন সম্মতি তো লাগবেই।আরাফের বাবা জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন: অর্নি এখন আরাফের সাথে থাকুক।পরে দেখা যাবে বাকিটা।

সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলো অর্নি থাকবে হাসপাতালে।তার বাবা-মা আরাফের কেবিনে গিয়ে আরাফ থেকে বিদায় নিয়ে আসলো। তারপর সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলো।

আরো দুইদিন কেটে গেলো মাঝে।আরাফ এখন অনেকটা সুস্থ।উঠে বসতে পারছে,হাত নাড়তে পারছে, স্পষ্ট কথাও বলতে পারছে।কিন্তু সে প্রয়োজন ছাড়া অর্নির সাথে কোনো কথা বলছে না।অর্নির রাগ হচ্ছে কিন্তু কিছুই বলছে না। দুইদিন ধরে ধৈর্য ধরে আরাফকে দেখছে। এখন আর নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছে না।আর কতোক্ষণ বসে বসে মানুষের ভাব দেখা যায়?পুরো আটচল্লিশ ঘন্টা সে পর্যবেক্ষণ করছে আরাফকে।মাঝে একটু ঘুমিয়েছিল এটুকুই। মনে মনে ভাবছে,”আমাকে ভাব দেখাস?তোর ভাব যদি বের না করি আমি আমার বাপের মেয়ে নয়।চলে গেলে তো ঠিকই পেছন পেছন দৌঁড়াবি। এখন যত্তোসব ঢং দেখাচ্ছে।”

অর্নি এসব ভেবে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। শান্ত কন্ঠে আরাফকে ডাকলো।সে চোখ বন্ধ করে আছে। গম্ভীর কন্ঠে বললো:কি হয়েছে?
_আমি আসছি।
_কোথায় যাচ্ছিস?
_সেটা আপনাকে বলবো কেনো?
_তাহলে কি পারভেজকে বলবি?
আরাফের কথায় অর্নির মেজাজ চরম পর্যায়ে গেলো। রেগে গিয়ে বললো: আমার মাঝে মানুষের মতো অসভ্য স্বভাব নেই যে ব‌উ রেখে বাইরে গার্লফ্রেন্ড রাখে বা জামাই রেখে বয়ফ্রেন্ড রাখে মতো থার্ড ক্লাস কাজ করবো।যে যেমন সে অন্যকে এমন মনে করে।আমার তাতে কিছুই বলার নেই।

আরাফ ভ্রু কুঁচকে অর্নির দিকে তাকালো।তার কেমন জানি মনে হচ্ছে কথাগুলো তাকে বলেছে।সব কথার ভাবার্থ খুঁজলে এমন অর্থ দাঁড়ায়।
_এসব কথা আমাকে বলছিস?
_নির্দিষ্ট করে কাউকে বলিনি।যারা এমন তাদের বলেছি। আপনার বৈশিষ্ট্যের সাথে যদি মিলে তাহলে ভেবে নিবেন আপনাকে বলেছি।
_দেখ তুই কিন্তু বেয়াদবি করছিস।
_হুম আমি বেয়াদব।বেয়াদব বলেই তো কথা বলছেন না। আপনি কথা বলুন বা না বলুন আমার তাতে কি? আমার দায়িত্ব ছিল আপনি সুস্থ হ‌ওয়া পর্যন্ত আপনার সাথে থাকা তাই ছিলাম। এখন আপনি সুস্থ।তাই আমি যেতে পারি।
_কোথায় যাবি সেটাই তো জানতে চাইলাম। তাতেই এতো কথা বললি কিন্তু কাজের কথা এখনো বলতে পারলি না।
_বলতে চাই না বলে বলিনি। আপনি থাকুন আমি গেলাম।
_বললেই হলো আমি গেলাম। আব্বু আছে বাইরে। কিভাবে যাবেন ম্যাডাম?
_আংকেলকে সব বলবো তারপর যাবো।যাতে আপনাকে ইচ্ছামতো কয়েকটা কষিয়ে চড় দেয়।

অর্নির এমন ভঙ্গিতে কথা বলা দেখে আরাফ মনে মনে হাসলো কিন্তু উপরে প্রকাশ করলো না। অর্নি চেয়ারে রাখা ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে যেতেই আরাফ তার হাত ধরে ফেললো।এক টানে তাকে অনেকটা আরাফের কাছে নিয়ে আসলো। শান্ত কন্ঠে বললো: এখানে চুপচাপ বসে থাক। নয়তো তোর খবর আছে।
আরাফের আকস্মিক এমন কাণ্ডে অর্নি একটু থামলো। কিন্তু থেমে থাকলে তো হবে না।আরাফকে নাকানিচুবানি খাওয়াতে হবে। রাগী গলায় বললো:আমি বসবো না।যাবো মানে যাবো।
_দেখ বাড়াবাড়ি করবি না। আমার এমনিতেই ভালো লাগছে না।
_আপনার ভালো না লাগলে আমার কি?আমার‌ও ভালো লাগে না সেটা তো আপনি বুঝেন না। কখন থেকে বসে আছি আপনার পাশে।আর আপনি ভাব দেখিয়ে আমার সাথে কথা বলছেন না। শুধু আমার সাথে ভাব দেখান। আপনি যে জুঁইয়ের সাথে সবসময় থাকতেন তখন তো আমি একটা প্রশ্ন‌‌ও করতাম না। কোর্টের সামনে আমাকে রেখে জুঁইকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন তখন‌ও পর্যন্ত কিছুই বলিনি।আর আমি খেতে যাওয়ার পথে পারভেজের সাথে দেখা হ‌ওয়ায় কথা বলেছি তাতে আমাকে ইচ্ছামতো কথা শোনালেন। তবু ক্ষান্ত হননি। আমাকে ভাব দেখাচ্ছেন। আমার লাগবে না আপনার মতো অসভ্য পুরুষ। আপনার মতো মানুষের সাথে থাকার চেয়ে আজীবন একা থাকা ভালো।আমি গেলাম আপনি এবার শান্তিমতো থাকুন।
এই বলে আরাফের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে অর্নি বেরিয়ে গেলো।আরাফ অবাক চোখে অর্নির যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে।

চলবে…