আঁধারে প্রণয়কাব্য পর্ব-১১

0
115

#আঁধারে_প্রণয়কাব্য
#পর্ব____১১
#নিশাত_জাহান_নিশি

“কাল সকাল দশটায় ব্লু বেরি ক্যাফে তার সাথে দেখা করতে!”

______________________

বাড়ির পাশের একটি খোলা, উন্মুক্ত ও সবুজ গাছপালায় ঘেরা নিরিবিলি, নিবিষ্ট ও মনোরম জায়গায় একা পথ ধরে হেঁটে চলছে সানাম। পরনে তার নীল রঙের একটি জামা ও গাঁয়ে চাদরের ন্যায় পেঁচানো একটি সাদা ওড়না। চুলে খোঁপা বাঁধা থাকলেও চুলের সিল্কি ভাবের জন্য খোঁপা থেকে চুলগুলো খুলে খুলে পরছে। এক পর্যায়ে চুলগুলো তার খোঁপা থেকে খুলেই গেল। সেদিকে হেলদোল নেই তার। বুকে হাত গুজে সানাম নিশ্চুপ নির্বিঘ্নে ও বেখেয়ালে জায়াগাটিতে পায়চারি করছে। ছোটোখাটো একটি পার্কও বলা যায় জায়গাটিকে। পার্কের মাঝখানে দুটি দোলনার ব্যাবস্থাও রয়েছে সাথে ছোটো বাচ্চাদের খেলাধূলোর জন্য দু-একটি রাইডও রয়েছে৷ ছোটোদের বিনোদনের জন্যই মূলত এলাকাবাসীর এই উদ্যোগ।

ভোরবেলায় চারিপাশ মৃদুমন্দ অন্ধকারে ঢাকা। তাই জনমানবশূন্য নীরব এই পার্ক। ভোর কেটে ওঠতেই বাচ্চাকাচ্চাদের আগমনে রমরমা হয়ে ওঠবে এই পার্ক। কিছুক্ষণ একমনে পায়চারী করে সানাম দোলনাটিতে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ইতোমধ্যেই ভোরের স্নিগ্ধ, ফুরফুরে ও শীতল বাতাস এসে তার সমস্ত শরীর জুড়িয়ে দিয়ে গেল। ভোরের হাওয়া যে সত্যিই ঔষধের ন্যায় কাজ করে তার প্রমাণ আজ সানাম পেল। শীতল হয়ে গেল তার হৃদয়। ভেতর থেকে এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব হতে লাগল। ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠল।

পরম আবেশে সানাম চোখজোড়া বুজে নিতেই অতীতের কিছু দৃশ্য তার মানসপটে ভেসে ওঠল। স্পর্শের সাথে ঠিক এই পার্কটিতেই প্রথম দেখা হয়েছিল সানামের। স্পর্শের একজন ক্লোজ ফ্রেন্ডের বাড়ি ছিল সানামের এলাকায়। সেই সুবাদেই এই পার্কে তাদের দেখা হওয়া। দিনের পর দিন স্পর্শ তার বাড়িঘর রেখে ফ্রেন্ডের বাড়িতে এসে পরে থাকত! আর সানামকে একটুখানি দেখার আশায় পার্কের আশেপাশে অসহায়ের ন্যায় ঘুরপাক খেত!

অতীত জীবন বড্ড জ্বালা দিতে লাগল সানামকে। ফট করে চোখজোড়া খুলে সে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে দৌড়ে তার বাড়ি ফিরে গেল। সিফরার পাশ ঘেঁষে মুখ চেপে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠল। সিফরা এর আঁচ পেল। ঘুম ঘুম আবেশে সে সানামকে জড়িয়ে ধরল। অস্ফুটে গলায় বলল,

“অতীত নিয়ে আর ভেবোনা আপু। বর্তমানে যে আছে তাকে আপন করে নাও। উপরওয়ালা কখনও শূণ্যস্থান ফাঁকা রাখেন না। আর এটাই উপর ওয়ালার ইচ্ছা।”

সানামের চোখের পাতা ভার হয়ে এলো। মাথায় টনটনে ব্যাথার অনুভব হলো। জোরপূর্বক চোখ বুজার চেষ্টা করল সে। ধীরে ধীরে মস্তিষ্ক শিথিল হয়ে ঘুমে ডুবে গেল। ঘণ্টা দুয়েক পর সানামের ফোন সাইলেন্ট মোডে বেজে ওঠল। ঘুম ভাঙল সানামের। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই ফায়েযের নাম ও নাম্বারটি ভেসে ওঠল। তড়িঘড়ি করে সানাম শোয়া থেকে ওঠে বসল। অস্থির হয়ে কলটি তুলে বলল,

“হ্যালো।”

ফায়েয কপাল ঘঁষল। সকাল সকাল ঘুম বিসর্জন দিয়ে বাড়ির পোশাকেই সে মালিবাগের রিসোর্টে পুলিশ কল পেয়ে একপ্রকার ছুটে আসতে বাধ্য হয়েছিল। দেয়ালে হাতের ওপর ভর দিয়ে আতঙ্কিত অবস্থায় দাড়িয়ে সে। চিন্তিত গলায় শুধাল,

“ঘুমাচ্ছেন আপনি?”
“উঁহু। কি হয়েছে বলুন?”
“আমি গাড়ি পাঠাচ্ছি। আপনি এখনি মালিবাগ রিসোর্টে চলে আসুন।”
“শ্রেতাকে খুঁজে পেয়েছেন?”
“হ্যাঁ তবে…..
“তবে কি?”
“জীবিত অবস্থায় নয়!”

সানাম কেঁপে ওঠল। পাখার নিচে থেকেও সে জবজবিয়ে ঘামতে লাগল। শঙ্কিতমনা হয়ে ভেতর থেকে আত্নচিৎকার বের হয়ে এলো। গলা ফাটিয়ে বলল,

“কিইইইই?”
“গলায় ফাঁসি দিয়েছে শ্রেতা। এটা সু’ইসা’ইড কেস নাকি খু’ন বুঝা যাচ্ছেনা। তবে আপনি শান্ত হোন। উত্তেজিত হবেননা। আপনার শরীরের জন্য এটা ক্ষতিকর।”

ফায়েযের শেষোক্ত কথাগুলো সঠিক শুনতে পেলোনা সানাম। ইতোমধ্যেই তার হাত থেকে ফোনটি বিছানায় পরে গেল। সানামের চিৎকারের আওয়াজ শুনে সিফরা ও আফিয়া শিকদার দুজন দু’দিক থেকে ছুটে এলো সানামের রুমে। সানামের নিথর ও নিষ্ক্রিয় অবস্থা দেখে আফিয়া শিকদার ও সিফরা চিন্তিত হয়ে দুজন দু’পাশ থেকে সানামকে ধাক্কা দিলো। আফিয়া শিকদার ঘাবড়ানো গলায় প্রশ্ন ছুড়লেন,

“এই কি হয়েছে তোর?”

ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে সানাম বিস্ফোরিত গলায় বলল,

“শ্রেতা সু’ইসা’ইড করতে পারেনা মা। নিশ্চয়ই তাকে খু’ন করা হয়েছে। আমি শিওর তাওহীদ ভাই সব জানে।”

আফিয়া শিকদার ও সিফরা কপাল কুঁচকে নিলো। আগ্রহী হয়ে দুজনই দুজনের দিকে তাকালো। সন্দিহান গলায় সিফরা প্রশ্ন ছুড়ল,

“তাওহীদ? তাওহীদটা আবার কে?”
“শ্রেতার বয়ফ্রেন্ড। আমাকে এখুনি রিসোর্টে যেতে হবে।”

হন্ন হয়ে সানাম জামা পাল্টাতে ওয়াশরুমে চলে গেল। ফায়েয অধৈর্য হয়ে ওঠল। তবুও একের পর এক সানামের নাম্বারর কল করতে লাগল। সানাম একাই বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল কিনা তা জানার জন্য সে অধীর হয়ে ওঠল। এই অবস্থায় সানামের একা বাড়ি থেকে বের হওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে। অবশেষে সিফরা কলটি তুলে হ্যালো বলতেই ফায়েয উদ্বিগ্ন গলায় শুধাল,

“সানাম কোথায়?”
“আপু তো ওয়াশরুমে গেছে ভাইয়া। কি হয়েছে একটু বলবেন?”
“তুমি সানামকে নিয়ে মালিবাগে চলে এসো। তাকে একা ছেড়ো না প্লিজ। বাকিটা এখানে আসার পর বুঝতে পারবে।”
“ওকে ভাইয়া।”

সিফরা কলটি কেটে তার মায়ের দিকে সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকালো। খুঁতখুঁতে গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,

“মা? এই তাওহীদ ঐ তাওহীদ নয় তো?”
“আরে ধ্যাত। ঐ তাওহীদ আমাদের তাওহীদ হতে যাবে কেন? পৃথিবীতে কি এক নামের একজন মানুষই আছে? সবসময় ফালতু চিন্তাভাবনা।”

বড়ো বড়ো পা ফেলে আফিয়া শিকদার রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালেন। মেয়েগুলোকে তো আর তিনি খালিমুখে বাড়ি থেকে বেরুতে দিতে পারবেন না। সানাম কিছু না খেলেও সিফরা একটু পরোটা মুখে দিয়ে তাদের উদ্দেশ্য বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল।

ঘণ্টা খানিক পর দুজন মালিবাগ রিসোর্টের বদলে ঢাকা মেডিকেল হসপিটালে এসে হাজির হলো। কারণ শ্রেতার লাশ আপাতত পোস্ট মর্টেমের জন্য হসপিটালে নিয়ে আসা হয়েছিল। শ্রেতার মায়ের আহাজারি এতক্ষণ যাবত ফায়েয ধৈর্য ধরে একাই সামলালেও এখন সানাম ও সিফরা এসে যুক্ত হলো। অয়ন্তী পাল সানামকে জড়িয়ে ধরে বুক ফাঁটা চিৎকার করে বললেন,

“আমার শ্রেতা সু’ইসা’ইড করতে পারেনা। আমার মেয়ের মতো মনের জোর ও সাহস পৃথিবীতে কম মেয়েদেরই আছে। ঐ ছেলেটা আমার মেয়েকে নিশ্চয়ই কিছু করেছে। আমি এর বিচার চাই। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ ঐ ছেলেকে আটক করে শাস্তি দিক এটাই আমার প্রার্থণা।”

সানাম ফুঁপিয়ে কেঁদে বলল,

“বিচার হবে আন্টি। অবশ্যই হবে। নিঃসন্দেহে শ্রেতা খুবই সাহসী ও বিচক্ষণ একটি মেয়ে ছিল। এই কেসে আমার যতটুকু সাহায্যের প্রয়োজন আমি করব আন্টি। আপনি মনে সাহস রাখুন। প্রশাসন নিশ্চয়ই আমাদের সাহায্য করবে।”

ফায়েয ইশারায় সানামকে ডাকল। ইশারা বুঝে সানাম ফায়েযের দিকে হেঁটে গেল। হসপিটালের এক কোণায় দাড়িয়ে ফায়েয ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন ছুড়ল,

“আমার একটা কোয়েশ্চন। শ্রেতা হিন্দু কিন্তু তার বয়ফ্রেন্ড মুসলিম ব্যাপারটা একটু কেমন নয়?”

সানাম শ্বাস ফেলল। নাক টেনে কেঁদে বলল,

“গতবছরের শেষের দিকে ফেসবুকে তাদের পরিচয়। ধর্মের দিক মাথায় রেখেই শ্রেতা প্রথম প্রথম তাওহীদকে পাত্তা না দিলেও পরবর্তীতে কোনোভাবে তারা ইমোশনালী এটাচড হয়ে যায়। আর এভাবেই সম্পর্কটা তৈরি হয়ে যায়।”

“বাট এটা ঠিক হয়নি। ধর্মের দিকগুলোর জটিলতার জন্যই হয়ত দুজনের মধ্যে দ্বন্ধের সৃষ্টি হয়েছিল। আর এর ফলাফলই হলো শ্রেতার খু*ন না হয় সু’ই’সাইড।”

“তবে আমি মাঝখানে শুনেছিলাম তাদের মধ্যে খুব ভেজাল চলছে। শ্রেতা তার ধর্ম পরিবর্তন করতে চায় এ নিয়েও সে আমার কাছে এডভাইস চেয়েছিল।”

ফায়েয উৎসুক গলায় শুধাল,

“এরপর আপনি কি এডভাইস দিয়েছিলেন?”

“আমি কিছু বলার পূর্বেই শ্রেতা তার প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলেছিল। হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল বিষয়টিকে। পরবর্তীতে আর এই বিষয় নিয়ে কোনো কথা হয়নি। যেহেতু সে আগ্রহ প্রকাশ করেনি তাই।”

কিছু একটা মনে করে ফায়েয তার হাতঘড়ির দিকে তাকালো। দশটা বাজতে আর মাত্র দশ মিনিট বাকি। সানামের দিকে ফায়েয তৎপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। শার্টের কলার ঠিক করে বেশ ব্যাস্ত স্বরে বলল,

“ওকে। আপনি এখানেই থাকুন। আমাকে একটু বের হতে হবে।”
“কেন? কোথায় যাবেন?”
“অনামিকার সাথে ডেট!”
“ফিক্সড হয়ে গেছে?”
“কাল রাতেই।”
“আর আপনি আমাকে এখন বললেন?”
“এক্সপেকটেশন তৈরি গেছে আমার ওপর?”

সানাম প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,

“রেকর্ডারটা কিন্তু মনে করে অন করে রাখবেন।”

সানামের প্রতিক্রিয়া আন্দাজ করার জন্য ফায়েয বেশ গম্ভীর গলায় বলল,

“কিন্তু অনামিকার মতো একটা মিষ্টি মেয়েকে ধোঁকা দিতে আমার খারাপ লাগবে!”

সানাম অবলীলায় বলে গেল,

“ধোঁকা দিতে কে বলল? প্রমাণ জোগাড় করার পর আপনি তাকে প্রয়োজনে বিয়ে করে ফেলুন এতে আমার কোনো সমস্যা নেই।”

এমন হৃদয় ভাঙা উত্তর শোনার জন্য ফায়েয যেনো তৈরিই ছিল! কোনোরূপ খারাপ প্রভাব পরলনা তার ওপর। কেবল শক্ত গলায় বলল,

“এতো নিষ্ঠুর? এতো নিষ্ঠুর আপনি? স্বার্থপর বলব না, কারণ আপনি স্বার্থের ‘স’ ও বুঝেন না।”

ফায়েয প্রস্থান নিলো। সানাম মাথা নুইয়ে নিলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“আমি আপনার প্রতি দুর্বল হতে চাইনা ফায়েয। আপনি আমার প্রতি দুর্বল হন আমি এটাও চাইনা। এতে যে স্পর্শের প্রতি অন্যায় করা হবে। আমার ভালোবাসার সাথে অন্যায় করা হবে।”

সানাম পিছু ঘুরল। আচমকা সিফরার মুখোমুখি হয়ে গেল। ভয় পেয়ে সে থতমত খেয়ে গেল। হাতে থাকা ফোনটি সিফরা কঠিন দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকা সানামের চোখের সামনে ধরল। বেশ উৎসুক গলায় শুধাল,

“এই ছেলেটিই কি শ্রেতা আপুর বয়ফ্রেন্ড ছিল আপু?”

সানাম ছবিটির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মৃহূর্ত কয়েক তাকালো। অতঃপর অবাক গলায় সিফরার দিকে প্রশ্ন ছুড়ল,

“তাওহীদ ভাইয়ার ছবি তোর কাছে কিভাবে এলো?”

_______________________

অনামিকা আজ সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে এলো ফায়েযকে সব সত্যি খুলে বলার জন্য। ফায়েয বেশ রাগী ভাব নিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইল। একটি হাত তার টেবিলের ওপর রাখা। অনামিকা ভয়ে শুকনো ঢোঁক গিলল। প্রসঙ্গ কোথা থেকে শুরু করবে তা ভেবে না পেয়ে সে বেশ সাহস নিয়ে ফায়েযের হাতে হালকা স্পর্শ করল। অমনি ফায়েয হাতটি সরিয়ে নিলো। ঝাঁজালো কণ্ঠে বলে ওঠল,

“ভনিতা না করে কাইন্ডলি কাজের কথা বলো।”
“তোমার হাতটা ধরলে আমি একটু সাহস পাব।”
“এখানে ভয় পাওয়ার কি আছে?”
“সব শোনার পর যদি তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাও?”
“তুমি এবং তোমরা কি এমন করেছ যার কারণে তোমাদের সম্পর্কে জানার পর আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাব?”
“আমি কিছু গোপন রাখতে চাইনা ফায়েয। পাই টু পাই হিসেব করে তোমাকে সব খুলে বলতে চাই। কারণ আমি কখনই চাইবনা আমার অতীতের জন্য আমার বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতে তোমার সাথে কোনো হাঙামা হোক। একচুয়েলি আমি তোমাকে অনেক ভালোবেসে ফেলেছি ফায়েয। যদি বলো কতটুকু। বলব নিজের চেয়েও বেশি! আমার পরিবারের চেয়েও বেশি।”

শিকার তার টোপ গিলেছে অবশেষে। ভেতরে ভেতরে ফায়েয মহা পৈশাচিক আনন্দ পেলেও বাইরে তা প্রকাশ করলনা। জোরপূর্বক অনামিকার হাতে হাত রাখল সে। অনামিকাকে আশ্বাস দিয়ে সচল গলায় বলল,

“কোনোকিছু আড়াল করার প্রয়োজন নেই। আমি তোমার পাশে আছি এবং থাকব। তোমার অতীত যতোই খারাপ হোক না কেন আমি সবসময় তোমার পাশে থাকব।”

অনামিকা আশ্বস্ত হলো। তার বাপ ও ভাইয়ের কুকীর্তি সব ফায়েযের কাছে খুলে বলল! কিছুই আড়াল করলনা সে। স্পর্শের ব্যাপারেও সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানল ফায়েয! এমনকি ফায়েযকে অপছন্দের কারণও বলল সে। ফায়েয সব স্বীকারোক্তি রেকর্ড করল! সমস্ত প্রমাণ এখন তার হাতে। দ্রুতই কেস কোর্টে তুলতে হবে। সানামকে অবশেষে একটা খুশির খবর দিতে পারবে সে। সানামের হাসির কারণ হয়ে ওঠবে। অনামিকার বিশ্বাস নিয়ে খেলতে ফায়েযের মোটেও বিবেকে বাঁধলনা। বরং এতে কারো সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের শাস্তি হবে তা ভেবে ফায়েয অসম্ভব আনন্দ অনুভব করছিল।

_______________________

“তুই আমার মেয়ে তা আমার ভাবতেও ঘৃণা হচ্ছে।”

তীব্র ক্ষোভ নিয়ে কথাটি বলে মালিহা চৌধুরী ঠাস করে রাইয়ের গালে চড় বসিয়ে দিলেন! চড় খেয়ে রাই আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠল। চোখ রাঙিয়ে বলে ওঠল,

“তুমি আমার গাঁয়ে হাত তুললে মা?”

“হ্যা তুলেছি। সাদিদ আসার পর থেকেই তোর রঙ তামাশাগুলো আমি শুধু দেখে যাচ্ছি। ছেলেটাকে এক পয়সার দামও দিসনা তুই। আজ তোর সাথে রাগ করে ছেলেটি বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল।”

“মেয়ের চেয়ে ঐ ছেলের প্রতি দরদ বেশি তোমার?”

“হ্যা বেশি। কারণ, এখানে আমি ঐ ছেলের দোষ দেখিনি, তোর দোষ দেখেছি। এতো বছর পর ছেলেটা দেশে এলো কোথায় তুই তাকে সময় দিবি তা না করে তুই একা একা ঘুরার জন্য বাড়ি থেকে বের হচ্ছিস?”

“হ্যা হচ্ছি। আমি একা একাই ঘুরতে বের হচ্ছি। তোমার কোনো সমস্যা আছে এতে?”

“হ্যা আছে! তুই একা একা বাড়ি থেকে বের হতে পারবিনা। সেদিন অযথা আমি ফায়েযকে ভুল বুঝেছিলাম। ছেলে আমার ঠিকই বলেছিল সেদিন।”

মালিহা চৌধুরী রাইয়ের পথ আটকে দাঁড়াতেই রাই রাগে রি রি করে তার মাকে ধাক্কা মেরে রুম থেকে বের হয়ে গেল! মালিহা চৌধুরী দেয়ালে মৃদু ধাক্কা খেলেন ভাগ্যিস মাথাটা ফাঁটেনি তাঁর! রাই শো শো বেগে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। মালিহা চৌধুরী হতভম্ব হয়ে গেলেন। আপনাআপনি চোখ থেকে তাঁর জল গড়াতে লাগল। আহত গলায় তিনি বললেন,

“এটাই তবে আপন মেয়ে ও সৎ মেয়ের মধ্যে পার্থক্য!”

_______________________

“তুই এখনও আগের মতোই রয়ে গেলি সাদিদ। ত্রিশ বছরের সাদিদকে নয় আমি বরং আঠারো বছরের টগবগে যুবক সাদিদকে দেখছি!”

আলতো হেসে কথাটি বলল মায়া। পলকহীন দৃষ্টি তার সাদিদের দিকে নিবদ্ধ। নদীর বুকে উত্তাল ঢেউ বইছে।সেই ঢেউ উল্টেপাল্টে দিচ্ছে নদীটিকে। আশেপাশের মানুষগুলোকেও এর দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। আকাশে ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝুম বৃষ্টি হবে তারই পূর্বাভাস। ছোট্টো নদীটির পাশেই একটি গোল টেবিলের দু’পাশে থাকা দুটি চেয়ারে মুখোমুখি বসে রইল সাদিদ ও মায়া।

অশান্ত সাদিদ। নদীর ঢেউয়ের ন্যায় তার বুকেও উত্তাল দুঃখের ঢেউ বইছে। চোখজোড়া আগুনের ফুলকির ন্যায় রঙিন হয়ে ওঠেছে তার। মায়ার উপস্থিতিকে উপেক্ষা করে সাদিদ প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট বের করে লাইটার দ্বারা সিগারেট জ্বালালো! ব্যাপারটি অশোভনীয় মনে হলেও সাদিদ এই অশোভন কাজ থেকে নিজেকে আটকাতে পারছিলনা। মায়া হতাশ হলো। সাদিদের দিকে প্রশ্ন ছুড়ল,

“স্মোকিং করিস তুই?”
“কেন? খারাপ কি?”
“আগে তো করতিস না। তাই জিজ্ঞেস করলাম।”
“এখন করি। ভালোই লাগে।”
“রাই কোথায়? হঠাৎ দেখা করতে বললি যে?”
“কেন? দেখা করতে বলাতে বিরক্ত হয়েছিস?”
“উঁহু। কথাটি এভাবে বলতে চাইনি। ভেবেছিলাম রাইও আসবে। তাই প্রশ্নটি করা আর কি।”

সাদিদ ভাবশূণ্য ভঙিতে সিগারেটে টান দিলো। বৈরী হাওয়ায় ভেসে যাওয়া নদীটির দিকে কপাল কুঁচকে তাকালো। নিবিড় স্বরে বলল,

“রাই আসবেনা। তোর কি খবর বল? এখনও বিয়ে করিসনি কেন?”

মায়া রুদ্ধশ্বাস ফেলল। পাশ ফিরে নদীটির দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকালো। জোরপূর্বক হেসে নিরাগ স্বরে বলল,

“সন্নাসী হওয়ার শখ তাই! সেই যে আঠারো বছরের প্রেমে ধোঁকা খেলাম তারপর থেকে আর ইচ্ছে হয়নি কাউকে ভালোবাসার।”

#চলবে____?