আঁধারে প্রণয়কাব্য পর্ব-১৩+১৪

0
106

#আঁধারে_প্রণয়কাব্য
#পর্ব____১৩
#নিশাত_জাহান_নিশি

চিঠি থেকে চোখ সরিয়ে ফায়েয তীরের সঙ্গে লটকে থাকা সাদিদের নিথর দেহটির দিকে তাকালো। খাটেই চির ঘুমে তলিয়ে রয়েছে রাই! ভেঙেচুরে মাটিতে পরে গেল ফায়েয। মালিহা চৌধুরী এই শোক সামলাতে পারবেন তো?

দেয়ালে ভর দিয়ে বসে ফায়েয হাঁসফাঁস করছিল। হঠাৎ শোকে তার নিজেকে বিদিশা লাগছিল। বুকটা ভয়ে ও আতঙ্কে টিউটিউ করছিল। দুমড়ে মুচড়ে আসছিল সব। একসাথে দু দুটো ধাক্কা। কিভাবে সামলাবে সে এবং তারা? বার কয়েক বিধ্বস্ত দৃষ্টি ফেলে ফায়েয একদফায় সাদিদের ঝুলন্ত দেহটিকে দেখছিল তো অন্যদফায় বিছানায় পরে থাকা রাইয়ের নিথর লাশটিকে। রাইয়ের জন্য বিন্দু পরিমাণ কষ্ট না হলেও তার সাদিদের জন্য বুকটা ফেটে যাচ্ছিল! ভেতর থেকে গুঙিয়ে ওঠে ফায়েয সাদিদের লাশটির দিকে বিভৎস দৃষ্টি ফেলে বলল,

“এটা তুমি কি করলে জিজু? তোমার থেকে এটা এক্সপেক্ট করিনি।”

ফায়েয ভেঙে পরল। নিশ্চুপ ও নির্বিকার হয়ে চিঠিটি হাতে নিয়ে ঘরের এক কোণায় বসে রইল। হিতাহিতজ্ঞান শূণ্য সে। কি করবে না করবে ভেবে ওঠতে পারছিলনা। মালিহা চৌধুরী ঘুম থেকে ওঠে মাত্র রান্নাঘরের দিকেই অগ্রসর হচ্ছিলেন। তখন আনুমানিক সকাল প্রায় আটটা। বাড়ির নিচ তলা থেকে তিনি রাইয়ের রুমের দরজা খোলা দেখতে পেয়ে কপাল কুঁচকালেন। সন্দিহান গলায় বললেন,

“কি ব্যাপার? এই সাত সকালে রাইয়ের রুমের দরজা খোলা কেন? এত সকাল তো রাই সাদিদ কেউই ঘুম থেকে ওঠেনা। দুজনের মধ্যে আবার ঝগড়া লেগে গেলনা তো?”

মরিয়া হয়ে ওঠে তিনি সিঁড়ি ভেঙে রাইয়ের রুমের দরজায় এসে দাঁড়ালেন। হাঁপিয়ে ওঠলেন তিনি। কয়েক দফা শ্বাস ফেলে নিজেকে স্থির করে তিনি রাইয়ের রুমের ভেতরে চোখ বুলাতেই চোখের পলক ফেলতেই ভুলে গেলেন। সাদিদের ঝুলন্ত দেহ ও রাইকে শায়িত অবস্থায় দেখে তিনি আঁতকে ওঠে বললেন,

“রাইয়ের বাবা কোথায় তুমি?”

ফায়েযের মৌনতা ভাঙল। হন্ন হয়ে সে ছুটে এলো তার মায়ের কাছে। কিছু একটা অনর্থ তো হবেই এবার। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মালিহা চৌধুরী মাথা ঘুরে পরে যেতে গেলেই ফায়েয সন্তপর্ণে তার মাকে আগলে ধরল৷ চোখ বুজার আগ মুহূর্তে তিনি ফায়েযের আতঙ্কিত মুখের পানে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন,

“এটা কি করল সাদিদ?”

ফায়েয তার মাকে ঝাকিয়ে তুলে বলল,

“কিছু হয়নি মা। তুমি ভয় পেওনা।”

মালিহা চৌধুরী জ্ঞান হারালেন। ফায়েয তার মাকে জড়িয়ে ধরে মা বলে চিৎকার করে ওঠল। আকরাম ফারনাজ চৌধুরী তড়িঘড়ি করে ঘুম থেকে ওঠে এলেন। রাইয়ের রুমের দিকে এগিয়ে এসে তিনি ফায়েয ও তার মাকে ঐ অবস্থায় দেখে চিন্তিত গলায় বললেন,

“কি হয়েছে?”

রাইয়ের রুমের দিকে তাকাতে তিনিও আঁতকে ওঠলেন। ছুটে গেলেন তিনি রাইয়ের রুমে। সাদিদের ঝুলন্ত লাশটির দিকে একবার তাকিয়ে তিনি রাইয়ের পাশে বসলেন। রাইকে ঝাঁকুনি দিয়ে শঙ্কিত গলায় বললেন,

“এই রাই? কি হয়েছে তোর?”

পেছন ফিরে ফায়েয উৎকন্ঠিত গলায় তার বাবাকে বলল,

“পুলিশ কল করতে হবে বাবা। কাউকে টাচ করোনা প্লিজ।”

মালিহা চৌধুরীর চোখেমুখে পানি ঢেলে তাঁর হুশ ফেরালো ফায়েয। জ্ঞান ফিরে আসতেই তিনি বুক ফাঁটা আহাজারি শুরু করলেন। মেয়ের লাশের পাশে বসে বুক চাপড়াতে লাগলেন। মুহূর্তেই পাড়া, প্রতিবেশী, আত্নীয় স্বজন সকলের কানে এই খবর পৌঁছে গেল। পুরো এলাকায় ছড়িয়ে গেল এই খবর। আকরাম ফারনাজ চৌধুরী নিজেও তব্দা লেগে গেলেন। শক্ত মনের মানুষটাও চুপচাপ হয়ে বসে রইলেন। তাঁর ব্যাবসায়ের সকল বন্ধু-বান্ধব, রাজনীতিবিদরা এসে তাকে শান্তনা দিচ্ছিলেন।

ফায়েয প্রথমে পুলিশ কল করেছিল। ঘণ্টা দেড়েক পর পুলিশ এসে সাদিদের ঝুলন্ত লাশটিকে দড়ি থেকে নামালো। সানাম দূর থেকে দাড়িয়ে সব দেখছিল। গতকাল রাতে ফায়েযদের বাড়িতে থাকার দরুন ঘটনার প্রথম থেকেই এখানে উপস্থিত ছিল সানাম। ফায়েয পায়চারী করছিল। ভীষণ উসকোখুসকো দেখাচ্ছিল তাকে। চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন। চোখমুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিলনা। না কাঁদলেও তাকে বিষন্ন দেখাচ্ছিল। ফায়েয তার বন্ধুদের সাথে ফোনে জরুরী কথা বলতে বলতে লোকজনের ভীড় মাড়িয়ে বাড়ির একটি নিরিবিলি জায়গায় এলো। সানাম ফায়েযের পিছু নিলো। নিম্ন স্বরে ফায়েয ফোনে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,

“নওশাদের ওপর নজর রাখ। কু*ত্তার বাচ্চা যেন পালাতে না পারে। প্রয়োজনে আমি তাকে নিজ হাতে ফা*য়ার করব!”

কথা শেষ করে ফায়েয পেছনে ফিরে তাকাতেই সানামকে দেখল! ফোনের আলাপচারিতা সানাম কিছু শুনেনি তা সানামের চোখমুখ দেখেই স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিল ফায়েয। সানাম আমতা আমতা করল। শুকনো গলায় বলল,

“কি থেকে কি হয়ে গেল। কিছুই বুঝে ওঠতে পারছিনা আমি। আপনাকে কিভাবে শান্তনা দিব তাও বুঝতে পারছিনা।”

নৃশংস বেদনায় কলুষিত হয়ে থাকা ফায়েযের চোখে প্রায় ঝাপসা জলের ছড়াছড়ি। এই অসময়ে অন্তত কেউ তো শান্তনা দিতে তার পাশে এসে দাড়ালো। ফায়েয সিদ্ধান্ত নিলো তার দুঃখগুলো হালকা করার। মনের কিছু সুপ্ত অনুভূতিগুলো প্রকাশ করার। কোনোদিকে কালক্ষেপণ না করেই ফায়েয আচমকা সানামকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল! আবেগাপ্লুত হয়ে ভারী গলায় বলল,

“সাদিদ ভাইয়ার প্রতি আমার এক আকাশ সমান অভিযোগ জানেন? ভাইয়া বলছি কারণ আপুর সাথে বিয়ের আগে মানুষটা সম্পর্কে আমার বড়ো ভাইয়ার মতই ছিল। সেই ছোটোবেলা থেকেই মানুষটার সাথে আমার পরিচয়। একদম মাটির মানুষ ছিলেন তিনি। তাঁর মতো উদার, সহজ সরল, নরম ও সহনশীল মানুষ আমি পৃথিবীতে খুব কমই দেখেছি। কিন্তু আমার আপু বাধ্য করেছে মানুষটাকে কঠিন হতে। ভালো মানুষ থেকে তাকে খারাপ মানুষ তৈরি হতে আপু বাধ্য করেছে। তাঁর এত বছরের সকল সৎ কর্মগুলো আজ এক নিমিষেই ধ্বংস হয়ে গেল। ভাইয়া ঐ নোংরা মেয়েটাকে তো খুন করল করল তার পাশাপাশি ভাইয়া তার জীবনটাও দিলো। পরকালে যদি কখনও ভাইয়ার সাথে আমার দেখা হয় যদি ভাইয়াকে আমি চিনতে পারি তবে একটা প্রশ্নই করব, কেন ভাইয়া তার জীবন দিলো? আপুকে মেরে কেন সে পালালো না? প্রয়োজনে আমি তাকে বাঁচিয়ে নিতাম! ছোটোবেলায় সে আমাকে যেভাবে প্রোটেক্ট করত আমিও তাকে করতাম। কেন আমার সাহায্য নিলো না সে? দেশের প্রতিটি আনাচে কানাচে এমন কতো খুনিই তো বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমন একটা খুনি বেঁচে গেলে কি হতো? ভেঙে পরেছি আমি। তাঁর মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছি আমি।”

ভেতর থেকে গুঙিয়ে ওঠছিল ফায়েয। সানাম অবাক হলো। বোনের চেয়েও বোনের খুনীর প্রতি এত বেশি টান তার! ফায়েযকে দূরে সরাতে গিয়েও দূরে সরাতে পারছিলনা সানাম। যদিও সানাম ফায়েযকে হাত দিয়ে এখনও আঁকড়ে ধরেনি। হাতদুটো ছাড়া তার। ফায়েযকে শান্তনা দেয়ার কোনো ভাষা জানা নেই তার। আচমকা সম্বিত ফিরল ফায়েযের! সানামকে ছেড়ে দাড়ালো সে। চোখ নামিয়ে বলল,

“সরি। একচুয়েলি আমার মাথা ঠিক নেই। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড।”

সানাম তার ওড়না ঠিক করল। চোখ ওঠিয়ে ফায়েযকে বলল,

“ইট’স ওকে। বাট আজকের এই পরিস্থিতি তো নওশাদ ভাই-ই ক্রিয়েট করল। তাকে এভাবে ছেড়ে দিবেন?”

“ছেড়ে দিব কে বলল? তাকে তিন তিনটি খুনে আমি ফাঁসাব। প্রথমত স্পর্শ৷ দ্বিতীয়ত আপু এবং তৃতীয়ত আমার সাদিদ ভাই! ফাঁসিই হবে তার মৃত্যুদন্ড। যদি সম্ভব হয় আমি নিজ হাতে তাকে খুন করব!”

“উঁহু। এটা মোটেও করবেন না। আইন নিজের হাতে তুলে নিবেননা। আপনার বাবা মায়ের কথা ভেবে অন্তত নিজের জন্য ভাবুন।”

“জ্ঞান চাইনি আমি। সো জ্ঞান দিতে আসবেন না।”

শো শো বেগে ফায়েয প্রস্থান নিলো। সানাম ছোটো শ্বাস ফেলল। ফায়েযের যাওয়ার পথে তাকালো। চিন্তিত গলায় বলল,

“এবার অন্তত লোকটার বোধ বুদ্ধি হোক। মাথা গরম করে কোনো ঝামেলায় না জড়াক, সুস্থভাবে সব হোক। অনেক তো ঝড় বয়ে যাচ্ছে লোকটার ওপর দিয়ে।”

________________________

রুমের চারিপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢাকা। থাই ভেদ করে জানালা দিয়ে আসা চাঁদের সূক্ষ্ম এবং অতি ক্ষুদ্র আলোটুকুনও অসহ্য লাগছিল মায়ার কাছে! পর্দা দ্বারা থাইটিকে নিঁখুতভাবে ঢেকে দিলো সে! সাদা কাপড় পরিহিতা, অগোছালো চুল ও এলোমেলো অবস্থায় সে মেঝের এক কোণায় গুটিসুটি হয়ে বসে সাদিদের সাথে থাকা কলেজ জীবনের ছবিগুলো ছবির ফ্রেম ঘেটে ঘেটে একেক করে দেখছে! পাগলের মতো করছিল সে। অস্থির হয়ে কেবল সাদিদের ছবিগুলোতে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। চোখ থেকে টুপটাপ জল গড়িয়ে পরছিল তার। আচমকা সে ফুঁপিয়ে ওঠে ছবির ফ্রেমটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে আতর্নাদ করে বলে ওঠল,

“এটা তুই কি করলি সাদিদ? কেন আমার কথা শুনতে গেলি? কেন ভেঙে বললি না যে ঐটা তোরই জীবন কাহিনী ছিল? এটা যদি জানতাম আমি তবে কখনও বলতাম না কাউকে খুন করার কথা! তুই তো নিজে মরলি মরলি জীবিত অবস্থায় আমাকেও মেরে দিয়ে গেলি। এতদিন তো একটা শান্তনা ছিল অন্তত আমার ভালোবাসার মানুষটা বেঁচে আছে। চাইলেই আমি তাকে দেখতে পারব। কিন্তু এখন তো আর এই শান্তনাটাও রইলনা! আমার এখন যখন তোকে খুব দেখতে ইচ্ছে করবে, তোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করবে তখন কি করব আমি? কিভাবে তোর দেখা পাব, কিভাবে তোর গলার আওয়াজ শুনব?”

মায়ার বুক ভরা আর্তনাদ ও আহাজারির আওয়াজে মায়ার রুমের দরজার বাইরে থাকা মায়ার মা ও ছোটো বোনও কান্না করতে বাধ্য হচ্ছিল! সাদিদকে ভালোবেসে মায়া গোটা বারো বছর নিঃসঙ্গ কাটিয়ে দিলো। কখনও বিয়ে করবেনা বলে বিয়ে ছাড়াই ত্রিশ বছরে পা রাখল। এখন তো তার বেঁচে থাকার অর্থটাই ফিকে হয়ে গেল। মায়া ভারী গলায় পুনরায় বলল,

“আমাকে ভালোবাসলে তোর কি এমন ক্ষতি হতো সাদিদ? কেন তুই কখনও আমার চোখে তোর জন্য ভালোবাসা দেখতে পাসনি? কেন কখনও তুই আমার চোখে চোখ রাখিসনি? আমাকে উপেক্ষা করে তুই রাইকে ভালোবেসেছিলিস। বিয়ে করে যখন দেখলি তুই তাকে নিয়ে খুশি নস তখন তুই কেন আমার কাছে কিছু শেয়ার করলিনা? তোদের মধ্যের অশান্তির বিন্দুমাত্র আঁচ যদি আমি পেতাম তবে আজ তোর এই হাল আমি হতে দিতামনা! তোকে এবার ঠিক আমার করে নিতাম। তোর সব দুঃখ ভুলিয়ে দিতাম। সেই সুযোগটাও তুই আমাকে দিলি না!”

_______________________

নওশাদ ও এরশাদ শিকদার এখন পুলিশের হেফাজতে! দুজনকেই তাদের বাড়ি থেকে হাতেনাতে ধরেছিল পুলিশ। রাইয়ের খুন ও সাদিদের সুইসাইডের খবরটি শুনেই ব্যাগপত্র গোছাচ্ছিল তারা বাড়ি থেকে পালানোর জন্য! তাদের সাথে অনামিকাও ছিল। ফায়েযকে বিশ্বাস করে অনামিকা কতখানি ভুল করেছিল তা খেসারত এখন অনামিকাকে জেলে বসে দিতে হবে বা হচ্ছে!

সাদিদ ও রাইয়ের দাফন কাফনের কাজ শেষে ফায়েয ও তার বাবা রাতে তাদের বাড়ি ফিরল। আকরাম ফারনাজ চৌধুরী তার রুমে দরজা আটকে নিরিবিলি বসে রইলেন। হঠাৎ শোকে তিনি জর্জরিত। রাইয়ের লাশ নেয়ার পর থেকেই মালিহা চৌধুরী রাইয়ের রুমে বসে রইলেন! রুম থেকে এক কদমও লড়লেন চড়লেন না তিনি। রাইয়ের রুমে শান্ত ভঙিতে হেঁটে এলো ফায়েয। সানাম এতক্ষণ মালিহা চৌধুরীর পাশেই ছিল। মালিহা চৌধুরীকে শান্তনা দিচ্ছিল। ফায়েযকে দেখামাত্রই সানাম ওঠে দাড়ালো। ফায়েয সানামের দিকে একদফা স্থির দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। এরপর তার মায়ের কোলে মাথা রেখে মেঝেতে বসল। মালিহা চৌধুরীর গলা প্রায় বসে গেছে। ফায়েযের মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি ভাঙা গলায় বললেন,

“তোকে আজ একটা সত্য কথা বলব ফায়েয?”
“হুম”
“রাই তোর আপন বোন ছিলনা!”

ফায়েয থমকালো। মাথা তুলে তার মায়ের দিকে হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকালো। শুধালো,

“হোয়াট?

“আমাদের বিয়ের পাঁচ বছর পরেও আমার যখন বাচ্চা হচ্ছিলনা তখন আমরা রাইকে দত্তক নিয়েছিলাম। আশ্চর্যের বিষয় হলো রাইকে দত্তক নেয়ার পাঁচ বছর পরই তুই হয়েছিস। তবে আমরা কখনও তোদের আলাদা করে দেখিনি। তোদের কখনও বুঝতে দিইনি তোরা আপন ভাই বোন নস।”

ফায়েয পুনরায় তার মায়ের কোলে মাথা রাখল। ছোটো শ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলল,

“এজন্যই আপু আমাদের স্বভাব পায়নি! তার বংশের ধারা হয়ত পেয়েছিল। তবে এর মাঝে আমার সাদিদ ভাই তার সুন্দর জীবনটা কোরবানি করল!”

_____________________

“কাল সকালেই ভাবছি বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হব।”

চোখ তুলে সানাম নিভীর্ক দৃষ্টিতে সিগারেট ফুঁকতে থাকা ফায়েযের দিকে তাকালো। নাকমুখ থেকে ধোঁয়া নির্গত করল ফায়েয। বাইরের নীরব ও নিশ্চুপ পরিবেশ থেকে চোখ ওঠিয়ে রুক্ষ দৃষ্টিতে সানামের দিকে তাকালো। রাত গভীর হলেও চাঁদের আলো বেশ সূক্ষ্মভাবেই পরছে ফায়েয ও সানামের চোখেমুখে। ইতোমধ্যেই রাতের শীতল বাতাস এসে দুজনকে ছুঁয়ে দিলো। ফায়েয গম্ভীর গলায় শুধাল,

“এত রাতে এটা বলার জন্যই ছাদে এসেছেন?”

সানাম ভড়কালো। চোখ নামিয়ে জড়ো গলায় বলল,

“আপনি রুমে ছিলেন না তাই খুঁজতে খুঁজতে ছাদে এলাম।”

“কাজ এখনও শেষ হয়নি আপনার। তাই কয়েকটা দিন এখানেই থাকতে হবে।”

“সমস্যা নেই আমি বাড়ি থেকেই যাতায়াত করতে পারব।”

“এখানে থাকতে কি সমস্যা? আমি কি আপনাকে ডিস্টার্ব করছি? কিংবা আপনাকে চ্যাচিয়ে বলছি আমাকে ভালোবাসা দিন, ভালোবাসুন, বিয়ে করুন?”

“বিষয়টা এমন নয়।”

“তাহলে বিষয়টা কেমন?”

ফায়েযের কঠোর ভাবভঙ্গি দেখে সানাম বিরক্ত হলো। নাকমুখ কুঁচকে বলল,

“আপনার সাথে কথা বলতে আসাটাই আমার ভুল হয়েছে!”

“আশ্চর্য! আমি করলামটা কি? আপনি যেমন প্রশ্ন করছিলেন আমিও তেমন উত্তর করছিলাম। এখানে ঠিক ভুল কোথা থেকে এলো?”

সানাম ক্ষেপে গিয়ে ফায়েযের সম্মুখ থেকে প্রস্থান নিতে গেলেই ফায়েয রাশভারী গলায় সানামকে ডেকে বলল,

“যাবেন না প্লিজ। আমার খুব একা লাগছে। ভীষণ মন খারাপ লাগছে।”

#চলবে____?

#আঁধারে_প্রণয়কাব্য
#পর্ব____১৪
#নিশাত_জাহান_নিশি

“যাবেন না প্লিজ। আমার খুব একা লাগছে। ভীষণ মন খারাপ লাগছে।”

সানাম থমকালো। মুহূর্ত কয়েক ভাবল। চাইলেও কি এই করুনাভরা আকুতি উপেক্ষা করা যায়? সম্পর্ক যতই খারাপ হোক না কেন বিপদে পড়া কোনো শত্রুর অসহায়ত্বকেও অগ্রাহ্য করতে নেই। অথচ ফায়েয তো তার পরম বন্ধু। চরম বিপদের দিনে তার পাশে দাড়ানো এক সহযোদ্ধা। যাকে সে নির্বিঘ্নে ভরসা করে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিও পাড়ি দিতে পারবে। কোনোদিকে কালক্ষেপণ না করে সানাম পেছন ফিরে তাকালো। উচ্ছন্ন ভাব ফায়েযের। নির্জীব ও নেতানো মুখমন্ডল। দু-চোখ ভরা ক্লেশ। শুকনো ঠোঁট। এ যেন বিস্তর বিষাদের ছাপ তার মুখশ্রীতে অতি সুনিপুণভাবে লেপ্টানো। কদম বাড়ালো সানাম। ফায়েযের সান্নিধ্যে এলো। শূণ্য দৃষ্টিতে ফায়েযকে দেখল। ফের দৃষ্টি নামিয়ে অবিশ্বাস্য ও অপ্রত্যাশিতভাবেই ফায়েযের হাতে থাকা সিগারেটটিকে ছুঁড়ে ফেলে দিলো! ফায়েয ভড়কালো। অদ্ভুত দৃষ্টি ফেলল সানামের দিকে। ভ্রু উঁচিয়ে সানাম বলল,

“সিগারেট না আমি কোনটা?”
“নিজেকে অপশন ভাবছেন?”
“সিগারেটে এলার্জি আমার। তাই অপশন দিলাম।”
“তাহলে আপনি!”
“শুধু এই মুহূর্তের জন্যই কিন্তু! মন খারাপ তাই সঙ্গ দিব।”
“এটা কিন্তু চিটিং হয়ে গেল।”
“ক্ষতি কি? চিটিং থেকে যদি ভালো কিছু হয় তবে চিটিংই ভালো!”

সানাম ক্ষীণ হাসল। ফায়েযের পাশাপাশি ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাড়ালো। বুকে হাত গুজে আকাশে উজ্জ্বলভাবে জ্বলতে থাকা স্নিগ্ধ চাঁদের পানে তাকালো। মন জুড়িয়ে এলো। ভেতর থেকে একটি স্বস্তির শ্বাস বের হয়ে এলো। আনমনে বলল,

“আমার যখন খুব মন খারাপ হয় আমি আকাশের দিকে তাকাই। আর যদি জোছনা রাত হয় তবে মায়াবী চাঁদের দিকে তাকাই, চাঁদের আশেপাশে ঘুরতে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তাঁরাদের দিকে তাকাই, আর যদি অমবস্যার রাত হয় তবে চোখ বুজে অন্ধকারকে অনুভব করি। আমার প্রিয় মানুষরা তখন অন্ধকার ভেদ করে আমার দু’চোখে ধরা দেয়! আর এটা সত্যি। আমি সত্যিই তাদের উপস্থিতি উপলব্ধি করতে পারি। নিমিষেই আমার মন ভালো হয়ে যায়। তখন আর কারো সঙ্গের প্রয়োজন হয়না। ভেতর থেকে এক অদ্ভুত শান্তি অনুভূত হয়। আপনিও ট্রাই করে দেখতে পারেন।”

ফায়েযের নির্লিপ্ত দৃষ্টি এখনও সানামের দিকে সীমাবদ্ধ। সানামের ঘোর যেন কাটছেই না তার। ক্ষণিকের জন্য হলেও সানাম তার! একান্তই তার। বিশ্বাসই হচ্ছেনা সানাম এই মুহূর্তের জন্য তার হতে রাজি হয়েছে! নিরবচ্ছিন্ন গলায় ফায়েয বলল,

“যদি বলি আমার আকাশ, আমার জোছনা রাত, আমার চাঁদ-তাঁরা, অমবস্যা সব আপনি! আমার দুনিয়া বলতে আমি আপনাকেই বুঝি। আপনাকে দেখলেই আমার মন ভালো হয়ে যায়। আপনার সঙ্গ আমার আমৃত্যু প্রয়োজন। আপনার সঙ্গ ছাড়া আমার এক মুহূর্তও যেন মৃত্যুর সমতুল্য। বিশ্বাস করবেন আপনি?”

সানাম কপাল কুঁচকালো। বিরক্তির রেখা মুখমন্ডলে ফুটিয়ে তুলল। ফায়েযের দিকে বিব্রতকর দৃষ্টি ফেলতেই ফায়েয বলল,

“উঁহু। কোনো বিরক্তি নয়। অপশন হিসেবে আমি এই মুহূর্তের জন্য আপনাকেই বেছে নিয়েছি তাই আমি এখন যাই বলব আপনাকে সব শুনতে হবে!”

সানাম নিজের জালে নিজেই ফেঁসে গেল! চোখ নামিয়ে নিলো সে। মুখ ভার হয়ে এলো তার। গম্ভীর গলায় বলল,

“আমি আপনার মন ভালো করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি আপনিই আমার মন খারাপ করে দিচ্ছেন। ইট’স নট ফেয়ার।”

“চোখ নামিয়ে নিলেন কেন? আমি দেখতে এতটাও জঘন্য নই যে আমাকে দেখলে চোখ নামিয়ে নিতে হবে।”

সানাম পুনরায় উত্তেজিত ফায়েযের দিকে নিষ্ক্রিয় দৃষ্টি ফেলল। বিরক্তির স্বরে শুধাল,

“আপনি দেখতে জঘন্য আমি কখন বললাম?”
“তাহলে চোখে চোখ রেখে কথা বলুন।”

সানাম অপারগ গলায় বলল,

“এইতো বলছি।”

সরু ও মগ্ন দৃষ্টিতে ফায়েযের। বেখেয়ালি গলায় শুধাল,

“একটা সত্যি কথা বলবেন?”
“কি বলুন?”
“আপনি সেদিন আমার ছবিটি দেখেননি?”
“উঁহু!”
“সত্যিই দেখেননি?”
“সত্যিই দেখিনি। হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?”
“তখন ভেবেছিলাম আমাকে দেখে হয়ত আপনার পছন্দ হয়নি। ভুল আমার মধ্যেই ছিল। তাই সেদিন আপনি বিয়ে ছেড়ে পালিয়েছিলেন। বাই দ্য ওয়ে, এবার চোখটা নামিয়ে ফেলুন!”

ফায়েয নিজেই চোখ নামিয়ে নিলো। উল্টো পাশ ফিরে মাথা চুলকালো। বিড়বিড় করে বলল,

“এই সর্বনাশীনি ও মায়াবীনী চোখের মেয়ের দিকে বেশিক্ষণ তাকাতে গেলে আমারই আবার প্রেম হয়ে যাবে! এক মেয়েতে আর কতবার মরব?”

গলা ঝেড়ে ফায়েয হতভম্ব সানামকে বলল,

“আমার দিকে বেশিক্ষণ তাকালে আপনার প্রেম হয়ে যাবে তাই চোখ নামিয়ে নিতে বললাম!”

সানাম ফিক করে হেসে দিলো! ফায়েযের দিকে হেয়ালি দৃষ্টিতে তাকালো। হেসে হেসেই বলল,

“আমার আর প্রেমে পড়া হবেনা মিস্টার ফায়েয ফারনাজ চৌধুরী। সব প্রেম ঐ একজনকেই লুটিয়ে দিয়েছিলাম!”

বুকে যেন তীর বিঁধল ফায়েযের। কথার আঘাতে ভেতরটা ঝাঁজরা হয়ে গেল। ক্ষুব্ধ ফায়েয প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট বের করে পুনরায় সিগারেট জ্বালালো! সানাম অবাক দৃষ্টিতে ফায়েযের দিকে তাকাতেই ফায়েয সিগারেটে ফুঁক দিয়ে রুক্ষ গলায় সানামকে বলল,

“আপনার প্রয়োজন শেষ। এবার যেতে পারেন!”

সানাম মৌন রইল। বার কয়েক ফায়েযের দিকে নিশ্চল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে একপ্রকার হাপিত্যেশ করেই সে ছাদ থেকে প্রস্থান নিলো! উল্টোদিক ফিরে গেল ফায়েয। গরম ভাপ বের হতে লাগল তার শরীর থেকে। তাৎক্ষণিক গাঁ থেকে সে শার্টটি খুলে ছাদের কার্ণিশে রাখল। নাক মুখ থেকে ধোঁয়া উড়িয়ে বলল,

“ভালোবাসা নিখুঁতভাবে প্রকাশ করেও দেখছি, তার থেকে প্রতিশোধ নিয়েও দেখেছি, তার জন্য আবার এগ্রেসিভ হয়েও দেখেছি। এবার শুধু কলিজা ভুনা করে তাকে খাওয়ানোর পালা! এতে যদি সে বুঝে আমার মনের জ্বালা।”

_____________________

সকাল দশটা নাগাদ ফায়েযের রুমের দরজায় কড়া নাড়ল কেউ। মনোযোগে বিচুত্যি ঘটল তার। মাথায় টং করে একটি শব্দ হলো। হাতে থাকা চিঠিটির থেকে চোখ সরিয়ে ফায়েয বিরক্তিকর দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকালো। মালিহা চৌধুরী ভাঙা গলা নিয়ে হাঁকডাক ছেড়ে বললেন,

“কি রে ফায়েয? ঘুম ভাঙল তোর? নাশতা করবি আয়।”

ফায়েয মৃদু স্বরে বলল,

“আসছি মা।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে মালিহা চৌধুরী প্রস্থান নিলেন। ফায়েয পুনরায় চিঠিটিতে চোখ বুলালো। গতকাল চিঠিটির উল্টো পাশে চোখ বুলানো হয়নি তার। তাই একটি জিনিস মিস করে গিয়েছিল সে। আজ সে ঘুম ভেঙে ওঠতেই চিঠিটির কথা মনে পরল। তাই হন্ন হয়ে চিঠিটি খুঁজে চিঠিটিতে চোখ বুলালো। চিঠিটির উল্টো পিঠে লিখা—-

“ফায়েয? তোর কাছে আমার একটি শেষ অনুরোধ রইল। আশা করছি রাখবি তুই। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড মায়াকে নিশ্চয়ই চিনিস তুই? পাগলীটা আমাকে সেই কলেজ লাইফ থেকেই ভীষণ ভালোবাসত, পছন্দ করত। আমি বুঝেও চুপ ছিলাম। কারণ, আমি তখন রাইয়ের প্রেমে মগ্ন! রাইকে ছাড়া অন্য কাউকে কখনও ভাবতেই পারিনি। যদি পারিস তো মায়ার সাথে একদিন দেখা করিস। এরচেয়ে ভালো হবে যদি তুই মায়াকে একটু বুঝাস। আমি জানি আমার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর মায়া খুব ভেঙে পরবে। তুই তাকে সামলে নিস। যদি সম্ভব হয় তো একটা ভালো ছেলে দেখে তাকে বিয়ে দিয়ে দিস। আর যাই হোক নিঃসঙ্গ জীবন কাটানো যায়না। বয়সে যদি তুই মায়ার বড়ো হতিস তবে আমিই তোকে বলতাম তাকে বিয়ে করতে! মায়ার মতো লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে হয়না। বিষয়টা মাথায় রাখিস।”

চিঠিটি ভাঁজ করে বালিশের তলায় রেখে দিলো ফায়েয। উবুড় হয়ে বিছানায় শুয়ে পরল। কপাল ঘঁষে সে কিছুক্ষণ শান্ত হয়ে শুয়ে রইল। পুনরায় দরজায় টোকা পড়ল। ফায়েয চোয়াল উঁচিয়ে বলল,

“মা আসছি তো।”
“আমি সানাম বলছিলাম।”

শোয়া থেকে ওঠল ফায়েয। গাঁয়ে একটি টি-শার্ট জড়িয়ে রুমের দরজা খুলে দিলো। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দাড়িয়ে সানাম। কপাল কুঁচকালো ফায়েয। প্রশ্ন ছুড়ল,

“আপনি কেন? মা কোথায়?”
“আন্টি বলল আপনাকে চা টা দিয়ে আসতে।”
“আন্টি বলল বলে ধেই ধেই করে নেচে একটা বেগানা ছেলের জন্য চা নিয়ে চলে এলেন? এখন যদি আন্টি বলে আমার ছেলেকে বিয়ে করো তখন আমাকে বিয়ে করবেন?”

সানাম নাক ফুলিয়ে বলল,

“মোটেও নয়!”
“তাহলে ভাগেন!”

সানামের মুখের ওপর ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিলো ফায়েয! বেকুব বনে গেল সানাম। রাগে রি রি করে বলল,

“এত রুড কেন এই ছেলে? মন তো চায় কলারটা টেনে ধরে তুলো ধুনো করি একে!”

______________________

সপ্তাহখানেকের মধ্যেই নওশাদ, এরশাদ শিকদার ও অনামিকাকে কোর্টে তোলা হবে। ফায়েয ও সানাম থানায় এসেছিল সেই সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে। নওশাদ ও এরশাদ শিকদারের সাথে দেখা না হলেও অনামিকার সাথে দেখা হলো ফায়েয ও সানামের। তাকে আলাদা সেলে রাখা হয়েছে। ফায়েযের কাছ থেকে ধোঁকা হয়ে সে জেরবার হয়ে গেল প্রায়। ফায়েযকে সেলের ঐ প্রান্তে এক ঝলক দেখামাত্রই অনামিকা ক্ষেপে গেল! ব্যগ্র হাসিতে মজা নেওয়া ফায়েযের দিকে তেড়ে এসে সে বলল,

“তুমি কাজটা ঠিক করোনি ফায়েয। তুমি আমার দূর্বলতার সুযোগ নিয়েছ!”

“তুমিও তো জীবনে কম ছেলেদের দূর্বলতার সুযোগ নাওনি অনামিকা! এবার না হয় আমি এসে তোমাকে হারিয়ে দিলাম।”

ফায়েযের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে অনামিকা এবার সানামের দিকে রুদ্রাক্ষী দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“তুই ফায়েযকে উস্কিয়েছিস তাইনা? আমাকে ব্যাবহার করে তুই ফায়েয অবধি পৌঁছে গিয়েছিলিস তাইতো? তোকে আমি কখনও ক্ষমা করবনা।”

সানামও কাঠখোট্টা গলায় অনামিকার কথার প্রত্যত্তুরে বলল,

“আমি ফায়েযকে উস্কাইনি। না আমি কখনও তোর মাধ্যমে ফায়েয অবধি পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি। ফায়েয তোর আগে থেকেই আমার ছিল! উল্টো ফায়েয আমার মাধ্যমে তুই অবধি পৌঁছেছিল!”

ফায়েয মৌন ও নিমগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রাগান্বিত সানামের দিকে। মেয়েটি শূণ্য মাথায় কেমন নির্দ্বিধায় তাকে তার বলে স্বীকার করছে! অথচ এর খবরও নেই হয়ত মেয়েটির। সানাম ফোঁস করে শ্বাস ফেলে ফায়েযের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কি বলুন? চুপ করে দাড়িয়ে আছেন কেন?”
“আপনিই বলুন না। শুনতে তো ভালোই লাগছে!”

সানামের টনক নড়ল। রাগের চোটে কি থেকে কি বলে ফেলছিল এতক্ষণে স্মরণে এলো তার। সানাম জিভ কাটল। আমতা আমতা করে মাথা নুইয়ে নিলো। ফায়েয বেশ ভাবপূর্ণ গলায় অনামিকাকে বলল,

“কি শুনলে তো? আমি মিস সানামের ছিলাম, আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকব এটা আমি তোমাকে কনফার্ম করে গেলাম!”

সানাম আকস্মিত দৃষ্টিতে ফায়েযের দিকে তাকাতেই ফায়েয চোখ টিপে দিলো! সানাম ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে ফায়েযের দিকে তাকাতেই ফায়েয সানামের হাত ধরে সোজা থানা থেকে বের হয়ে গেল। থানার বাইরে রাখা ফায়েযের গাড়িতে তারা ওঠে গেল। সানাম এখনও ঘোর থেকে বের হতে পারলনা। চুপচাপ রইল সে। ফায়েয গাড়ি স্টার্ট করে লুকিং গ্লাসের মাধ্যমে ভাবুক সানামের দিকে তাকালো। সানামকে আরও একটু তাতিয়ে দেয়ার চেষ্টা করল। নাক ঘঁষে মিচকে হেসে বলল,

“আরে এতো ভাববার কি আছে? আমাদের বাসর আপনার পছন্দের বেলিফুল দিয়েই সাজানো হবে। সো চিল!”

সানাম ভড়কে ওঠে ফায়েযের দিকে তাকালো। চোখ রাঙিয়ে বলল,

“হোয়াট?”

“আরে এতো অবাক হওয়ার কি আছে? আমি আপনার আর আমার বাসরের কথা বলছিনা। আপনার পছন্দের বেলিফুল দিয়ে আমি আমাদের বাসর সাজাব। আমাদের বলতে আই মিন আমি আর আমার সিনিয়র আপুর কথা বলছি!”

“সিনিয়র আপু?”

“হ্যাঁ মায়া আপু! আপনি তো আমাকে পাত্তাই দিচ্ছেননা। তাই এখন সিনিয়র আপুই আমার শেষ ভরসা!”

#চলবে_____?