আঁধারে প্রণয়কাব্য পর্ব-০৩

0
124

#আঁধারে_প্রণয়কাব্য
#পর্ব_____৩
#নিশাত_জাহান_নিশি

“উপর ওয়ালা যা করেন ভালোর জন্যই করেন। ছবিতে এক পলক মেয়েটিকে দেখেই আমার ছেলের জীবনটা এভাবে এলোমেলো হয়ে গেল। না জানি মেয়েটা আমার ছেলের জীবনে থাকলে আর কি কি হয়ে যেতো! আমার ছেলেটা নিশ্চয়ই এতদিনে কবরে থাকত!”

ফায়েযের মধ্যে বড্ড প্রতিশোধ স্পৃহা কাজ করছে। প্রতিশোধের নেশায় মত্ত হয়ে তার ভালোবাসায় কোথাও না কোথাও তাল কেটে যাচ্ছে! সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই তার। সুইমিংপুলের কিনারায় বসে সে সিগারেটের নেশায় বুদ। মাঝে মাঝে শুকনো কাশিও কেশে ওঠছে। নাকমুখ থেকে ক্ষতিকর সিগারেটের ধোঁয়া নির্গত করে সে বলল,

“ফায়েয ফারনাজ চৌধুরী বড্ড স্বার্থপর মানুষ। তাকে যে ভালোবাসবে সেও তাকে কড়ায় গন্ডায় ষোলো আনা ভালোবাসা ফিরিয়ে দিবে। প্রয়োজন হলে তার জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত থাকবে। কিন্তু কিন্তু কিন্তু…. যাকে ফায়েয ফারনাজ চৌধুরী একবার ভালোবাসবে সেই ভালোবাসার মানুষটি যদি তাকে বিন্দু পরিমাণ অবহেলাও করে তবে ফায়েয ফারনাজ চৌধুরী ভুলে যাবে যে সে ঐ মানুষটিকে ভালোবেসেছিল! সানাম আপনার অবহেলা আমাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কাঁচের মত গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিয়েছে। ট্রাস্ট মি আমি বিগত দুই বছর ধরে চেষ্টা করেও আপনার দেওয়া ধোঁকা ভুলতে পারিনি। কি করব বলুন আমার স্বভাবটাই যে এমন! অপমান ভুলতে পারিনা সহজে। গাঁয়ে সয়না।”

ইতোমধ্যেই ফায়েযের ছোটোবেলাকার বন্ধু প্রত্যয় এক প্রকার ছুটে এলো ফায়েযের কাছে। ফায়েযের পাশে বসে হাঁপিয়ে ওঠা গলায় বলল,

“এরশাদ। পুরো নাম এরশাদ শিকদার। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর কাল সকাল ঠিক দশটার ফ্লাইটে জর্ডান থেকে বাংলাদেশ ফিরছেন তিনি। সাথে তার মেয়ে অনামিকাও থাকবে! আই থিংক এটাই হবে আমাদের জন্য মুখ্যম সুযোগ তাদের আটকানোর জন্য।”

“প্রত্যয় প্রত্যয় প্রত্যয় প্লিজ কাম ডাউন। ইউ নো হোয়াট? সময় নিয়ে খেলতে আমি পছন্দ করি! টোপ গেলার পর ছিপ দিয়ে মাছ ধরার যে আনন্দ সে আনন্দ বাজার থেকে রেডিমেইড তাজা মাছ কেনাতেও নেই। টোপ যদিও অলরেডি গেলানো হয়ে গেছে!”

“টোপ বলতে? তুই কি মিন করতে চাইছিস?”

“আমাদের টার্গেট অনামিকা। কান টানলে মাথা এমনিতেই আসবে। এর জন্য আমাদের দেখতে শুনতে ভালো, টল, হ্যান্ডসাম, একদম রিচ কিড টাইপের ছেলে লাগবে। আই থিংক এই চরিত্রে তোকে ভালো মানাবে!”

মাথা ঘুরিয়ে ফায়েয ভ্রু উঁচিয়ে প্রত্যয়ের দিকে তাকালো। শুকনো ঢোঁক গিলল প্রত্যয়। হাত জোর করে বলল,

“ছেড়ে দে বাপ। দেখতে শুনতে ভালো হলেও আমার বাপের টাকা পয়সা নেই! সম্পত্তি বলতে বাপের ঐ এক বিঘা জমিই আছে। ঐ মেয়ের চক্করে পরে আমি আমার জীবন ও ঐ জমি খোঁয়াতে পারবনা। বাপ বাড়িতে জায়গা দিবেনা! সত্যি বলছি।”

“জাস্ট ফরগেট ইট। আমি তোকে বাজিয়ে দেখছিলাম। বাই দ্য ওয়ে, এই চরিত্রে আমাকে কেমন মানাবে সেটা বল?”

হতবাক দৃষ্টি প্রত্যয়ের। মুখে হাত দিয়ে আচমকিত গলায় শুধালো,

“তুই? তুই এই রোল প্লে করবি?”

“কেন? সমস্যা কি? নিজের স্বার্থের জন্য এতটুকু করতেই পারি। যদিও সাচ্চাওয়ালা পেয়ার আমার একবারই হয়েছিল! একদম দেবদাস টাইপ পেয়ার! সেকেন্ডটা হলো টেম্পোরারি। দেখি না জল কতটুকু গড়ায়।”

হাত তালি দিয়ে প্রত্যয় বলল,

“দেট’স গ্রেট। তুই এই রোল প্লে করলে প্ল্যান আনসাকসেসফুল হওয়ার কোনো চান্সই নেই। এই প্ল্যানে আমার যতটুকু হেল্প প্রয়োজন আমি করব।”

“বহু বছর ক্লিন শেইভ করিনা। ভাবছি আজ করব। বাট একটা ছোটো কনফিউশন।”

“কি কনফিউশন?”

“শেইভ করলে তো কচি কচি লাগবে। মেয়েরা কি কচি টাইপ ছেলে পছন্দ করে নাকি বড়ো দাঁড়ি গোঁফওয়ালা নেশাখোর টাইপের ছেলে? সেই বিষয়ে আমি কনফিউজড!”

“এটা আবার জিজ্ঞেস করার ব্যাপার হলো? চোখ বন্ধ করে মেয়েরা নেশাখোর টাইপের ছেলেদেরই পছন্দ করে! আমিই তার জ্বলন্ত প্রমাণ ভাই। আমার এক্স আমার মত কচি ছেলেকে রেখে দাঁড়ি গোঁফওয়ালা নেশাখোর ছেলের সাথে দিব্যি প্রেম করছে! আমাকে দিয়ে গেল ছ্যাঁকা, এখনও বুকের মাঝে বইছে তাকে হারানোর ব্যাথা।”

প্রত্যয়ের কাঁধে হাত রেখে ফায়েয বড়ো করে হেসে বলল,

“ডোন্ট বি স্যাড ইয়ার। আমাদের মত লয়্যাল ছেলেদের জন্মই হয়েছে মেয়েদের ছ্যাঁকা খাওয়ার জন্য। যদিও এখন নেশাখোর ও আমার মধ্যে কোনো পার্থক্যই নেই! তাহলে এই লুকেই আমি পার্ফেক্ট আছি শেইভ করার প্রয়োজন নেই!”

_______________________

এয়ারপোর্টের গেইটে বেশ অস্থিরতা নিয়ে দাঁড়িয়ে সানাম। হাসিমুখে কারো অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছে সে। পুরোনো ক্ষত যেন তাজা হচ্ছে! আজ তার কাছের দুজন মানুষ আসবে যাদের মাঝে সে তার অতীত দেখতে পায়। ইতোমধ্যেই সেই কাঙ্ক্ষিত মুখটিকে দেখে উত্তেজনায় লাফিয়ে ওঠতেই সেই পরিচিত মানুষটি ছুটে এসে সানামকে জড়িয়ে ধরে বলল,

“কেমন আছিস সানাম?”
“ভালো আছি অনামিকা। তুই কেমন আছিস?”
“ভীষণ ভালো। কত বছর পর আমাদের দেখা হলো বল?”

দুজন দুজনকে ছেড়ে দাঁড়ালো। সানাম শুকনো হেসে বলল,

“প্রায় পাঁচ বছর পর। বাই দ্য ওয়ে চাচা কোথায়?”
“এইতো আমি।”

হাসিমুখে এরশাদ শিকদার সানামের দিকে এগিয়ে এলেন। সানাম মিষ্টি হেসে বলল,

“কেমন আছেন চাচা?”
“ভালো আছি মা। তুমি কেমন আছো?”
“এইতো চাচা কোনো রকম চলে যাচ্ছে।”
“এ কি অবস্থা করেছ নিজের? এভাবে চলতে থাকলে তো একদিন তুমি…
“থাক না চাচা। এসব কথা এখন থাক।”

সানাম দম ফেলে পুনরায় বলল,

“আসুন চাচা এয়ারপোর্টের বাইরে গাড়ি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”

এরশাদ শিকদার এগিয়ে গেলেন। ইতোমধ্যেই তার ফোন কল বেজে ওঠল। কলটি তুলে তিনি আশেপাশে তাকিয়ে বেশ চাপা গলায় বললেন,

“হ্যাঁ আমি দেশে ফিরেছি। কাগজপত্র আজকের মধ্যেই রেডি করো। আর এক মুহূর্তও দেরি করা যাবেনা। ঐ ছেলের সন্ধান আমি আজ থেকে শুরু করলাম। তোমরা তোমাদের কাজে ফোকাস করো।”

সানাম ও অনামিকা পেছনে। সেই কখন থেকে অনামিকার চোখেমুখে প্রবল অস্থিরতার ছাপ। কাউকে ভীষণ আগ্রহ ও উদগ্রীবতা নিয়ে খুঁজছে সে। সানাম তা আন্দাজ করে অনামিকার কাঁধে ধাক্কা মেরে বলল,

“কি রে? কাউকে খুঁজছিস নাকি?”
“খুঁজছি। বাট পাচ্ছি কই?”
“ওহ্ রিয়েলি? নিশ্চয়ই তোর কোনো বয়ফ্রেন্ড হবে?”

অনামিকা লাজুক হেসে বলল,

“বাঙালি মেট্রোমনিতে একটা ছেলের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে! ট্রাস্ট মি তার মত হ্যান্ডসাম ছেলে আমি পৃথিবীতে দুটো দেখিনি। তারউপর রিচ কিড! আমি জাস্ট তার ওপর ফিদা হয়ে গেছি দোস্ত।”

সানাম কয়েক দফা চোখের পলক ফেলে কেবল অনামিকার দিকেই এক ধ্যানে তাকিয়ে রইল। লাইফে কম ছেলেকে অনামিকা তার পেছনে ঘুরায়নি! অতীত জীবনে তার লাইফে অনেক এক্স থাকলেও এভাবে কোনো এক্সের প্রশংসা করেনি সে। তবে আজ প্রশংসা করেছে মানে ছেলেটা সত্যিই সুদর্শন হবে।

ইতোমধ্যেই তারা এয়ারপোর্টের বাইরে চলে এলো। এরশাদ শিকদার ফোনে কথা বলতে বলতে তার গাড়িতে ওঠে গেলেন। সানাম ও অনামিকা যেইনা গাড়িতে ওঠতে যাবে অমনি পেছন থেকে একটি পুরুষালী ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

“হেই অনামিকা?”

চোখ বড়ো করে গেল অনামিকান। বুকে হাত দিয়ে সে খুশির হাসি হেসে ওঠল। পেছনে তাকাতেই বলল,

“আপনি?”

চোখ থেকে কালো চশমাটি খুলল ফায়েয। সাদা ও কালোর সংমিশ্রণে প্রিন্ট করা একটি ঢোলাঢালা নরমাল শার্ট পরনে তার। শার্টের কলারটি ঠিক করে ফায়েয বলল,

“ইয়াহ্ আমি। আমার গাড়িতে ওঠুন।”

অনামিকার পাশে উল্টো পাশ ফিরে দাঁড়িয়ে থাকা সানামের এবার টনক নড়ল। এই কণ্ঠস্বর তো তার চেনা। এবার নিশ্চয়ই তার ভুল হবেনা। এই লোকটা নিশ্চয়ই ফায়েয ফারনাজ চৌধুরী! সানাম ফট করে পিছু ফিরল। ততক্ষণে ফায়েয অনামিকাকে নিয়ে গাড়িতে ওঠে যাচ্ছিল প্রায়। অনামিকা ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটটিতে বসে গেলেও সানাম এক প্রকার ছুটে গিয়ে মাত্রই ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলতে যাওয়া ফায়েযকে পেছন থেকে ডেকে বলল,

“হেই ওয়েট ওয়েট। আপনিই তো ফায়েয ফারনাজ চৌধুরী?”

ফায়েয পেছনে ফিরল। চশমাটা চোখের নিচে নামিয়ে ভাবশূণ্য গলায় বলল,

“হেই হু আর ইউ? এন্ড হু ইজ ফায়েয ফারনাজ চৌধুরী?”

মাথায় চক্কর লেগে গেল সানামের! এই লোকটাই তো মনে হয় কালকের সেই অসভ্য লোকটি। আজ শেইভ করা তবে কাল মুখে দাঁড়ি গোঁফ ছিল! কিন্তু তার ধারণা তো ভুলও হতে পারে। তবুও সন্দেহ দূর করার জন্য সানাম গলা ঝাঁকিয়ে সানাম আমতা আমতা করে শুধালো,

“আপনি কালকের সেই অসভ্য লোকটি নন তো?”
“ওয়েট ওয়েট ওয়েট। অসভ্য লোক মানে? কে অসভ্য লোক? কাকে কি বলছেন আপনি?”

সানাম নখ কামড়ে কনফিউজড হয়ে বলল,

“আপনি আজ শেইভ করেছেন কেন?”
“হোয়াট? আমি কবে শেইভ ছাড়া ছিলাম?”
“কালই তো ছিলেন।”
“আগে জানতাম বাস স্ট্যান্ডে কিংবা রেল স্টেশনের আশেপাশে পাগল মেয়ে ছেলেরা ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু এখন দেখি এয়ারপোর্টের মত জায়গাতেও পাগলী মেয়েরা আপনার মতো দিন দুপুরে ঘুরে বেড়ায়। ডিজগাস্টিং!”

সানামের মুখের অবস্থা কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল। মুখটা জাস্ট দেখার মত ছিল। ফায়েয খুব মজা পেল। ওয়ালেট থেকে ফায়েয পাঁচশত টাকার একটি নোট বের করে সানামের মুখের কাছে ধরে বলল,

“টাকা নেয়াটাই তো মূল উদ্দেশ্য ছিল। এই নিন টাকা। এবার রাস্তা মাপুন। দেশ উন্নত হচ্ছে বলে আপনাদের ভিক্ষা করার টেকনিকও যে উন্নত হচ্ছে তা আজ আপনাকে না দেখলে বুঝতাম না!”

সানাম রীতিমত অপমান বোধ করল৷ ফায়েয গাড়িতে ওঠে গেল৷ ফোন থেকে চোখ সরিয়ে অনামিকা ফায়েযকে বলল,

“এত লেইট হলো কেন?”
“আর বলোনা বাইরে একটা পাগলী মেয়ের পাল্লায় পরেছিলাম!”
“পাগলী মেয়ে? কোথায় সে?”
“বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে দেখো।”

অনামিকা বাইরে তাকাতেই সানামকে দেখতে পেল। সানামকে ইশারা দিয়ে অনামিকা বলল,

“এই সানাম ভেতরে আয়।”

ফায়েয না বুঝার ভান ধরে বলল,

“সানাম? ঐ পাগলী মেয়েটার নাম সানাম?”

“উফ সে পাগলী হতে যাবে কেন? ও আমার বেস্টফ্রেন্ড সানাম।”

ফায়েযের ভুল ভাঙানোর জন্য সানাম গাড়িতে ওঠতে বাধ্য হলো। এরশাদ শিকদার গাড়ি নিয়ে একা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলেন। ফায়েয গাড়ি ছেড়ে দিতেই সানাম রাগে বোম হয়ে ফায়েযের পাঁচশত টাকার নোটটি ফায়েযের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল,

“এই নিন আপনার টাকা। আমি রোড সাইডের কোনো গাগলী নই যে টাকার জন্য অভিনয় করব। আর সরি ছোটো একটা কনফিউশনের জন্য আপনাকে অযথা বিভ্রান্ত করার জন্য।”

ফায়েয লুকিং গ্লাসে সানামের রাগী ও অসহায় মুখটা দেখে বাঁকা হেসে বলল,

“ইট’স ওকে। বাট আমি সরি বলবনা। কজ, আপনার কনফিউশনের কারণে অযথা আমাকে হ্যারেসমেন্ট হতে হয়েছে!”

ফায়েযের বিপরীতে সানাম কোনো কথা বলতে পারলনা। কথা বাড়াতেই ইচ্ছে হলোনা তার। এসবের কোনো দিকেই ধ্যান নেই অনামিকার। সে কেবল ব্যাস্ত মুগ্ধিত দৃষ্টিতে ফায়েযকে দেখতে! আনমনে বিড়বিড় করে অনামিকা বলল,

“লাইফে ফার্স্ট টাইম কোনো ছেলের প্রতি আমি এতটা ইমপ্রেস হলাম। অতীতে অনেক ছেলেকে ধোঁকা দিলেও এই মানুষটিকে ভালোবেসে তার থেকে ধোঁকা খেতেও আমি রাজি! তাকে পেয়ে গেলে আমার অহংকারের কমতি থাকবেনা। সিনেমার হিরোদের মতো রিয়েল লাইফেও তার মতো কাউকে পাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার।”

মাথাব্যাথাটা চট করে নাড়া দিয়ে ওঠল সানামের। ইদানিং প্রয়োজনের অধিক ভাবনাচিন্তা হয়ে ওঠেনা তার দ্বারা। আগামীকাল থেকে যাচ্ছে তা হয়ে যাচ্ছে তার সাথে। এত ধাক্কা একা সামলাতে পারছেনা সে। গাড়ির ব্যাক সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে সানাম চোখ জোড়া বুজল। কপাল ঘঁষতে ঘঁষতে বলল,

“এই প্রথম আমার কোনো উপস্থিত বুদ্ধি কাজ করছেনা। মনে হচ্ছে আমি কোনো অলোকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছি। একই কণ্ঠস্বর কিন্তু মানুষ তিনজন! কোনো ভাবে আমার ধারণা ভুল নয় তো? একজন মানুষই আমাকে তিনভাবে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে বিষয়টা এমন নয় তো? প্রথম দুজন মানুষের সাথে তো অন্ধকারেই দেখা হয়েছিল। তাই চেহারা সঠিক মনে করতে পারছিনা। আর আজ যার সাথে দেখা হলো তার সাথে তো গতকালের ঐ অসভ্য লোকটির খুব মিল পেয়েছিলাম। কিন্তু আজ এই লোকটা তার কথার দ্বারা আমাকে কনফিউজড করে দিচ্ছে। তবে ফায়েয ফারনাজ চৌধুরী আমাকে বেশ ভালোভাবেই চিনে তা আমার বুঝা হয়ে গেছে। যদি তিনি আমাকে না-ই চিনতেন তবে সেদিন আমার নাম ধরে আমাকে ডাকতেন না! তাছাড়া অন্ধকারে আমার মুখ চেপে ধরা লোকটি কে? কেউ কোনোভাবে আমাকে মে*রে ফেলার চেষ্টা করছেনা তো?”

অনামিকা মুচকি হাসল। বেশ ভেবেচিন্তে ধীরে ধীরে ফায়েযের হাতে হাত রাখল! ফায়েয আচমকা তার হাতটি সরিয়ে দিয়ে বলে ওঠল,

“প্লিজ ডোন্ট ডু দিস। ড্রাইভিংয়ের সময় এসব নয়!”

অনামিকা আঁতকে ওঠে বলল,

“ওহ্ গড। আপনার চিৎকারে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।”

ফায়েয দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল,

“উফ এই ন্যাকা মেয়ের ন্যাকামি আর সহ্য হচ্ছেনা। আর ঐদিকে আমার ন্যাকা এখন ঘুমুচ্ছে! সারারাত জেগে জেগে নিশ্চয়ই আমাকে নিয়ে ভেবেছে। বিষয়টা ভাবতেও কেমন ভালো লাগছে! আমার কথা ভেবে ভেবে ম্যাডামের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছে! যদিও আমি এটাই চেয়েছিলাম।”

_________________________

হাতে থাকা কাঁচের ছবির ফ্রেমটি ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিলো ফায়েয! বড্ড জ্বলন হচ্ছে তার, ভেতরে ভেতরে বড্ড হিংসেও হচ্ছে। দু’চোখের লেলিহান শিখায় তলিয়ে যাচ্ছে ছবির সেই ছেলেটি। হিংস্রাত্নক গলায় ফায়েয বলল,

“আমার সানামের ওপর আপনার কোনো হক নেই মিস্টার স্পর্শ! সানামের জন্মই হয়েছে আমার জন্য। পুরো পৃথিবী লন্ডভন্ড করে হলেও আমি সানামকে চাই। আপনার কোনো অধিকার নেই আমার ভালোবাসায় ভাগ বসানোর!”

ঐ মুহূর্তে সানামের আগমন ঘটল। সানাম এই দৃশ্য দেখে বেশ ক্ষেপে গেল। ফায়েযের জন্য আনা কোল্ড ড্রিংকসটি টেবিলের ওপর রেখে সে ছুটে এসে ফায়েযকে প্রশ্নবিদ্ধ করল,

“আপনি এই রুমে কি করছেন? তাছাড়া আপনি এই ছবির ফ্রেমটা এভাবে ভাঙলেন কেন?”
“অতীত কি ভুলতে পারবেন না আপনি?”
“অতীত মানে?”

স্পর্শের প্রিন্ট করা ছবিটি সানাম মেঝে থেকে তুলে নিলো। ছবিটা বুকের সাথে মিশিয়ে অঝরে কেঁদে দিলো। ফায়েযের এসব সহ্য হচ্ছিলনা। নিজের রাগকে শান্ত করার চেষ্টা করে ফায়েয বলল,

“ফ্রেমটা আমি ইচ্ছে করে ভাঙিনি। হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেছে।”
“এই ছবির ফ্রেমটা আমার জন্য কতটা দামী আপনি জানেন? কেন ধরতে গেলেন আপনি এই ফ্রেমটি?”
“কতটা দামী? আপনার জীবনের চেয়েও বেশি দামী?”

সানাম নিশ্চল দৃষ্টিতে ফায়েযের দিকে তাকাতেই ফায়েয রক্তচক্ষু নিয়ে বলল,

“ফর দ্য গড সেইক নিজের জীবন নিয়ে এভাবে খেলবেন না। পাগলও কিন্তু নিজের ভালোটা বুঝে। আমি কিন্তু পাগলকেও ছাড় দিইনা।”

ফায়েয প্রস্থান নিলো। পেছন থেকে অনামিকা ফায়েযকে হাজার ডেকেও থামাতে পারলনা। গাড়িতে ওঠে ফায়েয গাড়ি ছেড়ে মৃদু আর্তনাদ করে বলল,

“আমি আমার ভালোবাসায় কাউকে ভাগ বসাতে দিবনা সানাম। আপনি শুধু আমার আর আমার হয়েই থাকবেন। সারাক্ষণ পড়াশোনা, ফ্যামিলি, ক্যারিয়ার ও ঘোর প্রেম বিরোধী ছেলেটা একদিন হুট করেই আপনার ছবি দেখে আপনার প্রেমে পরেছিল। সুদূর আমেরিকা থেকে ছুটে এসেছিল। বিয়ে করবে না করবেনা বলেও আপনার মায়াবী মুখের মায়ায় পড়ে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল। বিভিন্নভাবে আপনার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু আপনি করেন নি! বিয়ের দিন ছেলেটি হঠাৎ জানতে পারল তার হবু বউ পালিয়েছে! এই পরিস্থিতিতে না পরলে কখনও জানতেই পারতাম না পুরুষ মানুষরাও অসহায় হয়। পৃথিবীতে লয়্যাল মানুষরা কতটা নির্মমভাবে ঠকে যায়!”

#চলবে____?