আঁধারে প্রণয়কাব্য পর্ব-০১

0
160

#আঁধারে_প্রণয়কাব্য
#পর্ব____১
#নিশাত_জাহান_নিশি

“তোর এই চোখ ধাঁধানো রূপ দেখে আমার মধ্যে পুরুষত্ব ভাব জেগে ওঠলে আমি কি করব? আজ রাতে তুই-ই হবি আমার শিকার! সরি মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড।”

আশ্চর্য হয়ে গেল “সানাম।”অথচ একটু আগে এই অপরিচিত ছেলেটিই তাকে রাস্তায় যাবতীয বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করছিল! পাশাপাশি একই বাসে দুজন ট্রাভেল করেছিল। আবারও প্রমাণিত হয়ে গেল অন্ধকারে নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস করতে নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘেরা নির্জন রাস্তায় একা অসহায় “সানামের” বুকের ওপর থেকে শাড়ির আঁচল কেড়ে নেওয়া সেই বখাটে ছেলেটির ভয়াবহ থাবার শিকার হয়েও সানাম গলা উঁচু করে বলল,

“আমি ম’রে যাব তবুও কোনো লম্পট পুরুষের সজ্জাসঙ্গিনী হওয়া তো দূর তার স্পর্শও আমার গাঁয়ে লাগতে দিবনা। অন্ধকারে একটা মেয়ের সুযোগ নেওয়া কখনও পুরুষত্ব হতে পারেনা। তোকে বন্ধু ভেবে আমি ভুল করেছিলাম সরে যা সামনে থেকে।

“আমার সজ্জাসঙ্গিনী হতে গেলেও হায়েস্ট যোগ্যতা লাগে মিস সারাহ্ সানাম! সরি টু সে আপনার সেই যোগ্যতা নেই। বখাটে ছেলেরা আপনার পিছু নিতেই পারে তবে এই ফায়েয ফারনাজ চৌধুরী নয়! তাঁর একটা ক্লাস আছে। সেই ক্লাস মেন্টেইন করে চলতে সে পছন্দ করে! সো ডোন্ট আন্ডারেস্টেড মি।”

ছু’রি চালানোর কাজ শেষ করে শার্টের কলার ঝেড়ে হনহনিয়ে প্রস্থান নিলো সানামকে বাঁচাতে ঝড়ের ন্যায় ছুটে আসা অন্য অচেনা যুবকটি! ঘোর তমসায় চারিপাশ অস্পষ্ট। বাকরুদ্ধ সানাম। কাকে কি বলল সে? হাঁসফাঁস করা ঘিঞ্জি পরিবেশে ঘর্মাক্ত শরীর ও চোখ ভরা আতঙ্ক নিয়ে দাঁড়িয়ে সানাম। তার সম্মুখে বখাটে ছেলেটির হাত কেটে ফিনকি বেয়ে চিরচিরিয়ে রক্ত গড়িয়ে পরছে! ছেলেটি তার হাত কাটার যন্ত্রণায় আক্রমনাত্নক গলায় সানামকে হুমকি দিয়ে বলল,

“তোর জন্য আজ আমার হাত কাটা গেল। তবে তোর পিছু আমি ছাড়ছিনা এই জন্মে! তোর ঐ উন্মাদ আশিককে বলে দিস সময় হলে আমিও তাকে দেখে নিব।”

হাত ঝারতে ঝারতে বখাটে ছেলেটি দৌঁড়ে জায়গা থেকে পালালো। ভীত সানাম শুকনো ঢোঁক গিলতেই সানামের দিকে উর্ধ্বগতিতে বাইক নিয়ে ধেয়ে এলো সানামের বেস্টফ্রেন্ড আফিম। ফোনের ফ্ল্যাশলাইট অন করে সানামের মুখোমুখি বাইক থামিয়ে অস্থির গলায় আফিম বলল,

“তুই ঠিক আছিস তো সানাম?

সানাম ভড়কালো। আশ্চর্যঘন গলায় শুধালো,

“তুই কিভাবে জানলি আমি এখানে আছি?”

“একটি অচেনা নাম্বার থেকে টেক্সট এসেছিল। ওখান থেকেই জানতে পারলাম তুই বিপদে পরেছিস। তাই আমি কিছু না ভেবেই এখানে ছুটে এলাম তোকে উদ্ধার করতে।

“নাম্বারটিতে আর দ্বিতীয়বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করিসনি?

“করেছিলাম। বাট নাম্বারটি সুইচ অফ আসছিল। প্রথমে ফ্রাঙ্ক কল ভেবে উড়িয়ে দিয়েছিলাম তবে পরে মনে হলো ঘটনাটা যদি সত্যি হয়?”

“আচ্ছা এখন চল আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

প্রসঙ্গ না বাড়িয়ে সানাম বাইকে ওঠে গেল। আফিম বাইক ছেড়ে দিলো। সানাম গভীর চিন্তায় ডুব দিলো। “ফায়েয ফারনাজ চৌধুরী” ছেলেটি কে? তার সম্মান ও জীবন বাঁচানো ছেলেটিকে সে না দেখে না বুঝেই বখাটে ছেলে হিসেবে উপাধি দিয়ে বসল? কটু কয়েকটা কথাও শুনিয়ে দিলো? সানাম ধারণা করল বখাটে ছেলেটি যখনই তার বুকের কাপড় সরাতে গিয়েছিল তখনই আমচকা ফায়েয ফারনাজ চৌধুরী এসে তাকে বাঁচিয়েছিল বলেই অন্ধকারে লোকটির হঠাৎ আগমন সে টের পায়নি। কপাল ঘঁষে সানাম চিন্তিত গলায় বিড়বিড় করে বলল,

“ধ্যাত, অন্ধকারে তো ছেলেটির মুখটাও দেখতে পারিনি। তবে কণ্ঠস্বর ও কথার ভাবভঙ্গি অনুমান করে মনে হয়েছে ছেলেটি খুবই দাম্ভিক, অহংকারী, উগ্র ও গম্ভীর প্রকৃতির। তাকে একবার থ্যাংকস জানানোর উচিত ছিল। তাছাড়া আফিমের নাম্বারে অচেনা নাম্বার থেকে টেক্সট দেওয়া ছেলেটি কে? আমাকে যে বাঁচিয়েছিল সেই ছেলেটি নয় তো?”

পর পর সবগুলো ঘটনা যেন সানামের মাথায় তালপোক পাকিয়ে দিলো। নীরবতা ভেঙে আফিম ভাবুক সানামের দিকে প্রশ্ন ছুড়ল,

“সত্যিই কি তোর ওপরে অ্যাটাক করা হয়েছিল সানাম? আমিতো এসে কিছুই দেখলাম না।”

“হ্যাঁ হয়েছিল। তবে ফায়েয ফারনাজ চৌধুরী নামে একটি ছেলে আমাকে বাঁচিয়েছিল। আমি জানিনা ছেলেটি কে। অন্ধকারে তার চেহারা স্পষ্ট ছিলনা। আচ্ছা একটা কাজ কর তো, তোর ফোনে যে নাম্বার থেকে টেক্সট এসেছিল সেই নাম্বারটি আমাকে দে তো।”

আফিম সেই নাম্বারটি সানামকে দিলো। সানাম অনেকবার নাম্বারটিতে কল করেও ব্যর্থ হলো। পরবর্তীতে সানাম বিরক্ত হয়ে কল করা বন্ধ করে দিলো।

_____________________

হাইওয়ে রাস্তার পাশ ঘেঁষে গাড়ির ডিক্কির ওপর বসে এক আগাগোড়া সুদর্শনীয় যুবক তার চিরাচরিত বাঁকা হাসির সাথে ঠোঁটের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেটটি অতি সযত্নে রেখে হাতে থাকা সিমটিকে দুমড়ে মুচড়ে ভাঙছে! চোখেমুখে তার বিস্তর হাসির রেখা লেগে থাকলেও সেই হাসিতে হিংস্রতা ফুটে রয়েছে অতি সাবলীলভাবে। আচমকা গাড়ি থেকে নেমে যুবকটি জাত সিগারেট খোরদের ন্যায় এক টানে সম্পূর্ণ সিগারেটটি শেষ করে নাক মুখ থেকে ধোঁয়া উড়িয়ে বলল,

“আপনার কাউন্ট ডাউন শুরু হয়ে গেছে মিস সারাহ্ সানাম! আজকের পর থেকে একটা রাতও আপনি শান্তিতে ঘুমোতে পারবেন না। আপনার জীবনে এখন মহা বিপদ সংকেত চলছে। মিথেন গ্যাসের ন্যায় আমি ধীরে ধীরে আপনার জীবনটাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে তুলব। যা আপনি দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি!”

কাঁধে কালো রঙের ব্লেজারটি ঝুলিয়ে ফায়েয গাড়িতে ওঠে মনের সুখে গাড়িটি স্টার্ট করে দিলো। ঘামে জবজবিয়ে কপালে পরে থাকা এলোমেলো চুলগুলো সে লুকিং গ্লাস দেখে সেট করে নিলো। মুখ থেকে সিগারেটের দুর্গন্ধ দূর করার জন্য মুখে স্প্রে করল। লুকিং গ্লাস দেখে নিজেকে আগাগোড়া ফিটফাট করে ফায়েয বলল,

“বাই দ্যা ওয়ে, এতটা ফিটফাট হওয়ারও দরকার নেই আমার। ফায়েয ফারনাজ চৌধুরীকে নরমাল লুকে দেখেও তো কত নারীর রাতের ঘুম ওড়ে যায়! আর এই লুকে দেখলে তো পৃথিবীর কোনো নারীই তাকে উপেক্ষা করতে পারবেনা। কিন্তু কিন্তু কিন্তু ঐ একজনই…!

আবারও চোখেমুখে বিস্তর রাগ ফুটে ওঠল ফায়েযের! তীব্র ক্ষোভ নিয়ে সে রওনা হলো তার বেস্টফ্রেন্ড ওয়াকিফের গার্লফ্রেন্ডের বার্থডে পার্টিতে!

______________________

“টেন টেনান। এই নে তোর পছন্দের আলুর চপ ও মাটন বিরিয়ানি।”

বেস্টফ্রেন্ডের বার্থডে পার্টিতে এসে একা একা বিরক্ত হচ্ছিল সানাম। ক্লাবের এক জায়গায় ঘাপটি মেরে বসে রয়েছিল সে। সেই সাথে একটু আগের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো চিন্তা করছিল। তার কাছের দূরের সব বন্ধু-বান্ধবীরা মিলে আড্ডা, হাসাহাসি ও নাচানাচিতে ব্যাস্ত। ইতোমধ্যেই তার বেস্টফ্রেন্ড তন্নির হাত থেকে টিফিন বক্সটি নিয়ে সানাম এক গাল হেসে বলল,

“মায়ের হাতের বানানো তো?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ। আন্টির হাতেরই বানানো। তোর বোন সিফরা পাঠালো।”
“সিফরা কেমন আছে?”
“আমার থেকে কেন জানতে হবে? তুই ফোন করে জানতে পারিসনা?”

মুখের হাসি ওড়ে গেল সানামের। তন্নির দিকে তাকিয়ে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“নতুন করে এসব প্রশ্ন কেন করিস আমাকে? জানিস না আমি বিরক্ত হই?”

“করি কারণ, আমি এবং আমরা চাই তুই বাড়ি ফিরে যা। নিজের পরিবারের কাছে ফিরে যা। নতুন করে সব শুরু কর সানাম। কেন অতীত নিয়ে এখনও পরে আছিস? এভাবে একাকীত্বে নিজের জীবনটাকে ধ্বংস করে দেয়ার কোনো মানে হয়?”

“একাকীত্ব কোথায় তন্নি? আর সেই কখন থেকে তুই কি অতীত অতীত করছিস? কিচ্ছু “গত” হয়নি আমার জীবনে। সব আগের মতই জীবিত, সুন্দর ও পরিপাটি রয়েছে। আমি অনুভব করতে পারি এসব। কিছু নষ্ট হয়ে যায়নি আমার জীবনের।”

“তুই সাইকো হয়ে গেছিস বুঝেছিস? তোকে কিছু বুঝাতে আসাটাই আমার ভুল! একজন মৃত ব্যক্তি কখনও জীবিত হতে পারেনা সানাম! কেন এই নরমাল বিষয়টা তুই বুঝতে চাইছিস না?”

“তুই কি আমাকে হার্ট করার জন্য তোর বার্থডে পার্টিতে ইনভাইট করে এনেছিস তন্নি? জানলে আমি কখনও এখানে আসতাম না!”

রেগেমেগে সানাম ক্লাব থেকে বের হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার পথেই চারিপাশ অন্ধকার হয়ে এলো। বুঝাই গেল লোডশেডিং হয়েছে। ইতোমধ্যেই সানাম অনুভব করল কেউ তার সমস্ত শরীরকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে রেখেছে! বিরিয়ানির বক্সটিও তার হাত থেকে পরে গেছে। ভয়ঙ্কর, ভারী ও কুৎসিত গলায় কানে বিড়বিড় করে লোকটি বলছে,

“সানাম সানাম সানাম। মেরা পেয়ারি সানাম। কোথায় যাচ্ছেন আপনি? এতই সহজ নাকি চলে যাওয়া? আপনার জীবনটাকে নরকে পরিণত করার জন্য আমি আবারও ফিরে এসেছি। যদিও অতীত, বর্তমান সবকিছুর হিসেবই আমি নিব। এমনকি আপনার ভবিষ্যতও আমিই ডিসাইড করব! অতীতে আপনি আমার সাথে যে অন্যায় করেছেন সেই অন্যায়ের শোধ না নেওয়া অবধি আমি শান্তি হবনা! জাস্ট মাইন্ড ইট।”

সানাম কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই লোকটি তাকে ছেড়ে কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল৷ মনে হলো হাওয়ায় মিশে গেল। ইতোমধ্যে কারেন্টও চলে এলো! সানাম ভয়ে ও আতঙ্কে অজ্ঞান হয়ে পরে যাওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তেই তন্নি ও আফিম ছুটে এসে সানামকে ধরাধরি করে একটি রুমে নিয়ে গেল!

________________________

সিফরার বিয়ে ঠিক হয়েছে। আগামী মাসেই তার বিয়ে! রুমের বেলকনিতে দাড়িয়ে সিফরা আনমনে গম্ভীর আকাশে বেশ দাপটে লেপ্টে থাকা ঐ অর্ধ চন্দ্র দেখছে। সেই অর্ধ চন্দ্রের পাশেই মিটমিটিয়ে জ্বলছে একটি সূক্ষ্ম ও অতি ক্ষুদ্রাকৃতির তাঁরা। মানুষ মরে গেলে নাকি তাঁরা হয়ে যায়? সিফরার আগে এসব বিশ্বাস না হলেও এখন বেশ হচ্ছে! তার লুকায়িত ভালোবাসায় পাপ ছিল বলেই হয়ত আজ তিন তিনটি মানুষের জীবন এভাবে ধ্বংস হয়ে গেল! তার বড়ো বোন আজ বাড়িহীন, পরিবারহীন, ঠিকানাহীন। আর অন্যজন তো…! চোখ থেকে কখন যে তার জল গড়িয়ে পরতে শুরু করল তার অনুভবও সে টের পায়নি।

সিফরার মা আফিয়া শিকদার সিফরার রুমে এসে সিফরাকে খুঁজে না পেয়ে তিনি বেলকনিতে গেলেন। সিফরার উদাস ভাব দেখে তিনি কাঁদো কাঁদো গলায় সিফরাকে বললেন,

“মা হয়ে তোর কাছে রিকুয়েস্ট করছি। তোর যদি অন্য কোথাও পছন্দ থাকে তো বলে ফেল! বিয়ের দিন দয়া করে তোর বড়ো বোনের মত আমাদের নাক কান কাটিসনা! তোর বাপকে আর মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিসনা।”

#চলবে____?