আঙুলে আঙুল পর্ব-০২

0
337

#আঙুলে_আঙুল
#পর্ব (২)

” কে যেন বলেছিল, আমার ঘরে জান্নাতের ফুল জন্মেছে? তাকে ডাকো। বলে দিই, জান্নাতের ফুল না জাহান্নামের আগুন জন্মেছে। যার তাপে আমার বিশ্বাস, ভরসা, স্বপ্ন, গর্ব সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ”

বাবার কণ্ঠে অবজ্ঞা, নিন্দা। চোখে অশ্রু, অনাদরের ছায়া। অরুণিমার বুকের জমিন কেঁপে ওঠল। রক্ত ছলকে ওঠল। ভীত ও আতঙ্কিত চোখজোড়া দেখল, জন্মদাতা কেমন করে এলোমেলো পা ফেলে রুমের ভেতরে ঢুকে গেলেন। তিনি চলে যেতে মাইমূন তার ছোকরাদের চোখের ইশারা করল। তারা বুঝতে পেরে ভাঙার কাজ বন্ধ করে দিল। অরুণিমা তার দিকে না ঘুরেই হতাশ স্বরে সুধাল,
” এমনটা কেন করলে? ”
” তোমার বাবার চাওয়া ছিল। ”

অরুণিমার দৃষ্টি ঘুরে গেল প্রেমিকের দিকে। অবোধের মতো সুধাল,
” মানে? ”

মাইমূন ভেজা রুমালটা দিয়ে নিজের মুখ মুছল। চুমু খেল। তারপর পকেটে ভরতে ভরতে বলল,
” তিনি চেয়েছিলেন, তোমার মাস্তান প্রেমিকের হাড়গোড় ভেঙে হাসপাতালে পাঠাতে। তাকে তো পেলাম না, তাই অন্য কিছু ভেঙে আমার ক্ষমতা দেখালাম। ”

অরুণিমা বিস্মিত বদনে পুনরায় সুধাল,
” কী সব উল্টা-পাল্টা বলছ! ”
” বিশ্বাস না হয় তোমার বাবাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো। ”

তার বলারভঙ্গি ও কণ্ঠস্বরে কঠোর আত্মবিশ্বাস। সগর্বে আত্মপ্রশংসা করে ফেলল এই সুযোগে,
” আমার ভালোবাসা জানে, তার মাইমূন কখনও মিথ্যা কথা বলে না। ”

অরুণিমা উত্তেজিত ও সন্দিগ্ধ হয়ে জিজ্ঞেস করল,
” তুমি কী করে জানলে? ”

মাইমূন উল্টে পড়ে থাকা একটা চেয়ার সোজা করল। সেটাতে বসে ধীরে-সুস্থে সুন্দর করে জানাল, কাল রাতে অসীউল্লাহ তার বাবার সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। সেই সময় মাইমূনের নামে অনেক বদনাম করেছে, বিচার দিয়েছে। তারপর অরুণিমার বিয়ের কথাটি উল্লেখ করে বলেছে, ‘ শুনেছি, আপনার ছেলে অনেক ক্ষমতাবান। পাড়ায় খুব নাম-ডাক। যদি বিয়ের দিন আমার পাশে থাকত। তাহলে নিশ্চিন্তে মেয়ের বিয়েটা দিতে পারতাম। ‘

” এই নিশ্চিন্তের মানে হয়তো তুমি বুঝোনি। আমার বাবা ঠিক বুঝেছিল। তাই রাতেরবেলা কল করে আমাকে আদেশ করেছে, তোমার বিয়ের মধ্যে যদি মাইমূন আসে তাহলে যেন, হাড়গোড় ভেঙে দিই। ”

পুরো ঘটনা শোনার পরও অরুণিমা কিছুই বুঝতে পারল না। আরও জট বেঁধে গেছে। সেই জট ছাড়াতে জিজ্ঞেস করল,
” বাবা তোমাকে চিনে। তাহলে তোমার বাবার কাছে যাবে কেন? ”
” আমার বাবাকে চিনেন না তাই। ”
” তোমার বাবা কে? ”

মাইমূন চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াল। ঠোঁটে হাসি নিয়ে মাথার উপর আঙুল ঘুরিয়ে অদৃশ্য বৃত্ত তৈরি করে বলল,
” এই বাসার একমাত্র মালিক, দিদারুল করিম। ”

অরুণিমা বজ্রাহত হলো। বিস্ফারিত নেত্রে কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ থেকে সুধাল,
” তুমি বাড়িওয়ালা চাচার ছেলে? ”

সে প্রসন্নচিত্তে মিষ্টি করে বলল,
” জি। ”

খালি পড়ে থাকা চেয়ারটায় অরুণিমা বসে পড়ল। আকস্মিক ধাক্কাটা খানিক সামলে প্রশ্ন করল,
” কোনোদিন তোমাকে দেখিনি তো! ”
” আমি দেখেছি রোজ। চুপিচুপি। আড়াল থেকে। তারপরেই তো বুকের মধ্যে ধুম করে ভালোবাসাটা পড়ল। ”

অরুণিমা কিছু বলতে পারছে না। নির্বাক থাকলে মাইমূন নিজ থেকে ঠিক করে উত্তরটা দিল,
” শুরুতে যেতে-আসতে দেখা হয়েছে। তুমি খেয়াল করোনি। যেদিন ক্লাবের ভেতর খেয়াল করে দেখলে সেদিন থেকে ইচ্ছে করে দেখা দিইনি। ভেবেছিলাম সময়মতো সারপ্রাইজ দিব। সেই সময়টা এরকম হবে ভাবতেও পারিনি। ”

মাইমূনের পিতৃপরিচয়ের ব্যাপারটাকে এড়িয়ে বলল,
” সব মানলাম, কিন্তু যে কাজ কোনোদিন করোনি সেটা বাবার সামনে কেন করলে? ”
” কোন কাজ? ”

অরুণিমা চোখ রাঙাল। মাইমূন জিভ কামড়ে বলল,
” ইচ্ছে করে করিনি। বিশ্বাস করো? তোমার বাবার সামনে আমার ক্ষমতা দেখাতে গিয়ে কখন যে তোমার কোমর জড়িয়ে ধরেছি, বুঝতে পারিনি। ”
” এটা ক্ষমতা দেখানো না, অপমান করা। তুমি শুধু বাবাকে না আমাকেও অপমান করেছ। বাবা আমাদের সম্পর্ক কোনোদিন মেনে নিবে না। ”

কথাটা বলতে বলতে অরুণিমার গলা ধরে এলো। চোখের কোল ভিজে ওঠল। মাইমূন বুঝতে পেরে বলল,
” ইশ! আবার ভুল করে ফেলেছি। এই ভালোবাসা, ভুল শোধরানোর উপায় বলো না। ”

অরুণিমার ভারি রাগ হলো। অভিমানী স্বরে বলল,
” কোনো উপায় নেই। ”

মাইমূন নিজ থেকে উপায় উদ্ভাবন করল,
” মাফ চাইব? হাত ধরে, পা ধরে? ”

সে কোনো উত্তর দিল না। নীরবে চোখের অশ্রু ঝরাচ্ছে আর ভাবছে, এই সম্পর্কের শেষ পরিণতি কী হতে পারে।

___________
এক বছর আগে,

অরুণিমারা তিন ভাই-বোন। সেই বড়। অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। তারপরে ছোট বোন শুভ্রা। এইচএসসি দিয়েছে। সবশেষে নিয়াজ। নবম শ্রেণির ছাত্র। মা ও তিন ভাই-বোন এতদিন নাসিরপুর নামের একটি গ্রামে বাস করত। অসীউল্লাহ একটি সরকারি কলেজের কেরানি পদে চাকরি করছেন প্রায় বারো বছর। মাস শেষে যে এক মুঠো নোট পেতেন তাই দিয়ে এতদিন সংসার চলছিল। তিন ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা ও পাঁচ সদস্যের সংসার ভরণ-পোষণের দায়িত্বের চাপটা বোধ হয় আর নিতে পারছিলেন না। প্রেশারটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। খবর পেয়ে অরুণিমা ও নাজিয়া বেগম ছুটে এলেন। চিকিৎসা করতে করতে বড় মেয়ে সিদ্ধান্ত নিল, বাবাকে আর এতদূর একা থাকতে দিবে না। সকলকে নিয়ে এখানে চলে আসবে। প্রয়োজনে সেও চাকরীর ব্যবস্থা করবে। বাবা এই প্রস্তাবে রাজি হতে চাইলেন না। বুঝাতে চাইলেন, সকলের পড়ালেখার অসুবিধা হবে। অরুণিমা বাবার বুঝ গ্রহণ না করে উল্টো নিজের মতো বুঝ দিয়ে সত্যি সকলকে নিয়ে এই শহরে চলে এলো। বাবার কলেজেই শুভ্রাকে ভর্তি করাল। নিয়াজকেও বাসার কাছে অবস্থিত একটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিয়ে নিজের মতো চাকরি খোঁজার চেষ্টা করে চলল। কয়েকদিন ঘুরতে একটি মলে কসমেটিক্সে দোকানে চাকরি পেয়ে গেল।

প্রতিটি পাড়াতে এমন কিছু সুন্দরী মেয়ে থাকে যারা অকস্মাৎ ভাবি হয়ে যায়। সেজন্য বিয়ের প্রয়োজন নেই, শুধু কয়েকটি দুষ্টু ছেলের দল থাকলেই হয়। সেরকম ঘটনাই ঘটল অরুণিমার সাথে। নতুন এলাকার নতুন বাসায় উঠার মাস পেরুতে ‘ ভাবি ‘ সম্বোধনটা হঠাৎ করে কানের মধ্যে ফুঁড়তে লাগল। শুরুতে পাত্তা না দিলেও পরবর্তীতে দিতে হলো। বাসার বারান্দা থেকে শুরু করে বাড়ির আশপাশের রাস্তা, মুদির দোকান, সবজি বাজার এমনকি নিজের কাজের স্থানেও শান্তি নেই। যখন-তখন কেউ ভাবি ডেকে হাওয়া হয়ে যেতে লাগল। খুব খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যেত না। কথায় বলে, ‘ চোরের দশ দিন গেরস্তের একদিন ‘ অরুণিমারও সেই একদিন এলো। সময়টা দুপুরবেলা। রাস্তাঘাট ফাঁকা, নীরব। যান চলাচল চোখে পড়ে না। নাজিয়া বেগম রান্না করার সময় বুঝতে পারলেন, সয়াবিন তেল নেই। অরুণিমা তখন ঘরেই ছিল। সমস্যার কথা জানাতে সে একটি খালি বোতল নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ে। কাছের মুদির দোকানটার দিকে কাছাকাছি পৌঁছাতে কেউ অতি আহ্লাদে ডেকে ওঠল,
” এই ভাবি! ”

অরুণিমা হাওয়া বেগে পেছন ঘুরল। নজরে পড়ল, একটি চৌদ্দ-ষোল বছরের ছেলে। ভাগ্য ভালো ছিল না হয়তো। পালাতে গিয়ে ছুটে আসা একটি সাইকেলের সাথে বাড়ি খেয়ে পড়ে গেছে। সেই অবস্থায় উঠে দৌড় দিতে নিলে অরুণিমা ডেকে ওঠল,
” এই, দাঁড়াও। একদম পালাবে না। ”

ছেলেটা পায়ে খুব ব্যথা পেয়েছে। দৌড়াতে গিয়ে আবারও পড়ে গেল। তাকে সাহায্য করতে আরেকটি ছেলে ছুটে এলো কোথাও থেকে। অরুণিমা ততক্ষণে পৌঁছে গেছে। আহত ছেলেটিকে নিয়ে পাশের ফার্মেসি ঢোকার পূর্বে পরে আসা ছেলেটির হাতে খালি বোতল ও টাকা দিয়ে বলল,
” আমার বাসায় তেল দিয়ে এসো। ”

আহত ছেলেটির চিকিৎসা শেষে অরুণিমা জিজ্ঞেস করল,
” তোমার নাম কী? ”
” স্বপন। ”
” আমাকে চেন? ”
” জি, ভাবি। ”
” আমি তোমার ভাবি হই? ”
” জি। ”
” কে বলেছে? ”
” মিয়া ভাই। ”

অরুণিমা নিচের ঠোঁটে চিন্তিত কামড় দিয়ে বলল,
” চলো, তোমার মিয়া ভাইয়ের সাথে দেখা করে আসি। ”

চলবে