আজও_তোমারই_অপেক্ষায় পর্ব-১০+১১

0
96

#আজও_তোমারই_অপেক্ষায়
#আফসানা_মিমি
১০.

আঁধার রাতের সমস্ত বিষন্নতা ভর করেছে হিমার উপর। মীর তার জন্য কষ্ট পাচ্ছে ভাবতেই কান্না পাচ্ছে। মীরের ভালোবাসা কতোটা গভীর তা সে আজ উপলব্ধি করতে পেরেছে। পৃথিবীর সমস্ত ভালোবাসা কী এমনই সুখকর! হয়তো, তার চেয়েও মধুর। হিমার আজ নিজেকে ঐ ভাগ্যবতীদের মতো নিজেকে মনে হচ্ছে যারা পাঁচ দিক দিয়েই সুখী হয়। সৃষ্টিকর্তা নাকি সকলকে পাঁচ দিক দিয়ে দেননা। সবার মাঝে কিছু না কিছু অপূর্ণতা রেখে দেন। হিমার সৌভাগ্য খুবই ভালো। হিমা ভাবতে ভাবতে হেলেদুলে সিঁড়ি ডিঙিয়ে নিচে নেমে রাদিফর হাতে ফোন তুলে দেয়।

ফোন হাতে পেয়ে রাদিফ বেজায় খুশি। সে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ফোনটা দেখছে। ফোন সহিসালামত আছে ভেবেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। হিমার দিকে খেয়াল করতেই তার উদাসী মুখ দেখতে পায়।
“ আমি ঘুমুতে গেলাম, রাদিফ ভাই। মাকে বলে দিও যেন আমাকে ডাক না দেয়।”

রাদিফ ভেবেছিল হিমার সাথে কিছুক্ষণ আড্ডা দিবে। অবশ্য রাদিফ তো বেশি কথা বলেই না, যে কোন টপিক তুলে দিলে হিমাই গল্পের আসর জমে যেতো আর রাদিফ মনোযোগ সহকারে শুনতো। হিমার কথায় রাদিফের আশায় এক বালতি জল পরে যায়। রাদিফ মাথায় সায় দিয়ে সম্মতি জানালে হিমা পূর্বের ন্যায় হেলেদুলে সিঁড়ি ডিঙিয়ে উপরে চলে যায়।
রাদিফ ভেবেছিল ফোন সহিসালামতে আছে কিন্তু সে ভুল ছিল। সে ভুলেই গিয়েছিল মীর নামক প্রাণী তার ফোনকে আদর করবে না বরং বারোটা বাজাবেই। ফোন ওপেন করেই সর্বপ্রথম সে গ্যালারিতে প্রবেশ করে। অ্যালবামে ক্লিক করতেই মীরের অস্বাভাবিক ছবি রাদিফ দেখতে পায়। প্রথম ছবিটাই ছিল মীরের রাগী চেহারার পরের ছবি মীরের হাতের যা দ্বারা সে বুঝাচ্ছ আজ তোর রক্ষা নাই রাদিফ। রাদিফ ছবিটা দেখে শুকনো ঢোক গিলে। পরের ছবি দেখা মাত্রই রাদিফ ফোন বন্ধ করে দেয়। নাহ! সে আর দেখবে না। শেষে দেখা যাবে মীরের পশ্চাৎদেষের ছবিও সামনে চলে এসেছে। রাদিফ মন খারাপ করে বসে রয়! ফোনের দিকে তাকিয়ে বলে,“ তোর কোনোদিন ভালো হবে না, মীর! আমার সাধের ফোনের সব স্মৃতি এভাবে মুছে দিতে পারলি! দেখিস,একদিন তোর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আমার কারণেই শেষ হবে।”
দুঃখভরা স্বরে রাদিফ কথাগুলো বলে আশা কী করছে দেখতে চলে যায়।

রাতের খাবারের টেবিলে বাহারি খাবারের সুগন্ধিতে ভরপুর কিন্তু যাদের জন্য আশা এতো কষ্ট করেছে তারাই নেই। রাদিফ অল্প খেয়েই গেস্ট রুমে চলে গেছে। হিমাকে ডাক দিতে গেলে রাদিফ হিমার বলা কথা জানায়। মীরকেও আশা কতক্ষণ ডেকে এসেছে, ছেলেটার কোনো খবরই নাই। সে বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। মীর ঘুমাচ্ছে ভেবে আশা চলে আসে। মন খারাপ করে খাবারের পর্ব শেষ করে বাড়তি খাবার ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখে।
শোয়ার সময় রাদিফ কোথায় শুবে তা নিয়ে বিপাকে পড়ে যায়। মীরের শোয়া দেখে সে বুঝতেই পারে আজ তার জন্য বিছানায় জায়গা হবে না। মীর ঘুমাচ্ছে বুঝতে পেরে ভদ্র রাদিফ মীরের পশ্চাতে লাথি মেরে বলে, “ তোর কোন ভারা ভাতে ছাই ফেলেছি রে, আমার সাথে এমন শত্রুতা শুরু করছিস কেন? শা’লা ভালো করে ঘুমা।”

মীরের কোন হেলদোল নেই। সে তো ঘুমুচ্ছেই। অগত্যা রাদিফ জমিনে বিছানো বিছানায় শুয়ে পড়ে যা হিমা মুভি দেখার জন্য বিছিয়েছিল। রাদিফ ঘুমিয়েছে বুঝতে পেরে মীর চোখ খুলে তাকায়। মাথা উঠিয়ে রাদিফকে একবার দেখে নিজের ফোন হাতে নেয়। গ্যালারিতে ঢুকে হিমার জন্মদিনের একটি ছবিতে ক্লিক করে। লালা জামায় সেদিন হিমাকে পরী লাগছিল।মীরের সেই মুহূর্তের কথা মনে পড়ে যায় যখন হিমার কেশব জামার চেইনে আটকে যায় আর মীর তা ঠিক করে দেয়। সেই সময়ের পর থেকেই মীরের মনে হিমার জন্য অনুভূতি জন্মে। মীর হিমার ঐ ছবিতে ঠোঁট ছুঁয়ে দেয়। হিমার ছবিতে হাত ছুঁয়ে দিয়ে বলে,“ তুমি ছুঁয়ে দিলে মন, আমি উড়বো আজীবন! ভালোবাসি, হিমালয়!”

———————————–

সকাল সকাল মীরের ঘুম ভাঙে পেটের ভেতরের আশ্চর্য শব্দে। রাতে খাবার না খাওয়ার কারণে ক্ষুধায় পে চু চু করছে। ফ্রেশ হয়ে মীর ফুফু ফুফু বলে চেচিয়ে সিঁড়ি ডিঙিয়ে নিচে নামতে থাকে। বাসায় কারো সারা শব্দে না পেয়ে মীর সোফায় এসে বসে। হাতের সাহায্য মাথার চুল সেট করে ফোন হাতে নেয়। গতকাল রাতে তার ভালো ঘুম হয়নি। হিমা নামক ঔষধিকে বার বার মনে পড়েছে। সে তো তার মনের কথা হিমাকে জানিয়ে দিয়েছে। হিমা কী তাকে গ্রহণ করবে? কী জবাব দিবে? যদি তার মনে ঐ কালাচান বাসা বাঁধে তো সে কি করবে? ম’রে যাবে, না না দেশ ছাড়বে। হিমার সামনেই আর আসবে না। সাত পাঁচ ভেবে মীর অস্থির হয়ে যাচ্ছিল। সে ফোন বন্ধ করে চোখ বন্ধ করে সোফায় হেলান দিয়ে বসে।
“ ঘুমিয়ে পড়লে নাকি? আমি তো তোমার জন্য কফি এনেছিলাম।”
হিমার আদুরে স্বর শুনে মীর চোখ খুলে তাকায়। সাথে সাথে তার হাত থেকে ফোন ফসকে পড়ে যায়। হিমা তা দেখে লাজুক হাসে। লাল টকটকে রঙের হাতখানা এগিয়ে দেয় মীরের দিকে। মীর দেখতে পায় লাল রঙের চুড়ি ঐ রাঙা হাতে শোভা পাচ্ছে। মীরের হৃৎস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বাজতে শুরু করে। সে কাঁপা হাতে কফির কাপ হাতে নেয়। মীরের হাত হিমার হাতে স্পর্শ করতেই হিমা চোখ বন্ধ করে নেয়। মীর মাতাল স্বরে বলে,“ মে’রে ফেলবি নাকি?”
“ তোমাকে মে’রে ফেলার মতো কষ্টের কাজ আমি করতে পারব না,মীর ভাই! তবে, তোমাকে নিস্তেজ করে দিব। মাতাল হাওয়ায় দোল খাওয়াবো। পরিশেষে তোমার প্রণয়ে ধরা দিব।”

কথাগুলো বলে হিমা মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে চলে যায় রান্নাঘরের দিকে। নুপুরের রিনিঝিনি আওয়াজ কানে আসলে মীর চোখ বন্ধ করে তা শুনে। অতঃপর চোখ আবারও খুলে সে অপলক দৃষ্টিতে হিমাকে দেখে। মীরের দেওয়া জন্মদিনের উপহারে আজ হিমা সেজেছে। মীর কল্পনায় হিমাকে যেভাবে দেখতে চেয়েছিল ঠিক সেভাবেই হিমা সেজেছে। মীরের কাছে মনে হচ্ছে, হিমাকে তার কল্পনা থেকেও সুন্দর লাগছে। সে মাদকাসক্তের ন্যায় হিমার নেশায় বুদ হয়ে যাচ্ছে। হিমা রান্নাঘরে কি যেন করছে। মীর ধীরপায়ে সেদিকে এগোয়। হিমা পায়েস রান্না করছে। রান্না প্রায় শেষের পথে। চামচ দিয়ে পায়েসের স্বাদ নিতে যাচ্ছিল সে। গরম চামচে ফু দেওয়ার সময় মীরের আগমন ঘটে। সে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে হিমাকে দেখছে।
“ কি দেখছো, মীর ভাই?”

“ তোকে আজ নতুন লাগছে রে,হিমালয়? কি মেখেছিস গায়ে শুনি?”

পায়েস হয়ে গেছে। চুলার সুইচ বন্ধ করে হিমা মীরের দিকে তাকায়। মীরকে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সময় জবাব দেয়,“ পছন্দের মানুষের উপহার গায়ে মিশিয়েছি, মীর ভাই! সে যেন আমার অনুভূতি বুঝতে পারে।”

মীরের হাত থেকে কফির কাপ ফসকে পড়ে যায়। সে তড়িৎ গতিতে হিমার পিছু এসে হাত টেনে ধরে। অস্থিচিত্তে বলে,“ সত্যিই কি তুই!”

“ আমি তোমারই, মীর ভাই! হিমার প্রণয়নের প্রণয় শুধু তুমি ই তুমি।”

মীরের কি হলো সে জানে না। হিমার পায়ে ধরে তাকে কোলে তুলে নেয়। খুশিতে সে হিমাকে সহ ঘুরতে থাকে এবং চিৎকার করে বলতে থাকে, “ পৃথিবীকে বলে দে, তুই আমার,হিমালয়। তোর মনের গহীনে লুক্কায়িত অনুভূতি শুধুই আমার জন্য। আমি তোকে ভালোবাসি রে, হিমালয়। খুব বেশিই ভালেবাসি।”

“ কিছু ভালোবাসা মুখে নয়, বুঝে নিতে হয় মীর ভাই! তোমার কাছে ভালোবাসার পাগলামি শিখেছি। তোমার প্রণয়ে আসক্ত হয়ে বিলীন হতে চাই। আমাকে কখনো ছেড়ে যেও না মীর ভাই!”

মীর হিমাকে নিচে নামায়। আঁজলা হাতে হিমার গাল স্পর্শ করে বলে, “ চল বিয়ে করে ফেলি, হিমালয়!”

হিমার উত্তর দেওয়ার আগেই কোনো কিছু পড়ে যাওয়ার আওয়াজ শুনতে পায় তারা। দুজনে একসাথে তাকিয়ে দেখতে পায় তাদের থেকে ঠিক পঞ্চাশ গজ দূরে রাদিফ দাঁড়িয়ে রয়েছে। জমিনে তার শখের কেনা নতুন ফোন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে আছে। রাদিফ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ভাঙা ফোন জমিন থেকে তুলে যেই পথে আসছিল সেই পথেই ফিরে যায়। পিছনে অবাক হয়ে যাওয়া হিমা ও মীরকে রেখে যায়।

চলবে ইনশাআল্লাহ……..

#আজও_তোমারই_অপেক্ষায়
#আফসানা_মিমি
১১.

আজ প্রকৃতিও ঝলমলে কিরণের সাথে হাসছে। সাথে হাসছে ভালোবাসার দুজন মানুষও। স্নিগ্ধ বিকেলে দুজন ছাদে বসে গল্প করছে। দিবসের আলোয় একজন অপরজনকে মনভরে দেখছে। আশার কাছের একজন বান্ধবীর স্বামী মারা গিয়েছে সকাল থেকে সে সেখানে। হিমেল দুপুরে এসেছিল। মেয়েকে লাল টকটকে বউ সাজতে দেখে মাথায় চুমু একে বলেছিল, “ আমার লাল বুড়ি আম্মা।”
রাদিফের কোনো খবর নেই সে যে সেই সকালে মীর হিমাকে একসাথে দেখেছিল তারপর আর বাড়ি ফিরেনি। মীর রাদিফকে ফোন করেছিল, সে বলেছে সন্ধ্যার ফিরবে।

ছাঁদে বসার জায়গা রয়েছে। মীর সেখানে গালে হাত দিয়ে বসে হিমার আলতা দেওয়া দেখছে। আজ এই মেয়েটা পাগল হয়ে গেছে। আলতার রং হালকা হয়ে যাওয়ায় আবারও সে আলতা পরার জিদ ধরেছে। মীরকে জোর করে ছাদে নিয়ে এসে একা একাই আলতা দিচ্ছে।
“ আলতা পায়ে রাঙা হাতে পাগল করবি নাকি,হিমালয়? বললাম, চল বিয়ে করে ফেলি; শুনলি না।”

“ তোমার মাথায় কি পোকায় কামড় দিয়েছে,মীর ভাই? ধৈর্য শক্তি কি দোকান ওয়ালাকে ধার দিয়ে এসেছো? আজই তো মনের কথা জানালাম। কিছুদিন যাক! আমার তো ইচ্ছে ছিল দুই তিন বছর চুটিয়ে প্রেম করব। তুমি তা হতে দিবে না,তাই না!”

হিমার পাকা কথায় মীর হাসে। এগিয়ে আসতে আসতে জবাব দেয়,“ আমি দূরে চলে যাই, এটাই তুই চাইছিস?”

হিমার মন খারাপ হয়ে যায়। সে তো এমন কিছু ভেবে বলেনি। আলতা দেওয়া বাদ দিয়ে ভাবতে শুরু করে কীভাবে মীরকে মূল কথাটা বুঝিয়ে বলবে। হিমার ভাবনার মাঝেই মীর তার কাছে এসে বসে। হিমার বাম হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে হাতের পিঠে গোল সার্কেল করে আলতা পরিয়ে দিতে দিতে বলে, “ আমি আজ ভীষণ খুশি তার সাথে চিন্তিত। তোকে তো পেয়ে গেছি ঠিকই কিন্তু আমাদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করতে হবে। তোকে কোথায় রাখবো কীভাবে রাখবো। তোর সুখ অসুখ সবকিছু আমারই দেখতে হবে। আমি আরো পরিশ্রম করব হিমালয়! শুধু তুই ওয়াদা কর, আমার থেকে ভুল বুঝবি না!”

হিমা মনোযোগ সহকারে মীরের কথা শুনে। মীরের গালে ডান হাত রেখে উত্তর দেয়, “ তোমাকে ভুল বুঝবো কেন? তুমি ডা’কা’তি করবে? নাকি খু’ন করবে। আমি জানি তুমি আমাদের সুখের জন্য ভালো কিছু করবে।”

“ তুই কি কখনো মিষ্টি মিষ্টি কথা বলবি না, হিমালয়?”

আকস্মিক মীর রাগ করে বসে। সে চেয়েছিল হিমার আবেগপ্রবণ উত্তর কিন্তু পেয়েছে জগাখিচুরি উত্তর। মীরের এখন ইচ্ছে করছে হিমার গালে ঠাস করে থাপ্পড় বসাতে। এই মেয়েটা সবসময় মীরের ফিলিংসের বারোটা বাজায়। এদিকে হিমা মিটিমিটি হাসছে। দুই হাতে পুনরায় আলতা রাঙা করে হাত বাড়িয়ে দেয় মীরের পানে। এরপর দুষ্ট হেসে বলে,“ আমার হাত ধরতে পারবে,মীর ভাই?”

মীর হিমার দুষ্ট হাসি লক্ষ করে বুঝতে পারে সেও হিমার মতো হেসে বলে,“ তুই কি চাস, আমি তোকে ছুঁয়ে দেই!”
“ অবশ্যই চাই।”
কথা শেষ করেই মীর দৌড় দেওয়ার জন্য প্রস্তুত নিতেই মীর তার হাত ধরে ফেলে; অতঃপর বাঁকা হেসে বলে, “তবে তাই হোক!”

হিমাকে কাছে টেনে গভীর দৃষ্টিতে মীর দেখতে থাকে। হিমা লজ্জায় নতজানু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মীর মাশাআল্লাহ বলে হিমার কপোলে অধর ছুঁয়ে দেয়। হিমার দিকে তাকিয়েই বলে, “ আমাদের ভালোবাসার প্রথম পরশ এঁকে দিলাম, হিমালয়। তুই কি আমায় খারাপ ভাবছিস?”

হিমা নিরুত্তর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মীর হাঁটু গেড়ে বসে হিমার পা মীরের উরুর উপর রেখে আলতা দিতে থাকে।হিমা চোখ বন্ধ করে মীরের স্পর্শ অনুভব করে।

সন্ধ্যা লগনে দুজন একসাথে সূর্যাস্ত দেখছে। হিমা মুগ্ধ দৃষ্টিতে দূর আকাশের বুকে সূর্যকে বিলিন হতে দেখছে। সূর্যাস্ত যে হিমা দেখেনি তা কিন্তু নয়! কিন্তু আজকের দেখার অনুভূতি আলাদা। আজ তার ভালোবাসার মানুষ পাশে আছে। মীর অনেক সময় ধরে হিমাকে কিছু বলতে চেষ্টা করছে কিন্তু হিমার মুখের হাসি যেন বিলিন না হয়ে যায় এই ভেবে কিছু বলছে না। সময় ও শ্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। সঠিক সময়ে সঠিক কাজ না করলে পরেরদিন ঠিকই আফসোস করবেন। মীর অন্তরে পাথর চেপে বলতে শুরু করে,“ আমি আগামীকাল চলে যাব, হিমালয়!”

হিমা অবাক নেত্রে মীরের দিকে তাকায়। তার চোখে টইটম্বুর জল। আঁখি যুগল মুছে বলে,“ তুমি আমাকে রেখে চলে যাবে,মীর ভাই?”

হিমার অসহায় কণ্ঠস্বর মীরের সহ্য হচ্ছে না। সে আঁজলা হাতে হিমার মুখ ধরে বলে, “ এভাবে বলে না কলিজা! আমার যেতে হবে। আমাকে আরো বড়ো হতে হবে। তবেই তো তোকে আমার করে নিতে পারব।”
হিমা মানতেই পারছে না তার মীর ভাই তাকে ছেড়ে চলে যাবে। আজই তো সে তার মনের কথা ব্যাক্ত করেছে। আর কালই মীর চলে যাবে? একদিনে মীরের সাথে হিমার মিষ্টি মুহূর্তগুলো তো তাকে শান্তি দিবে না। মীরকে দেখতে, কথা বলতে মন উতলা হয়ে যাবে। তখন সে কি করবে?
“ তুই মন খারাপ করলে, তোকে পেতে আরো দেরী হবে রে, হিমালয়। তুই কি তা চাস?”

হিমা মাথা নেড়ে উত্তর দেয়,“ না, আমি শুধু তোমাকে চাই, মীর ভাই।”

হিমার চেখের জল মুছে মীর হাত ধরে নিচে নামার জন্য অগ্রসর হয়। সামনে এগিয়ে যেতে যেতে বলে,“ তাহলে কথা দে, তুই কাঁদবি না!”
“ কথা দিলাম।”

সিঁড়ির কাছে আসতেই রাদিফের দেখা মিলে। সে উপরেই আসছিল। দুজনকে একসাথে দেখে তাদের উদ্দেশ্যে বলে,“ হিমা, ফুফু ডাকে। মীর, তোর সাথে কথা আছে।”

হিমা পাশ কেটে চলে যায়। মীর সেদিকে তাকিয়েই দেখতে পায় হিমা চোখের জল ভালোভাবে মুছে নিচ্ছে। মীর চোখ বন্ধ করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। এরপর রাদিফের দিকে তাকিয়ে বলে, “ চল, ছাদে বসে কথা বলি!”
————————–

হিমাকে দেখে আশা হা করে তাকিয়ে আছে। তার মেয়ে কবে যে বড়ো হয়ে গেছে বুঝতেই পারেনি। কলিং বেলের আওয়াজে আশা এগোয়। হিমেল এসেছে। হাসিমুখে স্ত্রীর গালে হাত ছুঁয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। হিমেল জুতা খুলছিল। হিমা সোফায় বসে নুপুর খুলতে চেষ্টা করছিল। আজ সারাদিন সে শাড়ি পরিধান করা অবস্থায়। এখন সব খুলে ফেলবে। মীরের চলে যাওয়া শুনে মন প্রাণ বিষিয়ে গেছে। আশা হিমাকে শুনিয়ে স্বামীকে বলতে শুরু করে,“ আমাদের মেয়ের জন্য ছেলে খোঁজ করো, হিমার বাবা! আমাদের মেয়েকে আর ঘরে রাখা যাবে না। সে বড়ো হয়ে গেছে।”
মায়ের কথায় হিমা ভীষণ লজ্জা পায়। বাবর সামনে দাঁড়িয়ে বলে,“ তুমি মিথ্যা বলছো, মা। বাবা এখনো আমায় কোলে নিতে পারবে। তাহলে কীভাবে বড়ো হয়ে গেলাম!”

হিমেল হেসে মেয়ের কথায় তাল মিলিয়ে বলে,“ হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক বলেছে আমার মেয়ে। তোমার চোখ বন্ধ আশা। যাও চোখের চিকিৎসা করে আসো।”

মা বাবার সাথে হিমা হেসে সন্ধ্যার সময় পার করে দেয়। রাতের খাওয়ার সময় মীর চলে যাওয়ার কথা জানায়। রাদিফ তাই। তারা দুজন একসাথে আগামীকাল রওনা হবে।
“ আরো কয়েকদিন থেকে যা তোরা।”
আশার কথায় মীর গম্ভীরমুখে জবাব দেয়,“ একটা চাকরির অফার পেয়েছি, ফুফু। আর কতো দেবদাসের মতো ঘুরবো। জীবনে কিছু একটা করতেই তো হবে!”

আশা খুশি হয়! মীরকে নিয়ে সে খুবই চিন্তায় ছিল। অবশেষে ছেলের বুদ্ধি হয়েছে। সে খুশিমন বলে,“ সত্যিই চাকরি হয়েছে? কোথায়?”
“ চট্টগ্রামে। আগামী সপ্তাহে চলে যাব।”

হিমা খাওয়া বন্ধ করে অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়। মীরের চাকরি হয়েছে তা তো তাকে জানায়নি। আবার আগামী সপ্তাহে চলেও যাবে! হিমা মন খারাপ করে বলে, “ তোমার চাকরি হয়ে গেছে! কই আমাকে তো বললে না!”
“ তোকে বললে কি তুই আমার মালিকের কাছে অনুরোধ করতি, হিমালয়! যেন আমার চাকরি না হয়!”

“ তুমি একটু বেশি বেশিই বুঝো, মীর ভাই। তোমার সাথে কথা নাই।”

মীর হাসে। হিমা স্বাভাবিক আছে ভেবেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। এদিকে রাদিফ চুপচাপ খাচ্ছে। এদিক সেদিক না তাকিয়েই খাচ্ছে তা দেখে আশা জিজ্ঞেস করে,“ তা তুই এতো তাড়াতাড়ি আনন্দ নগরে ফিরে কি করবি? পরীক্ষা তে শেষই হয়ে গেছে। আর কয়েকদিন থেকে যা!”
“ না ফুফু, বাবা চলে যেতে বলেছে। তাছাড়া মীর ও চলে যাবে। একা মন টিকবে না।”

আশা আর না করে না। তবে মীরের জন্য মন পুড়ে।ছোটবেলা থেকে মীরকে সবসময় পাশে রেখেছে। ঢাকায় থাকার সুবাদে সময় পেলেই সে মীরের বাসায় গিয়ে ছেলের খোঁজ খবর নিয়ে আসতো। নিজের ছেলের মতো ভাবতো। আশা হিমার দিকে তাকায় আর কিছু একটা ভাবে।

—————–

সকালের কিরণ আজ কারো জন্য সুখের আবার কারো জন্য দুখের। হিমা সকালে উঠে মায়ের হাতে হাত মিলিয়ে রান্না শেষ করে। মীর রদিফ একেবারে রেডি হয়ে বের হয়েছে। হিমা মুখে কৃত্রিম হাসির রেখা টেনে তাদের সামনে দাঁড়ায়। মীরকে ছেড়ে রাদিফের প্রশ্ন করে,“ তুমি আবার আসবে তো! রাদিফ ভাই।”
রাদিফ আড়চোখে মীরের দিকে তাকায়। মীর বাঁকা চোখে রাদিফের দিকে তাকায়। ভ্রু উঁচু করে বুঝায় যে, উত্তর দিলেই তোর খবর আছে।”
রাদিফ শুকনো ঢোক গিলে বলে,“ তুই আমার জা’ন ভি’ক্ষা দে বোন! আমি চল্লাম।”

কথা বলে এক মিনিটও দাঁড়ায়নি। ফুফু ডেকে পাশ কেটে চলে যায়। এদিকে হিমা আড়চোখে মীরের দিকে তাকিয়ে বলে,“ তুমি এতো খারাপ কেনো,মীর ভাই! গুন্ডা কোথাকার। রাদিফ ভাইকে কি করবে শুনি? আমি পৃথিবীর সকল ছেলের সাথে কথা বলবো। সবার সামনে কি গুন্ডাগিরি করবে!”

মীর হিমার দিকে ঝুকে উত্তর দেয়,“ উমম! মে’রে ফেলবো।”

হিমা ভেংচি কেটে চলে যেতে নিলে মীর আটকায়। হিমার মাথায় হাত রেখে বলে,“ রাগ করেছিস? তুই কষ্ট পাবি বলে জানাইনি। কি করলে তোর রাগ ভাঙবে? কানে ধরবো? নাকি নাকে ধরবো?”

মীরের ইনোসেন্ট ফেস দেখে হিমা ফিক করে হেসে ফেলে। নিচু সুরে উত্তর দেয়, “ তুমি আমার খোঁজ নিও, তাহলেই আমি খুশি থাকবো, মীর ভাই! বলো খোঁজ নিবে?”

মীর চোখের দৃষ্টি ফেলে হ্যাঁ জানায়। আশা মীরের এবং রাদিফের জন্য কিছু খাবার রান্না করে বক্সে ভরে দেয়। বিদায়ের সময় আশার চোখে পানি ফেলতে থাকে। হিমা অস্থির চিত্তে দৌঁড়ে ছাঁদে চলে যায়। ছাঁদের রেলিঙের দাঁড়িয়ে মীরকে দেখে হাত নাড়িয়ে ছলছল চোখে আনমনে বলে,
“ আমি আছি আজও তোমার অপেক্ষায়, তুমি আসবে তো ফিরে পরেরবার। অপেক্ষার অবসান হবে নাকি সময়ের ব্যবধানে তুমি ভুলে যাবে! অপেক্ষায় আছি, মীর ভাই!”

চলবে ইনশাআল্লাহ………….