আজও_তোমারই_অপেক্ষায় পর্ব-১২+১৩

0
95

#আজও_তোমারই_অপেক্ষায়
#আফসানা_মিমি
১২.

আজকের সকালটা হিমার জন্য অন্যরকম। গতকাল এই সময়টাতেই সে মীরের জন্য নিজেকে সাজিয়ে নিচ্ছিল কিন্তু আজ! হিমার ঘুম ভেঙেছে অনেক আগেই আলসে রাণী ভড় করেছে তার উপর। উপুড় হয়ে শুয়ে মীরের সাথে কাটানো মুহূর্ত ভাবছে। সে ভাবছে, তার জন্য মীরের অস্থিরতার কথা। সে ভাবছে, হিমার হ্যাঁ শোনার জন্য কীভাবে তাকে জ্বলিয়েছে। সত্যিই সে মীরকে খুব জ্বালিয়েছে এজন্য হয়তো মীর প্রতিশোধ নিচ্ছে! তাইতো বিগত চব্বিশ ঘন্টার জন্য সে এক মিনিটের জন্যও স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করেনি। তার সাথে হিমা ভীষণ অভিমান করেছে। মীর যাওয়ার পর থেকে একটিবারের জন্যও তাকে কল করেনি। হিমা দুই একটা ম্যাসেজ পাঠিয়েছিল, উত্তর দেয়নি। হিমা তো ভেবেই নিয়েছে। মীর তাকে কল দিলে কথাই বলবে না! হিমা এসব ভেবে মাথা তুলে জানালার দিকে তাকায়। তার জীবনটা একদিনের ব্যবধানে এলোমেলো লাগছে। অন্যদিন পাখিরাও জানালার ধারে এসে কিচিরমিচির করে আজ তারাও যেন অভিমান করে চলে গিয়েছে। হিমার ভাবনার মাঝেই মুঠোফোন বেজে উঠে। স্ক্রিনে জাদুকর নাম ভাসছে। হিমা ফোন রিসিভ করছে না। একমনে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই রয়েছে। ফোন বাজতে বাজতে একসময় বন্ধ হয়ে যায়। হিমা মাথা আবারও বালিসে রাখে। আলসে শরীরে পাশ ফিরতে নিলেই ফোনের নোটিফিকেশনের আওয়াজ ভেসে আসে। সে ফোন হাতে নেয়, হোয়াটসঅ্যাপে মীর ছবি পাঠিয়েছে। হিমার একটি অস্বাভাবিক ছবি পাঠিয়েছে যেখানে হিমা হাই তুলছিল। ছবিতে তার নাকের ছিদ্র এতো বড়ো লাগছে যে সেখানে একটি সিংহ ঢুকতে পারবে। হিমা তড়িৎ গতিতে ম্যাসেজ লিখে দেয়,“ এক্ষুনি ডিলিট করো, মীর ভাই। নয়তো খুব খারাপ হবে।”
অপরপাশ থেকে উত্তর আসে,“ দশবার ভালোবাসি বল, হিমালয়! তবেই ডিলিট করব।”

হিমা পড়ে মহা জ্বালায়! সে তো মীরের সাথে রাগ করেছে। কথাই বলবে না বলে ভেবেছে কিন্তু মহাশয় তাকে ভালোবাসি বলতে বলছে! হিমা লিখে উত্তর পাঠায়,“ না বললে কি জে’লে ঢুকাবে!”
“ এক্ষুনি তোর আর আমার ছবি ফুফুর ফোনে পাঠিয়ে দিব।”
হিমা দুঃখভরা ইমোজি পাঠায় তার সাথে রাগী ইমোজি। অসহায়চিত্তে ভিডিও কল দেয়! মীর তখন উপুড় হয়ে খালি গায়ে শুয়েছিল। হিমা দেখার সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে নিয়ে চিৎকার করে বলে,“ তুমি এতো নির্লজ্জ কবে থেকে হলে,মীর ভাই! পর নারীর সামনে পশমহীনা বুক দেখাতে লজ্জা করছে না?”

মীর নড়েচড়ে শোয়! হিমাকে আরেকটু লজ্জায় ফেলতে বলে,“ শুনেছি পশমওয়ালা পুরুষ বউকে একটু বেশিই আদর করে। তুই কী কোনভাবে ভয় পাচ্ছিস, যে বিয়ের পর এই পশমহীনা বুকের মালিক তোকে আদর করবে না!”
“ ছিহ্!”
হিমা লজ্জায় বালিশে মুখ গুঁজে ফেলে। হাত দিয়ে ক্যামেরা বন্ধ করে বলে,“ তুমি কল কাটো,মীর ভাই। এমন পঁচা কথা আমার কান গ্রহণ করছে না।”

হিমার কথায় মীর উচ্চস্বরে হাসে। ফোনের মধ্যেই শব্দ করে চুমু একে বলে, “ আমার আদুরিনী! তুমি কি জানো! দূরত্বের যন্ত্রণা কী? দূরত্বের যন্ত্রণা শক্ত পাথরের মতো। পাথর যেমন নিজে চলতে পারে না! দূরত্ব চলে আসলে তেমন মন শরীর চলবে না যন্ত্রণায় তখন মৃত্যুকেও নির্দ্বিধায় গ্রহণ করত প্রস্তুত হবে।”

হিমা এবার ক্যামেরার দিকে তাকায়। বরাবরের মতো বোকা কথা উত্তর দেয়,“ আমাদের এতো কষ্ট করতে হবে কেন,মীর ভাই! মাকে বললেই তো আমার হাত তোমার হাতে তুলে দিবে।”

মীর হেসে ফেলে। বিছানা থেকে উঠে টেবিলে ফোন সেট করে বসায়। গায়ে শার্ট জড়াতে জড়াতে বলে,“ আমার মতো কবে ভাববি, হিমালয়! ভালেবাসার ক্ষেত্রে সবাই পর, সবাই শত্রু। তোর আমার মিলন হবে, তবে তা অনেক পরীক্ষা দেওয়ার পর।”

“ তুমি কোথায় যাচ্ছো, মীর ভাই?”

মীর তৈরী হয়ে বাহিরেও বের হয়ে আসে। হিমার দিকে দুষ্ট হাসি ছুঁড়ে বলে,“ আমার এক নাম্বার গার্লফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে।”

হিমা তো রেগে আগুন। তাকে ছাড়াও কী মীরের আরো মেয়ের সাথে সম্পর্ক আছে? সম্পর্কের দ্বিতীয় দিনই তাকে এই কথা জানাতে হলো! সে রেগে চিৎকার করে বলে,“ তুমি খুব খারাপ, মীর ভাই। আমার চেহারা তুমি আর কখনো দেখবে না, বলে দিলাম।”

হিমা কল কেটে দেয়। রাগে সে কাঁপছে। ইচ্ছে করছে সব তছনছ করে ফেলতে। পরমুহূর্তে আাশার কথা মনে পড়ে। সে যদি উলটা পালটা কিছু করে তো আশা তাকে মে’রে তক্তা বানিয়ে ফেলবে। ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে সে বাথরুমে চলে যায়। এই মুহূর্তে হিমা কাঁদবে, খুব কাঁদবে। তার মীর ভাই এভাবে তাকে ধোঁকা দিতে পারলো? নাহ ঐ মীর নামক বাঁদরকে সে ছাড়বেই না।

এদিকে হিমা কল কেটে দেওয়ার পর মীর হাসে। ফোনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে,“ তোকে না জ্বালালে আমি কখনোই শান্তি পাবো না রে, হিমালয়!”
__________________________________

প্রায়ই আধাঘন্টা শাওয়ার নিয়ে হিমা বাহিরে বের হয়। কান্নার ফলে চোখ মুখ ফুলে একাকার। বিছানায় রিপ্তীকে বসে থাকতে দেখে অবাক হয় সে। সাথে সাথে নিজের চেহারা লুকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রিপ্তীর মতো চালাক মেয়ের সামনে হিমার লুকাতে পারেনি। রিপ্তী বিস্ময় হয়ে বলে,“ আরে বান্ধবী, কাঁদছিস কেন? কে ম’রে গেছে?”

“ বাথরুমে তেলাপোকা দেখে ভয় পেয়েছিলাম। একা একাই চিল্লাইছি। কেউ বাঁচাতে আসেনি, তাই রাগে কান্না করেছি। তুই কখন আসলি?”

হিমা যে মিথ্যা কথা বলছে তা তার চোখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে। রিপ্তী তার ছোটবেলার বান্ধবী, হিমাকে সে ভালো করেই চিনে। তেলাপোকা নামক জন্তুকে ভয় পাওয়ার মত সে মেয়ে নয়। হিমাকে ধরে রিপ্তী পাশে বসায়। নিজের ফোন বের করে দেখিয়ে বলে, “ দোস্ত দেখ, ছেলেটা জোস না! গতকালই কথা হয়েছে। আমাকে প্রথম দেখাতেই ফিদা! নিজে এসে নাম্বার দিয়ে গিয়েছে। উফফ আমি যে তখন কী অবস্থায় ছিলাম!”

লুচি মেয়ে যেখানে যায় সেখানেই একটাকে না একটাকে গলায় ঝুলিয়ে নিয়ে আসে। হিমার এখন এই কথাটা বলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু বান্ধবীর মন ক্ষুন্ন হবে তাই বলল না। সে তালে তাল মিলিয়ে বলল, “ আগেরটার চেয়ে এটা সুন্দর। তবে এটাকে বুড়া বুড়া লাগছে। মনে হচ্ছে মাথায় কুলুপ এঁটে নায়ক সাজতে রাস্তায় নেমেছেন। মুখে একগাদা মেকআপ করে এসেছে। ঠিক টিকটকার মামুনের বউ নামক চাচীর মতো।”

রিপ্তী ভ্রু যুগল কুঁচকে হিমার দিকে তাকায়। সে ভাবছে, তার রুচি খারাপ নাকি পুরো পৃথিবীর মানুষদের রুচি খারাপ! এতো সুন্দর ছেলেকে কীভাবে বুড়ো বলছে!সে ভাবুকের সুরে বলে,“ দুনিয়ার মানুষ যা ইচ্ছে বলুক, এই ছেলের সাথেই আমার সম্পর্ক টিকবে দেখিস!”

রিপ্তীর কথায় হিমা তার দিকে তাকায়। এরপর কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করে দুজনই উচ্চ স্বরে হাসতে থাকে।

বেলা দশটা বাজে। রিপ্তী হিমাকে নিয়ে বের হয়েছে। কিছু শপিং করবে, ঘুরবে, সিনেমা দেখে আবার চলে আসবে। বান্ধবীকে পেয়ে হিমার মনও ভালো হয়ে যায়। সে রিকশার হুডি তুলে মন ভরে নিশ্বাস নিতে থাকে। প্রকৃতি বরাবরই হিমার পছন্দের। আনন্দ নগরে গেলে সে পথে ঘাটেই বেশি ঘুরাঘুরি করে। হিমার মামার একটি জমি আছে। যেখানে আফজাল হোসেন চারপাঁচটি ঘর তুলেছেন। হরেক রকমের ফল সাথে বিরাট বড়ো পুকুর। পুকুরে প্রতি বছর মাছ চাষ করেন। হিমা সেখানে গেলে একবার হলেও ঐ বাড়িতে যায়। সারাদিন মামার সাথে থেকে সন্ধ্যায় চলে আসে। মামার বাড়ি মধুর হাড়ি। কথাটা মিথ্যা নয়! মামার বাড়ি গেলে হিমার মন এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। আনন্দ নগরের কথা ভাবতে ভাবতেই হিমার ফোনে নোটিফিকেশনের আওয়াজ আসে। সে ফোন হাতে নিয়ে দেখতে পায়, রাদিফের ম্যাসেজ, “ আপু, আমি মারিয়া।”

রাদিফের ফোন মারিয়ার কাছে! ভেবেই হিমা হাসে।মেয়েটা তার জন্য পাগল। হিমা যদি বলে, এটা সঠিক ত এটাই সঠিক। আর যদি বলে ভুল তো মারিয়াও বলবে ভুল। হিমা রিপ্লাই করে, “ কেমন আছিস, মারিয়া?”

মারিয়া হয়তো এই প্রশ্নেরই অপেক্ষায় ছিল। সাথে সাথেই হিমাকে কল করে সে। ফোন রিসিভ করতেই হিমাকে কিছু বলতে না দিয়ে সেই বলা শুরু করে,“ তোমার খালা আমাকে শান্তিতে থাকতে দিয়েছে? মাথায় কি সব গাছপালা দিয়ে ভরে রাখে! তুমি জানো! আমার সিল্কি চুলগুলো কতো রুক্ষ হয়ে গেছে? আমি আর আনন্দ নগরে থাকবোই না। আমাকে এসে নিয়ে যাও।”

হিমার খালা যে মেয়েকে নিয়ে খুবই চিন্তিত তা হিমা জানে। কিন্তু হোসনেআরার এই পাগলামি সে কীভাবে বন্ধ করবে তা সে জানে না। সে হেসে উত্তর দেয়, “ আচ্ছা, আমি মাকে নিয়ে কয়েকদিন পর আসবো। তখন তোকে আর খালাকে সহ নিয়ে আসবো।”
“ এই না না,মাকে নিব না। দেখা যাবে সেখানে গিয়ে ঢাকার সব শ্যাম্পুর শো রুমে গিয়ে বসে থাকবে।”

মারিয়ার কথায় হিমা হাসতে শুরু করে। হিমারা রিকশায়, রিপ্তী কারো সাথে ম্যাসেজে কথা বলতে ব্যস্ত আর হিমা ফোনে। এমন সময় পিছন থেকে বাইকের হর্ণ দেওয়া শুরু করে। প্রথমে আস্তে আওয়াজ হলেও আস্তে আস্তে আওয়াজ বেড়ে যায়। হিমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে, সে পিছনে ফিরে তাকিয়ে যেই না বকা দিবে তার আগেই মোটরযানে বসা মানুষটাকে দেখে কান থেকে ফোন পড়ে যায়। হিমার চোখে মুখে আনন্দে ভরপুর। সে পারছে না রিকশা থেকে লাফিয়ে পড়তে। হাসিমুখে একসময় বলে, তুমি এখানে, কীভাবে এলে?”

চলবে ইনশাআল্লাহ…………

#আজও_তোমারই_অপেক্ষায়
#আফসানা_মিমি
১৩.

“ হ্যাপি টুয়েন্টি ফোর আওয়ার এ্যানিভার্সেরি মাই লাভ!”

লাল গোলাপ হাতে নিয়ে চিৎকার করে বলছে মীর। হিমা অবাক হয়ে মুখ চেপে বসে আছে। রিপ্তী ধাক্কা দিয়ে বান্ধবীকে লজ্জা দিচ্ছে। একসময় রিকশার সামনে মোটরবাইক এসে দাঁড়ায়, রিকশা থেমে যায়। হিমা লজ্জায় লাল নীল বর্ণ ধারণ করছে। রিকশা ওয়ালা মামা ”কি সমস্যা ভাই।” বলে চিল্লিয়ে উঠে। ওনি হয়তো ভেবেছেন অচেনা কেউ উত্যক্ত করতে চলে এসেছে। পাবলিক প্লেসে ব্যপারটা নিয়ে যেন বাড়াবাড়ি না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে রিপ্তী রিকশাওয়ালা মামাকে সাইডে নিয়ে যায়।
হিমা তখনও রিকশা বসে। মীর মোটরযান থেকে নেমে হিমার দিকে লাল টকটকে গোলাপের তোড়া বাড়িয়ে দেয় এরপর দুষ্ট হেসে বলে,“ আমার প্রথম ও শেষ গার্লফ্রেন্ড, আমার সামান্য উপহার গ্রহণ করো!”

হিমা লজ্জা পেয়ে ফুলের তোড়া হাতে নেয় তৃপ্তির হাসি হেসে উত্তর দেয়,“ এভাবে সারপ্রাইজ দিলে! আমি তো মন খারাপ করছিলাম তোমার কথা ভেবে ভেবে।”

মীর এক লাফে রিকশায় উঠে বসে। রিকশাওয়ালা মাামাকে ডেকে নেয় সে আর বলে,!“ চাচা, আমার বউকে সারপ্রাইজ দিলাম। চলুন আজ আপনার বাহনে চড়ে শহর দেখবো।”

রিকশাওয়ালা বিড়বিড় করে কিছু একটা বলে রিকশার প্যাটার্ন ঘুরান। এদিকে হিমা মীরের হাত জড়িয়ে ধরে বসে মাথা তার কাঁধে এলিয়ে দেয়। তাজা ফুলের সুঘ্রাণে নিজেকে মাতাল মাতাল লাগছে। হিমার ইচ্ছে করছে,সময়টাকে এখানেই থামিয়ে দিতে। এতো সুন্দর মুহূর্ত আবার কবে আসবে কে জানে!
“ কী ভাবছিস, হিমালয়!”

“তোমাকে নিজের চেহারা আর কখনো দেখাবো না বলেছিলাম, কিন্তু দেখে ফেললে; ভাবছি কোথায় আমার চেহারা লুকাবো, যেন ফের আমাকে দেখতে না পাও!”

মীরকে ক্ষেপাতে হিমা কথাটা বলে হাসছে। মীর তা বুঝতে পারে। সেও হিমার মতো রসিকতা করে বলে,“ তুই চাইলে এই পশমহীনা বুকে লুকাতে পারিস হিমালয়! এতে তোকে দেখতে পারব না ঠিকই কিন্তু কিছু একটা অনুভব করতে পারব।”

হিমা বাম হাতে মীরের বুকে আঘাত করে। আগের চেয়ে গভীরভাবে মীরের হাত চেপে বলে,“ তুমি খুব খারাপ, মীর ভাই!”

মীর হাসে হিমার হাতের পিঠে অধর ছুঁয়ে দেয়। আর মাত্র কয়েকদিন আছে তার কাছে। সে ভাবছে, এই কয়েকদিন হিমাকে সময় দিবে। মেয়েটাকে মন ভরে দেখবে। পৃথিবীর সমস্ত পাগলামো করে পাগলাটে প্রেমিক উপাধি পাবে।

মীর হিমাকে নিয়ে রমনা পার্কে আসে। লেকের পাড়ে হাঁটতে থাকে দুজন। দুজনই নীরব। প্রকৃতি অনুভর করছে শুধু। আচমকা মীর দাঁড়িয়ে যায়। হিমার উদ্দেশ্যে বলে, “ এখানে একটু দাঁড়াবি? আমি যাব আর আসবো।”

কথাটা বলে মীর এক মুহূর্তের জন্যও দাঁড়ায়নি। লেকের পাড় থেকে নেমে কোথায় যেন চলে যায়। হিমা পূর্বেও রমনা পার্কে অনেক এসেছে। এবার মীরের সাথে প্রথম আসা। হাতের ফুলের তোড়া থেকে সুভাষ নিয়ে লেকের দিকে তাকায়। আশেপাশে গাছপালার জন্য লেকের পানি সবুজ মনে হয়। অনেকেই শ্যাওলা জমেছে বলে থাকে। তবে হিমা গাছপালার কথাই মনে করে নিজের মনকে বুঝ দেয়।
কয়েক মিনিট পর মীর চলে আসে। তার হাতে টিউলিপ ফুল। সে হাঁপাচ্ছে। হিমার দিকে ফুল বাড়িয়ে দিয়ে বলে,“ এই নে ধর।”

হিমা ফুল হাতে নিয়ে বলে,“ একবার না দিলে? আবার টিউলিপ আনলে কেন?”

“ ঐপাড়ে এক বেকুপকে দেখলাম, গার্লফ্রেন্ডকে চ’ড় মা’র’ছে। ভাবলাম, তোকেও মা’রি! তাই ফুল এনে দিলাম। যদি উলটা পালটা কথা বলিস তো দিব এক চ’ড়।”

হিমা মীরের কথায় ভ্রু যুগল কুঁচকে নেয়। মাঝে মাঝে মীরকে গিরগিটির সাথে তুলনা করতে ইচ্ছে করে তার। কখন সে রূপ ধারণ করে তা হিমা বুঝতেই পারে না। সে প্রত্ত্যুত্তরে বলে,“ তোমার মাথা নষ্ট হয়ে গেছে, মীর ভাই! এতদিন মনে অসুখ ছিল যা ট্রান্সফার হয়ে মাথায় চলে গেছে। নয়তো বিনা কারণে আমাকে মা’র’বে কেন? বিয়ের পরে এমন কিছু করলে বাপের বাড়ি চলে যাবো কিন্তু বলে দিলাম।”

মীর নিজের ফাঁদে নিজেই আটকে যায়। হিমার থেকে দূরে যাওয়ার কথা সে কল্পনাও করতে পারে না। তাই দুই হাতে কান ধরে বলে,“ ক্ষমা করে দে আমার কলিজা! আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমি একজন দুষ্ট মেয়ের সাথে প্রেম করছি।”

হিমা এবার সামান্য রেগে যায়। মীর তাকে জ্বালাতন করছে বুঝতে পারে। মীরকে একা ফেলেই সে সামনে হাঁটা শুরু করে। যাওয়ার আগে বলে যায়,“ কোন ভদ্র মেয়ে খুঁজে নাও,মীর ভাই! আমি চললাম।”

পাগলী ক্ষেপেছে। মীর কি আর শান্ত থাকবে! সেও পাগলীর মান ভাঙাতে তার পিছু হাঁটতে থাকে।

————————

হিমার দিন এভাবেই পাড় হচ্ছিল। প্রতিদিন মীরকে নতুন রূপে তার সামনে পায়। সারাদিন ঘুরাফেরা করে দুজন দুইদিকে চলে যায়। এসব কিছু সম্ভব হয়েছে রিপ্তীর জন্য। যেই মেয়ে সুদর্শন যুবক বলে মীরের উপর ক্রাশ নামক বাঁ’শ খেয়েছিল সে আজ ভাইয়া ভাইয়া বলে মুখে ফেনা তুলে। আজ সকাল থেকেই হিমার মন খুবই খারাপ। আশা আজ তাকে বাড়ি থেকে বের হতেই দিচ্ছে না। কোনো না কোনো বাহানায় তাকে ঘরে আটকে রাখছে। সে রাগে বিছানায় বসে মীরের সাথে ম্যাসেজে কথা বলছিল। এমন সময় আশা ঘরে প্রবেশ করে। হিমার হাতে সুন্দর একটি লাল থ্রি পিস ধরিয়ে দিয়ে তাগাদার সহিত বলে, “ ঝটপট তৈরি হয়ে নে তো মা!”

আশার কথায় হিমা সন্দিহান হয়ে পালটা প্রশ্ন করে,“ কোথায় যাবে, মা?”

“ কিছু মেহমান আসবে।”

আশার হাসিমুখের উত্তর শুনে হিমা নড়েচড়ে বসে। তার মনে যা সন্দেহ হচ্ছে তা নয় তো কী! সে মিনমিন করে প্রশ্ন করে,“ আমাকে কি দেখতে আসবে,মা?”

আশা হিমার মাথায় হাত বুলায়।কপোলে চুমু এঁকে বলে,“ আমার ভাল বাচ্চা। একদম বুঝে গেছে! তোর মামার বন্ধুর ছেলে। খুব ভালো। আজ দেখতে আসবে, পছন্দ হলে আংটিবদল করে রাখবে। দুই বছর পর উঠিয়ে নিবে।”
“ এই দুই বছরে কী, এভারেস্ট জয় করে আসবে?”

হিমার ত্যাড়া প্রশ্নে আাশা ভরকে যায়। তুতলিয়ে বলে,“ খবরদার হিমা! উলটা পালটা আচরণ করবি না। তোর বাবার মান সম্মানের বিষয়।”

হিমা চুপ করে বসে রয়। তার মাথায় অনেক কিছু ঘুরছে।আশা চলে যেতেই হিমা ফোন হাতে নেয়। মীর ম্যাসেজ পাঠিয়েছে, তার ফোনে চার্জ নেই, এক ঘণ্টা পর অনলাইনে আসবে।”
ম্যাসেজটা পড়ে হিমা কপাল চাপড়ায়। আমাদের জীবন কিছু অনাকাঙ্খিত কাজের জন্য আটকে যায়। এই সময়েই মীরের যেতে হবে! হিমা জানে এখন মীরকে কল দিলেও লাভ নেই। সে নিশ্চিত কম্পিউটার নিয়ে বসেছে! কানে হেডফোন লাগিয়ে আঁকিবুঁকিও শুরু করে দিয়েছে। হিমা ভেবে রেখেছে সে ঐ ছেলে আসলে একেবারে পায়ে পড়বে। হাতজোড় করে বলবে, ‘ সে এখন বিয়ে বসবে না।’পরে যা হবার হবে।
হিমা গোসল সেরে জামা পরিধান করে পরিপাটি হয়ে বসে থাকে। প্রায় বিশ মিনিট পর রিপ্তী চলে আসে। হিমা তাকে দেখে অবাক। সন্দিহান হয়ে প্রশ্ন করে,“ তুই কখন আসলি?”
“ আন্টি আমাকে ধরে বেঁধে নিয়ে এসেছে রে, হিমা! আমি কি করব? এতক্ষণ আন্টির এসিস্ট্যান্ট করে রেখেছিল।আমি কাজ করতে করতে শেষ দোস্ত!”

রিপ্তীর নেকামি কথা শুনে হিমা বিরক্ত হয়। রিপ্তীর হাত টেনে বিছানায় বসিয়ে বলে,“ আমার কি হবে রে, রিপ্তী?”

“ পছন্দ হলে আংটিবদল হবে, আর কি?”

রিপ্তীর হেয়ালি কথায় হিমা রেগে যায়।পিঠে দুরুম করে কিল বসিয়ে বলতে শুরু করে,“ তুই এতো হারামি কবে থেকে হলি রে, রিপ্তী? তুই আমার বন্ধু না শত্রু।”

রিপ্তী ভালোই ব্যাথা পেয়েছে। সে মিথ্যে কান্নার ভাব করে উত্তর দেয়,“ তুই আমাকে মা’র’লি! দেখিস তোর বর তোকে বিয়ের আগে থেকেই কষ্ট দিয়ে মা’র’বে।”
“ ঐ ছেলেকে আমি বিয়ে করলে তো!”

হিমা অনবরত মীরকে কল দিয়েই যাচ্ছে। মীর কল ধরছে না। সে রাগে ফোন বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে দেয়। এমন সময় আশা ঘরে প্রবেশ করে। হিমাকে দেখে মাশাআল্লাহ বলে কপালে চুমু একে দেয়। এরপর রিপ্তীর উদ্দেশ্যে বলে, “ ওকে নিচে নিয়ে যাও, মেহমানরা অপেক্ষা করছে।”

রিপ্তী হ্যাঁ বোধক মাথা নেড়ে হিমাকে ধরে ঘর থেকে নের হয়। আজ হিমা রোবটের ন্যায় হাঁটছে। তাকে যেদিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যা বলা হচ্ছে তাই করছে। হিমাকে সোফায় বসানো হয়। তার মাথা নিচু করা। পাঁচ থেকে ছয়জন লোক এসেছেন তাদের মধ্যে দুইজন মহিলা,একজন অল্প বয়সী মেয়ে আর দুইজন পুরুষ। হিমা সকলের পা দেখে বুঝে নেয়। সে নিজেকে প্রস্তুত করে কীভাবে এই আয়োজন আটকাবে। ভাবনার মাঝেই হিমা শুনতে পায় কিছু পরিচিত কণ্ঠ। যারা একে একে বলছেন,“
কি সুন্দর দেখাচ্ছে, আমাদের হিমাকে। একদম পরীর মতো।”
“ যা বলেছো, ভাইয়া। সেই ছোট্ট হিমা কতো বড়ো হয়ে গেছে!”
“ হিমা আপুকে তো বউবউ লাগছে।”

পরিচিত মানুষদের কণ্ঠ শুনে হিমা মাথা তুলে তাকায়। তার সামনে আফজাল হোসেন, হোসনেআরা, মারিয়া, রাদিফ বসে আছে। সকলের মুখে হাসি। সকলেই উৎসুক দৃষ্টিতে হিমাকে দেখছি। রাদিফ নিচে তাকিয়ে ফোন টিপছে সে যেন এই জগতে থেকেও নেই। মারিয়া এসে হিমাকে জড়িয়ে ধরে বলে,“ তেমাকে আপু ডাকবো, নাকি ভাবী? আমি তো খুব এক্সাইটেড তোমাকে বউরূপে দেখার জন্য।”

মারিয়ার কথা শেষ হতেই হোসনেআরা মুখ খুলে। সে আশাকে ডেকে বলে,“ তা জামাই বাবাজি কোথায়, আপা? সবাইকে হাতে পায়ে ধরে এনে সে কোথায় চলে গেছে?”

হিমার আজ চমকানোর দিন। সে একের পর এক চমক পাচ্ছে শুধু। রিপ্তী মাঝখানে এসে কথা ছুঁড়ে,“ মীর ভাইকে ডেকেছেন তো! সে না থাকলে আজকের আয়োজনটাই মাটি হয়ে যাবে।”

হিমা সকলের কথা শুনে কিছুটা আশার আলো দেখতে পেয়েছিল। সে ধারণা করেছিল, মীরের সাথেই হিমার বিয়ের কথা বলছে সবাই কিন্তু রিপ্তীর কথা শুনে মনটা আবারও ছটফটে হয়ে যায়। হিমার এখন কান্না করতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে করছে দৌঁড়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে। হিমার ভাবনার মাঝেই কলিং বেল বেজে উঠে।সকলেই নড়েচড়ে উঠে। মারিয়া গিয়ে দরজা খুলতেই কেউ একজন বলে,“ নতুন জামাই আসলে নাকি মিষ্টির ভান্ডার আনতে হয়। নাও এই দায়িত্বও পালন করলাম। এবার আমার বউকে আমার গলায় ঝুলিয়ে দাও তো দেখি!”

চলবে ইনশাআল্লাহ……….