আনমনে সন্ধ্যায় পর্ব-০৫

0
102

#আনমনে_সন্ধ্যায়
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ০৫

চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়াতে গিয়েও সাব্বির থেমে গেলো। একটু ভালো ভাবে খেয়াল করে নিঃশব্দে সাইডে রাখলো। বড় একটা শ্বাস ফেলে বইয়ে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করলো। কালকের একটা সাবজেক্ট, ক্লাসে নিবে। তাই একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া। গুছিয়ে, সুন্দর ভাবে পড়ানোর সুনাম তার আছে।

— চা রেখে দিলি কেন?

সাব্বির চোখ তুলে তাকালো। তার মা দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। তার আঁচলে ভাজা চাল। সেখান থেকেই সে একটু একটু মুখে দিচ্ছে। এই ভাজা চাল তার খুবই প্রিয়। বোয়াম ভরা থাকে। যখন ইচ্ছে খায়।

এর জন্য দাদির কাছে কতো বকা যে খেয়েছে হিসেব নেই। দাদির ধারনা ছিল। চাল ভাজা অলক্ষুণের লক্ষণ। চাল ভাজলে চাল যেমন শুকিয়ে এতোটুকু হয়ে যায়। তেমনি সংসারও শুকাতে থাকে। আয় বরকতও কমতে থাকে।

তবে দাদির কথা মা যেমন গনায় ধরে নি। তেমনি এই চাল ভাজাও ধরে নি। এই সংসারের আয় বরকত কমেনি বরং বলতে গেলে ভালোই বেড়েছে।
সাব্বির আবার বইয়ে চোখ রেখে বললো —- পরে খাব।

— সরবত খাবি আগেই বলতি। কষ্ট করে চা করতে গেলাম।

সাব্বির সে কথার ধারের কাছে গেলো না। কাপ ভালো করে পরিষ্কার করা হয়নি। এক কর্নারে ভিমবার শুকিয়ে আছে। সে বইয়ের দিকে তাকিয়েই বললো,

— তোমাকে কতোবার বলেছি মা। এভাবে কাপড়ে কিছু রেখে খাবে না। কতো জীবাণু থাকে তুমি জানো?

— আমার জানার দরকার নেই। তুই জানলেই চলবে। একটা মাত্র জীবন। জীবাণু আবার বাদ থাকবে কেন? টেষ্ট করে দেখি।

— ভালো! করো! আর একটা কথা মা, যার তার সামনে আমার নামে হাবিজাবি বলবে না।

— তো! হাবিজাবি করলে বলবো না? আর যার তার পেলি কোথায় ? রিমি কি বাইরের কেউ।

— দোষ দেখলে বলা দোষের না। আর দু- দিন কেউ বাসায় থাকলেই আপন হয় না ।

— তাহলে আমার বলাও দোষের না। আর শোন! তোদের মতো মনে প্যাচ নিয়ে আমি থাকি না। আপন পর সব নিজের কাছে। মনে করলেই আপন, না করলে সবাই পর।

সাব্বির হালকা হাসলো! তার মায়ের কাছে পুরো দুনিয়াই আপন। শুধু তার ছেলে ছাড়া।

— ভেতরে এসে বসো । দরজায় দাঁড়িয়ে আছো কেন?

— না দরকার নেই। পরে চাল পড়লে এক্ষুণি আবার ঝাড়ু লাগাতে বলবি। জ্বালা তো কম না। আরে হ্যাঁ! তুই নাকি রিমিকে দিয়ে আধা রাতে ঘর পরিষ্কার করিয়েছিস। কেন রে, মেয়েটা কি ভাববে?

— নিজে নোংরা করেছে, নিজেই পরিষ্কার করেছে। এতে মনে করার কিছু নেই। আর তার ভাবায় আমার কিছু আসবে যাবে না।

— সেটা কার ভাবায়ই আসে যায়? নাদু তো আমার সাথে গজগজ করছে। এত মানুষ থাকতে তুই দরজা খুলছিস বলে। আমি বলেছি তোকে দরজা খুলতে?

— বলতে হবে কেন? আমি জেগে থাকি তাই খুলি। এই মেয়ের জায়গায় অন্য কেউ হলেও খুলতাম। এটা নিয়ে গজগজ করার কি হলো?

— সেটাই! রিমি আর নিপা কি আলাদা নাকি বল? ছোট বোনের মতোই তো। নাদুর যতো আজগবি চিন্তা। আমিতো বলেই দিয়েছি। এতো চিন্তা হলে নিজে বসে থাকো বাপু।

সাব্বির খুকখুক করে হালকা কাশলো। কেন কাশলো সে নিজেও জানে না। রিমি বলতে গেলে তার কাছে অচেনা। বয়সে অনেক ছোট। চাচার বিয়ের সময় সে বলতে গেলে ভালোই বড়। চাচার সাথে প্রায়ই তার শুশুর বাড়ি যেতো। শ্যামলা, শুকনো একটা মেয়ে। মাটিতে হাত, পা মাখিয়ে খেলাধুলা করতো। ঠান্ডা লেগে থাকতো বারো মাস। নাক দিয়ে অনবরত প্যান পড়তো। সে প্যান হাতের উলটো পিঠ দিয়েই জামায় মুছতো। আবার সেই হাত দিয়ে এটা সেটা খেতো। আর এগুলো দেখে তার শরীর ঘিনঘিনিয়ে উঠতো। তাই সে কখনও এগিয়ে গিয়ে কথা বলেনি। আর এই মেয়েও আসেনি। তার দুনিয়া ভিন্ন ছিলো।

মেয়েদের শারীরিক পরির্বতন ছেলেদের চেয়ে অনেক দ্রুত হয়। এতো হয় তার জানা ছিলো না। সেই নাকে মুখে প্যান পড়া মেয়ে এখন তার সমান সমান। ভাবা যায়? প্রথম দিন দেখে সে চমকেই উঠেছিলো। অবশ্য তার চমকে যাওয়া রিমি খেয়াল করেনি। সে ঘুম আর ক্লান্তি নিয়েই ব্যস্ত ছিলো।

সাব্বির বই বন্ধ করলো। এখন আর মনোযোগ দেওয়া সম্ভব না। কোন এক গন্ডগল শুরু হয়েছে। কি সেটা সে ধরতে পারছে না।

রিমির সাথে তার তেমন পরিচয় কখনও ছিলো না । তবে ছোট ছোট কিছু খন্ডাংশ আছে। আচ্ছা, রিমির কি মনে আছে? থাকার কথা না। বয়সতো খুব একটা ছিলো না। কিন্তু লাস্ট বার। তখন তার বয়স কত? এগারো নাকি বারো। এমন ঘটনা কি কোন মেয়ের পক্ষে ভোলা সম্ভব?

মুহুয়া অবশ্য এতকিছু খেয়াল করলো না। সে নিজের মতোই বলে চলছে — ইশ! ছোট্ট একটা মেয়ে। কি সুন্দর চাকরি করছে। তাও আবার পুলিশের। পুলিশের ড্রেসটা পরে যখন টুকটুক করে হেঁটে যায়। কি সুন্দর লাগে দেখেছিস। আর আমার দুটো দেখো। একটা শ্বশুর বাড়ি মনই বসাতে পারে না। দু- দিন যেতে না যেতেই বাপের বাড়ি এসে হাজির। আরেকটা দিন ভরে সাজুগুজু আর মোবাইল। কপাল, সবই কপাল।

সাব্বির উঠলো! জালানা বন্ধ করা দরকার। দিনে রোদের কারণে গরম থাকলেও,সন্ধ্যার পরে পরে হালকা শীত পড়তে থাকে। তাই বাইরের বাতাসটা এখন গায়ে লাগছে।

সে জানালার কাছে এগিয়ে গেলো। দেখলো, রিমি বাড়ির গেইট দিয়ে ঢুকছে। আজকে এতো তাড়াতাড়ি! তার হাতে ঝালমুড়ি। সে আয়েশ করে তা মুখে দিচ্ছে।

এতো সুখ যে এই মেয়ের আসে কোথা থেকে কে জানে? যখনি দেখে বিন্দাস। যেন কোন কিছুকেই পরোয়া করে না। অবশ্যই পরোয়া না করাই ভালো। করে না বলেই হয়তো মেয়েটা সব ভুলতে পেরেছে। সেই বয়সের এমন স্মৃতি ভোলা কোন মেয়ের পক্ষে চাট্টিখানি কথা না।

সে জানালা বন্ধ করে আবার খাটে এসে বসলো।

— বিয়ে করবি সাব্বির?

সাব্বির মনে মনে হাসলো! এবার বুঝলো মার এখানে আসা। ম্যাডামের কথা তাহলে মার মাথায় ভালোভাবেই ঢুকেছে।

সে হেসেই বললো,– তুমি তো আমার ব্যাপারে হাত ধুয়ে ফেলেছিলে। এখন আবার জিজ্ঞেস করছো কেন?

— হাত ধুলে কি আবার হাত দেওয়া যায় না?

— অবশ্যই যায়। মা তুমি আমার। হাজার বার ধুবে হাজার বার দেবে।

মুহুয়াও হাসলো!
— আমি কিন্তু সত্যি সত্যিই বলছি।

— আমিও।

— পরে আবার বিপদে ফেলবি নাতো?

— আমি কখনও কাউকেই বিপদে ফেলি না মা।

মুহুয়া দুই ভ্রু উঁচু করে ছেলের দিকে তাকালো। সবচেয়ে বড় বিপদে তো তাদের’ই ফেলে রেখেছে। চাঁদের টুকরার মতো একটা মাত্র ছেলে। মনের মতো বউ আনবে। নাতি, নাতনী নিয়ে খেলবে। তা না, এই ছেলের বিয়ের কথা চিন্তা করলেই তার অস্থির লাগা শুরু হয়। চাকরি হওয়ার পরে বিয়ের জন্য বাড়ির সবাই তোড়জোড় শুরু করলো। করবেই না কেন? বাড়ির প্রথম ছেলে বলে কথা।

এক মেয়ে সে নিজেই পছন্দ করলো। কি গুটুরগু হলো কে জানে। সেটা ভাগলো! আরেক টাকে বাড়ির সবাই পছন্দ করলো। সবই ঠিক, দেখা করতে গিয়ে এই ছেলে গেঞ্জাম লাগিয়ে এলো। মেয়ের হাতে নাকি ইয়া বড় বড় নখ।

আরে বাবা, মেয়েরা বড় বড় নখ রাখবে নাতো কে রাখবে। এই ছেলে কি বলেছে কে জানে। মেয়ে বাসায় গিয়ে ডাইরেক্ট না। এখন আবার কি করবে কে জানে?

মুহুয়া আর দাঁড়ালো না। সাব্বিরের বাবার আসার সময় হয়েছে। সে চলে গেলো। যেতে যেতে বললো, — একদম চা ফেলবি না সাব্বির। যদি ফেলেছিস, আমি আর তোকে জীবনেও চা বানিয়ে দেবো না।

সাব্বির আবারো হাসলো। হেসে বইয়ে আবার মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও কেন জানি আর সে মনোযোগ দিতেই পারলো না।

রিমি ফ্রেশ হয়ে নিচে নামলো। এই সময় এই বাসায় থাকা তার প্রথম। এক সাথে এখনো হওয়া হয়নি।

সে ডাইনিং টেবিলের সামনে এসে চেয়ার টেনে বসলো। প্রায় সবাই এখন খাবার টেবিলে। অবশ্য নাদু মামা এখনো বসেনি। সে হাত পা ছড়িয়ে সোফায় বসা। ধ্যান জ্ঞান সব টিভিতে। একমনে নিউজ দেখছে। রাতের খাবারও মনে হচ্ছে সেখানেই খাবে। দুনিয়ায় সবচেয়ে সুখী মানুষ। এর সুখ দেখে রিমির হিংসে,ই হয়।

সে বসেছে নিপার পাশে । মেয়েটা তার সমবয়সী। সময়ের অভাবে এখনো তেমন ভাবে ভাব হয়ে উঠে নি। তবে মেয়েটা ভালো। কিছু কিছু মানুষ আছে না, দেখলেই মাই ডিয়ার টাইপ মনে হয়। নিপাও তাই। মায়ের কিছুটা দিক সে পেয়েছে। তাইতো সে বসতেই তার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলো।

মুহুয়া আন্টি, খালামণি সবাইকে এটা সেটা এগিয়ে দিচ্ছে। সে বসতে খালামণি তাকেও দিলো। তার ভ্রু কুঁচকে আছে। সে হান্ড্রেড পার্সেন্ট গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারে এই ভ্রুর অত্যাচার একমাত্র তার জন্যই।

তার ভ্রু আবার কেমন জানি চ্যাপটা পদের। কুঁচকাতে চাইলেও কুঁচকে না। বরং পুরো মুখ কুঁচকে যায়। তখন তাকে দেখতে লাগে পেঁচার মতো। এমনিতেই কালো তার মধ্যে আবার পেঁচামুখী হলে তো সমস্যা। তা না হলে সে দেখিয়ে দিতো কুঁচকানি কাকে বলে।

সে ভ্রু কুঁচকাতে না পারলেও মুখ ফেরালো। কি দরকার দেখার। তখনি সাব্বির আসলো। কিছুক্ষণ দাড়ালো। তার পর চুপচাপ তার বিপরীত সাইডে একটা চেয়ার টেনে বসলো।

কেন দাঁড়ালো রিমি বুঝতে পারলো না। তার আরেক পাশে মোটকা বাঁদর বসা। তাকে ইশারায় জিজ্ঞেস করলো, ব্যাপার কি?

আয়াশ অবশ্য ইশারার ধারের কাছে গেলো না। সে নেচে নেচে গলা ফাটিয়ে বললো, — তুমি ভাইয়ার চেয়ারে বসেছো। তার সব জিনিস আবার সিলগালা। চেয়ার, প্লেট, গ্লাস। এমনকি সে নিজেও। সেই সিলগালা জিনিস তুমি দখল করেছো।

সাব্বির বিরক্তি নিয়ে আয়াশের দিকে তাকালো। আয়েশা বাদে বাকি সবাই হাসলো।

রিমি ফট করে দাঁড়িয়ে গেলো। সে বুঝতে পারছে না। সেই প্রথম থেকে এই লোকের সাথে এতো ঠুকাঠুকি হচ্ছে কেন? সে অপমান করেছিলো। রিমি শার্ট নষ্ট করেছে। ব্যস শোধবোধ! এই বাসায় জার্নি তার অনেক দিনের। অনন্ত অন্য জায়গায় বদলি না হওয়া পর্যন্ত। তাই সে আর কোন রকম ঝামেলায় যেতে চায় না। তবুও না চাইতেও কেমন জানি লেগেই যাচ্ছে। ধুর…

রেজাউল হেসেই বললো, —- বসে পড়ো রিমি। সাব্বির বসে ঠিক আছে। তবে এমন না বসতেই হবে।

রিমি তবুও বসতে ইচ্ছা করলো না। সে বসবে, এই লোক নির্ঘাৎ মনে মনে তার গুষ্টি উদ্ধার করবে। এই ডাইনিং টেবিল পুরোনো আমলের। বিশাল বড়। কি দরকার নিজের গুষ্টি এমন উদ্ধার করার। সে সরে বসতে চাইলো। নিপা হাত ধরে টেনে বসালো। বসিয়ে হেসে ফিসফিস করে বললো, “বসো তো, জীবন অতিষ্ঠ করে রেখেছে, এবার সেও একটু হোক। ”

রিমি বসলো। আড়চোখে সাব্বিরের দিকে তাকালো। তার মধ্যে অবশ্য অতিষ্ঠ হওয়ার তেমন কোন লক্ষণ দেখা গেলো না। সে নিজের মতো খাচ্ছে। সুন্দর, গুছিয়ে, পরিপাটি ভাবে। বসেছেও কেমন রাজকীয় ভাবে। ইশ! খাবার খাওয়াও যেন একটা আর্ট। আর এই আর্টের চক্করে রিমি খাওয়ার ইচ্ছাই মরে গেলো। সে নিজ খেলো কম, বসে বসে আড়চোখে দ্যা মোষ্ট হ্যান্ডসাম বয়ের খাওয়াই দেখলো বেশি। আর মনে মনে বললো, — রিমি তুই তো শেষ, খতম, ফিনিস।

চলবে……