আনমনে সন্ধ্যায় পর্ব-০৭

0
80

#আনমনে_সন্ধ্যায়
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ০৭

সারা বেলা রিমি ঘুমিয়ে পাড় করলো। তার ঘুম ভাঙলো সন্ধ্যারও পরে। খালামণির ডাকে।
সে চোখ খুলেই তার খালামণির মুখটা দেখলো। স্নিগ্ধ, সুন্দর কোমল একটা মুখ। দেখলে যে কোন মানুষের মন ভালো হয়ে যাবে। রিমিরও গেলো। তার মনে হলো এর চেয়ে সুন্দর সন্ধ্যা আর কখনো হতেই পারে না।

সে উঠে বসলো। এখন ব্যথা না থাকলেও,কপাল ফুলে আছে। এমনিই বারোটা বাজানো চেহেরা তার মধ্যে আবার এই আলু। আয়নার সামনে যেতে তার ভয়ই লাগছে।

আয়েশা নিঃশব্দে তার ফোন বাড়িয়ে দিলো । আজকে অবশ্য তার চোখ মুখ কুঁচকে নেই। তবে নির্বিকার।

রিমি স্বাভাবিক ভাবেই তার ফোন নিলো। তার সুন্দর কোমল সন্ধ্যার, যে তার চেহেরার মতোই এখন বারোটা বাজবে ঠিক বুঝলো। তার মোবাইল নষ্ট। ঠিক করাতে হবে। তাকে না পেয়েই হয়তো খালামণিকে করেছে। তা না হলে এই মা মেয়ের ভারত, পাকিস্তানের মতো মধুর সম্পর্ক।

রিমি ফোন নিতেই আয়েশা চলে গেলো। সেই চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়েই রিমি হ্যালো বললো। হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে বুলেটের গুলির মতো কেউ বললো,

— ঐ চ্যাংড়ি কোন চ্যাংড়ার সাথে তুই নাকি ধাক্কা খায়া চিৎ পটাৎ হইছো। এখন মাথায় এত্তোবড় আলু নিয়া ঘুরতাছোছ?

রিমি দীর্ঘশ্বাস ফেললো! নিশ্চয়ই তার খালামণি লাগিয়েছে। এই চাকরি করা তার পছন্দ না। পদে পদে কাটাতো ফেলবেই।

— আলু দাম বেশি তো নানু । তাই ভাবলাম নিজেই একটু উৎপাদন করতে পারি কি না দেখি।

— আমার সাথে বেশি ফ্যাদলা পারবি না বলে দিলাম রিমি। উৎপাদন করার জন্য আর জায়গা পাও নাই। চ্যাংড়ার সাথে গেছো। এই জন্যই যাইতে দিতে চাই নাই। বদের হাড্ডি তুই। তোর চাকরির আমি খেতা পুড়ি। তুই এখনি আজ বাড়ি আসবি।

রিমি শুনলো! তার মধ্যে তেমন পরিবর্তন হলো। কখনো হয়ও না। সে তার মতো করেই বললো — আমি আর জীবনেও তোমাদের বাড়ি যাচ্ছি না নানু। এখান থেকেই আমি উড়াল দেবো দেখো। ফুরুৎ… তাই প্রেশার একটু কম নাও। এই বয়সে এতো লোড কুলাতে পারবে না।

রিমির নানু আগুর ঝরা কন্ঠে বললো — খবরদার রিমি। এখন থেকে গেছোস ঘুরে ফিরে এখানেই আসবি। তোর বিয়া আশিকের সাথেই হইবো। এইডা আমার শেষ কথা।

— তোমার শেষ হোক আর শুরুর কথা হোক। কারো কোন ডিসিশন আমার ঘাড়ে ফেলার চেষ্টা করবে না, একদম না।

— এই দিন দেখার জন্যই তোরে খাওয়া পাড়াইয়া বড় করেছিলাম?

— করেছো কেন? আমি বলেছি করার জন্য?

— রিমি মেজাজ গরম করবি না।

— সেটা তোমাদের সব সময়ই থাকে। বংশগত সমস্যা। তাই নতুন করে আমি আর কি করবো?

রিমির নানু চেঁচাতে লাগলেন। আমারে বংশ দেহাছ। দেখাবিই তো, পাখনা গছাইছেনা। তুই কোন জমিদারের বংশের?

রিমি আস্তে করে ফোন কেটে দিলো। দিয়ে হাই তুললো! এক কাপ গরম চা হলে মন্দ হতো না। সে উঠলো! রুম থেকে বের হতেই সে আঁতকে উঠলো। মৃদু চিৎকার দিয়ে বললো, — আল্লাহ!

নিপা হেসে ফেললো! হেসে বললো, —- তুমি কি বলতো? দিন দুপুরে আছাড় খেয়ে কপাল ফুলিয়ে আসছো, এখন আবার ঘরের মধ্যে ভয়ে হুটোপুটি খাচ্ছো। তোমাকে পুলিশের চাকরি কে দিয়েছে বলোতো। ভীতুর ডিম।

— পুলিশের চাকরি করি বলে কি ভয় টয় পাবো না নাকি। আর মুখে এগুলো কি?

— কি আবার ফেসপ্যাক।

রিমি আরেকটু এগুলো। একটু ঝুকে ভালো করে দেখে বললো, — ফেসপ্যাক নাকি? আমিতো ভাবলাম অন্য কিছু। নানুর কাছে গল্প শুনতাম। বাথরুমের টাঙ্কিতে নাকি হাবিজাবি থাকে। মাঝে মাঝে তারা বের হয়। তখন তাদের গা ভর্তি নাকি….

— আল্লাহ! চুপ, চুপ, চুপ। কি বলো? হারবাল তাই এমন লাগছে। নিপা চোখ মুখ কুঁচকে বললো।

— ভাগ্যিস তুমি বলেছো। আমি সত্যিই সে রকম কিছু ভেবেছিলাম। এমনিতেই তোমাদের বাড়ির যে অবস্থা। থাকা স্বাভাবিক। কতো বছরের পুরোনো টাঙ্কি কে জানে।

— বাড়ি পুরোনো থাকলেও বাথরুম, টাঙ্কি সব নতুন। আগে সব বাইরে ছিলে। পরে এগুলো ভেতরে করা হয়েছে বুঝেছো?

— বুঝলাম! তবে যাই বলো। দেখতে একেবারে টাটকা সেইরকম।

নিপা চোখ, মুখ করুণ করলো । তার গা ঘিনঘিন করছে। ইশ! সে আর জীবনেও এটা দেবে না।

তখনি সাব্বির তার রুম থেকে বের হলো। নিপা আর ডানে বামে দেখলো না। দিলো ভোঁ দৌড়। রিমিই যেখানে আঁতকে উঠেছে, ভাইয়া দেখলে আছাড় মারবে।

সাব্বির নিপাকে দেখলো। তবে পেছন থেকে। এভাবে দৌড়ে গেলো কেন, বুঝতে পারলো না। সে রিমির দিকে তাকালো। কপালের সাথে চোখ মুখও ফুলে আছে। ঘুম থেকে উঠে এসেছে বোধহয়। হাত, মুখও ধয় নি এই মেয়ে । এমনিই টিনটিন করে ঘুরছে।

সে এগিয়ে এলো, স্বাভাবিক ভাবে বললো,
— নিপা এভাবে দৌড়ে গেলো কেন?

রিমিও তার চেয়ে স্বাভাবিক ভাবে বললো — আমি কি জানি?

— এখানে তো তুমিই ছিলে।

— তো?

— তো মানে কি?

— আমি কি জানি?

— ইয়ার্কি করছো?

— হ্যাঁ।

— জানতে পারি কেন?

— এমনিই। দুনিয়ায় সব কিছুতে কারণ থাকতে হবে এমন কোন কথা আছে?

— আছে! কারণ ছাড়া এই পৃথিবীতে কিছুই হয় না। এমনকি ইয়ার্কিও না।

— কি জানি? আমি মুখ্য সুখ্য ছোট খাটো মানুষ। এতো ভারী ভারী কথার, ভারী ভারী অর্থ আমার জানা নেই।

— আচ্ছা?

— হ্যাঁ।

— ভালো! আমি করলে সহ্য করতে পারবে তো ?

রিমি ভ্রু উঁচিয়ে তাকালো, তাকিয়ে বললো — কি?

— ইয়ার্কি। বলেই সাব্বির আর দাঁড়ালো না। টাউজারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেলো।

রিমি তাকিয়ে তার যাওয়া দেখলো। মুখ বাঁকিয়ে মনে মনে বললো,” ভাব ছাড়া চলতে পারে না এক সেকেন্ড। সে আবার করবে ইয়ার্কি। হুহ্! ”

রিমি তার মোবাইল নিয়ে খাটে বসলো। মোবাইল ঠিক হয়েছে। তবে স্কিন ফাটা। মোবাইলটা ঠিক করে দিয়েছে নাদু মামা। একবার ভেবেছিলো রুমেল ভাইয়ের কাছে আবার দেবে। পরে ভাবলো থাক। বার বার দেওয়াটা ভালো দেখায় না । তাছাড়া রুমেল ভাইয়ের অতিরিক্ত কনর্সান তার ভালো লাগছে না।

একটা মেয়ের যতো স্বল্প জ্ঞানই থাক, ছেলেদের হাবভাব সহজেই ধরতে পারে। তাই বলেছিলো নিপাকে। নিপা আর সে বেরুতে যাবে তখনি পড়লো নাদু মামার সামনে।

সে তো দু- জন বেরোতে দেখে এমন ভাবে চাইলো। যেন দুনিয়ার পাপ টাপ করে ফেলেছি। সেই পাপ মোচনের দায়িত্ব ঘাড়ে নিয়ে সে ধমকে বললো, —- বাসার লোকেরা কি মরে গেছে? যে নাচতে নাচতে বের হতে হবে।

আর আমার দিকে তাকিয়ে কঠিন চোখে বললো, — নিজেতো পাখনা লাগাইছোই, এখন আবার আমার ভাগ্নিরও লাগাইতে চাও। দাও, মোবাইল দাও। দ্বিতীয় বার যেন দেখিনা কারণ ছাড়া ঘর থেকে বের হইতে। যাও ভেতরে যাও।

নিপা মুখ ভার করে তাকে টেনে ভিতরে নিয়ে আসলো। এসে বললো, — তুমি কিছু মনে করোনা। মামা একটু এমনিই।

রিমি হাসলো! সে ছোট থেকে বড় হয়েছে ভেসে ভেসে। নিজের ঘর নেই, বাড়ি নেই। এমনকি বাবা, মাও নেই। নানা -নানুর , তার তিন ছেলে আর তাদের বউ বাচ্চা নিয়ে বিশাল সংসার। কে কার দিকে আলাদা ভাবে খেয়াল রাখবে। তার জীবন ছিলো বাঁধন ছাড়া, শাসন ছাড়া। ইচ্ছে হলে স্কুলে গেছে না হলে নেই। ইচ্ছে হলে গোসল করেছে, না হলে নেই। ইচ্ছে হলে আনাড়ী হাতে মাথা সুন্দর দুটো বেনি তুলেছে, না হলে দু- তিন দিনও চলে যেতো। আর সেই কাকের বাসা নিয়ে’ই সে দিব্যি ঘুরে বেড়াতো। খিদে পেলে বললে খাবার। না বললে দেখা যেতো সারা দিনই না খাওয়া ।

সেখানে শাসন তার জন্য দুর্লভ বস্তুই। শুধু কি শাসন? একটু ভালোবাসা, একটু স্নেহ। একটা নিজের মানুষ। এই পৃথিবীতে সে একা। একদম একা। এই যে আশে পাশে এতো মানুষ। অথচো তার নিজের বলতে কেউ নেই। একটা মানুষও নেই।

রিমি বড় একটা শ্বাস ফেললো! ফেলে কাগজাটা বের করলো। সবই ঠিক হলো। এবার পার্সটার ব্যাপারে একটু খোঁজ খবর নেওয়া যাক।

সে নাম্বার তুলে ডায়াল করলো। রিং বাজতে বাজতে একেবারে শেষ সময়ে এসে রিসিভ হলো। সে হ্যালো বলার আগেই ঐ পাশ থেকে উচ্ছাসিত কন্ঠে কেউ বললো, — কেমন আছেন রিমি?

রিমি অবাক হলো না। নির্বিকার ভাবে বললো, — যতোদূর মনে পরে আমি আমার নাম বলিনি মিষ্টার…..

— ওলীদ, ওলীদ আশফাক।

— হ্যাঁ! মিষ্টার আশফাক।

— উঁহু ওলীদ।

রিমি ভ্রু কুঁচকে চাইলো। তবে কিছুই বললো না। বললো সে’ই।

— সেই দিন আমি আপনার পার্স দেওয়ার জন্য আপনার পেছনে গিয়েছিলাম। তখনিতো এক্সিডেন্ট টা হলো। ভিড়ের মধ্যে আমিও ছিলাম। তখনি জানতে পারলাম। আপনার নাম, কি করেন। বিলিভ মি ঐ মটু লোকটার মতো আমিও চমকে গিয়েছিলাম।

রিমি আগের মতোই বললো — কেন?

— এতো পিচ্ছি একটা মেয়ে। আমিতো ভেবেছিলাম কলেজ টলেজ ফাকি দিয়ে বয়ফ্রেন্ড এর সাথে হয়তো দেখা করতে এসেছে।

— তখন এগিয়ে এসে পার্সটা দিলেইতো ঝামেলা চুকে যেতো।

— হয়তো আমি চাইনি চুকে যাক।

— কেন?

— আপনার এখনো লাটে টেষ্ট করা বাকি রিমি।

— সেটা কি খুব প্রয়োজন?

— আমি জানি না। তবে মানুষ নিজের পছন্দের জিনিস কিছু কিছু মানুষকে দেখাতে চায়, তাই হয়তো আমিও চাইছি।

রিমি হেঁটে জানালার সামনে দাঁড়ালো। এই বাড়ির প্রত্যেক রুমে বিশাল বিশাল দু – সাইডে দুটো করে জানালা। তার রুমে একটা ওয়্যারড্রোবে আটকে গেছে। আরেকটা বেডের পাশে। ইচ্ছে হলেই শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখা যায়। সে অবশ্য আকাশের দিকে তাকালো না। সে তাকালো নিচে। ব্যস্ত শহরে, ব্যস্ত মানুষ দৌড়ে চলছে। আকাশ তাকে কখনো টানে না। টানে মানুষ। আকাশকে তার নিজের মতোই নিঃসঙ্গ মনে হয়।

সে মোবাইল কানে রেখেই রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলো। তাকিয়ে বললো, —- কিছু কিছু জিনিস আমার একদম অপছন্দ, তার মধ্যে এই কফিও।

ওলীদ হাসলো! হেসে বললো, —- ভালোতো! সবাই কে সব জিনিস পছন্দ করতেও নেই । কিছু কিছু জিনিস অপছন্দের তালিকায় রাখতে হয়। যখন কোন প্রিয় মানুষ অভিমান করবে। চোখ মুখ কুঁচকে তার জন্য সেই কাজ গুলো করে ফেলবেন। দেখবেন অভিমান জিনিসটাই নেই। করতে করতে হয়তো এক সময় দেখবেন সেগুলোই আপনার ভালোলাগছে। প্রিয় মানুষেরা প্রিয় মানুষকে এভাবেই বদলায় রিমি।

রিমি ঠোঁট টিপে হাসলো। হেসে বললো, — জোর করে কখনো কোন জিনিস প্রিয় হয়না মিষ্টার ওলীদ। সেটা হয় অভ্যাস। সেটা ইচ্ছে হলেই বদলানো যায়। এজন্যই হয়তো প্রিয় মানুষগুলো চেহেরা বার বার বদলায়। বাই দ্যা ওয়ে, বলতেই হচ্ছে আপনার ফ্লাটিং স্কিল খুব ভালো।

ওলীদ হো হো করে হাসলো! হেসে বললো, — আপনার জন্যই হয়তো এতোটা ভালো করলাম। তা না হলে এই ভালো খেতাব তো ভালোই, এই সাহসটা’ই এখন পর্যন্ত করে উঠতে পারিনি।

চলবে……..