আনমনে সন্ধ্যায় পর্ব-০৮

0
79

#আনমনে_সন্ধ্যায়
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ০৮

রিমি রেডি হয়ে গেইটের সামনে দাঁড়ালো। এখানে খুব একটা রিকশা পাওয়া যায় না, হেঁটে একটু সামনে এগুলেই মোড়। সেখানেই দুনিয়ার রিকশা । তবে তার হাঁটতে ইচ্ছে করলো না। সে দাঁড়িয়েই রইলো। যদি ভাগ্য ভালো হয় পেলে পেতেও পারে।

তখনি সাব্বির বেরোলো। গায়ে টিশার্ট, টাওজার। আজ শক্রবার। ভার্সিটিতো নেই। তো এই বান্দা যাচ্ছে কোথায়?

জাহান্নামে যাক, তার কি? রিমি আর তাকালো না। এ যেমন ঘর থেকে বের হলেই তাকে আর চেনে না। সেও চিনবে না । দরকার আছে চেনার। সে আগের মতোই দাঁড়িয়ে রইলো।

সাব্বিরও নিজের মতোই চলে গেলো। রিমির মনটা একটু খারাপ হলো। সে যে এখানে দাঁড়ানো এই লোক মনে হয় দেখেও নি। কিসের এতো অহংকার মিষ্টার সাব্বির আল মাহমুদ। রুপ, গুণ নাকি ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ডের। যে দেখলে সামান্য মিনিমাম কার্টেসিও করা যায় না ।

তখনি তার সামনে একটা রিকশা এসে থামলো। রিমি অবাক হয়ে তাকালো।

রিকশাওয়ালা তার বএিশ পাটি বের করে বললো,
— আপা আসেন।

— আসেন মানে?

— আসেন মানে আবার কি! যাইবেন না?

— আপনাকে ডেকেছি আমি?

— ওই ভাইজানই তো আপরার জন্য পাঠাইলো।

— কোন ভাইজান? কেউ বললো আর ওমনিই নেচে নেচে চলে আসতে হবে। চেনেন তাকে আপনি?

রিকশাওয়ালা আহম্মকের মতো তাকালো। কোন ঝামেলায় আবার পড়লো সে?

রিমি ঠোঁট টিপে হাসলো! হেসে উঠে বসলো। বসতে বসতে বললো, — যার জন্য পাঠিয়েছে সে আর যাই হোক আমি না। রং নাম্বার, তবে এসেছেন যখন চলেন।

রিকশাওয়ালা আর মাথা ঘামালো না। তার রং নাম্বার হয়নি সে জানে। দশ বছরের উপরে রিকশা চালায়। ছেলে মেয়েদের এই রাগে অনুরাগের রং নাম্বার তার ভালো করেই জানা। আর ভাইজান ভালো করে বলেছে, পুলিশের ড্রেস পরা লম্বা মাইয়া। আশে পাশে এরকম আরো কয়েকজন আছে নাকি। সে আপন মনেই এগুলো । অবশ্য ভয় একটু পেয়েছিলো। মইয়া মানুষ মানেই বিপদ। তাও আবার পুলিশ। এ তো মহাবিপদ।

রিমি রিকশায় যেতে যেতে আবার সাব্বিরের সাথে দেখা হলো। সে মোড়ে একদল ছেলেদের সাথে দাঁড়িয়ে আছে । সবাই তার সমবয়সী। বন্ধু – বান্ধব হয়তো। তার মধ্যে সেই দিনকার মটুও আছে। সাব্বির অবশ্য আর তাঁকায়নি। তবে মটু হা করে তাকিয়ে আছে। সে সম্ভবতো এখানে তাকে আশা করেনি।

রিমি হেসে ফেললো, খিলখিলানো হাসি। নায়ক নায়িকারা ধাক্কা খায় নায়কের সাথে। তার কপালতো আবার সোনা দিয়ে বাঁধানো। তাই সে খেয়েছে এক পেটমোটা তরমুজের সাথে।

রিমি হাসতে হাসতেই সোজা হয়ে বসলো। সে খেয়ালও করে নি, সাব্বিরা সেলুনের দোকানের সামনে দাঁড়ানো। তার খিলখিলানো হাসির দিকে আরেকজনও তাকিয়ে আছে। তবে আরশিতে! আর সেই হাসি দেখে তার ঠোঁটের কোণেও হাসি।

— ঐ কেসটার কি খবর ম্যাডাম?

মিথিলা ভ্রু কুঁচকে বললো,—- কোন কেস?

— ঐ যে বাথরুমের।

— ও! ওটা তো শামীম স্যার হ্যান্ডেল করছে। তুমি তো নতুন তাই জানো না। শামীম স্যারের সব কাজ হচ্ছে পেটে পেটে। এমন ভাবে থাকে যেন কিছুই করছে না। পরে ফট করে একেবারে গলা চেপে ধরে। কেন বলতো?

— এমনিই। শামীম স্যার কি এসেছে?

— না! তিনি আবার আরাম প্রিয় মানুষ। বারোটার আগে তার চেহেরা দেখবে না। তার মধ্যে আজকে আবার রাতে হোটেলে রেড মারতে যাবে।

— শামীম স্যার?

— আরে না। শামীম স্যার যাবে কেন? যাবে তো কামরুল স্যার।

— তো?

— তো আবার কি?

রিমি কনফিউজড হয়ে তাকিয়ে রইলো। বলে কি?

মিথিলা হাসলো! এই মেয়েটা তার খুবই পছন্দ। যা বলা হয় মন দিয়ে করার চেষ্টা করে। সরল ভাবটা এখনো যাইনি। অবশ্য এই সরল ভাব বেশিদিন থাকবে না। এমন এক লাইনে এসেছে। এখনে সরল বলে কোন কিছু নেই।

— রিমি…

— জ্বি ম্যাডাম।

— আজকে রাতে আর কোন কাজে টাজে যেও না। যতো তাড়াতাড়ি পারো বাসায় চলে যেও।

— কেন ম্যাডাম! কোন সমস্যা?

— না কোন সমস্যা নেই।

রিমি চোখ তুলে তাঁকালো! সে বুঝতে পারছে না।

মিথিলা আবারো হাসলো! তবে এবার হাসিটা অন্যরকম। সে সেই অন্যরকম হাসি নিয়েই বললো,
— সব কাজের মধ্যে ভালো মন্দ আছে রিমি। তবে আমরা যে পেশায় আছি। সেখানে ভালো বলে কোন শব্দ নেই। আছে দুটো শব্দ। খারাপ আর বেশি খারাপ। যাদের সাথে কাজ করো তাদের অন্য একটা রুপ আছে। সেই রুপ যতো কম জানবে ততো শান্তিতে কাজ করতে পারবে।

রিমি তাকিয়েই রইলো! সে বোঝার চেষ্টা করছে। হোটেলের রেড! হোটেলের রেড মানেই মেয়ে। তারা সারা রাত থানায় থাকবে।

রিমি আর ভাবতে পারলো না । সে একপলকে মিথিলার দিকে তাকিয়ে রইলো।

মিথিরা নির্বিকার। নির্বিকার ভাবেই ফাইলের দিকে চোখ রেখে বললো, — পানি খেয়ে আসো রিমি। এতো শক হওয়ার কিছু নেই। হোটেল থেকে ভালো মেয়েরা বের হয় না। আর না এখানে কেউ সাধুপুরুষ। যাও মাথা ঠান্ডা করো।

রিমি উঠলো! একটু এগুতেই রুমেলের সাথে দেখা। সে চিন্তিত ভাবে বললো, — কি হয়েছে রিমি, মুখ এমন দেখাচ্ছে কেন? আবার অসুস্থ হয়েছো নাকি?

রিমি জোর করে হালকা হাসার চেষ্টা করলো!
— তেমন কিছু না।

— আরে কি তেমন কিছু না। চোখ, মুখতো শুকিয়ে এতোটুকু হয়ে আছে। ব্যাপার কি?

রিমি তাকিয়ে রইলো! কিছু বললো না। পুরুষ! শব্দ একটা হলেও তার চেহেরা ভিন্ন ভিন্ন। কাল ভেদে আস্থা হয়, ভরসা হয়, ভালোবাসাও হয় আবার কখনো কখনো জানোয়ার ও হয়।

রিমি থানা থেকে বের হলো নয়টার একটু পরে। শামীম স্যারের সাথে তার একটু কথা ছিলো। সে দুপুরেও আসেনি। এসেছে বিকেলের পরে। হয়তো কাজ ছিলো।

সে বের হয়ে রিকশা নিলো না। আস্তে আস্তে হাঁটলো। রাতের ব্যস্ত রাস্তায় হাঁটতে তার ভালো লাগছে। কোন তাড়াতো নেই। বাসায় যেয়ে মটকা মেরে পরেই থাকতে হবে। তবে পুলিশের ড্রেসটা গায়ে না থাকলে ভালো হতো। পুলিশের ড্রেসের জন্য লোকে একবার হলেও তাকাচ্ছে।

সে অনেকটা পথই হাঁটলো। কোন পথে এসেছে সে খেয়াল করেনি। এখন করলো। সেই ভার্সিটির এলাকা। একটু সামনে এগুলেই তার খালুদের শোরুম। সে এগিয়ে গেলো।

তাকে দেখে ওবাইদুল, রেজাউল দুই ভাই ই হাসলো। মন থেকে প্রাণ খোলা হাসি। এই হাসির মধ্যে কোন ভাণ নেই।

খালু হেসেই বললো, — ভাই দোকানে রেড পড়লো নাকি? পুলিশ টুলিশ এসে হাজির।

ওবাইদুলও হেসে বললো —- সমস্যা নেই রে ভাই। ঘরের পুলিশ। উপর নিচ করে সেট করে ফেলবো। কি বলো রিমি?

রিমি হেসে ফেললো! প্রাণ খোলা হাসি। এতোক্ষণ মনে যে গুমোট ভাব ছিলো। তা নিমিষেই কেটে গেলো।

সাব্বির, নিপা, আয়াশ সিএনজি থেকে নামলো। তিনজন এক রিকশায় আসা সম্ভব না। আলাদা রিকশা নেবে এতো রাতে সাব্বিরে মন সায়ও দিলো না। তাই সিএনজিতে আসা।

সাব্বির ভাড়া দিতে দিতেই দু- জন দৌড়ে গেলো। সাব্বির হালকা হাসলো। কিছুক্ষণ আগে তার কাছে বাবার ফোন আসলো। নিপা আর আয়াশকে নিয়ে শোরুমে আসতে।

কেন অবশ্য সে জানে। এটা নতুন না। এই দু- বাঁদর বাইরের খাবারের পাগল। প্রায়ই এমন খাওয়া, দাওয়া হয়। সে অবশ্য এই সবের মধ্যে নেই। তার দায়িত্ব শোরুম পর্যন্তই।

সে দরজা ঢেলে ভেতরে আসলো। এসে অবাক হলো। রিমি বসে আছে। হেসে হেসে বাবা, চাচার সাথে কথা বলছে। এই মেয়ে সত্যিই চাকরি করছে তো নাকি? যখন তখন এখানে ওখানে।

সাব্বির তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। রিমি ফিরে তাকালো। তাকিয়ে হালকা হাসলো।

সাব্বির থমকে গেলো। কোন এক কারণে সেই প্রথম থেতে তারা দু- জনেই কেন জানি স্বাভাবিক হতে পারছে না। অথচো অস্বাভাবিক হওয়ার কিছু নেই। এই প্রথম রিমি তার দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভাবে হাসলো। সে পারছে না কেন?

ওবাইদুল সাব্বিরের দিকে তাকিয়ে বললো, —- আমরা বিরিয়ানি খেতে যাচ্ছি। তুই যাবি?

সাব্বির কিছু বলবে তার আগেই আয়াশ বললো, —- তুমিও না চাচ্চু। ভাইয়া বাইরের খাবার খায় নাকি। সে খাবে পিওর মায়ের হাতের রান্না। তাইনা ভাইয়া?

সাব্বির আয়াশের মাথায় থাপ্পড় মারলো। বাকি সবাই হাসলো। আর সবাইকে অবাক করে দিয়ে সাব্বির বললো, —- সে যাবে।

রিমি বাদে সবাই বিস্ময়ভরা চোখে তাকালো। তাঁকাবেই না কেন? সূর্য আজকে কোন দিকে অস্ত গেছে?

সাব্বির বড় একটা শ্বাস ফেলে বললো, — ঠিক আছে তোমরা না চাইলে যাবো না।

রেজাউল সাথে সাথে বললো, —- আরে চাইবো না কেন? যাবি সেটাতো ভালো কথা। চল, চল। রাত আবার বেশি হলে তোদের চাচি বিরিয়ানি খাওয়ার স্বাদ ঘুচিয়ে দেবে।

— তুমি সব সময় এমন করো চাচ্চু। দু- একদিন দেরি হলে কি হয়। নিপা মুখ ফুলিয়ে বললো।

— এই মুখ ফুলানি চাচির সামনে ফুলাস। তারপর দেখা যাবে কেন এমন করি।

নিপা ভেংচি কাটলো। সবাই আবারো হাসলো। হেসে ধীরে ধীরে বেরোলো।

হোটেলে এসে বসতেই রিমি এক অকাজ করে ফেললো। সে, নিপা, আয়াশ বসেছে এক সাইডে। বাকি তিনজন বসেছে আরেক সাইডে। সাব্বির পরেছে একদম তার বরাবর।

আর এই বরাবরের জন্য পা মেলতেই সাব্বিরের সাথে ঠুকাঠুকি হয়ে গেলো। সে ফট করে পা গুটিয়ে নিলো। সাব্বিরের মধ্যে অবশ্য কোন ভাবান্তর হয়নি। এমন কি তার দিকে তাকায়ও নি।

যাক বাবা, বেঁচেছে। হয়তো বুঝতে পারেনি কে দিয়েছে। তা না হলে যে বান্দা। চোখে, মুখে আগুন এনে বলতো ” পা ধোয়া তো তোমার মেয়ে। যদি না ধোয়া হয়। তবে এক্ষুণি আমার পা ধুয়ে দেবে। এক্ষুণি মানে এক্ষুণি। তা না হলে তোমার বিরিয়ানি খাওয়া বন্ধ। যত্তোসব অপদার্থের দল।

সে মনে মনে হাঁফ ছেড়ে ভালো ভাবে পা গুটিয়ে বসলো। বসে সাব্বিরের দিকে আবার তাকালো। সে চোখ, মুখ কুঁচকে বসে আছে। এতোই যখন সমস্যা কোন দুঃখে এসেছে কে জানে। এর দুঃখে না আবার তার নিজেরই খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

এতো দুঃখ দেখার রিমির অবশ্য সময় হলো না। বিরিয়ানি হাজির। সে খাওয়া খান্দানি লোক। বিরিয়ানির সুস্বাদু গন্ধে রিমির হুশ জ্ঞান সব হারিয়ে গেলো। সে দিন দুনিয়া ভুলে আয়েশ করে খাওয়া শুরু করলো। আর যখন হুশ এলো, তখন সে থমকে মূর্তি মানব হয়ে গেলো।

সে সাব্বিরের পায়ের উপর পা তুলে আরামছে খাচ্ছে। আল্লাহগো! কি দিয়ে বানাইছো? সব কিছুই তো একটু একটু দিছো। সাথে একটু আক্কেল দিলেও তো পারতে । তা না হলে অনন্ত এ রকম পরিস্থিতি তে পড়তে হতো না।

সে ঢোক গিললো। মুখের বিরিয়ানি নিচের দিকে নামানোর ব্যর্থ চেষ্টা। বিরিয়ানি তো নামলোই না। গলার কাছে দলা পাকিয়ে রইলো।

সে কাঁপা কাঁপা হাতে পানির গ্লাস নিলো। নিয়ে আড়চোখে সাব্বিরের দিকে তাকালো।
সে তার স্বাভাবমতো রাজকীয়তা বজায় রেখেই খাচ্ছে। বিশেষ কোন পরিবর্তন তার মধ্যে দেখা গেলো না।

রিমি মনে মনে আবারো হাঁফ ছাড়লো। যাক বাবা! এবারো মনে হয় বেঁচেছি। সে পানি খেতে খেতে আস্তে করে পা সরিয়ে নিতে চাইলো। তখনি সাব্বির ফট করে তার পা দিয়ে রিমির পা চেপে ধরলো।

রিমি থমকে গেলো। আগে বিরিয়ানি ছিলো এবার পানিও আটকে গেলো। সাথে সাথেই তার কাশি শুরু হয়ে গেলো। কাশতে কাশতে তার দম বেড়িয়ে যাওয়ার অবস্থা।

সাব্বির বাদে সবাই তার দিকে তাকালো। নিপা আস্তে আস্তে পিঠ বুলিয়ে দিলো। দিয়ে হেসে বললো, — ইশ! কেউ তোমাকে খুব মিস করছে বুঝেছো। তাইতো এমন খাবার আটকে গেছে। আস্তে আস্তে ঢোক গেলার চেষ্টা করো, তাহলেই নেমে যাবে।

রিমি আস্তে আস্তে ঢোক গিলে, দম ছাড়লো! কাশি থেমেছে। গলা, নাক জ্বলছে। সে আবার গ্লাস নিয়ে হালকা পানি খেলো। খেয়ে মনে মনে বললো, — কেউ মিস করেনি গো। তোমার ভাই তলে তলে টেম্পু চালাচ্ছে । আবার দেখো কোন হেলদোল নেই । কি নির্বিকার, স্বাভাবিক ভাবে খাচ্ছে। আমার এতো মহা মূল্যবান পা চেপে আরামছে খাচ্ছে, কে বলবে? সে ভেবে ছিলো ভদ্র মার্কা ছেলে। এখন তো দেখা যায় মিচকা শয়তান।

বলেই রিমি পা সারানোর আরেক বার বৃথা চেষ্টা করলো। ফলাফল আরো শক্ত ভাবে চেপে ধরলো। রিমি ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বড় একটা শ্বাস ফেললো। মানছি ভুলে একটু পা উঠিয়েই ফেলেছি। তাই বলে এমন ভর্তা বানাতে হবে? হুহ্..

চলবে……