আনমনে সন্ধ্যায় পর্ব-১০

0
91

#আনমনে_সন্ধ্যায়
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ১০

রিমি বাসায় ফিরে অবাক হলো। এই বাড়ির গেইট সব সময়ই খোলা থাকে, তবে ভেতরের টা থাকে বন্ধ। আজকে দু- টোই খোলা। ব্যাপার কি? ভেতর থেকে আবার উঁচু কথার শব্দও ভেসে আসছে। ঝগড়া – টগড়া লেগেছে নাকি? রিমি চোখে মুখে বিস্ময় নিয়ে এগিয়ে গেলো।

এই বাসা বলতে গেলে সাব্বির ভাইয়ের ভয়ে মোটামুটি সবকিছু গোছগাছই থাকে। আজকে চিত্র ভিন্ন। পুরো ড্রইং রুম এলোমেলো। সেই এলোমেলো ড্রইং রুমে সব সময়ের মতো হাত পা ছড়িয়ে টিভি ছেড়ে নাদু মামা বসে । আজকে অবশ্য নিউজ চ্যানেল নেই। চলছে মোটু- পাতলু।

রিমি অবাকের উপরে অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো, তারপর দ্বিতীয় তলার দিকে কান সজাগ করলো । কথার শব্দ সেখান থেকেই আসছে। অবশ্য কন্ঠ টা অপরিচিত। সে সেই দিকে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই পেছন থেকে একজন বললো, — হ্যান্ডসআপ।

রিমি হাসলো! এটা আয়াশ। হেসেই বললো, — যদি না করি।

— বোমা ছুঁড়বো ।

— আচ্ছা! তো ছুঁড়ো।

আয়াশ হাসলো! হেসে মাথা দিয়ে ইশারা করলো।
রিমি অবশ্য এসব কিছুই দেখলো না। শুধু দেখলো ছোট্ট একটা বাচ্চা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। রিমি এক চিৎকার দিলো। এই ছেলে খামচে তার কোমর ধরে ঝুলে পড়েছে।

তার চিৎকারে নাদু মামা ঝাড়া দিয়ে উঠলো। দু-তলা থেকে সবাই দৌড়ে এলো।

হায় হায় করতে করতে হাসি নুহাশকে টেনে ছাড়ালো। ছাড়াতে ছাড়াতে বললো, —- আহা রে। মাইয়াডারে মাঝখান থিকা একেবারে ভাইঙা ফালাইলো। এই ভাবে কাওরে ধরে? কোমরডার মাংস একটুও মনে হয় আর কোমরে নাই গো। সব খুবলায়ে নিছে।

নিপা, আয়াশ ঠোঁট টিপে হাসলো। নিসা বিরক্ত মুখে বললো, — ঢং বন্ধ করো তো খালা। বাচ্চা একটা ছেলে, একটু ধরেছে, ননির পতুল নাকি। যে ধরলেই গলে যাবে। যত্তোসব!

তারপর রিমি দিকে তাকিয়ে বললো,—- আর তুমিও মেয়ে, এ ভাবে কেউ চিৎকার দেয়। ছোট একটা বাচ্চা, এমন ভাব করেছো যেন মাথা টেনে ছিঁড়ে ফেলেছে।

নাদু এগিয়ে এসে নুহাশকে কোলে নিলো। তার কলিজা এটা। চিৎকারে সেও ভয় পেয়েছে। চোখে পানি টলমল করছে।

নিয়ে বিরক্ত মাখা কন্ঠে বললো, — এইটুকুতেই এই অবস্থা, পুলিশের চাকরি করো কিভাবে?

রিমির ঝটকা এখনো কাটেনি। তবুও নিজেকে সামলে নিলো। সে বুঝতে পারে না, তার সব কিছু পুলিশের চাকরিতে গিয়েই কেন শেষ হয়। তার কোমর জ্বলছে। সে কোমরে হাত দিয়ে এক পলক তার খালামণির দিকে তাকালো। সে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়ানো, নির্বিকার।

তারপর নিসার দিকে তাকালো। আচ্ছা! এই হলো নিসা। এক বাচ্চার মা হলেও রুপের কোন কমতি দেখা গেলো না। তবে রুপ বাবা মায়ের পেলেও, বাবা, মায়ের গুন যে বিন্দু মাত্র ও নেই তা বুঝতে তার এক সেকেন্ডও লাগলো না।

সে জোর করে একটু হেসে বললো,— স্যরি আপু! সবকিছু এতো তাড়াতাড়ি হলো কিছু বুঝতেই পারিনি।

নিসা উত্তর দিলো না। বিরক্ত মুখে চলে গেলো। নাদু মামাও তার কলিজাকে নিয়ে তার জায়গায় ফিরে গেলো।

এগিয়ে এলো মহুয়া আন্টি। মাথায় হাত রেখে কোমল সুরে বললো, — কিছু মনে করো না। বাচ্চা মানুষ, বুঝেনি।

রিমি আবারো হাসলো। হেসে এক পলক আয়াশের দিকে তাকালো। সে এখনো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দাঁত কেলাচ্ছে। তারপর মুহুয়ার দিকে তাকিয়ে বললো — আমি কিছু মনে করিনি আন্টি। হঠাৎ হয়েছে তো তাই একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম।

মুহুয়াও হাসলো! হেসে হাত ধরে টেনে বললো , — আসতো, রুমে গিয়ে দেখি ফাজিলটায় কি করেছে। মলম টমল লাগবে নাকি কে জানে, খামচির দাগ আবার সহজে যায় না।

রিমি আর কিছু বললো না। নিঃশব্দে এগিয়ে গেলো। যেতে যেতে আয়াশের দিকে আবার তাকালো। তার মুখে এখনো দুষ্ট হাসি।

তার হাসি দেখে রিমি মনে মনে বললো, — মটকা বাঁদর বোমা ছুঁড়েছিস না। সময় আসতে দে, আমি তো ছুঁড়বো নিউক্লিয়ার বোমা। শুধু তুই না, তোর পুরো পরিবার ঠুস।

রিমি ফ্রেশ হয়ে রুমেই রইলো। আজকে সে তাড়াতাড়ি এসেছে। আরামছে একটা বই পড়া যায়। তার বই পড়ার নেশা আছে। বলতে গেলে অনেক। ক্লাস নাইন থেকে তার এই নেশা। নিজে বই কেনার মতো টাকা তার কখনও ছিলো না। তবে আশিক ভাইয়ের বইয়ের এক রাজ্য আছে।

আর সেই বইয়ের রাজ্যে সে চলে যেতো অনায়াসেই। আশিক ভাই কখনও কোন বারণ বা রাগ করেনি। এই যে তার রাজ্যে থেকে এক গাদা বই বিনা অনুমতিতে নিয়ে এসেছে। কোন অভিযোগও নেই।

সে বই পড়তে পড়তে বলতে গেলে এক প্রকার ঢুকে গেছে তখন হাসি খালা আসলো। তার হাতে চা, হালকা নাস্তা। সেই নাস্তা বেডটেবিলে রাখতে রাখতে বললো, — ব্যস্ত নি আম্মা?

রিমি হেসে উঠে বসলো। বই পড়তে পড়তে খাটে গড়াগড়ি খাওয়া তার অভ্যাস। বসে তো ভদ্র ভাবেই। কখন যে ওলট, পালট হয়ে যায় কে জানে। সে উঠে বসে বললো, —- উঁহু! একদম না। বসুন খালা।

দু- ভ্রু উঁচু করে হাসি খালা বসলো। তার এমন ভাব বসলো খুব অনিচ্ছা নিয়ে। তবে রিমি ভালো করেই জানে এখন সে গরমা গরম খবর পাবে।

রিমি হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ নিলো। কাপ থেকে কিছুটা চা পিরিচে ঢেলে কাপ হাসি খালার দিকে বাড়িয়ে দিলো।

এভাবে বাড়িয়ে দিতো তার নানা। ছোট বেলার তার কোন মধুর স্মৃতি নেই।তবে নানার সাথে কিছু সুন্দর মূহুর্ত আছে।

তার এই ছোট্ট জীবনে পুরো পৃথিবীতে বিনাস্বার্থে মাথায় ভরসার হাত টা রেখেছে মাত্র তিনজন। প্রথম তার নানা। স্নেহ, ভালোবাসা বলতে রিমি যা কিছু যতোটুকু বুঝেছে, তা তার সবটুকুই নানা।

দুই সাব্বির ভাই। অবশ্য এক মূহুর্তের জন্য। তবুও আজকাল মানুষের দুঃখ মানুষকে আর কতোটুকু ছুঁতে পারে। সাইড কেটে যেতে পারলেই বাঁচে। তবে সাব্বির ভাই, কিছু কিছু মানুষ আছে না হঠাৎ করে আসে, আবার হঠাৎ করে চলে যায়। মধ্যে থাকে ছোট্ট একটু মূহুর্ত, অনাকাঙ্খিত ভাবে। সাব্বির ভাইয়েরটাও তার জীবনে তেমনই।

সাব্বির ভাইয়ের হয়তো মনেও নেই। দশ, এগারো বছরের আগের কথা। তবে রিমি ভুলেনি। কিছু কিছু জিনিস ভোলা যায় না। অবশ্য সে কখনো কোন কিছু ভোলেও না। কারোটাই না। সেটা ভালো হোক কিবা মন্দ।
আর তৃতীয়জন…..

রিমি চায়ের কাপ হাতে নিয়েই আনমনে বসে রইলো। হাসি খালা স্বাভাবিক ভাবেই সেই কাপ নিলো। যেনো এভাবে তারা প্রতিদিনই বসে আড্ডা টাড্ডা দেয়। ভাগাভাগি করে চা, বিস্কুট খায়।

— নিচে এতো চেঁচামেচি কেন খালা?

— কিসের চেঁচামেচি, দজ্জাল আইছে। ভালো ভাবে কথা বললেও মনে হয় মারামারি লাইগা গেছে। একেবারে আম্মার ডুবলিকেট।

— আম্মা?

— আরে তোমার খালামণির হাওরি। ছিলো আস্ত খাটাশ একটা। পুকুরের ঠান্ডা পানির লাহান বড় ভাবি। জ্বালাইয়া রাখছে নি কিছু। কয়না মানুষ মইরা ভূত হইয়া যায়। রাইখা যায় রক্ত। এই নিসা হইছে সেই খাটাইশার রক্ত। যা রাইক্ষা আরামছে উপরে গিয়ে বইসা বইসা তামাশা দেখতাছে।

রিমি হালকা হাসলো! পিরিচ এগিয়ে নিয়ে চায়ে চুমুক দিলো। হাসি খালার চায়ের হাত ভালো। খেয়ে তৃপ্তি পাওয়া যায়।

— বড় আব্বার জন্য মাইয়া দেখা হইবো। তারে জানাইলো না ক্যা। হেল লিগাই দৌড়ে আইছে। পুরো বাড়িরে মাথায় কইরা নাচায়তেছে।

— মেয়ে দেখা হচ্ছে নাকি?

— হ!

— সাব্বির ভাই রাজি?

— হ -ও ! তার অনুমতি ছাড়া কিছু সম্ভব নাকি? তারে জোর কইরা কিচ্ছুই করা যায় না। কখনও না। মইলল্লা পোলা। হেগো আবার জেদ থাকে বেশি।বড় আব্বারও বেশি। তয় বড় ভালা পোলা।

রিমির ভ্রু কুঁচকে গেলো।

— মইলল্লা কি খালা?

— আরে মইলল্লা বুঝো না। যাগো আগে ভাই বোন মরে।

— মুহুয়া আন্টির বাচ্চা মারা গেছে নাকি?

— হ! বড় আব্বার আগে মারা গেছে। দু- দিন আছিলো। কি চান্দের টুকরা যে ছিলো। আহারে।

রিমি কিছু বললো না । সে আবার চায়ে চুমুক দিলো।

— আর এই দিকে নিসা। সে তার এক ননদরে আনতে চায়। এহন না সেই আগে থাইকা। ওই মাতারিরে তো তুমি দেহো নাই। ধবধবে ধলা মুরগি। মারবেলের মতো সাইজ। নিসা মতোই শয়তান। এই বাড়ি আইলেই মৌমাছির মতো বড় আব্বার আশে পাশে ঘুরঘুর করে ।

ঘুরঘুর করার মতোই তো তোমার বড় আব্বা খালা। সেই মেয়েকে আর দোষে লাভ কি? রিমি মনে মনে বললো। তবে মুখে বললো — সমস্যা টা কি?

— কোন সমস্যা নাই। বড় আব্বার চাকরির পরে বড় ভাবি বিয়ার জন্য উইঠা পইড়া লাগলো। তখন নিসা তার ননদের প্রস্তাব রাখলো। কিন্তু গিট্টু বাজাইলো বড় আব্বা। সে সোজা বললো, — আনিকা আম্মারে বিয়া করবো।

রিমি নড়েচড়ে বসলো। এতোক্ষণে এসেছে কাহিনীতে টুইস্ট।

— আনিকা কে?

— বড় আব্বার ফ্রেন্ড।

— ও! তারপর?

— সেটাও বাদ।

রিমি অবাক হয়ে বললো —- ওমা কেন?

— কি জানি? সব যখন ঠিকঠাক তখন আবার বড় আব্বায় এসে সোজা কইলো। এই বিয়ে হবে না। হবে মানে হবে না।

— কেন?

— তা তো জানি না আম্মা। পরে অন্য জায়গার মেয়ে দেখা হইলো। এটা হয়, ওটা হয় না। ওটা হয়, এটা হয় না। তার মধ্যে আবার আব্বার পিছপিছানি। পরে বড় ভাবি হালই ছেড়ে দিলো।

রিমি বিজ্ঞের মতো মাথা দুলালো। দুলিয়ে বললো — আচ্ছা… যেন সব বুঝে এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেছে। আসলে তা না সব আরো ঝট পাঁকিয়ে গেছে।

— হুম, বলেই হাসি খালা উঠলো। দু- দন্ড বসার তার সময় কই। তয় এই আম্মার লগে কথা বলতে তার ভালোই লাগে। খুব মনোযোগ দিয়া হুনে। তা না হলে কামের বেডির কথা দাম দেয় কে?

সে উঠতে উঠতে বললো, — এই বাড়ির পুলাগো বিয়ার ভাগ্যই খারাপ। এিশয়ের আগে কেন জানি বিয়াই করতে পারে না। বড় ভাইয়ে করলো দেরিতে। দেরি হোক আর যাই হোক বউডা পাইছে মনের মতো। আর ছোট ভাই তো ছোট ভাই। বিয়া করে না, করে না করে, এমন জায়গায় যেয়ে গিট্টু ধরলো। যার মুখে ইহো জীবনেও হাসি দেখলাম না।

রিমি হাসি খালার দিকে তাকালো। ভ্রু উঁচিয়ে বললো —- সেটা তো আপনার মুখেও দেখি না খালা। জায়গার বদনাম করছেন কেন?

— হুনো আমার কথা দিলে নিয়ো না আম্মা! আমি আর হেনে কি এক হইলাম। জীবন আমার পুড়া কালা পাতিল। পরের বাড়ি থাইকক্যা ঘষতে ঘষতেই জীবন শ্যাষ। হেরের মতো জীবন, হেরের মতো স্বামীর সোহাগী হইলে দুই ঠোঁট আর এক করতাম না। ভেটকায়াই থাকতাম।

রিমি আবারো মাথা নাড়লো। কথা আসলে সত্য।

বলেই খালাও আফসোসের সাথে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে দাড়িয়ে মাথা নাড়লো। নেড়ে বললো, —বিয়াতো আমারো হয়ছিলো বুঝছনি আম্মা। তয় টিকেনাই। আরেক বেডির লগে ভাগছে। ভাগুক! ভাগছে বইলাই বাঁচচ্ছে। তা না হলে হালার পুতের মেইন পার্ট ছেইচ্চা ভর্তা বানাইয়া ফালাইতাম। হাসির লগে বাটপারি।

রিমি এবার হেসেই ফেললো! হেসে তার গড়াগড়ি খাওয়ার অবস্থা। আর কতো মাথা নাড়বে?

হাসি খালা অবশ্য তার গড়াগড়ি দিকে ফিরেও তাকালো না। সে ভাবুক মনে চলে গেলো। হাতে তার এখনো চায়ের কাপ। সে চুমুক দিতে দিতেই এগিয়ে গেলো। অতি দুঃখে মানুষ মদে চুমুক দেয়। হাসি খালা মনে হয় চা দিয়ে কাজ চালাচ্ছে।

রিমি কিছুক্ষণ একা একাই বসে বসে হাসলো! হেসে সে তার রাখা পিরিচের শেষ চাটুকুতে চমুক দিলো। তাহলে এই ব্যাপার! ছ্যাঁকা খেয়ে বাবা পরিষ্কারগির বেকা হয়ে আছে। তাইতো বলি দেখতে দেখতে বেলাতো কম হলো না। এখনও ছাদলা তলায় যায়নি কেন বাছা। আহারে, এতো সুন্দর মানুষটারেও কেউ ছেঁকা দিতে পারে? দুনিয়ায় আর কিছু বাকি রইলো না। হুহ্!

চলবে……