আনমনে সন্ধ্যায় পর্ব-১২+১৩

0
80

#আনমনে_সন্ধ্যায়
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ১২

রিমি চিঠিটা হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখলে। সেই আগেরকার দিনের সাদা খাম। এই যান্ত্রিক ফোনের যুগে চিঠি বর’ই দুর্লভ বস্তু। সেই দুর্লভ বস্তুই এসেছে তার নামে, রংপুর থেকে। প্রেরক আরিয়ান আহমেদ নামের ব্যক্তি। পাঠিয়েছে থানার ঠিকানায়।

সে মনে করার চেষ্টা করলো। আরিয়ান নামের কাউকে চেনে কি না। এক আরিয়ান কে অবশ্য চিনতো। সে তার সাথে কলেজে পড়তো। সে নিশ্চয়ই তার কাছে চিঠি দেবে না। সে খাম ছিঁড়ে চিঠি বের করলো। তার ভেতরে ভেতরে খুব এক্সাইটিং ফিল হচ্ছে। অবশ্য হবেই না কেন। তার জীবনে প্রাপ্ত প্রথম চিঠি বলে কথা।

সে চিঠি খুললো! গোটা গোটা অক্ষরের মুক্ত দানার মতো লেখা । কোন কাটাছেঁড়া নেই। তার মনে হলো চিঠির দাতারও প্রথম চিঠি। তাই লেখেছে খুব যত্ন করে। সে চিঠি তে চোখ রাখলো। চিঠির শুরুতেই তার ধাক্কা খাওয়ার কথা। তবে রিমির মধ্যে কোন হেলদোল হলো না। সে নির্বিকার ভাবেই পড়া শুরু করলো।

” আপা ”
জানি এই শব্দে আপনি চমকে যাবেন। যাওয়ার’ই কথা! চেনার মতো পরিচয় আমাদের কখনও হয়নি। তবে আমরা কিন্তু আপনাকে চিনি। আমাদের জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই আমরা জানি আমাদের একটা বড় বোন আছে। তবে সে আমাদের সাথে থাকেনা। কেন থাকেনা সেটা অবশ্য জেনেছি অনেক পরে, মায়ের কাছ থেকে। আমরা বাবাকে খুব ভয় পাই। তাই তাকে কিছু জিজ্ঞেস করার মতো সাহস আমাদের কখনও হয় নি। অথচো সে শান্ত, নিশ্চুপ।। কখনও আমাদের সাথে উঁচু গলায় কথা বলেনি। তবুও কেন জানিনা আমরা তাকে খুব’ই ভয় পাই।

হয়তো সে শান্ত, নিশ্চুপ তবে বাবার যে ভালোবাসায় আগলে ধরা, ভরসা দেয়া, ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে নেওয়া সেটা সে আমাদের নেয়নি বা নিতে পারেনি। কেন পারেনি সেটা ছোট বেলা না বুঝলেও, এখন কিছুটা হলেও বুঝি। এই পৃথিবীতে যতো শাস্তি আছে তার মধ্যে সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো অপরাধবোধ। এটা মানুষকে শেষ করে একেবারে ভেতর থেকে। চোখে দেখা যায়, ঘা হয় না, রক্ত ঝরে না। তবুও এর ভাঙন মানুষকে ভেঙে চুড়ে নিঃশেষ করে। হয়তো তাকেও করছে। তাই বাকি সন্তানদেরও কাছে টেনে নিতে পারেনি । যেই দূরুত্ব প্রথম সন্তান থেকে রেখেছে, সেই দূরুত্ব বাকি সন্তানের কাছ থেকেও রেখেছে।

যাইহোক! যেগুলো পুরোনো সেগুলো না হয় পুরোনোই থাক। আমি আপনার সাথে যোগাযোগ করার অনেক চেষ্টা করেছি, আপনার নানা বাসায়ও গিয়েছি। কেউ’ই আপনার নাম্বার বা ঠিকানা দিতে রাজি হয়নি। লোক মুখে শুনেছি, আপনি এই থানায় আছেন। তাই এই রাস্তাটা নেওয়া। জানি না চিঠি পাবেন কি না। যদি পান তাহলে আপনার কাছে আপনার ছোট ভাইয়ের ছোট্ট একটা রিকোয়েষ্ট। ফিরে কি আসবেন আপু? জানি আমরা সবাই আপনার দোষী। তবুও একবার সব ভুলে ফিরে আসা যায় না আপু?

মানুষই ভুল করে। হয়তো তখন পরিস্থিতি এমন ছিলো বাবাও করেছে। তবে তার শাস্তি তিনি অবশ্যই পাচ্ছেন। বাবা অসুস্থ আপু! তিনি কখনও আমাদের কে কিছু বলেন নি। তবে আমি জানি, তার চোখ শুধু এখন আপনাকে খোঁজে। অনন্ত একবার ক্ষমা চাওয়ার জন্য হলেও।

ভালো থাকবেন আপু আর আমরা সবাই আপনার অপেক্ষায় থাকবো, সত্যিই থাকবো।

রিমি এক নিঃশ্বাসে চিঠিটা পড়ে শেষ করলো। পড়ে বড় একটা শ্বাস ফেললো। ফেলে টুকরো টুকরো করে চিঠিটা ছিঁড়লো। ছিঁড়ে দু- হাত দিয়ে মুচড়িয়ে বল বানিয়ে ঝুড়িতে ছুঁড়ে মারলো। বিশেষ কোন পরির্বতন তার মধ্যে লক্ষ্য করা গেলো না।

সে স্বভাবিক ভাবেই ঝট করে উঠে দাঁড়ালো। সামনে নির্বাচন। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সমাবেশ হচ্ছে। আর তাদের কাজের চাপও বেড়েছে, তাকে বেরুতে হবে।

রিমি আজও বাসায় ফিরলো বিকেলে। সকাল থেকে এক সমাবেশে ডিউটি ছিলো। শেষ হতেই আর কোন কাজে যাইনি। সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। সেই বিধ্বস্ত শরীর নিয়েই বাসায় ফিরলো। আজ মেইন গেইট বাদে সবই বন্ধ। সে অবাক হলো না। এটাই এ বাসার স্বভাবিক অবস্থা।

সে সব সময়ের মতো বেশ কয়েকবার কলিং বেল চাপলো। এই বাসায় আর যাই হোক এক কলিং বেলে দরজা খুলবে, সে এরকম ভুলেও আশা করে না। তাই খুব নির্বিকার ভাবেই কয়েকবার কলিং বেল চেপে দাঁড়িয়ে রইলো।

তার কিছুক্ষণ পরেই দরজা খুললো হাসি খালা। চোখে মুখে তার কাঁচা ঘুম। সে তার কাঁচা ঘুম নিয়েই বললো, —- হগলে মিলে মেয়ে দেখতে গেছে গো আম্মা। বাসায় কেউ নাই। টেবিলে খাওন দেওয়া আছে, কষ্ট করে একটু নিয়া খাও। বলেই সে যেভাবে ঢুলতে ঢুলতে এসেছে, সে ভাবেই ঢুলতে ঢুলতে চলে গেলো।

রিমি হাসলো! বিয়ের ফুল ফুটতে চলেছে তাহলে। সে উপরে এলো। এই অবেলায় আর গোছল করার ইচ্ছা হলো না। সে হাত মুখ ধুয়ে আবার নিচে আসলো। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে।

নিচে আসতেই অবাক হলো। টেবিলের সামনে সাব্বির দাঁড়িয়ে। তার হাতে মগ। মগে কিছু মিক্স করছে।

— আপনি যাননি?

সাব্বির ভ্রু কুঁচকে তাকালো। এই মেয়ে এসেছে কখন? সে ঘুমে ছিলো। মাথা ভার, নাক গলা চেপে আসছে। নির্ঘাৎ ঠান্ডা লাগবে। সে ভ্রু কুঁচকেই বললো,

— কোথায়?

রিমি চেয়ার টেনে বসলো। বসতে বসতে বললো, — এ তো দেখি যার বিয়ে তার খবর নেই, পাড়া পড়শীর ঘুম নেই।

— হেঁয়ালি ছাড়া কথা বলতে পারো না?

রিমি হাসলো! হেসে ঢাকনা খুললো। মাংস! তবে কিসের বুঝা যাচ্ছে না। সে আবার গরু,মুরগি ছাড়া অন্য কিছু খায়না। দেখতে খাসির মতো লাগছে।
সে সন্দেহ মাখা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো — এটা কিসের মাংস?

সাব্বির কুসুম গরম লবণ পানিতে চুমুক দিলো। তার উচিত এখান থেকে চলে যাওয়া। সে ভালো করেই জানে দু- মিনিট দাঁড়ালেই এই মেয়ের ইয়ার্কি মার্কা কথার রেলগাড়ি শুরু হবে।

তবে সমস্যা হলো তার যা করা উচিত, এই মেয়ের সামনে করে ফেলে তার উল্টো। সেই দিন গেলো বিরিয়ানি খেতে। গেছে তো গেছে, আবার কি একটা কাজ করলো। তার সাথে এসব যায়? আবার গেলো হসপিটালে। লোকেশন বলে দিলেই তো হতো। তা না, এমন ওলট পালট হওয়ার কারণ কি?

সে চিন্তা করতে করতেই চেয়ার টেনে বসলো। বসে বললো, —- তোমার দরকার কোনটা?

— গরু, বা মুরগী।

সাব্বির মনে মনে হাসলো! তাদের তিন ভাই বোনের’ই খাসির মাংস পছন্দ। নিসা এসেছে তাই খাসিই রান্না করা হয়েছে।

— গরু।

রিমি মাংস ভালো করে খেয়াল করে বললো, — শিওর?

— তোমার কি ধারণা, আমি এখানে ফাজলামির জন্য বসেছি?

রিমি আর কিছু বললো না। উঠে কিচেন গিয়ে গরম করে আনলো। শীতে জমে গেছে। এনে আরামছে খাওয়া শুরু করলো।

— হসপিটালের লোকটা কে?

রিমি খেতে খেতে সাব্বিরের দিকে তাকালো। হসপিটালে গিয়ে দু- মিনিটও বসতে পারেনি। এই লোক বলতে গেলে টেনে ছিঁচড়ে নিয়ে এসেছে। পুরো রাস্তাও ছিলো থম মেরে। যাওয়ার সময়তো গেলো ভালোই। হঠাৎ করে কি হলো কে জানে। নয়টাও বাজেনি। তার নাকি ক্লাস আছে। আগে জানলে সাথে নিতোই না।

— কে সেটা এখনও বলতে পারছি না।

— কেন? ফ্রেন্ডশিপের প্রপোজাল এখনো এক্সসেপ্ট করোনি ?

রিমি খাওয়া থামিয়ে সাব্বিরের দিকে তাকালো। তাকিয়ে বললো,
— আপনি লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের কথা শুনেছেন?

— লুকিয়ে শুনতে হবে কেন? তোমরা কি কানে কানে ফিসফিস করে কথা বলছিলে নাকি?

রিমি মুখ বাঁকালো । বাঁকিয়ে আবার খাওয়া শুরু করলো। মাংসের কারিটা ভালো হয়েছে। সে আরো দু- পিস নিলো।

— লোকটা একটু অন্য রকম।

— কেন? দেখতে অসুন্দর বলে।

— না। কালো হলেই যে কেউ দেখতে অসুন্দর হয় তোমাকে কে বললো?

— ছোট থেকে এই শুনে শুনেই তো বড় হলাম।

— এজন্যই বুঝি বরাবর টাইপ কারো কাছেই যাচ্ছো? তবে লাভ হবে বলে মনে হয় না।

— কেন?
— কালো লোকের বউ সুন্দর হয়। শুনোনি?

— আর সুন্দর লোকের?

সাব্বির হালকা হাসলো। তবে সে কথার উত্তর দিলো না। বললো,
— লোকটার চোখে তোমার জন্য মুগ্ধতা আছে তবে সাথে অন্য কিছু।

রিমি ঠোঁট টিপে হাসলো।
— চোখ দেখে অনেক কিছুই বুঝেন দেখি?

সাব্বির কিছু বললো না । কথাগুলো সে এবার ফাজলামি করে বলেনি । কেন জানি লোকটাকে তার সত্যিই সুবিধার মনে হয় নি। একটি নিষ্পাপ ভালে মানুষের চোখ আর একটা চতুর চোখের মাঝে পার্থক্য আছে। এতোটুকু অনন্ত বোঝার বয়স তার হয়েছে।

রিমি সাব্বিরের দিকে তাকালো। চোখে চোখ রেখে বললো, —- আমার সম্পর্কেও কিছু বলুন তো? দেখি কেমন বুঝেন।

— হজম হবে?

— সেটা শোনার পর বোঝা যাবে।

— তুমি ভয়ংকর। আর এই ভয়ংকর মেয়েটা প্রেমে পড়েছে। কার শুনতে চাও?

রিমির খাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো। তারপর চোখ ফিরিয়ে নিয়ে স্বভাবিক ভাবেই খাওয়ায় আবার মনোযোগ দিলো। প্রেমের দিকে সে গেলো না। প্রেমে পড়লে সে পড়েছে। এটা আর এমন কি? প্রেম তো পড়ার জন্যই। এই বয়সে প্রেমে পড়বে না তো কবে পড়বে। আর ভয়ংকর সেটা?

রিমি চোখ ফিরিয়ে নিলেও সাব্বির নেয়নি। সে এখনো রিমির দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের লাস্ট বার দেখা হয় যখন চাচির বাবা মারা গেলেন। খবর শুনে বাড়ির সবাই রংপুরে গেলো। গিয়ে কিছুদিন থাকতে হলো। হাজার হলেও আত্মীয়, গিয়েই তো ফট করে আবার আসা যায় না। চাচির বাবার বাড়ি পিওর গ্রামের বাড়ি বলতে যা বুঝায়। বড় বড় ঘর, বড় উঠান, একগাদা মানুষ। বিশাল এরিয়া নিয়ে বাড়ি।

তখন সে সবে মাএ ভার্সিটিতে উঠেছে। আনিকার সাথে বন্ধুত্ব অনেক দিনের হলেও প্রেমটা তখন নতুন। দিন নেই, রাত নেই ফোনে গুটুর গুটুর। সে গুটুর গুটুরের জন্যই চিপা চুপায় চলে যেতে হয়। সেই দিনও কথা বলতে বলতে সে বাড়ির পেছনের সাইডে এসেছে। পেছনের সাইডে দুনিয়ার গাছগাছালি। এক সাইডে পুকুর। দিনের বেলাই অন্ধকার।

সেই অন্ধকারেই কথা বলতে বলতে সে থামলো। একটা ঘ্রাণ! খুবই তীক্ষ্ণ। কিসের সে বুঝতে পারলো না। ফুল টুল হবে হয়তো। গাছ গাছালির তো অভাব নেই। সে আবার এই ব্যাপারে খুবই আনাড়ী।

তবুও তার কেন জানি মনে হলো কিছু একটা ঠিক নেই। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো। কিছুদূর যেতেই সে থমকে দাঁড়ালো। পুকুরের সাইডে ঝোপের মাঝে হাঁটু মুড়ে রিমি বসে আছে । তার পুরো জামা রক্তে মাখামাখি। তাজা রক্ত। সে বসে আছে মূর্তির মতো। হাতে মুঠো করা কিছু একটা।

সে ফোন কেটে চোখে মুখে বিস্ময় নিয়েই আরেকটু এগুলো। এগুতেই বুঝতে পারলো হাতের জিনিসটা কি? একটা ঝিনুকের খোলস। এই ঝিনুকের খোলস তার পরিচিত। এভাবে ঝিনুকের মাথা ধার করে তারা ছোট বেলায় কতো আম টাম চুরি করে কেটে খেতো। এটার মাথাও তেমন ধার। সেই ধার করা অংশেও রক্ত।

অজানা আশংঙ্কায় তার ভিতর কেঁপে উঠলো। মা, বাবা ছাড়া একটা মেয়ের জন্য এই পৃথিবীটা ভংয়কর।
সে ধীরে ধীরে রিমির কাছে গেলো। হাঁটু মুড়ে রিমির সামনে বসলো।

রিমি নড়লো না। কিছু বললো না। শুধু ধরে রাখা ঝিনুকটা আরো শক্ত করে মুঠো করলো।

সাব্বির তাকিয়ে রইলো। এই মেয়েটা জীবনে আর কোন পুরুষ মানুষকে বিশ্বাস করতে পারবে না। কোনদিনও না।

তবুও সাব্বির ভরসা মাখা একটা হাত তার মাথায় রাখলো। রেখে কোমল সুরে বললো, —- ভয় নেই। আমি আছি। আমাকে বলো কি হয়েছে?

রিমি এবার সাব্বিরের দিকে তাকালো। শীতল, শান্ত চোখে, তবে মুখ দিয়ে টু শব্দও বের করলো না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে হাত দিয়ে ঠেলে সাব্বিরের হাত মাথায় থেকে সরালো। তারপর নিশ্চুপ উঠে দাঁড়ালো। স্বাভাবিক ভাবে হেঁটে পুকুরের পানিতে নেমে গেলো।

সাব্বির এতোক্ষণ খেয়াল করেনি। এখন করলো, রিমির পরনে ফ্রক হাঁটু পর্যন্ত। নিচের অংশ খালি। তার যতোদূর মনে পড়লো, রিমি ঢোলাঢালা ফ্রকের সাথে পায়জামা পরে । সাথে সাথেই তার ভিতর খামচে উঠলো। বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে রইলো।

রিমি পুকুর থেকে উঠে এলো স্বাভাবিক ভাবেই। তাজা রক্ত, পুকুরের পানিতে ধুয়ে মুছে শেষ। সাব্বির চোখ ফিরিয়ে নিলো। এগারো বারো বছরের কিশোরী হলেও বয়সের তুলনায় রিমি বাড়ন্ত। ভেজা কাপড়ে তা স্পর্ট। অবশ্য রিমির মধ্যে কোন হেলদোর দেখা গেলা। সে তার সামনে দিয়ে হেঁটে গেলো নির্দ্বিধায়। এখনো তার হাতে মুঠো করা সেই ঝিনুক।

তখন তার মনে হলো বাস্তবতা যা মানুষকে শেখায়, বয়স সেখানে সংখ্যা ছাড়া কিছুই না। এই যে এই বয়সে এই মেয়েটা যে দুনিয়া দেখছে। সেটা হয়তো সাব্বিরও দেখেনি।

সাব্বির বাড়ির ভেতরে আসলো। কাউকে কিছু বলতে পারলো না। তবে বলবেই কি? সে নিজেও কিছু বুঝতে পারছে না। সে রিমিকে কয়েকবার খুঁজলো। এই মেয়ে বাড়ির ভেতরে এসে গায়েব। এতো বড় বাড়িতে কোথায় আছে কে জানে।

অবশ্য ঘন্টা দু- একের মধ্যেই বাড়িতে হইচই পড়ে গেলো। চাচির ছোট ভাবির ভাইয়ের অবস্থা খারাপ। সে নাকি হসপিটালে। হঠাৎ করে কি হলো, কেন হলো কেউই কিছু বুঝতে পারলো না । শুধু চাচির ছোট ভাবি চিৎকার করতে করতে হসপিটালে ছুটে গেলেন।

সেই দিনের পরে আর রিমির সাথে তার দেখা হয়নি। চাচির সাথে তার বাবার বাড়ির সম্পর্ক কেমন সে ঠিক জানে না। তবে বলতে গেলে বিয়ের পরে সে বাসায় দরকার ছাড়া কখনও খুব একটা যেতে দেখেনি। না ওই বাসায় থেকে কেউ খুব একটা এসেছে। তাই তাদেরও আর যাওয়া হয়নি। তবে এই ঘটনা সে কখনো ভুলতে পারেনি। না ভুলেছে এই মেয়েটাকে।

সে মনে মনে বড় একটা শ্বাস ফেললো! ফেলে বললো, — শুনতে চাও না কার?

রিমি নির্বিকার ভাবে বললো, — না।

— কেন? হজম করতে পারবে না বলে?

রিমি একটু থামলো! তবে কিছু বললো না। তখনি কলিংবেল বাজলো ।

সাব্বিরও উত্তরের আসা করেনি। সে এগিয়ে গেলো দরজা খুলতে। বাবা আর চাচা এসেছে।

রিমি তাদের দিকে তাকালো। তাকিয়ে হালকা হাসলো। মেয়ে দেখতে শুধু মেয়েরাই গেছে নাকি?

ওবাইদুল আর রেজাউল সোফায় আয়েশ করে বসলো। বসে রেজাউল রিমির উদ্দেশ্য বললো, — আজকের খাসির কারিটা ভালো হয়েছে না রিমি। আমিতো মজায় মজায় মনে হয় প্রায় হাফ কেজি উপরে খেয়ে ফেলেছি।

ওবাইদুলও মাথা নাড়লো! নেড়ে বললো, —- একদম সেই। রহমানের দোকানের মাংস ভালো। আবার বলতে হবে।

রিমি থমকে বসে আছে। তার মুখে এখনো এক টুকরো মাংস। কিন্তু সেটা আর চিবুতে পারলো না। সে আগুন চোখে সাব্বিরের দিকে তাকালো।

সাব্বির হেসে ফেললো, প্রাণ খোলা হাসি। তার হাসি দেখে দু- ভাই অবাক হয়ে তাকালো। তাদের সবসময় শান্ত, গম্ভীর থাকা ছেলেটার হঠাৎ করে হলোটা কি ?

চলবে……

#আনমনে_সন্ধ্যায়
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ১৩

রিমি সাইন করে চেক বই নিলো। সে এসেছে ব্যাংকে। দু- সপ্তাহ পরে আসতে বলেছিলো। সে বলতে গেলে ভুলেই গিয়েছিলো। আজকে ব্যাংক থেকে ফোন করায় মনে পড়লো। সকালে ব্যস্ত থাকায় আসতে পারেনি, এখন একটু ফ্রি, তাই ভাবলো নিয়ে আসা যাক।

সে চেক বই নিয়ে পেছনে ফিরতেই ওলীদ এগিয়ে আসলো। তার গায়ে ফর্মাল ঘিয়ে রংঙের শার্ট, কালো প্যান্ট। গায়ের রং কালো হলেও দেখতে ভালো লাগছে। অবশ্য বলতে গেলে ব্যাংকের সব লোককেই তার কাছে দেখতে ভালো লাগে। সব সময় কেমন ফিটফাট বাবু সেজে বসে থাকে।

— ভালো আছেন রিমি?

— ভালো, আপনি?

— খুব ভালো।

— সেটাতো আপনি সব সময়ই থাকেন।

ওলীদ হাসলো।
— সময় আছে? নাকি এখনি আবার থানায় যেতে হবে?

— যেতে তো হবেই। তবে কিছুক্ষণ পরে গেলেও সমস্যা নেই।

— যদি ছোট্ট একটা রিকোয়েষ্ট করি রাখবেন?

রিমি হাসলো। তবে কিছু বললো না । বললো ওলীদ নিজেই,
— দু- মিনিট দাঁড়ান, আসছি। বলেই ওলীদ চলে গেলো।

রিমি বাইরে আসলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই যোহরের আজান পড়বে। ব্যাংক বলতে গেলে এখন প্রায়’ই ফাঁকা। লাঞ্চ আওয়ারও মনে হয় শুরু হবে কিছুক্ষণের মধ্যেই।

সে দাঁড়াতেই ওলীদও বেড়িয়ে আসলো। এসে বললো, — স্যরি অপেক্ষার জন্য।

— সমস্যা নেই।

— রিকোয়েষ্ট টা কি জানতে চাইলেন না?

— কি আর হবে, হয়তো লাটে টেষ্ট করাবেন।

ওলীদ আবার হেসে ফেললো। হেসে বললো, — আসুন।

দু- জনেই এগিয়ে গেলো। কিছুদূর হাঁটলেই একটা রেস্টুরেন্ট। তৃতীয় ফ্লোরে। ওলীদরা প্রায়’ই এখানে লাঞ্চ করে। সে রিমিকে নিয়ে সোজা উপরে চলে এলো। এখানের লোক তার পরিচিত। সবচেয়ে সুন্দর আর ভালো জায়গাটা তাদের দেওয়া হলো।

— কি খাবেন বলুন?

— আপনি এনেছেন তাই আপনিই অর্ডার করুন।

— শিওর।

— হ্যাঁ ।

ওলীদ নিজের মতোই অর্ডার করলো। করে রিমির দিকে তাকালো। সে নির্বিকার ভাবে আশে পাশে দেখছে। মেয়েটা সবকিছুতেই কি এমন নিরুউত্তাপ নাকি তার সাথেই?

— সেই দিন লোকটা কে ছিলো?

— রিলেটিভ।

— শপিংমলে কিন্তু সেই রকম মনে হয়নি।

— না মনে হলে কি আর করার, সত্যি তো সত্যিই।

— তা ঠিক! হয়তো আমার’ই বোঝার ভুল।

— সে রকম কিছু না। আমি তাদের বাসায়’ই থাকছি। আমার খালামণি তার চাচি।

— ওহ! বলেই ওলীদ একটু থামলো তারপর বললো, — সেই দিন আমি একটা প্রশ্ন করেছিলাম রিমি।

রিমি তাকালো। গালে হাত রেখে বললো, — আচ্ছা! উত্তর নেওয়ার জন্যই এতো আয়েজন?

— হ্যাঁ, তা বলতে পারেন। তবে ইচ্ছে না হলে বলার দরকার নেই।

রিমি হাসলো। হেসে হাত সামনে বাড়িয়ে দিলো। বললো, — আপনার রিকোয়েষ্ট এক্সসেপ্ট হলো মিষ্টার ওলীদ আশফাক।

ওলীদও হাসলো। তবে হাত বাড়ালো না। নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে রইলো । নিরাশ কন্ঠে বললো, — আরেক বার ভাবুন রিমি। আমি একবার হাত ধরলে সেটা আর ছাড়ি না । কোন পরিস্থিতিতে না। নাম যেটাই হোক সম্পর্কের, আমার কাছে তা খুব ইম্পোর্ট্যান্ট।

— আমি ওতো ভাবি টাবি না মিষ্টার ওলীদ। পাঁচ সেকেন্ড আপনার সময়। আপনি যেমন ধরলে আর ছাড়েন না। আমিও তেমনি দ্বিতীয় বার আর সুযোগ দেই না । টাইম স্টার্ট নাও পাঁচ, চার, তিন…..

ওলীদ সাথে সাথে হাত বাড়িয়ে রিমির হাতের সাথে হাত মেলালো। সে এক পাগল, এই মেয়েটা তো দেখা যায় তার চেয়েও পাগল। সে হাত ধরেই রিমির দিকে তাকিয়ে রইলো। সাধারণ চেহেরার সাধারণ একটা মেয়ে। তবুও তাকে এতো টানছে কেন? কই আগে তো কখনো এমন হয়নি। বিশেষত্ব টা কোথায় আপনার রিমি?

রিমির তেমন কোন প্রতিক্রিয়া হলো না। সে হাত ছাড়িয়ে নিলো । তারপর স্বাভাবিক ভাবে বললো,
— আপনার সম্পর্কে বলুন তে মিষ্টার ওলীদ। এখনতো জানতেই পারি নাকি?

— অবশ্যই পারেন।

— আপনি চাইলে আমাকে তুমি বলতে পারেন।

— সেটা আপনিও পারেন।

রিমি হাসলো, হেসে বললো, — আমি সব সময় আপনিতেই থাকবো, বাকি আপনার ইচ্ছা।

ওলীদ হাসলো! তখনি খাবার এলো। ওলীদ নিজেই গুছিয়ে এগিয়ে দিলো, দিয়ে নিজেও নিলো। নিয়ে খেতে খেতে বললো,

— আমার বাবা নেই। মা আর এক বোন আছে। আমাদের নিজ এলাকা কুমিল্লা। বোনের বিয়েও হয়েছে কুমিল্লা। মা একাতো, তাই বেশিভাগ সময় বোনের কাছেই থাকে। আমি এখানে এক কলিগের সাথে ফ্ল্যাট শেয়ার করে থাকছি।

— শেয়ার কেন? বেতন তো ভালোই হওয়ার কথা। মাকে নিয়ে ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট নিলেইতো পারেন।

ওলীদ খেতে খেতেই রিমির দিকে তাকালো। মেয়েটা সব কথা কাট কাট ভাবে বলে। জড়তা, সংকোচ নেই। এই যে বাচ্চাদের মতো খাচ্ছে। মাঝে মাঝে পাও নাচাচ্ছে। একবার তার পায়ের সাথে পা লাগলো। রিমি হয়তো খেয়ালই করেনি। ওলীদ নিজেই পা গুটিয়ে নিয়েছে। খেয়াল হলে হয়তো আনইজি ফিল করতে পারে।

— বদলির বেপারটা মা পছন্দ করে না। তাছাড়া শেষ বয়সে নিজ এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও থাকতেও চায় না।

— এর আগে কোথায় ছিলেন?

— গাজীপুর।

— বিয়ে করছেন না কেন?

— ভাগ্যে নেই তাই।

রিমি কৌতুহল চোখে তাকিয়ে বললো,
— কেন নেই?

— একজনের সাথে ঠিক ছিলো। এ্যারেঞ্জ ই বলতে পারেন। কলিগের বোন। মা পছন্দ করেছিলো। প্রায় তিন বছর কমিটেড ছিলাম। একটা এক্সিডেন্টে সি ইজ ডেড।

— দেখেতো মনে হয় না দেবদাস হয়ে বসে আছেন।

— কারণ আমি বসে নেই। কষ্ট পায়নি সেটা বলবো না। তবে বসে নেই।

— ভালো। সহজে মুভ অন করতে পারাটাও একটা ভালো গুণ।

ওলীদ মৃদু হাসলো। তবে আর কিছু বললো না। কিছুক্ষণ নিঃশব্দেই কাটলো। দু- জনেই নিজের মতো খেলো। ওলীদ যত্ন সহকারে মাঝে মাঝে এটা ওটা এগিয়ে দিলো।

তাদের দু- জনেরই খাওয়া শেষ। রিমি টিস্যু নিতে নিতে বললো, — আমার সম্পর্কে কিছু জানার আগ্রহ নেই?

— না।

— কেন?

— এমনিই।

— অদ্ভুত।

— একেক মানুষ একেক রকম রিমি।

— ভালো। লাটে কি আজই টেষ্ট করাবেন। নাকি সেটা জন্য আরো ঘুরতে হবে।

ওলীদ হেসে ফেললো। প্রাণ খোলা হাসি। এই মেয়ে নিজে হাসে কম। কিন্তু সামনের মানুষকে হাসাতে পারে সহজেই। সে হেসেই বললো, —- এতো সহজে আমি টেষ্ট করাচ্ছি না, ঘুরতে থাকো মিস রিমি।

রিমি উঠলো। মোবাইল পার্স নিতে নিতে বললো, — তুমিটা ভুলে মুখ ফসকে বলেছেন, না ইচ্ছাকৃত?

ওলীদ উঠলো না । সে আয়েশ করে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলো । বললো, — আমি ভুলেও কোন ভুল করিনা রিমি। যদি করতাম তাহলে তোমার সামনে বসে থাকতে পারতাম না ।

রিমি তাকালো। তার ঠোঁটের কোণেও হাসি। তবে এই কথার বিপরীতে সে কিছুই বললো না।

রিমি ছবি সামনে, দূরে, উল্টটিয়ে পাল্টিয়ে সব এঙ্গেলে দেখলো। দেখে কোন কমতি তার নজরে পড়লো না। গুণতো আর ছবি দেখে বোঝার উপায় নেই তবে রুপে টইটুম্বুর। অথচো এই মেয়ে নিয়েই ছোট খাটো এক যুদ্ধ আজ এ বাড়িতে হয়ে গেছে।

এই মেয়ে সবার মনে ধরেছে, শুধু নিসা বাদে । নাক নাকি একটু বাঁকা। কোমরও নাকি একটু বেশি ফোলা। লাজ লজ্জা নেই। পটর পটর নাকি বেশি করে। বিয়ে হলে নাকি দু- দিনেই মগজতো ভালোই তার ভাইয়ের মাথা শুদ্ধ চিবিয়ে খাবে।

রিমি তীক্ষ্ণ ভাবে ছবির দিকে আবার তাকালো। সামনের ফ্রান্টের ছবি। কোমরের কথা সে কিভাবে বলবে। সে ছবি থেকে চোখ উঠিয়ে ঠোঁট উল্টে বললো, — আমিতো কোন কমতি দেখছি না আন্টি। সব তো পারফেক্ট ই লাগছে।

মহুয়া এক গাল হেসে বললো, — একদম ঠিক বলেছো রিমি, আমিতো একশতো একশ দশ দিয়ে বসে আছি।

রিমি হাসলো কিন্তু নিসা খেঁকিয়ে উঠে বললো, — তোমার কাছে তো লাগবেই। নিজের চেহেরা পেয়ারা হলে সাদা চামড়া দেখলে সবাইকে তো আঙ্গুরই মনে হবে।

মুহুয়া চোখ গরম করে নিসার দিকে তাকালো। এই মেয়েটাকে নিয়ে সে কি করবে । কাউকে ভয় পায়না। চোপা চলে রকেটের গতিতে । শ্বশুর বাড়ি থেকে যে এখনো ধাক্কা দিয়ে বের করেনি এ ই অনেক।

রিমি ভ্রু বাঁকিয়ে তাকালো । নির্বিকার ভাবে বললো, — একেবারে সহমত আপু । আমার কাছে আসলে সবই আঙ্গুর । এই যে আপনার দুই ঠোঁট দুই দিকে ভেটকানো। তবুও আপনাকে আমার কাছে বিশ্বসুন্দরী মনে হয়। আর মানতেই হবে সাদা চামড়ার অনেক গুন। তা না হলে আপনাকে আফ্রিকান বলে যে কেউ অনায়াসেই ধোঁকা খেয়ে যেতো।

নিপা হা করে তাকালো! আয়েশা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রিমির দিকে তাকালো । মুহুয়া তো অবাক! এই মেয়েও তো কম না। আল্লাহ! আগুন লেগে যাবে এখন।

নিসা কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইলো। আজ পর্যন্ত তাকে এভাবে কেউ কিছু বলেছে বলে মনে পরে না । কলেজ, ভার্সিটিতে বরং এই ঠোঁট নিয়ে সে গর্ব করতো। গর্ব করে বলতো, সার্জারি করেও নিসার ঠোঁটের ধারের কাছে কেউ আসতে পারবে না । আর এখন শুনতে হচ্ছে ভেটকানো।

তার চোখে, মুখে, মাথায় আগুন লেগে গেলো। সেই আগুন নিয়ে’ই সে রিমির দিকে তাকালো। এই মেয়েকে তো সে জ্বালিয়ে ফেলবে। এতো বড় সাহস?

সে কিছু বলতে যাবে। তখনি সাব্বির সিঁড়ি বেড়ে নামলো। তার চোখ মুখ ফোলা, নাক লাল, গলায় মাফলার পেঁচানো। ঠান্ডা তাকে ভালো ভাবেই ধরেছে । সে ছুটি নিয়েছে দু- দিনের। এই অবস্থায় আর যাই হোক, পারফেক্ট ভাবে ক্লাস নেওয়া সম্ভব না।

নিপা ঝট করে সুন্দর ভাবে বসলো। বাবা, চাচা বাড়ির দু- মেয়েকে আদরে আদরে বাঁদর বানালেও, ভাইয়া তাদেরকে গনাও ধরে না। ঊনিশ থেকে বিশ হলেই এমন এক থাপ্পড় লাগাবে, তারা তো ভালোই সাথে দুনিয়াও ঘুরে যাবে।

নিপার কপালে অবশ্য কমই এই থাপ্পড় জুটে তবে নিসা যতোবারই বাপের বাড়ি আসে একটা না একটা ঝামেলা লাগিয়েই রাখে। তাই সব সময় দুই, একটা তার গালে অনায়াসেই পড়ে।

নিসা অবশ্য সেই থাপ্পড় কে গনায়ও ধরে না। তবে কিছুটা হলেও দমে। তবে এবার ভাইয়া রাগবে এমন কিছু মনে হয় না সে করবে। এবার সে এসেছে বিগ মিশন নিয়ে। যে করেই হোক তান ননদকে ভাইয়ার গলায় ঝুলাতে হবে। এমন না সে তার ননদকে চোখে হারায়। বাপের বাড়ির কৃতিত্ব যেন বজায় থাকে তারই এক ফালতু চেষ্টা । সে যদি তার বাপের বাড়িতে কৃতিত্ব না ফলাতে পারে তবে তার ননদও সেই বাসায় গিয়ে পাড়বে না, সিম্পল।

সে সুন্দর করে বসে রিমির দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো, — বেঁচে গেছো বাঁচাধন। তা না হলে আজকে তোমার খবর ছিলো।

রিমি মুখ বাঁকালো। বেঁচে যাওয়ার কোন খুশি তার মধ্যে দেখা গেলো না।

নিসা চোখে মুখে আগুন নিয়েই হনহন করে চলে গেলো। সাব্বির সেই চলে যাওয়া দেখলো। এর আবার কি হলো?

সে ঐ দিকে আর ধ্যান দিলো না। সে চোখ, মুখ কুঁচকালো। ড্রইং রুমের বারোটা বাজানো। কুঁচকেই তার মার উদ্দেশ্য বললো, — হঠাৎ করে একটা মানুষ আসলে কি বলবে বলতো? অন্তত ড্রইং রুমটা তো গুছিয়ে রাখো।

মুহুয়া দীর্ঘশ্বাস ফেললো! ফেলে মুখ ফুলিয়ে বসে রইলো। এক একটা নমুনা তার পেট থেকেই বের হওয়ার কোন দরকার ছিলো?

সাব্বির চোখ, মুখ কুঁচকে রিমিদের বিপরীত সোফায় বসলো। আজকে নাদু মামা নেই। আয়াশ, নুহাশ কে নিয়ে কোথায় গেছে কে জানে। তার জায়গায় হাসি খালা ধ্যান, মন লাগিয়ে টিভি দেখছে। বাংলা ছবি। পুরানো! সাবানা বুকে বালিশ চেপে কেঁদে কেঁটে দুনিয়া ভাসিয়ে দিচ্ছে। আর এই দিকে যে এতো কিছু হচ্ছে হাসি খালার হুশই নেই। তার সব হুশ জ্ঞান এখন সেই বালিশে।

সাব্বির বিরক্ত মুখে তাকালো। এই বাসায় পারফেক্ট চা বলতে হাসি খালাই বানায়। সে বিরক্ত মুখে বললো, — টিভি দু- মিনিটের জন্য রাখো তো খালা। দুনিয়া একটু পরে ভাসলেও চলবে। আমার গলার অবস্থা খারাপ। আমার জন্য যতো মসলা টসলা আছে দিয়ে এক কাপ চা বানিয়ে আনো।

খালা ফিরেও তাকালো না। শুধু হাত দিয়ে ইশারা করলো। যার অর্থ — গলা ভেসে যাক, আমি বাবা এখন উঠছি না।

রিমি ফিক করে হেসে ফেললো। সাব্বির চোখ, মুখ কুঁচকে তাকালো। তাকিয়ে তার মেজাজ আরো খারাপ হলো। এই মেয়ের গায়ে কালকেও এই জামা ছিলো। নিশ্চয়ই এসে গোসল তো ভালোই হাত মুখও ধয়নি। বসে গেছে আড্ডা দিতে।

সে ফুস করে বড় একটা শ্বাস ফেলে নিজেই কিচেনের দিকে এগুলো। তার কপালে যে কি আছে একমাত্র আল্লাহ ই জানে।

চলবে……