আনমনে সন্ধ্যায় পর্ব-১৬

0
84

#আনমনে_সন্ধ্যায়
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ১৬

রিমি পেট চেপে হাসতে লাগলো । হেসে তার গড়িয়ে পড়ার অবস্থা। আশিক ভাই আর সে এসেছে ছাদে। ছাদে আসতেই আশিক ভাই কালকের ঘটে যাওয়া সব ঘটনা বললো। তার ধারণা এই বাড়ির সবার মেন্টাল প্রবলেম আছে। আর না হয় সমস্যা এই বাড়িতে । কেমন আজব বাড়ি! দেখলেই তো গা ছম ছম করে। সারা রাত সে দু- চোখ এক করতে পারেনি।

সে ঠিক করেছিলো সকালে উঠে রিমির সাথে দেখা করেই দৌড়। কিন্তু বাঁধ সাধলো তার ফুপা। লোকটা অমায়িক। তাকে নিয়ে তার ফুপুর হেলদোল না থাকলেও, এই বাড়ির সবাই আদিখ্যেতার চূড়ান্ত করছে।
সবার এক কথা, এক সাপ্তাহের আগে যেতে দেবে না। আবার কবে নাকি আয়াশের জন্মদিন। সেটাও খেয়ে যেতে হবে। আরে জ্বালা, তার তো একদিনই কাটতে চাইছে না। এতোদিন থাকবে কিভাবে? তাছাড়া যে বাড়ি, যে টাইপের মানুষজন, জান নিয়ে সে ফিরতে পারবে কিনা তারও ক্ষীণ সন্দেহ আছে।

আশিক বিরক্ত মুখে বললো,– এভাবে হাসছিস কেন?

রিমি হেসেই বললো,– তো কি করবো?

— আমার যাওয়ার ব্যবস্থা কর।

— কোন ঠেকা, আমি আসতে বলেছি?

— তুই না বললেও কারণ তো তুই।

— খবরদার বলে দিলাম, একদম আমাকে দোষবে না। মায়ের সামনে তোতলাতে তোতলাতে জিহ্বা খসে পড়ে, আর আমার সামনে এসে যতো ঢং। মাকে বলতে পারোনি যেতে পারবো না।

— হাজার বার বলেছি রিমি কথার মধ্যে মা কে টানবি না।

রিমি ভেঙিয়ে বললো, — মা কে টানবি না। এসেছে আমার মায়ের চামচা।

— বড় ভাই বলেতো জীবনেও মান করলি না। অন্তত বয়েসের সম্মানটুকু তো দিতেই পারিস।

রিমি ভেংচি কাটলো! এসেছে আমার বড় ভাই।

আশিক দীর্ঘশ্বাস ফেললো! মেয়ে জাতটাই ত্যাড়া। এরা কসম খেয়ে পয়দা হয়। জীবনে এরা সব করবে তবে কোন পুরুষ মানুষের কথা শুনবে না।

তখনি নিপা আসলো। লজ্জায় গড়াগড়ি খেতে খেতে। এতো সকালেও সে পরিপাটি। মুখে একমণ মেকাপ ঘষা শেষ । সে ওড়নার কোণা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে মুচকি হেসে বললো, — চাচি নাস্তার জন্য নিচে ডাকছে।

আশিক ভ্রু উঁচু করে তাকিয়ে রইলো, — সামান্য একটা কথা, এখানে এতো লজ্জায় লাল, নীল, বেগুনি হওয়ার কি হলো? এই মেয়ে মানুষ না তার চিন্তার বাইরের সাবজেক্ট। অথচো কালকেও দেখো, দিব্যি নেচে নেচে আশে পাশে ঘুরে বেড়ালো, হা করে তাকিয়ে রইলো। এখন তো চোখ তুলতেই পারছে না। আজব!

রিমি ঠোঁট টিপে হাসলো। হেসে বললো,
— তুমি যাও নিপা আমরা আসছি।

নিপা চলে গেলো। যেতেই আশিক বললো, — কি সমস্যা এই মেয়ের?

— মরণ ব্যাধিতে পেয়েছে। এখন জলেও ডুববে না, আবার ডাঙাও টিকবে না। ছটপট করতে করতে বাকি জীবন পার।

— কি বলিস?

— সেটা যদি বুঝতে তাহলে তো কাজই হয়েছিলো।

— কি হয়েছিলো?

— আমি কি জানি?

— তুই না বললি?

— আমি আবার কি বললাম?

— রিমি?

— আশ্চর্য! চেঁচাচ্ছো কেন?

আশিক দীর্ঘশ্বাস ফেললো । এই মেয়ে কথা বর্তায় হেঁয়ালিতে এক্সপার্ট। এর জন্য কতো চড়
থাপ্পড় যে খেয়েছে তার হিসেব নেই। তবে এখানে এসে হাসিখুশি রিমিকে দেখে তার ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে অন্যরকম একটা দ্যুতি ছড়াচ্ছে। অবশ্য কিসের সে জানে না। লেখা পড়া ছাড়া বাকি সব কিছুতেই সে আনাড়ী । তাবে সে এই টুকু জানে, এই মেয়েটা জনম দুঃখী । অবশ্য তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই। এই মেয়ে যেমন কোন মানুষকে গনায় ধরে না, তেমনি দুঃখকেও ধরে না।

— তুই যাবি কয়টায়?

— নাস্তা খেয়েই বেরিয়ে যাবো।

— ফিরবি কয়টায়?

— ঠিক নেই।

— এতো রিস্কের চাকরিটা না করলেও হতো।

রিমি হাসলো! কিছু বললো না।

— কালকে এতো মরার মতো ঘুমালি কেন? টেনশনে ফুপির প্রেশার ট্রেশার উঠে শেষ।

রিমি কিছু বললো না, তার টেনশনে তার খালমণির অবস্থা শুনে কোন ভাবান্তরও হলো না। সে নিজের মতো হেলে দুলে হেঁটে ছাদের কর্নারে দিকে এগিয়ে গেলো। কার্নিশে ভর দিয়ে নিচের দিকে ঝুকলো। সাব্বির বেরোবে। আজকে অবশ্য ফরমাল গেটাবে নেই। গায়ে টিশার্ট, তার উপরে বুক খোলা কালো হুডি। জিন্স, কেডস। সে নিচু হয়ে কেডসের ফিতে ঠিক করছে।

রিমি হাসলো! দুষ্টু হাসি! সবাই ছাদে ফুলের বাগান টাগান করে। এই বাড়ির ছাদে সে রকম নেই। কয়েকটা টব আছে অবশ্য। সেগুলোতে মরা পুঁইশাকের ডাটা দাঁড়িয়ে আছে।

সে সেখান থেকে একমুঠো মাটি নিলো। কুয়াশায় হালকা ভেজা তবে মুঠো করা গেলো না, ঝরঝরে। তবুও যা করা যায় ততোটুকু করে ছুঁড়ে মারলো। মেরে আশিকের হাত ধরে দিলো এক দৌড়।

আশিক হতম্বভ! কি হলো? সে কিছুই বুঝতে পারলো না। শুধু বললো, — আল্লাহ! কি করলি তুই?

— যা করার করেছি। এখন মুখ বন্ধ, একদম বন্ধ। তা না হলে তোমাকে বিয়ের জন্য রাজি হয়ে যাবো বলে দিলাম।

আশিক সাথে সাথেই মুখ বন্ধ করে ফেললো। সে আছে মাইনকার চিপায়। এক দিকে মা, দাদি আর অন্য দিকে এই মেয়ে। ছোট বেলা থেকে রিমিকে সে আলাদা চোখে কখনও দেখেনি। তার নিজের বোনদের যেমন দেখেছে তেমনি। কিন্তু এখন হয়েছে জ্বালা। তার নাকি বিয়ে করতে হবে রিমিকে। কি যন্ত্রনা? ফিলিংস বলেও তো কিছু আছে নাকি। নিষেধ করেও লাভ হচ্ছে না। মা, দাদি কসম দিয়ে বসে আছে। কিভাবে যে এদের বুঝাবে কে জানে। এখন একমাত্র শেষ ভরসা এই রিমিই। তাই ভাই যেমনে নাচায় তেমনি নাচতে হচ্ছে ।

আয়াশের গালে আজকে থাপ্পড় টা অবশ্য সাব্বির দিলো না, দিলো আয়েশা। মেজাজ আজ তার তুঙ্গে। ছেলেটা দিন দিন বড় হচ্ছে না ছোট। বাচ্চা হয় না, হয় না করে পর পর দুটো মিসক্যারেজ। তার অনেক দিন পর আয়াশের জন্ম। একতো সাধনার ধন আবার বাড়ির সবচেয়ে ছোট। তাই আদরটা পেয়েছে বেশি। সেই বেশি আদরেই হয়েছে বাঁদর। এর বাঁদরামি দিন দিন বাড়ছেতো বাড়ছেই। কি করবে সে এই ছেলের।

থাপ্পড় খেয়ে অবশ্য আয়াশের কোন ভাবান্তর হলো না। ভাইয়ার একমণ সাইজের হাতের থাপ্পড় ই সে হেসে হেসে হজম করে। এই আর কি? তবে সে এটাই বুঝতে পারছে না। সে বাথরুমে গেলেই তার হয়ে এই অকাজ গুলো কে করছে। এখন তো তার বাথরুমে যেতেই ভয় করবে। রিমি আপুর কথাই ঠিক কিনা কে জানে। টাঙ্কিতে কিছু আছে নাকি?

থাপ্পড়ে আয়াশের কিছু না এলেগেলেও নুহাশ এক চিৎকার দিয়ে কেঁদে ফেললো। এটা তার ফেভারিট মামা। এই মামার কষ্টই মানে তার কষ্ট।

আর তার কষ্ট মানেই নিসা, নাদু। তারা দুজনেই ফুঁপে উঠলো। নিসা তেজের সাথে বললো, — না জেনে তুমি ওকে মারলে কেন চাচি?

— এই বাসায় এই অকাজ আর কে করে?

— ও করে বলে আজও এটা করেছে তার প্রমাণ আছে?

— তাহলে তুমি বলো আর কে করতে পারে?

নিসা উত্তর খুঁজে পেলো না । তবে এইটা সত্যিই ফাজিল। নুহাশের আব্বুকে চুলে জেল বলে একবার গ্লু লাগিয়ে দিয়েছিলো। কি একটা অবস্থা। পরে বেল মাথা হয়ে ঘুরতে হয়েছে। সেই থেকে শ্বশুর বাড়ি সে আসতেই চায়না । আসলেও এক দু- ঘন্টায় ই পাগারপার, ভুলেও রাত থাকবে না।

তার ভাস্যমতে চুলতো কিছুদিন পরে ফিরে এসেছে, অন্য কিছু গেলে আর আসবে না। তাই আগেভাগেই সেইভ থাকা ভালো।

সেই থেকে নিসা একাই আসে। অতিরিক্ত দরকার ছাড়া শ্বশুর বাড়িতে সে পা মাড়ায় না। সব জেনেও নিসা তেজের সাথে বললো, — না শিওর হয়ে থাপ্পড় মারা ঠিক হয়নি চাচি, এটা অন্যায়।

আয়েশা নিসার কথার আর উত্তর দিলো না। আয়াশের দিকে তাকিয়ে বললো — এটা লাস্ট বার। তা না হলে হোস্টেলে দিয়ে দেবো। একা থাকলেই সব ফাজলামি বের হয়ে যাবে।

হুমকি শুনে এবারো আয়াশের তেমন পরিবর্তন হলো না। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে এই হুমকি সে শুনে আসছে। তবে তাকে ফাসাচ্ছে টা কে? মনে মনে বলতেই তার চোখ রিমির দিকে পড়লো।

পড়তেই রিমি ঠোঁট টিপে হাসলো। সাথে সাথেই আয়াশ হা হয়ে গেলো। প্রথম থেকে সব ট্রেনের গতিতে চিন্তা করতে লাগলো। রিমি আপু আসার পর থেকেই তো এই কাহিনী হচ্ছে। ওহ আচ্ছা! এ হলো তার ট্যাঙ্কির ভূত। সব ক্লিয়ার এখন তার কাছে। ধুর আগে কেন তার মাথায় আসেনি?

সাব্বির চেঞ্জ করে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। তার মেজাজের পারদ উঠে আছে সপ্তম আকাশে। এমন শীতের সকালে বার বার গোসল, বার বার রেডি হওয়া বিরক্তিকর। ঝরঝরে মাটি, শুধু তার গায়ে পড়েনি, মাথায়ও পড়েছে। পড়ে পুরো মাথা মাখামাখি। শ্যাম্পুই করতে হলো দু বার। এখনও ভালো ভাবে তার ঠান্ডা ঠিক হয়নি। হালকা কাশি আছে। এর মধ্যে সাত সকালে আবার এতোবার গোসল। আবার লেগে যায় কি না কে জানে?

তখনি দরজায় টোকা পড়লো, সাথে আওয়াজ
— আহুমনি আব্বা?

সাব্বির এবার শার্ট পরেছে। হাতা ফোল্ড করতে করতে বললো, — এসো খালা।

হাসি খালা ভেতরে আসলো। তার হাতে চায়ে কাপ। সাব্বির অবাক হলো। না চাইতেই চা? তাও আবার খালা। নিশ্চয়ই কোন কথা পাচার করতে এসেছে। এখানে কথা ওখানে, ওখানের কথা এখানে পাচার করা হাসি খালার অভ্যাস। এখন কোন কথা পাচার করতে এসেছে কে জানে?

সে চুল ঠিক করতে করতে বললো, — এখন চা খাবো না খালা। তুমি খেয়ে ফেলো।

— সেটা যে খাইবা না আমি ভালো কইরাই জানি। সাত সকালে চৌদ্দবার নাহান, গতরে আর কতো শইবো। তাই বুদ্ধিখাটায়া আনলাম। যদি খাও। বলেই হাসি খালা নিজেই চায়ে চমুক দিলো।

সাব্বির হালকা হাসলো! কিছু বললো না।

— থাপ্পড় কিন্তু একটা কম হইছে। চাপায় আরো দুই তিনটা দেওয়ার দরকার ছেলো। সাত সকালেই শুরু করে বাঁদরামি। কামের মানুষ কামে যাইবো। তার মইধ্যে বাঁধা। আর ঐ দিকে চলছে রঙলীলা। পরের বাড়ি কাম করি বলে কতোকিছু যে দেহার লাগে।

সাব্বির ভ্রু কুঁচকালো। খাটে বসে মোজা পায়ে দিতে দিতে বললো, — কি হয়েছে খালা?

— আর কইয়ো না আব্বা। ধরলাম বিয়া ঠিক। তাই বইলা হাত ধইরা দলাদলি কইরা নাচোন কুদুন লাগবো? ভদ্র মাইনষের বাড়ি, ঘর ভরা মানুষ, ছোট ছোট পুলাপাইন। একটু চিন্তা ভাবনা তো কইরা চলা দরকার তাই না?

সাব্বির থামলো। তাকিয়ে বললো, — সোজা করে বলোতো খালা। এতো পেঁচাচ্ছো কেন? এমনিতেই আমার সময় কম। কে আবার কি করলো?

— কে আবার! রিমি আম্মা আর ঐ যে নতুন ছোকরা। কালকে যে আইলো। যহন তোমার উপর মাটি পড়লো। তুমি চিৎকুর কইরা উঠলা। আমিতো দু- তলায়। ঝাড়ু লাগাইতেছিলাম। আমি তোমার দিকে যামু তহন তাগো দেখলাম। ছাদ থাইকা নামতাছে। হাতের মইধ্যে হাত। মুখ ভরা মুক্তা ঝরা হাসি।

সাব্বির থমকালো! রিমির বিয়ে ঠিক হয়ে আছে নাকি? সাথে সাথেই তার ধ্যান হাসি খালার দিকে গেলো। শিট! হাসি খালা কথা পাচারও করে জায়গা বুঝে। তার মানে হাসি খালা সব ধরে ফেলেছে ।

সে মনে মনে, মনে করার চেষ্টা করলো। কি করেছে সে, যে হাসি খালা এতো সহজেই ধরে ফেললো। অবশ্য এই মেয়ে এসেছে পরে যা যা করছে সবই তার স্বভাবের বাইরে।

সে মনে মনে বড় একটা শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালো। হাসি খালা ধরা মানে আস্তে আস্তে এখন বাড়ির সবাই জানবে। এর পেটে কথা থাকেনা। অবশ্য কোন সমস্যাও নেই। তাকে কেউ কিছুই বলবে না। এমন ভাবে থাকবে যেন কেউ কিছু জানেই না। তাদের ঘাড়ের ব্যথার গতি হচ্ছে, এতেই তারা সন্তুষ্ট। তবে নিসা বুঝতে পারলে সমস্যা। ভালো ভাবে সব কিছু সেট হওয়ার আগেই ঝামেলা পাকিয়ে ফেলবে।

আর যাকে নিয়ে এতো কিছু , সে গুটুর গুটুর করছে এক ব্যাংকুর সাথে। হাতে হাত রেখে ঘুরে বেড়াচ্ছে ভাইয়ের সাথে। এতো লম্বা, চাওড়া, সুদর্শন একটা মানুষ সামনে তাকে কি তার চোখে পড়ে না? হুহ্!

বলেই সে বেরোবে তখনি সে ঝটকাটা খেলো! ওয়েট! রিমি কোথা থেকে নামছিলো? ছাদ, ঝরঝরে মাটি, তার মধ্যে মুক্ত ঝরা হাসি। এই মেয়ের মুখে হাসি একমাত্র অন্যকে বিপদে ফেলতে পারলেই বের হয়। তা না হলে সব সময় হাসি খালার তালতো বোন। হাসির হও তাদের আশে পাশে নেই।

এক মিনিটেই তার কাছে সব ক্লিয়ার হয়ে গেলো। সে দাঁতে দাঁত চেপে বললো, — রি-মি… তোমাকে তো আমি সত্যি সত্যি পানিতে চুবাবো।

চলবে……