আনমনে সন্ধ্যায় পর্ব-২৯+৩০

0
56

#আনমনে_সন্ধ্যায়
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ২৯

ওলীদ সিগারেট ধরালো। চোখ বন্ধ করে ধোঁয়া ছেড়ে বিরবির করে বললো, — এই সময় না বয়ে যাক । এভাবেই কেটে যাক জনম জন্মান্তর।

রিমি ভ্রু কুঁচকে বোঝার চেষ্টা করলো, বলছেটা কি ? অবশ্য বুঝতে পারলো না। ওলীদ দাঁড়িয়ে আছে জানালা ঘেঁষে। আর সে এই সাইডের চৌকিতে, মাঝে দূরুত্বটা ভালোই।

সে দীর্ঘশ্বাস ফেললো! ফেলে আগের মতোই বিরক্তি চেপে চুপচাপই বসে রইলো। কতোক্ষণ এভাবে থাকা যায়? হাত পা শেষ। মেরে ফেললে মেরে ফেলুক। মাছের মতো জিয়িইয়ে রেখে লাভ কি? রাত কতো কে জানে, শরীরও ঝিমিয়ে আসছে। সে বিরক্তি নিয়েই বললো, — এটা কোন জায়গা?

ওলীদ চোখ খুললো! মনে মনে হাসলো। রিমি তাকে ভয় পাচ্ছে। অবশ্য তাকে বুঝতে দিচ্ছে না। এই ভয়, এই আকুতি গুলোই তাকে প্রশান্তি এনে দেয়। তবে রিমির প্রশংসা করতেই হবে। এরকম পরিস্থিতেও সে চুপচাপ, শান্ত । আর ফাজিল চৈতি হুশ আসতেই চিৎকার চেঁচামেচি করে মাথা শেষ করে ফেলেছিলো।

সে এগিয়ে এলো! আসতে আসতে রিমির মতো স্বাভাবিক ভাবেই বললো,

— বেশি দূরে না। ঢাকার একটু সাইডে। বলেই রিমির পা খুলে দিলো। রশির দাগ পড়ে গেছে।

রিমি সাথে সাথে পা সোজা করলো। করে কিছু বলবে তার আগেই ওলীদ ঝট করে কোলো তুলে নিলো। রিমি চমকে গেলো।

ওলীদ রিমিকে জানালার সামনে এনে দাঁড় করালো। রিমি সোজা দাঁড়াতে পারলো না। পা অসাড় হয়ে আছে। পড়ে যেতে নিলো। ওলীদ আগলে ধরলো।

টিনের ঘর, ছোট জানালা। তার সামনে রিমিকে দু- হাতে আগলে ওলীদ পেছনে দাঁড়ালো। খুব কাছে, গায়ের সাথে গা লাগিয়ে।

রিমি কিছু বললো না। তার ধারণা ওলীদের মানসিক সমস্যা আছে । এই ভালো, এই খারাপ। সম্ভবতো এক সত্বা তাকে ঘৃণা করে, আরেক সত্বা ভালোবাসে। তাই সিন্ধান্তহীনতায় ভুগছে। তা না হলে এখনো ঝুলিয়ে রেখে লাভ কি?

রিমি ভাবতে লাগলো। তাকে যে করেই হোক এভাবেই রাখতে হবে। কিছুতেই তাকে রাগানো যাবে না । যতো সময় নেওয়া যায়। এতোক্ষণে তো সবার বুঝে যাওয়ার কথা। বুঝে নিশ্চয়ই চুপচাপ বসে থাকবে না। যেহেতু ঢাকা থেকে বেশি দূরে না। চেষ্টা করলেই খুঁজে পাওয়া যাবে। শুধু সময় দরকার।

— কি সুন্দর রাত দেখেছো রিমি। কুয়াশার চাদরে সব ঢেকে আছে।

— রিমি সুন্দর রাতের কিছুই দেখলো না। আশে পাশে নজর বুলালো। অন্ধকার, কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হু হু করে ঠান্ডা বাতাস গায়ে লেগে কাঁপুনি ধরে যাচ্ছে। এরকম বাতাস থাকে খোলা জায়গায়। ঢাকা শহরের এরকম খোলা জায়গা কোথায় হবে? গ্রামের সাইড ! হ্যাঁ একমাত্র গ্রামের সাইডেই মাইলের পর মাইল খোলা খেত থাকে। অবশ্য সে ভালো করেই জানে জনমানবহীন জায়গা । তা না হলে মুখ খোলা থাকতো না।

— এই বাড়িটা কিসের?

— এখানে একটা কারখানা হবে। পরিচিত এক বন্ধুর। খেতের জমি কিনে বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে । কিছুদিন পর থেকে কাজ শুরু হবে। এই ঘরটা এটা সেটা রাখার জন্য। মাঝে মাঝে অবশ্য অন্য কাজেও ব্যবহার হয়।

— অন্য কাজে?

— হ্যাঁ ! অনেক পরিচিতরা মেয়ে নিয়ে আসে। নিরিবিলিতে সময় কাটায়। আমিও তাকে ফোন দিয়ে বললাম। সে খুশি মনে রাজি হয়ে গেলো।

রিমি স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। শরীরে তার আগুন জ্বলছে। তবে অনেক কষ্টে নিজেকে দমালো। দমিয়ে বললো, — আমাকে আনলেন কিভাবে?

— তোমার পার্সে স্কোপালামিন দেওয়া ছিলো।

রিমি চমকে উঠলো! আল্লাহ! এ জন্যই ওলীদ যতোগুলো মার্ডার করেছে। কোন হাতাহাতি, ধস্তাধস্তি নেই। কারণ তারা জানেই না, তাদের সাথে কি হচ্ছে। এটা এমন একটা ড্রাগ। যা সরাসরি নিশ্বাসের মাধ্যমে শ্বাসলানীতে প্রবেশ করে। প্রবেশের সাথে সাথে দেহ বশ করে ফেলে। বাস্তব বোধ হারিয়ে যায়। সে তখন পুতুল। তাকে যা করতে বলা হবে তাই করবে।

তার গলা আগেই শুকিয়ে ছিলো। সেই খরখরে শুকনো গলায় রিমি ঢোক গেলার ব্যর্থ চেষ্টা করলো। হুশই যদি না থাকে করবে টা কি? তার সাথেও ওলীদ এখন যা খুশি তাই করতে পারে। এ জন্যই কি সে এতো স্বাভাবিক? সে কোন রকম ঢোক গিলে অস্ফুটভাবে বললো, — পানি খাবো।

ওলীদ সরে গেলো। রিমি জানালার গ্রিল হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। এই হাত শেষ। কোন ভাবে ছাড়াতে পারলেও কিছু করতে পারবে বলে মনে হয় না।

ওলীদ কালো ব্যাগটা থেকে পানির বোতল বের করলো। রিমি তাকিয়ে দেখলো। কতো কিছু নিয়ে এসেছে কে জানে। তার হাসি পেলো গেলো। সামান্য একটা মেয়ে সে, তাকে মারতেও কতো আয়োজন।

ওলীদ রিমির হাসি হাসি মুখ দেখলো। দেখে ভ্রু কুঁচকে বললো, — এরকম পরিস্থিতেও কোন মেয়ে হাসতে পারে তোমাকে না দেখলে জানতামও না। তোমাকে যতো দেখছি ততো অবাক’ই হচ্ছি।

রিমি বড় একটা শ্বাস ফেলে বললো, — জানবেন কি করে। কাউকে কোন সুযোগ দেওয়াই হয় না। তারা জানেও না তাদের সাথে কি হচ্ছে। সেই হিসেবে আমি ভাগ্যবান। অনন্ত স্বজ্ঞানে মরছি।

ওলীদ হেসে ফেললো! সে তার পুরো জীবনে এরকম মেয়ে দেখেনি। হেসে এগিয়ে এলো। বোতল খুলে রিমির সামনে ধরলো। রিমি খেতে পারলো না। দু- ঢোক খেতেই কাশি এসে গেলো। কাশতে গিয়ে পানি দিয়ে রিমি পুরো মাখামাখি হয়ে গেলো।

ওলীদ রিমির পিঠ বুলিয়ে দিলো। কাশি থামতেই হাত দিয়ে যত্ন করে মুখ, গলা মুছে দিলো। বুকের কাছটা ভিজে গেছে। ওলীদ সেখানে তাকালো।

রিমি দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইলো! তার এখন কন্ট্রোল দরকার। কন্ট্রোল! তার ধারণা তার নিজেও কিছু মানসিক সমস্যা আছে! কখনো ডান, বাম দেখে না। ফট করে জ্বলে উঠে। এই জ্বলা পরে চাইলেও আর দমাতে পারে না। এখন জ্বলে উঠলেই সে শেষ। তাই আস্তে করে সরে যেতে নিলো।

ওলীদ সরতে দিলো না। বোতল ফেলে ঝট করে রিমিকে ঝাপটে ধরলো। মুখে, গলায় এলোপাতালি চুমু দিতে দিতে ঠোঁট আঁকড়ে ধরলো।

রিমি শক্ত হয়ে গেলো। তার কন্ট্রোল শেষ। সে মরতে রাজি তবে হারতে না। শরীরের সব শক্তি দিয়ে রিমি হাঁটু উঁচু করলো।

ওলীদ কুঁকিয়ে তার দু- পায়ের মাঝে হাত দিয়ে চেপে বসে পড়লো। রিমি সুযোগ মিস করলো না। ওলীদ নিচু হতেই মুখে লাথি মারলো । একটা না পর পর দুই তিনটা। দুই মেন্টাল একই জায়গায় সব কিছু এতো স্বভাবিক মানায়?

ওলীদ পড়ে গেলো। তার নাক দিয়ে দরদর করে রক্ত বের হচ্ছে। রিমি সেই দিকে ফিরেও তাকালো না। তাকে নাকি ভালোবাসে! এই হচ্ছে ভালোবাসার নমুনা? কাপুরুষের দল! তোদের সব ভালোবাসা এক জায়গায়ই এসে শেষ হয়। বলেই রিমি আরেকটা মারলো।

মেরে কালো ব্যাগটার দিকে তাকালো। দৌড়ে সেটার কাছে যাবে। তখনি ওলীদ রিমির পা চেপে ধরলো।

সে কাঁপছে! ব্যথার না রাগে রিমি বুঝতে পারলো না। অবশ্য বোঝার সেই সময়টুকু পেলোও না । ওলীদ ঝট করে উঠে খাম্বার সাথে তার মাথা একটা বাড়ি দিলো।

রিমি থমকে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। তার কানের পেছন দিয়ে তিরতির করে কিছু একটা গড়িয়ে পড়তে লাগলো। খাম্বাটা সিমেন্টের! কোনা বরাবর লেগেছে।

ওলীদ সেই তিরতির করে গড়িয়ে পড়া রক্তের দিকে তাঁকালো। তাঁকিয়ে নিজের নাক, মুখের রক্ত মুছলো। তার ঠোঁটের কোণে হাসি। চোখে মুখে এখন অন্য এক রকম তৃপ্তি। যেন এর চেয়ে আর সুন্দর দৃশ্য আর দ্বিতীয় টি নেই।

সেই তৃপ্তি ভরা চোখের দিকে রিমি তাকিয়ে রইলো। এই চোখ তার চেনা। ভীষণ রকম চেনা। এই চোখ মানুষের মতো দেখতে জানোয়ারের চোখ। এই জানোয়ার ভিন্ন রুপে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আসে। তার জীবনে আরেক বারও এসেছিলো। সেই যে ছোট বেলায়। নানা মারা গেলেন। তার খাবার, দাবারের তো কেউ খেয়াল রাখে না। তার মধ্যে মরা বাড়ি। তার কথা কারো মনেও নেই। তার বেশিভাগ সময়ই কাটতো বাড়ির পেছনে। বিভিন্ন রকম ফলটল খেয়ে। সেই দিনও গেলো। তখনি একটা মোটা হাত, বিশাল দেহ তাকে জাপটে মাটিতে চেপে ধরলো। এক হাতে মুখ চেপে আরেক হাতে পায়জামা টেনে খুললো। হালকা, পাতলা গড়নের ছোট্ট রিমির কি আর এই শক্ত, সামার্থ্য লোকের সাথে পারা সম্ভব? না, সম্ভব না! সেও পারলো না। সে শুধু দেখলো দু- টো চোখ। হিংস্র, ভয়ানক দুটি চোখ তারপর…

রিমি আর ভাবতে পারলো না। তার চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো। শরীর হয়ে এলো অসাড়! তার মনে হলো সে শূণ্য উঠে যাচ্ছে। সে ঢলে পড়ে যেতে নিলো।
ওলীদ তাকে আগলে ধরলো! ধরতেই তার দু- হাত রক্তে ভেসে গেলো।

সাব্বির মাথা চেপে থানায় বসা। সে স্থির হতে পারছে না। কি দম বন্ধ করা অনুভূতি। বুকের মধ্যে থেকে কিছু একটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। ইশ! এতো কষ্ট?

ওবাইদুল ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন! তার চোখে পানি। মনে মনে বললেন, — আল্লাহ মেয়েটাকে রক্ষা করো।

রেজাউল সাইডেই বসা । সে চুপচাপ! শক্ত হয়ে বসে আছে। নাঈম তার হাত ধরলো। বরফের মতো ঠান্ডা।

মধ্য রাত, পুরো থানা সরগরম। সব অফিসরাই এখন থানায়। থানার সামনে থেকেই একজন কনস্টেবল মিসিং। এটা ছোট কথা না।

তখন রুমেল সবাই কে ফোন করতেই সবাই সজাগ হলো। সবচেয়ে বেশি হলো মিথিলা। সে তাড়াতাড়ি শামীম স্যারকে ফোন করলো। সব খুলে বলতেই শামীমের হুশ হলো। সে তাৎক্ষণিক সবাইকে থানায় আসতে বললো। প্রথমে সি সি ফুটেজ চেক করা হলো। মিথিলা যা বলেছে তাই। রিমি একটা লোকের সাথে নিজে থেকেই এগিয়ে যাচ্ছে। লোককটা কে বোঝা যাচ্ছে না। তবে শামীম জানে এটা কে? আর এও জানে রিমি নিজে থেকে এগিয়ে যায়নি।

ওলীদ বাথরুমে যে লোকটাকে খুন করেছে। পোস্ট মর্টেমে রক্তে স্কোপালামিন ড্রাগস পাওয়া গেছে। সে নিশ্চিৎ রিমিকেও সে ড্রাগস প্রয়োগ করা হয়েছে। শিট, শিট… তার জন্য মেয়েটা ফেঁসেছে। সে এতো হালকা ভাবে কেন নিয়েছে।

অফিসার ইন চার্জ শামীম কে তার কেবিনে ডাকলো। সব বিস্তরিত শুনলো। শুনে শান্ত ভাবে বললো, — টাকা খেয়ে ভয়ংকর এক অপরাধীকে ছেড়ে দেওয়া। সেই অপরাধী থানার সামনে থেকেই এক কনস্টেবল কে কিডন্যাপ করা। এটা ছোট কথা না শামীম। যদি ট্যাগেল নাই দিতে পারো এমন কাজ করো কেন? সাইন নেওয়ার সময়তো বুক ফুলিয়ে বলো। আমি দেখবো স্যার! এখন? এটা লিক হলে কি হবে জানতো? সবার রেপুটেশন নিয়ে টানাটানি লাগবে।

— এমপির লোক স্যার। কি করবো?

— আমি জানি না। তুমি ফেলেছো, তুমি সব ঠিক করবে। আর রিমির যদি কিছু হয় সম্পূর্ণ দায় তোমার। মিথিলার কাছে আমি সব শুনেছি। লোকটা সোজা হুমকি দিয়েছিলো, তবুও তুমি এতো হালকা ভাবে কেন নিয়েছো।
— স্যরি স্যার।

— তোমার স্যরিতে সব ঠিক হবে শামীম? যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব এমপির সাথে যোগাযোগ করো। আমরা যদি ফাঁসি তাহলে তাকে বলো সেও ফাঁসবে।

শামীম কেবিন থেকে বেড়িয়ে আসলো। সাথে সাথেই এমপির সেক্রেটারিকে ফোন দিলো। মধ্যে রাত ধরবে কি না কে জানে। ধুর… রিমিতো ভালোই এখানে তার জান নিয়েও টানাটানি।

চলবে…..

#আনমনে_সন্ধ্যায়
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ৩০

রিমি চোখ মেললো ধীরে ধীরে! এখন অবশ্য বাল্ব জ্বলছে না। টিমটিম করে ঘরের এক কোণে ছোট একটা মোমবাতি জ্বলছে। সম্ভবতো ক্যারেন্ট নেই। আধো আলো, আধো অন্ধকারে মশা চোখে মুখে এসে পড়ছে।

সে কাঁপা কাঁপা হাতে মাথায় হাত রাখলো! ব্যান্ডেজ পেঁচানো। ভার হয়ে আছে। চিনচিন করে কোথাও একটা ব্যথা হচ্ছে। রিমি ধরতে পারছে না।

সে আস্তে আস্তে হাত নামালো। হাত, পা এখন তার খোলা। তবে নাড়ানোর শক্তি নেই। মনে গচ্ছে ভারী কিছু একটার নিচে চাপা পড়ে আছে।

সে আবার চোখ বুঝলো! সারা দুনিয়ার ভার বুঝি চোখের পাতায়। তার গায়ে এখন সোয়েটার নেই। চাদর জাতীয় কিছু একটা গায়ে ।

সে বড় একটা শ্বাস ফেললো! তার মনে হলো জনম জনম ধরে সে এখানে বন্ধি। কতো দিন সূর্য দেখেনা, আকাশ দেখেনা, মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নেয় না। অথচো কতো ঘন্টা হবে? বড়জোর সাত, আট ঘন্টা।

ভোর হচ্ছে! অস্ফুটভাবে দূর থেকে আযান ভেসে আসছে। সে হালকা নড়ার চেষ্টা করলো। তবে ব্যর্থ! তার মনে হচ্ছে তার শরীর তার সাথে নেই। এই যে এতো কিছু ভাবছে। সেটাও মনে হচ্ছে ভ্রমের মতো। মনে হচ্ছে শরীর থেকে ভাবনা, চেতনা আলাদা হয়ে গেছে। তবে এমন হওয়ার কোন চান্স নেই। তার ভ্রম মনে হলেও, সে বুঝতে পারছে ওলীদ তার পাশেই শোয়া। সে অবশ্য তাকে দেখছে না। তার ভারী নিশ্বাস রিমির মুখের সাইডে পড়ছে।

সে আবার ধীরে ধীরে হাত নাড়িয়ে বুকে মধ্যেখানে আনলো। হাতে কিছু একটা শক্ত ঠেকতেই সে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। ফেলে অবশ্য বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারলো না। চোখে তার রাজ্যের ক্লান্তি। ধীরে ধীরে আবার ঘুমিয়ে গেলো।

সকাল হতেই শামীম একদল কে পাঠালো সি সি টিভি ফুটেজ চেক করতে। যে পর্যন্ত পাওয়া যায় চেক করতে বললো। গাড়ি যেহেতু উড়ে তো আর যাবে না। একটা না একটা দিক অবশ্যই পাওয়া যাবে।

সে সবাইকে পাঠিয়ে আবার এমপির সেক্রেটারি কে ফোন দিলো। রাতে অবশ্য কথা হয়েছে। বলেছে সকালে ফোন দিতে। ফোন দিলেই এমপির সাথে কথা বলিয়ে দেবে।

সে ফোন দিলো। এমপি সাহেব ফোন ধরতেই বললো, — আপনি জবান দিয়েছিলেন স্যার, কোন ঝামেলা হবে না। এখন দেখুন! আমার ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার পথে।

এমপি সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন! ওলীদ তো তার কোন মহব্বতের ব্যক্তি না। এক প্রকার বাধ্য বলতে। শালা দুনিয়ার কল রেকোর্ড জমা করে রেখেছে। এর মধ্যে থেকে একটা লিক হলেই সর্বনাশ। অবশ্য এই পর্যন্ত অনেক কাজই করেছে। কখনো কোন সমস্যা হয়নি। বলতে গেলে খুবই ভালো। কোন ঝামেলায় টামেলায় নেই। কাজের সময় কাজ করে। বাকি সময় নিজের মতো থাকে। হঠাৎ করে এমন বিগড়ে গেলো কেন?

দেশের বাহিরে পাঠানোর সব ব্যবস্থা করলো। বেটা গায়েব। কোন খবর নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে শুনলো, এক কনস্টেবলকে নাকি কিডন্যাপ করে বসে আছে। আরে বাবা কিডন্যাপ করবি ভালো কথা। পুলিশ কেন? অন্য কতো মেয়ে আছে। সেগুলো চোখে পড়ে নাই?

সে বিরক্ত মুখে বললো, — এবার যদি ধরো ডাইরেক্ট সুট করবে। কোন ডানে বানে তাকানোর দরকার নেই। আর চাকরি নিয়ে ভাবতে হবে না। আমি দেখছি।

শামীম করুণ ভাবে বললো, — মেয়েটা স্যার।

— মেয়েটা স্যার মানে কি? আমি কি করবো? আমিতো আর বলি নি কিডন্যাপ করো। আর এতোক্ষণ বেঁচেও আছে বলে মনে হয় না। পিশাচ একটা। নিজের হবু বউকে ছাড়েনি আর এই তো কোথাকার কোন মেয়ে। আর আমিতো এটাই বুঝতে পারছি না, এই মেয়ের মধ্যে দেখলোটাই বা কি? চিনেতো তো আর একে নতুন না। খারাপ হলেও মেয়ে ঘটিতো কোন বদনাম এর নেই। যাইহোক, ধামাচাপা দেওয়ার ব্যবস্থা করো। যত্তোসব! সবই আমাকে শিখিয়ে দিতে হবে নাকি?

— কিন্তু স্যার।

— এতো কিন্তু কিন্তু করবে নাতো শামীম। কেউই আমরা ধোয়া তুলসী পাতা না। যাও ব্যবস্থা করো। আর সেইবার কি যেন বললে, কোথায় নাকি জায়গা কিনবে। আমি সেটা দেখছি। এমন দুই একটা কেস যদি ধামাচাপাই দিতে না পারো ছায়ের ইন্সপেক্টর তুমি, রাখতো! বলেই সে ফোন রাখলো।

ফোন রাখতেই শামীম কিছুক্ষণ মাথা চেপে বসে রইলো। তার নিজেকে এখন খুবই নগন্য মনে হলো। অবশ্য সেটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। দুনিয়া বড়ই কঠিন জায়গা। আর এখানে কঠিন হয়েই বাঁচতে হয়।

সে বড় একটা শ্বাস ফেললো। ফেলে তার রুম থেকে বের হলো। সাব্বির রা যেখানে বসা সেখানে গেলো। নিজেকে সামলে বললো, — এখনো বসে আছেন কেন আপনারা? বাসায় যান। খোঁজ পেলে আমরা আপনাদের জানাবো।

ওবাইদুর এগিয়ে এলো! চিন্তিত ভাবে বললো,
— সকালে না এমপি সাহেব কে ফোন দেওয়ার কথা ছিলো। সে কি বললো?

— সে কি বললো মানে কি? এখন কি সব আপনাদের বলতে হবে নাকি?

নাঈম এগিয়ে এলো!

— মুরব্বি মানুষ এভাবে কথা বলছেন কেন?

— তো কিভাবে কথা বলবো! এখানে বসে বসে মাথা খাচ্ছেন। নিজের মেয়েতো আর না । তাও যদি ভালো হয়। আরে বাবা মেয়ে নিজে হেঁটে গেছে। কোন কাহিনী করছে কে জানে? এখন সব দায় আমাদের। বছরের পর বছর দুনিয়ার মেয়ে কাজ করছে। তাদের কিছু হয় না। এ আসতে না আসতেই দুনিয়ার কাহিনী। টাকা দেখেই আর লো….শামীম আর কথা শেষ করতে পারলো না।

সাব্বির ঝাঁপিয়ে পড়লো। পরপর মুখ বরাবর কয়েকটা ঘুষি মারলো । মেরে কলার চেপে প্রায় শূণ্য তুলে মুখের সামনে এনে বললো, — জবান খুলে ফেলবো! আর একটা বাজে কথা যদি তোর মুখ দিয়ে বের হয়। আল্লাহর কসম খুন করে ফেলবো ।

পুরো থানায় শোরগোল পড়ে গেলো। সাব্বির কে সবাই টেনে ছাড়ালো। ওবাইদুল চোখে পানি নিয়ে তার ছেলের এই রুপ দেখলো। যেই ছেলে সব সময় পরিপাটি থাকে সেই ছেলে আজ এলোমেলো। যেই ছেলে কখনো কোন বেয়াদবি করে নি, সেই ছেলেটা আজ অপরাধ করে ফেললো । আর সব সময় টিপটপ পরিষ্কার থাকা ছেলেটা আজ ফ্লোরেই পা ছড়িয়ে বসে পড়লো।

অন্য পুলিশরা সাব্বির কে ধরতে গেলো। শামীমও ফ্লোরে বসা। তার মাথা ঘুরছে, ঠোঁট কেটে গেছে, নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে। সে হাত দেখিয়ে থামালো ।

তারপর ওবাইদুলের দিকে তাকিয়ে বললো, —- দ্বিতীয় বার যেন একে থানায় না দেখি। যদি দেখি এমন এমন কেস দেবো । বাবার জনমে আর বাবার চেহেরা দেখতে পারবে না, আউট।

ওবাইদুল করুণ মুখে আবার ছেলের দিকে তাকালো। কিছু অবশ্য বলতে হলো না। সাব্বির নিজেই উঠে দাঁড়ালো। একবার শান্ত চোখে শামীমের দিকে তাকালো। তারপর বেড়িয়ে এলো। রিমি রিকশার জন্য যেই জায়গাটায় দাঁড়িয়েছিলো । ঠিক সেই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করলো। মনে মনে বললো, — রিমি শুধু বেঁচে থেকো। আমি আছি! আমাদের এখনো একসাথে অনেকটা পথচলা বাকি।

সবাই বেড়িয়ে যেতেই মিথিলা শামীমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো । তার চোখে পানি। সে পানি মুছে বললো, — রিমিকে জীবিত পান আর না পান। ওই লোকটাকে ধরতে পারেন আর না পারেন। দয়া করে রিমির নামে কোন মিথ্যা অপবাদ দিবেন না স্যার। মেয়েটা কোন অন্যায় করেনি । দায়িত্ব নিষ্ঠা ভাবে পালন করেছে। সেই নিষ্ঠার মূল্য এভাবে দিবেন না, প্লিজ।

শামীম ঠোঁটের পাশের রক্ত মুছলো। মুছে পা ছড়িয়ে বসলো। তখনি রুমেল দৌড়ে এলো। স্যার গাড়ির খোঁজ পাওয়া গেছে।

রিমির ঘুম ভাঙলো তীব্র আলোর ঝলকানিতে। ফুরফুরে সকাল! কুয়াশার চাদরকে ঢেলে সূর্য আজকে সাত সকালেই বেড়িয়ে এই টিনের ঘরে উঁকিঝুঁকি মারছে। সে চোখ মুখ কুঁচকে তাকালো। গায়ে তার ভীষণ জ্বর। জ্বরের ঘোরে মাথা সাথে আছে কিনা সে বুঝতে পারছে না। শীত নেই তবুও সে রিতিমতো থরথর করে কাঁপছে।

ওলীদ এসে তাকে ধরে উঠে বসালো। বসে জাপটে ধরেই রাখলো। রিমির অবশ্য বসে থাকার মতো অবস্থায় নেইও।

— এটা খাও! খেয়ে ওষুটাও নাও।

রিমি খেলো না । কোন রকম বললো, —- মেরেই তো ফেলবেন। তো আবার এতো ঢং কিসের?

— মরা টাকে মেরে মজা কি? তোমাকে তো মারবো তিলেতিলে। আগে বলিনি খুব যত্ন করে শাস্তি দেবো। শাস্তি পেতে পেতে এক সময় তুমি নিজেই মৃত্যুর জন্য ছটপট করবে। আমি তোমার সেই ছটফটানি দেখতে চাই।

রিমি এই অবস্থাও মুখ বাঁকিয়ে হাসলো! হেসে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,

— আমি কোন দুনিয়ায় বড় হয়েছি ওলীদ আপনি জানেন না। আপনার তো বাবা ছিলো, মা ছিলো, স্নেহের একটা বোন ছিলো। আর আমি শূণ্য। শূণ্যে বসবাস করা মানুষরা হার মানে না। রিমিও মানবে না। আর আপনার মতো জানোয়ারে সামনে তো কখনও না।

— দেখা যাক।

রিমি একটু থামলো! গলা শুকিয়ে আছে। সে শুকনো ঢোক গিলে বললো, —- আমাকে মেরে আপনি বাঁচতে পারবেন না।

— পারবো! সব ব্যবস্থা করা। আমি দেশের বাহিরে চলে যাচ্ছি। টাকা তো কম কামায় নি। খরচ বলতে গেলে হয় ই নি। থেকেছি সাধারণ ভাবে।

— আপনি যেখানেই যান! এই পৃথিবী যেই প্রান্তেই গিয়ে লুকিয়ে থাকুন। তবুও বাঁচতে পারবেন না। সে আপনাকে বাঁচতে দেবে না।

— কে?

রিমি উত্তর দিলো না। ওলীদ রিমির মুখ চেপে ধরলো! দাঁত চিবিয়ে বললো, — বলো কে?

রিমি হাসলো! হেসে ফিসফিস করে বললো, — খোঁজ খবরটা টা আরো ভালোভাবে নিলেই পারতেন ওলীদ আশফাক।

ওলীদও এবার হাসলো! মুখ ছেড়ে ঠোঁটের পাশে আঙুল বুলালো! শুকনো চিকন ঠোঁট! ফ্যাকাশে হয়ে আছে।

রিমি মুখ ঘুরাতে চাইলো! ওলীদ অবশ্য দিলো না। আবার চেপে ধরলো! ধরে মুখটা একেবারে রিমির মুখের সামনে নিয়ে সেও ফিসফিস করে বললো, — এই পৃথিবীতে অলৌকিক বলে কিছু নেই। এসব গাল গল্পে তোমার গ্রামের মানুষ ভয় পেতে পারে, ওলীদ না।

বলেই রিমিকে ধাক্কা মেরে চৌকিতে ফেলে দিলো!রিমি কুঁকিয়ে উঠলো। মাথায় যন্ত্রনা হচ্ছে। কাঁচা যায়গা! ধাক্কার কারণে আবার বাড়ি খেয়েছে। সে হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরলো।

— তোমার সাব্বির জানু তোমার জন্য কিছু করবে না?
— সে আপনার মতো অমানুষ না।

ওলীদের ঠোঁটের কোণে হাসি! তাচ্ছিল্যের হাসি।

— মানুষ না অমানুষ সেটা সুন্দর না হলে দেখা যেতো। সুন্দর, সব পেয়েছে হাতের সামনে। সে জানবে কি দুনিয়া কি, অবজ্ঞা কি?

— তার জানার দরকার নেই। তবে এইটুকু আপনি জেনে রাখুন, সে আসবে। আমার লাশ নিতে হলেও আসবে।

— এতো কনফিডেন্স?

রিমি কিছু বললো না। মাথায় যন্ত্রনা হচ্ছে। গুলিয়ে বমিও আসছে। অবুঝকে বুঝানো যায় কোন সাইকো কে না। এর মাথার তার ছোট বেলায়ই আউট হয়ে গেছে। তার নিজেরও কি হয়নি। সবই কি তার কল্পনা? তাদের শৈশবটা আরেকটু সুন্দর হলে কি হতো? হলে না ওলীদের মতো মানুষ তৈরি হতো, না হতো রিমির মতো।

— এতো ভালোমানুষ সে! এই যে গতকাল থেকে তুমি নিখোঁজ। আমার সাথে আছো। গেলে তোমাকে আগের মতো ভালোবাসবে? গ্রহণ করবে তোমাকে?

— হ্যাঁ করবে!

— তোমার কনফিডেন্সের তারিফ করতেই হবে।

— ভয়ংকর এক সত্যই সে হজম করে ফেলেছে এই আর কি?

— কোন সত্য? তুমি রেপড এটা। কলেজের এক দেওয়ানাকে তো এমন কিছুই একটাই গল্প বলেছিলো তাইনা। কি ডেঞ্জারাস মেয়ে তুমি রিমি। নিজের ব্যাপারে এমন মিথ্যা কথাও কোন মেয়ে বলতে পারে?

বলেই ওলীদ আবার রিমির কাছে আসলো! দু- সাইডে হাত রেখে ঝুকে শয়তানি হেসে বললো, — তোমার মুখের কথাটা সত্য করে ফেলি। কি বলো? এমনিতেও তোমার জানু ধরেই নিয়েছে। তাই খুব একটা তো সমস্যা হওয়ার কথা না।

রিমি ওলীদের গলা চেপে ধরলো! তার হাত কাঁপছে তবুও আঙুল ডেবে গেলো ওলীদের ঘাড়ে।

ওলীদ ঝাড়া মেরে ছাড়ালো! গলায় হাত দিয়ে দেখলো ছিলে গেছে। শরীরের অর্ধেক রক্ত বেড়িয়ে গেছে তাও তেজ কমে না কেন এই মেয়ের।

রিমি হাসলো! অবজ্ঞার হাসি! ওলীদের এই হাসি সহ্য হলো না। সে দাঁতে দাঁত চেপে হনহনিয়ে এগিয়ে গেলো । কালো ব্যাগ থেকে একটা ছুঁড়ি বের করে রিমির ঠোঁট বরাবর টান মারলো।

খেতের পর খেত। শুনশান চারপাশ। সকালটা নিস্তব্ধতা চাদরে মোড়ানো । সেই নিস্তব্ধতার চাদরে রিমির এক চিৎকার বাতাসে ভেসে কিছুক্ষণের মধ্যেই মিলিয়ে গেলো।

চলবে……