আমার নিঠুর মনোহর পর্ব-২৫+২৬

0
50

#আমার_নিঠুর_মনোহর
#লেখিনীতে_জেনিফা_চৌধুরী
#পর্ব_পঁচিশ [প্রথমাংশ]

রক্তমাখা হাতটা শক্ত করে ধরে তামজিদ গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল। তারিন জ্ঞান হারিয়েছে অনেক আগেই৷ তামজিদ নাকে হাত দিয়ে দেখলো নিশ্বাস পড়ছে কিনা। হ্যাঁ, পড়ছে! তারমানে বেঁচে আছে___কথাটা মনে উঠতেই তামজিদের টনক নড়লো। বিধ্বস্ত স্বরে পাশে একজনকে বলল,
“আমাকে একটু সাহায্য করবেন, প্লিজ। একটা গাড়ি ডেকে আনুন।”
তামজিদ তারিনের আঁচল দিয়ে তারিনের মাথাটা প্যাঁচিয়ে রেখে, তারিনকে কোলে তুলে নিলো। সবাই গাড়ি নিয়ে আসতেই তামজিদ গাড়িতে উঠে পড়লো। ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাওয়া হলো। সারাটা রাস্তা তামজিদ তারিনকে বুকে চেপে হাউমাউ করে কান্না করেছে। তারিনকে তড়িঘড়ি করে ডাক্তার, নার্সরা মিলে নিয়ে গেলো। আর তামজিদ বাইরের চেয়ারে বসে কাঁদছে। কি করবে ভেবে না পেয়ে তানহাকে কল দিয়ে আসতে বলে রেখে দিলো। তারপর রাহিমকে কল দিলো। রাহিম হলো তামজিদের বন্ধু।



“ভাই! এ কি অবস্থা তোর?”
হঠাৎ তানহার গলার স্বর পেয়ে তামজিদ হকচকিয়ে উঠলো। তামজিদের পাঞ্জাবীতে, হাত, মুখে রক্ত লেগে আছে। রাস্তায় পড়ে গিয়ে তামজিদের গুরুতর কিছু না হলেও অনেক জায়গায় কেটে, ছিলে গেছে। পায়েও প্রচন্ড ব্যাথা পেয়েছে। তামজিদকে এমন রক্তমাখা অবস্থায় দেখে তানহার আত্মা কেঁপে উঠল। তামজিদের সামনে গিয়ে তামজিদকে জড়িয়ে ধরল। কান্না করে দিলো মুহূর্তেই। কান্নারত স্বরে বলে উঠল,
“কি হয়েছে, ভাই? এই অবস্থা হলো কি করে? বল, কি হয়েছে? তুই এখানে কেন?”
একাধারে প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। তামজিদ ও কান্না করছে। মুখ দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না৷ কি বলবে? ওর বুকটা যে ফেটে যাচ্ছে। চোখের সামনে বার বার তারিনের রক্তমাখা মুখটা ভেসে উঠছে। তারিনের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো বুকের ভেতর যন্ত্রণা দিচ্ছে। তানহাও কাঁদছে। কি হয়েছে বুঝতে পারছে না৷ বুকের ভেতর অজানা ভয়ে তানহা কাবু হয়ে আছে। মস্তিষ্কে হাজারটা প্রশ্ন উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। তানহা এবার তামজিদকে শান্ত করলো৷ তামজিদের গালে হাত রেখে শান্ত স্বরে বলল,
“ভাই, আমার কাঁদিস না। আগে বল কি হয়েছে? তোর এই অবস্থা কেন? তারিন কোথায়? বাবা কোথায়? কোনো দূর্ঘটনা ঘটেছে? চুপ করে থাকিস না৷ বল আমাকে?”
তামজিদ নিজেকে অনেক কষ্টে সামলালো। সবটা খুলে বলল। সবটা শুনে তানহার বুকের ভেতর মুচড়ে উঠল। তারিনের সাথে সেই প্রথমদিন থেকে তানহার আদর, যত্নের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। সেদিন তানহা রাগ করেছে ঠিকই। কিন্তু সবটা পরে মেনেও নিয়েছিলো। তানহা কাঁপা কাঁপা স্বরে প্রশ্ন করল,
“এখন কি অবস্থা? ডাক্তার কি বললো?”
তামজিদ কোনোরকমে উত্তর দিলো,
“এখনো কিছু বলেনি।”
এর মধ্যেই সেখানে রাহিম এসে উপস্থিত হয়৷ রাহিমকে সবটা তানহা খুলে বলে। তামজিদের এই অবস্থা দেখে রাহিম কিছু বলে উঠার সাহস পাচ্ছে। তবুও তামজিদের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“সব ঠিক হয়ে যাবে। আল্লাহ ভরসা। চিন্তা করিস না।”



প্রায় ঘন্টা খানেকের মাথায় একজন নার্স ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতেই তামজিদ সেদিকে ছুটে গেলো। হাঁসফাঁস করতে করতে প্রশ্ন করল,
“আমার বউ! আমার বউ কেমন আছে, নার্স? ও ঠিক আছে তো? সুস্থ হয়ে যাবে তো? বলুন না? ঠিক আছে?”
রাহিম তামজিদকে শান্ত করে বলল,
“তুই একটু শান্ত হয়ে দাঁড়া এখানে। আমরা কথা বলছি।”
তারপর নার্সের উদ্দেশ্য তানহা বলে উঠল,
“তারিন কেমন আছে এখন?”
নার্স এবার শান্ত হলো। বলল,
“রোগীর অনেক ব্লাড লস হয়েছে। ইমার্জেন্সি ২ব্যাগ ‘ও পজিটিভ’ রক্ত লাগবে। এখনো জ্ঞান ফিরেনি। তাই এখন কিছু বলা যাচ্ছে না৷ আপনারা যত দ্রুত সম্ভব রক্ত জোগাড় করার চেষ্টা করুন।”
অন্য কেউ কিছু বলার আগেই তানহা বলে উঠল,
“আমার ‘ও পজিটিভ’ রক্ত। আমি রক্ত দিবো।”
রাহিমও বলে উঠল,
“আমারো রক্ত ‘ও পজিটিভ’। আমিও রক্ত দিবো।”
নার্স ওদের দুজনকেই নিজের সাথে নিয়ে গেলো। তানহার থেকে রক্ত নেওয়া হলো না৷ রাহিমের থেকেই দুই ব্যাগ রক্ত নেওয়া হলো। রক্ত দেওয়া শেষ হতে হতে অনেকটা সময় কেটে গেলো। ওরা তিনজনেই হসপিটালের করিডোরে পায়চারি করছে। তারিনের এখনো জ্ঞান ফিরেনি। যত সময় যাচ্ছে তত তামজিদের বুকের ভেতরের ভয়, অস্থিরতা বাড়ছে। মনে মনে উপরওয়ালাকে ডাকছে৷



ঘড়ির কাটায় রাত ১২টা ছুঁইছুঁই। তানহা কিছুক্ষণ আগে বাসায় চলে গেছে। ওর বাচ্চা কাঁদছে বলে। তামজিদ আর রাহিম রয়ে গেছে হাসপাতালে। রাহিম বাহিরের থেকে নতুন শার্ট, প্যান্ট এনে দিয়েছে। সেগুলো চেঞ্জ করে তামজিদ আর রাহিম দুজনেই পাশের মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে এসেছে। এসে থেকে তামজিদ প্রায় একশো বার ডাক্তারকে একশো প্রশ্ন করেছে। কিন্তু প্রতিবারেই হতাশ হয়ে ফিরেছে। ‘আই.সি.ইউ’ শিফট করা হয়েছে মিনিট দশেক আগে। তামজিদ আর অপেক্ষা করতে পারলো না। ডাক্তারের কাছে গিয়ে অসহায় স্বরে বলল,
“আমি কি একবার আমার বউয়ের সাথে দেখা করতে পারি, ডাঃ? প্লিজ না করবেন না৷ আমি কোনোরকম সমস্যা করবো না, প্রমিস। প্লিজ, একবার দেখা করে আসি?”
ডাক্তার প্রথমে বারণ করতে চাইলেও তামজিদের মুষড়ে পড়া মুখের দিকে তাকিয়ে বারণ করলো না। পারমিশন দিতেই তামজিদ ‘আই.সি.ইউ’ রুমে ঢুকে পড়লো। তারিনের মুখে অক্সিজেন মাক্স। মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ প্যাঁচানো। ঠোঁটের এক কোনে রক্ত জমাট বেঁধে আছে৷ ডান পাশের গাল লম্বালম্বিভাবে কেটে আছে হালকা। ফর্সা মুখটা লাল হয়ে আছে। হাতে স্যালাইন চলছে। কী এক বিদঘুটে দৃশ্য! তামজিদের সহ্য হলো না। যে মেয়েটা সারাদিন ছটফট করে। এক হাতে সব সামলে চলে সেই মেয়েটা এভাবে শান্ত হয়ে আছে! নাহ, মানতে পারছে না! তারিনের সামনে এগিয়ে গিয়ে আলতো করে, খুব সাবধানে তারিনের কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো। একটা চেয়ার টেনে তারিনের পাশে বসলো। হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে ঠোঁট ছোঁয়াতেই ফুঁপিয়ে কান্না চলে আসলো। শক্তপোক্ত ছেলেটা মাকে হারানোর এই প্রথম এভাবে অসহায়ভাবে কাঁদছে। তামজিদ কান্নারত স্বরেই বলতে শুরু করলো,
“এই আমার চাঁদ! চাঁদ! শুনছো? এই আমার মনোহরিণী! শুনছো? বলো না, শুনছো? একবার শুনছো? মাস্টার মশাই, বলে একবার ডাকো। একবার আমার দিকে তাকাও। এভাবে চুপ করে থেকো না, আমার চাঁদ। আমার কষ্ট হচ্ছে। খুব কষ্ট হচ্ছে। তুমি এতটা নির্মম হইও না। এই চাঁদ! দেখো আজ তোমার মাস্টার মশাই কাঁদছে। দেখো আমার পাশে কেউ নেই। আমাকে স্বান্তনা দেওয়ার কেউ নেই। কেউ নেই, চাঁদ। তুমি ছাড়া আমার পাশে কেউ নেই। আর সেই তুমি চুপ করে আছো। চোখ বন্ধ করে আছো। মানতে পারছিনা আমি। কিছুতেই মানতে পারছিনা।”
তামজিদের গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না৷ বারবার চোখের পানিতে সবটা ঝাপসা হয়ে আসছে। পুনরায় কান্নারত স্বরে বলা শুরু করল,
“এই মেয়ে! এই! এভাবে শুয়ে থাকলে চলবে বলো? তুমি না আমার ডাক্তার রানী হবে? তাহলে শুয়ে আছো যে? কলেজে যাবেনা? পড়বে না? এই দেখো, আমার মায়ের সংসার ভেসে যাচ্ছে৷ সামলানোর কেউ নেই। ও চাঁদ! উঠো না একবার। তুমি ছাড়া আমার সব এলোমেলো হয়ে যাবে। একবার উঠো আমি তোমাকে অনেক যত্নে আগলে রাখবো৷ সত্যি বলছি। উঠো একবার।”
তামজিদ তারিনের হাতে অজস্র চুমুতে ভরিয়ে দিলো। হাতটা বুকে জড়িয়ে কাঁদছে। কি থেকে কি হয়ে গেলো কে জানে? সময় শেষ হতেই তামজিদকে বের করে দেওয়া হলো। অনেক রিকুয়েষ্ট করেও থাকা গেলো না।



সারারাত গলা কা’টা মুরগীর মতো ছটফট করেছে তামজিদ। একসেকেন্ডের জন্যও চোখ বন্ধ করেনি। তাহাজ্জুদ ও পড়েছে। বার বার রুমের বাইরে গিয়ে কাচের দরজা ভেদ করে তাকিয়ে ছিলো ভেতরের দিকে। ভোরের আজান দিতেই তামজিদ মসজিদে চলে গেলো। নামাজ পড়ে এসে সেই দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে রইলো৷ এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড, এক মিনিট, দুই মিনিট এভাবে করে প্রায় ৩/৪ ঘন্টা কেটে গেছে। এখনো তারিনের জ্ঞান ফিরে আসেনি৷ সকাল ১০টার দিকে ডাক্তার এসে চেক-আপ করে বাইরে বেরিয়ে আসতেই, তামজিদ আর রাহিম তাকে ঘিরে ধরলো। একে একে দুজনেই প্রশ্ন ছুড়ে মা’রলো,
“তারিন, কেমন আছে?”
ডাক্তার অতি দুঃখের সাথে জানালো যে,
“২৪ঘন্টার মধ্যে জ্ঞান না ফিরলে উনি হয় কোমায় চলে যাবেন। অথবা জ্ঞান ফিরলেও সে পাগল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ৯০%। আর কিছু বলা এখন সম্ভব না।”
বলেই তিনি চলে গেলো। তামজিদের কর্ণদ্বয়ে পৌঁছাতেই তামজিদ কয়েক পা পিছিয়ে পড়ে যেতেই নিকেই রাহিম দুই হাতে তামজিদকে ধরে ফেলল। কোনোরকমে বলল,
“এভাবে ভেঙে পড়িস না, দোস্ত। আল্লাহ আছেন তো। সব ঠিক হয়ে যাবে?”
তামজিদকে ধরে নিয়ে চেয়ারে বসাতেই তামজিদ অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠল,
“আল্লাহ আমার থেকে আমার মাকে কেড়ে নিয়েছে। এখন আমার বেঁচে থাকার শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নিবে, দোস্ত?”

#চলবে

#আমার_নিঠুর_মনোহর
#লেখিনীতে_জেনিফা_চৌধুরী
#পর্ব_পঁচিশ [শেষাংশ]

“আমার বউ এখন কেমন আছে, ডাঃ?”
সম্পূর্ণ একদিন মাঝে কেটে গেছে। দিনের আলো ফুরিয়ে রাতের অন্ধকারে সবটা ঢেকে গেছে। তারিনের জ্ঞান ফিরেছে দুপুরের পরে। একবার শুধু চোখ মেলে তাকিয়ে তামজিদকে ডেকেছিলো। তারপর আবার চুপ হয়ে যায়। ডাক্তার অবশ্য বলেছে আর চিন্তার কোনো কারণ নেই। তবুও তামজিদের চিন্তা, ভয় দূর হচ্ছে না। সন্ধ্যা হয়ে আসতেই হসপিটালে বাইরে তামজিদ ডাক্তার আসার জন্য অপেক্ষা করছিলো। ডাক্তারকে আসতে দেখেই উপরোক্ত প্রশ্নটি করে বসলো। তামজিদের অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার হেসে ফেললো। তামজিদের কাঁধে হাত রেখে শান্ত বানীতে বলল,
“তোমার বউ একদম ঠিক আছে। ওষুধের ডোজে ঘুমাচ্ছে এখন। কোনো চিন্তা করো না৷ সব ঠিক হয়ে যাবে, মাই বয়।”
তামজিদের ঠোঁটের কোনেও স্বস্তির হাসি ফুটলো। একদিনেই ছেলেটা একদম মুষড়ে পড়েছে। চোখ, মুখের সে কি অবস্থা! তানহা সারাদিন হসপিটালে ছিলো। রান্নাবান্না করে নিয়ে এসেছিলো। কিছুক্ষণ আগে রাহিম গিয়ে তানহাকে বাসায় দিয়ে এসেছে। তামজিদকে হাসতে দেখে রাহিমের মুখেও হাসি ফুটেছে। তামজিদ ডাক্তারের হাত দুটো জড়িয়ে ধরে হেসে উত্তেজিত স্বরে প্রশ্ন করল,
“সত্যি? আর কোনো চিন্তা নই?”
ডাক্তার ও হেসে জবাব দিলো,
“হ্যাঁ! সত্যি। ”
তামজিদ এবার হাসতে হাসতে উচ্চস্বরে বলে উঠল,
“আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ!”
তারপর ডাক্তারের উদ্দেশ্যে বলল,
“আমি একটু আমার বউয়ের সাথে দেখা করতে পারি, ডাঃ?”
ডাক্তার বললেন,
“তোমার ওয়াইফকে বেডে শিফট করা হচ্ছে। তারপর সারাক্ষণ বসে বসে দেখো।”
বলেই সে হেসে চলে গেলো। রাহিম তামজিদকে জড়িয়ে ধরল। খুশি মনে বলে উঠল,
“বলেছিলাম না ভাবি একদম ঠিক হয়ে যাবে? এখন ভাবি সুস্থ হলে আমাগো ঘুরতে নিয়ে যাইতে হবে, দোস্ত।”
তামজিদ হেসে বলল,
“আগে আমার বউ সুস্থ হোক৷ তারপর নিয়ে যাবো।”
তামজিদ তানহাকে ফোন দিয়ে খবরটা জানিয়ে দিলো। তারিনের বাসায় ও জানালো। তারা আসতে চেয়েছিলো, কিন্তু তামজিদ বারন করেছে। বলেছে তারিনকে বাসায় নেওয়া হলে তখন আসতে।



তারিনকে বেডে শিফট করা হয়েছে৷ তামজিদ ডাবের পানি ভর্তি বোতলটা হাতে নিয়ে কেবিনে ঢুকলো। তারিন তখন চোখ বন্ধ করে ছিলো। তামজিদ নিশ্চুপে রুমে ঢুকে বসার টুল টেনে পাশে বসলো। তারিনের হাতের উপর আলতো করে হাত রাখতেই তারিন চোখ মেলে তাকালো। তামজিদকে দেখে অসুস্থ চেহারা পানে হাসি ফুটলো। চোখের কোনে মুহূর্তেই জল জমে গেলো। তামজিদের হাতটা শক্ত করে ধরার মতো শক্তি পাচ্ছে না। তবুও কোনোরকমে তামজিদের হাতটা ধরলো। তারিনকে কাঁদতে দেখে তামজিদের বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। উত্তেজিত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“ব্যাথা পেয়েছো? কাঁদছো কেন? কি হয়েছে? কষ্ট হচ্ছে?”
তারিন কোনোরকমে চোখের ইশারায় বুঝালো যে, কষ্ট হচ্ছে না। তামজিদ ইশারা বুঝতে পেরে শান্ত হলো। বলল,
“কিছু খাবে?”
তারিন তাও না করলো। অস্পষ্ট স্বরে বলল,
“আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিবেন, মাস্টার মশাই?”
ওইটুকু বাক্য বলতেই ওর দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো। তামজিদ নিজেকে সামলে আলতো হাতে তারিনের মাথায় হাত বুলাতে লাগলো। কাঁপা-কাঁপি স্বরে বলা শুরু করল,
“আমার শক্ত বউটা আজ এমন দূর্বল হয়ে পড়েছে কেন? তুমি না ডাক্তার হবে? আমার মায়ের সংসার সামলে রাখবে? তাহলে এভাবে ভেঙে পড়ছো কেন, আমার চাঁদ? তুমি ভেঙে পড়লে আমাকে কে সামলাবে?”
তারিনের চোখ থেকে দুই ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল। আগের ন্যায় থেমে থেমে বলল,
“আমি আছি তো।”
তামজিদের মনে হলো এই বাক্যটা সোজা ওর বুকে গিয়ে লাগলো। মেয়েটা এই অল্প সময়ে বিশাল মায়ায় বেঁধে ফেলেছে তামজিদকে। তামজিদ কখনো ভাবতেও পারেনি তারিনের মায়ায় এত শক্তপোক্ত ভাবে আটকে যাবে। তামজিদের এই মুহূর্তে খুব ইচ্ছে করছে তারিনকে বুকে জড়িয়ে রাখতে। কিন্তু সম্ভব হলো না৷ বেশ অনেকক্ষণ তারিনের সাথে বকবক করে সময় পার করলো। বকবক করতে করতে তারিন কখন যে ঘুমিয়ে গেছে তামজিদ টের পায়নি। তারিন ঘুমিয়ে গেছে___এটা খেয়াল করে একটু স্বস্তি পেলো। কিছুক্ষণ তারিনের পাশে ওভাবেই বসে বসে তারিনকে দেখতে দেখতে সময় কাটালো।



সেদিন রাতটাও এভাবেই কেটে গেলো। পরের দিন সকাল থেকেই তারিন বেশ সুস্থ হয়ে উঠলো। আগের থেকে শরীর ভালো লাগছে৷ সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখলো তামজিদ ওর বেডের পাশে মাথা রেখে, তারিনের হাত শক্ত করে ধরে ঘুমিয়ে আছে। তারিনের হাতের ক্যানোলা লাগানো। স্যালাইন কাল রাতেই শেষ হয়েছে। মুখে ওষুধ দেওয়া হয়েছে এখন। মাথার অবশ্য ব্যাথা রয়েছে বেশ। তবুও উঠে বসার মতো ক্ষমতা হয়েছে। তামজিদের ঘুমন্ত মুখপানে তাকিয়ে তারিনের বেশ স্বস্তি অনুভব হলো। শারীরিক অসুস্থতা এক নিমিশেই হাওয়া হয়ে গেলো, মানসিক শান্তির কাছে। তারিন কোনোরকমে উঠে বসলো। উঠে বসে তামজিদের মাথায় আলতো করে হাত রাখতেই তামজিদের ঘুম ভেঙে গেলো। ঘুম ঘুম চোখে উপরে তাকাতেই চোখের ঘুম উড়ে গেলো। তারিনকে উঠে বসতে দেখে চ্যাঁচিয়ে বলে উঠল,
“এ কি! তুমি উঠেছো কেন? কি হয়েছে?”
তারিন হাসলো। তামজিদের এলোমেলো চুলে হাত ডুবিয়ে হেসে উত্তর দিলো,
“আমি ঠিক আছি, জনাব। এত চিন্তা করবেন না। এই দুইদিনে চেহারার অবস্থা কি করেছেন?”
তামজিদ মলিন হাসলো। মলিন স্বরেই জবাবে বলে উঠল,
“আমার বউ ছাড়া আমি ঠিক কতটা অসহায় এই দুইদিনে তা খুব ভালো ভাবেই বুঝে গেছি।”
তামজিদের কণ্ঠের অসহায়ত্ব টের পেলো তারিন৷ তামজিদকে টেনে বেডে বসালো। তামজিদের কাঁধে মাথাটা আলতো করে রাখলো। বলল,
“আপনি আমার ব্যক্তিগত সুখ মাস্টার মশাই। উপরওয়ালা আমাকে এত সুখ দিয়েছেন, আলহামদুলিল্লাহ। এই সুখ ছেড়ে আমি কোথাও যেতে চাইনা, মাস্টার মশাই। আমি আপনার সাথে বাঁচতে চাই। সারাজীবন এই সুন্দর পৃথিবীতে আপনার সঙ্গী হয়ে কাটাতে চাই।”
তামজিদ তারিনকে হঠাৎ জড়িয়ে ধরতেই তারিন খানিকটা ব্যাথা পেলো মাথায়। কিন্তু তবুও শব্দ করলো না। চারদিকে একবার নজর বুলিয়ে নিলো। এই কেবিনে আরো ২/৩জন আছেন। তারা সবাই ওদের দিকে চেয়ে আছে। তারিন নিশ্চুপে তামজিদকে বলে উঠল,
“কি করছেন? ছাড়ুন আমাকে। লোকে দেখছে তো?”
তামজিদ ছাড়লো না। বরং আর একটু গভীর ভাবে বুকে আগলে রাখলো। খামখেয়ালি স্বরে জবাব দিলো,
“দেখুক। আমার কি? আমার বউ আমি জড়িয়ে ধরেছি। লোকের চোখ আছে লোক দেখবে। তাতে আমার কিছু যায় আসে না বুঝেছো, আমার চাঁদ?”
তারিন লজ্জা পেয়ে হেসে মুখ লুকালো শার্টের ভাঁজে। দুইদিন পর তারিন নিজের সুখ খুঁজে পেয়েছে।



মাঝে কেটে গেছে দুইদিন। তারিনকে আজ বাসায় আনা হয়েছে। বাসায় আসতেই তানহা এসে দরজা খুলে দিলো। তানহাকে দেখে তারিন অবাক চোখে তাকালো। হসপিটালে সেদিন দেখতে গিয়েছিলো। তানহাকে দেখে তারিনের সবটা স্বাভাবিক মনে হয়েছিলো। কিন্ত তবুও তারিনের মনে ভয় ছিলো তানহা হয়তো সবটা মেনে নেয়নি৷ তানহা তারিনকে দেখেই হেসে তারিনকে ধরে ভেতরে নিয়ে আসতে আসতে জিজ্ঞেস করলো,
“ঠিক আছো, তারু?”
তারিন হাসলো। ফুরফুরে স্বরে জবাব দিলো,
“একদম ঠিক আছি, আপু? আমাদের মাইশা মামনি কোথায়?”
তানহা তারিনকে সোফায় বসিয়ে দিয়ে, হেসে বলে উঠল,
“মাইশা ঘুমিয়েছে। বাবা আছেন ওর কাছে। তুমি এখানে বসো। আমি একটু তোমার জন্য শরবত বানিয়ে নিয়ে আসি।”
তারিন তানহাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে পাশে বসালো। বলল,
“কিছু লাগবে না, আপু। আপনি একটু এখানে বসুন। জাহেলা আপা, কোথায়? তাকে একটু বলুন আপনার ভাইকে শরবত দিতে। ”
তানহা বলল,
“জাহেলার মা অসুস্থ। ও একটু বাড়ি গেছে। তুমি একটু বসো। আমিই দিচ্ছি।”
তারিনার এবার তানহার হাত জড়িয়ে ধরল। নিচু স্বরে বলল,
“আপু, আমার উপর রাগ করে থাকবেন না। আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি সবটা গুছিয়ে রাখতে পারছি না।”
তানহা হাসলো। তারিনের গালে হাত রেখে হাস্যজ্বল স্বরে বলল,
“ধুর, বোকা মেয়ে। সেদিন এই বাসায় এসে মাকে না পেয়ে আমার মাথা ঠিক ছিলো না। মায়ের অভাব প্রতিটা সেকেন্ডে ফিল করছিলাম। তাই রেগে গেছিলাম। তোমাদের কথা বোঝার চেষ্টা করেনি৷ তোমাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছি। আমাকে ক্ষমা করো, বোন। আমি প্রথম দিন থেকে যেমন তোমার বোন ছিলো আর সারাজীবন থাকবো। আমি আছি তো। আমি, তুমি, তাজ আমরা সবাই মায়ের সংসার সামলে রাখবো। তোমার স্বপ্ন তুমি পূরণ করবে। আমি, ভাই দুজনেই তোমার পাশে আছি। তোমার কোনো চিন্তা নেই।”
তারিনের চোখের কোনে জল জমলো। কান্না চলে আসলো মুহূর্তেই। তানহা তারিনের চোখে জল দেখে তারিনকে আলতো করে জড়িয়ে ধরলো। তারিনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“আজ থেকে একদম কাঁদবে না। আর কোনো চিন্তা করবে না। যতদিন সুস্থ না হবে ততদিন একটুও নড়াচড়া করবে না। আমি আছি, সব সামলে নিবো। তোমার কাজ শুধু রেস্ট করা। বুঝেছো?”
তারিন মাথা নাড়ালো। মনে মনে ভাবছে,
“আমি এত ভাগ্যবতী কেন? আমার ভাগ্যে এত সুখ ছিলো কখনো ভাবতেই পারেনি৷ এত সুখে থেকে দিন দিন বাঁচার ইচ্ছাটা তীব্র বেড়ে যাচ্ছে৷ এখন তো মৃ’ত্যুকে ভয় হয়। মৃ’ত্যু নামক কঠিন সত্য যদি এসে সামনে দাঁড়ায়। তখন আমি এই মানুষগুলোকে ছেড়ে যাবো কি করে?”

#চলবে

#আমার_নিঠুর_মনোহর
#লেখিনীতে_জেনিফা_চৌধুরী
#পর্ব_ছাব্বিশ

“আপনার বুকে আমার শান্তি, মাস্টার মশাই। আমি যদি কখনো ম’রে যাই তাহলে এখানে আর কাউকে ঠাঁই দিবেন না, প্লিজ।”
প্রথম কথাটা শুনে তামজিদের ঠোঁটে কোনে হাসি ফুটলেও, দ্বিতীয় কথাটায় সব হাসি হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। তারিনকে তৎক্ষনাৎ বুক থেকে সরিয়ে দিয়ে উঠে বসলো। থম মে’রে বসে রইলো কিছুক্ষণ। কিছু বললো না। তারিন বুঝতে পারলো যে, তামজিদ কথাটায় কষ্ট পেয়েছে। বুঝতে পেরে নিজেরেই খারাপ লাগছে। এখন যে কিছু বলবে তার সাহস ও পাচ্ছে না। ছেলেটার উপর দিয়ে ৪/৫দিন ধরে অনেক ধকল গেছে। চোখ, মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। তামজিদ কিছুক্ষণ বসে থেকে, কোনো কিছু না বলে অন্য পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো। তারিন এই মুহূর্তে বুঝতে পারছে না, কি বলবে? কি করবে? তবুও কোনোরকমে তামজিদের গায়ে হাত রেখে বললো,
“মাস্টার মশাই?”
তামজিদ থমথমে গলায় উত্তর দিলো,
“বলো।”
“রাগ করেছেন?”
“ঘুমাও।”
তারিন পুনরায় শান্ত, শীতল স্বরে বলে উঠল,
“ভালোবাসি।”
তামজিদ চুপ রইলো। উত্তর দিলো না। তারিন এবার তামজিদের উপর মাথা রেখে বললো,
“মাস্টার মশাই, শুনুন না।”
“শুনছি তো।”
“তাহলে ভালোবাসি বলছেন না কেন?”
তামজিদ উত্তরে গম্ভীর স্বরে বলল,
“হুম, ভালোবাসি।”
“হুম, ভালোবাসি__এটা আবার কেমন শব্দ?”
তামজিদ বুঝতে পারছে, তারিন দুষ্টুমির ছলে ওর রাগ ভাঙানোর চেষ্টায় আছে। তবুও গম্ভীর ভাব বজায় রেখে বলল,
“এতকিছু জানিনা। চুপচাপ ঘুমাও।”
তারিন তামজিদের গালে হাত রেখে নিজের দিকে ঘুরানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু পারলো না৷ তবুও হাল না ছেড়ে জোর করে তামজিদের মুখ খানা তারিনের দিকে ঘুরালো। তারপর তামজিদের গালে হাত রেখে শান্ত স্বরে বলে উঠল,
“আমি আপনাকে ছেড়ে অন্য কোথাও শান্তি পাইনা, মাস্টার মশাই।”
তামজিদ চুপ। কিছু বলছে না। তারিন পুনরায় বলে উঠল,
“এত শান্তি রেখে আমি কোথায় যাবো বলেন?”
তামজিদ আগের ন্যায় চুপ৷ তারিন বলল,
“ও মাস্টার মশাই, আপনি আমার সব। আপনার মাঝে আমি আকাশসম শান্তি খুঁজে পাই। ভালোবাসা, যত্ন ও সম্মানের চাদরে যে মানুষটা আমাকে মুড়িয়ে রেখেছে তাকে রেখে আমি কোথায় যাই বলুন তো?”
তামজিদ এবার মুখ খুলল। অভিমানী স্বরে বলল,
“যেখানে খুশি যাও। আমার কি?”
তারিন চুপিসারে হাসল। অতঃপর তামজিদের গাল টেনে, খুব ভাব নিয়ে বড় গলায় বলে উঠল,
“একদম না। আমি চলে গেলেই আবার একটা ডাইনি এসে আমার জামাইয়ের ঘাড়ে বসবে৷ সেটা আমি বেঁচে থাকতে কোনোদিন হতে দিবো না। আমার জামাইয়ের দিকে কেউ নজর দিলেও তার চোখ তুলে ভুনা করে খিচুড়ি দিয়ে খেয়ে ফেলবো। সবসময় নামটা মনে রাখবেন, ‘তারিন দ্যা তামজিদের স্ত্রীর’। উখে?”
তারিনের এমন উল্টাপাল্টা কথা শুনে তামজিদ ফিক করে হেসে ফেললো। হেসে তারিনকে বুকে শক্ত করে প্যাঁচিয়ে ধরল। তারিনের গলায় জোরেসোরে একটা কামড় বসিয়ে দিয়ে, সাবধানতার বাক্যে বলে দিলো,
“আর একদিন যদি উল্টোপাল্টা কথা বলেছো তাহলে এমন জায়গায় কামড় দিবো যে, কাউকে দেখাতে পারবে না। বুঝছো, আমার চাঁদ?”
তারিন গলায় হাত বুলাতে বুলাতে ব্যাথাতুর স্বরে বলে উঠল,
“আস্তো খাটাশ লোক একটা।”
তামজিদ হেসে তারিনকে বুকে শক্ত করে ধরে রেখে বলল,
“শুধু তোমার জন্য।”
তারিনও প্রতিউত্তরে হাসলো। তারপর দুজনেই তলিয়ে গেলো অঢেল ঘুমে।



ফজরের আজানের সময় তামজিদের ফোনের টুংটাং এলার্মের শব্দে তারিনের ঘুম ভাঙলো। ঘুমঘুম চোখে তাকিয়ে দেখলো এখনো সেই তামজিদের বুকেই আছে। মাঝে মাঝে অবাক হয় ভীষণ। যেদিন থেকে তামজিদের বুকে ঘুমানো শুরু হয়েছে, সেদিন থেকে প্রতিদিন সকালে উঠে তারিন নিজেকে সেই একই জায়গায় আবিষ্কার করে৷ ছেলেটা কি এপাশ/ওপাশ করে না? এভাবে সারারাত থাকা যায়? বুক ব্যাথা হয়ে যায় না? হাত ব্যাথা হয়না? কি জানি? এত ধৈর্যশীল কেন মানুষটা? তারিন বিয়ের দিনের কথা মনে করলো। যেই মানুষটা বিয়ের দিন বিয়ে ভেঙে দেওয়ার জন্য হাত জোর করেছিলো, আজ সেই মানুষটাই ওর মানসিক শান্তির কারণ। খোদা কি এক রহমতের সম্পর্ক বানিয়ে দিয়েছেন। মাশ-আল্লাহ! মনে মনে প্রার্থনা করলো, ‘পৃথিবীর প্রতিটা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক যেনো মৃ’ত্যুরর আগে অব্দি উপরওয়ালার রহমত দ্বারা পূর্ণ থাকে’। তারিন তামজিদের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই তামজিদ ঘুমন্ত স্বরে বলল,
“নড়ছো কেন? ব্যাথা পাচ্ছো?”
তারিনের ঠোঁটে হাসি ফুটল। মানুষটা ঘুমের মাঝেও তারিনের ব্যাথা, কষ্ট নিয়ে ভাবছে৷ তারিন নিচু স্বরে উত্তর দিলো,
“না।”
তামজিদ পুনরায় আগের ন্যায় জিজ্ঞাস করল,
“তাহলে নড়ছো কেন?”
“এমনি।”
তামজিদ এবার ঘুমের ঘোরেই তারিনকে আবার বুকে টেনে নিলো। মিষ্টি স্বরে বলে উঠল,
“নড়ো না। আমার শান্তি নষ্ট হয়ে যাবে।”
তারিন আর উত্তর দিতে পারলো না। মানুষটার থেকে সরে আসতেও পারলো না। চুপচাপ তামজিদের উদাম বুকের সাথে লেপ্টে রইল। তামজিদের হার্টবিটের প্রতিটা শব্দ তারিনের কানে বাজছে। তারিন কি বলবে বুঝতে পারলে না? এই মুহূর্তে মানুষটা কি জাগানোর প্রয়োজন? নাকি কিছুটা সময় শান্তিতে ঘুমাতে দেওয়া উচিত? তারিন একবার ঘড়ির দিকে চোখ বুলিয়ে বলে উঠলো,
“মাস্টার মশাই, ও মাস্টার মশাই? শুনছেন?”
তানজিদ ঘুমের স্বরে জবাব দিলো,
“বলো শুনছি।”
তারিন এবার আগের ন্যায় শান্ত স্বরে বলল,
“ উঠুন, নামাজ পড়বেন না?”
কিছু সেকেন্ড কাটলো। তামজিদ পিট পিট করে চোখ খুলল। চোখ খুলে প্রতিদিনের মতো আজকেও তারিনের কপালে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালো। ঘুমন্ত চেহারায় আলতো হেসে মিষ্টি স্বরে বলে উঠলো,
“শুভ সকাল, আমার চাঁদ। তোমার দিন ভালো কাটুক।”
তারিন হাসলো। তামজিদের দেওয়া ভালোবাসার ছোঁয়া নিজেও ফেরত দিলো। তামজিদের কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো। তামজিদের নাকের সাথে নাক ঘষে বললো,
“আপনি পাশে থাকলে আমি প্রতি সেকেন্ড, মিনিট, ঘন্টা, দিন অনেক ভালো থাকি। আলহামদুলিল্লাহ।”
তামজিদ হাসলো। জিজ্ঞেস করলো,
“মাথা ব্যাথা করছে?”
তারিন হেসে বললো,
“না।”
“সত্যি?”
“পাক্কা।”
“তাহলে চলো ফ্রেশ হয়ে আসি।”
বলেই তামজিদ উঠে বসলো। বিছানা থেকে নেমে আগে তারিনের শাড়িটা ঠিক করে গুছিয়ে দিলো। তারপর তারিনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে উঠলো,
“সাবধানে নামবে৷”
তারিনের হাত ধরে বিছানা থেকে নামালো। ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই অসাবধানতায় তারিনের পা শাড়িতে আটকে গেলো। পড়ে যেতে নিলেই তামজিদ সামলে নিলো। তারিন প্রথমে ভয় পেলেও, সেকেন্ডের মাথায় ভয়টা উবে গেলো। কোনোরকমে নিজেকে সামলে দেখলো সে তামজিদের বুকে নিরাপদে রয়েছে। তামজিদ এবার জোরে রাগী স্বরে বলল,
“কাল বার বার বলেছিলাম, শাড়ি পড়বে না৷ শুনেছো আমার কথা? এক্ষুনি পড়ে গেলে কি হতো?”
তারিন হাসলো। তামজিদের গালে হাত রেখে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“আপনি আছেন তো। আমাকে সামলে নিবেন, আমি জানি।”
তামজিদ থতমত খেলো। মেয়েটা সবসময় এভাবেই ওকে চুপ করিয়ে দেয়৷ তবুও আগের ন্যায় ধমক দিয়ে বলে উঠলো,
“কোনো পাকামো করবে না। আজ থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া অব্দি শাড়ি পড়বে না। থ্রি-পিস পড়বে। বুঝেছো?”
“হ্যাঁ, মশাই।”
তামজিদ এবার খুব সাবধানে তারিনকে ওয়াশরুমে ঢুকিয়ে দিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“দরজা ভেতর থেকে লক করবে না। আমি এখানে আছি। আর দেখে শুনে পা ফেলবে, বলে দিলাম। ফ্রেশ হয়ে গেলে আমাকে বলবে।”
তারিন প্রতিউত্তরে কি বলবে ভেবে না পেয়ে হাসলো। তামজিদের কথামতো দরজা লক করলো না। ফ্রেশ হয়ে, একেবারে ওযু করে বের হলো। তারিন বের হয়ে আসতেই তামজিদ বলল,
“চেয়ারে পড়বে নাকি জায়নামাজেই পড়তে পারবে? নিজের অবস্থা বুঝে বলো?”
তারিন বলল,
“আমি এতটাও অসুস্থ নই যে, চেয়ারে বসে পড়ব। আলহামদুলিল্লাহ, ঠিক আছি। আপনি ওযু করে আসুন।”
তামজিদ ওযু করতে ঢুকলে তারিন এই সময়ে দুটো জায়নামাজ বিছিয়ে নিলো। তারিন আগের থেকে অনেকটাই সুস্থ। মাথায়ও ব্যাথাটা কম। তবুও তামজিদ একদম বাচ্চাদের মতো করে তারিনকে আগলে রাখে। তামজিদ বের হতেই দুজনে মিলে নামাজ আদায় করে নিলো। নামাজ শেষ করে তামজিদ তারিনকে পাশে বসিয়ে কোর-আন পড়ে শুনাচ্ছে। আবার মাঝে মাঝে তারিনের মাথায় ফুঁ দিয়ে দিচ্ছে৷ তারিন খুব মনোযোগ দিয়ে তামজিদের পড়া শুনছে। মনটা নিমিশেই শান্ত হয়ে গেলো। শরীরের সব অসুস্থতা, ব্যাথা, যন্ত্রণা এক মুহূর্তেই ভুলে গেলো তারিন। পড়া শেষ হতেই তারিন বলে উঠল,
“চলুন, একটু হেঁটে আসি।”
তামজিদও বারন করতে পারলো না। দুজনে মিলে হাঁটতে বেরিয়ে গেলো।



যাওয়ার আগে তারিন একবার আমজাদ সাহেবের রুমে উঁকি দিয়ে যেতে ভুললো না। এটা ওর নিত্যদিনের কাজ। দরজা খোলার সময় মাইশার কান্নার আওয়াজ কানে ভেসে আসলো তারিনের। তাই তামজিদকে বললো মাইশাকে নিয়ে আসতে। তামজিদও তারিনের কথামতো মাইশাকে গিয়ে নিয়ে আসলো। আর তানহা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালো। আজ থেকে আবার তামজিদের কলেজ আছে। তারিন, মাইশা আর তামজিদ মিলে ওদের ফুলের বাগানের সামনে এসে দাঁড়ালো। মাইশা বাইরে বেরিয়ে খিলখিল করে হাসছে। তামজিদ একটা গোলাপ ফুল ছিড়ে তারিনের খোঁপায় গুঁজে দিতেই, মাইশা ছুঁ মে’রে সেটা কেটে নিলো। তা দেখে তামজিদ কপাল কুঁচকে মাইশার উদ্দেশ্যে বলল,
“এটা কি করলে, মা? আমার বউয়ের জিনিসে ভাগ বসালে? একদম ঠিক করো নি তুমি? এক্ষুনি আমার বউয়ের ফুল আমার বউকে ফেরত দাও।”
কথাটা শেষ হতেই মাইশা ভ্যাঁ করে কান্না করে উঠল। তা দেখে তামজিদের মুখটা চুপসে গেলো। তামজিদের চুপসে যাওয়া মুখ দেখে তারিন ফিক করে হেসে দিলো। বলল,
“এবার ঠ্যালা সামলান, জনাব।”
তামজিদ মাইশাকে কোলে নিলে দোলাতে দোলাতে বলল,
“কে মে’রেছে আমার মা কে? মামনি মে’রেছে? ঠিক আছে আমরা মামনিকে মে’রে দিবো। কান্না করে না, মা।”
কে শুনে কার কথা? একাধারে মাইশা কেঁদেই যাচ্ছে। আর মাইশাকে সামলানোর জন্য তামজিদ এটা, ওটা বলছে। কতক্ষণ ফুল দিচ্ছে তো কতক্ষণ পাতা দিচ্ছে। কিছুক্ষণ নাচাচ্ছে, তো কিছুক্ষণ দোলাচ্ছে। কিন্তু কোনোমতেই থামছে না। এদিকে তামজিদ নিজেই হাঁপিয়ে গেছে৷ তাই এবার তারিন মাইশাকে কোলে নিতে নিতে বলল,
“আমার কাছে দিন। আপনার দ্বারা কিছু হবে না।”
মাইশাকে কোলে নিয়ে তারিন আদুরে স্বরে বলতে লাগলো,
“ওরে, আমার সোনাটাকে মামা বকেছে? এখন মামাকে নেচে নেচে আমার সোনামনিকে স্যরি বলতে হবে? তুমি কি মামার নাচ দেখবে বলো, মামনি?”
তারিন এ কথা বলার সাথে সাথে মাইশার কান্না থেমে গেলো। মাইশা কান্না থামতে দেখে তামজিদের মুখটা চুপসে গেলো। তারিন তা দেখে ঠোঁট চেপে হেসে বলল,
“নাচুন। দাঁড়িয়ে আছেন কেন? দেখছেন না আমার সোনাটা আপনার নাচ দেখার জন্য বসে আছে? নাচুন।”
তামজিদ মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল,
“কিন্তু, আমি তো নাঁচতে পারিনা।”
তামজিদ কথাটা বলতে বলতেই মাইশার কান্না শুরু হয়ে গেলো। ব্যস আর কি? তামজিদ বুঝে গেছে আজকে ও’কে বাঁচানোর আর কেউ নেই? উপায় না পেয়ে কোনোরকমে ব্যাঙের মতো হাত পা লাফিয়ে নাচা শুরু করে দিলো। তামজিদের নাচ দেখে তারিন হাসতে হাসতে শেষ। এতক্ষণ পরে মাইশার মুখেও হাসি ফুটেছে। তামজিদের মুখ আর নাচের ভঙ্গিমা দেখে তারিন হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে৷ এর মধ্যেই তানহা পেছন থেকে বলে উঠল,
“কি রে ভাই? তুই এমন কোলা ব্যাঙ্গের মতো লাফাচ্ছিস কেনো? পাগল-টাগল হয়ে গেলি নাকি?”
বলেই তানহা হাসতে লাগলো। মাইশা কান্না শুনে তানহা বেরিয়ে এসে দেখে তামজিদ এমন অদ্ভূত ভাবে লাফাচ্ছে। তানহাকে দেখে তামজিদ বেশ লজ্জা পেলো। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“তোর মেয়ে এক বজ্জাত, সাথে জুটেছিস তোরা ননদ, ভাবি দুই বজ্জাত। আমার জীবনটাকে শেষ করে দিলো।”
বলেই তামজিদ আর এখানে এক মুহূর্ত থাকলো না। হনহন করে বড় পা ফেলে রুমে চলে গেলো। তারিন ঠিক বুঝলো তামজিদ লজ্জা পেয়ে দৌঁড় লাগিয়েছে। তানহার কাছে তারিন সবটা বলতেই দুজনে মিলে একসাথে উচ্চস্বরে হেসে উঠলো।

#চলবে