আমার নিঠুর মনোহর পর্ব-২৯

0
53

#আমার_নিঠুর_মনোহর
#লেখিনীতে_জেনিফা_চৌধুরী
#পর্ব_উনত্রিশ

পরিক্ষা কেন্দ্রের সামনে গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে তারিনের কিছু একটা সাথে পা আটকে গেলো। উলটে পড়ে যেতে নিলেই একটা শক্তপোক্ত হাত এসে আঁকড়ে ধরলো। ভয়ে তারিন চিৎকার করে সামনের ব্যক্তিটার শার্ট খামচে ধরলো। তামজিদ তারিনকে শান্ত করার জন্য, অভয়বাক্যে বলে উঠলো,
“আমি আছি তো। ভয় পেও না। কিছু হয়নি।”
তারিন এবার চোখ খুললো। তামজিদের মুখের দিকে ভয়ার্র দৃষ্টিতে তাকাতেই, তামজিদের মুখের মিষ্টি হাসিতে সব ভয় কেটে গেলো। তারিনের ঠোঁটের কোনেও হাসি ফুটলো। তামজিদ চারদিকে একবার নজর বুলিয়ে তারিনের কপালে আলতো করে চুমু খেলো। দুই গালে হাত রাখলো পরম যত্নে। হাসি মুখে শুধালো,
“মনে রেখ, যেকোনো সময়, যেকোনো পরিস্থিতিতে তোমাকে আগলে রাখার জন্য তোমার স্বামী নামক ছায়া আছে। তাই একদম ঘাবড়ে যাবেনা। ভয় পাবেনা।”
তারিন হাসতে হাসতে মাথা নাড়ালো। গাড়ি থেকে নেমে তামজিদের পা ছুঁয়ে সালাম করার জন্য ঝুঁকতেই তামজিদ ধরে ফেললো। শক্ত কণ্ঠে বলে উঠলো,
“কি করছো? সালাম করছো কেনো? তুমি জানোনা উপরওয়ালা বাদে আর কারোর সামনে মাথা নত করতে হয়না?”
তারিন নিজের ভুলটা বুঝলো। ঝোঁকের মাথায় ভুল করে ফেলছিলো৷ তামজিদ তারিনকে হালকা করে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“তোমার জায়গা আমার পায়ে নয়। তোমার জায়গা আমার বুকের বা পাশে।”
তারিন হাসলো। আল্লাহর কাছে লক্ষ কোটি বার শুকরিয়া জ্ঞাপন করলো। মনে মনে ভাবলো, হয়তো কোনোদিন ভালো কাজ করেছিলো। তাই আল্লাহ খুশি হয়ে এত সুন্দর একটা পরিবার দিয়েছেন। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আমজাদ সাহেবকে বলতে গেলে তিনি তারিনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন,
“মন শান্ত রেখে পরিক্ষা দিও, মা। দোয়া করি অনেক বড় ডাক্তার হও। আমার মা ডাক্তার হয়ে আমার সেবা করবে, এই আশায় দিন গুনবো।”
তারিন শুধু হেসে উত্তর দিয়েছিলো,
“আপনারা শুধু আমার জন্য দোয়া করবেন। আমি আপনাদের মান ডুবাবো না, বাবা।”
খুশি হয়ে সে তারিনের হাতে পাঁচ হাজার টাকা গুঁজে দিয়েছেন। তানহা একটা লাল জামদানী শাড়ি হাতে দিয়ে, গাল ছুঁয়ে বলেছিলো,
“তোমার পরিক্ষার পরেই তো তোমাদের বিবাহ বার্ষিকী। তখন এই শাড়িটা পরো। খুব ভালো করে পরিক্ষা দিও। বেস্ট অফ লাক।”
বের হওয়ার সময় তারিন মাইশাকে কোলে তুলে চুমু খেয়ে তারপর বের হয়েছে। তামজিদের হাত ধরে কলেজের গেটের সামনে আসতে আসতে এই সুন্দর মুহূর্ত গুলো মনে করছিলো তারিন। গেটের সামনে আসতেই হঠাৎ কয়েকটা ছেলে মিলে একসাথে জোরে চেঁচিয়ে বলে উঠে,
“বেস্ট অফ লাক, বোনুউউউ।”
তারিন ভাবনার মধ্যে এতই ডুবে ছিলো যে আশেপাশের কাউকে খেয়াল করেনি। হঠাৎ করে ছেলেগুলো সামনে এসে দাঁড়ানোতে ভয় পেয়ে দুই পা পিছিয়ে যেতে নিয়ে পড়ে যাওয়ার আগেই তামজিদ ধরে ফেললো। হার্টবিট তবলা বাজানো শুরু করলো মুহূর্তে। ভয়ার্ত চোখে সামনে তাকাতেই ফোস করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। অবাক স্বরে বলে উঠল,
“ভাইয়া, আপনারা! উফফ! ভয় পাইয়ে দিয়েছিলন।”
সামনে দাঁড়ানো ৩/৪টা ছেলে সাথে দুইজন মেয়ে। এরা সবাই তামজিদের বন্ধু। এই দুই বছরে এদের সাথে তারিনের বেশ ভাব জমেছে। ওরা সবাই তারিনকে ছোটবোনের মতো স্নেহ করে। সচারাচর কেউ ওরা তারিনকে ভাবি ডাকেনা। সবাই নাম ধরেই ডাকে। এই বিষয়টা তারিনের বেশ ভালো লাগে। মনে হয় সবাই ওরা সবাই তারিনের নিজের ভাই। তারিন ওর বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই তারিনের খুব আফসোস হতো যে কেনো ওর কোনো ভাই বোন। এখন আর সেই আফসোস নেই। ভাই/বোন দুটোই পেয়েছে খুব ভাগ্য করে। তামজিদ এবার ওদের সবাইকে ধমক দিয়ে বলে উঠে,
“তোদের কোনো আক্কেল নেই? এক্ষুনি ও পড়ে যেতো। ননসেন্স! বাই দ্যা ওয়ে, তোরা এখানে কি করছিস?”
তামজিদের কথা শেষ হতেই রিহাব উল্টো ধমকে বলল,
“তুই চুপ কর। তারিন আমাদের বোন। আমাদের বোনের পরিক্ষা আর আমরা ওকে সার্পোট দিতে আসবো না?”
রাহিমও তালে তাল মিলিয়ে বলল,
“সেটাই! আমরা আসবো কি আসবো না সেটা তুই বলার কে?”
তামজিদ দাঁতে দাঁত চে’পে বলল,
“ও আমার বউ।”
তামজিদের সুরে সুর মিলিয়ে ওরা সবাই একসাথে বলে উঠলো,
“আর ও আমাদের বোন।”
তামজিদ চুপ হয়ে গেলো। আর তারিন ঠোঁট চে’পে হাসছে। এরা একসাথে হলেই এমন হৈ-হুল্লোড়, হাসি ঠাট্টা, খুনশুটিতে মেতে উঠে। জুঁই সবাইকে হাত উঁচু করে থামানোর ভঙ্গিতে বললো,
“স্টপ। আমরা সবাই এখানে এসেছি আমাদের ছোট্ট বোনকে উইশ করতে, তা না করে বসে বসে ঝগড়া করছিস তোরা? গাঁ’ধার দল।”
তামজিদ মিনমিনিয়ে বললো,
“সেটা তোরা জন্মের পর থেকেই।”
তামজিদের কথাটা খুশবা শুনে ফেললো। গর্জে উঠে বললো,
“তুই নিজে কি?”
তামজিদ খুব ভাবসাব নিয়ে বললো,
“খুবই ভদ্র।”
তা শুনে রাফি মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠল,
“বা*ল ভদ্র।”
তামজিদ গরম চোখে তাকালো। বললো,
“একদম মুখ বরাবর একটা লা’থি মা’রবো, শা’লা। মুখ খারাপ করিস কেনো?”
তারিন এবার বাঁধ হয়ে দাঁড়ালো। চোখ দুটো ছোট ছোট করে তামজিদের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে প্রশ্ন করলো,
“ আগে নিজে ভালো হয়ে দেখান। পরে আমার ভাইদের বকবেন।”
“আমি আবার খারাপ ছিলাম কবে?”
এবার অয়ন বললো,
“জন্মের পর থেকে।”
তারিন বললো,
“শা’লা শব্দটা এখন আপনি খুব ভালো অর্থে ব্যবহার করেছেন আপনি? গালি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাই আমার ভাইয়েরা যদি খারাপ হয়, তাহলে আপনিও খারাপ। মাইনাসে, মাইনাসে প্লাস বুঝলেন?”
এবার মুজাহিদ তারিনের সাথে সঙ্গ দিয়ে বললো,
“এই না হলে আমাদের বোনু।”
বলেই হাইফাইভ করলো। তামজিদের মুখখানা চুপসে গেলো। চুপসানো মুখ নিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
“তুমি কি এখানে দাঁড়িয়ে ওদের সাথে গল্প করবে নাকি পরিক্ষা হলে ঢুকবে?”
তারিন এতক্ষণ পরিক্ষার কথা ভুলেই বসেছিলো। তামজিদ আবার মনে করিয়ে দিতেই তারিনের তারিনের হার্টবিট দূর্বল হয়ে পড়লো। ঘড়ির দিকে একবার তাকালো নিদিষ্ট সময়ের আরো এক ঘন্টা বাকি। ভয়ার্ত স্বরে সবার উদ্দেশ্যে বললো,
“আমি তাহলে যাই। দোয়া করবেন আমার জন্য। ভালো রেজাল্ট করলে আমার জামাইয়ের পক্ষ থেকে আপনাদের সবাইকে সাজেক ঘুরতে নিয়ে যাবো, প্রমিস।”
তারিনের কথা শেষ হতেই ওরা সবাই একসাথে চেঁচিয়ে বলে উঠল,
“সত্যি!”
তারিন মুখ টিপে হাসলো। বললো,
“পাক্কা সত্যি।”
ওইদিকে তামজিদ বেচারার কাশি উঠে গেলো। তামজিদ কিছু বলতে যাবে তার আগেই রাফি বলে উঠল,
“ঠিক আছে এই কথাই রইলো, বোনু। আমরা তাহলে আজ আসি। তুমি ভালো করে এক্সাম দিবা। অল দ্যা বেস্ট।”
বলেই একটা ঘড়ির বক্স হাতে ধরিয়ে দিলো। একে একে ওরা সবাই তারিনকে গিফট দিয়ে বিদায় নিয়ে চলে গেলো। ওরা চলে যেতেই তারিন তামজিদের দিকে তাকিয়ে মেঁকি হাসি দিয়ে বললো,
“এগুলা কোথায় রাখবো, মাস্টার মশাই?”
তামজিদ দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
“আমার মাথায় রাখো।”
তারিন সত্যি সত্যি তামজিদের মাথায় গিফট গুলো রাখতে গেলে তামজিদ ধমকে উঠে বললো,
“একদম পাকনামি করবে না। চলো এখন।”
তারপর নিজেই তারিনের হাত থেকে ব্যাগ গুলো এক হাতে নিয়ে অন্য হাতে তারিনের হাত ধরে ভেতরে ঢুকলো। তারিনের রুম নাম্বার তামজিদে আগে থেকে জানা ছিলো। তাই সেই রুম গিয়ে তারিনকে নিদিষ্ট বেঞ্চের সামনে এনে দাঁড় করাতেই তারিন ভয় ভয় চোখে তামজিদের দিকে তাকালো। তামজিদ মিষ্টি হেসে বললো,
“ভয় পেও না। আল্লাহ ভরসা। সব ঠিকঠাক হবে, ইন শা আল্লাহ।”
তারিনও জোর গলায় বললো,
“ইন শা আল্লাহ।”
তামজিদ চারদিকে নজর বুলিয়ে বললো,
“তোমার বেস্টফ্রেন্ড কোথায়?”
তারিনের এতক্ষণে খেয়াল হলো নিহা এখনো আসেনি। তাই ভাবুক কণ্ঠে বললো,
“তাইতো, ও এখনো আসেনি কেনো? গাঁধাটা আজকেও লেট করে আসবে। এটাকে নিয়ে আর পারিনা আমি।”
তামজিদ হাসলো। কিছু বলতে যাবে তখনি নিহার চেঁচানো শুনতে পারলো। কার সাথে যেনো বকবক করতে করতে আসছে। পেছনে ফিরতেই দেখলো নিহা একদম কুল হয়ে হেলে দুলে রুমে ঢুকছে। তারিনকে দেখতে পেয়ে দরজা থেকে এক দৌড়ে এসে তারিনকে ঝাপটে ধরলো। দুজনে মিলে পড়ে যেতে যেতে সামলে নিলো। তামজিদ প্রায় ভয় পেয়ে গেছিলো। কিন্তু ওদের সামলানো দেখে স্থতি পেলো। মেয়ে দুটো এত চঞ্চল যে হাত পা ঠিক থাকেনা। তারিন নিজেকে সামলে বললো,
“আল্লাহ গো, এক্ষুনি দুইটায় মিলে পড়ে গিয়ে কোমরের বারোটা বাজিয়ে ফেলতাম। বে”দ্দপ, নিজেও মর’বি লগে আমারেও মা’রবি।”
নিহা বেক্কলের মতো হাসি দিয়ে বললো,
“না তোরে লইয়া ম’রা যাইবোনা, তাইলে আমাগো তামজিদ বাবু শোকে পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবো।”
কথাটা শুনে তারিন ঠোঁট চে’পে হাসলো। আর তামজিদ হালকা কেশে উঠতেই নিহা পাশ ফিরলো। এতক্ষণে তামজিদকে খেয়াল করে ভয় পেয়ে ‘মাগো’ বলে দুই পা পিছিয়ে গেলো। কোনোরকমে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে আমতা আমতা করে বলতে লাগলো,
“স্যার, আপনি! কখন আসলেন? আসসালামু আলাইকুম, স্যার। ভালো আছেন? শরীর ভালো আছে? স্যার, আমাদের প্রশ্ন কেমন আসবে? কঠিন নাকি সহজ? ও স্যার, দোয়া কইরেন আমাগো জন্য।”
নিহার একসাথে এতগুলো প্রশ্ন করা দেখে তারিন হেসে ফেললো৷ আর তামজিদের মাথা চক্কর দেওয়া শুরু হলো। মেয়েটা এত্ত বাচাল কেন? তবুও হাসি মুখে সালাম নিয়ে বললো,
“বেস্ট অফ লাক।”
তারপর তারিনের উদ্দেশ্য বলল,
“তাহলে থাকো। আমি আসি। সময় হয়ে গেছে। একবার অফিসে রুম যেতে হবে। ভয় পাবেনা একদম। আমি আবার এসে দেখে যাবো। আমার গার্ড পড়েছে পাশের গার্লস কলেজে। এখান থেকে ১০ মিনিটের দূরত্ব। আমি আসবো, তুমি চিন্তা করো না। বুঝলে?”
তারিন অসহায় চোখে তাকালো। এই মানুষটা ছিলো বলেই এতক্ষণ নিশ্চিন্তে ছিলো। চলে যাবার কথা শুনে আবার চিন্তা শুরু হয়ে গেলো। তামজিদ তারিনের গাল আলতো করে টেনে বললো,
“হাসো, আমার চাঁদ।”
তারিন হাসলো। তা দেখে তামজিদ তারিনের গালে আলতো করে হাত রেখে বললো,
“আজকে যারা গার্ড পড়বে তারা সবাই তোমাকে চিনে। চিন্তা করো না। কোনো হেল্প লাগলে তাদের বলবে নিঃসংকোচে। বুঝলে?”
তারিন মাথা নাড়ালো। অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’। তামজিদ আলতো হেসে বললো,
“আসি তাহলে?”
তারিন হাসি মুখেই বললো,
“সাবধানে যাবেন।”
তামজিদ বললো,
“আল্লাহ ভরসা।”
তারপর ওদের দুজনের থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলো। বেরিয়ে আসতে আসতে খেয়াল করলো তারিনের তামজিদের যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে অসহায় চোখে। কিন্তু কি আর করার? তামজিদ তারিনকে স্বান্তনা দিলেও নিজে ভেতরে ভেতরে চিন্তায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। মনে মনে প্রার্থনা করছে,
“মেয়েটা যেনো নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।”
তামজিদ নিজে বাচ্চা খুব পছন্দ করে। মাঝে মাঝেই বাবা ডাক শোনার জন্য অস্থির লাগে। শুধুমাত্র তারিনের কথা ভেবে তামজিদের নিজের ইচ্ছাটাকে সেক্রিফাইস করছে। নিজের অদম্য ইচ্ছাটাকে দমিয়ে রাখছে। শুধু মাত্র তারিনের স্বপ্ন পূরণের জন্য৷ গাড়িতে এসে বসতেই কেনো যেনো তামজিদের চোখ থেকে দুই ফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো। নিজে নিজে বলে উঠল,
“আল্লাহ তুমি দেখো। আমাদের সহায় থেকো।”
তারপর রওনা হলো নিজ গন্তব্যে৷ মাথাভর্তি চিন্তা আর ভয় থাকলেও সব ঠিক হবে ভেবে নিজেকে শান্ত রাখলো। শুরু হলো নতুন লড়াই।

#চলবে