আমার নিঠুর মনোহর ২ পর্ব-০৮

0
39

#আমার_নিঠুর_মনোহর
#লেখনীতে_জেনিফা_চৌধুরী
#দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#পর্ব_আট

হাসপাতালের বেডে বিয়ে হচ্ছে। এই প্রথম দেখছে তারিন। শুধু দেখছে না, শুনছেও এই প্রথম। নেওয়াজকে অবশ্য তামজিদ একবার বলেছিলো, নেওয়াজের বাসা বিয়ের অনুষ্ঠান করার জন্য, অথবা কাজি অফিসে নিয়ে গিয়ে। কিন্তু নেওয়াজ রাজি হয়নি। নিহার বিপি লো হয়ে আছে। শরীর ও বেশ দূর্বল। ডাক্তার জানিয়েছে যদি মাথা ঘুরে পড়ে যায় তাহলে স্ট্রোকের ঝুঁকি আছে। তাই নেওয়াজ কোনোরকম রিস্ক নিতে চায়না। এখানেই বিয়ে হবে। তারপর নিহার শরীর যতদিন সম্পূর্ণ সুস্থ না হবে ততদিন হসপিটালেই থাকবে। তাই আর কেউ জোর করেনি। নিহা লাল রঙের একটা থ্রি-পিস পড়েছে। ওড়না দিয়ে ঘোমটা দিয়ে আছে। আর নেওয়াজ লাল রঙের পাঞ্জাবী পড়েছে। কাজির সাথে কিছু একটা নিয়ে কথা বলছে। তামজিদ আর তারিন ম্যাচিং করে সাদা রঙের শাড়ি, পাঞ্জাবী পড়েছে৷ নিহার ঠোঁট জুড়ে রয়েছে বিশাল হাসি। নিহার বাবা-মাকেও নেওয়াজ জানিয়েছে। যতই হোক নিহার বাবা-মাকে ছাড়া তো আর বিয়ে হবে না। নিহার বাবা-মা প্রস্তাবে রাজি হয়েছে। অনেক আগেই এসে পড়েছে এখানে। নিহার ভাই আফসানের সাথেও নেওয়াজ কথা বলেছে। সেও মত দিয়েছে। সব মিলিয়ে নিহা বেশ খুশি। খুশিতে নাচতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু পারছে না। তারিন নিহার পাশে বসে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো,
“অনুভূতি কেমন নিহু?”
“তোর বিয়ের সময় তোর অনুভূতি কেমন ছিলো?”
তারিন তামজিদের দিকে একবার তাকিয়ে বলে উঠল,
“বুইড়া বেডারে বিয়ে করার কোনো ইচ্ছাই আমার ছিলো না। তবুও করতে হইলো।”
তামজিদ কথাটা শুনে ফেললো। দেরি না করে তারিনের দিকে বেশ ঝুঁকে ফিসফিস করে উত্তর দিলো,
“দেখো তোমার কি সোনায় সোহাগা কপাল? বুইড়া বেডারে বিয়ে করতে চাও নি বলেই আজ তার বাচ্চার মা হতে যাচ্ছো। ভাবো এবার বুড়া কালেই এত জোর তাহলে জুয়ান হলে কি হতো? সামলাতে পারতে জান?”
তারিন ঢোক গিলতে যেয়ে তালুতে উঠে গেলো। কাশতে কাশতে তামজিদকে বকা শুরু করলো। নিহা বেচারি মুখ চেপে বহু কষ্টে জোরে হাসিটাকে কন্ট্রোল করছে। অন্য সময় হলে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতো। শুধু নেওয়াজের ভয়ে এখন চুপচাপ হাসছে। তামজিদ বাঁকা হাসলো। পুনরায় চোখে মুখে দুষ্টুমির ছল এনে বলল,
“জান, আদর লাগবে? আদর খেলে কাশি কমে যাবে। আসো একটু আদর করে দেই। উম্মাহ।”
“চরম অস’ভ্য লোক।”
বলেই তারিন তামজিদকে দুই হাতে ঠেলে দূরে সরালো। নিহা হাসতে হাসতে একবার নেওয়াজের গায়ের উপর পড়ছে তো একবার তারিনের গায়ে উপর পড়ছে। তারিন এবার রাগে নিহাকেও ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। মুখ গুমোড়া করে বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে রইলো। তামজিদ গিয়ে পাশে দাঁড়ালো। কাঁধ দিয়ে তারিনের কাঁধে ধাক্কা দিয়ে বলল,
“আদর খাবা, পাখি?”
তারিন আগুন চোখে তাকালো। তামজিদ তা দেখে দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল,
“এভাবে তাকিও না, পাখি। হার্টে ব্যাথা শুরু হয়ে যাবে।”
তামজিদের দাঁত কেলানো দেখে তারিন আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলো না৷ হেসে দিলো। সাথে তামজিদও হেসে এক হাতে তারিনকে সামান্য জড়িয়ে ধরে দাঁড়ালো। কাজির সাথে সব বোঝাপড়া হতেই বিয়ে শুরু হলো। নিহার বাবা-মা ও উপস্থিত আছে। বিয়ে শেষ হতেই নিহার বাবা নিহাকে নেওয়াজের হাতে তুলে দিয়ে বলল,
“আমি তো আমার মায়ের যত্ন করতে পারিনি, ওকে ভালোবাসা দিতে পারিনি। তুমি আমার মেয়েটাকে সামলে রেখো। যত্নে রেখো।”
নেওয়াজ শান্ত বাক্যেই বলল,
“আপনারা ওকে জন্ম দিছেন এই জন্য হলেও আমি আপনাদের যথাযথ সম্মান করবো। কিন্ত ওর প্রতি যে অন্যায় করেছেন তার জন্য কখনো ক্ষমা করতে পারবো না, আংকেল। আর রইলো নিহার কথা ও আমার ব্যক্তিগত গোলাপ ফুল। গোলাপ যেমন গাছে খুব যত্ন থাকে। আবার যখন সেটা কেউ ছিঁড়ে ফেলতে আসে তখন কাঁটার ভয়ে খুব যত্ন করে সাবধানে ছিঁড়ে। ও আমার কাছে ঠিক ততটুকুই যত্ন থাকবে, যতটুকু যত্নে থাকলে একটা মেয়ের হাজার বছর বেঁচে থাকার স্বাধ জন্মায়।”
নিহা প্রশান্তির চোখে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আছে। কী আশ্চর্য! একজন মানুষ এত নিঁখুত ভাবে ভালোবাসতে পারে? নিহা উপলব্ধি করলো উপরওয়ালা কাউকে ঠকান না। কোনো না কোনো দিক দিয়ে মানুষ সম্পূর্ণটাই পায়। শুধু ধৈর্য ধারণ করতে হয় সঠিক সময়ের জন্য। তামজিদ এবার তারিনকে ফিসফিস করে বলল,
“শুনো পাখি?”
“কি শুনবো?”
“তোমার বাবাও তো আমাকে বিয়ের সময় বলেছিলো তোমাকে সুখে রাখতে, তাই তো?”
তারিন কথাটার মানে বুঝলো না। প্রশ্নোত্তর চোখে তাকিয়ে বলল,
“এই প্রশ্ন কেন?”
তামজিদ নাছোড়বান্দার মতো বলল,
“আরে বলো না। বলেছিলো কিনা?”
তারিন ভাবুক মুখশ্রী নিয়ে মাথা নাড়ালো। অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’। অতঃপর তামজিদ অসহায় মুখ করে বলে উঠলো,
“কিন্তু তোমার বাবা তো এটা বলেনি যে, ‘বাবা আমার মেয়ের জ্বালা যন্ত্রণা সহ্য করে তুমিও সুখে থেকো’।”
তারিন কথাটার মানে বুঝতে পারলো না। তাই প্রশ্ন করার জন্য মুখ খুলেও বন্ধ করে ফেললো। চোখ দুটো বড় বড় করে ফেললো। চোখ, মুখ খিচে তাকালো তামজিদের দিকে। প্রতিউত্তরে তামজিদ মিষ্টি হাসি উপহার দিলো। কিন্ত ততক্ষনে তারিন রেগে আগুন হয়ে গেছে। কিছু না বলে চুপ হয়ে গেলো। তামজিদ বেশ বুঝতে পারছে এ আগুন নেভানো এত সহজ না। বিয়ে শেষ হতেই যে যার মতো বাসায় চলে গেলো৷ তামজিদ যাওয়ার আগে নেওয়াজের কানে কানে বলল,
“বিয়ে তো হসপিটালে করলে, এখন কি বাসর টাও এখানে করার ইচ্ছে নাকি, নেওয়াজ বাবু?”
নেওয়াজ ও ফিসফিসিয়ে বললো,
“তুমি যদি ব্যবস্থা করে দিতে পারো, তাহলে আমি রাজি।”
“তুমি রাজি থাকলে এক্ষুনি ব্যবস্থা করে দিবো।”
নেওয়াজ হেসে উঠলো। বললো,
“তোমরা না গেলে শুরু করবো কিভাবে বলো? তাই তুমি গিয়ে নিজের বউ সামলাও। আমি আমার বউকে সামলে নিবো।”
তামজিদ হেসে বিদায় নিয়ে চলে আসলো।



গাড়িতে উঠেই দেখলো তারিন পেছনের সীটে বসেছে। দেখেই তামজিদ কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
“ স্বামীর সাথে রাগ করে সীট আলাদা করে ফেললে?”
তারিন উত্তর দিলো না। তা দেখে তামজিদ বেশ হেসে নরম সুরে বলল,
“ও পাখি। পাখি রে। পাখি, পাখি। শুনো। একটু শুনো। বলি?”
তারিন চুপ। তামজিদ পুনরায় আগের ন্যায় বলে উঠল,
“সামনে এসে বসো, পাখি। আর রাগ করে থেকো না। বাবা-মাকে আলাদা দেখে আমাদের বেবি কিন্তু খুব রাগ করবে।”
তারিন তবুও চুপ রইলো। তামজিদ এবার মুচকি হাসলো। অতঃপর নিজে গিয়েই তারিনকে কোলে তুলে নিতে নিতে বললো,
“কোলে উঠতে চাও মুখে বললেই হতো। এভাবে গাল ফুলিয়ে ঢং করার দরকার ছিলো না, পাখি।”
তারিন ভয় পেয়ে তামজিদের কলার শক্ত করে ধরে আছে। চেঁচিয়ে বলল,
“তাড়াতাড়ি নামান আমাকে। যদি পড়ে যাই কি হবে ভাবতে পারছেন?”
তামজিদ আরো শক্ত করে তারিনকে ধরে বলে উঠলো,
“আমি থাকতে আমার পাখি আর পাখির বাচ্চার কিছু হতে দিবো না আমার প্রতি এই বিশ্বাস নেই ?”
তারিন তামজিদের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“নিজের প্রতি বিশ্বাস নেই, কিন্তু আপনার প্রতি একশোভাগ বিশ্বাস আছে।”
তামজিদ তারিনকে সীটে বসিয়ে দিয়ে তারিনের কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“এই ছোট্ট পাখিটা কয়দিন পর মা হয়ে যাবে, কল্পনা করতে পারিনা আমি। একটা ছোট্ট প্রাণের জন্ম দিবে। সেই প্রাণ আমাদের চোখের সামনে বেড়ে উঠবে। হাঁটি হাঁটি পা করে সারা বাড়ি দৌড়ে বেড়াবে। ছোট ছোট আঙ্গুলে আমার হাত ছুঁয়ে দিবে। আমার বুকে দুটো প্রাণ একসাথে নিয়ে বাঁচবো আমি। শান্তির ঘুম ঘুমাবো৷ কত সুখের দিন আমার জন্য অপেক্ষা করছে বলো তো? সেই দিনগুলো কবে আসবে? অপেক্ষারা বাঁধ মানছে না তো।”
তারিনের এতক্ষণের সব রাগ ধুয়ে মুছে একাকার হয়ে গেলো। বলল,
“ইন শা আল্লাহ, সুখের দিন খুব শিঘ্রই আসবে।”
তামজিদ তারিনের কপালে দ্বিতীয় বার চুমু খেয়ে গিয়ে নিজের সীটে বসলো। অতঃপর রওনা হলো নিজ গন্তব্যে। তারিন নিজে পেটে হাত রেখে সীটে মাথা হেলিয়ে চোখ বুঝে রইলো।

#চলবে