আশার হাত বাড়ায় পর্ব-৩৪+৩৫

0
75

#আশার_হাত_বাড়ায়|৩৪|
#ইশরাত_জাহান
🦋
“আমার ছেলে তোমার জন্য দেশ ছেড়ে চলে গেছে।তুমি দায়ী ওর চলে যাওয়ার জন্য।”

কিছু বুঝতে পারলো না শ্রেয়া।তাকে যে কথাগুলো বলা হচ্ছে এটা সে শিওর কিন্তু সে তো কিছুই করেনি।প্রশ্ন করে,”আমি কি করেছি?”

“আমার ছেলেকে পটাতে চেয়েছিলে তাই না? পারোনি তো।তাই ওর বাবার সাথে রাগ করে চলে গেছে।থাকবে না এখানে।”

“আঙ্কেলের সাথে রাগ করেছে কেনো?”

“কারণ ও তোমার বাসায় প্রস্তাব নিয়ে গেছিলো তাই।তোমার মতো মিডিল ক্লাস ফ্যামিলির মেয়ে আদৌ কি আমাদের সাথে যায়?একটু ভেবে দেখোতো?”

মুখটা শুকনো হয়ে আসলো শ্রেয়ার।মুখের উপর এমন অপমান সহ্য করতে পারছে না সে।অতসী ব্যাগ থেকে ফোন বের করে দেখালো কালকের ভিডিও।যেখানে ফারাজ স্পষ্ট বলে দিচ্ছে সে শ্রেয়াকে ভালোবাসে না।বিয়ে করতে পারবে না শ্রেয়াকে।শ্রেয়ার চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে।এভাবে অপমান না করে ফারহান চৌধুরীর মাধ্যমে না করে দিলেই হতো।জিনিয়া এখন বিজয়ের হাসি হাসতে থাকে।ফারাজ তো রাজি ছিলো না এখন শ্রেয়া নিজেও না করে দিবে।জিনিয়া আর অতসী চলে যেতেই শ্রেয়া চলে আসে তার কেবিনে।কোনরকমে কাজ করতে থাকে।কাজ করলেও মন মস্তিষ্ক তার ঠিক নেই।এভাবে অপমানটা সহ্য হচ্ছে না।দুই ঘণ্টা পর না পেরে চলে গেলো এনির কেবিনে।এনি ভিডিও কনফারেন্সে আছে।শ্রেয়া নক করতেই হাত ইশারা করে শ্রেয়াকে বুঝিয়ে দিলো সামনে বসতে।শ্রেয়া বসে আছে।এনি কথা বলা শেষ করে শ্রেয়ার দিকে তাকালো।চোখমুখ লাল হয়ে আছে।বোঝা যাচ্ছে কান্না করেছে শ্রেয়া।কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা না করে এনি বলে,”কিছু বলবে?”

“আমি এই চাকরি করতে চাই না এনি।”

“হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত?”

“এমনি।আমার দ্বারা সম্ভব হচ্ছে না।”

“তুমি চাকরি করতে চাওনা এটা তোমার ডিসিশন তবে এই অফিস থেকে তোমাকে এখন বের করে দেওয়া তো সম্ভব না।”

“কেনো?”

“তুমি যার অ্যাসিসট্যান্ট হয়ে এসেছো সে কিন্তু এখানে নেই।তোমার বসের পারমিশন প্লাস পেপার সহ সই লাগবে।তবেই তুমি এই চাকরি বাদ দিতে পারবে।”

“ওনাকে ইনফর্ম করে দিলেই তো হলো।”

“শেহনাজ এটা কোনো হারিপাতিল খেলা না।এটা একটা কোম্পানি যেটাতে রুলস ফলো করে চলতে হয়।এখানে জয়েন হবার আগে তোমাকে একটা পেপারে সই করতে হয়েছে।সেখানে স্পষ্ট আমরা উল্লেখ করেছিলাম এক বছরের আগে নিজ থেকে তুমি যেতে পারবে না।আমরা স্ট্রং অ্যাসিসট্যান্ট খুজতেছি বলেই কিন্তু পেপারে সব রুলস উল্লেখ ছিলো।হ্যান্ডসাম এখানে বেশি একটা থাকে না যেটা দেখার তার অ্যাসিসট্যান্ট মানে তুমি আর তার শেয়ারহোল্ডার মানে আমি দেখবো।সবকিছু জেনেশুনে এসেও তুমি যেতে চাইছো।এতে কোম্পানিতে বড় আকারে লস হয়ে যাবে।”

“আমার ভালো লাগছে না এনি।আমি এই স্মার্ট জেনারেশনের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারছি না।অনেক সময় নিজের লিমিট ক্রস করে ফেলছি।নিজের উপর নিজেরই বিতৃষ্ণা লাগছে।”

“তুমি কিছুদিনের জন্য রেস্ট নেও।আজকে ছুটি নেও।তিনদিন পর এসো।কিন্তু সরি টু সে যে তোমাকে আমি এখন অফিস থেকে রিজাইন দিতে পারবে না।”

এনির কথা মতো শ্রেয়া মাথা নাড়িয়ে চলে যায়।হাতে থাকা কলমটি টেবিলের উপর রেখে এনি কল করে অর্পাকে।অর্পা রিসিভ করতেই এনি বলে,”লজিক্যালি সাথে অফিসের রুলস অনুযায়ী আমি শেহনাজকে আটকাতে পেরেছি।তুমি আজ আর ওর সাথে কথা বলো না।ওকে একটু হার্ড হতে হবে।নিজেকে শক্ত রেখে পথ চলা শিখতে হবে।নাহলে যে প্রতি পদে এভাবেই ভুগতে থাকবে।”

“হুম,আমি নিজেও চাই ও নিজের একটা রাস্তা করে তারপর এই পরিবারে আসুক।যে অশান্তি আমি ভুগছি এটা ওকে ভুগতে দিতে চাই না।মা কোনোদিন আমাকে ভালবাসেনি আমি চাই না শ্রেয়া এটা ফিল করুক।”

সকালেই যখন শ্রেয়ার দেরি হতে থাকে তখন এনি চেক করে সিসিটিভি ফুটেজ।যেটা ফারাজ আর তার ল্যাপটপের সাথে কানেক্ট থাকে।গাড়ি থেকে নেমে এনি দূরে দেখেছিলো শ্রেয়া রিক্সায় করে আসছে।যেখানে মিনিট পাঁচ দেরি হবে সেখানে কেনো আধা ঘন্টা দেরি হচ্ছে বুঝতে পারছিলো না।সিসিটিভি ফুটেজ দেখে এনি দেখলো শ্রেয়ার সামনে জিনিয়া আর অতসী।সাউন্ড সিস্টেম শুধু ফারাজের কাছে থাকায় কিছু শুনতে পারছে না।কি বলছে ওরা জানতে দারোয়ানকে কল করে।দারোয়ান রিসিভ করতেই এনি বলে,”আপনি চুপ থাকুন।ওখানে কি কথা হচ্ছে আমি শুনতে চাই।”

দারোয়ান চুপ থাকে।ওদের সমস্ত কথা শুনে নেয় এনি।সবকিছুর ঊর্ধ্বে শ্রেয়া কোনো প্রতিবাদ করেনি দেখে শ্রেয়ার উপর রাগ করে।শ্রেয়া যেভাবে চলছে তাতে বাংলা সিনেমার ন্যাকা হিরোইন থেকে কম কিছুই না।জিনিয়া আর অতসীর মুখের উপরে মোক্ষম জবাব দিতে পারতো শ্রেয়া।তাই এনি প্ল্যান করেছে সে কিছুই জানে না এমন ভাবে থাকবে।কেউ আঘাত করলে তাতে মলম লাগালে আঘাত শুকিয়ে যায়।ব্যথার কারণটাও ভুলে যায় সবাই।কিন্তু মলম না লাগিয়ে ব্যাথাকে পুষে রাখলে সেই ব্যাথা দ্বারা জীবনে বহুদূর এগিয়ে যায়।শ্রেয়াকে এখন এই ব্যাথা পুষে রাখতে হবে।তাহলেই সে নিজের পায়ে দাড়াতে পারবে।

বাসায় এসে শ্রেয়া কারো সাথে কোনো কথা না বলে দরজা আটকে দেয়। রিমলি সবকিছু শুনেছে অর্পার কাছে।রিমলি সব জেনেও চুপ আছে।সৃষ্টি বেগম ঘাবড়ে গিয়ে দরজা ধাক্কালে রিমলি নিষেধ করে।সবকিছু খুলে বললে তিনিও নিজের কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়েন।কিন্তু শ্রেয়া কোনো অঘটন ঘটিয়ে দেয় কি না ভাবছে।কিছুক্ষণ পরপর দরজার কাছে যেয়ে টোকা দিচ্ছে।কোনো সাড়াশব্দ না পেলেও কান্নার আওয়াজ ঠিকই পাচ্ছেন তিনি।মেয়ের দুঃখে নিজেও কান্না করে দেন।শ্রেয়া ঝর্না ছেড়ে তার নিচে বসে কান্না করতে থাকে।অনেকক্ষণ কান্না করার পর বাইরে এসে বাবার ছবি হাতে নেয়।বাবার কাছে আজ আক্ষেপের কথা বলে,”কেনো গেলে তুমি আমাকে ছেড়ে বাবা?তুমি থাকলে আজ আমরা ওই কুঁড়েঘরে সুখে থাকতাম।এসব বিলাসিতা দেখতে হতো না।সময়ের সাথে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতাম।এত দ্রুত সফলতার মুখে আসতে হতো না।তুমি নেই বলেই আমার বিয়ে হয়ে গেলো।তুমি নেই বলেই আমাকে কোনো রাস্তা দেখতে হলো।তুমি নেই বলেই আজ আমি আমার বটবৃক্ষ হারালাম।তুমি নেই বলেই মা বোন দুজনে আজ নিস্তব্ধ।আমাদের সেই আগের জীবনটা এখন আর নেই বাবা।অল্প টাকায় অল্প কিছুতে আমরা যে সুখ পেতাম এই সুখ এখন পাই না বাবা।এই সমাজ পুরুষের পরিচয় ছাড়া বাঁচতে দেয় না।টাকা পয়সা ছাড়া মূল্য দিতে পারেনা।তুমি থাকলে আজ আমি এই জায়গায় থাকতাম না।”

শ্রেয়া কান্না করতে করতে এত কথা বলছে অথচ ছবিতে তার বাবার মুখে সুখের হাসি।শ্রেয়া আবারও বলে,”তুমি হাসছো বাবা?তোমার মেয়ে সুখে নেই।আমি কারো ভালোবাসা পাই না বাবা।স্বামী শাশুড়ী ননদ এদের জন্য এতকিছু করেও দুইটা বছর অবহেলা পেয়েছি।জীবনে প্রথম কোন পুরুষকে নিজের মনে জায়গা দিয়েছি।সেও আমাকে চায় না।কারণ আমার টাকা পয়সা অর্থবিত্ত নেই।ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই বাবা।আমার ভালোবাসা আমার প্রচেষ্টা সব ব্যার্থ।আমি নিজেও এক ব্যার্থ নারী বাবা।আমি সমাজের কাছে ব্যার্থ।ডিভোর্সী নারীরা ব্যার্থ।”

বলেই শ্রেয়া আরো জোরে জোরে কান্না করছে।ভিতরের সমস্ত কথা শুনতে পেলো সৃষ্টি বেগম।কান পেতে আছেন যে তিনি এখানে।না পেরে রিমলিকে বলে,”আমি ওকে সত্যিটা বলে দেই।ওর এই কষ্ট মা হয়ে সহ্য হচ্ছেনা আমার।আমি জানতাম নারী জীবন বড়ই কঠিন।ঠিক এই কষ্টটার জন্য আমি ওকে মাটি আঁকড়ে সংসার করতে বলেছিলাম।তবে রনি যে নষ্ট কাজ করেছে এরপর আমি ওকে সংসার করতে দিতে পারতাম না।আজ আমার মেয়েটা পুরো নিঃস্ব।আমি অপদার্থ মা হয়ে ওর আহাজারি শুনছি।আমার মরণ হলো না কেনো?”

মায়ের কান্না দেখে রিমলি জড়িয়ে ধরে সৃষ্টি বেগমকে।মায়ের চোখের পানি মুছে বলে,”আপুকে শক্ত মনের হতে হবে মা।এই পৃথবীর মানুষ বহুরূপী।তাদের আসল সত্যিটা জানতে হবে।এখন আপু যদি জানতে পারে যে তার ভালোবাসার মানুষ নিজেই একটু সময়ের জন্য বাইরে আছে।দেশে ফিরে তাকে বিয়ে করবে তাহলে আপু নিজে একটা আশায় থাকবে।জিনিয়া আন্টির মতো মহিলাদের সামনে রুখে দাঁড়াতে পারবে না। আপুকে বুঝতে হবে মুক্ষম জবাব কিভাবে দিতে হয়।আপুকে যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে ওটা আপুর কাজে লাগাতে হবে।কতশত নারী আছে এই সুযোগটাও পায় না।আমার আপু পেয়েছে মা।তাই ওকে সমাজের অবহেলা করা মানুষের মুখের উপর জবাব দিতে হবে।এক জালিম শাশুড়ির কাছ থেকে এসে আরেক জালিম শাশুড়ির কাছে গেলে তো সেই একই জীবন পাওয়া।একটু সহ্য করো দেখবে ঠিক হয়ে যাবে।”

বিকালে আছরের আজানে ঘুম ভাঙ্গলো শ্রেয়ার।মনে পড়লো সে তো যোহরের নামাজ পড়েনি।সাথে সাথে চলে গেলো ওযু করতে।দুঃখ কষ্ট আসবেই তাই বলে নামাজ আদায় করা বাদ দেওয়া যাবে না।নামাজ পড়লে মনের শান্তি মেলে।যত কষ্টের জীবন হোক নামাজ মনের মধ্যে পবিত্রতা বজায় রাখে।সাহস বাড়িয়ে দেয় নতুন পথ চলার।নামাজ পড়ে মোনাজাত করে শ্রেয়া ওই জায়নামাজে মাথা এলিয়ে দেয়।ভাবতে থাকে পুরোনো স্মৃতি।কিছুক্ষণ এভাবে থেকে কিছু একটা ভেবে বাইরে আসে।সৃষ্টি বেগম আর রিমলি টেবিলে শুয়ে আছে প্রায় ঘুমে।সামনে খাবার।দেখেই বোঝা যাচ্ছে কেউ দুপুরে খায়নি।শ্রেয়া এসে আগে রিমলিকে ডাক দেয়।শ্রেয়াকে দেখে উঠে বসে বলে,”আম্মু,আপু এসেছে।”

সৃষ্টি বেগম শ্রেয়াকে নিয়ে বসে পড়েন।খাবার বাড়তে থাকে।তিনজনে মিলে দুপুরের খাবার এই বিকালে খাচ্ছে।সৃষ্টি বেগম কোনো প্রশ্ন করছে না দেখে অবাক হলেও কিছু বলল না শ্রেয়া।রিমলিকে বলে,”পাশের মাঠের খোঁজ নিয়েছিলি?”

“হ্যাঁ,ওই টিনের ঘরের সাথে আগে আরো কিছু ঘর ছিলো।জমির মালিক ইতালি থাকে এখন।এই মাঠে ওনারা মুদি দোকান দিয়েছিলেন আর সাথে করে টিনের ঘরে থাকতেন।পাশের ঘরগুলো ভেঙেছিলেন বাড়ি করবে কিন্তু তার আগে তার ছেলে এসে নিয়ে যায়।এইজন্য শুধু মুদি দোকান আছে।ওই পুলিশ খোঁজ নিয়েছে আমরা চাইলে কিছু করতে পারব ওখানে।ওটা ওদের পরিচিত লোক।”

“কোন পুলিশ?”

“আরে এই যে বাড়িওয়ালার ছেলে।”

হালকা হাসলো শ্রেয়া।কেনো যে ওই পুলিশকে পছন্দ করে এটাই বোঝে না।নিজে থেকে মিশুক হলেও ক্ষতি তো করেনা।তাহলে সমস্যা কোথায়?উল্টো ওদের সাহায্য করছে।সৃষ্টি বেগম বলেন,”জুঁই আপা বলছিলো ওই জমি ভাড়া নিয়ে থাকতে পারবি।আমি ভাবছি তুই সময় করতে পারবি কি না?”

“আমি তিনদিনের ছুটি পেয়েছি মা।সবকিছু কমপ্লিট করতে না পারলেও কিছু কাজ এগিয়ে রাখতে পারব।আমি কাল জমির মালিকের সাথে কথা বলে নিবো।ভাড়া জমিতে নাহয় পেস্ট্রি হাউজ খুললাম তারপর আস্তে আস্তে দেখা যাবে।এমনিতেও মালিক তো আর এসে ঝামেলা করবে না।”

সবকিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে শ্রেয়া পরেরদিন কল দিলো জমির মালিককে।কথা বলে নিলো।দোকানের কাগজ পত্রের দায়িত্বে আছেন মিসেস জুঁই।একই এলাকায় বাসা থাকায় তাদের এক অপরের মধ্যে সম্পর্ক ভালো ছিলো।মিসেস জুঁই কাগজ পত্রের বিষয়ে দেখছিলেন আর শ্রেয়া রিমলি মিলে দোকান পরিষ্কার করতে ব্যাস্ত।টানা দুইদিন দোকান পরিষ্কার করতে হয়েছে।চারপাশে কিছু স্টিকার দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে তুলেছে। আরও কিছু কাজ করে নিজেরা একটি ফেসবুক পেজ খুলেছে।প্রথমদিন কিছু কেক বানিয়ে পেজে ছবি ছেড়েছে।এদিক ওদিক থেকে মোটামুটি ভালই লাইক ফলো আসতে থাকে।প্রথম কেক কিনে মিসেস জুঁই রিভিউ দিলেন।সাথে অর্পা নিজেও ভালো রিভিউ দিয়েছে।ধীরে ধীরে আশপাশ এর লোকজন আসতে শুরু করে।নিরিবিলি পরিবেশে থাকায় তেমন কোনো ঝামেলা হয়নি শ্রেয়ার। সাথে করে শিহাবের মতো পুলিশ ও মিসেস জুঁইয়ের মতো পাওয়ার আলা মহিলা।সবকিছু মিলিয়ে শ্রেয়া তার দোকানটা গুছিয়েছে।রিমলি ও সৃষ্টি বেগমের দায়িত্বে দোকান রেখে শ্রেয়া অফিস করতে যায়।বাসায় এসে মা ও বোনের সাথে মিলে আবারও দোকানের দেখাশোনা করে।

এভাবে চলে গেলো এক বছর।আজ ফারাজ আসবে বাংলাদেশে।মিস সূচির বিয়ের অনুষ্ঠান হিসেবে চৌধুরী ফ্যাশন হাউজের উপর চাপ পড়েছে।শ্রেয়ার ধারণা ঠিক এই কারণেই ফারাজ আসবে।নিজেকে এখন শক্ত রাখতে পারে শ্রেয়া।ফারাজকে সে ভুলতে পারেনি তবে আগের মতো নরম মনের নয়। মনকে স্থির রেখেছে মিস সূচির বিয়ে হয়ে গেলে সেও রিজাইন নিবে।মিমি এই একটা বছর শ্রেয়ার কাছাকাছি খুনশুটিতে কাটিয়ে দিয়েছে।বলাবাহুল্য শ্রেয়া ছাড়া মিমি এখন কিছুই বোঝেনা।মাঝখানে অর্পার উপর দিয়ে আরেক দুরবস্থা গেছে।মা হওয়ার অনুভূতি পেয়েও হারিয়ে ফেলে অর্পা।জিনিয়া অনেক কটুবাক্য শুনিয়েছিল তাকে।যেটা শুনে আরো বেশি ভেঙ্গে পরে।এই দুঃখগুলো মোচন করতে অর্পাকে সহায়তা করছে মিরাজ।বাইরে ঘুরতে নিয়ে গেছিলো দুই মাসের জন্য।মিরাজের একটাই কথা,”বাচ্চা দেওয়া না দেওয়ার মালিক আল্লাহ।অর্পা বা আমার মধ্যে খুত থাকলে আল্লাহ দিয়েছেন।আমি এতেই সন্তুষ্টি আদায় করে নিবো।তবে বউ আমি ছাড়বো না।”

এখন অফিসের সবাই মিলে প্ল্যান করছে মিস সূচির ব্রাইডাল ড্রেসাপ নিয়ে।সবার কথার মাঝে ইভা জোরে বলে ওঠে,”স্যার এসেছে।”

সবাই ঘুরে তাকালো।মিমি দৌড়ে গেলো ফারাজের কোলে।বাবা মেয়ে একটা বছর পর আবারও এক হয়েছে।ফারাজকে চুমু দিয়ে বলে,”আই মিস ইউ পাপা।”

“আই মিস ইউ ঠু।”

শ্রেয়া একবার ফারাজকে দেখে চোখ ঘুরিয়ে নেয়।তবে আজ ফারাজ তাকালো শ্রেয়ার দিকে।অভিমানী নারীটি আজ তাকে দেখছে না।এতকিছুর পরও সে তাকে ভালোবাসে।ভালোবাসার কথাটি এই কয়েকমাস আগেই জানতে পারে ফারাজ।ভেবে দেখলো একটি সুন্দর পরিবার করতে শ্রেয়াকে বিয়ে করা যায়।অহনার কথা ভেবে জীবন পার করে মিমির জীবনকেও পিছনে ঠেলে দিচ্ছে।মা ছাড়া মেয়েটা একটা মা পাবে শ্রেয়ার মতো নারী একটি দায়িত্বশীল স্বামী ও সংসার পাবে ।তাকে চেষ্টা করতে হবে নতুন জীবনে পা দিতে।সে তো অনৈতিক কিছু করতে যাচ্ছে না।এনির দিকে তাকাতেই এনি ইশারা করে দেখিয়ে দিল একটু অভিমান।

চলবে…?

#আশার_হাত_বাড়ায়|৩৫|
#ইশরাত_জাহান
🦋
ফারাজ তার কেবিনে যাওয়ার সময় শ্রেয়াকে উদ্দেশ্য করে বলে,”মিস শ্রেয়া আমার কাছে ফাইল নিয়ে আসুন।আর এই এক বছরে কি কি ডিল কমপ্লিট হয়েছে তার একটা লিস্ট আমাকে দিবেন।”

শ্রেয়া চলে গেলো নিজের কেবিনে।মুখ থেকে একটা কথাও বলেনি।এখন সে নিজের ব্যাবস্থা করেছে।এই চাকরি থাকলে থাকলো না থাকলে নাই।ফারাজকে পাত্তা দিবে না সে।শুধু এই সূচির বিয়ের জন্য অপেক্ষা।নিজের কেবিন থেকে ফাইল নিয়ে শ্রেয়া চলে যায় ফারাজের কেবিনে।ফারাজের সামনে বসতেই ফারাজ বলে,”তো মিস সূচির ব্রাইডাল ড্রেসের কালার কম্বিনেশন সম্পর্কে আপনার আইডিয়া কি?”

শ্রেয়া ফাইলের দিকে তাকিয়েই বলে,”মিস সূচি ডিফারেন্ট স্টাইলে বিয়ে করতে চায়।কিছুদিন আগে ইন্ডিয়ান একট্রেস সুরভী চান্দানার বিয়ের ভিডিও দেখেছে।বলা যায় ভাইরাল হয়ে গেছে নেট দুনিয়ায়।যেটা মন কেড়েছে মিস সূচির।”

ফারাজ চিনলো না সুরভী চান্দানাকে।চলে গেলো গুগলে সার্চ দিতে।বড়সহ এক মহলের ভিতরে গান গাইতে গাইতে আসছে সুরভী চান্দানা আর সামনে তার বর দাড়িয়ে।আশেপাশে অহরহ মানুষজন আছে।ভিডিওটি দেখে ফারাজ বলে,”আম্বানির পরিবারের ভিডিও কয়েকদিন আগে ভাইরাল হয়েছিলো।ঐভাবে কেনো বিয়ে করতে চাইলো না।”

বিরক্ত হলো শ্রেয়া।ফারাজ যে খোচা মেরে বলছে এটা বুঝতে পারল।শ্রেয়া বলে,”এটা মিস সূচির পার্সোনাল চয়েজ।আমি কি জানি?”

“ওকে, বাট এই ড্রেস তো এখন আমাদের কোম্পানিতে অর্ডার দেওয়া সম্ভব না।গার্মেন্টস সাইটের লোকেরা তো আর কোনো প্লানিং ছাড়া এভাবে কাপড়ের ডিজাইন করতে পারবে না।আবার তো আছে টেইলর সাইট।”

“হুবহু এমন ড্রেস মিস সূচি চাননি।ওনার ইচ্ছা নুড কালারের লেহেঙ্গা সাথে পিংক কালারের জুয়েলারি সেট।”

“ডিজাইন রেডি আছে?”

“আমি কয়েকটা ডিজাইন করে রেখেছি।মিস সূচি এর মধ্যে তিনটি ড্রেস পছন্দ করেছেন কিন্তু আমাদের ওনাকে দিয়ে ট্রাই করানোর পর উনি মন্তব্য দিবেন।”

“ওকে।এই ডিল নিয়ে আপাতত কন্টিনিউ করা হোক আর হ্যাঁ এই এক বছরের একাউন্ট লিস্ট সহ আমাকে সবকিছু খুলে বলুন।”

“জি।”

একেক করে হিসাব দিতে থাকে শ্রেয়া।কিন্তু সে একবারও তাকালো না ফারাজের দিকে।অন্যদিকে এনি তার কাজ করছে।দ্রুততার সাথেই করছে।কারণ একটু পর এনি আর ফারাজ মিটিং করবে।কাপড়ের মান কেমন এই বিষয়ে এনি নিজেই ফারাজের সাথে কথা বলে নিবে।কাজ শেষ করে ফারাজের কেবিনে এসে দেখে শ্রেয়া আর ফারাজ কথা বলছে।ভিতরে না ঢুকে হাসি মুখে চলে আসলো এনি।

আয়নার সামনে এসে মাথা আঁচড়াতে শুরু করে অহনা।মাথায় চিরুনি দিতেই চিরুনি ভরে গেলো চুলে।মাথায় আবারও হাত দিয়ে একটু টানতেই চুলগুলো উঠে আসলো অহনার হাতে।এভাবে কিছুক্ষন করতে করতে অহনা একসময় ওখানেই কান্না করে দেয়।অহনার কান্নার শব্দে রুমে আসে মিসেস নাজমা।অহনাকে প্রশ্ন করে,”কি হয়েছে?”

অহনা তার মাথার চুলগুলো দেখিয়ে বলে,”পাপের ফল ভোগ করছি আমি।”

মিসেস নাজমা চোখ বন্ধ করে নেন।কয়েক ফোঁটা পানি পড়তে থাকে চোখ দিয়ে।প্রায় দেড় বছর ধরে অহনা আছে তার সাথে।এখন মেয়েটার দুর্দশা হতে চলেছে।কাছে থেকে যে মেয়েকে আদর স্নেহ দিয়ে পরিবর্তন করেছে আজ তার জীবনে অন্ধকার ছেয়ে গেছে।আল্লাহ হয়তো এই সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন।তিনি ভালো মানুষদের একটু তাড়াতাড়ি নিয়ে যান।অহনার আগের কৃতকর্ম যেমন হোক না কেনো বর্তমানে সে ভালো মনের হয়েছে।তাড়াতাড়ি করে বাইরে আসে মিসেস নাজমা।ফোন হাতে নিয়ে কনটাক্টে ঢোকে।ডায়ালে লেখা আছে অহি।ওখানে কল করতে যাবে ঠিক তখনই মিসেস নাজমার হাত ধরে অহনা।মিসেস নাজমা কিছুটা ঘাবড়ে যান।অহনা বলে,”আমাকে যারা স্বীকৃতি দেয়নি তাদেরকে আমার এই দুর্দিন না জানালেই আমি খুশি হব।এই পৃথিবীতে অনেক কিছু আমি জন্ম থেকেই হারিয়েছি তো অনেক কিছু নিজ পায়ে ঠেলে হারিয়েছি।আর ফিরিয়ে আনতে চাই না সবকিছু।দয়া করে আমার জীবনে আমার অতীতকে আনবেন না।”

মিসেস নাজমা চোখের পানি মুছে বলেন,”তোমার মা জানেন তুমি আমার সাথে আছো অহনা।একমাত্র তোমার মায়ের অনুরোধেই আমি তোমাকে আমার কাছে রেখেছি।”

অবাক চোখে তাকালো অহনা।মিসেস নাজমা হালকা হেসে বলেন,”কি মনে করো তুমি আমাকে?আমি খুব উদার মনের মানুষ?হ্যাঁ আমি উদার হতে পারি কিন্তু বোকা না।তোমার মা আমার ছোটবেলার বান্ধবী।তোমাকে দেখে আমি চিনে ফেলি।পিরাতেই কল দেই তোমার মাকে।নিউজ আমিও দেখছি।সব জানি তোমার ব্যাপারে।তোমার মায়ের আর আমার আলাদা হওয়ার কাহিনী কি জানো?আমাদের বিয়ে।আমার পারিবারিক অবস্থা উন্নত থাকায় আমার পড়াশোনা চলতে থাকে আর অহির বিয়ে দেওয়া হয় অল্প বয়সে।খুবই সাধারণ ঘরের মেয়ে অহি।মা বাবা নেই।ভাই ভাবী খেতে দিতো আবার দিতো না।কোনো রকমে নাইন পাশ করেই বিয়ের পিঁড়িতে বসে পড়ে।জোর করেই বিয়ে দেওয়া হয় তাকে।কত স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা করে চাকরি করবে।সবকিছু বিসর্জন দিয়ে এক টিনের ছাউনি থেকে বের হয়ে এলো পাকা দালানের বাড়িতে।ভেবেছিলো একটু সুখ হয়তো এখানে লেখা আছে।ভাগ্য খারাপ থাকলে যা হয়।ওই অল্প বয়সে দেখতে হয় সতীনের ছেলেকে।আমাদের যুগ সম্পর্কে যদি তোমার কোনো আইডিয়া থাকে তাহলে তুমি বুঝবে ওই সময় স্বামী মানে আমাদের কাছে অনেক কিছু।স্বামী যেটা বলবে আমরা মুখ বুজে ওটাই মানতাম।অহির ক্ষেত্রেও তাই।বিয়ের পর পড়াশোনা করতে চাইলেও দায়িত্বে থাকে তূর্য।চারমাসের তুর্যকে কোলে পিঠে বড় করে অহি।তার বছর দুই কি তিন যায় তখন তুমি আসো।তোমাকে জন্ম দিতে সাপোর্ট করেনি কেউ।পেটের সন্তানকে মেরে ফেলতে পারেনি অহি।অনেক জায়গায় আশ্রয় চেয়েছিলো জাতে তোমাকে জন্ম দিয়ে সে আলাদা থাকতে পারে।ভাগ্য হতে দিলো না।একটা সার্টিফিকেট থাকলেও তোমাকে নিয়ে আলাদা চাকরি করতে পারতো।ভিটেমাটি সব তো ভাই নিজের নামে করে রেখেছে।যে মেয়েটা কোনো দিক খুঁজে পায়না সে মুখ বুজে তোমার সুখের জন্য ওই বাড়িতেই থাকে।একটা সত্যি কথা কি জানো?তোমাকে নিয়ে যদি তোমার মা সবার সামনে মুখ খুলতো তোমার যে শান্তি স্বাধীনতা গেছে অতটুকুও পেতে না।এবার আসি তোমার দিকে।আমি জানি তুমি জীবনে অনেক কিছু সহ্য করেছো কিন্তু এতকিছুর বিনিময়ে তোমার মধ্যে কোনো শিক্ষাগত কিছুই অর্জন করোনি।বাকিদের কথা বাদ দিলাম বিয়ের পর নিজের জীবনকে পাল্টাতে পারতে।নিজের সন্তানকে একটাবার নিজের কোলে নিয়ে পৃথিবী ঘুরে দেখতে।মিমি তো তোমার গর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে।কেনো পারলে না নিজ সন্তানকে নিয়ে সবার সামনে সুখে সংসার করতে।তুমি যদি একটাবার ওই স্বামী সন্তানের প্রতি ভালোবাসা জন্মাতে তাহলে আজ তুমি রানীর হালে থাকতে।অস্বীকার করতে পারবে না যে ফারাজ তোমাকে কোনো কমতি দিয়েছে।বরং আমি বলতে পারি আমরা স্বামীদের থেকে যতটুকু অর্জন করেছি ফারাজ না চাইতেও তোমাকে ততটুকু দিয়েছে।বরং তার থেকেও বেশি দিয়েছে।জীবনের কিছু অংশ তুমি ভাগ্যক্রমে হারালেও বাকি অংশ তুমি নিজের কারণে হারিয়েছো।এগুলোর জন্য তুমি নিজেই দায়ী।”

অহনা কোনো কথা বলেনা।এগুলো সবই সত্যি।সে পারেনি তার স্বামীকে ভালোবাসতে সে পারেনি তার সন্তানকে আগলে রাখতে।বরং সে তার শান্তির জন্য ব্যবহার করেছে ফারাজকে।অনেক মারধর করেছে মিমিকে।কান্না করতে করতে ঘর থেকে বের হলো অহনা।মিসেস নাজমা আর কল করলেন না অহিকে।দেখা যাক অহনা কি বলে।অহনার বিষয়ে জানাতে চাইলেও একদিক ভেবে তিনি থেমে যান।

রাতে ফারহান চৌধুরী তার দুই ছেলেকে এক ঘরে ডাকলেন।এখন তিনজনে মিলে কথা বলছেন।ফারহান চৌধুরী কিছুক্ষণ ভিন্ন কথা বলে তারপর ফারাজকে প্রশ্ন করেন,”শ্রেয়াকে নিয়ে কি ভাবলে তুমি?”

ফারাজের সোজা উত্তর,”জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু করতে আমি প্রস্তুত বাবা।আমি রিয়েলাইজ করেছি আমাকেও মুভ অন করতে হবে।”

ফারহান চৌধুরী খুশি হলেন।মিরাজ বুঝতে পেরেও বলে,”কি বললে বুঝিনি।একটু সোজাভাবে কথা বলো।”

“আমি দ্বিতীয় বিয়ে করতে রাজি।”

“মানে তুমি তোমার জীবনে দ্বিতীয় নারী আনতে চাও।”

“হ্যাঁ।”

“দেখেছো বাবা?তোমার বড় ছেলের এক মুখে কত কথা।একবার বলে বিয়ে করব না এখন আবার বলে বিয়ে করব।একবার বলে জীবনে কোনো দ্বিতীয় নারীর স্থান নেই এখন বলে দ্বিতীয় নারীর স্থান আছে।কয়দিন পর কি কি বলে কে জানে?”

“একটু বেশি বুঝিস তুই?”

“তুমি যেমনটা বুঝতে দেও তেমনটাই বুঝি আমি।”

দুই ছেলের সাথে কথা বলে হাসিমুখে ফারহান চৌধুরী কল করলেন সৃষ্টি বেগমকে।খুলে বললেন সবকিছু।সাথে এটাও বলেছে শ্রেয়াকে এখন কিছু না বলতে।শ্রেয়াকে সারপ্রাইজ দিতে চায়।ভালোবাসার মানুষকে পেতে চলেছে এটা একটু ভিন্নভাবে উপস্থাপন করবে শ্রেয়ার কাছে।সৃষ্টি বেগম এটা শুনে খুশি।এতদিনে তিনি নিজেও বুঝতে পেরেছেন মেয়ে তার ভালোবেসেছে।ভালোবাসার মানুষের সাথে বিয়ে দিলে সুখে সংসার করতে পারবে।সকালে শ্রেয়া রেডি হচ্ছে এমন সময় সৃষ্টি বেগম এসে বলেন,”তোর জন্য একটা সম্বন্ধ এসেছে।”

হিজাব বাঁধছিলো শ্রেয়া।মায়ের কথা শুনে হাত থেমে গেলো।সৃষ্টি বেগমের দিকে ঘুরে বলে,”আমি এখন বিয়ে করতে চাই না মা।আমি যেমন আছি ভালো আছি।”

শ্রেয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে হিজবটা নিজে নিয়ে শ্রেয়াকে বেধে দেয়। রিমলি এখন কলেজে।যদি এখানে থাকতো শ্রেয়াকে খেপাতে থাকতো।সৃষ্টি বেগম বলেন,”ছেলেটা অনেক ভালো।আমাদের প্রতিবেশী।এই তো বাড়ি থেকে কয়েক কদম পা রাখলেই তার বাসা।আমি কয়েকবার তার সাথে কথা বলেছি।অমায়িক ব্যাবহার মা।আমি এবার খুব ভালোভাবে দেখেছি বাকিটা আল্লাহর হাতে কিন্তু আমার মনে হয় তুই রানীর মত থাকবি।”

শ্রেয়ার দম বন্ধ অবস্থা হয়ে আসছে।মনে একজনকে রেখে আরেকজনের সাথে সংসার বাধার স্বপ্ন কোনো মানব মানবী করতে পারে না।ওটাকে সংসার না ওটাকে বলা হয় দায়িত্বের ভার।যেখানে নিয়তি সেখানে নিজেকে বাঁধিয়ে রাখা।কিন্তু যাকে ভালোবাসা হয় যার সাথে প্রতিটা মুহূর্ত কাটানোর আগ্রহ জাগে ওটাতে দায়িত্বের ভার বহন করতে হয় না।দায়িত্ব নিজ কাধে নিয়ে খুশিতে দিন পার করা যায়।কথা এড়াতে শ্রেয়া বলে,”আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে মা।আমি আসি এখন।আল্লাহ হাফেজ।”

সৃষ্টি বেগম খুব ভালোভাবেই বুঝলেন শ্রেয়া কথা এড়িয়ে চলল।সূচি এসেছে ওর হবু বরকে নিয়ে।ড্রেসগুলো ট্রাই করে শ্রেয়া ও এনির প্রশংসা করেছে খুব।এই এক বছরে অফিসে শ্রেয়া নিজের কনফিডেন্ট নিয়ে অনেক কাজ করেছে।এখন মাথা উচু করে কথা বলে সবার সামনে।

সূচির প্রত্যেকটা অনুষ্ঠান সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছে সবাই।আজ সূচির বিয়ে।চৌধুরী পরিবারের সবাই উপস্থিত।অর্পা এসেছে কিন্তু ওর মুখ ভার।কয়েকবার কনসিভ করার পরও দুই তিন মাসের মাথায় মিসকারেস হয়ে যায়।ডাক্তার দেখালেও কাজ হচ্ছে না।মিরাজ অনেক শান্তনা দিয়েছে কিন্তু মাতৃত্বের স্বাদ পাওয়ার জন্য অর্পা ব্যাকুল।শ্রেয়া বসে আছে অর্পার হাত ধরে।অর্পাকে অনেক কিছুই বলতে থাকে।এক পর্যায়ে এসে অর্পার মন ভালো হয়।মিরাজের মতো স্বামী পেয়ে অর্পা সত্যি নিজেকে ভাগ্যবতী ভাবে আবার বান্ধবী হিসেবে শ্রেয়া।এরা অর্পাকে মানসিক শান্তি দেয়।

জিনিয়া এসেছিলেন অর্পার কাছে।এসে মিমিকে দিয়ে বলে,”নিজে তো নাতি নাতনি দেখালে না এখন আমার এই নাতনিকে দেখে রাখো।আমি একটু ওদিকে যাচ্ছি।”

অর্পা কষ্ট পেলেও কিছু না বলে মিমির হাত ধরে।যাওয়ার সময় শ্রেয়ার দিকে তাকালো।শ্রেয়াকে দেখে বলে,”নিজে তো মিডিল ক্লাস ফ্যামিলির আবার বান্ধবীটাও তেমন।আমার ছেলে যে কিভাবে এদের পছন্দ করে কে জানে?”

বলেই মুখ ঘুরিয়ে যেতে নেয় শ্রেয়া বলে,”এক মিনিট আন্টি।”

থেমে যায় জিনিয়া।দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে ফারাজ।শ্রেয়া এবার জিনিয়ার সামনে এসে বলে,”মিডিল ক্লাস ফ্যামিলির মেয়ে তো আমি।আপনার গায়ে এত জ্বালা কিসের?আমি তো আপনার কাছে হাত পেতে দু বেলা খেতে যাই না।নিজের যোগ্যতায় চলছি।দয়া করে আমার ফ্যামিলি স্ট্যান্ডারের জন্য আপনি নিজে মানসিক কষ্ট নিবেন না আন্টি।আপনার শরীরের জন্য ক্ষতিকর।”

কথাগুলো কড়াভাবে বললেও শ্রেয়ার চোখেমুখে হাসির রেখা দেখা যায়।শ্রেয়া আবারও বলে,”আমার বান্ধবী কিন্তু আপনার ছেলেকে বিয়ে করত না।একমাত্র ভাইয়া অর্পাকে ভালোবাসে তাই এই বিয়েটা হয়।নতুন করে বলতে হবে না নিশ্চয়ই কিভাবে বিয়ের সূচনা ঘটে?আন্টি একটা মেয়ে তার পরিবার ছেড়ে শশুড় বাড়িতে আসে সংসার করতে।দুই পরিবারের স্ট্যাটাস দেখাতে না।কিছু বলার হলে আপনার ছেলেকে বলুন।উনি বিয়ে করে এনেছে আপনার বাড়ির বউমাকে।আপনার বউমা জোর করে আসেনি যে পদে পদে কথা শোনাবেন ওকে।হার্ট হলে ক্ষমা করবেন কিন্তু আমি আপনার কাছে এই বিষয়ে ক্ষমা চাইছি না।কারণ আমরা ছোটরাও আপনাদের থেকে কিছু শিখে থাকি।আপনাদের বড়দের জানা উচিত আমাদের একটা মন আছে।এই মন নিয়ে প্রতি নিয়ত খেলা করার অধিকার আপনাদের নেই।সুযোগ পেলেই এত কথা শুনিয়ে দেওয়ার অধিকার আপনারা রাখেন না।”

রক্তচক্ষু নিয়ে চলে যায় জিনিয়া।কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে হাসতে থাকে ফারাজ।ওখানে ফারহান চৌধুরী ও মিরাজ ছিলো।মিরাজ এগিয়ে আসতে চেয়েছিল জিনিয়াকে কিছু শোনাবে বলে কিন্তু ফারাজ আটকে দেয়।শ্রেয়ার মুখে এমন কথা শুনে দুষ্টু হেসে ফারহান চৌধুরীকে মিরাজ বলে,”তোমার হবু বউমা তো তোমার বউকে কথা শুনিয়ে দিলো বাবা।এতবড় অপমানের পরও কি বাড়ির বড় বউ হতে পারবে শ্রেয়া?”

“তোমার ভাই ভালো জানে।তবে এতটুকু কথা শ্রেয়া শোনাতেই পারে।একদিকে ইট মারবে আর পাটকেল ফেরত আসবে না এমনটা তো হবে না।ইট মারলে পাটকেল খেতে হবে।আর তোমাকে বলি।একটু তাড়াতাড়ি বিয়েটা করো।বয়স তো দিনদিন বেড়েই চলেছে।”

শেষের কথাটি ফারাজকে উদ্দেশ্য করে বলে।সূচির বিয়ে শেষ করে যে যার বাসায় চলে আসে।ফারাজ কিছু একটা ভেবে ফেইসবুকে পোস্ট করে,”গট ম্যারিড সুন।”

পোস্টে ইতিমধ্যে অহরহ লাইক কমেন্ট চলে এসেছে।অর্পা নিজেও লিখছে,”বেস্ট অফ লাক বড়ভাই।”

সবাই লাভ লাইক কেয়ার দিলে রাগে ফুঁসতে থাকে শ্রেয়া ও সিনথিয়া।শ্রেয়া মনে করে ওই সিনথিয়াকে বিয়ে করবে ফারাজ আর সিনথিয়া জানে শ্রেয়াকে বিয়ে করতে চায় ফারাজ।শ্রেয়া পোস্ট দেখে সৃষ্টি বেগমের কাছে এসে বলে,”তুমি যে প্রতিবেশীকে দেখেছিলে।তার সাথে আমার বিয়ে ঠিক করো।দুই একের মধ্যে বিয়ে করতে চাই আমি।”

“ছেলে পক্ষকে কাল আসতে বলি?তোরা একে অপরের সাথে কথা বল।”

“কোনো দরকার নেই মা।কাল আমার পেস্ট্রি হাউজে একটা বড় অর্ডার আছে।ওখানেই মিনি বার্থডে অ্যারেঞ্জ করা হবে।আর আমি ডিভোর্সী নারী।এখন বসে বসে রূপ দেখে বিয়ে করব না।যেটা ইম্পর্ট্যান্ট বিষয় ওটা তো তুমি দেখেছো।আমার তাতেই হবে।যেহেতু প্রতিবেশী তাহলে ভালোই হবে।এট লিস্ট আমার পেস্ট্রি হাউজে তো আমি রেগুলার আসতে পারবো।”

“চাকরি করবি না?”

“না,চাকরি ছেড়ে দিবো।ওদিকেই আমি আর যাবো না।”

মুচকি হেসে সৃষ্টি বেগম বলেন,”আচ্ছা।”

চলবে…?