আশার হাত বাড়ায় পর্ব-৪০+৪১

0
89

#আশার_হাত_বাড়ায়|৪০|
#ইশরাত_জাহান
🦋
মিমিকে নিয়ে মিসেস নাজমার বাসায় এলো অহি।মিমি অহির হাত ধরে বাড়ির ভিতরে ঢুকলো।চারপাশ দেখছে।তাদের বাসার মতোই এই বাড়িটি।অহি জোরে ডাক দিলো,”অহনা তোর মেয়ে এসেছে।”

রান্নাঘরে মিমির পছন্দের খাবার রান্না করতে থাকে অহনা।সকালেই জানতে পারলো মিমি কি কি খেতে ভালোবাসে।মাথায় কাপড় দিয়ে বাইরে এসে দাড়ালো অহনা।মেয়েকে দেখে ঠোঁট প্রসারিত করে দুই হাত মেলে কোল পেতে মিমিকে আহ্বান দিলো।মিমি একবার অহনাকে দেখছে আবার অহিকে দেখছে।অহির ইশারা পেতেই অহনার কোলে দৌড়ে চলে যায় মিমি।অহনার কলিজায় শান্তি মেলে।অহি চোখের পানি মুছতে থাকে।অহনা মিমির দুই গালে হাত রেখে বলে,”আমাকে ভয় করছে কি?”

মিমি উত্তর দেয় না।অহনা মিমির দুই গালে চুমু দেয়।আপনমনে মিমির চোখ ভিজে আসে।অহনা চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে,”তোমার মাম্মি এখন আর তোমাকে বকবে না।অনেক ভালোবাসবে তোমাকে।”

“সত্যি?”

“হ্যাঁ,সত্যি।”

“তাহলে আমিও তোমাকে ভালোবাসবো।”

হেসে দিলো অহনা।সুখের হাসি হাসতে থাকে।মিমিকে বলে,”নানুর সাথে মাঝে মাঝে আমার কাছে আসবে তো মাম্মি?”

“পাপা জানলে রাগ করবে তো।”

“পাপাকে বলবে না।তুমি এসে একটু থেকেই আবার চলে যাবে।”

“আচ্ছা,তাহলে আসবো।”

মা মেয়ের আজ মিলন হলো।অহনা মন ভরে আদর করছে মিমিকে।মিমি তার মায়ের ভালোবাসা অবশেষে পেলো।শুধু আফসোস যখন মমতার স্নেহের আশায় মিমি হাত বাড়িয়েছিলো তখন মিমি শূন্যতা নিয়ে ফিরেছিল এখন এতদিন পর মমতার হাত ফিরে পেলো।

লাঞ্চ করে অফিসে আসলো ফারাজ ও শ্রেয়া।আজকে অফিসে কাজ নেই।ফারাজের সাথে শ্রেয়ার বিয়ে হয়েছে সবাই জানে।এখন সবাই মিলে একসাথে কেক এনেছে।ফারাজ ও শ্রেয়ার জন্য।একসাথে কেক কেটে সবাই এখন আনন্দ করছে।ফারাজ তার কেবিনে এসে বসেছে মাত্র।শ্রেয়া ফারাজের কেবিনে এসে দুটো ফাইল দেখাতে থাকে।ফারাজ ফাইলদুটো বন্ধ করে পাশে রেখে বলে,”আজ কাজ করতে হবে না।কাল থেকে সবাই কাজ করতে শুরু করবো।আজকে সবাই আনন্দ করতে চায় সুতরাং আনন্দ করুন।”

শ্রেয়া ভাবছে এখন একটু বাইরে যাবে।দেখতে চায় সূর্য কোনদিকে আছে। ফারাজকে বলে,”ওকে।”

শ্রেয়া চলে যেতে নিলে ফারাজ পিছন থেকে বলে,”একটা কথা ছিলো।”

“জি বলুন।”

“রিমলির বিষয়ে।”

ভ্রুকুটি করে শ্রেয়া বলে,”কি হয়েছে ওর?”

“আসলে আমার খালাতো ভাই শিহাব ওকে পছন্দ করে।আমার খালামণি এই সম্পর্ককে সম্মান জানিয়েছে।বাকিটা আপনাদের হাতে।”

শ্রেয়া খুশি হলো।বলে,”আম্মুকে একটু কল করে বলি?”

“শিওর।”

শ্রেয়া কল দিয়ে কথা বলল সৃষ্টি বেগমের সাথে।সৃষ্টি বেগম খুশিতে বলে ওঠেন,”বাড়ির কাছে দুই মেয়ে থাকবে।আমি হীরের টুকরোদের পেয়ে না করবো কেনো?আমার তো বেশ ভালো লাগে শিহাবকে।তোর বোন কি বলে শুনি।”

“ওর থেকে শুনে আমাকে জানিয়ে দিও।”

কথা শেষ করে শ্রেয়া তাকালো ফারাজের দিকে।বলে,”আম্মু রাজি।তবে রিমলি কি চায় এটাও তো দেখতে হবে।”

“হ্যাঁ,ও পড়াশোনা করতে চাইলে ওকে ওই সুযোগ করতে দেওয়া উচিত।বিদ্যার চেয়ে মূল্যবান সম্পদ কিছুই না।”

“এলো আমার বিদ্যাসাগর!আমার বোন বই পড়ুয়া না উপন্যাস পড়ুয়া।বিয়ের কথা শুনলে হয়তো লাফাতে লাফাতে নাচতে থাকবে এখন।”(বিড়বিড় করে বলে শ্রেয়া।)

ভ্রুকুটি করে ফারাজ বলে,”কি বললেন?”

“বলছিলাম হুম।দেখা যাক কি রেসপন্স আসে।”

ওদের কথার মাঝে এনি আসে কেবিনে।শেষে ফারাজের বললেন কথাটি এনির কর্ণপাত হয়।এসেই বলে,”ওহহো হ্যান্ডসাম!বউকে কেউ আপনি করে বলে?তুমি করে বলো।”

“এত তাড়াতাড়ি?”

“তো তুমি কি চাও বিয়ের মতো এখন তুমি বলার জন্য আরো একটা বছর বিদেশে পারি দিতে?”

হেসে দিলো শ্রেয়া।ফারাজ চোখ ছোট ছোট করে দেখছে।শ্রেয়ার হাসিকে লজ্জাতে পরিণত করতে ফারাজ বলে,”ফাইলগুলো নিয়ে যাও।আর এখন কাজ করতে হবে না। কাল তো বিয়ে করেছি।আজ নাহয় ইনজয় করলাম,শ্রেয়াময়ী।”

অবাক হয়ে তাকালো শ্রেয়া।এনি মিটিমিটি হাসতে থাকে।শ্রেয়া লজ্জা মাখা মুখ নত করে আছে।এনি শ্রেয়াকে উদ্দেশ্য করে বলে,”হ্যান্ডসামকে হারানো এতটা সহজ নয় শেহনাজ।”

চলে গেলো শ্রেয়া।সবার সাথে গল্প করতে থাকে।সৃষ্টি বেগম এলেন রিমলির কাছে। রিমলিকে জানালেন শিহাবের কথা।সাথে রিমলির মতামত জানতে চান।রিমলি মুচকি হেসে বলে,”তোমরা যা চাও তাই হবে।”

“শিহাবকে তোর পছন্দ না?”

“অপছন্দও না আম্মু।”

মেয়ের কথার মাঝে প্রকাশ পেলো বিয়েতে সে রাজি।আর রাজি হবে না কেনো?রিমলি তার মায়ের কাছে থাকতে পারবে দোকান দেখতে পারবে আবার নিজের মনের মানুষকে বিয়ে করে সংসারটাও করতে পারবে।এই সুযোগ তো আর বারবার আসবে না।শ্রেয়াকে কল করে জানিয়ে দিলেন সৃষ্টি বেগম।গাড়িতে উঠে ফারাজ ড্রাইভ করে আর পাশে বসেছিলো শ্রেয়া।ফারাজকে বলে,”বোন অমত করেনি।”

অবাক হয়ে ফারাজ বলে,”একবারও বলেনি যে পড়াশোনা করতে চাই?”

“ও আবার চাইবে পড়াশোনা করতে!”(বিড়বিড় করে)

“কি বললে?”

“কিছু না।পড়াশোনা তো বিয়ের পরও করতে পারবে।শিহাব ছেলে হিসেবে তো ভালো।একসাথে এক বাসায় এক বছর থেকেছি আমরা।খারাপ কিছু তো চোখে বাদেনি যে না বলে দিবে।আর আমার বোনের কোনো আলাদা চয়েজ নেই।”

“ওকে।”

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে।অহি এখন মিমিকে নিয়ে যেতে চায়।অহনার কাছে এসে বলে,”তুইও চল ওই বাড়িতে।”

“না মা।আমি যেতে চাই না ওই বাড়িতে।”

মিমি অহনার হাত ধরে বলে,”কেনো যেতে চাও না মাম্মি?তুমি আমার সাথে থাকবে।”

অহনা এবার মিসেস নাজমার কাছে এসে দাড়ালো।মিসেস নাজমা অহনার হাত ধরে নিলেন।আলতো হেসে অহনা বলে,”একটা জিনিষ লক্ষ্য করেছো মা?আমার আর আমার মেয়ের ভাগ্যটা কেমন যেন একই রকম।আমিও জন্ম থেকে মমতা পাইনি আমার মেয়েটাও পায়নি।আমিও অল্প কিছুদিনের জন্য মায়ের ভালোবাসা পেয়েছি আমার মেয়েটাও তার মায়ের ভালোবাসা অল্পদিনে পেতে চলেছে।আবার আমরা মায়ের ভালোবাসা না পেলেও মাতৃত্বের স্বাদ দেওয়ার মতো আরেক মায়ের ভালোবাসা ঠিকই পাচ্ছি।আমি পাচ্ছি নাজমা আন্টির থেকে আর মিমি পেলো নতুন মায়ের থেকে।আমি যতই ওই বাড়িতে যাই আমার মন তো এই মাকে চাইবে।আর মিমি তখন ওর নতুন মাকে বেশি চাইবে।জন্ম দিলেই হয়না।মায়ের ভালোবাসার অনুভূতি মনের মধ্যে আনতে হয়।যেটা মিমির মধ্যে অন্য কারো জন্য এসেছে এদিকে আমার মনের মধ্যেও নাজমা আন্টির জন্য।আমি পারবো না নাজমা আন্টিকে ছেড়ে যেতে আবার নাজমা আন্টিও পারবে না আমাকে ছেড়ে থাকতে।তেমনই মিমি পারবে না শ্রেয়াকে ছেড়ে থাকতে আর শ্রেয়া পারবে না মিমিকে ছেড়ে থাকতে।”

অহনার কথার বিপরীতে কিছুই বলতে পারলো না অহি।কথাগুলো ভুল বলেনি অহনা।অহনা বলে,”তোমরা শুধু আমাকে একটু দেখা দিতে এসো মা।আমি তোমাদের এই ভালোবাসা পেতে চাই শুধু।”

অহি এসে অহনাকে জড়িয়ে ধরে বলে,”আসবো মা।এবার থেকে আমি আসবো তোর কাছে।”

অহনার মাথায় হাত বোলাতেই মাথা ওড়না পড়ে যায়।অহি অবাক হয়ে বলে,”এ কি!তুই টাক কেনো?”

অহনা আর ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না।দৌড়ে ঘরে চলে গেলো।মিসেস নাজমা সবকিছু খুলে বললেন।অহি মুখে হাত দিয়ে কান্না করে দিলো।মিমি নিজেও এখন কান্না করছে।অহি অহনার কাছে যেতে চাইলে মিসেস নাজমা বাধা দিয়ে বলেন,”ওকে একটু আলাদা থাকতে দে। কাল আবার আসিস।”

“আচ্ছা।”

অহনাকে এখন কিছু বললে ও আরো বেশি কান্না করে দিবে।এই অবস্থায় এত প্রেশার দেওয়া উচিত না।একা থাকলে মন খুলে কান্না করেও নিমিষেই থেমে যায় কিন্তু পাশে কেউ থাকলে কান্নার পরিমাণ যেনো বেড়েই যায়।

মিমি আর অহি বাড়িতে আসতেই ফারাজ বলে,”কেমন ঘুরলে আজ সারাদিন।”

মিমি উত্তর দিচ্ছে না।অহি বলে,”অনেক মজা করেছি আজ আমরা।”

ফারাজ তাকিয়ে আছে মিমির দিকে।মিমির কোনো উত্তর নেই।ফারাজ এসে মিমির দুই বাহু ধরে ঝুঁকে বসে।বলে,”পাপাকে কখনো মিথ্যা বলেনি আমার মেয়েটা।আজও কি মিথ্যা কথা বলবে?”

মিমি চোখ তুলে তাকালো ফারাজের দিকে।ঠান্ডা ঠান্ডা শরবত বানিয়ে এনেছে শ্রেয়া। ফারাজের এমন কথা শুনে ট্রে সহ ওখানেই দাড়িয়ে আছে।মিমি একবার অহির দিকে তাকাচ্ছে আবার ফারাজের দিকে।ফারাজ কোনো উত্তর না পেয়ে বলে,”পাপাকে মিমি কখন বেশি হার্ট করতে পারে জানো?”

মুখ খুলল মিমি।বলে,”কখন?”

“যখন মিমি তার পাপার থেকে সত্যিটা লুকিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেয়।”

মিমি ভয় পেলো।ফারাজ বলে,”আজ সারাদিন কার সাথে ছিলে মা?”

মিমি তাকালো ফারাজ আর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রেয়ার দিকে।ফারাজ বলে,”পাপা কখনও তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করে না মা।তুমি যেটা চাও তোমার ভালোর জন্য আমি সেটা এনে দেই।আজও না করব না।তুমি শুধু একবার বলো কোথায় ছিলে তুমি?”

অহি আঁচল চেপে ধরলো।মিমি বলে দেয়,”মাম্মির কাছে গিয়েছিলাম।”

পাশেই দাড়িয়ে ছিল জিনিয়া।তেড়ে আসতে নেয় সে।ফারাজ বাম হাত দেখিয়ে ওখানেই থামিয়ে দিলো।মুখে হাসির রেখা দেখা দিলো।কিন্তু এই হাসি সুখের না আবার দুঃখেরও না।ফারাজ কিছু না বলে উঠে দাড়ায়। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বলে,”সন্তান তার মায়ের কাছে ভালোবাসা আদান প্রদান করতে যেতেই পারে কিন্তু আমাকে মিথ্যা বলার প্রয়োজন ছিলোনা।এতে করে নিজের মধ্যে থাকা আস্থাটাও কবর দিতে ইচ্ছা হয়।”

মিমির কাছে এসব শক্ত কথার মানে প্রকাশ পায় না।শুধু বুঝলো ফারাজ কষ্ট পেয়েছে তবে তাকে অহনার সাথে দেখা করার সুযোগ দিয়েছে।

ঘর থেকে হয়তো কিছু একটা নিতে গিয়েছিল ফারাজ।তাইতো দুই মিনিট থেকেই বের হয়ে আসে।শ্রেয়া লক্ষ্য করলো ফারাজের হাতে চাবি ওটা পকেটে ঢুকিয়ে নিচে নামছে।চোখমুখ লাল হয়ে আছে।কোনোদিকে না তাকিয়ে ফারাজ চলে গেলো সদর দরজার বাইরে।শ্রেয়া শরবত টেবিলের উপর রেখে অহিকে বলে,”আপনি আর মিমি শরবত নিন।বাইরে থেকে এসেছেন।আমি যাচ্ছি একটু।”

বলেই দৌড়ে চলে যায় শ্রেয়া।বেশ দূরে থাকতে জোড়ে চিল্লিয়ে বলে,”কোথায় যাচ্ছেন আপনি?”

কোনো উত্তর মেলে না।নির্বাক হয়ে আছে।

ফারাজ গাড়ি নিয়ে চলে যায়।শ্রেয়া দৌড়াতে থাকে।কল করে ফারাজকে।রিসিভ করে না ফারাজ।শ্রেয়ার চিন্তা বাড়তে থাকে। ফারাজকে আজ বড্ড বিষন্ন লাগছে।হয়তো মেয়ের এই মিথ্যার আশ্রয় নেওয়াটা বাবা হিসেবে মেনে নিতে পারেনি।ফারাজ যে পরিমাণ কষ্ট করেছে শেষে এসে মেয়েকেই নিজের অস্তিত্ব করে নিয়েছে।আজ মেয়েটাও তার থেকে কিছু আড়াল করলো।কষ্ট হচ্ছে ফারাজের।শ্রেয়া কল করতে করতে রাস্তায় গাড়ি খুঁজতে লাগলো।কোনো গাড়ি না পাওয়ায় রাস্তার পাশ দিয়ে দৌড়াতে থাকে।মেইন রোডে এসে গাড়ি নিবে।মেইন রোডের উপরে এসে গাড়ি ধরার জন্য রাস্তা পার হবে তখনই শ্রেয়া পিছন থেকে মিমির ডাক শুনলো।মিমি জোরে জোরে বলে,”মাম্মাম।”

শ্রেয়া থেমে যায়।পিছনে ঘুরে দেখে মিমি দৌড়ে আসছে আর বলে,”আমি আর পাপাকে মিথ্যা বলবো না।আমি কিছু লুকাবো না। পাপাকে আসতে বলো মাম্মাম।”

মিমির পিছনে অহি নিজেও দৌড়াচ্ছে।মিমিকে থামানোর চেষ্টা করছে কিন্তু অহি ব্যার্থ।মিমি কষ্টে আছে।ফারাজ তার উপর অভিমান করে চলে গেছে কোথাও।মিমি একেকটা কথা বলে চিল্লাতে থাকে শ্রেয়া আবারও পিছনে ঘুরে রাস্তা পার হতে নিবে একটি অটোর সাথে ধাক্কা লেগে পাশে থাকা খাম্বার সাথে মাথায় বাড়ি খায়।ছিটকে নিচে পড়ে যায় শ্রেয়া।শ্রেয়ার ডান হাতের উপর দিয়ে অটোর চাকা চলে যায়।মিমি এটা দেখে ওখানে দাড়িয়ে পড়ে।অহি কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেলেও আবারও দৌড়ে যায় শ্রেয়ার কাছে।ফাঁকা রাস্তায় এখন লোকজনে ভরে গেলো।মিমির হাত ধরে অহি দৌড়ে এলো শ্রেয়ার কাছে।শ্রেয়া অজ্ঞান হয়ে আছে।মেয়েটা স্বামীর চিন্তায় বের হয়ে দুর্ঘটনার শিকার হলো। অটোয়ালাকে ধরে লোকজন মারতে থাকে।রাতের বেলা এরা নেশা করে রাস্তায় বের হয়।প্রায় মানুষের দুর্ঘটনা ঘটে।আজ যেমন শ্রেয়ার হলো।অহি কল করে বলে অর্পাকে।অর্পা আর মিরাজ বাজারে গিয়েছিল।ওরা এসেই উপরে চলে যায় তখন ফারাজ বাইরে চলে যায়।তাই অর্পা বা মিরাজ এই সম্পর্কে অবগত না।অর্পা শ্রেয়ার এক্সিডেন্টার কথা শুনেই মিরাজের সাথে গাড়ি করে বের হলো।মিরাজ আর অর্পা এসে শ্রেয়াকে নিয়ে হাসপাতালে গেলো।বারবার কল করছে ফারাজকে।নদীর পাড়ে এসে বসে আছে ফারাজ।একা একা সময় কাটাতে চায়।কোনো শান্তনা বাণী এখন তার চাই না।কিন্তু সে জানেই না তার জন্য এতগুলো মানুষ চিন্তা করে রাস্তায় নেমেছিল।তার মস্তিষ্কে নেই তাকেও কেউ ভালোবাসে। মিরাজ একটি ম্যাসেস দিয়ে হাসপাতালের বাকি কাজ করতে থাকে।আজ জিনিয়া নিজেও এসেছে শ্রেয়াকে দেখতে।শ্রেয়ার শরীর থেকে রক্ত বের হয়েছে অনেক।রক্ত লাগবে বলে জানিয়েছে ডাক্তার।কিন্তু এই রক্ত এখন হাসপাতালে এভিলেবল না।এদিক ওদিক খুঁজতে থাকে মিরাজ ও ফারহান চৌধুরী।অর্পা আর মিমি কান্না করছে।এখনও সৃষ্টি বেগমকে জানায়নি।সকালের আগে জানাতে চায় না অর্পা।ভয় পাচ্ছে সৃষ্টি বেগমকে কি বলবে।সৃষ্টি বেগম আসলেও রক্ত পাওয়া যাবে না।সৃষ্টি বেগম বা রিমলি কারোর সাথেই রক্তের মিল নেই।সবার ছোটাছুটির মাঝে জিনিয়া বলে,”আমি দিবো রক্ত।”

“রক্তের গ্রুপ?”(ডাক্তার জিজ্ঞাসা করে)

“ও নেগেটিভ।যেটা আপনারা শ্রেয়ার জন্য খুজছেন।”

ফারহান চৌধুরী আলতো হাসলেন।স্ত্রীর মাঝে পরিবর্তন এসেছে।ভালো লাগলো তার।তবে পরিবর্তন সম্পূর্ণ রূপে দেখতে চায়।কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে নদীর ধারে প্রাকৃতিক বাতাসে নিজেকে প্রশান্তি দিলো ফারাজ।এখন গাড়িতে উঠবে সে।ফোন বের করে সময় দেখতে যেয়ে দেখলো মিরাজের ম্যাসেজ।সাথে সাথে গাড়ি নিয়ে ছুটলো হাসপাতালের দিকে।

চলবে…?

#আশার_হাত_বাড়ায়|৪১|
#ইশরাত_জাহান
🦋
হাসপাতালে এসে মিরাজের থেকে সবকিছু শুনে থ হয়ে গেলো ফারাজ।শ্রেয়া একমাত্র তার জন্যই বাইরে বের হয়।কিন্তু তার হুশ ছিলো না।শ্রেয়া যে তাকে ডাকছে সে এটা লক্ষ্যই করেনি।তার মূল কারণ কানে হেডফোন ছিলো।অপারেশন রুমের সামনে একটি বেঞ্চে বসে আছে ফারাজ।মিরাজ পাশে বসে বলে,”এভাবে শ্রেয়ার থেকে দূরে যাওয়া উচিত হয়নি।মেয়েটা তোমার মেয়েকে আর নিজেকে সেফ করতে চেয়েছিল।দেখলে তো আজ তার কি হলো?”

মাথা উচু নিচু করে হ্যাঁ বুঝিয়ে দিলো ফারাজ।বলে,”আমার কানে হেডফোন ছিলো।জানিসই তো আমার মন খারাপের সঙ্গী আমার গান আর নিরিবিলি পরিবেশ।তখন আমার একটু নিজেকে সময় দিতে ইচ্ছা করছিলো।কি বলতো ভাই।নারী জাতির জীবনের কষ্ট বেশি হলেও লাঘব করার জন্য আশার হাত থাকে কিন্তু পুরুষ জাতির জীবন একটা মূর্তির মতো।মূর্তির যেমন কোনো অনুভূতি নেই লোকে মনে করে পুরুষেরও কোনো অনুভূতি নেই।এই যে শ্রেয়ার মতো মেয়ের জীবনে কষ্ট গেলো সবাই দেখলো।আফসোস করলো।মিমির মা চলে গেছে কান্না করলো ওর জন্য।কাকিয়া জীবনে যা পেয়েছে তার কষ্টটাও সবাই বুঝলো।অর্পার মাতৃত্বের অভাবের কষ্টও সবাই বোঝে কিন্তু আমি?আমার কষ্টটা কে বুঝলো?আমি যে একজনকে ভালোবেসে পুরো দুনিয়ার সাথে লড়াই করতে চেয়েছিলাম।আমি যে একটা হাত আঁকড়ে ধরে দুনিয়া পারি দিতে চেয়েছিলাম।আমি যার সাথে মৃত্যু পর্যন্ত সংসার বাধার স্বপ্ন দেখছিলাম।যার হাত বাড়ানোর আশায় আমি আমার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।তাকে তো আমি পাইনি।দিনশেষে আমার ঠকে যাওয়া কি কারো নজরে আসে?আসেনা।কারণ আমি পুরুষ মানুষ।পুরুষের মন পাথর বলে ধরা হয়।কখনও পুরুষকে আঁকড়ে নেওয়ার কেউ আসেনা।পুরুষের জীবনে নারীর স্থান হয় নিজের একটা পরিচয় গড়তে।নারীদের নিজের আস্থানা গড়তে।সেই আস্থানা গড়তে গড়তে আমি পুরুষ মানুষ যা হারিয়েছি যেই ব্যাথাটা আড়াল করে রেখেছি এটা কি কেউ আজও বুঝতে পারছে?কেউ নেই আমার কষ্ট বোঝার জন্য।এরপরও আমি পারিনি স্বার্থপর জীবন কাটাতে।আমার অস্তিত্বকে হারাতে আমি পারিনি।”

কথাগুলো বলতে বলতে ফারাজের চোখ থেকে পানি পড়তে থাকে।পুরুষ মানুষ নাকি কাদে না।এখন মিরাজের সামনে পুরো পরিবারের সামনে ফারাজ কান্না করে দিলো।জিনিয়া দুর্বল শরীরে এসে বসলো ফারাজের পাশে।ফারাজ দেখছে জিনিয়াকে।হাতে ব্যান্ডেজ দেখে ফারাজ বলে,”কি হয়েছে তোমার?”

পিছন থেকে ফারহান চৌধুরী বলেন,”শ্রেয়াকে রক্ত দিয়েছে জিনিয়া।”

ভ্রুকুটি করে ফারাজ বলে,”তুমি দিয়েছো ওকে রক্ত?”
“হ্যাঁ।”
“হঠাৎ এতটা সহানুভূতি?”
“হয়তো আজ সকালেও এক্সিডেন্ট হলে এই সহানুভূতি হতো না।কিন্তু আজ যেটা জানতে পারলাম তারপর ওকে রক্ত দিয়ে নিজের ঋণ শোধ করতে চাই।যদিও এই ঋণ শোধ হবেনা কখনও।আজকেই চেয়েছিলাম আমার বড় বউমা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে কিন্তু ভাগ্য দেখ আজকে ওর যত দুর্ঘটনা।”
“কিসের ঋণ?”
“মনে আছে আজ থেকে তিন বছর চার মাস আগের কথা?আমরা পুরো পরিবার যশোরে যাই কিন্তু আমি রাগ করে চলে আসি।অর্পার বাড়ির পরিবেশ আমার ভালো লাগেনি তাই।”
“হুম।”
“ওইদিন এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর আগে বাইপাস রাস্তায় কিছু গুণ্ডা আমাদের গাড়ির উপর হামলা করে।আমি আর ড্রাইভার থাকি। গুন্ডাগুলো কোনো মাদকাসক্তের সাথে জড়িত ছিলো।যারা নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে ওদিকটায় বসবাস করত।সুযোগ পেলে নীরব রাস্তায় আড়ালে লোকেদের হামলা করতো।শ্রেয়ার বাবা পুলিশ ছিলেন।ওনারা ওইদিন ওই এরিয়াতে ডিউটিতে থাকেন।ছদ্মবেশে ছিলেন ধানক্ষেতের আড়ালে।আমার গাড়ি যখন হামলাকারীদের কাছে আটকে পরে পুলিশরা এসে ওদের ধরে নেয় কিন্তু আমাকে নিয়ে দুজন গাছের সাথে বোম সেট করে।তখন সবাই ভয় পেলেও শ্রেয়ার বাবা একমাত্র নিজের জীবনকে ঝুঁকি রেখে ওখানে দৌড়ে আসে। আমার বাঁধন খুলে দিয়ে বোম হাতে নেয়।সাহস করে দূরে থাকা পুকুরে ছুড়ে মারে।কারো কোনো ক্ষতি না হলেও হামলাকারীরা শ্রেয়ার বাবাকে গুলি করে।পরপর চার পাঁচটা শুট করে দেয়।শ্রেয়ার বাবা আমাকে তারপরেও গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে রাস্তার মাঝে চলে যায়।আমি গাড়িতে উঠতে চাইনি আমাকে জোর করেই উঠিয়ে দেয়।ঠিক তখনই একটি ট্রাক আসে। আর ওনার জীবনের শেষ সময় সেখানে নির্মমভাবে শেষ হয়ে যায়।লোকটা যেখানে নিজের জীবনের কথা ভাবেনি সেখানে আমি কি করে তার মেয়েকে ঝুঁকিতে রাখি?”

“কিন্তু তুমি জানলে কিভাবে শ্রেয়ার বাবা তোমাকে বাঁচিয়েছিল?”

“আজ সকালে জুঁইয়ের বাসায় যাই।রিমলি আর শিহাবের বিয়ে নিয়ে জুঁই আমাকে বলে।তাই আমি জুঁইকে বলতে থাকি,শ্রেয়া আর রিমলির উদ্দেশ্য হলো আমাদের মতো বড় বাড়ির ছেলেদের হাতানো।তুই কি অবুঝ?একবার অন্তত ভেবে দেখ।রিমলি মেয়েটার কোনো যোগ্যতা নেই।দেখতেও ভালো না। কেমন কালো দেখতে।আর সবথেকে বড় কথা কোনো ক্লাস নেই ওদের।”

আমার কথা শুনে জুঁই বলে,”আমাদের জীবনটা মধ্যবিত্ত পরিবারের আওতায় ছিলো আপা।তুমি আমি পড়াশোনা করে নিজ যোগ্যতায় আজ চাকরি করি বলে এই না যে আমরা আমাদের অতীত ভুলে যাবো।তুমি এক বড়লোক পরিবারে বিয়ে করেছো তারপর তোমার জীবন বিলাসিতা পেতে পেতে পুরোপুরি পাল্টে যায়।কিন্তু আপা আমি আমার স্বামীর এই বিলাসিতা নেইনি বরং আমার স্বামী আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছে তাতে আমি সন্তুষ্ট।তুমি তোমার ফ্রেন্ডদেরকে তোমার স্বামীর অর্থ সম্পদ দেখাতে যেয়ে নিজেকে এতটা স্মার্ট করেছো যে আজ তোমার স্বামীটাও তোমার ধারে কাছে নেই।তোমার সন্তানেরা তোমার আড়ালে কিছু করলেও অনুতপ্ত না।তারাও বুঝে যায় তোমার থেকে তারাই ব্যাটার কিছু ভাবতে পারে।আমার সন্তানকে আমি সেই সুযোগ দিতে চাই না।আমার সন্তানের জন্য যদি আগুন ক্ষতিকারক না হয়ে পরিপূর্ণ জীবন হয়ে ফিরে আসে তবে আমি তার জন্য সেই আগুন বেঁচে নিবো।যদি শিহাব তার জন্য একটা বাজে মেয়ে আনতো আমি ওকে শাসন করতাম।কিন্তু আমার ছেলে হীরে বেচেছে।সেখানে তোমার এই কথাটা আমি রাখতে পারলাম না আপা।”

আমিও হার মানবার পাত্রী না।রাগ করে বলে দেই,”এই বিলাসিতা জীবনের জন্য সুখে আছি।তোর মতো নারী সেবা করে নিজের জীবনের ইনজয় মোমেন্ট হারাইনি।”

“যার কাছে যেটা শান্তির স্থান।এটা তুমি বুঝবে না।আমার মতো মহিলা সদস্যের মানুষ না থাকলে আজ তোমরাও সেফ থাকতে না।তবে তোমরা নিজেদেরকে অতিরিক্ত পর্যায়েও নিয়ে যাও যেটা আবার নিজেদের জন্য ক্ষতিকারক।”

আমি রাগ করে বেরিয়ে আসি।সিড়ির কাছে দেখা হয় শ্রেয়ার মায়ের সাথে।তিনি আমাকে তার ঘরে নিয়ে যান।আমার উদ্দেশ্য ছিল তাকেও দুটো কথা শোনানোর কিন্তু তার আগেই আমার নজরে আসলো শ্রেয়ার বাবার ছবি।তখনই শ্রেয়ার মায়ের থেকে সব জানতে পারলাম।লোকটা গুলির আঘাত নিয়েও আমাকে গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে ঢাকায় আসতে সাহায্য করে।গাড়ির পিছনে ঘুরে আমি দেখি উনি ট্র্যাকে…।বলতেও যেনো আমার গা কেপে উঠছে।”

“তুমি তো আমাদের বলোনি এই হামলার কথা।”

“সাহস হয়নি আমার।ড্রাইভারকেও নিষেধ করে দেই।তারপর অবশ্য তাকে পাল্টানো হয়।তাই তোমরা কিছু জানতে পারোনি।”

“সেদিন শ্রেয়ার বাবার জন্য তোমার জীবন বেঁচে যায়।”(ফারহান চৌধুরী)

“একদম তাই।নাহলে কে ছিলো ওই দড়ি খুলে বোমটা নিজে থেকে সরিয়ে নিবে?কেউ তো আসেনি।ওনার থেকেও বড় পুলিশ ছিলো ওখানে।সেও তো তার পোশাকের মান রাখতে এগিয়ে আসেনি।একা শ্রেয়ার বাবা এসেছিলো।”

“আমার উনি ছিলেনই এমন।সবসময় তার পোশাকের মান রাখতে চাইতো।তার একটাই কথা।পুলিশ হয়েছি মানুষের সেবা করতে।মানুষদের বিপদে রক্ষা করতে।যদি আমি রক্ষা না করতে পারি তাহলে কেনো এই সম্মানের পোশাক আমার শরীরে আসলো?লোকটার এই মানবতার জন্যই আমরা এক পরিবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম।”

সৃষ্টি বেগমের কথা শুনে সবাই পিছনে তাকালেন।শিহাব নিয়ে এসেছে ওনাকে আর রিমলিকে।মিরাজ কল করে জানিয়েছিলো শিহাবকে।রিমলি এসে শ্রেয়ার অপারেশন রুমের দরজায় উকি দিতে থাকে।কিছুই দেখতে পারছে না।কান্না করতে করতে মা মেয়ের চোখ লাল।এখন প্রায় সকাল।এই সকালেই শিহাবকে কল করছিলো মিরাজ। রিমলি অর্পার কাছে এসে অর্পার হাত ধরে বলে,”আপু ঠিক হয়ে যাবে তো?”

অর্পা শক্ত করে ধরে রিমলির হাত।বলে,”হবে,ওর তো শুধু হাতের উপর দিয়ে অটো গেছে।একটু ফ্র্যাকচার আর ব্যাথা হবে এছাড়া কিছু হবে না ডাক্তার জানিয়েছে।”

“আমার আপুটার খালি কষ্ট হয়।সব সময় ওর জীবনে এসব সমস্যা এসেই থাকে।একটুও কি ও আনন্দে জীবন কাটাবে না?”

“এবার থেকে ওর জীবন আনন্দে কাটবে।”

মিমি ঘুম থেকে উঠলো মাত্র।অহির কোলে ঘুমিয়েছিলো।আলাদা একটা কেবিন ভাড়া নিয়েছে মিরাজ।সেখানে ঘুমিয়েছিলো মিমি।উঠেই দৌড়ে আসে শ্রেয়ার খোঁজে।ফারাজ মিরাজ একসাথে নামাজ পড়ে এসেছে।অর্পা ও বাকি মেয়েরা কেউ কেউ কেবিনে আবার আলাদা নামাজ ঘর থেকে নামাজ পড়েছে।মিমি অপারেশন রুমের বাইরে এসে বলে,”মাম্মাম কোথায়?কি বলেছে ডাক্তার?”

বলতে না বলতেই ফারাজের লাল রক্তিম চোখ দেখে মিমি।কিছুটা ভয় পায় তবুও ফারাজের কাছে যায়।বাবা হয় তার। ফারাজের সামনে দাড়াতেই ফারাজ জড়িয়ে ধরে মিমিকে।মিমি বলে,”তোমার চোখ লাল কেনো?”
“রাতে ঘুম হয়নি মা।”
“মাম্মাম এখনও ঘুমাচ্ছে কেনো?”
“ইনজেকশন দিয়েছে ডাক্তার।উনি রাতেই এসেছিলো বাইরে।আমাদের জানালো সকালে উনি একটু চেক করে যাবেন তারপর আমরা একেক করে দেখা দিবো।”
“মাম্মাম সুস্থ হয়ে যাবে?”
“তোমার মাম্মামের হাতে ফ্রাকচার হয়েছে।সারতে সময় লাগবে।বাকি সব ঠিক আছে।”

শান্তি পেলো মিমি।অবশেষে এটা তো বুঝলো ফারাজ এখন আর রেগে নেই।সকাল নয়টা বাজতেই ডাক্তার আসে শ্রেয়াকে দেখতে।শ্রেয়ার সেলাইন শেষ।সেলাইন পরিবর্তন করে দিচ্ছে আর মিমি চোখমুখ কুচকে দেখছে। কেনোলার সুই হাতের পিঠে ফোটানো দেখেই মিমির ভয় বেড়ে যায়।শ্রেয়া চোখ পিটপিট করে খুলতে থাকে।চোখ খুলেই ঝাপসা চোখে দেখতে পেলো ফারাজকে।অসুস্থ অবস্থায়ও শ্রেয়ার মুখে ফুটে উঠলো হাসি।মিমি এসে জড়িয়ে ধরলো শ্রেয়াকে।শ্রেয়ার বাম কাধ ধরে শ্রেয়ার বুকে মাথা দিয়ে ছিলো।ডান হাতে ব্যাথা আর বাম হাতে কেনোলা থাকার কারণে শ্রেয়া পারছে না তার হাতটা বাড়িয়ে মিমিকে আদর করতে।ফারাজের দিকে তাকিয়ে বলে,”আমার হয়ে একটু মেয়েকে আদর করে দিন।হাত ব্যাথা করছে তো।আমার হয়ে নাহয় আপনার হাতটি বাড়িয়ে দিলেন।”

স্মিত হেসে ফারাজ মিমির মাথায় হাত বোলাতে থাকে।কিছুক্ষণ এই ভালোবাসার মুহূর্ত কাটিয়ে চলে যায় সবাই।কেবিনে এখন শুধু ফারাজ আছে।ফারাজ নিজেই সবাইকে চলে যেতে বলেছে।তূর্য আসবে আজ তাই।শ্রেয়া বেডে শুয়ে আছে।ফারাজ পাশে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে।অনলাইনে হাসপাতালের বিল পেয় করে দেয়।অতপর শ্রেয়ার দিকে তাকিয়ে বলে,”তুমি এখনও বোকাই আছো।”

অসুস্থ অবস্থায় এমন কথা শুনে রেগে গেলো শ্রেয়া।কপাল কুঁচকে চোখ ছোট ছোট করে আছে।ফারাজ বলে,”আমাকে একটা কল করলেই হতো।যেতাম না একা একা কোথাও।একসাথে নাহয় আধারে চন্দ্রবিলাস করতাম।”

শ্রেয়া অন্যদিকে ফিরে গেলো।অভিমান করেছে সে।ফারাজ বলে,”কি হলো?”
“আপনি এমন কেনো?”
“কেমন?”
“নিরামিষ।”
“তাই?”
“হুম,একটুও ভালো কথা বলতে পারেন না। উল্টো আমাকে বকা দেন।”

শ্রেয়ার অভিমানী রূপে তার নাকটা ফুলে উঠেছে।যেটা দেখে হেসে দেয় ফারাজ।কিছু একটা ভেবে টুকুষ করে শ্রেয়ার ফোলা নাকের উপর চুম্বন এঁকে দিলো ফারাজ।চোখ বন্ধ করে হালকা কেপে উঠলো শ্রেয়া।ফারাজ আলতো হেসে বলে,”আমার একটা চুম্বনে তোমার কম্পন বৃদ্ধি পেলো,শ্রেয়াময়ী!জীবনের বাকি অধ্যায়ে কি করবে?”

কান গরম হয়ে এলো শ্রেয়ার।ফারাজের থেকে এমন কথার আশা সে রাখেনি।চোখ এখনও বন্ধ করেই আছে।ফারাজ হাসছে লজ্জাবতী শ্রেয়াকে দেখে।অহি আর আজকে কিছুই করছে না।প্রত্যেকবার তূর্য আসলে অহি অনেক রান্নাবান্না করে।তূর্য খায় কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া করেনা।তুর্যের পছন্দের কতকিছু করেও কখনও মা হিসেবে ভালোবাসলো না তূর্য।আজ মিমিকে নিয়ে ব্যস্ত অহি।এদিকে শ্রেয়াকে হাসপাতাল থেকে দুপুরে ছেড়ে দেওয়া হবে।কারণ শ্রেয়ার এখন শুধু ব্যয়াম করতে হবে।দুইটা সেলাইন নিলেই শ্রেয়ার দুর্বলতা কেটে যাবে।সেই সময়টুকু শ্রেয়ার সাথে ফারাজ আছে।

দুপুরে শ্রেয়াকে এনে সোফায় বসিয়েছে ফারাজ।নিজে থেকেই শ্রেয়ার সেবা করছে।ফারাজ শ্রেয়ার পাশে বসতেই জিনিয়া শ্রেয়ার আরেক পাশে বসে।মাত্র রান্নাঘর থেকে আসলো।অতসী সেজেগুজে নিচে নামছে।স্বামী আসবে দুইটা বছর পর।আনন্দে পুরো বাড়ি নাচতে ইচ্ছা করছে আজ তার।অতসী সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে হাসতে হাসতে।পরনে স্লিভলেস হাতার ব্লাউজের সাথে জর্জেট শাড়ি।অতসী নামতেই সদর দরজার কলিং বেলটা বেজে উঠলো।সার্ভেন্ট গিয়ে খুলে দিলো দরজা।তূর্যকে দেখে অতসী দৌড়ে গেলো কিন্তু তূর্য অতসীকে পাত্তা দিল না।সবাই একটু অবাক হলেও ফারাজ স্মিত হাসছে।তূর্য ফারাজের সামনের সোফায় বসে আছে চুপ করে।অতসী এসেই বলতে থাকে,”আই মিস ইউ সো মাচ বেবী।”

তূর্য কোনো কথা বলছে না।অতসী বলে,”কানাডা থেকে কি নিয়ে এসেছো আমার জন্য?”

তূর্য এখনও নীরব আছে।অতসী আবার বলে,”শোনো!এবার কিন্তু আমরা লং ডের জন্য ট্যুরে যাবো।তুমি কিন্তু না করবে না।”

এখনও কোনো কথা বলছে না তূর্য।অতসী হাসি হাসি মুখে বলে,”আচ্ছা আমাকে কেমন লাগছে?”

তূর্য তাকালো অতসীর দিকে।ক্লান্তির চোখে বলে,”পুরোই ডাইনির মতো।”

হাসি মুখটা নিভে গেলো অতসীর।বলে,”কি বললে তুমি?”
“একদম ডাইনির মতো লাগছে।আর তুমি শুধু একজন ডাইনি না তুমি একজন ডাইনি মা।”
“ডাইনি মা?”
“আমাদের তুষারের কোনো খোজ নিয়েছো তুমি?আচ্ছা এই বাড়িতে এত মানুষ থাকতে কেনো ওকে বোর্ডিংয়ে থাকতে হয় বলতে পারো?”
“তূর্য আমাদের ছেলেটা বড় হয়েছে।ওকে তো এখন বোর্ডিংয়ে আমাদের ইচ্ছাতেই পাঠানো হলো।তুমি এখন এগুলো কেনো বলছো?”
“তুষারকে আমি নিয়ে এসেছি।”
“কোথায় ও?”
“আসছে ও নিজেই দেখতে পারবে।”

বলতে না বলতেই ভিতরে আসে তুষার।তুষারের হাতে একটি স্ট্যান্ড।যেটার সাহায্যে হাঁটছে তুষার।অতসী অবাক হয়ে বলে,”কি হয়েছে তোমার?”

এবার তূর্য উঠে দাড়ালো সোফা থেকে।চিল্লিয়ে বলে ওঠে,”কেমন মা তুমি যে তুমি জানোই না তোমার সন্তান তিনতলা ভবন থেকে পড়ে ইনজিউর্ড হয়েছে?”

অবাক হয়ে তূর্যকে দেখছে অতসী।তূর্য আবারও বলে,”তোমার মতো মা যে কেনো গর্ভ ধারণ করে বুঝিনা।সন্তানের খোঁজ খবর রাখোনা।আমার দুই কাকাতো ভাই তো ঠিকই জেনে যায় সব।ফারাজ ভাই আর মিরাজ না থাকলে আমার ছেলের হয়ে কোনো গার্জিয়ান তো যেতই না বোর্ডিংয়ে।”

অর্পা মিরাজের দিকে তাকিয়ে বলে,”আমাকে বলোনি কেনো?”
“তোমার নিজের অবস্থা ভালো না।ওই সময় তোমারও মিসকারেস হয়।তাই তোমাকে মাইন্ডলি ডিস্টার্ব করিনি।”

তূর্য অতসীর দিকে তাকিয়ে চিল্লিয়ে বলে,”তুষারের মেইন গার্জিয়ান হিসেবে চেনে তোমাকে আর আমাকে।তোমাকে কল করেও পায়নি বোর্ডিংয়ের ম্যানেজার।আমাকে কল করে।আমিও মিটিং করে এসে তারপর কথা বলি।জানতে পারি এক্সিডেন্টের কথা।আমিও তোমাকে কল করি অনেক।শেষমেষ কল রিসিভ হয় কিন্তু রিসিভ করে কোনো এক পুরুষ মানুষ।জানায় আপনার বউ এখন মদের বোতলে নিজেকে ভাসিয়ে রেখেছে। বাহ!ছেলে হাসপাতালে ভর্তি মা বারে নাচতে ব্যাস্ত।”

অতসী আপনা আপনি মুখে হাত দিয়ে কান্না করে দেয়।কিছু একটা ভেবে বলে,”কিন্তু আমি তো দুইদিন পর কল করেছিলাম।ওরা জানালো তুষার ঠিক আছে ইনফ্যাক্ট আমি তুষারের সাথে কথাও বলেছিলাম।”

“কারণ আমি সবাইকে জানাতে না করেছি।দেশে এসে তোমার সাথে বোঝাপড়া করবো বলে।দিনদিন সংসার ও সন্তানের থেকে তোমার যে বাইরে ঝোঁক বাড়ছে তার হেস্তনেস্ত করতেই সবাই চুপ ছিলাম।ফারাজ ভাইকে কল করে তুষারের কথা বলেছিলাম তাই ফারাজ ভাই নিয়ে যায় তুষারকে।ছেলেটার পা ভেঙ্গে গেছে।যার সাথে ওর ঝামেলা হয়েছে তাকে হ্যান্ডেল করেছে ফারাজ ভাই।কিন্তু বাবা মা হয়ে আমরা ব্যর্থ।আমি তো তাও বাইরে ছিলাম কিন্তু তুমি?তুমি তো জীবিত এবং কাছেই ছিলে।মা হয়ে কি তোমার রাতের বেলা পার্টি করা শোভা পায়?”

উপর থেকে হাততালি দিতে দিতে নামে অহি। তিহান চৌধুরীসহ সবাই দেখছে অহিকে।বিশেষ করে তিহান চৌধুরী আর তূর্য।অহি নিচে নেমে বলে,”বাহ,এই বাড়ির কত রঙ্গ দেখা বাকি!”

তিহান চৌধুরী ভ্রুকুটি করে বলেন,”মানে?”
“তোমাদের একেকটা রূপের শেষ নেই।কখনও চাও মডার্ন বউ।যেটা আমার মধ্যে ছিল না।তাই তো আমি হয়েছি এই বাড়ির চাকরানী।তোমরা চেয়েছো স্মার্ট বড়লোক বাড়ির বউ।নিয়েও এসেছো এমন বউ।এখন কেনো তাকে নিয়ে সুখে থাকতে পারছো না?স্মার্ট চেয়েছো স্মার্ট হয়েই তো থাকবে।”
“তাই বলে সন্তান রেখে পার্টি করবে?”
“বাড়ির মেয়ে বউ উচ্ছন্নে যায় কিভাবে?তোমরা কি একবারও খোঁজ খবর নিয়ে কাছে আগলে রেখেছো তাকে?তোমরা কি কখনও শাসন করেছো তাকে?তোমার মনে আছে তিহান?আমাদের বিয়ের পর তুমি আমাকে কোথাও নিয়ে যেতে না।কারণ আমি ওয়েস্টার্ন ড্রেসের সাথে লাইফ লিড করিনা।এখন বউমা তো ওয়েস্টার্ন ড্রেস নিয়ে মডার্ন লাইফ লিড করে।তাকে নিয়েও কেনো এতো সমস্যা?”
“আমাদের বাচ্চাটার কথা ভাববে না তাহলে?”(তূর্য)
“তাহলে মাস্তি করবে কখন?ফ্যাশন, সোসিয়াল লাইফ,স্মার্টনেস কে দেখাবে?আদৌ কি অতসী একজন গৃহবধূ হওয়ার যোগ্য?তোরা বাবা ছেলে তো গৃহবধূ দেখে আনিসনি। তোরা বাড়িতে এনেছিলি স্মার্ট বড়লোক বাড়ির মেয়ে। যারা সুন্দর সুন্দর কথা বলে বাইরের পুরুষদের মন ভোলাবে।ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরে আরো পুরুষদের আকৃষ্ট করবে।এমনই তো চাও তোমরা।”
“তার মানে তুমি সবই জানতে?”(তিহান চৌধুরী)
অহি মুখে হাসি ফোটাল।যার অর্থ সে জানত সব।তিহান চৌধুরী বলেন,”তাহলে বলোনি কেনো?”
“কারণ আমার কথার কোনো মূল্য এই বাড়িয়ে নেই ইনফ্যাক্ট আমার অস্তিত্বের মূল্যটাও নেই।তাই নীরব থেকেই সবকিছু দেখতে থাকলাম।দেখলাম একজন ব্যার্থ বাবাকে যে পারেনি তার ছেলেকে সঠিক শিক্ষা দিতে পারেনি মেয়েকে বুকে আগলে ভালোবাসতে আবার শাসন করতে।এক কথায় বলা চলে নীরব থেকে প্রতিশোধ নিতে থাকি।”

অহিকে নিজের হয়ে লড়াই করতে দেখে অবাক অতসী।সাথে করে তিহান চৌধুরী আর তূর্য।বাকিরা সবাই খুশি হয়েছে আজ।আজকে অন্তত প্রতিবাদ করার সুযোগ পেলো।

চলবে…?