একগুচ্ছ শুকতারা পর্ব-৩৬+৩৭

0
60

একগুচ্ছ শুকতারা
শারমিন ইরান

৩৬.
‘ আপনি আমার সাথে কথা বলেন না কেন?’
পার্থিব শ্রুতির দিকে তাকাল। তাকিয়ে খুব সুন্দর একটা হাসি দিল। হাসি দিয়ে সে শ্রুতিকে গুরুত্বও দিল না, অবহেলাও করল না। পরিস্থিতিটাকে হাতের মধ্যে রাখল। আন্তরিক কণ্ঠে বলল, ‘ কী যায় আসে শ্রুতি? কথা নাহয় নাই বললাম। জীবন তো থেমে নেই। চলেই যাচ্ছে। তাইনা?’
শ্রুতি হতবাক হয়ে চেয়ে রইল। এতো কঠিন কথা? শ্রুতি তার কাঠির মতো দুই হাত দিয়ে পার্থিবের বাহু ধরল। ধরে নিচের দিকে টানল। পার্থিব কাগজ থেকে মুখ তুলল শ্রুতির দিকে। শ্রুতি শান্তকণ্ঠে বলল, ‘ রাগ করলে বলে দিতে হয় যাতে অপর মানুষটা রাগ ভাঙাতে পারে।’
পার্থিব তাকিয়ে রইল শ্রুতির দিকে। নম্রকণ্ঠে বলল, ‘ রাগ না করলে বলব কেন?’
‘ আপনি রাগ করেছেন। আমাকে বোকা ভাবেন?’
‘ আপনি চালাক?’
শ্রুতি থম ধরে রইল। কিছু বলল না। পার্থিব শ্রুতিকে হাত ধরে উঠাল। বলল, ‘ রাত অনেক হয়েছে। চলেন ম্যাডাম, ঘুমাতে যাই।’
পার্থিব শ্রুতির হাত ধরে টেনে রুমে নিয়ে এলো। শ্রুতিকে বিছানায় শুয়ে পড়তে বলে সে চলে গেল বাথরুমে। শ্রুতি মুখ লটকে দাঁড়িয়ে রইল। শ্রুতি ঠিক জানে পার্থিব যে তাকে অবহেলা করল। কথা যাতে না বাড়াতে হয় তাই হাত ধরে এনে শুয়ে পড়তে বলল। ও কী বাচ্চা?
সারাদিন কাজ করে আবার রাতে এসে ভাব দেখায়। কীসের এতো কাজ তার? কী হবে এতো কাজ করে? কই আগে তো এতো কাজ ছিলনা। শ্রুতি নাক ফুলিয়ে শুয়ে পড়ল। মনে মনে নিজেকে দুটো চড় মারল পার্থিবকে ভালোবাসার জন্য।

.
মানুষের জীবনে কখনো আফসোস শেষ হয়না। জীবনের একেক পর্যায়ে থাকে একেক প্রকারের আফসোস। যেমন মাহাথিরের বর্তমান আফসোস হলো সে কেন চাকরি করে? সে যদি ব্যবসা করতো তবে নিজের মতো চলতে পারতো। গা ধার মতো প্রতিদিন সকাল উঠে এখানে দৌড়াতে হতো না। চাকরি মানুষ করে? না, মানুষ করেনা। জানো/য়ার করে। আর জানো/য়ার হলো মাহাথির। আনাস তো বলেছিলোই। কেন জানি বলেছিল? ও হ্যাঁ বিভার প্রতি করা মাহাথিরের আচরণের জন্য বলেছিল। মাহাথির থমকে গেল। আবার বিভা?
মাহাথির বিভার কথা মোটেও ভাববে না। না মানে না। সে ফোন বের করে স্ক্রোলিং শুরু করল। সামনে যা আসছে কিছুই সে গ্রাহ্য করছে না। আঙুলের সাহায্যে উপরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ একটা পোস্টে চোখ আটকে গেল। মাহাথির পড়তে শুরু করল –

‘ কখনো নারীদের মন থেকে উঠে যাওয়ার মতো কাজ করবেন না। নারীদের মন থেকে উঠে যাওয়ার মতো ভয়ংকর আর কিছুই নেই। যেদিন থেকে আমার স্ত্রী আমার সাথে রাগ করল না, চিৎকার করল না, অভিমান করল না সেদিনই আমি বুঝে গেলাম আমি আমার স্ত্রীর মন থেকে উঠে গেছি। আমি তাকে হারিয়ে ফেলেছি। সে আর আমার নেই।’

মাহাথির কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইল পোস্টের দিকে। কী আজেবাজে লেখা এই পোস্টে? রাগ না করলে, চিৎকার না করলে, অভিমান না করলে মন থেকে উঠা হয়ে যায়? এরমানে বিভা তাকে মন থেকে উঠিয়ে দিয়েছে। মাহাথিরের ভ্রু জোড়া আরোও কুঁচকে গেল। মুখ দিয়ে গালি বের হলো, ‘ বা* আমার।’
সে পোস্টের নিচে মন্তব্য লিখতে শুরু করল, ‘ এমন আলতু-ফালতু কথা কই পান? বউরা চুপ থাকতে পারেনা? চুপ থাকা মানেই দূরে যাওয়া না। আমার বউ জন্মগত শান্ত। নেক্সট টাইম আজেবাজে কথা বললে রিপোর্ট মেরে পেজ উড়িয়ে দিব। যত্তোসব! ফাউল কথাবার্তা।’
মাহাথিরকে দিয়ে এমন বাচ্চামো আশা করা যায়না। অথচ সে করে ফেলল। রাগের মাথাতেই এমন ধরনের বাচ্চামো তার দ্বারা হয়ে গেল। মাহাথির বিরক্তিতে ফোন ফেলে টাইপিং করতে শুরু করল। আজেবাজে কথা শোনার থেকে কাজ করা ভালো।

মাহাথির বাড়ি ফিরল এক আকাশ সমান ক্লান্তি নিয়ে। ক্লান্তিতে হাত-পা ভেঙে আসছে। দরজা খুলল আম্মা। মাহাথির আম্মাকে দেখে চোখে হাসল।
ঘরে ঢুকে দেখতে পেল খাটে বিভা বসা। কাজ করছে। জামা-কাপড় ভাঁজ করছে। দেখতে কী ভালো লাগছে! চুলগুলো এলোমেলো। শ্যাম্পু করেছে? নয়তো এতো ছড়িয়ে আছে কেন?
বিভা চোখ তুলে তাকিয়ে নামিয়ে ফেলল। মাহাথির সরাসরি বাথরুমে ঢুকে গেল। আগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া প্রয়োজন।

মাহাথির বের হয়ে দেখল ঘরে বিভা নেই। হাপ ছেড়ে গামছা দিয়ে গলা মুছতে মুছতে আলমারির দিকে গেল। টি-শার্ট পড়া উচিত। আলমারির দরজা খুলে হঠাৎ কপালে ভাঁজ পড়ল। বিছানায় তাকাল। নাহ! বিছানার কোথাও-ও নেই। তাহলে? মাহাথির আলমারির আরেক দরজা খুলল। জামা-কাপড় কোথায়? তার জামাকাপড় তো ঠিকই আছে। বিভার কোনো জামাকাপড় নেই কেনো? একটু আগেই না ভাঁজ করছিলো। ভাঁজ করে রাখল কই? মাহাথিরের মনে পড়ল নিজের কীর্তিকলাপ। অনুশোচনায় বন্ধ হয়ে গেল চোখ। বিভা তারমানে আলমারিতে কাপড় রাখেনা। ঠিকই তো। তার ওই ব্যবহারের পর রাখা যায়? মাহাথিরের আজ মনে হলো, এতো দুর্ব্যবহার সে না করলেও পারতো।
.

বিভা ফোনের আওয়াজে ঘরে ঢুকে দেখল মাহাথিরের ফোন বাজছে। আশেপাশে কোথাও মাহাথির নেই। গেল কোথায়? আকাশ-কুসুম ভাবতে ভাবতে এগিয়ে গেল ফোনের দিকে। অপরিচিত নাম্বার। ধরবে? জরুরী হতে পারে। বিভা ধরে সালাম দিল, ‘ হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম।’
‘ ওয়া আলাইকুমুস সালাম। মিস্টার মাহাব আছে?’
বিভা বিমূঢ় হতে দাঁড়িয়ে রইল। মাহাব? ন্যানোসেকেন্ডের মধ্যেই মাথায় খেলল মাহাব তো মাহাথিরেরই আরেক নাম। মাহাথিরের ভালো নাম মোহাম্মদ মাহাব ইসলাম। বিভা দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলল, ‘ আমি মাহাব নই।’
‘ জ্বী, আপনি কী উনার বাড়ির লোক বলছেন? আচ্ছা শুনুন, কালকে অজ্ঞাত কারণে অফিস বন্ধ থাকবে। অফিসের গ্রুপে নোটিশ দেওয়া হয়েছে তাও সবাইকে কল করে জানিয়ে দিচ্ছি। আপনি মি. মাহাবকে জানিয়ে দিয়েন।’
‘ আচ্ছা, জানাব।’
ফোন কেটে দিল। বিভা পেছনে ঘুরে দেখল মাহাথির দাঁড়ানো। শান্ত, নির্মল মুখ। মাহাথির চুপচাপ এগিয়ে এলো। বিভা একবার নিজের হাতের ফোনের দিকে তাকাল আবার মাহাথিরের দিকে। রাগ করবে? না বলে ফোন ধরেছে বলে? বিভা ইতস্তত করে বলতে লাগল, ‘ আপনি ছিলেন না তাই…..’
মাহাথির শান্ত মুখে ভ্রু উঁচু করে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
‘ আমি কী কিছু বলেছি তোমায়?’
বিভা উত্তর দিলনা। মাহাথির নিজ থেকেই বলল, ‘ কে ছিল? কী বলল?’
‘ আপনার অফিস কাল বন্ধ তাই বলছিল।’

কথাটা বলেই বিভা চলে যেতে নিল। মাহাথির ডাকল, ‘ বিভা…..’
বিভা তাকাল। দৃষ্টির অর্থ – কী জন্য ডাকলেন? মাহাথির এবারো ব্যর্থ হলো। বলল, ‘ কিছুনা। যাও’
বিভা চলে গেল। মাহাথিরের মনে হলো সে এমন না হলেও পারতো। মনের কথা ঠাসস ঠাসস বলে দেওয়ার মতো স্বভাব হলেও পারতো। কীভাবে প্রকাশ করবে সে? মাহাথির বারান্দায় চলে গেল। আজ বেশ অনেকদিন বাদে সিগারেট ধরাল।

রাত সাড়ে নয়টা। খাওয়ার সময়। বিভা ঘরে ঢুকল মাহাথিরকে ডাকার জন্য। ঘরে ঢুকে তাকে কোথাও না পেয়ে বারান্দায় চলে এলো। উল্টোঘুরে দাঁড়িয়ে আছে সে। বিভার মাথায় হঠাৎ তখনের কথা মনে পড়ল। সাথে মাহাথিরের আগের বলা কিছু কথা। অভিমান, কষ্ট, রাগ সব একসাথে জড়ো হলো। বুকের ভেতর থাকা এক সমুদ্র গভীর অভিমান থেকে ডেকে উঠল,
‘ মাহাব।’
সাড়া এলো না। বিভা আবারো ডাকল,
‘ মাহাব।’
অলস সময়ে কাজ না পেয়ে নিচের দোকানপাট, মানুষের চলাচল ভীষণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল মাহাথির। সব ধ্যান-জ্ঞান দিয়ে দেখছিল সে। হঠাৎ বিভার জোড়াল আওয়াজে বিভার দিকে ফিরল মাহাথির। গম্ভীর মুখেই বলল, ‘ কিছু বলবে?’
‘ কখন থেকে ডাকছি আপনাকে?’
‘ ডাকছো! আমাকে! কখন ডাকলে?’
‘ একটু আগেই ডেকেছি।’
মাহাথির শান্তমুখে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ আগের ডাক তার অবচেতন মন শুনেছে। তার মনে হয়েছে বিভা ফোনে অন্যকারো সাথে কথা বলছে। কিন্তু তাকে ডেকেছে? কী বলে যেন ডাকল? মাহাথিরের খেয়ালে এলো। হ্যাঁ! বিভা মাহাব, মাহাব করছিল। মাহাথির ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘ তুমি আমাকে মাহাব কেন বলছো?’
‘ এমনি। কেমন শুনাচ্ছে?’
‘ কেমন শুনাচ্ছে মানে? হঠাৎ এইভাবে বলছো কেন?’
বিভা হাসল, ‘ বললাম। কী হয়েছে তাতে?’
‘ এই নামে আমাকে কেউ ডাকেনা বিভা। আমার চেনা-পরিচিত মানুষজন সবাই আমাকে মাহাথির বলে ডাকে। তুমি, আম্মা-আব্বা, আনাস সবাই। শ্রুতি-পার্থিব ও আমাকে মাহাথির নামে চেনে। জাস্ট স্কুল, কলেজ, অফিশিয়াল কাজে আমার ওই নাম ব্যবহার করা হয়।’

‘ পাগলামি করছেন আপনি। দু’টো নাম তো আপনারই। তাইনা? একটা ডাকলেই হলো। খেতে আসুন। খাওয়ার জন্য ডাকতে এসেছিলাম।’

বিভা ঘুরলে মাহাথিরের ডাকে আবারো থামতে হলো। মাহাথির বলল, ‘ এখন তুমি আর আমাকে অফিসের জন্য খাবার দাওনা কেন? আম্মা কেন দেয়?’

‘ আবারো বাচ্চাদের মতো প্রশ্ন করলেন। আমি ব্যস্ত থাকি তাই আম্মা দেয়। খাবার দেওয়া নিয়ে কথা। কে দিলো সেটা কথা নয়।’

মাহাথির নির্বাক, বিমর্ষ মুখে তার বউ এর বলে যাওয়া কথা শুনল। কষ্টের সাথে সাথে রাগ হলো। এতোদিন ভালোবেসেছে আর এখন যখন সে ভালোবাসা শুরু করল তখন সে সব শোধ একসাথে তুলছে?

.
শ্রুতিকে নিজের অফিসে দেখে চমকে গেল পার্থিব। তার কাছে মনে হলো দিনের বেলায় চাঁদ উঠেছে।

‘ আপনি এখানে?’
‘ আসতে পারিনা?’
‘ কেন নয়? অবশ্যই পারেন। বসুন।’
‘ ফর্মালিটির প্রয়োজন নেই। আমার হাসবেন্ডের কেবিনে এসেছি। যা ইচ্ছে করতে পারি। পারিনা?’
পার্থিব হেসে ফেলল, ‘ পারেন।’
শ্রুতির মুখে হাসি নেই। সব কথা সে বলেছে ধমকে ধমকে। তার স্বভাবে।

‘ হঠাৎ কাজ বেড়ে গেল মনে হচ্ছে?’
‘ হঠাৎ না। আপনি বাড়িয়েছেন। যেই প্রজেক্ট নষ্ট করেছেন তার মাশুল দিচ্ছি।’
শ্রুতি নরম হয়ে গেল। কী সুন্দর তাকে বলে দিল। একটুও রাগ করল না। শ্রুতি পার্থিবের জায়গায় নিজেকে বসাতে চাইল। সে যদি পার্থিবের জায়গায় থাকতো তাহলে কী হতো। শ্রুতি কল্পনা করে যা পেল তা হলো সে পার্থিবকে এক ধাক্কা দিয়ে অফিস থেকে বের করতো। সাথে আরোও বলতো, আমার কাজ আমি করছি। আপনার তাতে কী? আমার কাজ বাড়ুক, কমুক তাতে আপনার এতো মাথা ব্যথা কীসের?
হ্যাঁ, ঠিক এমন ব্যবহার টাই করতো। সে এতো উগ্র কেন? শ্রুতির মন খারাপ হয়ে কান্না পেল। নরম কণ্ঠে বলল,
‘ আপনি আমার সাথে কথা বলেন না কেন?’
‘ আবার সেম প্রশ্ন! কথা কই বলছি না? এতোক্ষণ কী ভূ/তে কথা বলছে?’
‘ সত্যি সত্যি বলুন পার্থিব। মজা করবেন না। আমি সিরিয়াস। বলুন কেন কথা বলেন না।’
‘ এইসব বলতে এসেছেন?’
‘ টিফিন নিয়ে এসেছি।’
‘ টিফিন বক্স তো দেখলাম না।’
‘ কাল নিয়ে আসব। আজকে আনতে ভুলে গেছি। আজ আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।’
শ্রুতির এমন কথায় পার্থিব হেসে ফেলল। এরপর হঠাৎ করেই সিরিয়াসভাব নিয়ে ফেলল মুখে। শান্তস্বরে বলল, ‘ আমি কথা বললে আপনার অস্বস্তি হয়, আপনি কষ্ট পান। তাই বলিনা শ্রুতি। আপনাকে টাইম দিচ্ছি। বলেছিলাম না জোড় করব না? করছিনা। আপনি আপনার মতো করেই ভালো থাকুন। আমি শুধু আপনাকে ভালো রাখার চেষ্টা করছি। আমার স্ত্রীকে খুশি করতে চাইছি।’
শ্রুতি কিছু বলতে পারল না। এতোকিছুর পরেও এই কথা? মানুষটা কী অসম্ভব ধরনের ভালো নয়কি? শ্রুতির দৃষ্টি পর্যবেক্ষণ করে পার্থিব বলল, ‘ আর কিছু?’
শ্রুরি ‘না’ বোধক মাথা নাড়ল।

পার্থিব কানে টেলিফোন তুলে আদেশ করল, ‘ আমার কেবিনে দু’টো আইস্ক্রিম, দু’টো চিকেন বার্গার পাঠিয়ে দিন।’

পার্থিব শ্রুতির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ লাঞ্চে কেউ এইসব খায়? খায়না। তবুও বললাম কারণ আমার মহারানির এইসবই পছন্দ। অফিসে আসার কারণে একদিন তাকে ছাড় দেওয়ায়ই যায়।’

পার্থিবের কথা শুনে শ্রুতির ইচ্ছে করল চেয়ার ছেড়ে উঠে পার্থিবের কপালের ঠিক মধ্যিখানে চুমু খেতে। খেলে পার্থিবের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে? শ্রুতি ভেবেই মুখ নামিয়ে ফেলল।
_______
চলবে~

একগুচ্ছ শুকতারা
শারমিন ইরান

৩৭.
প্রতিদিন সকাল সকাল উঠে আজ বেশ বেলা করে ঘুম ছাড়ল মাহাথির। হাত-মুখ ধুয়ে বাহিরে বেরিয়ে দেখল টেবিলে কেউ নেই। বুঝল মা-বাবা ঘরে, হামিমও বিছানায় শুয়ে শুয়ে নিজের মতো সময় পার করছে। বিভা তাহলে কোথায়?
ওমনি দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল বিভা। হাতে বড়সড় ব্যাগ। মাহাথির ব্যাগ দেখে শুধালো, ‘ কই গেছিলে তুমি?’
‘ এই যে পাইকারি মূল্যে এইগুলো কিনেছিলাম অনলাইন থেকে। আজকে ডেলিভারি দিলো। নিচে আনতে গেছিলাম।’

মাহাথিরের কী মনে হলো কে জানে! সে বলল, ‘ এতো কষ্ট করার প্রয়োজন নেই। তুমি চাইলে বিজনেস ছেড়ে দিতে পারো। এখন তো আমি আছি।’
বিভা চোখে চোখে রাখল। কতো সহজেই কথাটা বলে দিল মাহাথির। সত্যিই কী সে আছে? বিভা মাহাথিরের বলা কথা গ্রহণও করল না, বর্জনও করল না। বলল,
‘ প্রয়োজন পড়লে কিংবা বেশি কষ্ট মনে হলে ছেড়ে দিব।’
মাহাথির নিরব সম্মতি দিল।

বিভা ব্যাগ সাইড করে রেখে বলল, ‘ বসুন, নাস্তা দিচ্ছি।’
মাহাথির গিয়ে টেবিলে বসল। বিভা হাত ধুয়ে প্লেটে খাবার দিল। খাবার সে এক প্লেটেই বাড়ল। মাহাথির তা দেখে বলল,
‘ তুমি খেয়েছো?’
‘ হ্যাঁ, খেয়েছি। আজ অনেক সকালে উঠেছিলাম। ক্ষুধা পেল, খেয়ে নিলাম। আজ সবার আগে আমি খেয়েছি।’
‘ ভালো করেছো।’
আগে বিভা মাহাথিরের জন্য অপেক্ষা করত। আজ করল না? অভিমান থেকে নাকি সত্যিই ক্ষুধা পেয়েছিল? যদি ক্ষুধা পেয়ে থাকে তাহলে ভালো করেছে খেয়ে। আর যদি অভিমান থেকে হয়ে থাকে তাহলে ওর খবরই আছে!
মাহাথিরের খাওয়া শেষে হাত ধুয়ে পানি খেতে টেবিলে বসল। এরমাঝেই কফি দেওয়া হলো। মাহাথির ডাকল বিভাকে,
‘ খাবার কখন না কখন খেয়েছো, আমার সাথে কফি খাও?’
বিভা মাহাথিরের ব্যবহার হজম করতে পারছেনা। কষ্ট হচ্ছে। এই লোকের হয়েছেটা কী? কথা তো গম্ভীরমুখেই বলছে। তবুও কথার সুরে ভিন্নতা। বিভা বলল,
‘ খাবনা, মাহাব। খেলে বানিয়ে নিব। সমস্যা নেই।’
মাহাথিরের মনে হলো তার পুরো সকালবেলার ওপর কেউ নিম পাতার রস ছুঁড়ে মেরে সকালবেলাটাকে তিক্ত করে ফেলল। মাহাব! আবারো? এখন কী এই নামেই ডাকবে নাকি? মাহাথির বলেছিল মাহাথির নামে তার কাছের মানুষ ডাকে, সে যেন না ডাকে। সেই কথাকে কেন্দ্র করেই বুঝি এমন করছে? নিজেকে দূরের মানুষ বানাতে চাইছে? সাথে মাহাথিরকে কষ্ট দিতে চাওয়া তো আছেই।
আর কী বলল? খেতে মন চাইলে বানিয়ে খাবে? কেন ওর কফি অর্ধেক খেলে কী হতো?
ও কী সত্যি সত্যি মাহাথিরকে মন থেকে উঠিয়ে ফেলল? ওর মনের কোনো জায়গায় কী মাহাথিরের ছায়াও এখন অবশিষ্ট নেই?
মাহাথির বিরস মুখে কফির দিকে চেয়ে রইল। উদ্দেশ্য কফি ফেলে দিয়ে আসবে।
মিনিক সাতেক পর সে পুরো কফি ঢকঢক করে গিলল। ইসসস! ঠান্ডা শরবত…!

.
‘ শ্রুতি, এইসব আমি কী শুনছি? আপনি নাকি দুপুরে খাননি? কিন্তু কেন?’

শ্রুতি ঘুরল না। সে উল্টোঘুরে আছে। পার্থিব শ্রুতির এক বাহু ধরে নিজের দিকে ফিরাল। পার্থিব হতবাক হয়ে গেল শ্রুতির অশ্রুভরা চোখ দেখে। শ্রুতি ঘুরে পার্থিবের দিকে তাকাতেই টপটপ করে ঝড়ল চোখের বৃষ্টি। পার্থিব বিচলিত হয়ে গেল। অস্থির কণ্ঠে বলল, ‘ আপনি কাঁদছেন কেন?’
শ্রুতি কিছু বললনা। পার্থিব শ্রুতিকে টেনে নিজের কাছে আনল। শ্রুতির মুখ থেকে কিছুই বের হচ্ছেনা। পার্থিব শ্রুতিকে এক হাতে জড়িয়ে বলল, ‘ শ্রুতি, কী হয়েছে আমাকে বলুন? প্লিজ? এইভাবে কাঁদলে আমি কী করে বুঝব?’
আচম্বিত শ্রুতি পার্থিবকে জড়িয়ে ধরল। শরীরের সব শক্তি দিয়ে। পার্থিব কান্ডজ্ঞানহীন হয়ে গেল। বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মুখ দিয়ে কিছুই বের হলো না।
শ্রুতি হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে ধমক দিল,
‘ আপনি আমার সাথে আগের মতো হয়ে যান প্লিজ। আমার ভালো লাগেনা এমন। আপনি আগে একটুও কাজ করতেন না। বাড়ি ফিরে আমার সাথে কথা বলতেন। অথচ এখন আমি কেউ’ই না আপনার কাছে। কেন? এতো কীসের কাজ আপনার? আমি তো জানতাম না ওই ফাইলে আপনাদের দরকারি কাগজ ছিল। জানলে ছিঁড়তামও না। ভুল করে ফেলেছি তাও মানছেন না। আমাকে ক্ষমা করছেন না। অথচ বিয়ের পরে বড় বড় কথা বলেছিলেন যে – ছোট মানুষদের ভুল ক্ষমা করতে হয়। বিয়ে মানে আত্মার সম্পর্ক। ঘোড়ার ডিমের সম্পর্ক! আপনি আমার সাথে স্বাভাবিক ব্যবহারই করছেন না, আত্মা তো দূরের বিষয়। আমাকে ভালোওবাসেন না। অন্যকাউকে ভালোবাসেন? আমি ঠিকই ভাবি। আমাকে কেউ ভালোবাসে না। কেউ না।’
ধমকে ধমকে, কাঁদতে কাঁদতে নিজের কথা শেষ করল শ্রুতি। পার্থিব চুপ করে রইল। হাপ ছাড়ল। মেয়েটা এতো অবুঝ! অথচ ভাব এমন করে যেন পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে চতুর সে। পার্থিব নিজেও তার বউকে জড়িয়ে ধরল।
শান্তকণ্ঠে বলল,
‘ কান্না থামান, শ্রুতি। আমি আপনাকে কষ্ট দিতে চাইনি। শুধু চেয়েছিলাম আপনি সম্পর্কে এগিয়ে আসুন। একার জোড়ে কখনো সম্পর্ক টিকে না। সম্পর্কে দুইজনের চেষ্টা, যত্ন, তাগিদ থাকতে হয়। আমি যা চেয়েছিলাম আমি পেয়ে গেছি শ্রুতি। এইযে আপনি এক পা এগুলেন, এবার আমি একশো পা দৌড়ে যাব আপনার কাছে। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আমি আপনার ওপর রাগ করিনি। পার্থিব তার শ্রুতির ওপর রাগ করতেই পারেনা।’
শ্রুতি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল মুখ উঠিয়ে, ‘ আপনি আমাকে ক্ষমা করেছেন?’
‘ উহুম! আমি আপনাকে ভালোবেসেছি। আগেও বাসতাম, এখনো বাসছি। ভবিষ্যতেও বাসব।’
‘ আর রাগ করবেন না? কাজের নাটক করবেন না তো?’ সরল প্রশ্ন।

পার্থিব অনেকদিন পর প্রাণখুলে হেসে দিল। শ্রুতিকে এক হাতে জড়িয়ে এনে এক আঙুল দিয়ে নাকের মাথা ধরে নাড়িয়ে দিল আর বলল, ‘ আমার বোকা বউ! আমি কাজের অভিনয় করিনি। সত্যিই আমি ব্যস্ত ছিলাম। ওইদিন বললাম না?’

শ্রুতি মাথা নিচু করে ফেলল। শুধু শুধু কতো চিন্তা করছিল সে। পার্থিব শ্রুতিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতেই শ্রুতি ছটফটিয়ে উঠল, ‘ আমি শ্বাস নিতে পারছিনা তো। আসতে ধরুন।’

‘ এটা আপনার শাস্তি। এতোদিন ধরে আমার সাথে তিড়িংবিড়িং করার শাস্তি। এবার শ্বাস আটকে বসে থাকুন।’

.
হাসিনা ছাদে এসেছে কাপড় শুকা দিতে। সে লক্ষ্য করল তার পিছু পিছু মাহাথিরও এসেছে। মাহাথিরকে অসময়ে ছাদে দেখে বলল, ‘ তুমি এইখানে কেন আব্বা? কিছু লাগব?’
‘ আপনার সাথে আলাদা কথা বলতে চাচ্ছিলাম, আম্মা।’
‘ কী কথা?’
‘ আম্মা, আপনি বিভাকে বলেন ভালো হতে।’
‘ এইসব কী কও তুমি! বিভা কী খারাপ নাকি?’ নিজের ছেলের এমন কথায় আশ্চর্য হয়ে উঠলেন হাসিনা।
‘ ও আমার সাথে ভালোভাবে কথা বলেনা।’
‘ ভালো তো। তুমিও বলোনা, ওয়’ও বলেনা। শোধবাধ।’
‘ আমি বলিই আম্মা। আমি ওর সাথে বলতে চাই। ও আমাকে এড়িয়ে গেলে কীভাবে বলব?’
‘ এড়াই যাওয়ার মতোন কাজ করলে তোমারে মাথায় তুইলা নাচব নাকি?’

মাহাথির রেগে উঠল। কী শুরু করেছে সবাই তার সাথে!
‘ আমার এইসব মোটেও ভালো লাগছেনা।’
‘ তো আমি কী করবো?’
‘ আপনি ওকে বলবেন, আমি আগের মতো নেই। আমি ওকে.. ওর সাথে স্বাভাবিক হতে চাচ্ছি।’

হাসিনার কাজ শেষ। সে মাহাথিরের দিকে তাকাল। মনে মনে হাসল। আগেও মাহাথিরের কিছু লাগলে সে এইভাবে পিছু পিছু ঘুরতো। আজও এসেছে। দেখে মনে হচ্ছে বাচ্চা ছেলেটা নিজের প্রিয় জিনিসের অভাবে গাল ফুলিয়ে আছে। সে বালতি নিয়ে মাহাথিরের দিকে এগিয়ে এলো। বলল,
‘ শুনো বাজান। অনেক দোষ তুমি করসো। সেই শাস্তিও তুমি প্রাপ্য। আর কেমন পোলা তুমি? বউয়ের মান ভাঙাইতে মায়ের কাছে আসছো? যেই কথাগুলো আমারে বললা সেইগুলা বউরে বলো যাও।’
হাসিনা হাপ ছেড়ে আবারো বলল, ‘ কম অন্যায় করো নাই। নিজের চোখেই এতো দেখছি, আমি না থাকতে আরোও কতো করসো আল্লাহ মালুম। ওইদিন বললাম বউডার হাত কাটছে। ফিরাও চাইলা না। উচিত ছিল না নিজের বউরে খাওয়াই দেওয়ার? বলো, উচিত ছিল কিনা?’

মাহাথির উত্তর দিতে পারল না। কপালে অসহায়ত্বের ভাঁজ ফেলল। এতো এতো দোষ করেছে যে নিজের চোখেই চোখ মিলাতে পারছেনা। কী হবে তার? কী হবে তার সম্পর্কের? এর পরিণামে কী?

বিকেলবেলা। মাহাথির বাইরে গেছিল একটু। ঘরে ফিরে দেখল সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত আছে। মাহাথির নিজের ঘরে ঢুকল। হাত-মুখ ধুয়ে বের হতেই চোখ পড়ল বিছানায়। বিছানায় ভাঁজ করা কাপড়ের দু’টো স্তূপ। একটা স্তূপে মাহাথিরের কাপড় ভাঁজ করা। অন্যটায় বিভার কাপড়। মোক্ষম সুযোগ। মাহাথির কাপড় গুলো তুলে নিজে আলমারিতে রাখল। মাহাথিরের ভাঁজ করা পাঞ্জাবিগুলোর ওপর সুন্দর করে বিভার জামাগুলো রেখে দিল। আপাতত এইগুলো থাক, পরে অন্যান্য কাপড়ও ঢুকিয়ে রাখবে।
মাহাথিরের মনে হলো এখন আলমারিটা দেখতে সুন্দর লাগছে। আলমারিটাকেও বিবাহিত মনে হচ্ছে। বিবাহিত মাহাথিরের বিবাহিত আলমারি। মাহাথির মুখে সরু হাসির সাথে আলমারির দরজা বন্ধ করে ফেলল।

.
‘ মাহাব, উঠুন। এই… ৭ টা ২০ বাজে। খাবেন কখন, গোসল করবেন কখন আর অফিসে যাবেনই বা কখন? আটটায় না অফিস? এই মাহাথ..মাহাব।’

বিভা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। সাতটা থেকে ডাকছে। এইবার হাত ধরে টানতে লাগল। উদ্দেশ্য উঠিয়ে বসানো। মাহাথিরের ঘুম হালকা হতেই সে বিভার হাতের স্পর্শ বুঝল। উল্টো সে টান দিল বিভাকে। বিভা এমনটা আশা করেনি। তাই নিজের ওপর নিজের আয়ত্ত রাখতে পারল না। পরে গেল মাহাথিরের ওপর। মুখ গিয়ে ঠেকল মাহাথিরের কাঁধে। চুল বাঁধা থাকায় অতিরিক্ত ঝামেলা হলোনা। ঘটনায় আকস্মিকতায় বিভা হতভম্ব!
অন্যদিকে সকাল সকাল মাহাথিরের মুখে হাসি ফুটল। এক হাত বিভার পিঠে। অন্য হাতে জড়িয়ে ধরতে যাবে ওমনি বিভা কর্কশ কণ্ঠ কানে এলো, ‘ মাহ্ থির সাতটা ছাব্বিশ বাজে। আটটায় আপনার অফিস। ভুলে গেছেন নাকি লেট হলে যে ফি কাটে?’
মাহাথির চমকে বিভার দিকে চাইল। বিভা নিজেকে সামলে উঠে পড়তেই মাহাথির ঘড়ির দিকে তাকিয়ে এক লাফে উঠে পড়ল। সেদিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে স্থান ত্যাগ করল বিভা।

বাথরুম থেকে তাড়াহুড়োয় বেরিয়ে হাতের কাছে সব পেয়ে মনটা খুশি হলো। মোজা পড়তে গিয়ে দেখল মোজাটা অনেক দিন ধরে পরা হয়। নষ্ট হয়ে গেছে। আলমারি খুলল নতুন মোজা বের করার আশায়। কাঙ্ক্ষিত জিনিস নিয়ে দরজা আটকানোর সময় চোখ আটকালো ওপরে। বিভার জামা নেই। কোথাও নেই আলমারির। মূহুর্তের মধ্যে সুন্দর মেজাজে ছাই পড়ে গেল। রাগে, দুঃখে দরজা আটকে ফেলল। এতো রাগ? এতো অভিমান? মাহাথির নিজের হাতে রাখল জামগুলো। তাও সরিয়ে ফেলল?

নিজের বদরাগের কারণে দুপুরের খাবারও নিল না মাহাথির। বেরিয়ে পড়ল অফিসের উদ্দেশ্যে।
_____

চলবে~
শব্দসংখ্যা – ১৪২৭
#একগুচ্ছ_শুকতারা
#শারমিন_ইরান