কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ পর্ব-২৫+২৬+২৭

0
86

#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

২৫.

সমুদ্রতীরের এক দোকানে সিগারেট কিনতে গিয়ে তুল্য শার্লিকে চিপস কিনতে দেখলো৷ পরনে ভার্সিটিট লগোওয়ালা টিশার্ট, ঢোলা জিন্স। শার্লি কেনা শেষে চলে যাচ্ছিলো। তুল্য পেছন থেকে ডাক লাগালো,

– শার্লি শোন?

শার্লি দাড়ায়। তুল্য এগিয়ে একহাত পকেটে গুজে ওর সামনে দাড়ালো। সিগারেটের ধোয়া ছেড়ে, গা ছাড়া ভাবে বললো,

– শান্তর থেকে দুরে থাকবি।

– কোন শান্ত?

তুল্য কিছুটা অবাক হয়। উল্টো প্রশ্ন আশা করেনি ও। মুখ থেকে সিগারেট নামিয়ে বললো,

– তুই জানিস আমি কার কথা বলছি।

– কিন্তু তোর কথা আমি কেনো শুনবো?

তুল্য শিথিল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়। শার্লি কোনোরকম গোড়ামী না করে বললো,

– শার্লি তোর কথা শোনার জন্য বসে নেই তুল্য। স্টপ ট্রাইয়িং টু কন্ট্রোল মি। আমি তোর হাতের পুতুল নই।

বেশ কড়াভাবে জবাব দেয় শার্লি। তুল্য আবারো সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়লো। বেশ স্বাভাবিক গলায় বললো,

– তোকে আমি আমার হাতের পুতুল হতে বলিনি। অন্যকিছু হবি?

তুল্যর এমন প্রশ্নের জন্য শার্লি মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। ওর মনে হলো, আজকে আবার ওর লজ্জা পাচ্ছে। এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সাধ্য ওর নেই। দ্রুততার সাথে স্থানত্যাগ করলো শার্লি। হেলেদুলে বিচে পা বাড়ালো তুল্য।

তাথৈ ঘরজুড়ে পাইচারী করছে। কখনো গ্লাস হাতে নিচ্ছে, আবারো রেখে দিচ্ছে। ব্যালকনিতে যাচ্ছে, কাচের জানালায় নখ দিয়ে আওয়াজ করে আবারো রুমে চলে আসছে। ল্যাম্পশেডের দিকে হাত বাড়াতে গিয়ে, ফোনটা নিয়ে সরে আসছে। রাগের কারন, রুমে থাকা সিনিয়র মেয়ে দুইটা সাজতে সাজতে অনেকবেশি কথা বলছে। শার্লি আলো গেছে সূর্যাস্ত দেখতে। ওকেও বলেছিলো। অনেক জোরও করেছিলো। কিন্তু ও যায়নি। রুমের মেয়েদুটো গিয়েও আবারো ফেরত এসেছে। গ্রিলপার্টির আগে সাজগুজের জন্য। ওদের কথাবার্তা সহ্য করতে না পেরে রুম থেকে বেরিয়েই আসলো তাথৈ। কিন্তু করিডরে পা রাখতেই কারো সাথে ধাক্কা লাগে ওর। তাথৈ পিছিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু চুলে টান লাগার দরুন পারে না। ঠিকঠাক তাকিয়ে খেয়াল করলো, ওর সামনে তাশদীদ। তার খয়েরী শার্টের বোতামে ওর চুল আটকেছে। তাশদীদের হাতে ব্যাগ। সেখানে চামচ দেখা যায়। শান্ত ওকে গ্রিলের জন্য ওগুলো আনতে হোটেলে পাঠিয়েছে। তাথৈকে দেখে তাশদীদ হেসে ফেলে। হাসতে হাসতে বলে,

– হুয়াট আ ফিল্মি মোমেন্ট…

তাশদীদ হাসছিলোই। আর তাথৈয়ের রাগ বাড়লো তাতে। চুল ধরে জোরে টান লাগালো ও। হাসছিলো বলে তাশদীদ ঝোঁক সামলাতে পারে না। অনেকটা উবু হয়ে পরতে গিয়েও নিজেকে সামলে নেয় ও। কিন্তু ওর চাওনি প্রসারিত হয়। কেননা তাথৈ ওরই ব্যাগ থেকে কাটাচামচ বের করে ওর বরাবর ধরে আছে। ওর বড়বড় চাওনি দেখে তাথৈ শান্তভাবে বললো,

– এখন?

তাশদীদ সোজা হয়ে দাড়ালো। কেবল দাড়ালো না। হুট করে আবারো পেছাতে লাগলো। চুলের টান সহ্য করতে না পেরে এবারো ওর সাথে পা বাড়ালো তাথৈ। কয়েকপা পিছিয়ে তাশদীদ থেমে যায়৷ আরো একদফায় ওর বুকে ধাক্কা খায় তাথৈয়ের উত্তপ্ত মস্তিষ্ক। মাথা তাশদীদের বুকে রেখেই দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলালো তাথৈ। তাশদীদ তেমনই হেসে বললো,

– এখন রোমান্টিক।

তাথৈ সরে যায়৷ একটানে বোতামে জড়িয়ে থাকা চুল ছিড়েই ফেললো রাগে। আস্তেকরে ‘আউউউচ’ শব্দ বের করলো তাশদীদ। শক্ত হয়ে দাড়ানো তাথৈকে দেখে বুঝলো, ও অনেকবেশি রেগে আছে। তাশদীদ আর পরিস্থিতি বিগড়ালো না। স্বাভাবিক গতিতে তাথৈকে পাশ কাটাতে কাটাতে বললো,

– তুমি না আসলে। রুমেরগুলোকে জলদি সি সাইডে পাঠিয়ে দাও। বলবে আমি ডেকেছি।

জবাব হারায় তাথৈ। নিরবে চেয়ে চেয়ে দেখে তাশদীদের চলে যাওয়া। তারপর রুমের দিকে তাকিয়ে, কি ভেবে বাইরে থেকে লক করে দেয় রুমের দরজা। দ্রুত পায়ে চলে আসলো বাইরে। বনফায়ার করা হয়েছে। চলছে গ্রিলপার্টির প্রস্তুতি। সুর্যাস্ত দেখে এসে সেখানে ছেলেমেয়েরা গোল হয়ে বসে গেছে। নিজেদের মতো করে আড্ডা দিচ্ছে, হাসছে, গাইছে, গিটার বাজাচ্ছে। আর সবার মাঝে সবচেয়ে ব্যস্ত মানুষটা হলো শান্ত। সবকিছু নিয়ে ছোটাছুটি করছে ও। দায়িত্ব কাধে নিয়ে একটু বেশিই অস্থিরতা দেখাচ্ছে সে। তাশদীদ হাতের জিনিসগুলো রেখে ওকে স্থির হতে বললো। শোনেনি ও। কাঠগুলো ঠিকঠাক ঠেলে দিয়ে টিটু এবার টেনে ধরলো শান্তকে। বাধ্য হয়ে বসে গেলো ও। তাথৈ আশপাশ তাকিয়ে সবাইকে দেখে নিলো। শার্লি আলো একে অপরের সাথে কথা বলছে আর হাসছে। ওকে দেখে খুশি হয়ে গেলো ওরা দুজন। এগিয়ে গিয়ে ওদের পাশে বসলো তাথৈ। তবে আড্ডায় না। মোবাইল স্ক্রল করতে লাগলো ও। কিছুসময় পর টিটু স্টিলের বাটিতে চামচ দিয়ে শব্দ তুললো। সবার চাওনি জড়ো করে বললো,

– এতো সুন্দর ভিউ! এতো সুন্দর পরিবেশ! এখানে বসে খালিমুখে গ্রিল গুজলে মজা পাবো না। কোনো খেলা হয়ে যাক?

সবাই সম্মতি দেয়। টিটু একটা বক্স দেখিয়ে বললো,

– সোজা নিয়ম। দু দলে খেলা। ছেলে ভার্সেস মেয়ে। এই বক্সের কিছু কাগজ ফাঁকা আর কিছু কাগজে গানের নাম লেখা আছে। যে ফাঁকা পাবে, সে আপাতত দর্শক। কিন্তু যে গান পাবে, তাকে সেটা অভিনয় করে বাকিদের বোঝাতে হবে। যদি কোনো মেয়ের অভিনয়ে আগে মেয়েরা ঠিক গেইস করে, তাহলে ওদের এক পয়েন্ট। আর যদি মেয়ের অভিনয়ে আমরা ছেলেরা ঠিক গেইস করি তাহলে আমাদের দুই পয়েন্ট। সেম ছেলেদের ক্ষেত্রেও। আর যদি কেউ অভিনয় করে গান বোঝাতে না পারে, তাহলে তাকে বা তার দলকে ওই গানটাই পারফর্ম করতে হবে। ব্যস!

সবাই আগ্রহ দেখালেও তাথৈ বিরক্ত হয়। উঠে যাবে বলে উদ্যতও হয়। তাশদীদ ওকে উঠতে দেখে বলে উঠলো,

– আর যারা যারা পার্টিসিপেট করবে না, কালকে তারা আমাদের ট্যুর গাইড। আজরাতে এখানকার সব জায়গা গুগল করে জেনেশুনে, কাল সেই আমাদের ঘোরাবে।

তাথৈ তীক্ষ্মচোখে তাকালো ওর দিকে। কিন্তু তাশদীদ ওরদিক তাকালোই না। বসে রইলো তাথৈ। তীব্র রাগ হলো ওর। ভাগ্যও যেনো পদেপদে ওকে বিপরীতে টানছে। একেএকে ছেলেমেয়েরা কাগজ তুলে অভিনয় করতে থাকে। খেলা সমানসমানে ছিলো। ছেলেরা ছেলেদের অভিনয় আর মেয়েরা মেয়েদের অভিনয় ধরতে পারছিলো। এক পর্যায়ে এগিয়ে যায় শান্ত। কাগজ তুলে গানের নাম দেখে খুশি হয়ে যায় ও। গানের কথা ইশারায় বুঝাতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাশদীদ চেচিয়ে বললো,

– পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে!

হৈহৈ করে ওঠে সব ছেলেরা। শান্ত খুশিতে এসে ঝাপিয়ে পরে তাশদীদের ওপর। ওর কোলে পরে থাকা অবস্থাতেই সবাই একসাথে গেয়ে ওঠে,

‘ভেবে দেখেছো কি?
তারারাও শত আলোকবর্ষ দূরে…
কতো দুরে…
তুমি আর আমি যাই ক্রমে দুরে সরে…’

শেষলাইন গাইতে গিয়ে আড়চোখে একবার শার্লির দিকে তাকালো শান্ত। মেয়েদের মাঝ থেকে এবার আলোর পালা ছিলো। খালি কাগজটা দেখে স্বস্তির দম ফেললো আলো। বসার জায়গায় ফেরত যেতে দিয়ে দুরে বসা তুল্যকে চোখে পরে ওর। তুল্য পেছনের দিকে বসে ছিলো। মুলত সিগারেট খাচ্ছিলো ও। আলো চুপচাপ গিয়ে বসে পরলো। এতোক্ষণ ধ্যান না দিলেও শার্লিকে দাড়াতে দেখে তুল্য ধোঁয়া ছাড়লো মুখ দিয়ে। একপলক তাকালো শান্তর দিকে। শান্ত স্বাভাবিক ছিলো। অথচ তুল্যর মনে হলো, শার্লিকে দেখে শান্তর প্রতিক্রিয়া আলাদা। কয়েকটানে সিগারেট শেষ করে সিগারেটটা ফেলে দেয় তুল্য। আবার নতুন একটায় আগুন ধরায়। শার্লি গিয়ে কার্ড হাতে নিলো। গানের নাম দেখে মুখটা চুপসে যায় ওর। এই গান এখন কিভাবে বর্ণনা করবে ও? ওর কি অভ্যাস আছে এসবে?বাকি মেয়েরা ওকে সাহস দিচ্ছে, গান বোঝানোর জন্য, অভিনয় করার জন্য। কিন্তু অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও গানটা বোঝাতে পারলো না শার্লি। প্রথমবার কোনো মেয়ে গান বোঝাতে পারেনি। ছেলেরা হুল্লোড় বাধিয়ে দিলো। কাগজ মুঠো করে আলোর পাশে গিয়ে বসে পরলো শার্লি। শান্ত বললো,

– চলো! অভিনয়ে তো ডাব্বা গুল! এবার গানটা কে গেয়ে শোনাবে? দ্রুত শুনিয়ে দাও, কি গান ছিলো। ফাস্ট ফাস্ট!

শার্লি মন খারাপ করে কাগজটা পাশের অন্য জুনিয়র মেয়ের দিকে বাড়িয়ে দিলো। গানটান ওর গাওয়ার ইচ্ছে নেই। জুনিয়রকে দিয়ে পার করে দিক। মেয়েটা কাগজটা হাতে নিলো। কিন্তু ও গান ধরার আগেই মাঝে বসা আলো চোখ বন্ধ করে গেয়ে উঠলো,

‘আমি আবার ক্লান্ত পথচারী
এই কাঁটার মুকুট লাগে ভারী।
গেছে জীবন দুদিকে দু’জনারই
মেনে নিলেও কি মেনে নিতে পারি?
ছুঁতে গিয়েও যেন হাতের নাগালে না পাই…’

আলো চোখ মেললো। গোটা জায়গাটা একেবারে নিশ্চুপ হয়ে গেছে ওকে গান গাইতে দেখে। শার্লি উৎফুল্ল হয়ে তাকিয়ে রইলো আলোর দিকে৷ তাথৈও যেনো নিজের চোখ-কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না। যে আলো গানের গ টাতেও কখনো ভাবনা ভাবেনি, সেই আলো গান গাইছে! ফোন বাদ দিয়ে ওউ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো আলোর দিকে। একটু থমকে ছিলো ছেলেরাও। তাশদীদ নিজেকে স্বাভাবিক করে শান্তর কাধে চড় মেরে ওকে গিটার বাজাতে বললো। শান্ত করলোও তাই। আলো মৃদ্যু হেসে গাইতে লাগলো,

‘এভাবে হেরে যাই, যেই ঘুরে তাকাই
কেমন যেন আলাদা আলাদা সব।
আলগা থেকে তাই, খসে পড়েছি প্রায়
কেমন যেন আলাদা আলাদা সব।

রাগের মাঝেও তাথৈ খুশি হলো। এখানে না আসলে আলোকে এভাবে দেখা হতো না ওর। ওদিকটায় তাকিয়ে দেখে তাশদীদ হাটু ভাক করে তাতে কনুই ঠেকিয়ে বসে। বোন ফায়ারের লালচে আলোতে ওর চেহারায় সেই সদাসর্বদার হাসিটা। শার্লি সবার আড়ালে একপলক তুল্যর দিকে চাইলো। অন্ধকারে তার চেহারা দেখা যায় না। কেবল সে যে মুখ দিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছে, তা বোঝা যায়। তুল্যর দিকে চেয়ে শার্লিও এবার গেয়ে উঠলো,

‘কুয়াশা ভেজা নামছে সিঁড়ি
অনেক নীচে জল…
সেখানে এক ফালি চাঁদ ভাসছে
করছে টলমল।

‘তাকে বাঁচাবো বলে জলে নেমেও
বাঁচাতে পারি না আর…’

লাইনদুটো আলো গেয়েছে৷ শার্লি তুল্যর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে, আলোর দিকে তাকালো। হেসে দিলো দুজনে। তারপর একসাথে গাইলো,

‘এভাবে হেরে যাই, যেই ঘুরে তাকাই
কেমন যেন আলাদা আলাদা সব।
আলগা থেকে তাই, খসে পড়েছি প্রায়
কেমন যেন আলাদা আলাদা সব।’

হাততালি আর হুল্লোড়ে মেতে উঠলো সবাই। পরেরবার তাথৈকেই উঠতে হলো। ঘাড় খানিকটা কাত করে আগ্রহ নিয়ে তাকালো তাশদীদ। তাথৈ চোখ বন্ধ করে দম নিলো। মনেমনে চাইলো, লেখাছাড়া কাগজ আসুক। কিন্তু তা হলো না। কাগজ তুলে তাতে লেখা দেখে শরীর বিষিয়ে উঠলো যেনো। সবচেয়ে বিশ্রি যেটা, ওর পরিস্থিতি কাটানোর উপায় নেই। বাধ্য হয়ে শার্লির দিকে তাকিয়ে নিজের চোখের দিকে ইশারা করলো। চোখ বন্ধ করে, তাকিয়ে, তারপর আবারো চোখ বন্ধ করে লম্বা একটা শ্বাস নিলো ও। তাশদীদ ওর অভিনয় পরখ করছিলো। এটুক দেখেই বিশ্বজয়ের হাসি হাসলো ও। যেনো তাথৈয়ের বলতে চাওয়া গানটা ওর বুঝতে এতুটুকোও কষ্ট হয়নি। ও বললো,

– ঘুম বাই ওড সিগনেচার।

আশপাশ থেকে সবাই হচকিত চোখে তাশদীদের দিকে তাকায়। তাথৈ শার্লি-আলোর প্রতি মনোযোগী ছিলো। ও ভেবেছিলো, এটুকোতেই ওরা বুঝে যাবে গানটা কি। কিন্তু তা হয়নি। তাশদীদের ঠিকঠাক আন্দাজটা শুনে থেমে যায় ও। চুপচাপ চলে আসলো সামনে থেকে। ছেলেরা বুঝে যায়, ওরাই জিতেছে। আবারো হৈচৈ শুরু করে ওরা। শান্ত তাশদীদকে ধমকে বললো,

– হোপ ব্যাটা! না বলতি! আলফেজ ডটার আজকে গান শুনাতো আমাদের!

– হ্যাঁ। সে তো গায়েক মেয়ে! তোদের গান শোনাতে উদগ্রীব হয়ে বসে আছে!

তাশদীদের জবাব শুনে শান্ত চুপ মেরে যায়। তাশদীদ আবারো বললো,

– যে মেয়ে, ও না গাওয়ায় গান সুইসাইড করতে গেলেও ও গান গাইবে না। আমি গেইস না বললে নির্ঘাত জুনিয়রকে দিয়ে গানটা গাওয়াতো ও!

– বেশ ভালোই চিনিস দেখি ম্যাডাম আলফেজকে? হু হু?

তাশদীদকে গুতানোর চেষ্টা করলো শান্ত। তাশদীদ একবিন্দু না দমে বললো,

– তুইও তো গান গাওয়ার সময় এদিকওদিক তাকাচ্ছিস। তা বলেছি আমি একবারো?

শান্ত কিছু না শোনার ভান করলো একটা৷ তাথৈ শার্লির পাশে এসে বসলো। শার্লি কিছুটা ওরদিক ঝুকে, ওকে লজ্জা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ফিসফিসিয়ে বললো,

– এই তাশদীদ ভাই তোকে একটু বেশিই বুঝতে শুরু করেছে না? হু?

তাথৈয়ের চাওনি দেখে তৎক্ষনাৎ কথার ধরন বদলালো শার্লি। চোরের মতো এদিকওদিক চেয়ে, আমতা আমতা করে বললো,

– ই্ ইয়ে, ভাই অনেক ব্রিলিয়ান্ট। অল্প হিন্টসেও ঠিকঠাক গেইস করতে পারে! বুঝিতো আমি! সবই বুঝি!

#চলবে…

#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

২৬.

‘খোলা চোখ খানা করো বন্ধ, বাতাসে ঠান্ডা গন্ধ
বয়ে বেরায়, ঘরেরও বাহিরে…
আসো ছোট্ট একটা গান করি যাতে
ঘুম পাড়ানি মাসী এসে,
পাশে বসে, হাতখানা, দেবে কপাল ভরে…
ভয় নেই আছি পাশে, হাতখানা ধরে আছি হেসে
কোলেতে আমার মাথা, তোমার…
অন্ধকার রাত নিশ্চুপ সব,
জোনাকির দল আজো জেগে আছে
তারা হয়তো অপেক্ষায় তোমার ঘুমের।
হাতে রেখে হাত দেখে ঘরি, বসে অপেক্ষা করি
কবে হবে কাল, ফুটবে সকাল…
আয় ঘুম চুম্বন দে, তার সারা কপালে
যাতে ঘুম আসে সব নিশ্চুপ, হয়ে যায়…
আয় চাঁদ মামা কাছে আয়,
যাতে অন্ধকার না হয়…
আলোমাখা কপালেতে টিপ টা দে যাতে
কিছু আলোকিত হয়।
সে যাতে ভয়, না, পায়…’

তাথৈয়ের বন্ধ চোখের কোনা বেয়ে জল গরালো। সারাদিনের সব ভীড় কলরব ঠেলে, একটুখানি স্তব্ধতা পেলে যে সুখটা অনুভূত হয়, সে সুখের কান্না। একাকীত্বের সুখ। কিন্তু ওর একাকীত্বকে ছাপিয়ে হঠাৎই কেউ বলে ওঠে,

– ব্রেকিং নিউজ! সমুদ্র দেখে গাইয়ে হয়ে গেলো তাথৈ আলফেজ! গহীন রাতে তার গান শুনে উচ্ছ্বাসিত হচ্ছে আকাশবাতাস, কল্লোলে ফেটে পরছে সুগন্ধা পয়েন্টের ঢেউয়েরা!

তাথৈ অন্যদিক ফিরে চোখের জল মুছলো। পাশ ফিরে, চেনা স্বরধারীকে দেখে অবাক হলো না ও। পরনে আকাশীরঙা শার্ট, গোটানো জিন্স, পায়ে স্যান্ডেল আর ঠোঁটে সেই চিরন্তন হাসিবহুল মানুষটা। তাশদীদ। ফজরের পর এদিকটা দেখে গিয়েছিলো তাশদীদ। রাতের দৃশ্যটা দেখবে বলেও ঠিক করে গিয়েছিলো। তাই এখন আসা। তুলনামুলক কম কোলাহল পুর্ণ জায়গাটায় অসময়ে নারী অবয়ব দেখে ওর কৌতুহল জাগাটা যেমন, ও তেমনটাই স্বাভাবিক ছিলো তাথৈকে দেখার পর। বিন্দুমাত্র অবাক হয়নি ও। কেননা ও জানে, অসময়ে একাকী সমুদ্রতীরে দাড়িয়ে থাকার সাহসটা তাথৈয়ের আছে। তাশদীদ দুহাতের তালু ঘষে বললো,

– একটা ইউটিউব চ্যানেল না থাকায় আজকে সত্যিই আফসোস হচ্ছে! থাকলে পরে তোমার গান লাইভ ব্রডকাস্ট করতাম। ‘তুমি গান গাইছো!’ এমন তোড়ফোড় নিউজ থেকে মানুষজন বঞ্চিত হলো বলো? নাহ! ব্যাপারটা ঠিক হলো না। মোটেও ঠিক হলো না!

তাশদীদ আফসোসে ‘স্তু স্তু’ আওয়াজ করলো। তাথৈয়ের রাগটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো এবারে। পরিপুর্নভাবে তাশদীদের দিক ফিরে হাতের মোবাইলটা তুলে ধরলো ও তাশদীদের সামনে। তাশদীদ ভ্রুকুচকে তাকালো। তাথৈ ক্ষিপ্ত কন্ঠে বললো,

– ইয়াহ! ক্রেডিট গোজ টু আপনার অশ্রুতপূর্ব, অদৃষ্টপূর্ব, অভূতপূর্ব সিনারিও। এসবের কথাই বলেছিলেন না আপনি? দিজ? টোটাল ওয়েস্ট অফ মাই টাইম!

ফোনটা হাতে নিলো তাশদীদ। আজকে ওরা যেখানে যেখানে ঘুরেছে, হিমছড়ি পাটুয়াটুলি, কলাতলী বিচ, সবকিছুর ছবি তাথৈয়ের ফোনে। কিন্তু ছবিগুলোতে না আছে প্রকৃতি, না আছে প্রাণ। কেবল মানুষজনের ভীড়। অবশ্য সেটাই বাস্তবতা। পর্যটকদের ভীড়ে জায়গাগুলো সবসময় ভরাট। সমুদ্রের পানিতে ভেজা, ঝড়নায় গোসল, তীরে বাইক ড্রাইভ, প্যারাশুটিং এগুলোতে কেউ নিজেকে না জড়ালে ট্রিপ কি করে উত্তেজনাপুর্ন হয়? আর তাথৈ এগুলোর কোনোটাতেই আগ্রহ দেখায়নি। তাশদীদ খেয়াল করেছে, ও কেবল রোবটের মতো সবার সাথে গিয়েছে, চুপচাপ আশপাশ দেখেছে, খাবারটা খেয়েছে। এই ওর ট্যুর! ছবিগুলো দেখতে দেখতে তাশদীদ মৃদ্যু হাসলো। তাথৈ ততোক্ষণে রাগে ফুসছে। বুকে হাত গুজে উল্টোপাশ হয়ে দাঁড়িয়েছে ও। কি ভেবে এগিয়ে গিয়ে তাথৈয়ের পিঠ ঘেষে দাড়ালো তাশদীদ। ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,

– জুতা খোলো তাথৈ।

পিঠে ছোঁয়া অনুভব করতেই চমকে ওঠে তাথৈ।
কানের ওপর উষ্ণ নিশ্বাস টের পেয়ে পিছন ফিরতে যাচ্ছিলো ও। কিন্তু পারলো না। বাধা পেলো পায়ে। পেছন থেকে তাশদীদ ওর কেডসের ওপর পারা দিয়ে দাড়িয়েছে। তাশদীদ ওর এতোটাই কাছে দাড়ানো যে, ওর পিঠ ঠেকেছে তাশদীদের বুকে। তাথৈ ঘাড় কিঞ্চিৎ ঘুরিয়ে শক্তভাবে বললো,

– হুয়াট ইজ দিস ননসেন্স নাও?

– টু মেক ইউ সেন্স আবাউট দ্যাট ওয়েস্ট অফ টাইম।

– কি করছেন টা কি! লিভ মি ড্যাম ইট!

– লিভ ইওর শুজ।

– হোয়াট দ্যা…আপনি চাইছেন আমি সিন ক্রিয়েট করি?

– সিন অলরেডি ওপরওয়ালা ক্রিয়েট করে দিয়েছে। আর সেই সিনে আপাতত আমি আর তুমি ছাড়া কেউ নেই। এখন একপাও সরতে চাইলে, জুতা খোলো।

জেদ করে ওভানেই দাড়িয়ে রইলো তাশদীদ। আজও তাথৈ হার মানলো। রাগ নিয়ে জুতা খুললো ও। পা রাখলো বালুকাময় তীরে। কোনোদিক না তাকিয়ে চলে আসতে যাবে, তাশদীদ বলে উঠলো,

– ফোনটা?

তাথৈ পেছন ফেরে। তাশদীদ একটা হাসি দিয়ে ফোনটা ওরদিক বাড়িয়ে দিলো। ফোন নেওয়ার উদ্দেশ্যে হাত বাড়ালো তাথৈ। হাসি বর্ধিত হয় তাশদীদের ঠোঁটের। নিজের পায়ের স্যান্ডেলটা খুলে একপা দু পা করে পেছোতে শুরু করে ও। তাথৈ বুঝলো, ওকে জ্বালাতে ইচ্ছে করে পেছোচ্ছে তাশদীদ। ফোন নেবার উদ্দেশ্যে কয়েকপা এগোলো তাথৈ। তাশদীদ শব্দ করে হেসে দিয়ে ছুট লাগালো এবারে। তাথৈ নিজেও আর সাতপাঁচ ভাবেনা। ছুটতে শুরু করে তাশদীদের পেছন পেছন। তাশদীদ আরেকটু তীরে এগোলো। যেটুকোতে ঢেউ এসে পা ছুইয়ে ফিরে যায়। কয়েকবার বাক নিয়ে তাথৈকে ঘোরাতে লাগলো একজায়গাতেই। রাগের বশে তাথৈ উবু হয়ে আজলাভরা পানি তুলে ছুড়ে মারলো তাশদীদকে। তাশদীদ যেনো আরো উদ্দীপনা পায়। ওউ পানির ছিট লাগালো তাথৈকে। তাথৈ হাত দিয়ে নিজেকে আড়ালের চেষ্টা করতে থাকে। সাথে তাশদীদকেও ভেজানোর চেষ্টা করতে থাকে। সমুদ্রতীরের আবছা আলোতে দেখা যায় একজোড়া ছায়া মানব-মানবী ছুটছে, একে ওপরকে ভেজাচ্ছে। তাদের দুরন্তপনার সঙ্গ দিচ্ছে মিটমিটিয়ে আলোভরা আকাশ, শনশনে আওয়াজে জেলেনৌকার পাল দোলানো বাতাস, আর গর্জন করে তীরে আছড়ে পরা ঢেউ।

তুল্য কানে হেডফোন দিয়ে তীর দিয়ে হাটছিলো। মুলত মোবাইলে তোলা আজকের ছবিগুলো দেখছিলো ও। ছবি বলতে, লুকিয়ে চুরিয়ে তোলা শার্লির ছবি৷ সকালবেলা হিমছড়ি ঝর্ণার উদ্দেশ্যে যখন ও হোটেলের সামনে দাড়িয়ে ছিলো, কালো হুডি-প্যান্ট পরিহিত, মাথায় কাপড় বাধা শার্লিকে দেখে কিছু তো একটা হয়েছিলো ওর৷ ঘোরাঘুরির পুরোটা সময় ও শার্লির আড়ালে আড়ালে থেকে ওকে দেখেছে, ছবি তুলেছে। ছবিগুলো দেখতে দেখতে আপনামনে হাসছিলো তুল্য৷ হঠাৎই তাথৈয়ের উল্লাসী আওয়াজ কানে আসে ওর। ফোন থেকে চোখ তুলে দুরে তাকালো তুল্য৷ আর তাতে যা দেখলো, ওর নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছিলো না ওর। দুপা এগিয়ে, চোখ ছোটছোট করে আবারো পরখ করলো দৃশ্য৷ না! ও ভুল দেখেনি। তাথৈ সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে ছোটাছুটি করছে। হাসছে৷ একটু সময় নিয়ে পাশের পুরুষালী অবয়বটাকেও চিনে নিলো তুল্য। ওটা তাশদীদ। তুল্যর ঠোঁটে হাসি ফোটে। কিন্তু চোখে রয়ে যায় বিস্ময়ের রেশ। কি ভেবে, উল্টোদিকে পা বাড়ালো ও।

কয়েকপা দুরে তুল্যকে দেখে দৌড়ের গতি কমে আসে আলোর। থেমে গিয়ে ভয়ে ও শুকনো ঢোক গিললো একটা। রাতের খাবার সেরে তাথৈ বলেছিলো একটু দরকার আছে ওর, বেরোবে। এরপর তাথৈ আর রুমে ফেরেনি। ওরা ক্লান্ত ছিলো, কখন ঘুমিয়ে গেছে টেরই পায়নি। কিন্তু ঘুম ভাঙার পর তাথৈকে না দেখে ভয় পেয়ে যায় আলো। শার্লিকে ডেকে হোটেলে খুজতে বলে আলো নিজেই বিচে চলে এসেছে তাথৈকে খুজতে। আর কাউকে জানানোর সাহস হয়নি আলোর। ও জানে, তুল্য তাথৈকে যতোটা জ্বালায়, আড়ালে আড়ালে তারচেয়ে বেশি যত্নও করে। এসময় তাথৈ হোটেলে রুমে নেই, সেটা শুনলে আকাশপাতাল একে করে দিতে তুল্য দুবার ভাববে না। আলোকে অসময়ে বিচে দেখে, ওমন ভয় পেতে দেখে তুল্য বললো,

– এতোরাতে এখানে কি?

– ও্ ওই আসলে…

– তোমাকে ভীতু ভেবেছিলাম। এই এতোরাতে একা একটা মেয়ে হোটেল থেকে বেরিয়েছো, এতো সাহস কোথায় পেলে তুমি?

আলোর ভয় বাড়তে থাকে। যে ছেলে ওকে বেরোনো নিয়ে এতো কথা শোনাচ্ছে, তাথৈ ঘরে নেই জানলে আর কি কি বলবে ভাবতেই ভয়টা তরতর করে বাড়তে লাগলো ওর। কিন্তু না বললে তো তাথৈকে খুজে পাওয়া যাবে না। এখন দেখা যখন হয়েছেই, আলো সিদ্ধান্ত নিলো তুল্যকে সত্যটা বলবে। সাহস সঞ্চার করে কোনোমতে বললো,

– ত্ তাথৈ রুমে নেই তুল্য। আমি ওকে খুজতেই বেরিয়েছি।

বলে দিয়ে তুল্যর প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলো আলো। কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে চুপ রইলো তুল্য। স্বাভাবিক গলায় বললো,

– আছে ও ঠিকঠাক। তুমি হোটেলে ফিরে যাও।

স্বস্তির শ্বাস ফেললো আলো। কিছু একটা মনে পরতেই আবারো বললো,

– কোথায় গেছে ও? তোমার কথা হয়েছে ওর সাথে?

– আমার বোনের টেককেয়ার আমি করে নেবো। তোমাকে এতো ভাবতে হবে না।

আলো ভেতরেভেতরে তীব্র কষ্ট অনুভব করলেও চেহারায় তা প্রকাশ করলো না। মৃদ্যু হেসে মাথা নিচু করে নিলো ও। অকস্মাৎ হাসির আওয়াজ কানে আসে ওর। আলো সেদিকে লক্ষ্য করতে যাবে, তার আগেই তুল্য ওর হাত ধরে ফেললো। ওকে নিয়ে হাটা লাগিয়ে বললো,

– অনেক রাত হয়েছে। চলো এখান থেকে।

সবটুকো মনখারাপ সুখের পায়রা হয়ে আলোর মনজুড়ে উড়তে শুরু করে দেয় যেনো। তুল্য সামনে থেকে ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, পেছন থেকে ওরদিক একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে পা বাড়িয়েছে আলো। ওর বিশ্বাস হয় না, তুল্যর এইটুকো ছোঁয়া ওর ভাগ্যে ছিলো। সমুদ্রপাড়ের কোনো এক ঝুপড়ি দোকান থেকে টুংটাং আওয়াজ ভেসে আসছে। আলোর বেখেয়ালী মনটাও হয়তো তার তালেতালে বলছে, ‘সময় তুমি থেমে যাও। সময় তুমি থেমে যাও।’

তাশদীদ তাথৈয়ের ছোড়া পানি থেকে নিজেকে বাচানোর চেষ্টা করছিলো। কিন্তু অকস্মাৎ ওর চোখে পরে, তাথৈ হাসছে। ও ভুলে গেছে, ও ওর পেছনে ছুটছিলো, রাগ নিয়ে ছুটছিলো। গায়ে আসা ছিটেফোটা পানিকনার শিরশিরে অনুভূতিতে তাথৈ হাসতে শুরু করেছে। এখন সে রাগ না, উল্লাসে তাশদীদকে পানি ছুড়ছে। তীরে আসা ঢেউয়ের সাথে ছোটাছুটি করছে। কোথাও ঢেউ নেমে গেলে, ঝিনুক খুজতে সেদিকে দৌড়াচ্ছে। তাশদীদ থামলো। কিঞ্চিৎ ঘাড় বাকিয়ে, কোমড়ে দুহাত রেখে চেয়ে রইলো উচ্ছ্বল তাথৈয়ের দিকে। তাথৈয়ের সাদা রঙের কুর্তার নিজের দিকে পানির ছিটেফোটা, টাইট জিন্সটা ভাজ দিয়ে গিরার ওপর অবদি ওঠানো, সেটাও কিছুটা ভিজে গেছে, ফর্সা পা জোড়ায় কাদাবালি লেগেছে। তাথৈ কিছু একটা পেয়ে উত্তেজিত হয়ে গেছে। দুহাতের আজলায় সেটা নিয়ে ছুটে আসলো ও তাশদীদকে দেখাতে। কিন্তু তাশদীদের কাছে আসতে আসতে আঙুলের ফাঁকে পরে যায় পানিটুকো। তাথৈ ঠোট উল্টে হয়ে আবারো ছুটলো সমুদ্রের দিকে। সেখানে গিয়ে আবারো মুঠোতে পানি নিয়ে ইশারায় ডাকলো তাশদীদকে। তাশদীদ হাসলো৷ মৃদ্যুবেগে দৌড়ে গিয়ে দেখে তাথৈয়ের হাতের পানিটুকো জ্বলছে। তাথৈ উল্লাসে বললো,

– সুন্দর না?

তাশদীদের চাওনি প্রসারিত হয়। তাথৈকে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বুঝিয়ে, ঢেউগুলো দেখতে লাগলো ও। বেশ কয়েকটা ঢেউ পরপর এমন উজ্জ্বল ঢেউ তীরে আসছে। তাশদীদ আশপাশ তাকিয়ে দেখলো, লোকজনের আনাগোনা নেই। পানি নেওয়ার মতো পলিথিন, বোতলজাতীয় কিছু খুজলো ও। পেলো না। সারাদিনের ময়লা সব সরিয়ে ফেলা হয়েছে তীর থেকে। তাশদীদ তাথৈয়ের দিকে তাকিয়ে দেখে, সে কেবল ঢেউয়ের সাথে খেলতে ব্যস্ত। দিনদুনিয়া সব ভুলে গেছে সে। মুচকি হেসে নিজের ফোনে ওর ছবি তুললো কয়েকটা। ছবিগুলোতে তাথৈ যেনো পানি না, কোনো আলোকীয় বিচ্ছুরন ছুড়ে মারছে। তাশদীদ গিয়ে তাথৈয়ের কেডস নিয়ে আসলো এবারে। কিছু পানি, আর বালি কেডসে তুলে তাথৈয়ের সাথে নিজেও উজ্জ্বল ঢেউয়ের অপেক্ষা করতে লাগলো। তিনচারটা ঢেউয়ের পর আর উজ্জ্বল ঢেউ আসছিলো না। তাথৈ উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিলো। তাশদীদ ওর অপেক্ষা দেখে বললো,

– আর আসবে না।

– কিন্তু…

– অনেক রাত হয়েছে তাথৈ। হোটেলে ফিরবে চলো।

তাথৈ চকিত চোখে পাশে তাকালো। যেনো এতোক্ষণে হুশে ফিরেছে ও। তাশদীদ বেশ স্বাভাবিকভাবে ওর দিকে তাকিয়ে। শশব্যস্তের মতো চতুর্দিকে চোখ বুলালো তাথৈ। কোথায় ছিলো ও? কোথায় এসেছে? কেনো এসেছে? এখানে কি করছিলো ও? বিস্ময়ে বললো,

– এ্ এসব…এসব কি ছিলো?

– বায়োলুমিনেসেন্স।

তাথৈ নিজের কপাল চেপে ধরে। ও জানে বাংলাদেশে বায়োলুমিনেসেন্স হয় না। অথচ আজ ও যা দেখলো…তড়িঘড়ি করে প্যান্টের পকেট চেইক করে ও। তাশদীদ একপা এগিয়ে ওর দিকে ওর ফোনটা বাড়িয়ে দিলো। তাথৈ হতাশ হয়ে ‘শিট’ উচ্চারন করলো। তাশদীদ বললো,

– ছবিতে ক্যাপচার করলেই মোমেন্ট আনফরগেটএবল হয়ে যায় না তাথৈ। পারিপার্শ্বিক অনুভব করতে শেখো। অনুভবেই সর্বোচ্চ সুখ।

তাথৈ চুপ করে তাকিয়ে রইলো তাশদীদের দিকে। তাশদীদ ওর খালি পায়ের দিকে তাকালো। সমুদ্রের ঢেউ ওর পা ছুয়ে দিয়ে যাচ্ছে। তাশদীদ মুচকি হেসে বললো,

– চোখ বন্ধ করে এই ঢেউয়ের ছোঁয়া অনুভব করো, বড়বড় শ্বাস নাও এই স্নিগ্ধ-শীতল বাতাসে, ঢেউয়ের গুর্জন শোনার চেষ্টা করো। এন্ড ট্রাস্ট মি, তোমার সব প্রশ্নের জবাব সেখানে তাথৈ। এ সবটাই তোমার জন্য অভূতপুর্ব, অদৃষ্টপূর্ব, অশ্রুতপূর্ব।

তাথৈ তেমনই নিস্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। তাশদীদ এগিয়ে এসে ওর চোখের সামনে হাত বুলালো। মন্ত্রপুতের মতো চোখ বন্ধ করে নেয় তাথৈ। ওর হাত ধরে ওকে সমুদ্রমুখী করে দাড় করিয়ে তাশদীদ হাত ছেড়ে দুলো ওর। নিজেও বুকে দুহাত গুজলো। একদৃষ্টিতে চেয়ে রইলো বিশাল জলরাশির দিকে।
তাথৈ চোখ বন্ধ করে আছে। হিমশীতল বাতাস গা ছুইয়ে দিচ্ছে ওর। লবনাক্ত জল ওর পা ছুইয়ে দিচ্ছে। বন্ধ চোখজোড়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো জবাব পেয়ে মৃদ্যু কেপে উঠলো তাথৈ। তৎক্ষনাৎ চোখে খুলে তাশদীদের দিকে তাকালো ও। কি হলো, নিজেকে আর স্থির রাখা হয়ে উঠলো না ওর। একপা দুপা পিছিয়ে, ও দৌড় লাগালো হোটেলের দিকে। তাশদীদ ওর চলে যাওয়া দেখলো। তারপর নিচে থাকা তাথৈয়ের কেডসজোড়া হাতে নিয়ে, নিজেও পা বাড়ালো হোটেলের দিকে।

#চলবে…

#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

২৭.

হোটেলের রুমের দেয়াল ঘড়িটায় পাঁচটা বায়ান্ন বাজছে। তাথৈ দুইসিটের সোফাটার ওপর লম্বালম্বিভাবে বসে। সোফার এক হাতলের ওপর হাটু ভাঁজ ফেলে, আরেক হাতলে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে আছে ও৷ পাশের বিছানা দুইটায় আলো-শার্লি, সিনিয়র মেয়েদুইটা ঘুমাচ্ছে। হোটেলে ফিরে ও সেইযে থমকে বসে আছে, আলো-শার্লির কোনো কথার কোনো জবাব দেয়নি। ওভাবেই সোফায় বসে ছিলো। ওর নিরবতার কাছে হার মেনে বসে থাকতে থাকতে এলোমেলেভাবেই ঘুমিয়ে গেছে আলো-শার্লি। সারাটারাত ঘুম নামেনি তাথৈয়ের চোখের পাতায়। ওর পায়ে এখনো কাদাবালি লেগে আছে। সেদিকেই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ও। পাশের টি টেবিলে ফোন জ্বলতে দেখে, বেখেয়ালিপণায় কল রিসিভ করে ফোন কানে ধরে ও। ওপাশ থেকে স্পষ্টগলায় ভেসে আসে,

– হেই? জেগে আছো?

তাশদীদের কন্ঠ শুনে চমকে ওঠে তাথৈ। ফোন কান থেমে নামিয়ে অচেনা নাম্বারটা দেখে নেয়। ওপাশ থেকে তাশদীদ আবারো ‘হ্যালো!’ বলে। তাথৈ ফোন কানে নিয়ে নোয়ানো স্বরে বললো,

– হু্ হুজ দেয়ার?

– তাশদীদ ওয়াসীর। আব্ তুমি একটু ব্যালকনিতে আসতে পারবে?

তাথৈ দু সেকেন্ড সময় নিয়ে ছুট লাগালো ব্যালকনিতে। চারতলা থেকে নিচে তাকালো। তখনো ভোরের আলো ফোটেনি। ইটবিছানো সরু রাস্তার দু পাশের গোলাকার লাইটগুলোতে কালো-খয়েরী হুডি পরিহিত মানুষটাকে চিনতে সময় লাগেনি তাথৈয়ের। ওখানে তাশদীদ দাড়ানো। একহাতে ওর কেডসজোড়া, আরেকহাতে কানে ফোন ধরে আছে সে। তাথৈয়ের অবয়ব দেখতে পেয়ে তাশদীদ হাতের জুতা নাড়ালো। আগেররাতে জুতাজোড়া নিজের রুমে নিয়ে যায়নি ও। হোটেলের বাইরেই রেখেছিলো। সকালবেলা বেরোনোর আগে শান্তর কাছে থাকা লিস্ট থেকে তাথৈয়ের নম্বর নিয়ে বেরিয়েছে। জুতা ফেরত নিয়ে যেতে বলবে বলে। ফোনে বললো,

– তোমার জুতা।

তাথৈ জবাব দিলো না। কান থেকে ফোন নামিয়ে পা বাড়ালো রুমের বাইরে বেরোবে বলে। রীতিমতো ছুটলো ও। লিফট আসতে দেরি করছিলো বলে সিড়ি বেয়েই নামতে শুরু করে দেয় তাথৈ। মাত্র কয়েকমিনিটে চারতলার সিড়ি বেয়ে নামে ও। হোটেলের বাইরে তাশদীদের সামনে দাড়ালো। তাশদীদ ওকে নিচে দেখে অবাক হয়। জবাব দেয়নি বলে ফোন কেটে নিজের কাজে যেতে উদ্যত হচ্ছিলো ও। কিন্তু এখানে তাথৈ ওর সামনে। অবাক হয়ে আপাদমস্তক দেখে নিলো ও তাথৈকে। ভোরের শীতের মধ্যেও তাথৈয়ের শরীরে কোনোরকম শীতবস্ত্র নেই। সেই গতরাতের সাদা কুর্তা, গিরার ওপর গুটানো জিন্স, এলোমেলো চুল। পায়ে জুতাটা নেই, বরং শুকনো কাদামাটি লেগে আছে। খালি পায়ে এই শীতল মেঝেতে হাটাহাটি করছে ও। কিন্তু সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই তাথৈয়ের। তাশদীদ জুতাটা বাড়িয়ে দিলো ওর দিকে। জুতা হাতে নিয়ে চলে আসার জন্য পেছন ফেরে তাথৈ। পেছন থেকে তাশদীদ বলে উঠলো,

– সূর্যোদয় দেখতে যাবে?

তাথৈ পরিপূর্ণভাবে পেছন ফিরতে দেখে প্রথমবার তাশদীদ দমে যায়। কথাটা বলে নিজেও অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছে ও। কাল রাতে তাথৈকে একপ্রকার জোরই করেছিলো ও। রাত পোহাতে না পোহাতে ওকে আবারো এভাবে বলাটা হয় ঠিক হলো না। তাশদীদকে অবাক করে দিয়ে তাথৈ দুবার মাথা ওপরনিচ করলো। মানে ও যাবে। দৃশ্যটা তাশদীদের বিশ্বাস হলো না। আশপাশ তাকিয়ে নিজের ভুল ভাঙাতে দু দন্ড সময় নিলো ও। তারপর আবারো তাকালো তাথৈয়ের দিকে। লাভ হয়নি। তাথৈয়ের দৃঢ়তা বলে দিচ্ছে, ও যাবে ওর সঙ্গে। তাশদীদ গলা ঝেরে নিজেকে স্বাভাবিক করলো। কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে বললো,

– আব…বাইরে ঠান্ডা…

– আমার শীত করছে না!

তৎক্ষনাৎ জবাব দেয় তাথৈ। তাশদীদ কথা বাড়ানোকে সমাচীন মনে করলো না। এই মেয়েটার উৎসাহকে নষ্ট করতে ইচ্ছে করছে না ওর। ঘাড় নাড়িয়ে বুঝালো, চলো। তাথৈয়ের চেহারাজুড়ে খুশি নেমে আসে৷ শব্দহীন হেসে জুতাজোড়া পরে নেয় ও। দ্রুতপদে এগোয় বাইরের দিকে। তাশদীদ পেছন থেকে ওকে পরখ করতে করতে এগোলো। তাথৈয়ের মাথায় এখন আরকিছুই নেই। ডানহাতে বা হাতের কনুই ধরে দ্রুতপদে সমুদ্রতীরের দিকে যাচ্ছে ও। হাটছে না। বরং মৃদ্যু গতিতে দৌড়াচ্ছে। যেনো জনম জনম হলো ওর সমুদ্রের সূর্যোদয় দেখার আগ্রহ। অথচ গতকাল অবদি এখানকার কোনো বিষয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিলো না ওর। সমুদ্রতীরের দিকে কিছুটা এগিয়ে তাথৈয়ের হাত ধরলো তাশদীদ। ওকে থামিয়ে দিয়ে বললো,

– এদিকে না।

– তাহলে?

তাশদীদ আঙুল দিয়ে কিছুটা দুরের পাহাড়ের দিকে ইশারা করলো। তাথৈ কিছুটা বিস্ময় নিয়ে বললো,

– ওখানে? কিভাবে?

তাশদীদ আশপাশে তাকালো। সুর্যোদয় দেখতে তীরে অনেকেই এসেছে। পাশেই এক ডাব বিক্রেতা সাইকেলে করে ডাব ঝুলিয়ে রেখেছে। কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা ডাবগুলো। মানে এখনো দোকান খোলেনি সে। মাঝবয়সী দোকানদার বসেবসে মোবাইলে কিছু একটা দেখছে । তাশদীদ এগিয়ে গেলো। দোকানদারের সামনের টুলটায় কাছে হাজার টাকার পাঁচটা নোট রাখলো। তারপর ডাবগুলো সাইকেল থেকে নামাতে নামতে বললো,

– ঘন্টা খানেকের মধ্যে আসছি।

দোকানদার ফোন থেকে চোখ তুলে তাশদীদকে থামাতে উদ্যত হচ্ছিলো। কিন্তু ওর কথা শুনে থেমে যায়। তাশদীদ সাইকেল ঠেলে নিয়ে তাথৈয়ের দিকে এগোলো। তারপর চড়ে বসে ওকে ইশারা করলো পেছনে বসে পরার জন্য। তাথৈ অপ্রস্তুত হয়ে বললো,

– আমার সাইকেলে চড়ার অভ্যাস নেই।

তাশদীদ এবারে ওর হাত ধরে ওকে সাইকেলের সামনে বসালো। তারপর সাইকেল চালাতে শুরু করলো। কিছুটা চকিত হলেও নিজেকে সামলে নিলো তাথৈ। সামনের হাতল ধরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাশদীদের দিকে চেয়ে রইলো ও। আবছা আলোতে তাশদীদের গালের খোচাখোচা দাড়িগুলো বোঝা যায়। হুডির গলার দিকটা দিয়ে ভেতরের সাদা টিশার্টটা কিঞ্চিৎ দেখা যাচ্ছে ওর। মুখে ‘শীত লাগছে না’ বললেও শীত করছিলো তাথৈয়ের। সাইকেলে বসার পর গতির কারনে শীতটা বাড়ার কথা। কিন্তু বাড়লো না। জানুয়ারীর ভোরের শীতলতা, সমুদ্রপাড়ের গা হিম করা বাতাস আজ হার মেনেছে। তাশদীদ ওয়াসীরের দু হাতের ভাজ, বুকের মাঝখানটার উষ্ণতার কাছে হার মেনেছে সমস্ত শীতলতা, সমস্ত হিম। তাশদীদের দেওয়া নোটগুলো গুনতে গুনতে ডাব বিক্রেতা হাসলেন। সমুদ্র তাকে নিত্যনতুন প্রেম দেখায়। তবে আজকের প্রেক্ষাপট কিছুটা আলাদা। সেখানে কেউ প্রেম জড়িয়ে সূর্যোদয়ের জন্য অপেক্ষা করছে না। বরং আলোছায়ার মিলনরেখায় দুজন মানব মানবী গতিশীল। সাইকেলে করে যেনো সুন্দরতম ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে তারা।
বেশ দ্রুতগতিতে সাইকেল চালিয়ে একটা পাহাড়ের ঢালুতে থামলো তাশদীদ। সাইকেল থেকে নেমে তাথৈকে বললো,

– ওপরে উঠতে হবে। দ্রুত চলো!

তাশদীদ রাস্তাটা বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করে। আলো বাড়তে শুরু করেছে চারপাশে। সূর্যোদয় হতে খুববেশি দেরি নেই। তাথৈও ওর পেছনপেছন পাহাড় চরছে। কিন্তু কিছুটা উঠতেই হাপিয়ে যায় ও। হাটুতে দুহাত রেখে উবু হয়ে হাপাতে থাকে। সামনে তাকিয়ে দেখে তাশদীদ পরিপূর্ণ স্বাভাবিক। যেনো এভাবে দৈনিক পাহাড়ে চড়ে অভ্যস্ত ও। তাশদীদ তাথৈকে দেখতে পেছন ফিরলো। ওকে ওমন হাপাতে দেখে হেসে দিয়ে বললো,

– কি মেমসাহেব? হাপিয়ে গেছেন? অর্ধেক পথও তো আসেননি!

তাথৈ দম নেয়। আবারো ওপরে উঠতে থাকে। ঢালুটার দু পাশে হাটু অবদি বড়বড় ঘাস, জঙ্গলের মতো। বোঝাই যাচ্ছে মানুষের যাতায়াতের জন্য পায়ের নিচে কোনো ঘাস গজায়নি। পাহাড়ের চূড়া দেখে শুকনো ঢোকে গলা ভেজালো তাথৈ। নিজেকে নিয়ে অতিকষ্টে পৌছালো চূড়াতে। আশপাশ না দেখে হাঁপাচ্ছিলো ও। তাশদীদ কিছুটা কিনারায় এগিয়ে গেলো। সূর্যোদয়কে ঘিরে মানুষ এতো উত্তেজনা নিয়ে বসে থাক। অথচ এটুকো অনুধাবন করে না, সূর্যোদয়ের আগমুহূর্তটাও ঠিক ততোটাই সুন্দর। তাথৈ ক্লান্ত চাওনিতে ডানে বামে দেখলো। দু পাশে কেবল সবুজ পাহাড়। কোনোরুপ আকাঙ্ক্ষা না রেখে সামনে তাকালো তাথৈ। কিন্তু তৎক্ষনাৎ সমস্ত ক্লান্তি উবে গেলো ওর। সামনে যতোদুর চোখ যায়, দৃষ্টির কোনো সীমারেখা নেই। আকাশে ভাসা ছাইরঙা মেঘের দল, অসীমে জল-আকাশের মিলন, সেখানেই আলোর প্রথম রশ্নির আভা, পাহাড়ের নিচেই ঢেউ আছড়ানো বিস্তীর্ণ তীর, আর ওর থেকে দুহাত দুরুত্বে উল্টোপাশ হয়ে দাড়ানো এক পুরুষালি অবয়ব। তাশদীদ হুডির পকেটে দুহাত গুজে দুরে আকাশ দেখায় মনোযোগী। মন্ত্রপুতের মতো একপা দুপা করে এগোলো তাথৈ। তাশদীদ বললো,

– দু মিনিট ওয়েট করো। অন্য কোনো দিক তাকিও না।

তাথৈয়ের কানে গেলো কথাটা। কিন্তু তবুও যেনো ও শুনতে পেলো না। কিছুটা পেছনে দাড়িয়ে একদৃষ্টিতে তাশদীদের দিকেই তাকিয়ে রইলো ও। ওর চোখ অন্য কোনোদিক তাকাতে আগ্রহী না, ওর মন-মস্তিষ্ক কেউই আজ ওকে অন্যকোনো দিকে তাকানোর অনুমতি ওকে দেয়নি। তাশদীদ আকাশে তাকিয়ে পাঁচ থেকে উল্টোদিকে গুনতে শুরু করলো। ও এক বলাতেই সূর্যের প্রথম রশ্নি এসে পরলো ওর চোখেমুখে। চেহারাজুড়ে লালচে রোদ নিয়ে দাড়ানে সে হাসোজ্জল মানবের চেহারার দিকে তাথৈ মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে রইলো। সময় পার হয়ে যায়। তাশদীদ সামনে থেকে চোখ সরায়। তাথৈয়ের দিক ফিরে ওকে ইশারায় বুঝালো, ‘দেখেছো?’
ধ্যান ভাঙে তাথৈয়ের। সামনে তাকিয়ে দেখে সূর্যোদয় শেষ। সকালের আলেকরশ্মিটা তাশদীদের চেহারায় দেখেছে ও। তাশদীদ ওরা জবাবের জন্য অপেক্ষা করলো না। আবারো ওর হাত ধরে ছুট লাগিয়ে বললো,

– চলো আরেকটা জিনিস!

নিজেকে সামলে তাশদীদের সাথে দৌড়ালো তাথৈ। পাশের টিলাটার মাঝে একটুখানি খাদের মতো জায়গা। তাশদীদ তাথৈয়ের হাত ছেড়ে নিজে আগে সেখানে নামলো। তারপর আবারো হাত বাড়িয়ে দিলো তাথৈয়ের দিকে। ওর হাত ধরে নিচে নামে তাথৈ। তাশদীদ আঙুল দিয়ে কিছু একটা দেখালো ওকে। আঙুলের দিক অনুসরণ করে সেদিকে তাকালো তাথৈ। কিন্তু আলোর ঝলকানিতে তৎক্ষনাৎ চোখ সরিয়ে নিতে বাধ্য হলো ও। চোখ পিটপিটিয়ে আবারো ওপরে তাকিয়ে দেখে ঢালুর সামনে কয়েকটা ছোটবড় টিলা। আর সবচেয়ে উচু টিলার ওপরে একটা সোনালু ফুলের গাছ। পুরো গাছটায় হলুদ ফুল ঝুলছে। উপরন্তু সকালের সোনারঙা রোদ। সব মিলিয়ে গাছটা অপার্থিব এক সৌন্দর্য তৈরী করে দিয়েছে যেনো। আবারো আলোর প্রতিফল চোখে লাগে তাথৈয়ের। ও খেয়াল করলো সোনালুর গাছটার ফুলের সাথে কিনারার ডালে কাচসদৃশও কিছু ঝুলছে। ঠিকঠাক দেখার পর বুঝলো, ওখানে দশবারোটা আয়না ঝুলানো। গোলাকার, চারপাশ কারুকাজকরা। দুর থেকে দেখেই বোঝা যায়, ওগুলো উচুনিচু করে ঝুলানো। কিন্তু বুনো গাছে কেউ এভাবে কেনো আয়না ঝুলাবে? কিছুটা অবাক হয়ে তাশদীদের দিকে তাকালো তাথৈ। সে মুগ্ধ চোখে ফুলে আবৃত গাছটার দিকে তাকিয়ে। তাশদীদ বললো,

– এটা কিন্তু নতুন কোনো জায়গা না। এটাও হিমছড়ির একাংশ। কালকে সবাই যখন টিকিট কেটে ঝর্ণা আর সমুদ্রের ওভারভিউ দেখা নিয়ে ব্যস্ত ছিলো, এই গাছটার ঝুলন্ত কলিগুলো আমার নজর কেড়েছিলো। আমি বিকেলেও এদিকটায় এসেছিলাম। তখনও গাছের ফুল ফোটেনি। হাটাহাটি করে দেখলাম গাছের ওই পয়েন্টটা থেকে সূর্যোদয়ের তেমন একটা ভালো ভিউ পাবো না। তাছাড়া এদিকটা ওয়ার্নিং এরিয়া। ভোরবেলা ওখানে ওঠাও কিছুটা রিস্কি হয়ে যায়। দেন আই থট, ওখান থেকে সূর্যোদয়ের ভিউ ঠিকঠাক না আসতে পারে। কিন্তু আমি সূর্যোদয়ের ভিউ ওখানে এ্যাড করতেই পারি। ব্যস! বিচের দোকান থেকে আয়নাগুলো কিনে এনে ঝুলিয়ে দিলাম। একটু ক্যালকুলেট করে রিফ্লেক্ট কোথায় পাবো সেটাও বুঝে গেলাম। এন্ড হেয়ার’স্ দ্য রেজাল্ট!

তাথৈ কথা বলা ভুলে যায়। একটা মানুষের ভাবনা ঠিক কতোটা সুন্দর হলে কেউ এভাবে প্রকৃতিকেও সাজাতে পারে, আন্দাজ আসে না ওর। তাশদীদ হাসিমুখে ওরদিক ফিরলো। কিছুটা ঝুকে দাড়িয়ে বললো,

– যাবে ওখানে?

তাথৈ তখনো স্তব্ধ। ঠিক সে সময়েই ফোন বেজে ওঠে তাশদীদের। ফোন বের করে স্ক্রিনে রিংকির নাম দেখে ও ছোট্ট শ্বাস ফেললো একটা। রিসিভ করে বললো,

– হ্যাঁ বলো।

– কেমন আছেন তাশদীদ ভাই?

– আলহামদুলিল্লাহ। তুমি কেমন আছো? ও বাসার সব?

– জ্বি সবাই ভালো। আ্ আপনি এখন কোথায় তাশদীদ ভাই? হোটেলে নাকি বাইরে?

তাথৈয়ের দিকে তাকালো তাশদীদ। ওরদিকে তাকিয়ে থেকেই জবাব দিলো,

– বাইরে। এক জুনিয়রকে নিয়ে সূর্যোদয় দেখতে এসেছি। আহ্!

পাথরে পা ফসকে পরে যাওয়ার ভঙিমা করে আওয়াজটা করলো তাশদীদ। ওকে পরে যেতে দেখে তাথৈ একটু ব্যস্তভাবেই বলে উঠলো,

– সামলে…

মেয়েলি আওয়াজ শুনে ফোন কান থেকে ফোন নামিয়ে নিলো রিংকি। অকস্মাৎ বিছানায় বসা থেকে ফ্লোরে ছুড়ে মারলো ফোনটা। দামী ফোনটা নিচে পরে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। জলভরা চোখে, দাতে দাত চেপে, সামনেপেছনে হেলেদুলে নিজেকে সংবরনের চেষ্টা চালালো রিংকি। বরবেশে তাশদীদ, ঘোমটা দেওয়া বউ সাজের অন্য আরেকটা মেয়ে, আর তার পাশে ও নিজে। এমন দুঃস্বপ্ন দেখে সকালের ঘুমটা ভেঙেছে ওর। অস্থির লাগছিলো। তাই তখনতখন তাশদীদকে কল করেছে ও। ও জানে এবং মানে, তাশদীদের কোনো মেয়ের সাথে ঘনিষ্ঠতা নেই। আলাদাকরে একটা বান্ধবীর সাথে কোনোদিন দেখা যায়নি ওকে। সে মানুষটা ‘একজন জুনিয়র’ বললে সেটা নিসন্দেহে কোনো ছেলেই হবে। নিশ্চিত ছিলো রিংকি। কিন্তু তাথৈয়ের আওয়াজ ওর সব ধারণাকে উল্টেপাল্টে দিয়েছে। তাশদীদ ভাইয়ের সাথে একাকী কোনো মেয়ে থাকবে কেনো? সে তো শুধু ওকে গুরুত্ব দেবে! ওকে নিয়ে পৃথিবীর সব সৌন্দর্য দেখবে! ও বাদে অন্যকোনো মেয়েকে কেনো আলাদাকরে গুরুত্ব দেবে তাশদীদ? কেনো?

#চলবে…