খেরোখাতার ছেঁড়াপাতা পর্ব-০২

0
120

#খেরোখাতার_ছেঁড়াপাতা — ২

মিয়া সাবে কামডা করলো কি? ছিঃ ছিঃ হ্যার মাইয়ার বয়সী মাইয়া! হের একটুও কইলজা কাঁপলো না?
মনেমনে গালি দেয় তমিজ **লা **রামীর বাচ্চা।

বেশ ফুরফুরে মেজাজে হেঁটে চলেছেন মিয়া সাব, পেছনে তমিজ সর্দার, মনে মনে ভীষণ খুশী কতদিনের খায়েশ আজ মিটলো। মনেমনে কথা বলে… অনেকদিন যাবত ধৈর্য ধইরা থাইকা আর পারলাম না, যাক! হাতের মুঠোয় আনতে পারলে হয়?
ভয় তো অনেক দেখাইয়া আসলাম, কারো কাছে বললে জানে মেরে ফেলবো, ভিটাছাড়া করবো, পথের ফকির করবো, হুমকিতে কাজ হলেই হয়?
আর বললেই কি? কেউ বিশ্বাস করবে না, তমিজ ছাড়া কেউ সাক্ষী নাই।
নাহ!! মনে হয় না কাউকে বলবে? কচিকাঁচা মাইয়া কত্ত আর বয়স ১৭/১৮ হইবো। উৎফুল্ল মনে হাটছেন মিয়া সাব হঠাৎ…..

তমিজ সর্দার পিছে পিছে টর্চ লাইট ধরে হাটছে, আর মনের ভেতর খোঁচাচ্ছে, সমাজের সবাই কত্ত ভালো মানুষ জানে, অথচ কেউ কি জানে এই উনার চরিত্র। নিজের মেয়েরে তো ঢাকায় পড়ালেখা করাইতাছেন একবারও ভাবলেন না এই মেয়েটার কথা, সম্ভ্রম হারিয়ে মেয়েটা কি করে বাঁচবে?

তমিজ সর্দার হেন অপরাধ বাকী নেই যা মিয়া সাবের নির্দেশে করেন নাই? রাইতের আন্ধার আর উপরওয়ালা সাক্ষী, আইজ তাইলে ক্যান মন কান্দে, ক্যান?
তাইলে কি নিজের মেয়ের ছায়া পড়লো মনে? প্রতিটা মানুষেরই দুর্বলতা থাকে, তমিজ সর্দারের দুর্বলতা তার মেয়ে আগুনের মত রুপ নিয়া না জন্মাইলেও চেহারায় সেকি মায়া?
মেয়ের জন্মের পর থেকেই বউ বাচ্চা শ্বশুরবাড়ি রেখে মেয়েকে বড় করতেছে তমিজ।

এই গ্রামে তমিজের মেয়ে জন্মের পর থেকে কোনদিন আসে নাই, সব সময় সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া চায় তমিজ তার পাপের শাস্তি যেন তার সন্তান না পায়, সেই জন্যই কি বকুলের কান্না তার অন্তরে লাগছে।
মিয়া সাব যখন জিগায় –কিরে তোর বউ বাচ্চা তো আজও দেখাইলি না?
আতকা কলিজা মোচড় মারে। সাথে সাথে উত্তর দেয় কি দেহামু মিয়া সাব? কালা পেতনি একখান বিয়া করছি মাইয়া ও হইছে মার লাহান।
কিছু একটা পড়ে যাবার আওয়াজে তমিজের চিন্তায় ছেদ পড়ে।

–ওই তমিজ্জা এই দিক আয়….
— জ্বে মিয়া সাব আহি??
তমিজ এগিয়ে দেখে মিয়া সাব উপুড় হয়ে পড়ে আছেন, গাছের মোটা শেকড়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেছেন , টেনেটুনে তোলে তমিজ।
এইবার দুজনেরই খেয়াল হয় বেখেয়ালে দুজনেই উলটো পথে হেটে নির্জন বাগানবাড়িতে চলে এসেছে। আর এটা সেই হিজল গাছটা যে গাছ তলায়…. দুজনেই দুজনের মুখের দিকে বিস্ফোরিত হয়ে তাকিয়ে আছে। দুজনার মনে একটা ভাবনা, আরেহ এটাই তো সেই গাছটা যেটার নিচে………..

*
অসাড় হয়ে পড়ে রইলো বকুল, প্রচণ্ড একটা ঝড় এসে ওর জীবন তছনছ করে দিয়ে গেলো । জীবনটা কি তবে কষ্টে কষ্টেই কাটবে? উত্তর মেলাতে পারেনা বকুল, মা মারা যাবার পর থেকে দুঃখ আর পিছু ছাড়ছে না। কটা দিন সুখে কাটলো সবুজের সাথে, সেও কপালে সইলো না।
সবুজ তো বিদেশ যেতে চায়নি, মিয়া সাব ফেরেশতা হয়ে আসলেন বললেন,
—- তুই যা সবুজ্জা, কোন চিন্তা করিস না, আমি দেইখা রাখুম বকুলরে। ও তো আমার মেয়ের মতন, আমি আছি, তোর চাচী আছে, পাড়াপড়শি আছে, কোন সমস্যা হইবো না।
— না মিয়া সাব ওই চিন্তা করিনা, আপনারা থাকতে আর চিন্তা কি? চিন্তা হইলো হাতে কোন টাকা পয়সা নাই, সাথে লইয়া যামু কী? আর বকুলরে দিয়া যামু কী।
— ওইসব তুই ভাবিস না। বকুল আমার বাড়িতে থাকবো তোর চাচীরে হাতের কাজে সাহায্য করবো। খাইবো দাইবো আর.. রাইতে না হয় তোর ভিটায় আইসা ঘুমাইবো।
— আপনের মত মানুষ হয় না মিয়া সাব, আপনে আমারে বাঁচাইলেন। আপনে অনেক ভালা মানুষ।
—- এসব কইয়া আমারে শরম দিস না।

এসব কথা মনে পড়তেই ডুকরে কেঁদে উঠলো বকুল,এই তার আসল রূপ, এই তার ভালো মানুষী। বকুলের কান্নায় মনে হলো আকাশ ভারী হয়ে ভেঙে পড়বে। অনিশ্চিত ভাবনায় আর আতঙ্কে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে বুক ফাঁটা আর্তনাদ করতে লাগলো।
এক মন এক ভাবনা সবুজ কি বিশ্বাস করবে তার কথা, গায়ের কেউ বিশ্বাস করবে না, এ কোন ফাঁদে পড়লো বকুল। বুঝতে বাকী নেই এ রাক্ষস বারবার আসবে, কি করবে বকুল কিভাবে মুক্তি পাবে?

আজ ২০ দিন হয় সবুজ চোরাই পথে বিদেশ গেছে, কোন একটা খবর পাচ্ছে না, আবার অনেকের মুখে শুনতেছে বিদেশের কোন জঙ্গলে নাকি অবৈধ লোক ধরা পড়েছে, কিছুলোক নৌকা ডুবে মারাও গেছে?
সবুজ বেঁচে আছে তো?
কি হবে বকুলের?কোথায় যাবে? বাবার বাড়ি আশ্রয় জুটবে না। একটাই পথ খোলা মরে যাওয়া, হ্যা তাই করতে হবে, এই মুখ আর সবুজ কে দেখাতে পারবে না, কিছুতেই না।

.
*
পড়িমরি করে দুজন ছুটে পালালেন বাড়ির দিকে।
কিভাবে দৌড়েছেন তা বলতে পারবেন না, একসময় আবিষ্কার করলেন মিয়াসাব বাড়ী চলে এসেছেন এখন নিজেকে ঘরের দাওয়ায়।
ধুপধাপ আওয়াজ শুনে মিয়া গিন্নী দৌড়ে আসলেন ঘুম জড়ানো চোখে।
— কেডায় এমন শব্দ করে?
— আমিইইই এক লোটা পানি দে?
—- ও আপনে? আনতাছি, এমনে দৌড়াইয়া আইছেন ক্যান? ভুত দেখছেন নাকি?
—- বকবক বন্ধ কর? পানি দে?
মিয়া গিন্নী পানির লোটা এগিয়ে দিয়ে গামছা এনে পাশে দাঁড়ালেন।
হাত পা ধুয়ে ঘরে গেলেন মিয়া সাব।

তমিজ সর্দার ছাপড়াতে চলে গেলো, প্রচন্ড মনখারাপ নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো আর অতীত স্মৃতির আলোড়নে ডুবে গেলো।
বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ একদিন হাটে গিয়ে সন্ধ্যায় আর ফিরে এলেন না সবুজের বাপজান!
ওদিকে উধাও হয়ে গেল সাহা পাড়া প্রনব সাহার বউ আরতি…..

সারা গ্রামে কানাঘুষো চলছে সবুজের বাপের সাথে পালিয়ে গেছে আরতি। মোল্লা সাবও হম্বিতম্বি করে চলেছেন, একবার হাতের মুঠোয় পেলে দুটোকে ইচ্ছামতো পিটিয়ে ছাল ছাড়াবেন আর কড়া শালিসি বসাবেন।
সবুজের বাবা আসাদ মুন্সী এমন ধারা মানুষ নয় তাই এই নিয়ে দ্বিমত করছে গ্রামের মাস্টার সাহেব সহ বেশ কিছু গণ্যমান্য ব্যাক্তিবর্গ,কিন্ত মোল্লা সাবের কথার উপর কথা বলে এমন সাহস কার?

সবুজের মা রেবেকা চিৎকার করে চলেছেন, আহাজারি করে বারবার বলছেন, তিনায় এমুন মানুষ না, মাস্টার সাব আমি থানাত যাইতে চাই। তেড়ে আসলেন মোল্লাসাব —- অবুঝ বেডি মানুষ, কী কও ইতা? তোমাগো মানসম্মান নাই বইলা কী গায়ের ইজ্জত মারবা? চুপচাপ বইয়া থাকো?আপনেই ফিরা আইবো।
–রাবেয়া বুঝে পাচ্ছেনা, নিখোঁজ স্বামীকে খুঁজতে গেলে গ্রামের ইজ্জত কী করে ধূলিসাৎ হবে। মনে কু ডাকছে তার, মন বলছে স্বামী তার কঠিন বিপদে আছে।

মোল্লাসাব আবার বললেন, শোনেন— গ্রামের গণ্যমান্য সকল মানুষ, আমি কোন কাজ করতে গেলে, সকলের পরামর্শ নিয়া করাই ভালো মনে করি, আপনারা গ্রামের গণ্যমান্য দশজন ও গ্রামবাসী সবাই এইখানে উপস্থিত আছেন।
আসাদ মুন্সী বছর খানেক আগে আমার কাছ থেইক্কা ৭০হাজার টাকা কর্জ নিছে, কিরে তমিজ্জা নাকি মিছা কইলাম, (তমিজ সম্মতিতে মাথা নাড়ে) এখন আসাদ হিন্দু বাড়ির বউ লাইয়া পলাইছে, টাকা শোধ দিবো কেমনে? তাই যতদিন ওর খোঁজ পাওয়া না যাইবো, বড় সড়কের কাছে যে ধানী জমিন আছে? ওইটা আমার কাছে জিম্মা থাকবো,এখন যে কয়ডা ধান আছে পাকলে আমি আসাদের উঠানে পাঠাইয়া দিমু, আপনাদের কী মতামত?
এই যে দেখেন মাস্টার সাব কর্জের কাগজ।
কাগজ হাতে নিয়ে মাস্টার সাহেব দেখেন ঠিকই তাতে কর্জের কথা লেখা।

রাবেয়ার বুক ধরাস করে উঠে, সোয়ামি গায়েবের পিছনে মোল্লা সাবের হাত নেই তো?
ভরা মজলিসে চিৎকার করে বলে উঠে
— মিছা কতা এই কর্জ সম্পর্কে আমি কোনদিন শুনি নাই! আমার ঘরে এমন কোন বিপদ আসে নাই, যে টাকা কর্জ করা লাগবো?
মোল্লা সাব রাগে চোখ কটমট করে বলে
— বেডি মাইনষের লগে সব পরামর্শ পুরুষরা করে না,বেডি তোমার এহনো বুঝে আহে না টাকা কারে নিয়া দিসে। প্রণবের বৌ এর লগে তোমার জামাইয়ের পিরীত আছিলো।
শোনো আসাদের বউ তুমি ভাইবো না, তোমারে গাঙে ভাসামু না, আমার বাড়িত তোমার ভাবীর লগে সাহায্য করবা, মায়ে ছায়ে ভালোই বাঁচতে পারবা।

গ্রামের মানুষের নিশ্চুপতায় জমির দখল নেয় মোল্লাসাব। বুড়ো শাশুড়ি আর দুধের শিশু সবুজের মুখের দিকে চেয়ে মোল্লাবাড়ি কাজ নেয় আসাদ মুন্সীর বউ রাবেয়া। আর বিভিন্ন অজুহাতে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ সইতে হয় মোল্লাসাবের, বেশীর ভাগই গোলাঘরে কাজে ব্যস্ত রাখতো রাবেয়াকে মোল্লাগিন্নী।

একদিন আচমকা গোলাঘরের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, কিছুক্ষণ জোরাজুরি ইজ্জত বাঁচানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা মুখ চেপে ধরে তারপর সব শেষ! এই ঘটনার অবতরণ হতে থাকে দিন কয়েক পরপর । প্রায়ই নিশ্চুপ কান্না শুনতো অক্ষম বুড়ো শাশুড়ি, একদিন সব কিছুর অবসান হয়, সকালে ঘরের পেছনের পুরনো আম গাছে নিষ্প্রাণ দেহে রাবেয়াকে ঝুলন্ত দেখতে পাওয়া যায়। সব হারিয়ে সর্বহারা অক্ষম বুড়ো দাদীর কোলে বাড়তে থাকে ছোট্ট সবুজ।

সবই তো নিজের চোখে দেখেছে তমিজ সর্দার, তবে আজ কেনো প্রাণ কাঁদে, মেয়েটাকে বাঁচাতে মন চায় এই পিশাচের হাত থেকে। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘর খুঁলে বিছানা ছেড়ে নদীর পাড়ে চলে এসেছে তমিজ জানেনা। খেয়াল হতেই টর্চ মেরে হাতঘড়ির দিকে চেয়ে দেখে রাত সাড়ে চারটা প্রায়।

হঠাৎ করে কার যেনো পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে, কে যেনো মৃদু পায়ে এগিয়ে আসছে….

চলবে….

#শামীমা_সুমি