খেরোখাতার ছেঁড়াপাতা পর্ব-১৩+১৪

0
81

#খেরোখাতার_ছেঁড়াপাতা –১৩

— ম্যাম শুনুন
পেছন ফিরে বকুল দেখে পুলিশের পোশাকে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে, ভালো করে খেয়াল করে দেখে সেদিনের সেই লোকটা। বুকপকেটে নেম ব্যাজ লাগানো ‘ইয়াশ ইমতিয়াজ’ শার্টের হাতায় বেশ কিছু তারকাও লাগানো। ভালো কোন পদে আছে বোধহয়। বকুল উত্তর দেয়,
— জি বলুন।
— ওইদিনের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ, আপনি না থাকলে অনেক বড় কিছু হয়ে যেতে পারতো, অনেক ক্ষতি হয়ে যেতো আমার।
— ইটস ওকে, আর আমি কিছু করিনি, সবই আল্লাহর ইচ্ছাতে হয়েছে।
— জি, তবুও আল্লাহ আপনার হাত দিয়ে রক্ষা করিয়েছেন।
— ওকে ধন্যবাদ গ্রহণ করলাম, আসি তাড়া আছে।
— জি ইয়ে….

ইয়াশ চলে যাওয়া রিকশাটার দিকে তাকিয়ে রইলো।
সুদর্শন পুরুষ হিসেবে তার একটা একস্ট্রা ইমেজ আছে। যে মেয়ে একবার তাকে দেখে, কথা বলে সে নাকি বারবার দেখার জন্য কথা বলার জন্য পাগল থাকে। এমনটা শুনে এসেছে সে, অথচ এই মেয়ে ফিরেও তাকালো না, বিষয়টা তার ইগোতে ভীষণভাবে লাগলো। লম্বা একহারা গড়ন, বড় বড় গভীর কালো চোখ, সিল্কি চুলের ওড়াউড়ি দেখে নাকি মেয়েদের বুকে ঝড় উঠতো এমনটাই বলতো বন্ধুরা।

মধ্যবিত্ত ছিমছাম পরিবারের ছেলে ইয়াশ ইমতিয়াজ , সৎ পুলিশ অফিসার বাবা ইমতিয়াজ মাহমুদের আয়ে সংসার দিব্যি চলে যেতো। ছাত্র জীবনে আর সবার মতো গায়ে হাওয়া লাগিয়ে টোটো করে সারাদিন ঘুরে বেড়াতো। বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, কর কর্মকর্তা স্বামীর সাথে বেনাপোল থাকে। কলেজের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতেই হঠাৎ বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো বাবার ক্যান্সার ধরা পড়লো লাস্ট স্টেজ অফিসের সব ফ্যান্ডের টাকায় চিকিৎসা করা হলো, সব টাকা শেষ হয়ে গেলো কিন্তু বাবাকে বাঁচানো গেলো না।
আকুল পাথারে পড়লো মা ছেলে, ইয়াশের কোন রকমে লেখাপড়া চলছে কারণ মাস শেষে হাতে আসে মাসিক পেনশনের অল্পস্বল্প টাকা, এই দিয়েই দিন গুজরান করতে হয়। পড়াশোনার খরচ সামলে নিতে ইয়াশকে টিউশনি শুরু করতে হয়, এভাবেই দিন চলতে থাকে।

এরই মাঝে তার মাস্টার্স কমপ্লিট হয়ে যায়, ভাগ্যের ফের বলতে হয়, পুলিশের এস আই নিয়োগ পরীক্ষার বিজ্ঞাপন আসে পত্রিকায়। তড়িঘড়ি করে দরখাস্ত করে, যথারীতি ডাক আসলে, এগারোটি ধাপ দক্ষতার সাথে পার করে ইয়াশ, চাকুরীটি সে পেয়ে যায়। মামা চাচার জোর না থাকলেও বাবার পুলিশে চাকুরীর সুবিধাটুকু তার পথ চলাতে সহায়ক হয়।
বছর না ঘুরতেই মা দেখেশুনে শিক্ষিত সুন্দরী মেয়ে তিন্নিকে বউ করে ঘরে তুলে আনেন। ইয়াশের জীবনে সেই ভাবে প্রেম করার সুযোগ জীবনে আর হয়ে উঠেনি।

বছর দুয়েকের মধ্যে কোল আলো করে কন্যা ঐশীর জন্ম হয় সুখেই চলছিলো সংসার। কিন্তু সবার অলক্ষে সুখের আকাশে আঁধার কালো মেঘের ঘনঘটা দেখা দিলো।
মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়ি দিনাজপুর বেড়াতে গেলো তিন্নি, কিছুদিন পরে প্রচন্ড জ্বর নিয়ে ফিরে এলো, বাসায় ঔষধ খায় কিছুতেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া যাচ্ছিলো না। অনুরোধ করলে একই উত্তর, কিছু হয়নি এমনিতেই ভালো হয়ে যাবো। যখন প্রচন্ড জ্বরে বমি করতে করতে বেহুশ হয়ে গেলো, তখন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানা গেলো ডেঙ্গু জ্বর। হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা চলছিলো, অবস্থা ক্রিটিকাল হলে আইসিইউতে রাখা হলো। সকল চেষ্টাকে বিফল করে ডাক্তারদের হতাশ করে দিয়ে তিন্নি পরপারে পাড়ি জমালো ।
সেই থেকে ঐশীকে বুকে নিয়ে আর পঞ্চাশোর্ধ মাকে নিয়ে ইয়াশের দিন কোনোরকমে কাটতে লাগলো।

হঠাৎ করে ঝড়ো বাতাসের মত এই মেয়েটি কোথা থেকে এলো, নাম ধাম জানা নেই অথচ ভালোলাগার একটা অনুভূতি তৈরি হয়ে গেলো প্রথম দেখাতেই।
আজ মেয়েটির সাথে দ্বিতীয় দেখা অথচ মন বলছে, যেনো কত বছরের চেনা জানা।

*
বকুলের আজকাল কাজের চাপ বেড়েছে, এখন আর বিকেলের শিফট লাগে না, তিনদিন সকাল তিনদিন বিকেলে একদিন ছুটি এভাবেই কাটে।
নিজেদের তৈরি পন্যও ভালো বিক্রি হয় অথবা বিভিন্ন ইভেন্টে হস্তশিল্প মেলায় অংশ নেবার সুযোগ থাকে। ইনকাম এখন মোটামুটি খারাপ নয়, থাকা, খাওয়া, পড়াশোনা ও কর্মীদের বেতন, কাঁচামাল সব বাদ দিয়েও উদ্ধৃতি হিসাবে বেশ অনেক টাকা বেঁচে যায়, যা ব্যাংক একাউন্টে জমা হতে থাকে। তার একটাই স্বপ্ন নিজস্ব একটা বুটিকস শপ, জীবনের আর কোনো লক্ষ নেই।
তবে সেদিনের সেই মেয়ে বাবুটার কথা মনে পড়ে ভীষণ মায়া লাগে। আজ তার বাবার সাথে দেখা, লোকটা অদ্ভুত অন্তরভেদী চোখে তাকিয়ে ছিলো যেনো ভেতরটা দেখে নিচ্ছে। বকুলের সারা গায়ে একটা অন্যরকম শিহরণ জেগে উঠেছিলো। কিন্তু সে মনকে শাসায়, প্রেম ভালোবাসা বকুলের জন্য বিলাসিতা এসব ওকে মানায় না। জীবনে বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ঘাটেঘাটে ঠোকর খেয়ে আজ বকুল এই জায়গায় পৌঁছেছে, অনেক বুঝেশুঝে ওকে পথ চলতে হবে।

.
কিন্তু নিয়তি যখন ইচ্ছে হয় কারো দুঃসহ পথচলার অন্ত করবেন তখন সাধ্য কার যে ঠেকায়।
বকুলের সাথে প্রায়শঃই ইয়াশের দেখা হতে লাগলো, “কেমন আছেন” “ভালো আছি” বড়জোর একে অন্যের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি সম্পর্ক এই পর্যন্ত আলাপচারিতায় টিকে রইলো। কেউ কারো নাম পর্যন্ত সাহস করে জিজ্ঞাসা করে না। বকুল যদি ও বা জানে তার নাম ইয়াশ ইমতিয়াজ পেশায় পুলিশ কর্মকর্তা কিন্তু ইয়াশ নামধাম কিছুই জানে না, পুরোই অন্ধকার।

ছুটির দিনে সাপ্তাহিক বাজারের জন্য বের হলো, উদ্দেশ্য কৃষি মার্কেটের দিকে যাবে প্রয়োজনীয় যা যা লাগবে নিয়ে আসবে। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমেই দেখলো ওদিনের ওই মেয়ে বাবুটি একটি মধ্যবয়সী মহিলার হাত ধরে রাস্তায় হাটছে। বকুলকে দেখতে পেয়ে বাচ্চাটি মহিলাকে টেনে দেখাতে লাগলো, বকুলও হাস্যোজ্জ্বল মুখে জিজ্ঞাসা করলো
—- কি মামনি কেমন আছো তুমি?
বাচ্চাটি লজ্জা পেয়ে মহিলার শাড়ির আড়ালে মুখ লুকালো। মহিলাটি ইশারায় বকুলকে থামতে বললো। বাচ্চাটির হাত ধরে রাস্তা পাড় হয়ে এপাড়ে আসলো ।
— তুমি বুঝি সেই মেয়ে যে আমার নাতনীকে সেদিন এক্সিডেন্ট এর হাত থেকে বাঁচিয়েছিলে?
— জি , কিন্তু আপনি কি করে জানলেন?
— বাপ মেয়ে বাসায় গিয়ে বলেছিলো, আর আজ নাতনী হাতের ইশারায় তোমাকে দেখাচ্ছে আর বলছে ঐ আন্টি।
— ও আচ্ছা হ্যা তাইতো! না না আন্টি আমার তো কিছু করার ক্ষমতা নেই সবই আল্লাহর ইচ্ছে।
— তবুও মা উছিলা তো তুমি?
— জি ধন্যবাদ আন্টি, আমার জন্য দোয়া করবেন।
— এখন কোথায় যাচ্ছো?
— বাজারে যাচ্ছি কিছু কেনাকাটা আছে?
— ও আচ্ছা, তোমার নাম কি মা?
— জি আমার নাম বকুল
— বাসায় কে কে আছে তোমার?
— আন্টি আমি আর আমার বান্ধবী এখানে থাকি। বাবা মা দেশের বাড়ি থাকেন।
— ও আচ্ছা, চাকুরী করো বুঝি?
— জি আন্টি
— আমাদের বাসায় এসো একদিন।
— জ্বি আসবো?
— তোমার ফোন নম্বরটা একটু আর মোবাইলে সেইভ করে দাও তো। মাঝেমধ্যে তোমাকে ডেকে এনে গল্প করবো, ভীষণ একা একা লাগে এক একেকটা সময়। তুমি রাগ হচ্ছো না তো? বয়স্ক মানুষ তো তাই একটু বেশিই বকবক করি।(বলেই নিজের মোবাইলটা এগিয়ে দিলেন)
— না না আন্টি রাগ হবো কেনো? আপনার যখন ইচ্ছে করে ডাকবেন, আমি আসবো।

বকুল নম্বর সেইভ করে মোবাইলটা ফিরিয়ে
দিয়ে বাচ্চাটাকে থুতনি ধরে আদর করলো,
— বাবু তোমার নাম কি?
— ঐশী
— বাহ খুব সুন্দর নাম তো! কে রেখেছে এমন সুন্দর নামটা?
— বাবাই
— ও আচ্ছা কয় বছর তোমার?
— তিন চার বছর
সবাই হো হো করে হেসে দিলো, ঐশীর দাদী বললো,
— আসলে তিনবছর শেষ চার বছর শুরু হবে, আমাদের মুখে একথা শুনেছে এভাবে বললো।
— হ্যা আমি সব জানি।
— ওরে বাবারে পাকনা বুড়ি একটা, সব জানে।
বলে ঐশীকে একটু আদর করে দিয়ে, আসি আন্টি বলে সামনে আসা রিক্সায় উঠে গেলো।

কাজ থেকে ফিরেই বকুল ফ্রেশ হয়ে এসে মোবাইল ওপেন করলো। কাস্টমারের ভিড় থাকলে বকুল মোবাইল সাইলেন্ট করে রাখে। এখন ওপেন করতেই দেখে আননোন নম্বর থেকে কয়েকটি কল উঠে আছে।
বকুল তাজ্জব হলো! তাকে আবার কে কল করলো? তাও এত্তগুলো?

.
চলবে

#খেরোখাতার_ছেঁড়াপাতা –১৪

হ্যালো আসসালামু আলাইকুম কে বলছেন?
— আমি হোসনে আরা, চিনতে পারছো আমাকে?
— কে হোসনে আরা সরি চিনতে পারছি না?
— ওহহো সরি মা নাম বললে তো চেনার কথাও নয়, আমি ঐশীর দাদু, ওইযে যে বাচ্চা মেয়েটা যাকে তুমি এক্সিডেন্টের হাত থেকে বাঁচিয়েছ।
— ও আচ্ছা, এইবার চিনেছি, কেমন আছেন খালাম্মা?
— আলহামদুলিল্লাহ মা, তুমি কেমন আছো?
— জ্বি আলহামদুলিল্লাহ আমিও ভালো আছি। কেনো ফোন করেছেন, কোনো দরকার ছিলো?
— হ্যা মা ঐশীর চতুর্থ জন্মদিন উপলক্ষে বাসায় একটু আনন্দ আয়োজন করেছি, তোমার দাওয়াত রইলো মা, পরশুদিন তুমি আমাদের এখানে আসবে। আমি ভীষণ খুশি হবো মা প্লিজ আসবে তো?
— আচ্ছা আন্টি আসবো।

.
বাসাটা ঘুরেফিরে দেখছে বকুল, সবখানে আভিজাত্যের ছাপ, দেয়ালে দেয়ালে পেইন্টিং, এন্টিকের শোপিস, ইনডোর প্লান্ট দিয়ে সাজানো প্রতিটা কর্ণার । রুচিশীলতার যথাসাধ্য প্রমাণ রেখেছেন খালাম্মা বাসার আনাচে-কানাচে। ঘরভর্তি মেহমান বেশিরভাগই নিকট আত্মীয়স্বজন, বকুলের সাথে কারো পরিচয় নেই তাই সে একটু দূরে দূরে সরে আছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার ইয়াশের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেছে প্রতিবার বকুল চোখ নামিয়ে নিয়েছে।
কেক কাটার সময় হোসনে আরা বকুলকে ডেকে নিয়ে ঐশীর পাশে দাঁড় করিয়ে দেন। বকুলের অস্বস্তি লাগলো এটা কেমন কথা? এত এত আপনজন থাকতে বকুল কেনো?
বকুলের অস্বস্তি এড়ায় না তার চোখে তিনি সবার সাথে বকুলের পরিচয় করিয়ে দেন ঐশীর প্রিয় আন্টি বলে, আরো বর্ণনা করেন বকুল কিভাবে ঐশীর প্রাণ বাঁচিয়েছে। বকুল খুব লজ্জা পায় আবার আন্তরিকতায় খুশিও হয়।

খাওয়াদাওয়া শেষে বকুল বের হবার মুহূর্তে ঝড়ের বেগে খুব সুন্দরী আর সুশ্রী একটা মেয়ে এসে ঢুকলো। এসেই ঐশীকে আদর করতে লাগলো, খালাম্মা তাকে নিপুণ নামে সম্বোধন করে বললো
— এতক্ষণে আসার তোমার সময় হলো নিপুন? আপন মানুষ এতো দেরিতে আসলে কি চলে মা?
— আর বলবেন না আন্টি একটা কাজে আটকে গিয়েছিলাম।
—- খালা হয়ে যদি অজুহাত দেখাও তবে আর কি বলা চলে?
—- আপনার কি মনে হয় আন্টি? ঐশীর জন্য আপনার চেয়ে আমার দরদ কম? ভুলে যাবেন না আমি ওর মায়ের বোন হই? ( রুক্ষভাষায় বললো)
— মায়ের সাথে এই ভাষায় কথা বলছো কেনো নিপুন? (রেগে বললো ইয়াশ)
— আপনি দেখছেন না আন্টি আমাকে দেরিতে আসার জন্য কথা শোনাচ্ছে।
হোসনে আরা বেগমের মুখটা অপমানে লজ্জায় চুপসে গেলো।
এমন পরিস্থিতিতে বকুলের এখানে থাকা ঠিক নয় তাই বিদায় নিয়ে চলে আসলো।

.
এরপর থেকে প্রায় সময়ই হোসনে আরা বকুলকে ডেকে বাসায় নিয়ে যান ভালোমন্দ রান্না করলে ডেকে পাঠান। বকুলও হাতে সময় পেলে এসে গল্প করে এমনি একটি দিনে পারিবারিক এলবাম দেখতে বসেছে সবাই ঐশী বকুলের কোলের উপর লেপটে বসে আছে। মুরুব্বি বকুলকে নিজের মেয়ে, জামাই নাতি , এর ওর তার সবার ছবি দেখাচ্ছেন। বকুল ইয়াশের বিয়ের ছবি দেখলেন, নবজাতক ঐশীকে কোলে নেয়া তিন্নিকেও দেখালেন। বকুল মনোযোগ দিয়ে দেখলো, তিন্নি বেশ সুন্দরী ছিলো মা তিন্নিকে একদম স্বর্গীয় লাগছিলো।
এরই মাঝে বাঁধা কাজের মহিলা এসে নাস্তা দিয়ে গেলো। হোসনে আরা বকুলের হাতে চায়ের কাপ তুলে দিয়ে বললেন
— তুমি এমন করে মাঝেমধ্যে এসো মা, তুমি আসলে আমার ভীষণ ভালো লাগে আর সময়ও কেটে যায়। ঐশীও তোমাকে বেশ পছন্দ করে।
— জ্বি আসবো খালাম্মা।
— মনটা ভালো থাকে না , আমার ছেলেটার এই বয়সেই এত দুঃখ এলো জীবনে।
— উনার জন্য দ্বিতীয়বার….
—- হ্যা সে চেষ্টা করেছি রে মা, কিন্তু সবাই আমার নাতনীকে বোঝা ভাবে। একটা সমন্ধ প্রায় ঠিকই হয়ে গিয়েছিলো, শেষ মুহূর্তে এসে মেয়ে বলে বাচ্চাকে সে লালনপালন করতে পারবে না, বাচ্চা দাদুর সাথে দিয়ে আলাদা করে দাও নয়তো নানুর বাড়ি দিয়ে দাও। ছেলে সাথে সাথে নাকচ করে দিয়েছে, সেই থেকে ছেলের সামনে দ্বিতীয় বিয়ের নামই নিতে পারি না।
— ওহ দুঃখজনক!
— সমস্যা তো আরো আছে? ওইদিন তুমি যাবার সময় যে মেয়েটাকে ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকতে দেখলে? ওর নাম নিপুন ঐশীর খালা হয় মেয়েটা, মেয়েটার একটা বিয়ে হয়েছিলো কিন্তু সংসার টেকেনি।
— ও আচ্ছা।
— বেয়াই বেয়ানের ইচ্ছে ওকে ইয়াশের সাথে বিয়ে দেবেন, কিন্তু দেখলে তো কেমন ব্যবহার। এ মেয়েকে ঘরের বউ করা যায় বলো? আমার ছেলে সোজা নাকচ করে দিয়েছে।
— মনের মতো না হলে তো নাকচ করবেই, আচ্ছা খালাম্মা আমি এবার আসি।
— মা গো আমি বোধহয় বকবক করে তোমায় বিরক্ত করে ফেলি।
— না না খালাম্মা, এমন করে বলবেন না, আমারও ভালো লাগে আপনার সাথে গল্প করতে।

বকুল বের হবার জন্য উঠে দাঁড়াতেই ইয়াশ এসে বাসায় ঢুকলো, সোজা মায়ের রুমে ঢুকে ঐশীকে কোলে নিলো। চোরা চোখে বকুলকে দেখছে, বকুল বুঝতে পেরে মাথা নিচু করে বের হয়ে গেলো। বিষয়টা হোসনে আরার চোখে পড়লো। বকুলের চলে যাবার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— বকুল মেয়েটা বড়ই লক্ষ্মীমন্ত , ভীষণ মায়াবী ও মিশুক, এমন মেয়ে যার ঘরে যাবে ঘর আলো করে রাখবে।
প্রতিউত্তরে ইয়াশ বললো,
— হুমম

.
নিজের রুমে গিয়ে ইয়াশ ফ্রেশ হলো,একটা বই হাতে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগলো, বাহ ‘বকুল’ বেশ সুবাস ছড়ানো নাম তো! এই প্রথম মেয়েটার নাম জানলো সে। কি যেনো একটা অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তি আছে মেয়েটার? খুব কম সময়ে মানুষকে আপন করে নিতে পারে। প্রথম দেখার দিন থেকেই মনে আঁচড় কেটেছে, আর এখন মায়ের মনও দখল করে নিয়েছে। একে বোধহয় মন থেকে সরানো দুঃসাধ্য হবে।

.
বাবাকে পারলে ক্ষমা করে দিও বকুল, সাবেরার কথা শুনে চোখ তুলে তাকালো বকুল। কফির কাপটা তুলে চুমুক দিয়ে আবার টেবিলে রাখলো।
— উনার খবর কি আপু?
— শুনেছ হয়তো? তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ, ছাড়া পাবার আশা নেই নতুন পুরনো মিলে অনেক মামলার আসামি।
— আমি যতটুকু জানি আপনি ল পড়ছিলেন, এখন হয়তো পড়া শেষ প্র‍্যাকটিস করছেন?
— হ্যা, একটা ফার্মে সহকারী হিসাবে যুক্ত হয়েছি, ভাবলাম আগে অভিজ্ঞ হই পড়ে নিজের ফার্ম করবো।
— আপনার বাবার জন্য লড়বেন না?
সজল চোখে তাকিয়ে থাকে সাবেরা, চোখদুটো ছলছলে, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
— নাহ বকুল, লড়ছেন একজন জাদরেল ব্যারিস্টার কিন্তু বাঁচাতে পারবেন বলে মনে হয় না। আবার শুনলাম তমিজ সর্দার নাকি রাজসাক্ষী হয়েছে?
— আপনি কি তাকে এখনো ঘৃণা করেন আপু?
— তার কর্মকাণ্ডকে ঘৃণা করি কিন্তু জন্মদাতা পিতা হিসেবে তাকে যে বড্ড ভালোবাসি বকুল। মন্দ হোক ভালো হোক বাবা তো বাবাই বাবার কোনো আলাদা জাত হয় না। (চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়লো)
—- আসলেই আপু পাপকে ঘৃণা করা যায় কিন্তু মানুষকে আদৌ ঘৃণা করা উচিতও নয়।
—- আমার বাবাকে তুমি ক্ষমা করে দাও বকুল, আমি জানি সে তোমার ক্ষতি করেছে অনেক। আর তার চরম শাস্তি সে পাচ্ছে আর পাবেও।(বকুলের হাতদুটো চেপে ধরলো সাবেরা)
— উনি আমার অনেক ক্ষতি করেছেন এটা সত্য, তবে উনার কারণে আমার জীবনটাই বদলে গেছে এটাও সত্য । আইন উনাকে শাস্তি দেবেন আর পরকাল তো রইলোই, যেদিন আমার দীর্ঘশ্বাসগুলো সুখের মুখ দেখবে তখন উনার ক্ষমা উনি আপনা আপনিই পেয়ে যাবে আপু।

বকুল উঠে হনহন করে বেরিয়ে এলো ক্যাফে থেকে।
মার্কেটে একটা জরুরী কাজে এসেছিলো সাবেরা এখানে এসে বকুলকে দেখে চমকে গেছে। বকুল যদিও এড়িয়ে যেয়ে চেয়েছে, কিন্তু অনেক বলে কয়ে সাবেরা দুটো কথা বলার জন্য বকুলকে ক্যাফেতে নিয়ে এসেছে।
বকুল সেই দুঃসহ দিনগুলো পেছনে ফেলতে চায়, সব ভুলে নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছে হয়, ইচ্ছে হয় একটা আস্থার ও নির্ভরতার হাত এগিয়ে আসুক। কেউ আসুক জীবনে যে তার বিগত দিনের সকল দুঃখ ভুলিয়ে দেবে, আলিঙ্গনের সুধায় ধুয়ে মুছে দেবে বিগত জীবনের সকল শোকতাপ।

কিন্তু এমন কেউ কি আসবে? কেউ কি আছে কোথাও বকুলের জন্য? একলা একা নির্জনতায় বকুল নিজেকে বারবার প্রশ্ন করে।

আজকাল একটা সংসারের বড্ড লোভ হয় বকুলের, নিজের একটা সংসার যেটা স্বামী সন্তান নিয়ে খুনসুটি ভরা । নয়টা পাঁচটা অফিস করা স্বামীর জন্য চা নাস্তা রেডি করে বসে থাকার বড্ড ইচ্ছে জাগে মনে, অপেক্ষা করতে ইচ্ছে হয় দিনের শেষে, বিকেলে বারান্দায় পাশাপাশি চা খাওয়ায়, ঘুমের আগে।
বকুল এটা জানে এ স্বপ্ন পূরণ হবার নয়, এটা অলীক বকুলের জন্য।

চলবে..

#শামীমা_সুমি