গভীর গোপন পর্ব-০২

0
218

#গভীর_গোপন
#২য়_পর্ব
#অনন্য_শফিক



টুকি বললো,’ মাকেও এরকম ভাবে আ*দর করে আশফাক মামা।আজও করেছে। কিভাবে করেছে জানো?’
টুকি বলে শেষ করার আগেই জেবা উঠে এলো। তার চোখ মুখ রাগে রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। সে এসে কান ধরে টুকিকে টেনে নিলো কাছে। তারপর গালে দুটো থা*প্পর বসিয়ে দিয়ে রাগে অভিমানে এক রকম কান্না করেই বললো,’ বাপের চরিত্র পেয়েছিস। অকারণে মানুষের চরিত্রে অ*পবাদ দেয়া তোদের স্বভাব। তোদের চৌদ্দ গোষ্ঠী এরকম। তোকে আমি গলা টি*পে মে*রে ফেলবো আজ! মিথ্যুক মেয়ে!’
জেবা এইটুকু একটা মেয়েকে ঘাড় ধা*ক্কা দিয়ে দিয়ে ও ঘরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।মেয়েটা গলা ছেড়ে কাঁদছে।ভ*য় পাচ্ছে।
আমার ভারী শরীর নিয়ে উঠতে বসতে কষ্ট হয়। তবুও যতোটা পারি তাড়াহুড়ো করে উঠে জেবার হাত থেকে টুকিকে রাখতে চাইলাম।জেবা আমার হাতে টুকিকে দিলো না। সে এক হাতে টুকিকে ধরে অন্য হাতে চোখ মুছে আমায় বললো,’ আপনি এইটুকু একটা বাচ্চার কাছে এসব জিজ্ঞেস করতে পারলেন কিভাবে? ছিঃ! মানুষকে আপনারা এতো নোংরা ভাবেন! আমি এখানে ইচ্ছে করে আসিনি। বিপদে পড়েই এসেছি। তাছাড়া আশফাকের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কেমন সবাই জানে।আন্টি বেঁচে নাই। থাকলে আপনি তাকে জিজ্ঞেস করতে পারতেন।আমি জানি জুঁইয়ের সঙ্গে আশফাকের জমিজমা নিয়ে এখন একটা দন্দ্ব আছে। জুঁই আশফাককে পছন্দ করে না। তবুও যদি তাকে জিজ্ঞেস করেন। সে কখনোই আশফাক আর আমায় নিয়ে একটা খারাপ কথাও বলতে পারবে না!’
জেবা আবার চোখ মুছেছে। তার ফর্সা নাকের ডগা লাল টুকটুকে হয়ে গেছে।
আমি নরম গলায় বললাম,’ জেবা, আপনি আমায় ভুল বুঝছেন শুধু শুধু।আমি ওকে কিচ্ছু জিজ্ঞেস করিনি। জিজ্ঞেস করবার কোন প্রশ্নই আসে না। আশফাক এবং আপনার সম্পর্কে আমি যতোটুকু জানি এটাই যথেষ্ঠ। নতুন করে আর জানবার প্রয়োজন নাই। কিন্তু টুকি এসেই এসব বলতে শুরু করলো।আমি ওর কথায় হ্যা না কিচ্ছু বলিনি।’
জেবা টুকির গালে আবার একটা শক্ত চ*ড় বসিয়ে দিলো।চ*ড় দিয়ে বললো,’ মিথ্যে কথা বললি কেন? এসব কোথায় শিখেছিস? আমার ম*রাই উচিৎ ছিল। কেন যে মরলাম না!’
আমি জেবার হাত থেকে জোর করেই টুকিকে কেড়ে নিলাম। তারপর বললাম,’ ও বাচ্চা মানুষ।একে মা*রলে কোন লাভ হবে? ‘
জেবা রাগের গলায় বললো,’ গলা টি*পে মে*রে ফেললেই সব ঠিক হয়ে যাবে।পরের পাপ বয়ে বেড়াবার ইচ্ছে আমার নাই।’
জেবা কাঁদতে শুরু করলো আবার।
আমি ওর কাছে গেলাম।ওর কাঁধে হাত রেখে বললাম,’ এরকম বলবেন না।মেয়েটা আপনার। নিজের মেয়েকে কেউ পাপ বলে না! ওর বাবা নি*ষ্ঠুর বলে কি আপনিও ওরকম হবেন? একটা বাচ্চা গর্বে ধরতে কতো কষ্ট হয় আপনি তো জানেন? জানেন না?’
জেবা কিছু বললো না।চুপ করে শুধু নাকের স্বর্দি মুছলো ওড়না দিয়ে।
ততোক্ষণে আশফাক এসে গেছে।আমি টুকিকে নিয়ে ও ঘরে চলে যেতে যেতে জেবাকে বললাম,’ জেবা , আশফাক যেন কিচ্ছু না জানে এই বিষয়ে।ও শুনলে কষ্ট পাবে!’
জেবা কিছু বললো না আর।

পরদিন সকাল বেলা আশফাক অফিসে গেলো।জেবা চুপচাপই আছে। কথা বলে না। শুয়ে থাকে সারাদিন। একবার দেখলাম তার চোখ ফুলা ফুলা। অনেক কাঁদলে এরকম হয়।বেচারি বোধহয় সব সময় শুয়ে থেকে কাঁদে।ওর জন্য খুব মায়া হচ্ছে আমার। ইচ্ছে করছে সব কিছু জানতে। জিজ্ঞেস করতে,ওর প্রেমিক কে ছিলো? কেন এতো দিন পর এই নোংরা কাজটা করলো? কিন্তু সাহস পেলাম না কাছে যেতে। ভাবলাম, সে যদি ভাবে তাকে আমি কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিচ্ছি!
টুকি এখন তার মায়ের সাথে। আমার কাছে আসতে দেয় না তার মা।ও আসতে চায়। তার মা আসতে দেয় না। হয়তো জেবা ভাবছে, মেয়ে এসে আবার আমার কাছে বানিয়ে বানিয়ে এসব বলবে। এতে করে নতুন সমস্যার সৃষ্টি হবে। সে হয়তো নতুন করে আর কোন সমস্যার কারণ হতে চায় না!

কিন্তু টুকি এলো। জেবা ঘুমিয়ে পড়েছে,আর এই সুযোগেই সে আমার কাছে এসেছে। এসে বলে তার বাবার সঙ্গে ফোনে সে কথা বলতে চায়।আমি বললাম,’ তোমার মা তোমাকে কথা বলতে দেয় না?’
টুকি দু’ পাশে মাথা নাড়িয়ে বললো,’ দেয় না।’
আমি বললাম,’ বাবার জন্য খারাপ লাগছে তোমার টুকটুকি?’
টুকি প্রায় কেঁদেই ফেললো।বললো তার পেট পুড়ে বাবার জন্য।
টুকিকে আমি জড়িয়ে ধরলাম বুকের সাথে। বাবার কথা খুব মনে পড়ছে আজ। আমিও ছোট বেলায় বাবার ন্যাওটা ছিলাম। বাবাকে ছাড়া কিচ্ছু বুঝতাম না।বাবাও আমার জন্য পাগল ছিলেন।আমায় কোলে নিয়ে সারা শহর হাঁটতেন। যা চাইতাম তাই কিনে দিতেন। এরপর বাবা সিঙ্গাপুর চলে গেলেন। ওখানে কাজ করবেন। উপার্জন করবেন।যাবার পর এক বছর টাকা পয়সা পাঠালেন। যোগাযোগ রাখলেন। কিন্তু এক বছর পেরুতেই যোগাযোগ বন্ধ করে দিলেন তিনি। এরপর আর কোনদিন তিনি যোগাযোগ করেননি।দেশেও ফিরেননি।মা বড় কষ্ট করে আমায় বড় করেছেন। পড়াশোনা করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। বাবার আর কখনোই খোঁজ মিলেনি। অনেকেই বলেছে বাবা নতুন বিয়ে করেছেন। নতুন মেয়ের পাল্লায় পড়ে বাবা আমাদের ভুলে গিয়েছেন।অথবা ওই মেয়ে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেয়নি। আবার অনেকেই বলেছে,বাবা আর নাই।মারা গিয়েছেন।আমি জানি না বাবার আসলে কি হয়েছিলো! কিন্তু এখনও আমি বাবাকে ভালোবাসি। এই যে এসব লিখছি।লিখার সময়ও আমার চোখ ভিজে উঠেছে জলে।জল মুছে মুছেই আমি লিখছি ‌।

টুকির বাবার নম্বর আমার কাছে নাই। জেবার কাছে চাইলে ও নম্বর দিবে না।আশফাকের কাছে সম্ভবত টুকির বাবার নম্বর আছে।
আমি আশফাককে ফোন করলাম। আশফাক ফোন কেটে দিলো। হয়তো বিজি আছে।
এদিকে টুকি আমায় একেবারে পাগল করে ছাড়ছে।বার বার বলছে, ‘বাবাকে ফোন দেও না কেন? বাবাকে ফোন দেও না কেন?’
আমি ওকে কিছুতেই বোঝাতে পারছি না।বলছি, ‘নম্বর নেই।’
সে বুঝে না।
জেবা ঘুম থেকে উঠে গেছে। সে এসব শুনে এদিকে এলো। এসে বললো,’ কি হয়েছে?’
আমি বললাম,’ কিছু না।’
টুকি ভয়ে গুটিয়ে গেছে। আমাকে আঁকড়ে ধরেছে। কাঁপছে থরথর করে।
আমি জেবাকে বললাম,’ জেবা, একটা বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে এরকম কঠোরতা দেখাচ্ছেন কিভাবে আপনি? ‘
জেবা বললো,’ কিসের কঠোরতা দেখাচ্ছি? কি হয়েছে বলুন তো।’
আমি বললাম,’ ওকে ওর বাবার সঙ্গে কথা বলতে দিচ্ছেন না।এটা কি আপনি ঠিক করছেন?’
জেবা হতাশ হওয়া গলায় বললো,’ যা জানেন না তা নিয়ে কথা বলবেন না। সে আমার সঙ্গে কথাই বলে না।মেয়ের সঙ্গেও কথা বলে না।টুকিকে সে এখন নিজের সন্তান বলেই স্বীকার করে না। আমি এসব বলতে চাই না। কিন্তু বলতে হচ্ছে। গত পড়শুদিন টুকি তার বাবাকে বাবা বলে ডাকার পর তার বাবা তাকে খুব মে*রেছে।মা*রতে মা*রতে বলেছে, কোনদিন যেন ভুলেও তাকে বাবা না ডাকে। সে আমার মেয়েকে জা*রজ বলেছে। এরপরেও মেয়ে যখন কাঁদে। বাবার সঙ্গে কথা বলতে চায়। তখন আমি বেহায়ার মতো ওকে ফোন করেছি। কিন্তু সেই একই রকম আচরণ করেছে সে।আমায় নোংরা নোংরা ভাষায় গালাগাল করেছে। এখন আপনি বলুন, আমি কিভাবে কঠোর হলাম আমার মেয়ের প্রতি?’
আমি কি বলবো আসলে কথা খুঁজে পাচ্ছি না।
টুকির মুখের দিকে একবার তাকালাম।কি মায়াময় একটা মুখ! কি যে পবিত্র! কি যে মিষ্টি! কিন্তু এইটুকু একটা মেয়ে তার বাবা – মায়ের ভুলের জন্য এতো বড় শাস্তি পাচ্ছে। এই ছোট্ট শিশুটিকে একবার তার বাবা মা*রধোর করে, তো আরেকবার তার মা মারধোর করে।কি ভয়াবহ অবস্থা!
আমি বললাম,’ জেবা, আপনি যান। টুকি আপনাকে ভয় পাচ্ছে। দেখুন ভয়ে কিভাবে গুটিয়ে যাচ্ছে! কাঁপছে থরথর করে! ও এখন থেকে আমার সঙ্গে থাকবে। খ*বরদার! আপনাদের একে অপরের উপর করা রাগ ওর উপর ঝাঁড়বেন না আর।’
জেবা চলে গেল। কিছু বললো না।
ওর মা চলে যাবার পর টুকিকে দেখলাম আবার আগের মতো প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।আমি মনে মনে ঠিক করলাম, যেভাবেই হোক টুকির বাবার নম্বর আমি নিবো। তারপর ইচ্ছে মতো ওকে কিছু কথা শুনিয়ে ছাড়বো!


#চলবে