তবুও_তুমি ১১তম পর্ব

0
928

তবুও_তুমি
১১তম পর্ব
.
“আপনি এখানে? ” এতটুকু বলেই কোন অজানা অভিমান যেন মুখের ভাষা আটকিয়ে আসলো। হাতে গন্ধরাজ ফুল আর হাঁটু গেড়ে সে আমার সামনে বসা। আমি যে আজ অন্যকারো হয়ে গেছি আর এখন সে আসছে আমাকে প্রপোজ করতে? শার্টের কলার ধরে টেনে তাকে দাঁড় করালাম। কেন জানি না প্রচন্ড জিদ হচ্ছিল তার উপরে। ” শুধু পারেন আমার সাথে রাগই দেখাতে। অন্যকোন কিছু বোঝার যোগ্যতা আপনার নেই আর কখনই হবে না ” এই বলেই সরে আসতে চাইলাম। পিছনে থেকে জড়িয়ে ধরে রাসেল ভাই বলল ” আচ্ছা যাবি তো সমস্যা নেই। কিন্তু তার আগে কিছু কথা শুনে যা”। একরাশ অভিমান নিয়ে বললাম ” কিছু কথা শোনার দিন শেষ হয়ে হয়ে গিয়েছে। আমি যে আজ অন্য কারো “। এতক্ষন লাগছিল জিদ এখন এক অজানা অভিমানে বাকরুদ্ধ হয়ে আসছে। যে কোন সময় চোখের পানির বাঁধ ভেঙ্গে চলে আসতে পারে। শুধু চাইছিলাম তার বাহুডোর থেকে ছুটে আসছে। সে যেন আরো শক্ত করে আগলিয়ে ধরল আমাকে। পিছন থেকে ফিসফিস করে বলল ” নিপা আগে শুনবি তো আমার কথা তারপর যা যেখানে যাওয়ার যা”। ঘুরে একদম তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কেন জানি না মনে হচ্ছে এই মানুষটাকে আমি চিনি না। খুব যেন অচেনা মনে হচ্ছে তাকে। ” বৃষ্টিতে এমনিতে কাক ভেজা হয়ে গিয়েছি এখানে দাঁড়িয়ে বলব নাকি ঘরে যেয়ে বলব ” রাসেল ভাইয়ের প্রশ্ন। ” রুমে অনেক অন্ধকার ইলেকট্রিসিটি নেই ” আমি উওর দিলাম। ” তুই চল রুমে আমার শীত করতেছে ” এইটুকু বলেই রাসেল ভাই রুমে ঢুকে গেল। আমিও তার পিছে পিছে রুমের ভিতরে ঢুকলাম। ” নিপা একটা টাওয়াল দে তো, আর জয়ের রুমে আমি একটা থ্রিকোয়াটার প্যান্ট ফেলে গেছিলাম ওইটাও নিয়ে আয়। চেঞ্জ করব না হয় ঠান্ডা লাগবে ” টিশার্ট খুলতে খুলতে বলল রাসেল ভাই। ফর্সা শরীরটা অন্ধকারেও যেন আমি দেখছিলাম এই শরীরটা দেখলেই যেন আমার ঘোর লাগে। পরক্ষনেই ঘোর কেটে মেজাজটা সেই লেভেলের খারাপ হল।সাহস কত বড় অন্যের বউকে হুকুম দিচ্ছে। আমি বললাম
___ কেউ যদি জানে আপনি আমার রুমে ঝামেলা হয়ে যাবে।
___ কেউ জানবে কি করে আমি যখন ঢুকেছি সবাই খেলায় মশগুল ছিল। তুই আস্তে করে জয়ের রুমে যেয়ে নিয়ে আসবি।
___ বাইরে লোক হুট করে কেউ দেখে ফেললে কি যে করবে আমাকে আমি নিজেও জানি না।
___ তুই যাবি নাকি আমি যাব। তখন কিছু হলে কিন্তু আমি জানি না।
পাগল মানুষ কখন কি করে বসে নিজেও জানি না। কথা না বাড়িয়ে সোজা,ভাইয়ার রুমে চলে গেলাম। কি করে যে ওই প্যান্টটা পেলাম আমি নিজেও জানি না। মনে হল যেন ঘোরে মধ্যে নিজের রুমে আসলাম। আজকেই বিয়ে হয়েছে আমার আর বাসা ভর্তি লোক যদি কেউ জানে আমার রুমে রাসেল ভাই তাহলে যে কি হবে জাষ্ট ভাবতে পারতেছিলা না। রুমে এসে তাড়াতাড়ি ফোনের লাইট অন করে দেখলাম সে দাঁড়িয়ে আছে জানালা ঘেসে। যেন এক অন্য চোখে বাইরের বৃষ্টি দেখছে। সে চাহনিতে কি যে নেশা তা কাউকে বোঝানো যাবে না। প্যান্টটা সামনে বাড়িয়ে ধরতেই বলল ” যা তো নিপা রুমের দরজা লক করে “। ” কেন দরজা লক করব কেন ” আমি ঘাড় বেকিয়ে প্রশ্ন করলাম। ” সমস্যা নেই খোলা থাক হুট করে কেউ এসে দেখুক আমি তোরে কাহিনী শোনাচ্ছি” এই বলেই ওয়াশরুমে ঢুকল রাসেল ভাই। মনে মনে ভেবে দেখলাম সত্যিই তো মিলি জিমি আছে বা খালারা যদি কেউ চলে আসে। তাইলে মাইর আগে দেবে বিচার পরে করবে এর চেয়ে ভাল দরজা লক করে দেই। দরজা লক করে বিছানায় বসতেই দেখলাম বৃষ্টির ছিটায় জামা ভিজে আছে তার মানে আমারও ড্রেস চেঞ্জ করতে হবে। যে পাগল ঢুকেছে ওয়াশরুমে কখন বের হবে কে জানে। এর চেয়ে ভাল আমি রুমেই ড্রেস চেঞ্জ করে ফেলি। ওয়াশরুমের বাইরে থেকে ছিটকিনি আটকিয়ে অন্ধকারে হাতড়ে পেলাম এক টিশার্ট সেটা পরে নিচে স্কার্ট পরে তাড়াতাড়ি যেয়ে ছিটকিনি খুলে দিয়ে বিছানার উপরে পা উঠিয়ে বসে বসে গেম খেলতে লাগলাম। আহা কি কপাল আমার, বিয়ের রাতে আমার ঘরে অন্য পুরুষ আমি খেলি গেম আর স্বামী.? এখনও আমি জানিই না যে আমার স্বামীটা কে। রাসেল ভাই অনেক গুলো গন্ধরাজ ফুল এনেছে। এত ফুল কই পেয়েছে কে জানে।দুটো ফুল নিয়ে খোঁপায় গুজলাম। মনটা যেন এমনিতেই ভাল হয়ে গেল কেন জানি না। কি ব্যাপার এতক্ষন হয়ে গেল বের হয় না কেন লোকটা এই ভেবে ভেবে যখন বিরক্ত হচ্ছিলাম তখনই নবাব সিরাজুদ্দৌলার বংশধর বের হলেন। খালি গা ভেজা শরীর মাথার চুল গুলো লেপ্টে আছে ইসস নিজেকে আটকানোই যে দায়। সব বাদ দিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকলাম। ওয়াল ঘড়িতে তখন বাজে নয়টা কিন্তু বৃষ্টিতো কমেই না বরং আরো বাড়তেছে। ঠিক আমার সামনে এসে বসল সে। চোখের দিকে তাকিয়ে বলল ” শোন আমি কিছু কথা বলব কথার মাঝে কোন কথা বলবি না “। মাথা কাত করে সায় দিলাম যে আচ্ছা কিছুই বলব না। ” জানিস নিপা যখন আমি তোদের বাসায় প্রথম এসেছিলাম জয়ের সাথে তখন তুই মনে হয় ক্লাস সেভেনে পড়িস। আমি আসলে সবাই আসলেও তুই কিন্তু আসিস নাই আমার সামনে মনে আছে তোর? পর্দার আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে দুইটা সাদা সাদা চোখ আমাকে দেখছিল। আমি কিন্তু খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতেছিলাম মুখ খানি দেখার জন্য” এই বলেই মুচকি হাসি দিল রাসেল ভাই। আমি অপলক চেয়ে শুনতেছি তার কাহিনী। ” পরের দিনও জয়কে ডাকার উসিলায় এসেছিলাম ও মুখটা দেখতে শুনি স্কুলে চলে গিয়েছিস তোরা। এর পরে আর বাসায় আসতাম না স্কুলের আসার পথে এমন এক জায়গায় দাঁড়াতাম যাতে তোরা কেউ দেখতে না পারিস। প্রথম দিন তোকে স্কুল ড্রেসে দেখে আমার এত্ত হাসি পেয়েছিল যে এই পিচ্চিকে এত পছন্দ করার আছে কি। কিন্তু তুই যখন ওই দুইটা চোখ নাড়িয়ে নাড়িয়ে কথা বলিস আমার মনে হয় পুরো পৃথিবী এক পাশে আর তোর ওই দুই চোখ অন্য দিকে। যখন তুই টেনে উঠলি তখন এক অন্য চিন্তা শুরু হল তোকে হারিয়ে ফেলার ভয় ঢুকলো মাথার ভিতরে। তোর চারদিকে অদৃশ্য ঢাল হয়ে গেলাম। কাউকে তোর পর্যন্ত আসতেই দিতাম না৷ ” এটুকু বলেই রাসেল ভাই বড় একটা নিশ্বাস ছাড়ল। যেন অনেক দিনের জমানো ব্যাথা দূর হয়ে গেল তার। তখন বুঝলাম স্কুল কলেজে আমার দিকে চেয়ে কেউ হাসলে পরের দিন তাকে দেখতাম আমার দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাতে। এই হল তার আসল কাহিনী। রাসেল ভাই আবারও বলতে লাগল ” তুই কি করিস কই যাস সব সময় ছায়ার মত থাকতাম তোর সাথে। যখনই বৃষ্টি হত আমি সব ফেলে তোদের বাসার সামনে চলে আসতাম। আমি জানতাম তুই বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি ধরবিই। কিন্তু কখনও তোকে বুঝতে দেই নি যে আমি তোকে ভালবাসি। কেউ যদি আমাকে বলে একদিকে তুই অন্য দিকে সারা পৃথিবী তাহলে আমি বলব আমার তোকেই চাই “। আমার যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না যে এই মানুষটা আমাকে এত এত ভালবাসে। নতুন করে যেন আবিষ্কার করছিলাম মানুষটাকে। কিন্তু বুকটা ভেঙ্গে যাচ্ছিল এই ভেবে যে আমি এখন কি করব। আমি যে আজ অন্যকারো। ” তোর দিকে কেউ তাকালে যেন আমার মাথায় রক্ত উঠে যেত। মনে হত তোকেই মেরে ফেলি কেন তুই এত সুন্দর। আর কেনই বা অন্যকেউ তোর দিকে তাকাবে? তুই যখন ওড়না পেঁচিয়ে মাথায় ঘোমটা দিয়ে বের হইস তখন তোকে মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কেউ থাকলে সেটা হলি তুই। তোর লম্বা লম্বা চুল গুলো ছেড়ে রাখিস তার ঘ্রানে আমি পাগল হই ” এটুকু বলেই আমার হাত ধরল সে। আমিও যেন কোন বাঁধা না দিয়ে তার কথায় মত্ত হয়ে গেলাম। রাসেল ভাই আবার বলতে শুরু করল ” জয়ের হলুদে তোর নাভির উপরের তিল দেখে মনে হচ্ছিল এত্ত সুন্দর একটা জায়গায় তিল শুধু তোরই হয়ে পারে অন্য কারো না। খুব ইচ্ছা করছিল আলতো করে ছুঁয়ে দেই তোর ওই তিলটা। বিয়ের আগের দিন জয় যখন আমাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে পরীর সাথে দেখা করতে গেল আমার খুব ইচ্ছা হচ্ছিল আমিও তোকে একটু দেখি ঘুমিয়ে গেলে তোকে কেমন দেখায়। তুই জানিস ঘুমের মধ্যে তুই কি পরিমাণ নড়াচড়া করিস? সেদিন হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যেতেই আমার পাশে তোকে দেখে কি পরিমান আশ্চর্য হয়েছিলাম তুই জানিস! মিনে হচ্ছিল এ যেন স্বপ্ন কিন্তু তোর ওই ঠোঁটটা আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে বুঝেছিলাম যে আমার স্বপ্নটা সত্যিই হয়েছে। কতক্ষন যে তোকে হাঁ করে দেখদছিলাম আমি নিজেও জানি না। ঘুম ভাঙ্গে তোর রাম চিমটি খেয়ে। দেখি তুই আমার বুকের উপরে শুয়ে মুখ উঁচু করে আমাকে দেখছিস। তুই যখন উঠে গেলি মনে চাচ্ছিল তোকে আবার টেনে আমার বুকের উপরে নিয়ে শুয়ে থাকি। কিন্তু তুই তো তুই আবালের রাণী ” এতটুকু বলেই বড় একটা নিশ্বাস নিল সে।

” এত যখন ভালবাসতেন তো বলেন নি কেন আগে” এই প্রথম কথা বললাম আমি। ” তোকে খুব বেশি হারানোর ভয় ছিল রে। বাসার সবাই জানতো আর রাজিও ছিল। জয়কেও ইশারা ইঙ্গিতে বুঝিয়েছিলাম আমি তোকে পছন্দ করি। কিন্তু সমস্যা ছিল তোর বড় দুই বোন। ওদের বিয়ের আগে তো আর তোকে কখনোই বিয়ে দেবে না ” এটুকু বলেই যেন আমার হাতটা আরো শক্ত করে মুঠি করে ধরল রাসেল ভাই। নিজেকে যেন আর বাঁধা দিতে পারলাম না। হুহু করে উনার বুকের উপরে পড়ে কাঁদতে লাগলাম। ” আমিও যে আপনাকেই ভালবাসি। এখন কি হবে আমার যে বিয়ে হয়ে গেছে। কখনোই আর ফ্যামিলি মেনে নেবে না আপনার আমার ভালবাসা” উনাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললাম। ” নিপা তোর কি মাথা ব্যাথা করতেছে? একটু শুয়ে পড় আমি তোর মাথায় হাত বুলিয়ে দেই ” হঠাৎই রাসেল ভাই এককথা বলে উঠলো। এত রাগ যে হল বলার মত না। আমি কাঁদি আমার আবেগে আর উনি আছে উনার তালে। কিসের মধ্যে কি পান্তা ভাতে ঘি। রাগ করে খাটের ওয়ালের সাইডে ফিরে শুয়ে পড়লাম। উনি আস্তে আস্তে আমার পাশে শুয়ে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। এমন করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি সেটা নিজেও জানি না।

ধুম ধুম কিলের আওয়াজে চোখ খুলে দেখলাম ঘরে সূর্যের আলো ঢুকছে। এত তাড়াতাড়ি সূর্য উঠল কি করে। হঠাৎ মনে হল দিন হয়ে গেছে। তারপর মনে হল হায় আল্লাহ রুমে তো রাসেল ভাই ছিল সে কই। চারপাশে তাকিয়ে দেখি রুম খালি। দরজার শব্দে আবার মনে পড়ল রাসেল ভাই বাইরে গেলে দরিজা ভেতর থেকে আটকালো কে আজব তো। রুমে আর কেউ ছিল নাকি। মাথা ঝাড়া দিয়ে মাথা পরিষ্কার এর চেষ্টা করলাম। বড় বড় নিশ্বাস নিলাম যাতে ব্রেন পর্যন্ত অক্সিজেন যায়। ভাল করে খেয়াল করে দেখিলাম আমি রাসেল ভাইয়ের পিঠের উপরে ঘুমিয়ে ছিলাম এতক্ষন। ইয়া খোদা আবারও একই ভুল। না আগের বার তো একটা কাহিনী ছিল কেউ দেখে নাই। এত বড় এক্কটা মানুষকে আমি কি করে লুকাবো। ওদিকে দরজায় আঘাত করেই যাচ্ছে। এখন না খুলে উপায়ও নেই। কিন্তু দরজ খুললে হবে টা কি। এই ভেবে সাত পাঁচ চিন্তা করতে করতে দরজা খুলেই দেখি বড় খালাম্মা সামনে………….

চলবে
মারিয়া আফরিন নুপুর