তবুও_তুমি ৪র্থ পর্ব

0
790

তবুও_তুমি
৪র্থ পর্ব

” বুকের উপরে ঘুমিয়ে ছিলি কেন ” রাসেল ভাইয়ের ফিসফিসে গলায় প্রশ্ন শুনে মনে হচ্ছিল বুকের ভেতরের হার্টটা এমন জোরে লাফাচ্ছে যে গলা পর্যন্ত উঠে আসছে। আমি তো ভাইয়ার পাশে শুয়েছিলাম। ভাইয়া কখন যেয়ে আপনাকে এখানে রেখে গেল এতটুকু বলেই বুঝলাম উনি রাগে ফুলে ফেঁপে বেলুন হয়ে গেছে কিন্তু কেন। ” বাড়িতে এত জায়গা থাকতে জয়ের রুমে আসলি কেন ঘুমাইতে “? রাসেল ভাইয়ের প্রশ্ন শুনে কতক্ষন দম ধরে রেখে বললাম ” সারা বাড়িতে জায়গা ছিল না তাই একটু ঘুমাতে এসেছিলাম “। ” রান্না ঘরের ফ্লোরে কি জায়গা ছিল না? ওখানে ঘুমিয়ে পড়তি এই রুমে কেন এসেছিস” এটুকু বলেই চুপ করে গেল রাসেল ভাই। কান পেতে যেন শুনছিল কেউ আছে কি না বাইরে। চাপা একটা নিশ্বাস ফেলে আবার শুরু করল ” এত বড় ধিঙ্গি মেয়ে নাচতে নাচতে এসেছে ভাইয়ের রুমে ঘুমাতে, বাহ কি মজা”। এসব কথা শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল ফ্লোরটা ফাঁকা হয়ে যাক আর আমি ফ্লোর খুঁড়ে ভেতরে ঢুকে যাই। কান থেকে যেন গরম ধোঁয়ার মত কিছু একটা বের হচ্ছিল টের পাচ্ছিলাম। শান্ত কন্ঠে বললাম ” ভাইয়ার সাথে ঘুমাতে হলে এত কিছু চিন্তা করার তো কোন প্রয়োজনই নেই তাই না?” এটুকু বলেই অন্ধকারে আবছা আলোতে তার মুখের দিকে তাকালাম। কেন জানি না এই মানুষটার শরীর থেকে মাতাল করা একটা ঘ্রাণ আসে। আচ্ছা সে কি ঘুমানোর আগেও পারফিউম স্প্রে করে ঘুমায় নাকি? বুকের দিকে তাকিয়েই লজ্জায় কুঁকড়ে গেলাম ইসস ওই বুকে কতক্ষন মাথা দিয়ে ঘুমিয়েছি কে জানে। আমি উঠে দাঁড়ালাম ঘুমানোর জন্য কালকে বিয়ে আজকে ঘুমাতে না পারলে আর বিয়ে চোখে দেখা লাগবে না আমার। অন্ধকারে দিক ঠিক করতে না পেরে টেবিলের কোনায় বেঁধে দুড়ুম করে ফ্লোরে পড়লাম। পড়ার পরে মনে হল চোখে যেন হলুদ হলুদ সরিষা ফুল দেখতেছি। ধাতস্ত হয়ে বসতেই টের পেলাম একটা উষ্ণ হাত আমার কপালে এসে ছুঁয়ে দিল। এ যেন অন্য এক অনুভব। মুখটাকে কানের কাছে এসে রাসেল ভাই বলল ” চোখ কি কপালে দিয়ে হাটিঁস নাকি? ” এটুকু বলেই আড়কোলে তুলে নিল আমাকে। সব সময় রাগি লুকে চলা মানুষটার এত কেয়ারিং রুপ দেখে মনে হচ্ছি হয় আমি ভুল দেখছি না হয় এ অন্য কোন লোক। আমাকে আস্তে করে বিছানায় শুয়ে দিয়ে বলল ” নিপা ঘুমিয়ে পড় অনেক রাত হয়েছে “। আপনি ঘুমাবেন না? আমার এই প্রশ্ন শুনে হঠাৎই জানি উনার কি হল বলল ” তোর সাথে ঘুমালে আবার তুই ঠেলেঠুলে বুকের উপরে উঠবি”। মানুষটা এমন কেন এটুকু ভেবেই কম্বল টেনে দিলাম শরীরের উপরে। মাথাটা আস্তে করে উঁচু করে দেখলাম সে করেটা কি। বালিশ আর কম্বল নিয়ে সোজা সোফায় চলে গেছে। মনে মনে ভয়াবহ এক ইচ্ছা উঁকি দিচ্ছিল। তাড়াতাড়ি করে কম্বল মুড়ি দিলাম আবার যে অবস্থা কখন জানি কি হয়ে যায়৷

পরের দিন ঘুম ভাঙ্গল বেশ বেলা করে। চোখ খুলে দেখি ভাইয়া পাশে ভুসভুস করে ঘুমাচ্ছে। চোখ কচলে উঠে দেখলাম সত্যি কি না দেখলাম যে সত্যিই তো এটা ভাইয়া। সোফার দিকে তাকিয়ে দেখি এলোমেলো হয়ে রাসেল ঘুমাচ্ছে। তাড়াতাড়ি উঠে আস্তে করে রুম থেকে বের হয়ে দরজা টেনে দিলাম। মাথা চুলকাচ্ছি আর ভাবতেছি কাহিনী কি হল। ভাইয়া ছিল কই সারারাত। সেটা তো বের করবই আপাতত সামনে যে প্রশ্ন পর্বের সিডর আসতেছে তা সামলাবো কি করে। আমাকে দেখেই বড় আপু বলে উঠলো ” কি রে নিপা কই ছিলি এতক্ষন, সকাল থেকে তোকে খুঁজতেছি আমি “। বড় আপুর কথা শেষ হতেই আমি উওর দিতে যাব এমন সময় কোথা থেকে যেন ছোট মামি এসে হাজির। হাত ধরে টান দিয়ে বলল ” নিপা তাড়াতাড়ি আসো ব্লাউজের ফিটিং দেখবা “। হঠাৎই ছোট ভাবির উদয় ” নিপা তাড়াতাড়ি এসো শাড়ি সিলেক্ট করে দিবা “। মোটামুটি রশি টানাটানির মাঝে পড়ে গেলাম আমি। কোন রকমে বললাম ” আমি এখনও হাত মুখ ধুই নি আগে আমারে একটু ফ্রেশ তো হইতে দেও তোমরা “। হাত ছুটিয়েই সোজা ওয়াশরুমে ঢুকলাম মনে চাচ্ছিল ওয়াশরুমের ছোট জানালা ভেঙ্গে সোজা বাইরে লাফ দিয়ে বসি। আল্লাহর দুনিয়ায় কি খালি আমার সাথেই এমন হয়। দাঁতে ব্রাশ ঘসতেছি আর ভাবতেছি কপাল কাহাকে বলে কত প্রকার ও কি কি কেউ আমার কাছ থেকে এসে জানুক। ফ্রেশ হয়ে যখন বের হলাম দেখি ভাবি আর মামি তখনও ওয়াশরুমের দরজার বাইরে দাঁড়ানো। মনে চাচ্ছিল গড়াগড়ি দিয়ে কান্না করি যে যাই হোক বললাম আমি নাস্তা খেয়ে সবার রুমে আসতেছি । আপাতত আমারে একটু ছেড়ে দেন। নাস্তার টেবিলে দেখি মিষ্টির ছড়াছড়ি আর ব্রেডবিনে মাত্র তিন পিস পাউরুটি। জিজ্ঞেস করলাম এই নাস্তা। খালা বলল খিচুড়ি চুলায় অপেক্ষা করতে। কিন্তু আমি জানি এই যদি না খাই আর কপালে কিছুই জুটবে না। বিয়ে বাড়ি বলে কথা। এক কামড় পাউরুটি মুখে দিয়ে মিষ্টি মুখে দিতে যাব এমন সময় মিলি এসে ছোঁ দিয়ে মিষ্টিটা মুখে নিয়ে চলে গেল। করুন নয়নে তাকিয়ে ভাবতেছিলাম বড় বোন হওয়ার মজা কতটুকু। কোনরকমে পাউরুটি আর মিষ্টি নাকে মুখে গুজে যখন উঠলাম দেখি ভাইয়া আড়মোড়া ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে রুম থেকে বের হচ্ছে। মনে মনে ভাবলাম ” এই বার চান্দু তুমি কই যাবে “। আস্তে করে উঠে সোজা ভাইয়ার সামনে। আমাকে দেখেই ভাইয়া যেন একটু থতমত খেয়ে গেলেন। টেনে ভাইয়াকে এনে রুমের দরজা দিলাম।
___ ভাইয়া কালকে সারা রাত কই ছিলে তুমি?
___ আবাল রানী তুই যে রাতে আমার পাশে ঘুমাইলি সেটাও কি ভুলে গেছিস? তোর তো কপাল ভাল যে আমি তোরে ঘুমাইতে দিছি।
___ ভাইয়া শোনো তোমার ফালতু জোক্স তোমার কাছে রাখো। কই গেছিলা যদি সত্যি না বলো সোজা খালারে ডেকে নিয়ে আসবো।
এটুকু বলেই যখন ঘুরলাম তখনও দেখি রাসেল ভাই পড়ে পড়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। ইসস মানুষ ঘুমালে বুঝি এত্ত কিউট দেখায়। ভাইয়া হাত জোড় করে সামনে দাঁড়ালো ” নিপা শোন না বুবু, আমি গেছিলাম এক জায়গায় তাই বলে কি আম্মারে ডাকবি না কি তুই? তুই তো আমার সোনা বুবু! ” মাঝে মাঝে ভাইয়ারে দেখলে মনে হয় তেল মারার উপরে ও পি এইচ ডি ডিগ্রী নিছে। জিজ্ঞেস করলাম গেছিল কই। একটু খানি মোচড়ামুচড়ির পরে যেই চেপে ধরেছি সোজা গড় গড় করে বলল ” আমি অসুস্থ তোর ভাবি দেখতে চেয়েছিল আমাকে তাই ওর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম”। ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে মনে চাচ্ছিল ওরে মার্ডার করে আমি সোজা জেলে চলে যাই। এই সামান্য বিষয়টা বলতে ওর এমন করা লাগে। কিছু না বলেই সোজা চলে আসি।
“এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি সাপ্তাহে জিতে নিন বই সামগ্রী উপহার।
আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এখানে ক্লিক করুন
ভাইয়ার রুম থেকে বের হয়ে বাসার দিকে তাকাতেই মনে হল আমি যেন সার্কাস দেখছি। আসলেই আমাদের ফুল ফ্যামিলিটা একটা সার্কাস পার্টি আর সবাই এই পার্টির সদস্য। মিলি জিমিকে দেখলাম দুইটা এক মুঠ চুড়ি নিয়ে টানাটানি করতেছে মাঝখান থেকে ছোট খালা মনি খপ করে এসে চুড়ির মুঠ নিজের জন্য নিয়ে গেল। দুইটা কতক্ষন চুপ থেকে একটা অন্যটাকে দোষ দেওয়া শুরু করল। বড় আপু হাতে এখন না দুপুরের পরে মেহেদি দেবে তাই নিয়ে গভীর চিন্তায় ব্যাস্ত।মানহা আপু দশ মিনিট পর পর ড্রেস চেঞ্জ করছে আর এক একজনকে ধরে ধরে জিজ্ঞেস করছে হইছে কেমন। বাই চান্স কেউ যদি খারাপ বলেছে সেই ড্রেস ক্যান্সল করে অন্য ড্রেস পরতেছে। ছোট খালামনি খালুকে স্ট্যান্ড বাই দাঁড় করিয়ে রেখেছে তার ব্লাউজের ফিটিং এর জন্য। বড় ভাইয়া একটু পর পর কোন এক কারনে মাথা একবার এদিকে আর একবার ওদিকে নাড়াচ্ছে। যে ভাব করতেছে মনে হচ্ছে নিউটনের নানা শশুর। সবচেয়ে বেশি প্রেশারে আছে মনে হচ্ছে খালা। মাথায় আইস ব্যাগ বেঁধে নিয়েছেন। আর একটু পর পর খালুকে বলছেন ” বুজ্জচ্ছ জয়ের আব্বা যদি জানতাম পোলা বিয়া করানো এত ঝামেলা তাইলে আর পোলা পয়দাই করতাম না “। খালু কিছু না বলেই ফ্যাল ফ্যাল করে খালার দিকে তাকাচ্ছেন। কেন জানি না আমারও মনে হচ্ছে খালার মানসিক কোন সমস্যা হয়েছে। কেমন কেমনই জানি করতেছেন। সারা সকাল পার হল এই অবস্থা করতে করতে।দুপুরের খাবারের সময় মোটামুটি বিশাল এক হট্টগোল বেঁধে গেল খাওয়া নিয়ে। অনেক খুঁজেও কারন যখন বের করতে পারলাম না তখন না পেরে ছোট মামির কাছে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে। মামি বিরাস বদনে উওর দিল ” মাথা নিয়ে তোর দুই মামা মাইর বাঁধাইছে। তারা তর্কাতর্কি করার সময় ছোট খালু এসে তরকারির বাটি থেকে বড় মাথা নিয়ে চম্পট দিয়েছে “। মামির কথা শুনে হাসবো না কাঁদবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। যাদের বাচ্চাদের আজ বাদে কাল বিয়ে দেবে তারাই ছোট বাচ্চাদের মত মাইর করে।কেন জানি না তখন মনে হল আমরা এমন কেন এর কারন আজকে বের হল।
দুপুরের পরে সবাই মেয়েরা মোটামুটি রেডি হচ্ছে পার্লারে যাওয়ার জন্য। আমি আর খালাই থাকতেছি বাসায়। আমার কেন জানিনা মনে হয় পার্লারে সাজলে আমারে আলিফ লায়লার দৈত্যের মত মনে হয়৷সব মেয়েরা যখন দুপুরের পর পরই চলে যায় তখনই আমি আর খালা মোটামুটি কোমরে ওড়না বেঁধে ঘর গোছাতে লেগে গেলাম। আমি আমাদের রুম গোছায়ে যখন ভাইয়ার রুমে ঢুকলাম তখনও দেখি রাসেল ভাই ঘুম। কখন যে খাটে এসে ঘুমিয়েছে কেইবা জানে। ভয়ংকর একটা ইচ্ছায় পেয়ে বসল আমাকে কেন জানি না মনে হচ্ছিল এই কাজটা করলে কেমন হয়। আমি আস্তে করে দরজা চাপিয়ে দিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটু ভর দিয়ে খাটের উপরে উঠলাম। কম্বলটা ধীরে ধীরে তার শরীর থেকে সরিয়ে দিলাম………

চলবে
মারিয়া আফরিন নুপুর
পর্ব ৩
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=458442428087744&id=212049839393672