তবুও_তুমি ৬ষ্ট পর্ব

0
809

তবুও_তুমি
৬ষ্ট পর্ব
.
” খোদার কসম নিপা আমি রেনুরে সত্যিই চিনি নাই” এটুকু বলেই খালু কেমন জানি কাঁদো কাঁদো চেহারা করে ফেললেন। আসলে খালুকে যে কি বলে স্বান্তনা দেবে তাই বুঝতে পারছি না। বললাম ” খালু মন খারাপ করবেন না। খালামনি তো এমনিতেই একটু মাথা গরম। রাত পর্যন্ত আর এই ঘটনা মনে থাকবে না”। ” মা গো রাগ কইরো না একটা কথা বলি, মেয়েরা লক্ষ টাকা কই রাখছে সেটা ভুলে যেতে পারে কিন্তু আল্লাহ না করুক স্বামী যদি কিছু করে মরনের আগ পর্যন্ত ভোলে না” এটুকু বলেই বিশাল এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। খালু খালামনিকে প্রচন্ড পরিমান ভয় পায়। খালু কেন আমি নিজেও মাত্রাতিরিক্ত ভয় পাই খালামনিকে। উনি রেগে গেলে উনার কথার কোন ব্যালান্স থাকে না। মুখে যা আসে তাই ছাড়তে থাকে।খালামনির ওই বচন শোনার চেয়ে শীতের দিনে মাঝ রাতে খালি গায়ে পুকুরে গলা পর্যন্ত পানিতে বসে থাকা অনেক শান্তির। মনে মনে খালুর পালা চিন্তা করে হাসিও পাচ্ছিল আর কান্নাও পাচ্ছিল। সে এক মিক্সড অনুভূতি। খালু আমার পাশে বসে বসে একটু পর পর বিশাল বিশাল শ্বাস ফেলছিল্। আমার কেন জানি না মনে হচ্ছিল এই শ্বাস গুলো যদি সাগরের মাঝে ফেলত নির্ঘাত ” সুনামি ” হয়ে যেত। ” কি ব্যাপার বিয়াইন কেমন আছেন”? হঠাৎই এই প্রশ্নে উপরে তাকিয়ে কেমন জানি আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে লাগল। সাদ এসে হাসি মুখে আমার সামনে দাঁড়ানো। তাড়াতাড়ি চারদিক খুঁজে দেখলাম রাসেল ভাই নামক ভয়াবহ জিনিসটা আছে নাকি কোথাও। যখন দেখা শেষ হল মিষ্টি করে একটা হাসি দিয়ে বললাম ” আলহামদুলিল্লাহ ভালো, আপনি? “। আমার আর সাদের কথোপকথন এর মাঝেই ঝুমু এসে হাজির। আমার দিকে চেয়ে চোখ টিপ দিয়েই সাদকে বলল ” কি ব্যাপার সাদ ভাই তুমি এখানে? তোমার তো গরমে নাকি প্রান যায় যায়! “। ” আচ্ছা ঝুমু তোমার সমস্যা কি? এত কিউট একটা মেয়েকে দেখলে তো নিজের মনে হয় আমি সাইবেরিয়াতে আছি ” এটুকু বলেই হাসে উঠল সাদ। ” বাহ, আমার ভাইয়াটাও দেখি ফ্লার্ট করে ” ঝুমুর কথা শুনে আমার কান লাল হয়ে যাচ্ছিল সাদও তাড়াতাড়ি কাজের অযুহাত দেখিয়ে সোজা চলে গেল। বিয়ে বাড়ির সব পর্ব মিটিয়ে যখন বাসার জন্য রওনা দিলাম তখন প্রায় সাড়ে ১১তা বাজে। খালারা ভাবিরা আগেই চলে গেছে। এর মধ্যে একটা কাহিনী হল আমি সারা বিয়ে বাড়িতে রাসেল ভাইকে খুঁজেছি কোথাও পাই নি। মানুষটা গেল কই! বিয়ে বাড়িতে কি আসেই নাই। আপুরা পিচ্চি গুলো ভাইয়ারা সব গাড়িতে উঠে গেছে আমি উঠতে যাব এমন সময় পিছনে কে যেন আমাকে আলতো করে হাত ধরে। ঘুরে দেখি রাসেল ভাই। চোখ বড় করে কিছু বলতে যাব এমন সময় ঠোঁটে হাত দিয়ে চুপ করতে বলল। কানের কাছে এসে বলল ” ছাদে আসিস আজকে তোর ক্লাস নেবো। যদি রাতে তোরে ছাদে না পাই তো বুঝিস তোর এক দিন কি আমার একদিন” এটুকু বলেই চলে গেল।

গাড়িতে উঠে সারারাত মুরগির মত ঝিমাতে ঝিমাতে এলো। নতুন ভাবিকে তার রুমে দেওয়া হল। ভাইয়ার বন্ধুরা খুব মজা করতেছিল। রাসেল ভাইকে দেখলাম শিহাব ভাইকে নিয়ে ভাইয়াকে ক্ষেপাচ্ছে। এই মানুষটাকে দেখলে কে বলবে যে সে এতটা রাগি। আচ্ছা উনি আমার সাথে এমন করে কেন সব সময়। আমি করেছি কি উনাকে। এত মানুষ থাকতে আমার সাথেই কেন এমন করে। কতক্ষন যে ধ্যান ধরে উনার দিকে তাকিয়ে এসব ভাবছিলাম আমি নিজেও জানি না। রাত প্রায় দেড়টার দিকে শোয়ার ব্যবস্থা হল। জয় ভাইয়া রুমে যেয়ে দরজা দিতেই ভাবিরা সব কান পেতে দাঁড়ালো দরজায়৷ ” নিপা এদিকে আয় তো, সবাই শোয়ার ব্যবস্থা তোর আর আমার করতে হবে। এরা যে যার মত গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে” এটুকু বলেই খালা ঘুরে রুমে ঢুকলো। আমিও কুইক মার্চ করতে করতে খালার পিছনে যেয়ে হাজির। সিদ্ধান্ত হল মেয়েরা সব একরুমে ঘুমাবে ছেলেরা অন্য রুমে। যারা একটু বয়স্ক সেই মহিলারা খালার রুমে আর পুরুষরা ড্রয়িংরুমে। সেই সেটা আপে বিছানা করে ঘড়ি দেখলাম পুরো দুইটা। পাঁচ বোন বড় বড় শ্বাস নিলাম এই ভেবে যে আল্লাহ বাঁচাইছে কাজ সব কমপ্লিট করে ফেলেছি। বড় আপু তাড়াতাড়ি যেয়ে খাটের কোনা দখল করে শুয়ে পড়ল। আসলে সারাদিনের এই ধকল কারোই কুলাচ্ছে না শরীর দশ মিনিটে বাসা মোটামুটি মরা বাড়ি হয়ে গেল। আমিও ঘুমাতে যাব যাব করছি তখন মনে পড়ল ইসস আমাকে তো ছাদে যেয়ে বলেছিল। এত প্যারা আর ভাল লাগে না। মন চায় হয় আমি মরে যাই না হয় ওই লোককে মেরে ফেলি। ড্রয়িংরুমে যেয়ে যেই মেইন গেট খুললাম ছাদে যাওয়ার জন্য দেখি বড় মামা নড়াচড়া করছে।তাড়াতাড়ি দরজা চাপিয়ে কি করে যে বের হয়েছি নিজেও জানি না।

ছাদের দরজা আলতো হাতে মেলে ধরতেই চোখে কাউকে পড়লো না। নিজের বোকামির উপরে নিজেরই জিদ লাগল। হায়, একবার বলল ছাদে আসতে আমিও এই রাত দুইটায় ঢাং ঢাং করতে করতে ছাদে চলে এসেছি। আস্তে করে ছাদে উঠতেই দেখি শর্টস পরে একটা টিশার্ট গায়ে পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চির এক লাম্বু দাঁড়ানো। ধীর পায়ে তার সামনে যেয়ে দাঁড়াতেই আমার দিকে ঘুরল। ” রাতে আসতে বলেছিলাম তুই তো ভোরে এলি ” এই বলেই আমার সামনে এসে দাঁড়ালো রাসেল ভাই। আমি বললাম,
___সব কাজ গুছিয়ে তারপর এসেছি।
___ কেন তুই কি কাজের বেটি জরিনা নাকি যে সব কাজ গোছেয়ে সাহেব ম্যাডাম ঘুম পাড়িয়ে তারপর তোর ডিউটি শেষ হয়।
___ আমি এমন কখন বললাম?
___ এই সব ছোট ছোট কাসুন্দি বাদ। মেইন মুর্দায় আসি আজকে তোকে বিয়ে বাড়ি যাওয়ার আগে কি বলেছিলাম?
___ আপনি তো সারাদিনই কথা বলতেই থাকেন কোন কথাটা ঠিক মনে করতে পারছি না তো।
তখনই আমার সামনের হাতটা মুচড়িয়ে পেছনে নিয়ে গেল। আমার পিঠ একদম তার বুকের সাথে লাগানো আর হাতটা তার হাতে ধরা। তার তপ্ত প্রতিটা নিশ্বাস আমার ঘাড়ের উপরে পড়ছে আর তার আবেশ শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ছে। এ যেন এক অন্য অনুভব। জীবনের এত বসন্ত চলে গেল এমন অনুভব তো আর কখনোই আমাকে ছুঁয়ে যায় নি। অনেক চেষ্টা করছিলাম হাতটা ছাড়ানোর জন্য। কিন্তু কথায় আছে পুরুষ মানুষের সাথে মেয়েরা শক্তিতে কখনোই পারে নাই।কানের কাছে মুখ এনে বলল ” সমস্যা কি তোর। সাদ পাদের জন্য মায়া যেন উথলায় উঠেছে “। এই বলেই হাত আরো পেছনে টেনে ধরল। আমি যেন উনার বুকের সাথে আরো বেশি মিশে গেলাম। সমস্যার ভিতরে সমস্যা একটাই হল উনার শরীরের সেই ঘ্রান আবার আমাকে মাতাল করে তুলতে লাগল। উনি কিন্তু দিব্যি আমাকে বকেই যাচ্ছে কিন্তু আমি কেন জানি না কিছুই শুনতে পারছি না।

আমার একটা সমস্যা আছে বিদ্যুৎ চমকালে আমি আর আমি থাকি না । প্রচুর ভয় পাই এই বিদ্যুৎ এর ঝিলিককে। যখন উপরে এসেছিলাম আকাশ ঘন অন্ধকার ছিল। হাত মুচড়িয়ে ধরে রাসেল ভাই যখন আমার রিমান্ডে নিচ্ছিল হঠাৎই দেখি সারা পৃথিবী যেন আলোকিত করে বিশাল এক বিদুৎ এর চিলিক আকাশের মেঘকে দ্বিখণ্ডিত করে দিল। এতটুকু দেখেই আমার যেন সব হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে গেল। সোজা ঘুরেই রাসেল ভাইকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। ” এই নিপা ছাড় বলছি কি ফাজলামি শুরু করেছিস। চড়িয়ে দাঁত সব ফেলে দেবো”এসব বলতেই উনাকে শুধু বললাম আমার দুই কান চেপে ধরেন।উনি কি বুঝলেন কে জানে সত্যিই উনার দুই হাত দিয়ে আমার কান চেপে ধরল। পর মূহুর্তেই গগন বিদারী এক শব্দ। আমি আরো জোরে দু হাত দিয়ে আকড়ে ধরলাম তাকে
। যেন তার বুকের মধ্যে ঢুকে যেতে পারলে রেয়াদ করি না। আমার এই হঠাৎ করা কাহিনী দেখে রাসেল ভাই নিজেও যেন হতভম্ব হয়ে গেছে। কেন জানিনা আমার মনে হল উনিও আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। এমন করে আরো কতক্ষন বিদ্যুৎ চমকানোর পরে শুরু হলে হঠাৎ করেই মুশল ধারে বৃষ্টি। আমি উনাকে ছেড়ে দিয়েই নিচে নামার জন্য যেই ঘুরলাম আমার হাত ধরে টেনে ধরল। ” মিস তেলাপোকা বৃষ্টিরেও ভয় পাস নাকি ” এই বলেই মুচকি হাসি দিল। আমি কেমন জানি ঘোর লাগা চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। বৃষ্টিতে ভিজে তার টিশার্ট লেপ্টে আছে শরীরে। কেমন জানি নেশা ধরিয়ে দেয় ওই শরীরটা। ” বৃষ্টিতে ভিজলে আমার জ্বর আসে” এই বলেই আমি নিচে নামতে লাগলাম। “স্টোর রুমে একটা টাওয়েল নিয়ে আসিস” আমার পিছে পিছে নামতে নামতে বলল রাসেল ভাই। আমি আস্তে করে ভিজে কাপড় নিয়ে রুমে ঢুকলাম। সবাই ফ্লোরে এলোমেলোভাবে ঘুমানো ওয়্যারড্রায়ারের কাছে কি ভাবে যাব তাই ভাবতে ভাবতে খেয়াল আসল ওয়াশরুমে একটা পায়জামা আছে কিন্তু খালি পায়জামা দিয়ে কি করব আমি উপরে কি পরব। এই ভেবে একটা টাওয়াল নিয়ে ঢুকে পড়লাম। ওয়াশ বেসিনের আয়নার সামনে দাঁড়িয়েই নিজের দিকে তাকাতেই লজ্জায় একাকার হয়ে গেলাম।

গোলাপি কালারের একটা কামিজ পরেছিলাম আর কালো পাজামা ওড়না। কামিজটা বৃষ্টির পানিতে ভিজে শরীর প্রতিটি খাঁজ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। আমাকে খেয়াল করে নি তো মনে হয়। ইসস কি যে গরু আমি। গোসল করে উপরে চেয়ে দেখি মিলির একটা টিশার্ট পড়ে আছে আমার পাজামার সাথে। উপান্ত না পেয়ে সোজা পাজামা আর মিলির টিশার্ট পরেই বের হলাম। ভেজা চুলটাকে আলতো করে মুছে ছেড়ে দিলাম। হাতে টাওয়াল নিয়ে আবার বের হলাম রুম থেকে। এই রাত তিনটায় আমি পাগলের পাল্লায় পড়ে টাওয়াল হাতে দৌড়াইতেছি। যেখানে সবাই বিশাল আরামে ঘুমাচ্ছে। স্টোর রুমের সামনে যেয়ে দেখি ভাইয়ার বন্ধুরা দিকবেদিক হয়ে অঘোরে ঘুম। ভাল করে উঁকি দিয়ে দেখলাম রাসেল ভাই টিশার্ট খুলে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কোন রকমে ফাঁকফোকর দিয়ে কাছে যেতেই এক ঝাড়ি দিয়ে বলল ” টাওয়াল আনতে গেছিলি না সাহারা মরুভূমির বালি আনতে গেছিলি যে এত লেট হল “। ”
___আমি ড্রেস চেঞ্জ করে তারপর তো আসবো।
___ হ হ তুই তো রানি ভিক্টোরিয়ার আত্মীয় স্বজন। ড্রেস পালটাইতেই ১০ ঘন্টা লাগে।
আসলে এই মানুষটার সাথে তর্ক করা আর কচু গাছের সাথে গলায় দড়ি দেওয়া একই কথা। টাওয়াল টা এগিয়ে দিয়ে বললাম ” এই নেন আপনার টাওয়াল”। ” দেরি করে টাওয়াল আনার শাস্তি তো তোরে দিতে হবে” এই বলে আমার আরো কাছে এসে বলল ” আমার শরীর এখন তুই মুছে দিবি”। কোন রকমে টাওয়াল টা তার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললাম ” আমি পারব না আপনার শরীর আপনিই মুছে নেন ” ।

পিছনে আর না ফিরেই সোজা রুমে আসতে যাব এমন সময় দেখি ভাইয়ার রুমে ধুড়ুসধাড়ুস শব্দ। আমি ভাইয়ার রুমের সামনে যেয়ে দাঁড়াতেই দরজা খুলে গেল। জিমি আর ঝুমু যেন অপ্রকৃতস্থ মানুষের মত বেরিয়ে এল। আমি দেখলাম আমার পিছনে রাসেলও এসে দাঁড়িয়েছে। ভাইয়া দাঁতে দাঁত পিষে কি কি বলে যেন দুইটাকে বের করে দিয়েই দরজা লাগিয়ে দিল। জিমি আর ঝুমু ভাইয়ার রুমের খাটের নিচে ঢুকেছিল। কিন্তু এমন করে বের হল কেন আজব তো। ঝুমু ডাইনিং এর চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল। জিমি মাথা একটু পর পর,জোরে জোরে ঝাকাচ্ছে। পিছনে দেখলাম টাওয়াল গায়ে রাসেল ভাইও এসে হাজির।সবই ঠিক আছে কিন্তু এই দুইটারে এমন দেখাচ্ছে কেন? ঝুমু আর জিমির মাঝে যেয়ে দাঁড়াতেই ঝুমু আমাকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগল……….

চলবে
মারিয়া আফরিন নুপুর