দর্পণ পর্ব-০১

0
124

#দর্পণ
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ০১

দিলশাদ ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো। পুরো রুম অন্ধকারে তলিয়ে আছে। হঠাৎ ঘুম ভাঙায় দিন না রাত সে বুঝে উঠতে পারলো না। সে কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইলো। তাঁর ঘোর কাটলো কলিং বেলের শব্দে।
ওহ আচ্ছা! হঠাৎ ঘুম ভাঙার তাহলে এই কারণ।
সাথে সাথেই বিরক্তিতে তার চোখ মুখ কুঁচকে গেলো।

দুপুরের পর থেকেই বৃষ্টি । এই ঝড় বৃষ্টি মাথায় করে এই ভর সন্ধ্যায় কে আসলো? আর সবচেয়ে বড় কথা বাসায় সে একা। ঠিক একা না, তিহাও আছে। তিহা তাঁর খালাতো বোন। তবে আট বছরের মেয়ে থাকা আর না থাকা একই কথা। আব্বুর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। তাই আম্মু ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছে। ডাক্তার বসবে সন্ধ্যায়! সিরিয়াল দেওয়া। ঝড় বৃষ্টি দেখে আম্মু একটু আগে আগেই বের হয়েছে। আসতে রাত হবে। তাই যা হওয়ার হোক সে এখন দরজা খুলছে না।

সে হাতড়ে মোবাইল খুঁজে বের করলো। এই ঝড় বৃষ্টির মধ্যে ক্যারেন্ট কখন আসে কে জানে? সে আলো জ্বালালো! জ্বালাতেই নিজের দিকে তাকিয়ে নিজেই লজ্জা পেয়ে গেলো। ইশ!

এই ঝড় বৃষ্টি মধ্যে দু- বোন ঘরে বসে বসে করবে টা কি? তাই টাইম পাসের জন্য দিলশাদ নিজে শাড়ি পরেছে, তিহাকেও পরিয়েছে এবং ইচ্ছে মতো সাজিয়েও দিয়েছে। তিহার অবশ্য সাজুগুজুর খুব শখ। তারপরে দুজনে নুডুস রান্না করে ছোট খাটো পার্টি করেছে। তারপর খেয়ে দেয়ে গল্প করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে গেছে বুঝতেই পারে নি। আর এই ঘুমের মধ্যেই শাড়ির দফারফা হয়েছে। শুধু যে শাড়ি তা না। পেটিকোটও দুমড়ে মুচড়ে কুন্ডলী পাকিয়ে বিপদ সীমার কাছাকাছি চলে এসেছে। এ জন্যই সে ঢিলেঢালা কিছু পরে কখনও ঘুমায় না। ভাগ্যিস অন্ধকার ছিলো।

সে উঠে দাঁড়ালো! দাঁড়াতেই আবার কলিং বাজলো। আশ্চর্য! এখনও যায়নি?

এখন তুমুল বেগে বৃষ্টি হচ্ছে। এই বৃষ্টির মধ্যে একটা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, ভাবতে দিলশাদের মন কেমন জানি করে উঠলো। সে তাড়াতাড়ি কোন রকম কাপড় ঠিক করতে লাগলো ।

তাঁদের বাড়িটা তিনতলা। এই তিনতলা বাড়ির নিচতলার একটা ফ্ল্যাটে তাঁরা থাকে। আরেকটা সব সময়ই খালি। সেখানে বাড়িওয়ালা দুনিয়ার হাবিজাবি জিনিসপত্র রাখে। রাখুক! সমস্যা সেটা না। সমস্যা হলো? নিচতলা এখন পুরোটাই খালি। অবশ্য কেচিগেইটে সব সময় তালা থাকে। সবাইকে চাবি দেওয়া। যে ফ্ল্যাটের লোক আসবে। সে ফ্ল্যাটের কেও এসেই খুলে নিয়ে যাবে। তাই সে ঠিক করলো। শুধু ফ্ল্যাটের দরজা খুলবে। খুলে চলে যেতে বলবে। অযথা বৃষ্টির মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখার দরকার কি?

দিলশাদ ফ্ল্যাটের দরজা খুলে উঁকি দিলো। সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট পরা ছোট খাটো এক পাহাড় সাইজ লোক গেইট ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। ভিজে চুপচুপে। এটাই স্বাভাবিক! যে তুমুল বৃষ্টি! এই ছোট খাটো পাহাড়কে যদি ভেজাতেই না পারে, তবে আর পারলো টা কি ?

সে এগিয়ে গেলো। এই লোককে কোন দিক দিয়েই চোর, ডাকাত কিংবা খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে আশা কেও মনে হলো না। বরং সে ঠাঁট বাঁট নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে। তবে তাঁর চোখ দুটো লাল আর ঠোঁট ফ্যাকাশে হয়ে আছে। ইশ্! না জানি কতোক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে। সে আস্তে করে বললো,— কাকে চাচ্ছেন?

উসমান ঘুরে দাঁড়ালো! বিরক্তিতে তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। তাঁর ইচ্ছে করলো এই মেয়েকে কয়েকটা ঠাটিয়ে চড় মারতে। প্রায় আধা ঘন্টার মতো সে এখানে দাঁড়িয়ে আছে। কলিং বেল দিয়েছে ছয় সাত বারের ও উপরে। ঘরের ভিতরে থেকেও এই মেয়ের কোন খবর নেই। আশ্চর্য! আশ্চর্য হওয়ারও অবশ্য কিছু নেই। এই সব থার্ড ক্লাস শহুরে লোক দের কাছ থেকে আর কি আশা করা যায়। ময় মটকা থাকে সব খালি। কিন্তু এমন ভাব ধরবে, দরজা খুললেই খেয়ে ফেলবে।

যত্তোসব! আর এই বৃষ্টির! এই বৃষ্টি যদি না থাকতো, সে কখনও এতোক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে থাকতো না। এমন গিঞ্জি এলায় বৃষ্টির মধ্যে যে একটা রিকশাও যে পাবে না, সে ভালো করেই জানে। জানে বলেই দাঁড়িয়ে থাকা। আর সবচেয়ে বোকামি করেছে গাড়ি সাথে করে না এনে। আনলে অন্তত গাড়ির ভিতরে বসে থাকা যেত। সে ভাবলো অচেনা যায়গায়, অচেনা বাড়ি খুঁজে বের করাতো আর চাট্টি খানি কথা না। তাঁর মধ্যে আবার অলি গলি। গাড়ি কোথায় না কোথায় রাখবে। তাই ভাড়া গাড়িতে চলে এসেছে। সেও এসেছে তাঁর সাথে সাথে এই অসভ্য মেঘও এসেছে। তা না হলে গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথেই বৃষ্টি শুরু হবে কেন? তাঁর বৃষ্টি একদম অপছন্দ। শুধু তাঁর না, তাঁর শরীরেরও। পানি মাথায় পড়লেই জ্বর। আর আজতো! কি হবে কে জানে? সে দাঁতে দাঁত চেপে বললো, — এটা কি রাজ্জাক সাহেবের বাসা?

দিলশাদ উপর নিচে মাথা দোলালো! সাথে আস্তে করে চোখের আড়ালে আঁচল টেনে পেট ঢাকার চেষ্টা করলো। সে তাড়াতাড়িতে কুচি গুজেছে কি ভাবে কে জানে?তিন মাসের পেটের মতো উঁচু হয়ে আছে। ধুর্! অন্ধকারে ভালো ভাবে খেয়ালই করে নি।

— আমি তাঁর বড় মেয়ের দেবর! তাঁর সাথে একটু কথা বলার ছিলো। সে কি বাসায় আছে?

দিলশাদ রিতিমতো ঝটকা খেলো। আপুর দেবর, এখানে! কেন? সাথে সাথেই মনে ভয় হলো, ” আপু ঠিক আছে তো? লাষ্ট বার আপুর সাথে কবে কথা হয়েছে? সে ঠিক মনে করতে পারলো না। এক মাস নাকি তারো বেশি। আসলে সেতো আপুকে কখনও ফোন দেয় না। আপুই মাঝে মাঝে দেয়। সেই দেওয়াও যে এতোদিন হয়েছে, সে বুঝতেও পারেনি। অবশ্য না বোঝারও কিছু নেই। যা হচ্ছে তা সব আপুর জন্যই। একদিন ভার্সিটির কথা বলে আপু গায়েব। তাঁর আর কোন খবর নেই। বাসার কি যে অবস্থা। মার অবস্থা খারাপ, বাবার মুখের দিকে তাঁকানো যায় না। এর মধ্যে থানায় দৌড়াদৌড়ি! তবে কোন খবর নেই। খবর পেলাম দু-দিন পরে। আমার মোবাইলে আপুর কল আসাতে। রিসিভ করতেই একেবারে শীতল কন্ঠে শুধু বললো,— আমি বিয়ে করেছি, ভালো আছি, আর টেনশন করিস না। বাবা, মাকে দেখে রাখিস”।

কষ্টের এক সাগরে ফেলে। দেখে রাখার কথা বলা হাস্যকর। অন্তত সেইদিন দিলশাদের তাই মনে হলো। তাঁর গায়েব হওয়াতে বাবা, মা যতোটুকু ভেঙে পড়েছিলো। তাঁর চেয়ে হাজার গুণ ভেঙে পড়লো তাঁর এই কলে। সেই দিন আমার প্রথম মনে হলো। আপু সার্থপর! অনেক অনেক সার্থপর। শুধু নিজের দিকটাই দেখেছে।

আর এই সার্থপর মেয়েটা জানলোও না। তাঁর জন্য আমরা কতোটা কষ্টের মধ্যে দিয়ে গেলাম। বাবা মার চেয়েও আমি আপুকে বেশি ভালোবাসতাম। আর তো কোন ভাই বোন নেই। শুধু একটা বড় বোন। ভালো না বেসে যায়? সেই আপু কিভাবে দু- দিনের ভালোবাসার কাছে আমাদের তুচ্ছ করে ফেললো। কিভাবে? এক বার কি বলা যেতো না। বাবা, মা কি এমন? ঠিক মেনে নিতো। তাই ভাবলাম , কখনও আপুকে ক্ষমা করবো না। কখনও না। বলা যতো সহজ। করা অবশ্য অতো সহজ না। এক বছর আপু সাথে কোন যোগযোগ ছিলো না। থাকার অবশ্য কারণ ও নেই। আপু কাকে ভালোবাসতো, কার সাথে চলে গেছে, এখন কোথায় আছে তাঁর কিছুই আমরা জানতাম না। জানার অবশ্য চেষ্টাও করিনি। কি হবে জেনে? সে তাঁর রাস্তা নিজে খুঁজে নিয়েছে। তাই যেখানেই থাকুক, ভালো থাকুক।

তাঁরপর একদিন তাঁর ফোন আসলো! আমার কাছেই। বাবা,মার কাছে দেওয়ার কি আর মুখ আছে। আমি ফোন ধরে কিছুই বলতে পারলাম না। তবে একটা জিনিস বুঝলাম। ভালোবাসার মানুষদের ঘৃণা করা সহজ ব্যাপার না।

তারপর থেকেই মাঝে মাঝে তাঁর ফোন দেওয়া শুরু হলো। সেই দেওয়া অবশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হতো না। হতো কিভাবে? নিজে থেকে কিছুই বলতাম না। আবার কেঁটে দিতেও পারতাম না। সে যা জিজ্ঞেস করতো হু, হা করে উত্তর দিতাম। এই যা! আমি কখনও তাঁর বর বা শুশুর বাড়ি সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করিনি। সেও আগবাড়িয়ে কখনও কিছু বলে নি। এভাবেই চলছিলো! সে ভালো ছিলো তাঁর মতো। আমরা আমার মতো। তবে আজ কি হলো?

উসমানের বিরক্ত এবার আকাশ ছুঁলো। শুধু বিরক্ত না, তাঁর শরীরের তাপমাএাও। তাঁর এখন মাথা ঘুরছে। সে তাঁর বিরক্ত আর তাপমাত্রা চেপে গলা খাঁকারি দিলো। এই মেয়ে মর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে কেন কে জানে?

খাঁকারির শব্দে দিলশাদের ঝটকা কাঁটলো। কাঁটতেই সে তরিৎ গতিতে ভিতরে গেলো। গেইটের চাবি দরকার। দিলশাদ যে স্পিডে ভিতরে গেছে সেই স্পিডে আবার ফিরে এসেছে। এসেই তাড়াতাড়ি গেইট খুললো। খুলে আস্তে করে বললো,— আপনি ভিতরে আসুন। বাবা বাসায় নেই। তবে এসে পড়বে।

উসমান কিছু বললো না। মেয়েটাকে অসহ্য লাগছে। আর সবচেয়ে বড় কথা এমন অবস্থায়ও দৌড়াদৌড়ি করছে। মেয়েটা কি জানে না এমন অবস্থায় দৌড়াদৌড়ি ঠিক না। অবশ্য এই মেয়ের আর দোষ ধরে লাভ কি? তাঁদের নিজের বাসায়, নিজেদের চোখের সামনে থেকে এর বড় বোনেররই যা অবস্থায় পুরো বাড়ি ভয়ে তাটস্থ হয়ে থাকে। হুহ্!

সে আর কিছু ভাবলো না। অবশ্য ভাবার মতো অবস্থা তাঁর নেই ও । সে ধীরে ধীরে ভিতরে আসলো। তাঁর অবস্থা খারাপ। শুধু খারাপ না, অনেক খারাপ। সে ঘোলা ঘোলা চোখে আশেপাশে তাকালো। জ্বর আর মোবাইলে স্বল্প আলোতে সে রুমের আগা মাথা কিছুই বুঝতে পারলো না। তবে সামনে সোফা পেয়ে ভেজা শরীর নিয়ে সেখানেই বসে পড়লো। বসতেই আস্তে আস্তে তাঁর শরীর নিস্তেজ হতে লাগলো ।

#চলবে…..