দর্পণ পর্ব-২৯+৩০+৩১

0
95

#দর্পণ
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ২৯

দিলশাদ ঘুম থেকে উঠলো খুব ভোরে! এখনও আলো ফোটেনি! চারিদিক থেকে আযানের শব্দ ভেসে আসছে। এটা অবশ্য নতুন না। এখন কেন জানি খুব বেশি ঘুমোতে পারে না। পড়তে পড়তে রাত হয়। তবুও ঘুম ভাঙে খুব সকালে।

সে নিঃশব্দে উঠলো! এই রুমের বাসিন্দা তিনজন। তাদের ঘুম যেন না ভাঙে, সে সেভাবেই উঠলো। উঠে বাথরুমে গেলো। ফ্রেশ হয়ে ওযু করে নামাজে দাঁড়ালো! নামাজ শেষে দু- হাত তুলে বাবা- মার জন্য দোয়া চাইলো।

সময় সময়ের মতোই চলছে! সে তো আর কারো জন্য বসে থাকে না। দিলশাদেরও যেভাবে যাওয়ার সেভাবে দেখতে দেখতে যাচ্ছে। এই যাওয়া ও কখন প্রায় বছর হয়ে গেছে, দিলশাদ বুঝতে পারে না।

এই হোস্টেলে যখন সে উঠেছে, তখন বছরের মাঝামাঝি ছিলো। চাইলেই তো আর হোস্টেলের সিট পাওয়া যায় না। তবে উমর ভাইয়া কথা রেখেছে। সে জান প্রাণ ছেড়ে হোস্টেলের ব্যবস্থা করেছে।

তবে আপু তখনও রাজি ছিলো না, এখনও না। তাই সে অভিমানে তার সাথে কথা বলে না। কথা না বললেও, দু- দিন যেতে না যেতেই ভাইয়া এসে হাজির। সাথে থাকে দুনিয়ায় জিনিস। সে জানে এগুলো আপুরই কাজ। বোনের উপর অভিমান করা যায়, ফেলে দেওয়া যায় না।

এবার সে সেকেন্ড ইয়ারে। ভালো ভাবেই উঠেছে! উঠবেই না কেন? সব কিছু ভোলার জন্য তো সে বই নিয়েই পরে থাকে। যতোক্ষণ ভার্সিটি বই এসবের মধ্যে ডুবে থাকে ততোক্ষণই ভালো থাকে। চুপচাপ বসলেই অস্থির লাগা শুরু হয়। তখনি তার মনে হয়, তার কেও নেও, নিজের ঘর নেই, বাড়ি নেই, অতি প্রিয় বাবা মাও নেই।

দিলশাদ জানালার কাছে গিয়ে বসলো! তাদের রুমটা তিনতলায়। তিনতলা থেকেই নিচে তাকালো। ফাকা রাস্তা ! এখনো সোডিয়ামের আলো নেভেনি। সেই আলোতেই রাস্তাকে তার নিজের মতোই বিষন্ন মনে হলো।

এই বিষন্ন রাস্তায় মাঝে মাঝে একজন এসে দাঁড়ায়। তার দৃষ্টি থাকে এই জানালার দিকে। সে তাকে এখন আর ফোন দেয় না, পিছু নেয় না, জ্বালাতনও করে না, শুধু মাঝে মাঝে হঠাৎ করে হাজির হয়। কাছে আসে না, কথা বলে না, এমনকি চোখের সামনেও পরে না। তবে দিলশাদ জানে সে আছে, থাকবে।

দিলশাদের ধ্যান ভাঙলো ফোনের আলোতে! সাইলেন্ট করা তাই রিং হয়নি। সে হাত বাড়িয়ে মোবাইল নিলো!

ইউসুফ ফোন দিচ্ছে। সে অবাক হলোনা! এই ছেলে তাকে যখন তখন ফোন দেয়। আর ফোন না ধরা পর্যন্ত দিতেই থাকে, দিতেই থাকে। এতো ধৈয্যে এই ছেলের আসে কোথা থেকে কে জানে।
সে ফোন রিসিভ করলো। করে হ্যালো বলতেই ইউসুফ ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললো,–

— কি করো?

— আমি কি করি সেটা কথা না! এতো সকালে ফোন, ব্যাপার কি?

— এমনিই! ঘুম ভাঙলো! ভাবলাম তোমাকে গুড মর্টিং টা বলে আবার ঘুমাই। তুমিতো এখন ভোরের পাখি।

দিলশাদ মলিন ভাবে হাসলো! আগের সময় হলে ঢং করে বলতো, —- ঘুম ভেঙেছে নাকি কেও ঘুম থেকে টেনে তুলেছে। তবে এখন আর কিছু বলতে ইচ্ছা করে না। তাই সে নীরস ভাবে বললো, — বলো!

— কি?

— কি আবার গুড মর্নিং! বলে ঘুমাও।

ইউসুফের মন খারাপ হলো! সে তার আগের আপুকে মিস করে। কবে আবার তার দুষ্ট, মিষ্টি আপুটা ফিরে আসবে। সে মন খারাপ নিয়েই বললো,—- এখন আর বলবো না! গুড মর্নিং ব্যাড মর্নিং হয়ে গেছে।

— তাই!

— হ্যাঁ!

— কি করলে আবার গুড হবে?

— তুমি আসলে।

দিলশাদ মনে মনে বড় একটা শ্বাস ফেললো, ফেলে আস্তে করে বললো — আসবো।

— কবে আসবে? সেই যে গেলে একবারের জন্যও তো এলেনা। আমরা বুঝি এতোই খারাপ?

দিলশাদ এই কথার উত্তর দিলো না। সে কথা ঘোরানের জন্য বললো,—- কলেজ লাইফ কেমন যাচ্ছে?

— ছাই যাচ্ছে! স্কুল কি আর কলেজ কি? শুধু পড়া আর পড়া। এই পড়ালেখার সাথে ইউসুফের জমেনা বুঝেছো। শুধু ভাবির মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলি না। তা না হলে, এই পড়ালেখাকে টাটা বাইবাই করে দিতাম।

দিলশাদ মৃদু হাসলো! কিছু বললো না।

— আচ্ছা তোমার ঐ বোনের কি খবর বলোতো?

— কোন বোন?

— তিহা না ফিহা! এখনো অফারটা চালু আছে নাকি?

— ডেট অভার হয়ে গেছে। এখন কলেজে উঠেছো। সেখানে নতুন অফার খুঁজো।

— আমারতো পুরাতন টা চাই।

দিলশাদ এবার হেসে ফেললো! মলিন হাসি না!
প্রানচ্ছোল হাসি। হেসে বললো,—- তোমরা ভাইয়েরা আমার গুষ্টির মেয়েদের এবার রেহাই দাও প্লিজ।

ইউসুফও হাসলো! হেসে বললো, —- গুড মর্নিং আপু!

দিলশাদ থমকে গেলো! কখন যে এই ছেলেটা সব ভুলিয়ে দিয়েছে, বুঝতেই পারেনি।

দিলশাদ দীর্ঘশ্বাস ফেললো! বললো, — রাখি। বলেই ফোন রেখলো। রেখে উদাস ভাবে জানালার দিকে আবার তাকালো। এখন অনেক কিছুই সে বুঝে না, দেখে না, শুনেও না। কোন কিছুই যে তার ভালো লাগে না। কিছুই না।

_____

দীপা কিচেনে ছিলো ! বিকট শব্দে ড্রইং রুমে দৌড়ে গেলো। শুধু সে না! যার যার রুম থেকে সবাই দৌড়ে বেড়িয়েছে।

ড্রইং রুমে আসতেই দীপার রাগ চড়ে গেলো! পুরো ড্রইং রুম পানিতে ভেসে যাচ্ছে। সে এগিয়ে গিয়ে আহানের গালে ঠাস করে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো।

সাবিহা দৌড়ে এসে জাপটে ধরলো! ধরে বললো,— আহারে, আহারে, কর কি দীপা?

সাথে সাথে হামিদা বানু তেড়ে এগিয়ে এলেন, — এইডা তুমি কি করলা? কি করলা বউ? আমার সামনে আমার পতির গায়ে হাত তুললা। তুমি তার গায়ে হাত তো তুলো নাই, তুমিতো আমার কইলজায় হাত তুললা।

দীপা কিছু বললো না! সে রাগে ফুঁসছে।

আহান, আহাদ টিভিতে মাছ দেখলেই লাফায়। তাই উসমান তাদের জন্য ড্রইং রুমে বড় একটা একুরিয়াম বসিয়েছে। সেই একুরিয়ামই ফাজিলটা ধাক্কা দিয়ে ফেলেছে।

দুটোই হয়েছে ফাজিলের হাড্ডি! দিনভরে তুরতুর করতেই থাকে। রুবিনা ফুপু নেই! তার ছেলের বউর বাচ্চা হবে। হাজার হলেও ছেলের বউ, না গেলে হয়? তিনি যাওয়াতে সাবিহা আম্মার কষ্ট হয়ে গেছে। দু- টাকে এক সাথে সামলাতে পারে না। এই সুযোগে যা ইচ্ছা তাই করে।

দীপা এগিয়ে আরেকটা দিতে গেলো! উমর ধরে ফেললো!
— হয়েছেতো! কতো দিবে?

দীপা রাগ নিয়ে বললো,—- কি হয়েছে? তোমাদের জন্যই এমন ফাজিল হচ্ছে।

উমর হেসে ফেললো ! হেসে ছেলেদের দিকে তাকালো! একটা থাপ্পড় খেয়ে ঠান্ডা হয়ে দাদীর কোলে মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। আরেকটা দাদার পেছনে ভয়ে পালিয়েছে। এমনিতে এদের মনে একটুও ভয় ডর নেই । শুধু দীপাকে দেখলেই যা একটু ঠান্ডা।

ইউসুফ হেসে আহানকে খোঁচা মেরে বললো,— কিরে কেমন খেলি? সকাল সকাল বাদরামি। আর করবি?

আহান এতোক্ষণ কাঁদেনি! এখন ইউসুফের কথায় ঠোঁট উলটে কেঁদে ফেললো।

উসমান ইউসুফের পিঠে সাথে সাথেই থাপ্পড় মারলো! মেরে আহানকে কোলে নিতে নিতে বললো,— কাঁদে না আব্বু! ছোট বাবাকে দিয়েছি একটা। আরো দেবো?

আহান কিছু বললো না! মেজো চাচার বুকে চুপ করে শুয়ে রইলো। কিছু বঝুক আর না বঝুক তারা এতোটুকু ঠিকিই বুঝে। মায়ের সামনে কোন হাংকি পাংকি চলবে না।

আলি হোসেনও হাসলেন! হেসে সেও আহাদ কে কোলে তুলে নিলো। নিয়ে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেলো। এখানে থাকলে দীপা এটাকেও কয়েকটা দেবে।
দীপা বিরক্ত মুখে পুরো রুমের দিকে তাকালো! পানি থৈ থৈ করছে। এখনও নাস্তা তৈরি হয় নি। মাছগুলোকে আগে তুলতে হবে। না হলে মরে যাবে।

উমর দীপা চেহেরা দেখলো! দেখে মৃদু হেসে বললো, — তুমি কিচেনে যাও! আমি এগুলোর ব্যবস্থা করছি।

দীপা মুক বাঁকিয়ে যেতে যেতে বললো, — প্রথমে নিজের তো ব্যবস্থা করো। পরে ঘরের চিন্তা করো। বলেই কিচেনে চলে গেলো। গিয়ে মুক্তাকে পাঠালো আগে মাছগুলো তুলতে।

উমর হাসলো! সে ঘুমাচ্ছিলো! হঠাৎ শব্দে দৌড়ে বেড়িয়ে এসেছে। আজও তার গা খালি। নিচে শুধু হাফপ্যান্ট।
সে এগিয়ে গেলো! কার্পেট গুলো আগে তুলতে হবে। তাঁর সাথে সাথে সাবিহাও গেলো।

— তোর বউরে সাবধান করিছ উমর! আজকে ছাড়লাম! এর পরের বার যেন না দেখি।

উমর কার্পেট তুলতে তুলতে হেসে বললো,— তুমি তো আমাদের এখনও মারো। আর আমার বউ মারলেই দোষ।

— খবরদার আমার সামনে বউর চামচামি করবি না।
— তো কার সামনে করবো? কে আছে আমাদের।

এই কথায় হামিদা বানু থামলেন! তার হ্নদয় সিক্ত হলো। সত্যিই তো, সে ছাড়া কে আছে এদের। তার সামনেই তো এরা হাসবো, গাইবো, ঝগড়া করবো। এইতো সংসার। এই সংসারের মায়া বরই কঠিন। সময় শেষ হয়ে যায়, মায়া শেষ হয় না।

উমর গোসল করে বের হয়ে দেখলো দীপা রুমে এসেছে। নাস্তা বানানো হয়তো শেষ। এখন লাগবে রুমের পেছনে। পুরো রুম এলোমেলো। দু- টার জন্য কিছুই ঠিক রাখা যায় না। দীপার দিন যায় এদের জিনিস গুছিয়ে রাখতে রাখতে । সে এগিয়ে এসে পেছন থেকে দীপাকে জড়িয়ে ধরলো। তাঁর গা খালি। ঠান্ডা শরীর। ড্রইং রুম পরিষ্কার করে সে সোজা গোসলে গিয়েছে।

দীপার মধ্যে কোন ভাবান্তর হলো না। সে স্বাভাবিক ভাবে বললো,— কি হয়েছে?

— কি হবে?

— সেটাই তো জানতে চাচ্ছি?

উমর দীপার ঘাড়ে মাথা রেখে বললো, —- বউ নিরামিষ হয়ে গেছে, আমিষ বানানোর চেষ্টা করছি।

দীপা ঘুরে দাঁড়ালো ! শান্ত চাহনিতে বললো —- এতো চেষ্টার দরকার কি ? নতুন করে আরেকটা নিয়ে আসলেই হয়।

উমর আরো শক্ত করে চেপে ধরলো! তবে কিছু বললো না। সে নির্বিকার ভাবে তাকিয়ে রইলো।

— ব্যথা পাচ্ছি।

— পাও, আমার কি?

— তোমার কিছু না?

উমর হাত ঢিলে করলো! করে বললো,— আমিও যে ব্যথা পেলাম, সেটার কি?

— কোথায়?

উমর দীপার হাত নিয়ে বুকে রাখলো! বললো,
— এখানে।

দীপা নিচু হয়ে বুকে ঠোঁট ছোঁয়ালো! ছুঁয়ে বুকেই মাথা রেখে চোখ বন্ধ করলো।

উমরের মুখে হাসি ফুঁটলো! দু- হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো! উপরে যতোই স্বাভাবিক থাক! উমর জানে, বাবা-মার মৃত্যু, বোনের চলে যাওয়ায় দীপা ভেতরে ভেতরে প্রতিনিয়ত কিভাবে গুমরে কষ্ট পাচ্ছে। তবে সে’ই করবেটা কি?

— আহান, আহাদের আকিকা করবো। প্রায় দু – বছর হয়ে এলো। বারো ঝামেলায় তো করা হলো না।

দীপা চোখ বন্ধ করেই বললো —- করবে, বলার কি হলো?

— বড় করে করবো! কাল উসমানকে পাঠাবো দিলশাদ কে আনতে। বাহানা ছাড়া তোমার বোনকে আনা যাবে না।

দীপা মাথা তুললো! তুলে বললো, — ওকে জানিয়েছো?

— না! আগে বললে বাহানা তৈরি করে রাখবে। আসবে না।

দীপা বড় একটা শ্বাস ফেললো! ফেলে বললো,— উসমান ভাই কেন? তুমি যাও।

উমর মৃদু হাসলো ! হেসে দীপা সামনের এলোমেলো চুল কানে গুজে বললো, — তুমি জানো কেন।

— কিন্তু….

উমর কথা শেষ করতে দিলো না। ঠোঁটের মাঝামাঝি আঙুল রাখলো। রেখে বললো — দীপা, আমি চাই আমার ভাই ভালো থাকুক! তুমিও নিশ্চয়ই চাও, তোমার বোনও ভালো থাকুক। বিশ্বাস করো দীপা। আমার ভাইয়ের চেয়ে ভালো দিলশাদকে আর কেও রাখতে পারবে না।

দীপা তাকিয়ে রইলো! কিছু বললো না। কি বলবে সে? উসমান ভাই কাকে পছন্দ করে সে এখন জানে। আব্বু,আম্মুর মৃত্যুর পরে উসমানের ব্যবহারে সন্দেহ হয়েছিলো । সেই সন্দেহ দূর হলো তাদের ফ্ল্যাট ছাড়ার সময়। ভাড়া বাড়ি, কেও নেই। অযথা রেখে লাভ কি। তাই দীপা তাঁর রুমের আগের কিছু ফার্নিচার সরিয়ে সেই বাসার কিছু ফার্নিচার এনেছে। আব্বু,আম্মুর সংসারের স্মৃতি। কি করে সব বেঁচে ফেলবে। তাই কিছু রেখে বাকি গুলো বিক্রি করতে চাইলো।

কিন্তু উসমান ভাই বিক্রি করতে দেই নি। তাঁর রুমের সব ফার্নিচার বের করে এই ফার্নিচার রাখলো। দীপা অবাক হয়েছে। তবে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। করতে ইচ্ছেও করেনি। যা বুঝার সে বুঝেছে। শুধু সে না, বাড়ির সবাই বুঝেছে। তবে কেও কিছু বলেনি, জিজ্ঞেসও করেনি । কারণ! তারা যেমন উসমানকে চেনে তেমনি এখন দিলশাদকেও চিনে। তাঁর ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছুই সম্ভব না।

চলবে…….

#দর্পণ
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ৩০

দিলশাদ ভার্সিটিতে আসতেই আরমান ডাকলো। দিলশাদ মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো! আরমান তাদের দু- বছরের সিনিয়র। আর এই সিনিয়রের ঝামেলা সে নিজের কাঁধে নিজেই নিয়েছে। তখন সে ফাস্ট ইয়ারে।তার দুনিয়া তখন ভিন্ন ছিলো, সব কিছু দুষ্টুমি করে উড়িয়ে দিতো।

সেরকম একদিন ভার্সিটিতে আসতেই গানের শব্দ
ভেসে আসলো। গিটারের টুং টাং শব্দে কেও গলা ছেড়ে গাইছে। সে এগিয়ে গেলো। দূর থেকে দেখলো!

একদল ছেলে বসে আছে। তাদের মধ্যে একটা ছেলে গিটার হাতে গান গাইছে। এলোমেলো চুল, মুখ ভর্তি দাড়ি, ছেঁড়া জিন্স, গায়ে ঢিলেঢালা গেঞ্জি। এই ছেলের প্রতি তার আগ্রহ হওয়ার কথা না । হলোও না! দেখতেই বোঝা যায় বড়লোক বাপের বিগড়ে যাওয়া সন্তান। তবে তার গানের গলা দিলশাদকে মুগ্ধ করলো।

সে মুগ্ধ থেকে প্রায়ই দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গান শুনতো। এতো এতো স্টুডেন্টের মধ্যে তাকে খেয়াল করার কথা না। তবে কিভাবে যেন করলো।

তেমনি একদিন সে দাঁড়িয়ে ছিলো। আরমান সোজা তার দিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে ইশারা করলো। দিলশাদ প্রথমে জমে গেলো। ভার্সিটিতে এদের খুব একটা ভালো রেকোর্ড নেই। র্যাগিং ট্যাগিং দেবে কিনা কে জানে? তবে বুঝতে দিলো না। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো।

আরমান সিগারেট ধরিয়ে আয়েশ ভাবে টান দিলো। দিয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখলো। দেখে বললো,— ফাস্ট ইয়ার?

দিলশাদ স্বাভাবিক ভাবেই বললো, — হ্যাঁ!
— নাম?
— দিলশাদ।
— কোন ডিপার্টমেন্ট?
— কেমিস্ট্রি।
— প্রতিদিন হা করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি! ব্যাপার কি? রসগোল্লা আমরা?

দিলশাদ কি বলবে ভেবে পেলো না। এরা গলা ছেড়ে গান গাইবে আর দূর থেকে দাঁড়িয়ে শুনলেও দোষ। আরে বাবা এতো দোষ হলে, বাথরুমে যা! সেখানে গিয়ে গান গা। তাহলে তো আর অন্য কেও শোনার ঝামেলা নেই ।

— কি হলো! সিনিয়ররা কিছু জিজ্ঞেস করছে। বেয়াদবের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছো কেন?

দিলশাদ মুখ ভারের ঢং করলো! বললো,
— প্রতিদিন কোথায় ভাইয়া? মাঝে মাঝে! আর হা করেতো অবশ্যই না।

— তাহলে তুমি বলছো চাইছো, আমি মিথ্যা বলছি।

— না! না! তা হবে কেন? হয়তো দূর থেকে ভূল দেখছেন।

— তাহলে বলতে চাইছো আমার চোখে সমস্যা।

— না, না ভাইয়া। কোন দুঃখে আমি সেটা বলবো।তবে আমার মনে হয় আপনার ডাক্তার দেখানো উচিত। আজকাল বয়স ম্যাটার করে না। যে কোন সময়, যে কোন সমস্যা ধরা পরে। হুম! বলেই দিলশাদ বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়লো।

আরমান ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো! এতো স্বাভাবিক ভাবে কোন ফাস্ট ইয়ারের মেয়ে তার সাথে কথা বলেছে বলে মনে পরে না। সেও তারচেয়ে স্বাভাবিক ভাবে বললো, — কানে ধরো!

দিলশাদ অবাক হলো! অবাক হয়ে বললো,— জ্বী?

— কানে ধরো!

দিলশাদ আশে পাশে তাকালো! সবাই তাকিয়ে আছে। তার এবার সত্যিই মুখ ভার হলো। যেচে পড়ে বিপদ ডেকে এনেছে সে।

সে কাঁদো কাঁদো মুখ করে বললো,—- জীবনেও আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আপনার গান শুনবো না। প্রমিজ! আমার কি দোষ! আপনার কন্ঠই এতো সুন্দর। না চাইতেও দাঁড়িয়ে পরি। স্যরি! আর কখনও দাঁড়াবো না। এবারের মতো মাফ করে দিন।

আরমান তাকিয়ে রইলো! কিছু বললো না! তার আশে পাশের বন্ধুরা হাসছে। হেসে তাদের মধ্যে থেকে একজন বললো,— তোমার কমপ্লিমেন্ট শুনে খুশি হলাম। যাও ভাগো! এবারের মতো মাফ।

দিলশাদ হাঁফ ছাড়লো! মনে মনে বললো,— বড় বাঁচা বেঁচেছি বাবা। সে এক প্রকার দৌড়েই সেখান থেকে পালালো। আরমান তাকিয়ে তাকিয়ে সেই পালানোও দেখলো।

দিলশাদ আর দাঁড়িয়ে গান শুনেনি! কোন দরকার! দুনিয়াতে গানের অভাব আছে। তার তাহসান আছে, জাস্টিন বিবার আছে। তুই কোন ছাতার মাথা।

সেখানেও তার দোষ হলো। আবার তাকে ডাকা হলো! সে আবার মুখ ভার করে তাদের সামনে দাঁড়ালো!

আরমান স্বাভাবিক ভাবেই বললো,—এখন আমার কন্ঠ বুঝি সুন্দর না?

দিলশাদ উপর নিচে, ডানে বামে মাথা দোলালো! এই দোলানোর অর্থ কি সে নিজেও জানে না । তবে মুখে কিছু বললো না। সে কিছু জানুক আর না জানুক। এইটুকু বুঝেছে, মুখ খুললেই বিপদ! এরা প্যাচে ফেলে। কি দরকার।

— তাহলে?

দিলাশাদ তাঁকিয়ে রইলো! তাহলের মানে কি?

— কানে ধরো!

দিলশাদ হা হয়ে গেলো! কি করেছে সে?

আরমান সিগারেট ধরালো! বাতাসে ধোঁয়া ছাড়লো। তবে তাঁর দৃষ্টি দিলশাদের দিকে। মেয়েটা হা করে তাকিয়ে আছে। সে মনে মনে হাসলো!
হেসে বললে,— যাও!

দিলশাদ মুখ ফুলিয়ে চলে এলো! সে ঠিক বুঝলো! নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মেরেছে সে। এই গানের পার্টি তাকে জ্বালিয়ে মারবে।

তার পর থেকে সে পালিয়ে বেড়ালো। এই দল যে সাইডে আছে, সেই সাইডে দিলশাদ নেই।

তবে এরা তাঁর নাম, ডিপার্টমেন্ট সব জানে, খুঁজতে অবশ্য বেগ পেতে হলো না। এক ছেলে এসে খবর দিলো। আপনাকে ডাকছে।

দিলশাদ মুখ ফুলিয়ে আবার হাজির হলো।
আরমান অতি স্বাভাবিক ভাবে বললো,— এখন বুঝি আমরা রসগোল্লা না? পালিয়ে পালিয়ে বেড়াও।

দিলশাদ তাকিয়ে রইলো! কিছু বললো না! সে জানে কিছু বলুক আর না বলুক। শেষ মেষ সব কানে ধরায় গিয়েই থামবে।
তাই সে মনে মনে ঠিক করলো! আজ বললে আর পালাবে না। একেবারে কানে ধরে সব ঝামেলা আজই দফারফা করে ফেলবে।

আরমান হাসলো! হেসে বললো, —- মোবাইল নাম্বার টা বলোতো দেখি।

দিলশাদ অবাক হলো! নতুন টিউন দেখি। ব্যাপার কি? সে মুখ ভোঁতা করে মোবাইল নাম্বার বললো। এই আর কি? সে না বললেও মোবাইল নাম্বার বের করা এদের কাছে কোন ব্যাপার না।

আরমান অবশ্য মোবাইল নাম্বার কোন ফোন টোনে সেভ করলো না। শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে শুনলো। শুনে শান্ত ভাবে বললো, — যাও।

দিলশাদ গেলো না! এবার মুখ খুললো— এখন আমি কি করবো? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গান শুনবো নাকি শুনবো না। দোষ কোনটায়?

আরমান হেসে ফেললো! প্রাণখোলা হাসি! তার হাসি দেখে তার বন্ধুরা অবাক হলো। সে হেসেই বললো,— তোমার যেটা ভালো লাগে।

— পরে আবার ডেকে বলবেন না তো, কানে ধরো।

— না! এর পরে আর কেওই বলবে না।

দিলশাদ হাসলো তাঁর সেই মিষ্টি মাখা হাসি। সে যদি জানতো এই হাসি সামনের জনের উপরে কি প্রভাব ফেলে, তাহলে হয়তো এই হাসি সে কখনও ঠোঁটেই আনতো না।

তখন অবশ্য এতো কিছু চিন্তা করতো না। বাবা, মায়ের ভালোবাসায় আগলে ছিলো। দুনিয়া রঙিন ছিলো। সেই দুনিয়ায় সব কিছুই ভালো লাগতো। তাইতো সব কিছু নিয়ে শুধু মাথায় দুষ্টুমি ঘুরতো। তাই ওতো গায়ে মাখেনি। আরমানের সাথে দেখা হলেই স্বভাবিক ভাবে কথা বলেছে, দুষ্টমি করেছে। কিন্তু এখন তাঁর বোঝা মনে হয়। সব বোঝা।

সে স্বাভাবিক ভাবেই দাঁড়ালো! আরমান এগিয়ে এলো। এগিয়ে এসে বললো,— ক্লাসে যাচ্ছো।

— হুম!

— ছুটির পর সময় হবে?

দিলশাদ আরমানের দিকে তাকালো! গত এক বছর সে সব কিছুই এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে। আরমানকেও! অবশ্য ইচ্ছে করে না। তার এখন কিছু ভালো লাগে না, কিছুই না। এমনকি পড়ালেখাও না। পড়ালেখা করে বাঁচার তাগিদে। পড়ালেখায় ডুবে থাকলে সব ভুলে থাকা যায়। আর সবচেয়ে বড় কথা এই ছেলের হাবভাব তাঁর ভালো ঠেকছে না। তাই সে কোনরকম বললো,— না! একটু কাজ আছে।

আরমান হাসলো! দিলশাদের বাবা, মা মারা গেছে সে জানে। মারা যাওয়ার পরেই মেয়েটা অন্য রকম হয়ে গেছে। কারো সাথেই খুব একটা কথা বলে না। এটা আরমানের ভালো লাগে না। কিছু কিছু মানুষকে দুষ্টই ভালো লাগে।

সে হেসেই বললো,— ছুটির পরে আমি অপেক্ষা করবো। বলেই আরমান আর কিছু শোনার প্রয়োজন মনে করলো না। সে চলে গেলো।

দিলশাদ দীর্ঘশ্বাস ফেললো! ফেলে মনে মনে ঠিক করলো! সে লাস্ট ক্লাস করবেই না। ছুটির আগেই বেড়িয়ে যাবে।

করলোও তাই! তবে তাঁর ভাগ্য আজ খারাপ! আরমান গেইটের সামনেই তাঁর সাঙ্গ পাঙ্গ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেন সে জানতো দিলশাদ এই কাজ করবে।

দিলশাদ দাঁড়িয়ে গেলো! আরমান তাঁর এলোমেলো চুল আরেকটু এলোমেলো করতে করতে এগিয়ে এলো। তাঁর ঠোঁটে দুষ্ট হাসি। যেন দিলশাদের চালাকি ধরে সে খুব মজা পাচ্ছে।

এগিয়ে এসে খুব স্বাভাবিক ভাবে বললো,— চলো কোথাও বসি।

দিলশাদ মুখ কালো করে বললো —- না! আমার কাজ আছে।

— কি কাজ? বলো! আমি দেখছি।

দিলশাদ বিরক্ত হলো! তবে তা দমিয়ে শান্ত ভাবে বললো,— আরমান ভাই। আমি বুঝতে পারছি আপনি কি বলতে চান। না বোঝার কিছু নেই। আমি ছোট্ট বাচ্চা না। তাই আমি খুব দুঃখিত! আপনি যেটা চাচ্ছেন সেটা সম্ভব না।

আরমান নির্বিকার ভাবে বললো —- কেন?

— সেটা আমার ব্যাপার।

আরমান উচ্চস্বরে হাসলো! হেসে বললো,— অন্য কাওকে ভালোবাসো নাকি?

দিলশাদ কিছু বললো না। কঠিন চোখে তাঁকিয়ে রইলো। আরমান ভালো না, সে শুনেছে! তবে গত এক বছরে তার কোন খারাপ রুপ সে দেখেনি। তবে এখন থেকে মনে হয় দেখবে।

আরমান আরেকটু এগুলো! দাঁতে দাঁত চেপে বললো,— ভুলে যাও! যতোদূর জানি কেও নেই। ভার্সিটির অলির গলির সব খবরই আমার কাছে থাকে। আর তোমার খবরতো আমি ভার্সিটির বাইরেও রাখি। তবুও মনের অলি গলিতে কেও থাকলে, ভুলে যাও। আরমানের তুমি। যদি আরমানের না হও। তাহলে কারো হবে না।

দিলশাদের মুখ দিয়ে আর কথা বেরোলো না। আগের মতো মনে রঙ থাকলে সেও দেখিয়ে দিতো দিলশাদ কি জিনিস। সে আবারো দীর্ঘশ্বাস ফেললো! ভার্সিটি তার জন্য জাহান্নাম হলো সে ঠিক বুঝলো। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাইডে তাকালো। তাঁকিয়েই বড়োসড়ো একটা ঝটকা খেলো। এতোটাই খেলো যে তার কাঁধে থেকে ব্যাগ পড়ে গেলো।

আরমান ভ্রু কুঁচকে তাকালো! তাকিয়ে বললো,— কি হয়েছে?

দিলশাদ কথা বলতে পারলো না। সে হতম্ভব! কতো দিন পরে এই মুখটা দেখলো।

উসমান তাদের সামনে স্বাভাবিক ভাবেই এগিয়ে এলো! নিচু হয়ে নিচ থেকে ব্যাগ তুললো! তুলে একবার শান্ত চোখে আরমানের দিকে তাকালো। তারপর দিলশাদের দিকে তাকিয়ে সেই শান্ত চোখেই বললো,—- এসো! বলেই আর দাঁড়ালো না! গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলো।

দিলশাদের মাথা ঘুরে উঠলো! আজকেই তার আসতে হলো? সে একবার আরমানের দিকে তাকালো! সে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। সে সম্ভবতো বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে। দিলশাদ আর দাঁড়ালো না । ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো। আজকে তার ভাগ্য সত্যিই খারাপ।

চলবে……

#দর্পণ
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ৩১

দিলশাদ রুমে এসে কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইলো। তার বুক টিপটিপ করছে। ভার্সিটি থেকে তাদের হোস্টেল খুব একটা দূরে না। তবুও ওতোটুকু সময় তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে মরে যাওয়ার জোগাড়। এরকম হচ্ছে কেন? এরকম হওয়ার তো কথা না। এর আগেও হাজার বার উসমান তার সামনে এসেছে। পাশে বসেছে। এমন কি….

সে আর ভাবতে পারলো না। কিছু কি বদলে গেছে? অথচো পাশের মানুষটা ছিলো নির্বিকার। চুপচাপ ড্রাইভ করেছে। হোস্টেলের সামনে এসে শুধু বলেছে। আহান, আহাদের আকিকা করা হবে। হল সুপারের সাথে ভাইয়ের কথা বলা আছে। ব্যাগ ট্যাগ গুছিয়ে নিয়ে আসো। আমি এখানেই আছি।

উমর ভাইয়া হলে দিলশাদ বাহানা তৈরি করতো। তার কোথাও যেতে ইচ্ছা করে না। তবে উসমানকে কেন জানি কিছু বলার সাহস হলো না। সে চুপচাপ গাড়ি থেকে নেমে এসেছে। তার ঘোর কাটলো লাইটের আলোতে।

পায়েল অবাক হয়ে বললো,— ওমা তুমি রুমে নাকি? অন্ধকারে বসে আছো কেন?

— এমনিই।

— তুমি ঠিক আছো তো? তোমাকে দেখতে এমন লাগছে কেন?

— না তেমন কিছু না, বলেই দিলশাদ উঠলো! উঠে ব্যাগ বের করলো। আস্তে আস্তে যা যা দরকার গোছাতে লাগলো।

পায়েল অবাক হলো! গত এক বছরে এই মেয়েটা কোথাও যায়নি। ঈদের সময়ও হয়তো যেতোনা না। যদি হোস্টেল খোলা থাকতো। হোস্টেল বন্ধের একদিন আগে তার এক খালামণি এসে জোর করে নিয়ে গেছে।

আজব এক মেয়ে! ফাস্ট ইয়ার, তার মধ্যে বছরের মাঝামাঝি। এই সময় হোস্টেলের সিট পাওয়ার কথা না। তাই যখন শুনলো, তাই ভাবলো বড় লোক বাপের মেয়ে টেয়ে হবে। টাকা পয়সা দিয়ে হয়তো ম্যানেজ করেছে। এখন তো অনেকেই নিজের ইচ্ছে মতো হোস্টেলে থাকে। তাই সেও সে রকম ভেবেছে।

তবে যখন আসলো! অবাক হলো! বিধস্ত, নিস্তেজ হয়ে যাওয়া একটা মেয়ে। কারো সাথেই খুব একটা কথা বলে না। বইয়ের মধ্যে মুখ গুজে পড়ে থাকে। আর সবচেয়ে অবাক হলো তার দু- দিন পরে তার মোবাইলে ফোন আসাতে। ফোন এসেছিলো দিলশাদের বড় বোনের। সে কেঁদে কোমল সুরে বলেছিলো, — আমার বোনটাকে একটু দেখো বোন! সে কখনও এভাবে একা থাকেনি। তাকে একটু দেখো।

পরে অবশ্য আস্তে আস্তে সব জেনেছে। জেনেছে বলেই মেয়েটার জন্য মায়া হয়।

— বাসায় যাচ্ছো?

— উঁহু! বোনের বাড়ি।

পায়েল হাসলো! মেয়েটার খুব অভিমান! উপরওয়ালার উপর। কেন তার ঘর ছিনিয়ে নেওয়া হলো। কেন এভাবে তার বাবা, মাকে চলে যেতে হলো।
আল্লাহ যে কি চান একমাএ তিনিই ভালো জানেন। তবে এই মেয়েটা জানে না। এমন বোন, বোনের বাড়ি পেতেও ভাগ্য লাগে। তার নিজেরই বড় দু- বোন আছে। তারা নিজেদের দরকার ছাড়া তেমন খোঁজ খবরও নেয় না।

পায়েল একটু মজা করেই বললো,—- বাইরে গাড়ির সাথে দাঁড়িয়ে এক হ্যান্ডসাম হাল্ক কে দেখলাম ? উমর ভাইয়ার ছাট কাট। মালটা কে?

দিলশাদ ঘুরলো! কিছুক্ষণ তাঁকিয়ে রইলো। তার কোথায়ও যেন একটু জ্বলে উঠলো। সাথে মেজাজও খারাপ হলো। এতো ফিটফাট বাবু হয়ে আসার দরকার কি? শুধু শুধু মেয়েদের মাথা নষ্টের ধান্দা। সে ঠোঁট চেঁপে বললো,— উমর ভাইয়ার ভাই।

— আচ্ছা… বেয়াইসাহেব।

দিলশাদ বড় একটা শ্বাস ফেলে বললো— হুম! বেয়াইসাহেব, বলেই দিলশাদ গোছগাছে মনোযোগ দিলো। বেয়াই সাহেবের আবার নাকের ডগায় বিরক্তি, দেরি তার একদম সহ্য হয় না।

আরমান উসমানের সামনে এসে দাঁড়ালো! সে দিলশাদের বোনের জামাইকে চিনে। চিনবেই না কেন? গত এক বছরে দিলশাদের সব প্রয়োজন অপ্রয়োজনে সে ই এখানে এসেছে। এমন বোনের জামাই অবশ্য সে কমই দেখেছে। আজকাল তো নিজের বোনেরও কেও খোঁজ খবর নেয় না। আর এখানে শালী।

তাই চেহেরা সুরত দেখে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি চিনতে। সে ধরেই নিয়েছে ভাই টাই ই হবে।
বর্তমানে দিলশাদের গার্ডিয়ান বলতে এখন তো এরাই। তাই তখন কোন সিনক্রিয়েট করতে চাইনি। তবে সমস্যা হয়েছে দিলশাদের রিয়েক্ট দেখে। তাই ক্লিয়ার হওয়া দরকার ।

— আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া…. বলেই আরমান ফিচলে হাসলো ।

উসমান গাড়িতে হেলান দিয়ে মোবাইল দেখছিলো। আরমান এসেছে দেখেছে। তবে তাকায়নি। এখন তাকালো! তার চোখ মুখ শান্ত, শীতল। সেই শান্ত, শীতল চোখে তাকিয়েই সে সোজা হয়ে দাঁড়ালো!

— ভাইয়া কি আর্মিতে নাকি? চুল, বডি, হাইট দেখে সেরকমই মনে হচ্ছে।

উসমান কিছু বললো না! মোবাইর সহ দু- হাত পকেটে রাখলো।

আরমান আবারো হাসলো! হেসে বললো, — আমি আরমান! দিলশাদ আমরা একই ভার্সিটিতে পড়ি। আমি তার দু- বছরের সিনিয়র। আমরা বন্ধু! বন্ধু বুঝেনতো?

বলেই আরমান দুষ্ট হাসলো ! সে উসমানের উত্তরের অপেক্ষা করলো না। সেই হাসি নিয়েই বললো, — সিনিয়র জুনিয়র এর বন্ধুত্ব! অবশ্য না বুঝলেও সমস্যা নেই। আপনের যুগ ছিলো ভিন্ন, আমাদের টা ভিন্ন। দিলশাদের বাপ বলেন, ভাই বলেন আছেনতো আপনারাই। সময় মতো সব জেনে যাবেন। এখন ভাই আপনার নাম্বারটা দিনতো। দিলশাদকে নিতে এসেছেন নিশ্চয়ই। খবরা খবর নেওয়া যাবে।

উসমান মৃদু হাসলো! বাঁকা হাসি! এই হাসির অর্থ আরমানের বুঝার কথা না । বুঝলোও না! উসমান শান্ত ভাবে নাম্বার বললো।

আরমানও হাসলো! হেসে তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুদের মধ্যে একজনকে বললো, —- ভাইকে আমার নাম্বার থেকে একটা মিসডকল দে তো। তা না হলে কল দিলে আবার রং নাম্বার ভেবে ভুল করতে পারে। তাই না ভাইয়া?

উসমান এবারো কোন উত্তর দিলো না।

আরমান এবার তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো! তার মুখ একটু অন্ধকার হলো। সে বুঝতে পারলো সামনের জন তার মতোই ঘাড়ত্যাড়া । আর সবচেয়ে বড় কথা, তার মন অন্য কিছু বলছে। আরমান তো আর বোকা না। এই অতিরিক্ত শান্ত চোখটাই সব বলে দিচ্ছে।
সে কিছুই বুঝেনি এমন ভাবে হাত বাড়ালো। বন্ধু আর প্রতিদ্বন্দীর সাথেই তো হাত মেলাতে হয়। তাই তারা বাদ যাবে কেন?

উসমানের মধ্যে কোন হেলদোল হলো না। পকেট থেকে হাতও বের করলো না। ভাগ্যিস করে নি! তা না হলে এতোক্ষণে আরমানের মুখ থেতলে যেতো। সে পকেটে হাত মুঠো করে, আগের মতোই সোজা হয়ে নির্বিকার দাঁড়িয়ে রইলো।

আরমান কিছুক্ষণ হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইলো! তারপর আবার হাসলো! হেসে হাত গুটিয়ে এগিয়ে উসমানের ঠিক সামনে দাঁড়ালো । চোখে চোখ রেখে বললো,— আমার যা নেওয়ার সামনের জন দিক আর না দিক। আমি ছিনিয়ে নিতে জানি। তাই আজকের টা তোলা রইলো। নাইস টু মিট ইউ ভাইয়া।

বলেই আরমান চলে যেতে নিলো ! যেতে যেতে বললো,— আসি ভাইয়া! আশা করি অতি শীঘ্রই দেখা হবে। সে পর্যন্ত আমার দিলশাদকে দেখে রাখবেন।

আরমান চলে গেলো। উসমান সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইলো। দিলশাদ নামলো তার কিছুক্ষণ পরেই। তাকে দেখে উসমান স্বাভাবিক ভাবেই এগিয়ে গেলো। তার হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে নিঃশব্দে গাড়িতে রাখলো।

দিলশাদ গাড়ি থেকে নামতেই প্রথমে সুমি আর ইউসুফ দৌড়ে এলো। সুমি এসেই জড়িয়ে ধরলো। দিলশাদ অবাক হলো। অবাক হয়ে বললো, — তুমি?

সুমি হাসলো! হেসে বললো, — হ্যাঁ! আমি! এতো অবাক হচ্ছো কেন? পালিয়ে গিয়েছিলাম। মরেতো যাইনি।
দিলশাদ মাথা নাড়ালো ! তাও ঠিক! আদরের মেয়ে। মেনে নেওয়াই স্বাভাবিক। তারপর ইউসুফের দিকে তাকিয়ে বললো,— কি খবর?

ইউসুফ হাসলো! হেসে বললো,— তুমি এসেছো না! এখন সব গুড আর গুড।

— আচ্ছা…

— হুম!

তারপরেই আস্তে আস্তে সবাই এগিয়ে এলো। দিলশাদও এগুলো! এই বাসায় সে আগেও এসেছে। তখন সময় ছিলো এক। এখন অন্য! তখন এই বাড়ির মধ্যে প্রাণ ছিলে না। এখন তার প্রাণতো ভালোই নিজের বাড়িই নেই। সময় কতে তাড়াতাড়ি বদলায়।

সে এগিয়ে গেলো। উমর ভাইয়া আর সাবিহা আন্টির কোলে আহান, আহাদ। সে হাত বাড়াতেই, তাকে দেখে মুচড়ে তারা পেছনে ফিরে গেলো। দিলশাদ হাসলো! এটাই স্বাভাবিক! তারা তার খালামণিকে চেনে না। চেনার কথাও না। আসা তো ভালোই! ফোন বলতে উমর ভাইয়াই যা দিয়েছে। সে কখনও নিজে থেকে ফোন দেয়নি!

দিলশাদ আলি হোসেন, হামিদা বানুকে সালাম দিলো।

আলি হোসেন সালাম নিয়ে বললো,— আসতে সমস্যা হয়নি তো মা?

দিলশাদ মাথা নেড়ে বললো,— উঁহু!

হামিদা বানু বললেন, —- কি সমস্যা হবে? উসমান গেছেনা! আর তুমি মেয়ে। শুকিয়েতো হাড্ডি বের করে ফেলেছো । কতো বললাম হোস্টেলে ফোস্টোলে যাওয়ার দরকার নেই। কেন এখানে থাকলে আমারা উঠতে বসতে খোঁচাতাম?

— দাদী, থামতো! আসতে না আসতেই শুরু! উমর বিরক্ত মুখে বললো।

— তুই চুপথাক! বুঝোছ কি তুই? একলা মাইয়া হোস্টেলে থাকা এইডা ভালা কথা। কেও শুনলে ভালা যায়গায় বিয়া হইবো?

— তোমার এতো টেনশনের দরকার নেই দাদী! তুমি তোমার নিজের টেনশন করো? ইউসুফও সাথে সাথে বললো।

— যা, না কইলাম! মুখ দিয়া কথা বের করতে পারি না। এরা মৌমাছির মতো জাইকা ধরে। ভালা কইতো! ভালা কারো সহ্য হয়না। মায়া মাইনষের বিয়ে ছাড়া গতি আছে। বলেই হামিদা বানু বিরবির করতে করতে চলে গেলেন।

দিলশাদ সে দিকে ভ্রু উঁচিয়ে তাকিয়ে রইলো! দুনিয়া উলটো দিকে ঘুরবে, সূর্য অন্য দিকে উঠবে তবুও এই মহিলা একটুকুও বদলাবে না । অবশ্য না বদলানোই ভালো। বদলানো বিষয়টা কতোটা কষ্টের তার চেয়ে ভালো কে জানে।

—- আচ্ছা! এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা বলবে নাকি। ভেতরে আসতো। আসল জনই রেখে বম হয়ে আছে। মনে আছে তো? সাবিহা হেসে বললো।

দিলশাদ হালকা হেসে মাথা নাড়ালো! নাড়িয়ে ভেতরের দিকে এগিয়ে গেলো। উসমান পেছনেই ছিলো। উমরের সামনে আসতেই উমর বললো, — দীপার কাছে ভিডিও তুই দিয়েছিস?

— হুম!

— ছেলেটা কে?

— সেটা জেনে তোমার লাভ কি? একটা মাএ শালী! মাসে গিয়েছো চৌদ্দ বার। তারমধ্যে এসব ফালতু ছেলে পেছনে লাগে কিভাবে?

— শালী আমার লাখে একটা। ভার্সিটিতে এমন দু- একটা পেছনে পড়বে না তো, কবে পড়বে? তুই এর মধ্যে আমার বউকে টানছিস কেন? আমি দেখতাম।

— তোমার বউই তো মেইন চাবি। সে যা পারবে দুনিয়ার আর কেও পারবে না।

— সবই বুঝলাম। তবে দিলশাদের কথাও মাথায় রাখিস। এমনিই এখানে আসতে চায় না। ঈদে কি করলো, দেখলি না। এতো বার গেলাম। তবুও খালার বাসায় গেছে, তবুও এখানে আসেনি। এখন যদি ওলট পালট কিছু করিস। এবার গেলে কিন্তু আর আসবে না। মেইন চাবির জন্যও না।

উসমান হাসলো! হেসে আহানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। এতোক্ষণ বাবার কোলে ছিলো বলে কোন সারাশব্দ ছিলো না। সে হাত বাড়াতেই ঝাঁপিয়ে আসলো। তাকে আগলে ধরে বললো,— গেলে আর আসবে না মানে কি? তাকে আর যেতে দিচ্ছে কে? যতোখুশি লেখাপড়া করুক। যা খুশি করুক তবে আমার হয়ে। আর আজকে যা দেখলাম এখন তো আরো না।

উমর দীর্ঘশ্বাস ফেললো! ফেলে শান্ত ভাবে বললো, — উসমান?
— বলো!
— তুই আমার ভাই হলেও! ওকেও আমি আমার বোনই মনে করি। তাই আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি। দিলশাদের যদি ইচ্ছে না থাকে তাহলে আমি কিছুই হতে দেবো না। যেই ভুল আমি একবার করেছি। সেই ভুল দ্বিতীয় বার করবো না।

— ইচ্ছে নেই?

— সেটা আমি জানবো কিভাবে? সেটাতো তোর জানার কথা।

— তাহলে আবার কথা বলছো কেন?

— বলবো না? দশ না, পাঁচ না, একটা মাএ শালী।

— হ্যাঁ! তোমার এই একটা মাএ শালীর জন্যই হাত, মুখ সব বন্ধ করে বসে আছি। ভাবা যায়?

উমর হেসে ফেললো! হেসে বললো, —- হ্যাঁ! তাইতো বলি, এখনো ঐ ছেলের হাত, মুখ সহি সালামত কেন? তবে যাই হোক! আমি ভাই আমার শালীর সাইডে।

উসমান ঠোঁট টিপে কিছুক্ষণ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো ! তারপরে বললো, —- এজন্যই বলে বিয়ের পরে ভাই পর। তোমার চেয়ে ইউসুফ ভালো!কিছু পারুক আর, না পারুক অন্তত সব কিছুতে সাপোর্ট করে। আর শোন জোর করার হলে আরো আগেই করতাম। এখনো শুকনো মুখে বসে থাকতাম না।

— বাদ দে না ভাই! এতোদিন পরে এসেছে। একটা দিন অন্তত শান্তিতে থাকতে দিতি। আজই দীপা কাছে ম্যাসেজ পাঠানোর কি দরকার ছিলো। এমনিতেই রেগে আছে। তার মধ্যে আবার এইসব।

উসমান থামলো! কিছুক্ষণ চুপ থেকে শান্ত ভাবে বললো,—— শান্তিতেই তো ও নেই ভাই! যদি থাকতো! আমি কিছুই করতাম না। চুপচাপ ওর জীবন থেকে সরে যেতাম।
এভাবে সব কিছু থেকে দূরে গুটিয়ে থাকাকে শান্তিতে থাকা বলে না। এটাকে বলে পালিয়ে থাকা। সে সবার কাছ থেকে পালিয়ে নিজের কষ্ট নিজের মধ্যে চেপে রাখছে। এভাবে কেও ভালো থাকে না। তার ঘর নেই, কেও নেই। অন্যের বাড়ি সে থাকবে না। না থাক! আমি তাকে আমার ঘর, আমার পরিবার, আমার সব কিছু তার নামে করে দেবো। তবুও সে ভালো থাক।

চলবে……