দো দিলে জাহান পর্ব-০১

0
193

#দো_দিলে_জাহান
#সূচনা_লগ্ন
#বর্ষা

১.
হবু বরের সদ্য বিয়ে করে আনা বউকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে মেহের।তারই ফুফাতো ভাই তূর্যয়ের সাথে আজ তার বিয়ে হবার কথা ছিলো।তবে ঘন্টাখানেক আগেই সবুজ থ্রী পিস পড়া মেয়েটাকে নিয়ে হাজির হলো সে।পুরো বিয়ে বাড়িতে যেন মুহুর্তেই কানাঘুষা শুরু হয়ে গেছে।যেই মেহেরকে নিয়ে আজ অব্দি কেউ বাদে কথা বলেনি।তারাই তার চরিত্র নিয়ে কথা বলছে।মেহের খারাপ দেখেই নাকি তূর্যয় এই মেয়েকে বিয়ে করে এনেছে।

বিয়ের খাবার খাইয়ে অতিথিদের একে একে বিদায় করেছে তালুকদাররা।মেহের নির্বিকার হয়ে দেখে যাচ্ছে তূর্যয়ের বউকে।তার মাঝে নেই কোনো অনুভূতি।ওর বড়দা ভাই মাহিন জরুরি তলবে হসপিটালে গিয়েছে। ডাক্তারদের এই এক জ্বালা।ছুটি চাইলেও নিতে পারেনা।

মহাসিন তালুকদার চোয়াল শক্ত করে বসে আছেন। একমাত্র বোনের কথা রাখতেই ওর ছেলের সাথে নিজের আদরের বাচ্চাটার বিয়ে দিতে রাজি হয়েছিলেন তিনি।তবে এই ছেলে কি করলো?ওনার মেয়ের মান-সম্মান নিয়েই টানাটানি করলো! মহাসিন তালুকদারের মেঝ ভাই জুনায়েদ তালুকদার অতিথিদের এক দুই বুঝিয়ে সব সামলে বাড়ি পাঠিয়েছেন।ওনার স্ত্রী তান্মি বেগম জমজ ছেলে-মেয়ে জিয়ান-তোয়াকে মেহেরের কাছে পাঠিয়েছেন।

-“মেহের দরজা খোল।তুই তো ভেঙে পড়ার মতো মেয়ে না।ওই মেহের দরজা খোল”(তোয়া)
-“তোয়া তুই এখান থেকে যা তো।তোর ফালতু প্যাচালে ওর মাথা আরো খারাপ হবে।আমি ওর সাথে কথা বলছি।তুই যা”(জিয়ান)

তোয়া-জিয়ানের কথা কাটাকাটির মাঝেই দরজা খুলে দেয় মেহের।বিয়ের শাড়ি পাল্টে নিয়েছে সে।কেমন যেন বিধ্বস্ত লাগছে।হয়তো কখনো না শব্দ শুনতে অভ্যস্ত না হওয়া মেয়েটার জীবনে এতো বড় না আসবে তা ও ভাবেনি।আর ভাবার কথাও তো না।

-“মেহের ঠিক আছিস তুই?”(জিয়ান)
-“হুম”

শাড়িটাকে দলা করে বিছানার একপাশে রাখতে রাখতে ছোট্ট করে জবাব দেয় সে।জিয়ান-মেহের-তোয়া ওদের বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা সব একই সাথে।অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ছে ওরা।বিশ/একুশ বয়সের তরুণ-তরুণী।

-“মেহের এখানে বস।একটু কান্না কর বোন।এভাবে পাথরের মতো শক্ত হয়ে থাকলে কি করে হয় বলতো”

তোয়ার কথা শুনেও না শোনার ভান করে মেহের। চুলগুলো শ্যাম্পু করতে হবে। পার্লারের মেয়েগুলো কি কি না দিয়ে চুলগুলো ফিক্সড করেছিলো।তাছাড়া মুখেও তিন ইঞ্চি মেকআপের স্তর পড়েছে।

-“তোরা চাইলে বসতে পারিস।আমি শাওয়ার নিবো। চুলগুলোকে ছাড়াতে হবে।আর মেকআপও উঠাতে হবে”

শাওয়ারের নিচে বসে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে মেহের।বড়দা ভাই ছাড়া সবার কাছেই বড্ড অপ্রকাশিত সে।কখন আসবে বড়দা ভাই?আর ছোটদা ভাই কি জানে তার ছুটকির সাথে কি হয়েছে!মেহের কান্না আটকানোর বৃথা চেষ্টা করে। হুঁ হুঁ করে কেঁদে ওঠে। কাঁদতে কাঁদতে অস্পষ্ট কন্ঠে কি যেন বলতে থাকে।

২.
তূর্যয় সদ্য বিয়ে করা বউকে নিয়ে মামার বাড়ি বসে আছে।এটা ওটা এনে তার বউকে খাওয়াচ্ছে।যদি বড়রা না থাকতো তাহলে হয়তো নিজ হাতেই খাইয়ে দিতো।এসব আদিখ্যেতা দাত চেপে সহ্য করছে ওর মা মায়া বেগম।এখন নিজের প্রতি তার নিজেরই ঘৃণা লাগছে।তাইতো তিনি তৎক্ষণাৎ ভাইয়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।দোতলা থেকে তূর্যয় আর ওর বউয়ের সব ঘটনা দেখছে মেহের।তার কাছে যেন এসব আদিখ্যেতা বৈ আর কিছুই না।

-“নুরিয়া একদম না করবে না।খেতে বলেছি খাবে।কে কি ভাবলো তাতে আমার কিছুই যায় আসে না”

নুরিয়া নামের মেয়েটা যে লজ্জা পেয়েছে তা তার চোখে মুখের ভাব দেখেই বোঝা যাচ্ছে।প্রতিটা মেয়ের চাওয়াই থাকে একজন যত্নশীল স্বামী।নুরিয়া একজন যত্নশীল মানুষের স্ত্রী হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছে। আর মেহের সে তো তূর্যয়কে একজন প্রতারক বৈ আর কিছুই ভাবছে না।

মহাসিন তালুকদার স্টাডি রুমের দরজা আটকে বসে আছেন।মেয়ের নামে এতো এতো বাজে কথা শুনে তার মনটা বিষিয়ে গেছে।তিনি আফসোস করছেন কেন তিনি মেয়ের কথা মানলেন না।মেয়ে তো বিয়ে করতে নাকোচ করেছিলো।কেন যে তিনি শুনলেন না!

-“মাহিনের আব্বু দরজা খোলো। তোমার প্রেশারের মেডিসিন খেয়ে নেও।প্রেশার নয়তো আবার ফল করবে।”

রাবেয়া বেগম তিনি একজন ধৈর্যশীল নারী। এতকিছু হয়ে গেছে তাও তার মাঝে কোনো ফারাক লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।তিনি পড়ে আছেন তার দায়িত্ব নিয়ে।এখানে অন্য কোনো মেয়ের মা হলে হয়তো কেঁদে কেটে বুক ভাসাতেন।তিনি যেমন নিজে কাঁদেননি তেমনি মেহেরকেও কাঁদতে দেননি। শক্ত কন্ঠে বলেছিলেন,

-“মেহের তুই কাদবি না। একফোঁটা চোখের জলও যেন না গড়ায়।আল্লাহ চাননি তাই তোর তূর্যয়ের সাথে বিয়ে হয়নি।তোর জন্য উত্তম কিছু আছে।তাই তোকে যেন আমি কাঁদতে না দেখি।”

৩.
বোনের দশটা মিসড কল দেখে চিন্তিত হয় মাহিন।মাত্রই ওটি থেকে বেরিয়েছে ও। কার্ডিওলজিস্ট ও।অল্প বয়সেই বেশ নামডাক কামিয়েছে সে।বয়স যদিও ঊনত্রিশের কোঠায় পৌঁছে গেছে তবুও বিয়ে-শাদী নিয়ে এখনো ভাবেনি কিছুই সে। মহাসিন তালুকদারের দত্তক নেওয়া ছেলে মাহিন। রাবেয়া বেগমের বড় বোনের ছেলে ছিলো মাহিন।যদিও মহাসিন তালুকদার দত্তক নিয়ে নিজের পুত্র বানিয়ে নেন মাহিনকে।সড়ক দূর্ঘটনায় মাহিনের বাবা-মা দুইজনেই মারা যায়।তারপর থেকে রাবেয়ার কাছে বেড়ে উঠছিলো মাহিন।আর মাহিনের চার বছর বয়সেই মহাসিন তালুকদারের সাথে বিয়ে হয় রাবেয়া বেগমের।আর মহাসিন তালুকদারও মাহিন দত্তক নিয়ে নেন নিজের ছেলেরুপে।

-“হ্যালো”(মাহিন)
-“বড়দা ভাই”(মেহের)
-“বনু কি হয়েছে তোর কন্ঠ এমন লাগছে কেন?কিছু কি হয়েছে?”(মাহিন)
-“বড়দা ভাই তুমি তাড়াতাড়ি বাড়ি আসো”(মেহের)
-“ওহ এবার বুঝেছি।আমার কলিজা এই জন্য কষ্ট পাচ্ছে যে তার বিয়েতে তার ভাই অনুপস্থিত তাইতো।আচ্ছা বাচ্চা আমি এইতো আচ্ছি।আরেকটু অপেক্ষা কর”(মাহিন)

মেহের কন্ঠ ধরে আসে। কান্নারা দলা পাকিয়ে বেরিয়ে আসতে চায়।দ্রুত কল কেটে দেয় মেহের।বিছানায় শুয়ে কাঁদতে থাকে।জায়িনকে একটু আগেই বাজারে পাঠিয়েছে জুনায়েদ চাচু।আর তোয়াকে পাঠানো হয়েছে ওই মেয়েটার কাছে অর্থাৎ নুরিয়ার কাছে।তাইতো একাকী প্রাণ খুলে কাঁদতে পারছে মেহের।

ফোনের ভাইব্রেশনে কান্না থামায় মেহের।ছোটদা ভাই দিয়ে সেভ করা নাম্বারটা।কল রিসিভ করতে গিয়েও করে না।কেননা সে যে বিধ্বস্ত হয়ে কাঁদছে।আর ওর ভাইয়েরা যে ওর এই বিধ্বস্ত অবস্থা দেখলে বড্ড কষ্ট পাবে।কথাটা মাথায় আসতেই মেহের দ্রুত ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসে।

-“ছুটকি আজ নাকি তোর বিয়ে ছিলো?”(মোয়াজ)
-“হুম”(মেহের)
-“তাহলে এই পোশাকে কেন তুই?আর তোর মুখ এতো শুকনো লাগছে কেন?”(মোয়াজ)
-“বিয়েটা হয়নি ছোটদা ভাই “(মেহের)
-“মানে?আমি না মাত্রই দেখলাম তূর্যয় ওর রিলেশন স্টেটাস চেঞ্জ করেছে”(মোয়াজ)
-“ছোটদা ভাই আমার বিয়ে হয়নি।তবে তূর্যয় ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে।”(মেহের)
-“মানে?”(মোয়াজ)
-“আমাকে বিয়ের আসরে একা রেখে তূর্যয় ভাই অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করে এনেছে।”(মেহের)
-“আমি ওই তূর্যয়কে ছাড়বো না।আমি আজকের ফ্লাইটেই ঢাকা আসছি। তুই একদম ভেঙে পড়বি না।তোর ছোটদা ভাই তোর অপমানের মূল্য নিয়েই ছাড়বে।”(মোয়াজ)
-“ভাই কি দরকার কোনো ঝামেলার। তুমি মাথা ঠান্ডা করো।”(মেহের)
-“তুই খাবার খেয়েছিস?”(মোয়াজ)

মেহেরের কোনো জবাব না পেয়ে মোয়াজ বুঝে যায় ওর ছুটকি এখনো অব্দি কিছু খায়নি।আর কিছুক্ষণ পরেই তো মাগরিবের আজান হবে।বেলা প্রায় পেরিয়ে গেছে আর এই মেয়ে এখনো অভুক্ত!আচ্ছা মা কি করছে।মা কি খাইয়ে দিতে পারলো না!প্রশ্ন জাগে মোয়াজের মনে তবে কিছুই বলে না। নিরবতা ভেঙে যখন কিছু বলতে যাবে তখন বুঝতে পারে ওপাশ থেকে কল কেটে দিয়েছে।

-“মোয়াজ কে কল করেছে?”
তৃষ্ণার কথায় মোয়াজ মোবাইল রেখে ওকে টেনে নিজের পাশে বসায়। চিন্তিত গলায় বলে ওঠে,
-“আমি আজই ঢাকায় যাবো।তুমিও কি যাবে আমার সাথে?”
-“আমি আমার প্রশ্নের উত্তর পাইনি”(তৃষ্ণা)
-“মেহের ছিলো”(মোয়াজ)
-“কিছু কি হয়েছে?”(তৃষ্ণা)
-“আজ মেহেরের বিয়ে ছিলো”(মোয়াজ)
-“আর ওর আপন ভাই হলেও তুমি অনবগত ছিলে তাইনা।আচ্ছা মোয়াজ তোমার পরিবার কি কখনোই আমাদের বিয়েটা মেনে নিবে না?”(তৃষ্ণা)
-“কেউ মানুক বা না মানুক তাতে আমার কিছুই যায় আসে না।আমার মেহের তোমাকে ভাবী মা মানে এটা কি কম নাকি!এখন বলো যাবে আমার সাথে?”(মোয়াজ)
-“আমাদের কি বাসায় ঢুকতে দেবে?”(তৃষ্ণা)

মোয়াজ ভাবনায় পড়ে।সত্যিই তো মিষ্টার মহাসিন তালুকদার কি তাদের ঢুকতে দেবে নাকি সেই দিনের মতো দরজা থেকেই তাড়িয়ে দেবে।তাড়িয়ে দিলেই এবার আর ও বেড়িয়ে আসবে না।এবার ও যাচ্ছে ওর বোনের জন্য।ওর বোনের কাছে যাওয়া থেকে ওকে কেউ আটকাতে পারবে না।

৪.
তূর্যয়ের বাবা যে অনেক খুশি হয়েছেন তূর্যয়ের এমন কাজে তা তার মুখের ভাবেই বোঝা যাচ্ছে।কি জম্পেশ গল্প করছেন তিনি নুরিয়ার সাথে।যেন বহুদিনের পরিচিত মেয়েটা ওনার।আর তূর্যয় সে তো গেস্ট রুমের দিকে যেতে গিয়েও রান্না ঘরে যায়।প্লেটে পোলাও,রোস্ট তুলে দোতলার উত্তর দিকের শেষ কক্ষের দিকে চলে যায়।

দরজা টোকা দিতেই ভেতর থেকে শব্দ আসে,”জিয়ান আমার ভালো লাগছে না। তুই যা তো বিরক্ত করবি না”

“মেহের দরজা খোল আমি তূর্যয়।জিয়ান না”

মেহের যেন থমকে যায়।মিনিট পাঁচেক পর মেহের দরজা খোলে।ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
-“কি চাই?”
-“কিছু চাইনা।আপাতত খাবার খেয়ে নে।এই নে তোর পছন্দের পোলাও, রোস্ট”(তূর্যয়)
-“আমি এসব কিছুই খাবো না। এগুলো নিয়ে যান তূর্যয় ভাই।”

মেহের দরজা আটকে দিতে নেয়।তবে দরজা ঠেলে ভেতরে ডুকে পড়ে তূর্যয়।প্লেটটা পড়ার টেবিলের ওপর রেখে বলে ওঠে,
-“দেখ মেহের আমি তোকে সবসময় আমার বোনের নজরে দেখেছি।আর নুরিয়াকে আমি তিনবছর যাবৎ ভালোবাসি।যেই মেয়েটা আমার অপেক্ষায় আছে তিনবছর ধরে তাকে ঠকিয়ে কি করে তোকে বিয়ে করতাম বলবি আমায়? আম্মুকে আমি বলেছিলাম।আম্মু আমার কথা কানে নেয়নি।”

-“তূর্যয় ভাই আপনি চাইলেই আমার আব্বুকে জানাতে পারতেন।তাহলে হয়তো এতো কিছু ঘটতো না।আপনার সৎ হবার জন্য আজ আমার চরিত্রে প্রশ্ন উঠছে।আপনি এখন আমার রুম থেকে যান।আমি আপনার সাথে কথা বলতে চাইনা”(মেহের)

চলবে কি?