দো দিলে জাহান পর্ব-০২

0
131

#দো_দিলে_জাহান
#পর্বঃ২
#বর্ষা
৫.
বিয়ের বাড়িতে এতো নিস্তব্ধতা যদিও মানানসই না তবুও বাড়ির মেয়ের অপমানে এমন নিষ্প্রাণ থাকাটা অস্বাভাবিক না।এখনো ফুলের গন্ধে মৌ মৌ করছে বাড়িটা।তবে ফুলগুলো শুকিয়ে গেছে। তারা বাতিগুলো জ্বলজ্বল করছে।আর তার সাথে জ্বলছে মেহের।তূর্যয়ের বিয়ের জন্য নয় বরং ওর করা এই অপমানের জন্যই ওর এই দহন।

রাত এগারোটা বেজে আরো বেশি হয়তো।দোতলা থেকে আর নামেনি মেহের।যদিওবা নিচে নতুন বউ দেখার জন্য তূর্যয়ের বন্ধুরা এসেছিলো।হইচই হয়েছিলো।মেহের বোঝে না যেখানে আজ একজনের সাথে বিয়ে হবার থাকলেও তার বিয়ে হলো আরেকজনের সাথে সেখানে তূর্যয় কি করে এতো হইচই করছে!রাগের বহিঃপ্রকাশ ভেতরেই রাখে মেহের।

-“মেহের?”

এই রাতদুপুরে দরজায় করাঘাত আর বড়দা ভাইয়ের কন্ঠে বিছানা থেকে নেমে মেহের দরজা খোলে।মাহিন রুমে একবার উঁকি দিয়ে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে,
-“কিরে তূর্যয় কোথায়?”
-“ওনার বউয়ের সাথে”(মেহের)
-“মানে?”(মাহিন)

আজকের সব ঘটনা শুনে মাহিনের মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে।আদরের বোনের সাথে এতোকিছু হয়ে গেল আর তাকে কেউ কিছু বললো না! ইশ্ হসপিটাল থেকে বের হবার পথে যদি আরেকটা ইমার্জেন্সি কেস না আসতো তবে হয়তো বোনটার দুঃখ কিছুটা সে ভাগ করে নিতে পারতো।মাহিন একহাতে বোনকে জড়িয়ে ধরে বলে,

-“একদম কষ্ট পাবি না।আমি বাপিকে বলবো।তুই পড়াশোনা করবি।নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ভালো একটা রাজপুত্রকে বিয়ে করে তূর্যয়কে দেখিয়ে দিবি।ওই তূর্যয়ের জন্য একদম কষ্ট পাবি না”
-“আহা বড়দা ভাই তোমার কি মনে হয় আমি ওনার জন্য কষ্ট পাচ্ছি?আমার মতো এরোগেন্ট মেয়ের ইগো হার্ট হয়েছে।এর চেয়ে বেশি কিছুই না”(মেহের)
-“বোকা মেয়ে যে নিজেকে সহজে এরোগেন্ট বলে মেনে নেয় সে কি সত্যিই তেমন হয়?”(মাহিন)
-“বড়দা ভাই তোমার বনু কেমন তুমি জানো না?”(মেহের)
-“জানি তো।আমার বোনটা পরিস্থিতি এবং মানুষের আচরণ দেখে তাদের সাথে সেরকম ব্যবহার করে।”(মাহিন)

পুরো ঘরটাও ফুলের গন্ধে মৌ মৌ করছে।এই ঘরটা ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছিলো।যার সবই ছিঁড়ে একপাশে ফেলে রাখা। রাবেয়া বেগম দরজায় আসেন খাবার নিয়ে।মাহিনকেও এই ঘরে ঢুকতে দেওয়া দুই প্লেট নিয়েই এসেছেন।মা তো হোক নিজেকে শক্ত প্রদর্শন করা কঠোর ব্যক্তিত্বের অধিকারী।

-“মাহিন,মেহের..”

মায়ের কন্ঠে দুই ভাই-বোনই পেছন ফেরে।মেহের মাথা নিচু করে ফেলে।মায়ের কথা রাখতে না পারায় তার বড্ড কষ্ট হচ্ছে।সে একজন প্রতারকের জন্য কেঁদেছে ভেবেই তো ওর কষ্ট হচ্ছে। রাবেয়া বেগম ভেতরে এসে টেবিলে খাবার রেখে মেহেরের দিকে তাকান।বলে ওঠেন,
-“বলেছিলাম তো ওর জন্য কাঁদবে না। আল্লাহ তোমার জীবনে উত্তম কিছু লিখে রেখেছে”

মেহের চমকায় না।ওর মা ওদের ভাই-বোনদের চেহারা দেখলেই বলে দিতে পারে কার কি হয়েছে।ওনারও যে কম পুড়ছে না।তবে তা যে প্রকাশ করার সাধ্যি তার নেই। কেননা এটা তার শশুরবাড়ি।কথা বলতে গেলে এখনো তার শ্বশুরের কাছে শুনতে হবে,
-“আমার মেয়ের বিরুদ্ধে একটা কথাও বলবা না বউমা।পর কখনো আপন হয়না এই কথাটা বার বার প্রমাণ করবার লিগা উইঠা পইড়া পইড়ো না।”

-“মেহের সকাল থেকে পেটে কিছু পড়েনি তোমার খেয়ে নেও।আর মাহিন তুমিওতো কিছু খাওনি।দ্রুত হাত মুখ ধুয়ে এসে খেয়ে নেও।আমি এখানেই বসছি।”

মায়ের কথায় দুই ভাই-বোন তৎপর হলেও সারাদিনের ক্লান্তিতায় কারোরই খাওয়ার ইচ্ছা নেই। তূর্যয় যেই প্লেট দিয়ে গিয়েছিলো তা বেলকনি দিয়ে ফেলে দিয়েছে মেহের।যার চেহারা দেখতেই ঘৃণা লাগছে এখন তার আনা খাবার নাকি মেহের খাবে ভাবা যায়!

-“বসো আমি খাইয়ে দিচ্ছে।ঢং করতে হবে না দু’জনের
না খেয়ে খেয়ে কি অবস্থা করছে দুই ভাই-বোন।আর আমার মোয়াজ…”

মোয়াজের কথা বলতে গিয়েও বলেন না রাবেয়া বেগম।গলা ধরে আসে ওনার।মাহিন,মেহেরকে খাইয়ে দুজনের কপালে চুমু এঁকে দেন।মাহিনকে নিয়ে বেরিয়ে যান।মেহের তার শতভাবনায় ব্যস্ত।কালবাদে পরশু পরীক্ষা শুরু।ওই এক্সাম মিস দিলে ঝামেলা আছে। তৃতীয় বর্ষের ফাইনাল পরিক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে যে।পড়াশোনা তো সব লাটে উঠেছিলো এই কয়দিনে।শত চিন্তার মাঝে পড়াশোনার চিন্তায় ডেরা বাঁধে ওর মস্তিষ্কে।

৬.
দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ছে সকালের শুভ্রতা।সূর্য্যি মামার উদয়নে যেন বেশ ক্ষিপ্র বাতাস বাবু।তাইতো এই ভোর সকালে এতো গরম পড়েছে।গা যেন জ্বলে যাচ্ছে।গরমের প্রকোপ এতোই বেশি যে জানালা খোলা থাকায় সূর্যের কিরণ যেখানেই পড়েছে এখন সেখানেই চুলকাচ্ছে মেহেরের।বেচারির এই এক কষ্ট। অতিরিক্ত গরম বা তাপ সহ্য করতে পারে না।চুলকানি শুরু হয়ে যায়।

গোসল শেষে বেলকনিতে বসতেই প্রধান ফটকের দিকে চোখ যায় মেহেরের।এখনো প্যান্ডেল আছে দেখে ভ্রু কুঁচকে নেয় সে।তবে মুহুর্তের মাঝেই বুঝতে পারে এসব না সরানোর কারণ।নিশ্চিত তূর্যয় ভাইয়ের হিটলার কিপটা বাপই এখানে ওর রিসেপশনের আয়োজন করছে।যাতে ওই লোকের টাকা খরচ না হয়।মানবিকতা ধুয়ে কি পানি খেয়েছে এই লোক?হয়তো।

৭.
জগিং শেষে বাড়ি ফিরে এতো সব আয়োজনের আবারো সূত্রপাত দেখে মাহিনের মাথা বিগড়ে যায়।ক্ষেপে গিয়ে থামায় তূর্যয়ের বাবা মিষ্টার গোলাম ফকরুলকে।ক্ষিপ্রতা দেখিয়ে বলে ওঠে,
-“আপনাদের লজ্জাবোধ কি একটুকুও অবশিষ্ট নেই নাকি!এমনিতেই আপনার প্রতারক ছেলেটা আমার বোনকে ফেলে আরেকজনকে বিয়ে করে এনেছে।আর আপনি আপনি সেই ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠান করছেন আমাদের বাড়িতে!”

গোলাম ফকরুল তো বেশ খুশি।ছেলে যে ওর অজান্তেই তার প্রতিশোধ আদায় করে নিয়েছে এই খুশি সে রাখবে কোথায়।মনে মনে যদিওবা ভাবে,”আমার লজ্জা লাগবে কেন?আমার তো পার্টি করতে মন চাচ্ছে।আহা রাবেয়া সেদিন যদি তুমি আমার দেওয়া বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হতে তাহলে এমন কিছুই হতো না।”তবে মনের কথা মনে রেখে মুখে বলেন,

-“এই ছেলে একদম তোমার বাড়ি বলবে না।তোমার তো তালুকদার পরিবারের সাথে রক্তের কোনো সম্পর্কও নেই। রাবেয়া ভাবীর বোনের ছেলে তুমি। দূরত্ব রেখে কথা বলবা।আর আমি এই বাড়ির জামাই যা ইচ্ছা করবো তুমি বলার কে?”(গোলাম ফকরুল)

মাহিনের মাথা ঝুঁকে যায়।এই কথা শোনার ভয়েই সবসময় সব ঝামেলা থেকে নিজেকে দূরে রেখেছে।এই কথাটা শুনতে হবে ভেবেই যেখানে ওর রুহ কাপতো।সেখানে আজ তা তাকে শুনতেই হলো।তবে পেছন থেকে আসা মেয়েলী কন্ঠ শুনে স্থির হয় মাহিন।

-“ফুপা জি সসম্মানে এই বাড়ি ত্যাগের সুযোগ দিচ্ছে।মেহের সবার অপমান সহ্য করলেও নিজের বাবা-মা আর ভাইদের অসম্মান সহ্য করে না।আপনার ছেলে,ছেলের বউ আজই বিদায় হোন।নয়তো এমন হাল করবো না যে পায়ে হেঁটে আর যেতে পারবেন না।”

মেহেরকে ফর্মাল ড্রেসে দেখে ভয় পান গোলাম ফকরুল।এই মেয়েটা একটা গুন্ডা। অবশ্য গুন্ডামি করে না।তবে এলাকার অনেক মানুষই তাকে ভয় পায়।আবার শত্রু সংখ্যাও যে খুবই নগণ্য তা বলা একেবারেই ভুল হবে।এই অল্প বয়সেই তার শত্রু হয়েছে বেশ কয়েকজন।বয়স যখন আঠারো তখন এসিড নিক্ষেপকারী এক যুবককে ইচ্ছে মতো ধুয়ে ছিলো সে।তারই চোখের সামনে বাইকে করে এসে একটা মেয়ের মুখে এসিড ছুঁড়তে নিয়েছিলো ছেলেটা। ভাগ্যিস মেহের চলন্ত বাইকের পেছন থেকে ছেলেটাকে টান দিয়েছিলো।মেয়েটা সে যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলো।আর ছেলেটার কপালে জুটেছিলো উত্তম-মধ্যম।

-“মেহের আমি তোমার ফুফা হই তুমি আমার সাথে এমন ব্যবহার করতে পারো না।বিহেভ ইয়োর সেল্ফ,সম্মান দিয়ে কথা বলো”(গোলাম ফকরুল)
-“আমি আপনাকে এখনো যথেষ্ট সম্মান দিয়েই কথা বলছি।আজ যদি আপনি আমার ফুপির স্বামী না হতেন তবে আপনাকে আর আপনার ছেলে-বউকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করতাম।”(মেহের)
-“মেহের বাদ দে তো। শুধু শুধু নিজের মুখ পচানোর কি দরকার!দাদাই শুনলে শুধু শুধুই তোকে ভুল বুঝবে।”(মাহিন)

মোবারক তালুকদার বৃদ্ধ হয়েছেন তবুও তার দাপট কমেনি এক ইঞ্চিও।এইতো তিনদিন আগে ক নিয়ে কথা কাটাকাটি করে এখান থেকে তিনবাড়ি দূরের বাগান বাড়িতে উঠেছেন।এতো বলে কয়েও ফিরিয়ে আনা যায়নি।আর বিয়ে ভাঙার খবর পেয়ে এসেছিলো বটে তবে তা শুধু মেহেরকে দোষারোপ করতে। এসেছিলেন বলতে যে মেহের কলঙ্কিনী,অমঙ্গল এইসব।আদিম যুগের ধ্যান ধারণা নিয়েই পড়ে আছেন তিনি।

৮.
মোয়াজ-তৃষ্ণা চট্টগ্রাম থেকে ইতিমধ্যে ঢাকা এয়ার পোর্টে ল্যান্ড করেছে।ভোর ভোর বেড়িয়েছিলো ওরা।যদিওবা চাইলে কাল রাতেই আসতো পারতো তবে বিভিন্ন চিন্তা ভাবনা করতে করতেই এই দেরি হওয়া। উদ্দেশ্য তালুকদার বাড়ি। তালুকদার বাড়ির চৌকাঠ মেরানো।

-“মোয়াজ আমায না খুব বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ছে।বাড়ি ফেরার পথে কি বাবা-মায়ের সাথে দেখা করতে দিবা?”

তৃষ্ণার আকুলতা দেখে মোয়াজ না করতে পারে না।যদিও জানে বাবা-মায়ের সাথে দেখা করতে গেলেই মেয়েটার চোখে জল আসবে। কাঁদতে কাঁদতে বুক ভাসাবে।বাপ-মা হারা মেয়েটা যে চাচা-চাচীর কাছে বড় উঠেছিলো।ভালো ব্যবহার যদিও পায়নি তবে লেখাপড়া শিখিয়ে নিজেদের কার্যসিদ্ধিতে এক বয়স্ক লোকের গলায় ঝুলাতে চেয়েছিলো ওকে।তৃষ্ণার মনে প্রশ্ন জাগে।তবে মনের কথা আর মুখ ফুটে বের হয় না।মনে মনেই বলে,
-“আচ্ছা মোয়াজ আজ যদি আমার কোনো বড় ভাই থাকতো তবে সে তোমার মতোই হতো…?”

চলবে কি?