দো দিলে জাহান পর্ব-০৩

0
103

#দো_দিলে_জাহান
#পর্বঃ৩
#বর্ষা
৯.
বিষন্নতা শব্দটা কত অর্থকেই না প্রশ্ন করে তোলে।তেমনি মেহেরের জানে নেই তাকে আবার কিসের বিষন্নতা জড়িয়ে ধরেছে।আজ সকাল সকাল কথা কাটাকাটি করে যখন ভার্সিটি গেলো,আড়ালে আবডালে সবাই যে তাকে নিয়ে আলোচনা করছিলো বেশ বুঝেছে সে। অবশ্য তাতে একটু খারাপ লাগলেও এতোটা গুরুত্ব দেয়নি সে।জীবনে অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলোকে এড়িয়ে গেলেই জীবন সুন্দর।তবে সবসময় তা করা হয়ে ওঠেনা।

মোয়াজ ভাই আসার পর কি যে এক কান্ড হলো! মোবারক তালুকদারের আচরণগুলো ওদের প্রতি মোটেও মানানসই না।বড্ড তেতো টাইপের লোক।মোয়াজ ভাইকে বেরিয়ে যেতে বললো।যদিও ওইবার রাগের বশে আর কথা শোনানোর জন্য ঠিকই চলে গিয়েছিলো,প্রতিবাদ করেনি।তবে আজ সে এই তালুকদারের জন্য নয় বরং নিজের ছুটকির জন্য এসেছে।যদিও সেও তালুকদার বংশের ছেলে তবে এই নিয়ে তার একদম মাথা ব্যথা নেই।এই বুড়ো তো ওর বোনের প্রতি অন্যায় করেছে।ওর বোনকে অপদস্থ করেছে।মনে মনে একচোট বকা দিয়ে তৃষ্ণার হাত ধরে বাড়িতে ঢুকেছে ওরা।

-“আরে মোয়াজ যে..আমার বিয়ের কথা শুনে ভাবীকে দেখতে আসলি নাকি!”

তূর্যয়ের এই গা জ্বালানো কথায় রাগ হয় মোয়াজের। তূর্যয়ের পিছুপিছু নুরিয়াও সিঁড়ি দিয়ে নামছে।না মেয়েটা মেহেরের থেকে একটু নয় অনেক বেশিই সুন্দর।এই সৌন্দর্যের কারণেই কি তূর্যয় এই মেয়েকে বিয়ে করলো মোয়াজের মনে প্রশ্ন জাগে। পরক্ষণেই ভাবে যা হয়েছে তা হয়েছে এবার আমি আমার পছন্দে আমার ছুটকির বিয়ে দিবো।দেখিয়ে দেবো আমার ছুটকি কিছুতে কম না।

-“তোমার বিয়ে খেতে নয় বরং আমার ছুটকির বিজয়ের সেলিব্রেশনে এসেছি”(মোয়াজ)
-“মানে?”(তূর্যয়)
-“আমাদের ছুটকি খুব শীঘ্রই ইতালি যাচ্ছে পড়াশোনার জন্য।ডানা মেলে উড়ার সম্পন্ন ওর খুব শীঘ্রই পূরণ হচ্ছে”(মোয়াজ)
-“আমরা তো কেউ কিছুই জানতাম না।এসব হলো কখন?”(তূর্যয়)
-“সময় হলে জেনো।এখন অনেক পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি একটু বিশ্রাম নেই।আর তোমরাও যাও তোমাদের বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচো গিয়ে”(মোয়াজ)

মহাসিন তালুকদার ছেলেকে দেখে গম্ভীর থাকলেও কিছু বলেননি।তবে রাবেয়া বেগম ছেলেকে দেখা মাত্র চোখের জল ছেড়ে দিয়েছেন।বেয়াদব ছেলেটা এই কয়েকমাস মায়ের সাথেও যোগাযোগ রাখেনি।তখন নাহয় অভিমান করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছিলো তাই বলে আর যোগাযোগই করলো না!

-“বাবু তুই ফিরেছিস!আহারে কত শুকিয়ে গেছিস।যা যা দ্রুত ফ্রেশ হয় আয়।আমি তোদের জন্য এখনই শরবত আনছি।”

রাবেয়া বেগমের হঠকারিতা,ছেলের প্রতি মায়া-মমতা দেখে চোখ ভরে আসে তৃষ্ণার।সেই ছোটবেলায় কবে নাগাদ মায়ের ভালোবাসা পেয়েছিলো কিছুই তো মনে নেই।যদি এই মা ওকেও সন্তান ভেবে একটু আদর করে দিতো!

-“ছেলেকে আরো আদর দিয়ে মাথায় তোলো বউমা। এমনিতেই যা বেয়াদব!মেয়ে ভাগিয়ে বিয়ে করে এখন আবার ঢেঙ ঢেঙ করে এখানে এসেছে”

মোবারক তালুকদারের এসব কথায় মোয়াজের রাগ উঠে যায়।তবে সম্মান দেখিয়ে চুপও থাকেনা।তাকে তো বেয়াদবের পদবী দিয়েছে তাই চুপ না থেকে বলেই দেয়,
-“ঠিক বলেছেন দাদা।আমি তো বেয়াদব তাই মেয়ে ভাগিয়ে বিয়ে করেছি।তা আপনার মেয়ের ঘরের ছেলেও দেখছি আস্তো হারামী একজনের সাথে বিয়ের দিন পালিয়ে গিয়ে অন্য মেয়ে ধরে বিয়ে করেছে”

-“একদম মুখে মুখে তর্ক করবি না মোয়াজ।আমার মেয়ে আর ওর সন্তান নিয়ে আমি একটাও বাজে কথা শুনবো না।ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবো আমার বাড়ি থেকে।”(মোবারক তালুকদার)

তৃষ্ণা মোয়াজের হাতে আলতো আলতো থাপ্পর দিতে থাকে।ছেলেটার যে রাগ!কখন জানি ভাঙচুর শুরু করে।সত্যিই এই পরিবার বড্ড অদ্ভুত। অবশ্য এমন অনেক পরিবার আছে যেখানে ছেলের বউ আর সেই ঘরের সন্তানদের ততটাও গুরুত্ব দেওয়া হয়না যতটা মেয়ে এবং মেয়ের ঘরের বাচ্চাদের দেওয়া হয়!

১০.
রাত্রিবেলায় যেন জম্পেশ আলোকসজ্জায় সাজানো হয়েছে তালুকদার বাড়িটা। গার্ডেনের দিকটায় বড় করে স্টেজের মতো বানানো হয়েছে।নুরিয়া গোল্ডেন কালারের শাড়িতে মুড়িয়ে ননীর পুতুলের মতো বসিয়ে রাখা হয়েছে।যারা বিয়েতে আসেনি রিসেপশনে আসবে ভেবে তারা অধিকাংশই অবাক হয়ে শুধু দেখেই যাচ্ছে।

বন্ধুদের সাথে আরেকপাশে দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছে তূর্যয়।মামার বাড়ি তো মধুর হাড়ি।আর মামার বাড়িতে দাঁড়িয়ে বিয়ে আহা! তূর্যয় শ্যামপুরুষ।তার চেহারা দেখে যে কেউ বলবে ছেলেটা হয়তো বেশ ভদ্র দেখো মুখেই লেখা আছে।তবে সবার মুখ যে পড়া যায় না।

-“ভাই নুরিয়াকে তুই তাহলে বিয়ে করলি!”(নয়ন)
-“এমন সুন্দরী যদি পালিয়ে বিয়েতে রাজি হয় তাহলে মামাতো বোনের সাথে বিয়ে কেন আম্বানির মেয়ের সাথে বিয়ে হলেও করতো না এই ছেলে”(আকাশ)
-“আরে আরে তোরা তো ভুলেই যাচ্ছিস নুরিয়া ভাবী তো মডেল।আর কাল থেকে তো আমাদের বন্ধু মডেলের জামাই হয়ে গেছে।হা হা হা”(রাহুল)
-“উল্টা পাল্টা কথা বন্ধ কর।কেউ শুনলে ঝামেলা নেই তবে নানা ভাইয়ের কানে গেলে সে আমাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তাড়াবে।”(তূর্যয়)
-“উফস ভাই তোরা চুপ থাক। তূর্যয়ের জন্য আমার অনেক আফসোস হচ্ছে।”(আকাশ)
-“কেন?”(তূর্যয়)
-“পেছনে তো দেখ।একদম পরীর মতো লাগছে মেহেরকে”(রাহুল)

তূর্যয় একবার তাকালেও চোখ ফিরিয়ে নেয়।তবে বাকিদের কিছু না বলেই সরাসরি নুরিয়ার পাশে এসে বসে পড়ে।তূর্যয় নুরিয়া দু’জন কাপল ড্রেস পড়েছে। এগুলো সব মেহের আর তূর্যয়ের বিয়ের শপিং ছিলো। যদিও মেহেরের প্রয়োজন না হলেও নুরিয়ার কাজ চলে যাচ্ছে।

মেরুন কালারের শাড়িতে চুল ছেড়ে সুন্দর করেই সেজেছে মেহের। বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠান ছাড়া ততটা সাজতে দেখা যায় না মেহেরকে।তাছাড়া কাল থেকে তো পরীক্ষা।কয়েক দিন বই রেখে তো সরাই যাবে না।তাই একটু নিজের কাজে সময় ব্যয় করা।তবে রাবেয়া বেগমের চোখে পড়লে যে ওর খবর আছে তা ও বেশ ভালোই জানে। জায়িন তো ইতিমধ্যে ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।তোয়া এখনো সাজছে।যেখানে মেহের স্বাভাবিক আচরণ করছে ওরা না করলে কেমন দেখায়!

-“কিরে এভাবে সেজে কোথায় যাচ্ছিস?আর মাহিন ভাই কোথায়?”(জায়িন)
-“বড়দা ভাই হসপিটালে গিয়েছে।বিকালেই গিয়েছে।আজ আসবে বলে মনে হয়না।তা তুই ভাইয়াকে খুজছিস কেন?”(মেহের)
-“এমনি”(জায়িন)
-”ওহ”(মেহের)
-“আচ্ছা ভাই একটা কথা বলবি?”(জায়িন)
-“কি কথা?”(মেহের)
-“তুই মাহিন ভাইকে বড়দা ভাই আর মোয়াজ ভাইকে ছোটদা ভাই বলিস কেন?”(জায়িন)
-“আমিও জানি না রে।তবে মন থেকে এই ডাক আসে। কলকাতার সিনেমা দেখার সময় ছোটবেলায় এই ডাক শুনেছিলাম।তারপর থেকেই আমার ডাকাডাকি”(মেহের)

জায়িন আর মেহের একত্রেই যায় স্টেজের দিকে।যদিওবা অতিথিরা উৎসুক হয়ে বসেছিলো নতুন কোনো নাটক দেখার জন্য।তবে সেরকম কোনো প্রকার নাটকের ‘ন’ও হতে দেয়নি মেহের।একটা গিফট পেপারে রেপিং করা পেপার এগিয়ে দিয়ে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে ওদের শুভ কামনা জানিয়ে চলে আসে।

-“ছুটকি?”

তৃষ্ণার কন্ঠ পেয়ে তৎক্ষণাৎ তাকায় মেহের।তার ভাবী মা এখানে!যদিওবা বিকালে বাড়ি ফিরে শুনেছিলো মোয়াজ এসেছে তবে তখন ওরা বাইরে গিয়েছিলো।আর মেহের সে তো ঘুমের রাজ্যে।এইতো এখন সেজেগুজে একেবারে বের হলো।ভাবী মায়ের দিকে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে।টুকুস টুকুস করে গালে দুটো চুমু দিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে।বলে ওঠে,
-“কি ব্যাপার ভাবী মা এতো উজ্জ্বলতা কেন?তা আমার ভাইকে ছাড়াই এসেছো নাকি”

-“তোর ভাবী মাকে একা আসতে দিলে না আসবে!আমিও এসেছি।”(মোয়াজ)

‘ছোটদা ভাই’ বলেই মোয়াজকে জড়িয়ে ধরে মেহের।ভাই আর ভাবী মায়ের সাথে রাজ্যের গল্প জুড়ে বসে। সামনাসামনি গল্প করার মজা আর অনলাইনে গল্প করার মাঝে বেশ পার্থক্য রয়েছে।তাইতো প্রায় কয়েক মাস পর ভাইয়ের সাথে ভাবী মা’কে সামনাসামনি পেয়ে তার এই আনন্দের আন্দোলন।

১১.
কেবিনে বসে কফিতে চুমুক দেওয়া আর মোবাইল ঘাঁটাঘাঁটি করা ছাড়া এখন কিছুই নেই আর করার।সিফট শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ।তবে বাড়ি ফেরার যে তাড়া সেটা নেই তার মাঝে। হঠাৎ দরজায় নক হতে সেদিকে তাকায় মাহিন।ভেতরে আসার পার্মিশন দিয়ে আবারো মোবাইল দেখতে শুরু করে।

-“কিরে আমি কি শুনতাছি তোরা নাকি আমার হবু বউয়ের বিয়ে দিতে চাইছিলো?”

সামনে দাঁড়ানো ছেলেটার কপট রাগ দেখানো কথা শুনে মাহিন হেসে দেয়। ছোটবেলায় বলা কথাগুলো বড্ড হাস্যরসিক লাগে এখন।এই যেমন তীব্রর বলা এই কথাটা ওরা ছোটবেলায় দুষ্টামির ছলে কত বারই না বলেছে।তবে মাহিন অবাক যে তীব্র বাংলাদেশে!

-“ভাই তুই বাংলাদেশে?”(মাহিন)
-“আমার বউয়ের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিলি আরেকটু হলেই আর আমি বিদেশে বসে থাকবো নাকি!ভাগ্যিস বিয়েটা হয়নি”(তীব্র)
-“তুই পারিসও বটে মজা করতে।”(মাহিন)

দুই বন্ধু দু’জনকে জড়িয়ে ধরে।সেই বাল্যকালের বন্ধু ওরা।মোয়াজ,মাহিন,তীব্র এবং মেহের চারজন একত্রে খেলতো সবসময়। ছোট্ট মেহের যদি ভুলেও অন্য কোনো বাচ্চাদের সাথে খেলতে চাইতো তো তীব্র রাগ করে ফুলে থাকতো।সেই ছোট্ট থেকেই মেহেরকে বুঝে নিতে হতো যে তীব্র রাগ করেছে।রাগের বহিঃপ্রকাশ না ঘটালে সহজে বোঝা যায় নাকি যে সামনের মানুষটা রাগ করেছে!

-“তা কি হালচাল সবার?আংকেল,আন্টিও কি ফিরেছে নাকি ওখানেই থাকবে সারাজীবন!”(মাহিন)
-“সবার অবস্থা তো ভালোই। হুম মম,ডেড খুব শীঘ্রই আসতে চলেছে।”(তীব্র)
-“আমার সাথে বাসায় চল সবাই তোকে দেখে খুশি হবে।”(মাহিন)
-“নারে ভাই ট্রাভেল করে বড্ড ক্লান্ত।এখন কাছাকাছি ভালো কোনো হোটেলে চেকইন করতে হবে।তারপর শাওয়ার,রেস্ট,ঘুম…”(তীব্র)
-“তুই এখনো বাংলায় কাঁচা।আগেও বুঝতি না,বিদেশ থেকে এসে আরো বুঝিস না”(মাহিন)
-“মানে?”(তীব্র)
-“তোর লাগেজ,সব জিনিসপত্র নিয়ে চল। আমাদের বাসায় থাকবি “(মাহিন)
-“তোর দাদা..?”(তীব্র)
-“ভুলে গেলি আমাদের থেকেও অনেক বেশি তোকে আদর করে।তার বন্ধুর নাতি তুই!”(মাহিন)

নিজের কথা অনবরত চালু রেখেই মাহিন আর তীব্র হসপিটাল থেকে বেরিয়ে আসে।সেই একঘন্টা আগেই ওর সিফট শেষ।আর ও এখানে মূর্তির ন্যায় বসেছিলো।ভাগ্য ভালো তীব্র এসেছে নয়তো ওর কোমড় আজ যেতো!

চলবে কি?