দো দিলে জাহান পর্ব-০৪

0
106

#দো_দিলে_জাহান
#পর্বঃ৪
#বর্ষা
১২.
রাতে তীব্রের দেখা পেয়ে মেহেরের তো আনন্দের শেষ নেই।তার কত প্রিয় বন্ধু তীব্র।কখনো তীব্র ভাই বলেও সম্বোধন করতে মন চায়নি তার।তবে শেষ যখন দেখা হলো তখন তীব্রর প্রতি ছিলো ওর অবাধ রাগ, ক্ষোভ। কেননা ছেলেটা একেতো ওর আইসক্রিম খেয়ে নিয়েছিলো আর দ্বিতীয় ছেড়ে চলে যাচ্ছিলো।ওই সময় মনে করেই তো অভিমানে তীব্র-র আসার খবর পেয়েও ছুটে গিয়ে বলেনি,”তীব্র এখন তোমার আসার সময় হলো!এতো বছর পর”

সকাল সকাল নাওয়া খাওয়া রেখেই ভার্সিটিতে পৌঁছে পরীক্ষা দিতে শুরু করেছে। ক্ষণে ক্ষণে নাক টানছে।ঘেমে একাকার অবস্থা। কাঁশতেও শুরু করেছে ইতিমধ্যে।এই রুমের ইলেকট্রনিক কানেকশন নষ্ট হবার আর দিন পেলো না!প্রায় সব শিক্ষার্থীদেরই আজ এই অবস্থা।

পরীক্ষা দিয়ে বের হতেই জারিন এসে ঝাপটে ধরে ওকে।মেহের অবাক হয়না।এই মেয়ে তো ওর বোনের বাবু হবে দেখে ওনার সাথে ছিলো এই কয়দিন।আজ হয়তো এসেছে পরীক্ষার জন্যে।দুধে আলতা গাঁয়ের রঙ ওর,যেমন সুন্দরী ঠিক তেমন চঞ্চলা মেয়ে।মেহেরের বেষ্ট ফ্রেন্ড।একান্তই কাছের।মনের প্রায় কথাই ওকে বলা।

-“দোস্ত পরীক্ষা কেমন দিলি?”(জারিন)
-“হুম। তুই কেমন দিলি?”(মেহের)
-“খুবই ভালো।”(জারিন)
-“এতো সেজে এসেছিস কেনো?”(মেহের)
-“সারিম দেখা করতে আসবে। আচ্ছা বলনা কেমন লাগছে আমায়”(জারিন)
-“পুরাই শেওড়া গাছের পেত্নির মতো।এতো মেকআপ করছিস কেন?”(মেহের)
-“আমার বিয়ে লাগছে তাই।”(জারিন)

দুইজনের মধ্যে ভালো কথা থেকেই ঝগড়া লেগে যায়।এই ঝগড়ার স্থায়িত্ব সারাদিন হলেও এর প্রভাব থাকবে মাত্র কয়েক মুহূর্ত।তারপর সেই আগের বন্ধুত্ব।এই চলছে দিনকাল।শত ঝগড়া, খুনসুটি, কাড়াকাড়ি, বাড়াবাড়ির পরও একত্রে এতবছর পথ চলা।পুরো ছয় বছরের বন্ধুত্ব।নবম শ্রেণি থেকে পরিচয়, বন্ধুত্ব।

বিকেল নাগাদ বাড়ি ফিরে চমকায় মেহের।জানতে পারে তীব্র চলে গেছে।কষ্ট পায় বড্ড সে।তীব্র কি বুঝতে পারেনি যে মেহের তার সাথে অভিমান করেছে! বুঝতে পারলেও কেন সে চলে গেলো!এই অভিমান নিয়ে দুপুরে না খেয়েই শুয়ে পড়ে সে।

১৩.
পরীক্ষা শেষ হয়েছে আজ।মেহেরের কোথাও ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছা জেগেছে।বাড়িতে থাকতে এখন বিরক্ত লাগে।বাসায় কিছু হলে দাদা বলে ওঠে,”এই অলক্ষ্মীরে তাড়াও নয়তো কোনো শুভ কাজ এই বাড়িত সুষ্ঠুভাবে হইবে না।”

জারিন আর মেহের ফুচকার দোকানে বসে আছে।ঝাল ঝাল করে ফুচকা খাবে ওরা। যদিওবা মেহেরের ঝাল খাওয়ার অভ্যাস একেবারেই নেই। তবুও শখ করে খাওয়া যাকে বলে ওই আরকি!জারিনের মুখ তো পুরো লাল হয়ে গেছে।বেচারী শোষাচ্ছে।আর এদিকে মেহেরের অবস্থা আরো খারাপ। একটা ফুচকাই মুখে ঢুকিয়ে ছিলো। কাঁশতে কাঁশতে নাকে মুখে অবস্থা ওর।একেই তো ঝাল খাওয়ার অভ্যাস নেই তার ওপর আবার এই অবস্থা!

মেহেরের অবস্থা দেখে জারিন ছুটেছে আইসক্রিম আনতে।ঠান্ডা কিছু খেলেই জিহ্বা ঠান্ডা হবে,ঝালও কমবে।আগে এই ফুচকা স্টলের পাশেই আইসক্রিমের স্টল বসতো।তবে কি এক ঝামেলা হয়েছিলো কে জানে তারপর থেকে আর ওই ভাইয়ার দেখা নেই।

-“এতো বড় হয়েছিস তবুও এই বাচ্চাপনা কেন তোর?নে জুসটা খা”

পুরুষ কন্ঠ কানে আসতেই ভেজা চোখে তাকায় মেহের।তীব্র দাঁড়িয়ে আছে।বেচারা ঘেমে নেয়ে একাকার।আবারো এক ধমক দেওয়ার সাথে সাথেই ঢগঢগ করে জুসটা সাবার করে মেহের।প্লাস্টিকের গ্লাসটা ফেলে বলে ওঠে,
-“তীব্র তুমি এখানে?”
-“তো কি করবো!যেখানে সেখানে কাঁদতে শুরু করিস। মানুষ ভাবে আমি আমার বউকে হয়তো পিটাই আর সেই দুঃখ আমার বউ রাস্তায় দেখায়”(তীব্র)
-“হা হা হা”(মেহের)
-“হাসছিস কেন পাগল?”(তীব্র)
-“তুমি কি সুন্দর মজা করো!”(মেহের)
-“এই হৃদয়ের কথা যদি বুঝতে শিখতি তবে আমার বউ এখন আমার হতো।রাস্তায় বাঁদরামি করতো না “(তীব্র)
-“এতো বউ বউ করো কেন?তোমার বিয়ে হলে দেইখো তোমার বউকে সব বলে দিবো।”(মেহের)
-“আচ্ছা বলিস।তবে বউটা কিন্তু তুই হবি।এখন চল…”(তীব্র)
-“কোথায়..?”(মেহের)
-“মরতে”(তীব্র)

ফুচকার বিল মিটিয়ে মেহেরের হাত ধরে হাঁটা দিতেই জারিন আসে।মেহেরকে ডাকতে গিয়েও ডাকে না।সারিম এসেছে।আজ ভেবেছিলো সারিমের সাথে ওর দেখা করিয়ে সবকিছু আজ ঠিক করাবে।এখনো অব্দি তো দেখাই হয়নি মেহের আর সারিমের।দুইজনের টাইমিং-ই তো ম্যাচ করেনা।যাইহোক এখন নাহয় তারাই ঘোরাঘুরি করবে।

গাড়িতে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে।মেহেরের ইচ্ছে হচ্ছে কথা বলার তবে কি দিয়ে কথা শুরু করবে বেচারী তাই খুঁজে পাচ্ছে না। অনেকগুলো দিন হয়েছে এই ছেলে দেশে আর তার সাথে আজ ওর দেখা।এই নিয়েই কি কথা বলবে!না,থাক।আরো অনেক কিছুই ভাবে।তবে মুখ দিয়েই কোনো কথাই বের হয়না ওর।এভাবে কি চলে?কথা না বললে তো আরো দূরত্ব বাড়ে।

-“তীব্র..”(মেহের)
-“বল”(তীব্র)
-“আমার বিয়ে হবার কথা ছিলো জানো?”(মেহের)
-“হুম,তবে হয়নি তো”(তীব্র)
-“তোমার গার্লফ্রেন্ডের কি অবস্থা?”(মেহের)
-“ভালোই”(তীব্র)
-“তোমার গার্লফ্রেন্ড আছে?”(মেহের)
-“থাকবে না কেন?”(তীব্র)
-“তাও ঠিক”(মেহের)
-“কি ঠিক?”(তীব্র)
-“তোমার গার্লফ্রেন্ড আছে”(মেহের)
-“মাথামোটা আমার জীবনে তুই,মম আর জিমি ছাড়া কোনো মেয়ের আগমন ঘটেনি এখনো অব্দি।”(তীব্র)
-“কেন?”(মেহের)
-“কারণ তুই আমার বউ।আর বউ রেখে বাইরের মেয়ে দেখার স্বভাব আমার নেই।তবে ভাগ্য খারাপ তো তাই বউ আমায় রেখে বাইরের ছেলেকে বিয়ে করতে চায়”(তীব্র)
-“তীব্র এবার কিন্তু বেশি বেশি হচ্ছে “(মেহের)
-“কি বেশি হচ্ছে?”(তীব্র)
-“তুমি যেভাবে বউ বউ করছো মনে হচ্ছে আমি তোমার সত্যিই বিয়ে করা বউ”(মেহের)
-“তা নয়তো কি!হোক সত্যি কিংবা মিথ্যে ছোটবেলায় পুতুল খেলার সময় যে তুই পুতুল বউ আর আমি পুতুল বর হয়ে বিয়ে করেছিলাম। মনে পড়ে?”(তীব্র)
-“ওইটা নিছক খেলা ছিলো”(মেহের)
-“তাহলে চল বিয়ে করে নেই।তাহলে তুই আমার সত্যি সত্যিই বউ হবি”(তীব্র)

কার চালাতে চালাতেই পটরপটর করছে ওরা।গাড়ির স্প্রিড একদম কম। রাস্তার পাশ ধরে আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছে গাড়িটা। হঠাৎ এক জায়গায় গাড়ি থামিয়ে নেমে যায় তীব্র।মেহের জানালার কাচ নামিয়ে বাইরে তাকায়।তীব্র ফুটপাত থেকে ফুল কিনছে।লাল,হলুদ গোলাপ কিনছে।

১৪.
রাস্তায় হাতে হাত রেখে হাঁটাহাঁটি করার সুখটা তো কেবল কপোত-কপোতীরাই এখন অনুভব করছে।রৌদ্র মামা লুকিয়ে পড়েছে।হয়তো লজ্জা পেয়েছে এতো সুন্দর সুন্দর জোড়া দেখা।তূর্যয় নুরিয়াকে নিয়ে একটু বেরিয়েছে। নুরিয়ার নাকি বাসায় ভালো লাগে না।সবাই নাকি তাকে দূর দূর করে।রান্না ঘরে গেলে তাকে নাকি কেউ কিছু করতেই দেয়না।একা একা শুয়ে বসে কি আর ভালো লাগে!

বাইক নিয়েই বেরিয়েছে ওরা। উদ্দেশ্য উত্তরার দিকে যাওয়া। বৃষ্টি যেই হারে হচ্ছে ইদানিং লেক পার্কে গেলে আলাদা শান্তি আছে।তূর্যয়ের কোমড় জড়িয়ে শক্ত করে বসে আছে নুরিয়া।যদিওবা আস্তেই বাইক চালাচ্ছে তূর্যয়।

-“নুর এতো শক্ত করে ধরছো কেন?হাত আলগা করো”(তূর্যয়)
-“না,না,আমার ভয় লাগে।তুমি যে জোরে বাইক চালাও”(নুরিয়া)
-“কোথায় জোরে চালাচ্ছি?তুমি যেভাবে আমায় খামচে ধরছো আমি তো বাইকের নিয়ন্ত্রণ হারাবো”(তূর্যয়)
-“বাইক যখন চালাতে পারো না,চালাতে যাও কেন?যত্তসব!”(নূরিয়া)

রাগ দেখিয়ে তূর্যয়কে ছেড়ে খোলা হাতে বসে থাকে নূরিয়া।তূর্যয়েরও রাগ লাগে।তবে এখন ঝগড়া করে সুন্দর মুহূর্ত কাটানোর ইচ্ছাটাকে ধামাচাপা দেওয়ার মানে হয় না।

একপাশে বাইক থামিয়ে বেলি ফুলের মালা কিনে নেয় তূর্যয়।নুরিয়ার হাতে বাঁধতে চাইলে সে ক্ষেপে বলে ওঠে,
-“একদম ন্যাকামি করবে না তূর্যয়।আমার বিরক্ত লাগছে।তোমার সাথে বের হওয়াই ভুল হয়েছে।রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হচ্ছে”

তূর্যয় এবার আর রাগ দমিয়ে রাখে না। ঠাঁটিয়ে চড় মারে।রাস্তার অনেক মানুষই তাদের দেখে নেয়।নুরিয়া শক্ত হয়ে বসে থাকে।তূর্যয় বাইক ঘুরিয়ে নেয় তালুকদার বাড়ির দিকে।বাড়ির কাছে গাড়ি আসতেই হুরহুর করে বাড়িতে ঢুকে যায় সে।আর তূর্যয়?বাইক নিয়ে চলে যায় বন্ধুদের আড্ডা খানায়।

বিকেল বিকেল তূর্যয়কে বারে দেখে চমকায় ওর বন্ধু সানভি।সানভিই দেখাশোনা করে এই বারের।এই শহরে ওর বাবার চারটা বার আছে।আর সানভিই দেখাশোনা করে এগুলোর।সানভির পরিচয়ে তূর্যয় বিকেলেই ঢুকতে পেরেছে বারে।

-“কিরে এই অসময়ে?”(সানভি)
-“আর জিজ্ঞেস করিস না।এক প্যাগ দিতে বল।মাথা ধরে আছে”(তূর্যয়)

সানভি ইশারায় একজনকে দিতে বলে।লোকটা ইশারায় বোঝায় সময় লাগবে। কেননা সব ড্রিংকসগুলো সাজানো হচ্ছে।সানভি ইশারায় ম্যানেজ দিতে বলে।লোকটা মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দেয়।বসের কথা তো সেই মানতেই হয়।

-“বা*রে বিয়ে করছি।বিয়ের আগে বলতো ফুটপাত থেকে বেলি ফুলের মালা কিনে হাতে পড়িয়ে দিও…আমি খুশিতে আত্মহারা হয়ে যাবো।আর এখন করায় বলে আমি নাকি ন্যাকামি করছি”(তূর্যয়)
-“আরে মেয়ে মানুষ এমনই।বাদ দে তো।ড্রিংকস করে বাড়ি যা।গিয়ে দেখবি ঠিকই তোর অপেক্ষায় বসে আছে”(সানভি)
-“তুই চিনস না ওরে..।আমি নিশ্চিত এতোক্ষণে বাড়িতে ঘূর্ণিঝড় তুলেছে ও।নানা আজ ওকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করবে দেখিস।”(তূর্যয়)
-“ভাই তোর নেশা চড়তাছে।আর খেতে হবে না।”(সানভি)

এক প্যাগের কথা বললেও বিয়ারের বোতল পেয়ে ঢগঢগ করে এক বোতল শেষ করেছে ও।এখন সোফায় শুয়ে বিড়বিড় করে কি কি যেন বলছে।এই বিকেল বেলায় নেশাগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে আছে ও।যদিওবা একজন মুসলিম ঘরের সন্তানদের জন্য অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় হারাম।

চলবে কি?