দো দিলে জাহান পর্ব-০৫

0
102

#দো_দিলে_জাহান
#পর্বঃ৫
#বর্ষা
১৫.
মোবারক তালুকদার বেলকনির বারান্দায় বসে হাতের লাঠি দিয়ে ঠকঠক শব্দ করছেন।ওনার মস্তিষ্কে ঘুরছে উল্টোপাল্টা সব চিন্তা।বৃদ্ধ বয়সে মানুষের কত স্বাধই না জাগে!এইতো দুই সপ্তাহ আগে ওনার জেদ আর তূর্যয়ের মায়ের টানাটানিতে মেহেরের বিয়ে হতে হতেও শেষমেশ হলো না। বৃদ্ধ মানুষ তিনিই সব বোঝেন,আর কেউ কিছু বোঝে না এমনটাই ওনার ধারণা।

-“আব্বা ডেকেছিলেন?”

জুনায়েদ,মহাসিন দুইভাই একসাথেই এসেছে। মোবারক তালুকদারই ওনাদের ডেকেছে।অফিস বাদ দিয়ে এই ভরদুপুরে বাপের কথা রাখতে বাড়িতে আসা। অবশ্য নিজস্ব অফিস হওয়ায় ঝায়ঝামেলা এক্কেবারেই নেই।তবে মিটিং ছিলো যা দুইঘন্টা পেছানো হয়েছে। মোবারক তালুকদারের অনুমতিতে ভেতরে আসে ওনারা।

-“মাইয়া মানুষের এতো পড়ালেখা আমার আগেও ভালো লাগতো না এখনো ভালো লাগে না।মেহেরের বিয়া তো তূর্যয় নানু ভাইয়ের লগে হইলো না।তাই ভাবছি ওর বিয়া অন্যখানে দিমু।যত তাড়াতাড়ি দিমু তত ভালো নয়তো ওরে কেউ বিয়াও করবো না।বিয়া ভাঙা মাইয়া”

মহাসিন তালুকদার মাথা নিচু করে বাবার প্রতিটা কথাই শোনেন।তিনি পিতৃ ভক্ত।মা তো খুব ছেলেবেলায় মারা গিয়েছিলো।তাই মহাসিন তালুকদারের পিতার ভালোবাসার জন্য পিতৃভক্তি দেখান।যদিও তিনি বাবার কথায় মেয়ের বিরুদ্ধে যাওয়ার মতো ভুল দ্বিতীয়বার করবেন না।

-“জুনায়েদ তোর মেয়েও তো ডাঙর হইছে।তোয়ার লিগা ভালো পুলা দেখছি….”

মোবারক তালুকদারকে সম্পূর্ণ কথা শেষ করতে দেন না জুনায়েদ তালুকদার।বাবার কথার মাঝেই বলে ওঠেন,
-“আব্বা আমার ওপর তোমার জোর আছে তবে আমাকে ক্ষমা করো।আমার তোয়া যতদিন পড়তে চাইবে পড়বে।ওর বাবার টাকা এতোও কম পড়ে যায়নি যে ওর তৈজসপত্রের জন্য বিয়ে করতে হবে।”

জুনায়েদের কথা শেষ করতে দেরি হয়ে লাঠি দিয়ে পেটাতে দেরি করেন না মোবারক তালুকদার।দু ঘা বসিয়ে নিজেই আহাজারিতা শুরু করেন।এবার আর মেহেরকে একা নয় বরং তোয়ার নাম নিয়েও বকতে শুরু করেছেন।দুইভাই ধীরে আস্তে বাবাকে শান্ত করে বেরিয়ে আসেন।

১৬.
মহাসিন তালুকদার নিজের স্টাডি টেবিলে বসে বসে তিন সপ্তাহ আগের ঘটনাবলীগুলো আবারো আওড়াচ্ছেন নিজ স্মৃতিতে।এইতো তিন সপ্তাহ আগে হুট করে তূর্যয়ের মা এসে বায়না করলো তার ছেলের বিয়ে দিবে।তাও কার সাথে মেহেরের সাথে। যেহেতু মেয়ে পাগল মোবারক তালুকদার।তাই মুহুর্তেই রাজি হয়ে গেলেন।কত করে কতবার মহাসিন তালুকদার ঠান্ডা মাথায় বোঝানোর চেষ্টা করেছিলো আব্বা আপনি যেদিন বিয়ের তারিখ রাখছেন তার ঠিক একদিন বাদেই মেহেরের পরীক্ষা।যেহেতু মোবারক তালুকদার মেয়েদের পড়াশোনা পছন্দ করেননা তাই তিনি ইচ্ছা করেই এমনটা করেছিলেন বলে মহাসিন তালুকদারের এখন মনে হচ্ছে।

-“কি এতো ভাবছো?”

রাবেয়া বেগমের কথায় মাথা তুলে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে ওঠে,
-“আচ্ছা রাবেয়া তোমার রাগ লাগেনা আমার ওপর?আমি যে এত পিতৃভক্ত।আমার কারণে আমাদের মোয়াজ কতমাস ধরে দূরে। আমাদের মেয়ের জীবনে এই দশা।তাও তোমার কি আমার প্রতি বিরক্ত আসে না?”

স্বামীর কথায় মৃদু হাসেন রাবেয়া বেগম।বলে ওঠেন,
-“পিতৃভক্তীতে বিরক্ত হবার কি আছে?তবে মাঝে মাঝে রাগ ওঠে।যখন দেখি আমার সন্তানদের ক্ষতি হচ্ছে দেখেও তুমি আব্বার মুখের ওপর কোনো কথা বলো না।তবে ভালোও লাগে যখন তুমি সামনে আব্বাকে কিছু বলতে/করতে না পারলেও পেছনে চেষ্টা করো সন্তানের ভালোর।এই যে মোয়াজের চাকরিটা হলো তাও তো তোমার কারণেই।”

রাবেয়ার কথায় হাসেন মহাসিন।এই নারী তার জীবনে না থাকলে কি হতো কে জানে!কত গভীর ভাবে ওনাকে বোঝে,ওনার সন্তানদের জননী,ওনার জীবনসঙ্গীনি।মাঝে মাঝে রাবেয়াকে ওনার বলতে ইচ্ছে হয়,
-” তুমি যদি না থাকতে তবে আমি হয়তো মানসিক বিপর্যস্ত হয়ে যেতাম!তোমার মতো আমায় আর কেউই বুঝবে না”

১৭.
ক্রিকেট খেলে ফেরার পথে জায়িন থমকে যায় স্কুল পড়ুয়া এক রমনীর ডাকে।দুইপাশে দুই ঝুঁটি।হাতে ঘড়ি। কাজল টানা বড় বড় চোখজোড়া।জায়িন যেন পুরোপুরি স্ক্যান করে নেয় মেয়েটাকে।

-“ভাইয়া আপনার প্যান্ট ছিঁড়ে গেছে।”

মেয়েটার সাথে আরো দুটো মেয়ে দাড়িয়ে আছে।তবে কথাটায় এতোটাই আতঙ্কিত হয়েছে সে যে কাঁধের ব্যাগ ঠুস করে নিচে পড়ে গেছে।টিউশন থেকে ফেরার পথেই খেলছি তাই ব্যাগ হওয়া।জায়িনের আতংকিত চেহারা দেখেই মেয়ে তিনটা হেসে দেয়।প্রথমে কথা বলা মেয়েটা ভেংচি দিয়ে সরে আসে।একদিন জায়িনও এই মেয়েকে অপদস্থ করেছিলো এই ভাবে।তাই প্রতিশোধ নিলো সে।

-“এই রিনি তুই কি ঠিক করলি?তালুকদাররা দিনদুপুরে মানুষ খুন করতে পারে তুই জানিস না!”

মায়ার কথায় গাছাড়া ভাব দেখিয়ে রিনি বলে ওঠে,
-“এই ছেলে আমাকে আজ থেকে প্রায় সাড়ে দুইবছর আগে আমার বেনুনি নিয়ে কথা শুনিয়েছিলো।আজ আমি‌ প্রতিশোধ নিয়ে নিলাম।”

নিরা মাথা চাপড়ে রিনিকে ধাক্কা মেরে বলে ওঠে,
-“সাড়ে দুই হয়না।আড়াই বল, আড়াই হবে।”

-“আমি তো সাড়ে দুইই বলবো।আড়াই-ফাড়াই ওতো আমার মনে থাকেনা।তোর সুধরে নিস তাহলে হবে”(রিনি)

তিন বান্ধবীর বাড়ি একই ভবনে।রিনিরা তিনতলায়,মায়ারা দুইতলায় আর নিরারা বাড়িওয়ালা থাকে রিনিদের ফ্লাটের সামনের ফ্লাটে।একই সাথে থাকায় ওদের বন্ধুত্ব অনেক গভীর।আগে যদিওবা আলাদা বাসায় থাকতো তবে মাস কতক হলো তিন বান্ধবী একই ভবনে।

জায়িন বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে রাগ দেখাচ্ছে।দেয়ালে ঘুষি মারছে।এই এক বদঅভ্যাস এই ছেলের।একটু রাগ হলেই এখানে সেখানে গিয়ে ঘুষাঘুষি শুরু করবে।রাগ কন্ট্রোল করতে পারে না।দাদার মতো রাগ হয়েছে সবগুলোর।

তান্মি এসে ছেলের হাত ধরে আটকান।কারণ জিজ্ঞাস করলেও না বলে ওয়াসরুমে ঢুকে যায়।তান্মি একা একাই বকবক করে বেরিয়ে যান। ছেলেপেলেগুলো যে নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বুঝতে পারেন।এখন আর আগের মতো করে কোনো কথাই বলে না।আরেকটু বড় হলেই জুনায়েদকে বলে এই ছেলেকে বিয়ে করাবেন। ছেলেদের বিশ্বাস নেই কখন কি করে বসে কে জানে!তান্মির কাছে মেয়ে হলো কোমলবতী।যাদেরকে যতোই প্রহার করা হোক না কেন ভেতরে কোমলতা তার থাকবেই।তবে ছেলে হলো আগুনের মতো।যতো ফুঁ দিবে তত বাড়বেই।

ওয়াসরুমে ঢুকে দেয়ালে হাত ঠেকিয়ে ভিজছে জায়িন।মনে মনে ভেবে নিচ্ছে শতখানেক কথা।কে সে মেয়ে তা তো তার জানতেই হবে।যদিওবা প্রতিশোধ নিবে।তারপর বিয়ে করে ঘরে তুলবে।আব্বুর সাথে তার খুব শীঘ্রই দেখা করতে হবে।তবে তার আগে প্রতিশোধ। কেননা প্রতিশোধ নেওয়ায় মিস করা যাবে না।এই মেয়ের কারণে আরেকটু হলে মান-ইজ্জতের ভয়ে সে হার্ট অ্যাটাক করতো।জায়িন মনে মনে বলতে থাকে,

-“তোমার রুপের ঝলকে আমায় আটকে তো ফেললে মেয়ে।তবে আমার প্রতিশোধ যে তারচেয়েও বড্ড প্রিয় থাকবে।রেডি হয়ে থাকো”

১৮.

মোয়াজ আর তৃষ্ণার দিনকাল এখন ভালোই যাচ্ছে সরদার বাড়িতে।মোয়াজ বাবার ব্যবসায় হাত দিয়েছে।কারণটা সম্পূর্ণ মোবারক তালুকদার।তিনিই বাধ্য করেছেন নাতিকে ব্যবসায় ঢুকতে।বলেছেন,
-“তূর্যয়ের থেকে শিখ।ওর বাপের ব্যবসা ও সামলায়।তুইও তো কম ডাঙর হোস নাই।বাপের ব্যবসা সামলা।নয়তো কাপুরুষের মতো ঘরে শাড়ি চুড়ি পইড়া বইসা থাক।”

মোয়াজের রাগ তো উঠেছিলো।তবে কিছু বলেনি। কেননা ওর মা রাবেয়া বেগম ওকে বুঝিয়েছে।বলেছে,
-“বাপ দাদার কোথায় একদম রাগ করবি না।তোর দাদা আসলে ভালো কথাই বলতে চায়।তবে ওনার বলার ধরনটা ভালো না।তাই ভুল বুঝে নিজেকে আর দাদাকে কষ্ট দিস না যেন”

তাইতো মোয়াজ রাগ না করে হ্যা তে জবাব দিয়েছে।বিকেলে ফেরার পথে বেলি ফুল কিনে নিয়েছে সে।বাসায় ফিরে তৃষ্ণার খোঁপায় গুঁজে দেওয়া যাবে।মেয়েটা বড্ড ফুল পাগল।

বাসায় ফিরে নিজের ছটপটে রানি সাহেবাকে নিশ্চুপ দেখে মোয়াজ অবাক হয়।কই আগে তো তার রানি সাহেবা এভাবে চুপচাপ থাকেনি কখনো।কেউ কি কিছু বলেছে?মোয়াজ কয়েকবার জিজ্ঞেস করে তৃষ্ণাকে।তবে সে বরাবরের মতো নিশ্চুপ থেকে মোয়াজের পোশাক পরিবর্তনে সাহায্য করছে।পানি এগিয়ে দিচ্ছে।ঘড়ি হাতে নিয়ে নিজ জায়গায় রাখছে।

রান্নাঘরের সামনে গিয়ে মোয়াজ ডাকে ওর মা’কে। ভেতরে তান্মি,নুরিয়া আর তূর্যয়ের মাও আছে।তাই আর ও যায়নি।তবে জোর গলাতেই বলেছে,
-“আম্মু তৃষ্ণাকে কে কি বলছে?”

-“বউয়ের চামচা।বাসায় আসার সাথে সাথে কান ভরছে।আর তা শুনে চলেও আসছে।”

রাবেয়া বেগম কিছু বলার আগেই রান্নাঘর থেকে কথা ভেসে আসে। মোয়াজ যতদূর ওর ফুফি আর চাচির সাথে পরিচিত এই কন্ঠ তাদের না। অর্থাৎ নুরিয়া কথাটা বলেছে।মোয়াজ নিজেকে সংযত রাখতে পারেনা।বলে ওঠে,
-“আম্মু অন্যদের সাবধান করে দিও।তালুকদারদের বাজে রেকর্ড আছে মানুষ খুনের।আমার হাতে আবার নয়া নয়া খুন না হয় কেউ!”

মোয়াজ চলে যায়। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার সময় লক্ষ্য করে মাহিন আর মেহের কিছু একটা করছে।তবে লুকিয়ে লুকিয়ে।মেহেরের রুমে আস্তে করে ঢুকে মোয়াজও দেখার চেষ্টা করে।আর মোয়াজকে হঠাৎ দেখে মেহের চিৎকার করে ওঠে।আর বোনের মতো মোয়াজও চিৎকার করে ওঠে।তিন ভাই-বোন হেসে দেয়।

-“কিরে ছুটকি,বড়দা ভাই তোমরা কি করছিলে?”

-“এই দেখো ছোটদা ভাই বড়দা ভাই আমায় কি দিয়েছে!”
হাতের খরগোশটা গালের সাথে স্পর্শ করিয়ে ভালোবাসা আদান-প্রদান করে মেহের।সে তো এই ক্ষুদ্র প্রাণীটার নামও ঠিক করে ফেলেছে।তিন ভাই-বোন খরগোশ নিয়ে গল্প শুরু করলেও গল্পের ইতি হয় দুইদিন আগে মেহের আর তীব্রর ঘোরাঘুরি নিয়ে।মেহের তো লজ্জায় শেষ। অবশ্য সে তো বুঝতেই পারছে না সে আসলে লজ্জা কেন পাচ্ছে!

চলবে কি?